Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৮

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৮

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৮
তানিয়া হুসাইন

ইশায়া তাকে দেখুক বা না দেখুক, তার খোঁজ রাখুক বা না রাখুক,ভীর কখনোই তার থেকে দূরে ছিল না।
অদৃশ্য এক ছায়ার মতো, নিঃশব্দে, নিঃশ্বাসের মতো কাছাকাছি সে সবসময়।সে ইশায়ার প্রতিটা মুহূর্তের হিসাব রাখে।আগেও সে নজর রাখতো,
কিন্তু এখন সবকিছু যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
কারণ এখন ইশায়া একা না।তার ভেতরে রয়েছে আরেকটা ছোট্ট প্রাণ।ভীরের অস্তিত্বেরই একটা অংশ।মাঝে মাঝে ভীর নিজেই অবাক হয়ে যায়।
তার মতো একজন মানুষ যার জীবনে র*ক্ত, ভয় আর ক্ষমতা ছাড়া কিছু ছিল না, তার বুকের ভেতরেই এখন একটা অদ্ভুত নরম অনুভূতি জন্ম নিয়েছে।
তার লিটল প্রিন্সেস সে নিজেই তো এখনও বাচ্চা,
অভিমানী, জেদি, ভাঙা-গড়া অনুভূতিতে ভরা।
আর সেই ইশায়াই এখন আরেকটা প্রাণের আশ্রয় হয়ে আছে।ভীর দূর থেকে সব দেখে।ইশায়ার মুড সুইং, হঠাৎ রাগ, অকারণ কান্না সবকিছু সে বোঝে।

সে জানে কেন ইশায়া এমন আচরণ করছে।
তার ভয়, প্রতিটা অভিমান সবকিছুর উৎস সে নিজেই।
তবুও এইবার ভীর থেমে আছে। চুপচাপ দেখছে
এই তেজ, এই দূরত্ব, এই অবহেলা কতদিন টিকে থাকে।
তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে ওঠে।
সে জানে ইশায়া যতই দূরে সরে যাক,শেষে ফিরে আসার জায়গাটা একটাই।
আর সেটা সে নিজে।এখানেই আসতে হবে তাকে।
ভীর দূরে থাকলেও ইশায়ার সুরক্ষার জন্য সে কোনো কমতি রাখেনি।অদৃশ্য দেয়ালের মতো চারদিক ঘিরে রেখেছে তাকে যেন কোনো বিপদ তার ছোঁয়াও না পায়।
কারণ এখন তার একটাই লক্ষ্য ইশায়াকে নিরাপদ রাখা। তার সন্তান পৃথিবীতে আসার আগ পর্যন্ত সে কোনো ঝুঁকি নিতে পারবে না।আর তারপর তার চোখে ধীরে ধীরে ফিরে আসে সেই পুরোনো অন্ধকার।
আর কয়েকটা মাস।তারপর আবার সবকিছু সে নিজের মতো করে গড়ে নেবে।ইশায়া আবারো আগের মতো হয়ে যাবে।আবার ইশায়া তার দিকে দুর্বল হয়ে পড়বে
না, শুধু দুর্বল না।একেবারে বদ্ধ উন্মাদের মতো ভালোবাসবে তাকে আবারো।তার মন, তার শ্বাস, তার প্রতিটা অনুভূতি শুধু একজনকেই চিনবে
রাজভীরকে।শুধু ভীর।ভীরের দৃষ্টি নেমে আসে নিজের বুকে,সেই ক্ষতটার দিকে।একটা তীক্ষ্ণ, গভীর দাগ।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই ক্ষত নিয়ে তার কোনো রাগ নেই।ইশায়া তাকে আঘাত করেছে,তবুও সে তাকে দোষ দেয় না।ইশায়ার দেওয়া কোনো কষ্টই তার কাছে কষ্ট না।কিন্তু যারা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী যাদের কারণে ইশায়া আজ এমন। তাদের জন্য ভীরের চোখে কোনো ক্ষমা নেই।তাদের ভয়ংকর পরিণতি না দিয়ে শান্তি পাবেনা সে।তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।এই কারণেই তার আসা এইবার।

____গ্র‍্যানি ইশায়ার কাছে যাচ্ছে না এটা নজরে পরে ভীরের।আর কি জন্য হচ্ছে এটা সে আচ করতে পারে।
তাই ভীর ইলারা আলভারেযকে ফোন করে বলে ইশায়ার কাছে থাকতে,ওকে দেখে রাখতে সবসময়।সে যতদিন প্যালেসে নেই ততদিন অন্তত যেনবসে সাথে থাকেন।
ইলারা আলভারেয ভীরের কথা ফেলতে পারেন না কখনোই।তাই তিনি আবারও যান ইশায়ার কাছে।
তার পদচারণায় আজ রাগ, অভিমান আর অস্বস্তির মিশ্রণ।ইশায়ার ওপর তিনি সত্যিই ক্ষুব্ধ। কারণ একটাই ভীরের ওপর আক্রমণ। ভীর তার অত্যন্ত আদরের।
নিজের র*ক্ত-মাংসের চেয়েও বেশি প্রিয়।
তার সামান্য কষ্টও তিনি সহ্য করতে পারেন না, কারন সে জানে ভীর কিসের উপর দিয়ে এসেছে,সেখানে এভাবে আঘাত এটা তিনি মেনে নেবেন কীভাবে।
হঠাৎ এতোদিন পরইলারা আলভারেযকে তার রুমে দেখে ইশায়া ধীরস্বরে বলে উঠে,

___আমার উপর রেগে আছো, গ্র্যানি?
তার কণ্ঠে এক ধরনের ক্লান্ত হাসি, সে আগে থেকেই জানে উত্তরটা।
ইলারা আলভারেয গম্ভীর গলায় জবাব দেন,
__তুমি যা করেছো, তার পর রেগে থাকাটা কি স্বাভাবিক না?
ইশায়া একটু হাসল। সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে ব্যথাই বেশি ছিল।সে ধীরে ধীরে বলে,
__আমার জায়গায় যদি তুমি থাকতে, তাহলে বুঝতে পারতে।
ইলারা আলভারেযের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠে,
তিনি এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন,
__তোমার সাথে যা হয়েছে, তা কি ভীর করেছে?
ভীর তোমাকে ভালোবেসেছে,তোমাকে বিয়ে করেছে,
তুমি তার সন্তানের মা হতে চলেছো।একজন মা*ফিয়া তোমাকে কতটুকু সম্মান দিয়েছে,তুমি কি বুঝতে পারছো।অন্য কারো হাতে পড়লে তোমার কী হতো?
তার কথাগুলো কঠিন হলেও বাস্তব।আমি মানি তোমার সাথে অন্যায় হয়েছে।কিন্তু সেটা করেছে নিকো।সেটা তুমি ও জানো।ভীর কি নিকো যেটা তোমার বোনের সাথে করেছে সেটা তোমার সাথে করতে পারতো না।
সব কিছু জেনেও না বোঝার ভান করে থাকলে কী করার আছে বলো?

__ইশায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে।মাথাটা আস্তে করে বালিশে এলিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করে ঠান্ডা,নিস্তেজ কণ্ঠে বলে,
___মুখে বলা সহজ, গ্র্যানি।
ওনার নজর যদি আমার ওপর না পড়তো,
তাহলে এগুলোর কিছুই হতো না।আমার পুরো পরিবারটা শেষ।যা আর কোনদিন ও ঠিক হবে না। উনি যদি আমাকেই চাইতেন তাহলে আপুকে কেনো জড়ানো হলো, নিককে উনি আটকাতে পারতেন।উনি চাইলে সব কিছু স্বাভাবিক থাকতে পারতো।
ইশায়ার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল। তবুও সে কোনরকমে কথাটা বলে।
ইলারা আলভারেয কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন।
তারপর নরম স্বরে বলেন,
___দেখো, ইশায়া যা হওয়ার হয়ে গেছে।তুমি চাইলেও এটা ঠিক করতে পারবে না।
তাই যা হয়েছে, মেনে নাও, এটাই তোমার জন্য ভালো।
দেখো, তোমার জীবন এখন এটাই।ভীর-ই তোমার ভবিষ্যৎ।দু-দিন পর তোমার সন্তান আসবে।
তাই বলছি, সব মেনে নাও।আর ভীরের এখানে কোনো দোষ নেই।যা নিক করেছে, তার দায়ভার ভীরের না।
সে শুধু তোমাকেই চেয়েছিল।আর তোমার উপর ভীর কখনো কোনো অন্যায় করেনি।
ইশায়া আর কোনো কথা বাড়ায় না।চুপচাপ শুয়ে রইল, চোখ বন্ধ করে।কারণ সে জানে এখানে কেউ তাকে বুঝবে না।

____ইতালির উত্তরের এক নির্জন উপত্যকা চারদিক জুড়ে পুরনো পাথরের ভিলা, শুকনো আঙুর বাগান আর কুয়াশায় ঢাকা সরু রাস্তা। ঠিক সেখানেই ভীর। জায়গাটা বাইরে থেকে শান্ত, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে রহস্য।সেখানেরই খোঁজ পেয়েছে তার শত্রুপক্ষ এখানে ঘাঁটি গেড়েছে। আর তাদের ধরতেই ভীরের এখানে আসা।
কিন্তু লুকা, মাতেও এদের কেউই এখানে ছিল না।ওরা ছিল অনেক দূরে কলম্বিয়ায়।মাতেও খুব চালাক। সে কখনো এক জায়গায় থাকেনা।ই*তালি, স্পে*ন, সব জায়গায় তার লোক ছড়িয়ে আছে। এমনভাবে এগোয়, যেন তার অস্তিত্বটাই একটা ধোঁয়া ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।আর ম্যাটিয়াস তো আছেই। সে নিক আর ভীরের সমস্ত পরিকল্পনা তাদের জানিয়ে দেয়।আর সেই কারণেই শত্রুপক্ষ আগে থেকেই সতর্ক হয়ে যায়।কিন্তু এবার একটা জিনিস তাদের অজানা রয়ে গেছে,ভীর কোথায় আছে,কেন গেছে, কি উদ্দেশ্যে গেছে।নিকোও সেটা জানে না।
কারণ এবার ভীর কাউকে কিছু জানায় নি।
রাত তখন গভীর।আকাশে চাঁদ নেই, শুধু কালো মেঘের স্তর।ভীর আফ তার লোকেরা সেই লোকেশনে চলে আসে।তার পাশে রোসাস নিষ্ঠুর, ঠান্ডা মাথার যোদ্ধা।
আর তার সাথে আরও কয়েকজন বিশ্বস্ত গার্ড আলেজান্দ্রো, লোবো, ক্রুজ,মেন্দোজা, কাস্তিয়ো।কালো এসইউভির সারি নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে সেই পরিত্যক্ত ওয়াইন ভিলার চারপাশে।চারদিক ঘিরে ফেলা হয় একটা নিখুঁত অবরোধ।ভীর গাড়ি থেকে নামতেই ঠান্ডা বাতাসে তার কোট উড়তে থাকে।চোখে সেই একই দৃষ্টি।শিকার শুরু হওয়ার আগের নীরবতা।
ভীর শক্ত গলায় বলে,কেউ যেনো পালাতে না পারে।

শত্রুপক্ষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আক্রমন শুরু হয়।
স্বয়ংক্রিয় রা*ইফেলের শব্দে রাত ফেটে পড়ে।
গো*লাগু*লির ঝড়, কাঁচ ভাঙার শব্দ, চিৎকার সব একসাথে মিশে যায়।
ভিলার ভেতর থেকে শত্রুরাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।একজন জানালা থেকে গুলি ছুঁড়তেই রোসাস তাকে নিখুঁত হেডশটে নামিয়ে দেয়।মোন্দেজা দরজা লাথি মেরে ভেঙে ঢুকে পড়ে।তার হাতে শ*টগান প্রতিটা শট মৃত্যুর ঘোষণা।
একজন লোক ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তেই রিকো তার হাতে গু*লি করে,র*ক্ত ছিটকে পরে।ভীর ভেতরে ঢোকে।তার হাতে সা*ইলেন্সার লাগানো পি*স্তল।
একজন দৌড়ে পালাতে গেলে,রোসাস গু*লি করে লোকটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।
ক্রুজের শরীরের গু*লি লাগলে লোবো তাকে নিয়ে যায় সেইফ জায়গায়।কাস্তিয়ো এগিয়ে এসে তাদের বের করে দেয়।
ভীর সামনে থেকে লড়াই করে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সব শেষ।এক এক করে সবাইকে শেষ করা হয়।শুধু একজন বেঁচে থাকে। মাতেওর স্পেশাল লোকগ্যাংস্টার বিয়ানকি, মাতেওর ডান হাত।তাকে বাচিয়ে রাখা হয়।রোসাস তাকে টেনে এনে ফেলে ভীরের পায়ের সামনে।মুখ র*ক্তে ভেজা, নিঃশ্বাস কাঁপছে।
রোসাস সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।তার চোখে কোনো রাগ নেই শুধু আছে নিষ্ঠুরতা।
বল মাতেও কোথায়?
বিয়ানকি হাসে,র*ক্ত মিশে থাকা দাঁত দেখা যায়।

___তো**তোরা কখনোই….
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই রোসাস ঘু*ষি মারে।
একটা দুইটা তিনটা… হাড় ভাঙার শব্দ শোনা যায়।
মোন্দেজা তার কাঁধ চেপে ধরে রাখে।
রাফা পাশে দাঁড়িয়ে ছু*রি ঘোরাচ্ছে আঙুলে।
ভীর তখনো চুপ, সে এগিয়ে আসে। বিয়ানকির সামনে দাঁড়ায়।
তারপর নিচু হয়ে ফিসফিস করে বলে,
___আমি সময় নষ্ট করতে পছন্দ করি না।হয় বলবি না হয় এক্ষুনি মা*রা পরবি।
মাফিয়া বসের উপস্থিতি বিয়ানকির সারা শরীর কেপে ওঠে।
শেষ সুযোগ তোর কাছে ওরা কোথায়,ওদের ধরিয়ে দিলে তোকে ছেড়ে দিবো।
___ভীরের চোখের দিকে তাকাতেই বিয়ানকির সাহস ভেঙে যায়।তবুও সে মুখ খুলে না।
রোসাস আবার মারতে শুরু করে,এবার আর শুধু মার না এটা ছিল তথ্য বের করার জন্য নির্যাতন।
র*ক্ত মেঝেতে জমে ছোট ছোট দাগ তৈরি করছে।
চিৎকার প্রতিধ্বনি হচ্ছে চারপাশে।

___মাতেও… লুকা… কোথায়?
প্রতিটা প্রশ্নের সাথে বাড়ছে আঘাতের তীব্রতা।
ভীর আবারো বলে,
মাতেও লুকার সাথে আর কে জড়িত আছে।
এখানে তৃতীয় ব্যাক্তি আর কে আছে।যে পিছন থেকে গেইম খেলছে সামনে আসছে না।নাম কি তার?
___বিয়ানকি এখনো চুপ।
র*ক্তে পুরোপুরি ভিজে গেছে মুখ।
ভীর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তারপর হাত এগিয়ে দেয় সামনে,
রাফা ধারালো ছু*রি এগিয়ে দেয়।ঠান্ডা, চকচকে ব্লে*ডে ভিলার ভাঙা লাইটের আলো প্রতিফলিত হয়।এক মুহূর্তও দেরি করে না সে।ছুরিটা ধরে বিয়ানকির হাতে এক টান, একটা আ*ঙুল কে*টে ফেলে।
বিয়ানকি বিকট চিৎকার দিয়ে ওঠে।
তার চিৎকারে কারোর কোন হেলদোল নেই,ভীর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না।শুধু নিচু গলায় বলে,
___বল… কোথায় আছে ওরা?আর কে কে জড়িত তোদের সাথে?কথা শেষ হতে না হতেই
আরেকটা আ*ঙুল।
আবার সেই হাহাকার। বিয়ানকির শরীর কাঁপতে কাঁপতে ভেঙে পড়ে।
আর সহ্য করতে না পেরে সে বলে,

___বলছি… বলছি… ছেড়ে দাও আমাকে, বলছি
কান্না মিশে যায় তার কণ্ঠে।ভীর সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
এক পা পিছিয়ে যায়।তার চোখ এখনো বিয়ানকির উপর স্থির।
তারপর শক্ত, আদেশময় গলায় বলে,
___বল।
বিয়ানকি একটা লম্বা শ্বাস নেয়।তারপর মুখ খুলে,
____ম্য……
শব্দটা ঠোঁট থেকে বের হতেই দূর থেকে ভেসে আসে একটা গু-লির শব্দ।এক সেকেন্ড তারও কম সময়।গু*লিটা সোজা এসে লাগে বিয়ানকির কপালে।
চোখের সামনে তার মাথা পেছনে ছিটকে যায়।
শরীরটা নিস্তেজ হয়ে নিচে লুটিয়ে পড়ে।
সবকিছু থেমে যায়।

___শিট!
রোসাস চিৎকার করে ওঠে।
রোসাস, মেন্দোজা রাফা তিনজনই দ্রুত দৌড়ে বেরিয়ে যায় বাইরে।যে লোকটা গু*লি করেছে, তাকে ধরতে।
ভীর এক ঝটকায় নিচে ঝুঁকে পড়ে।বিয়ানকির নিথর শরীরটা ঝাঁকায়।
___বল! কার কথা বলছিলি?নাম কি?
কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।চোখ দুটো ফাঁকা।
___ভীর দাঁতে দাঁত চাপে,
ফা***!
বিরক্তি আর রাগে বিয়ানকির শরীরটাকে ছিটকে ফেলে দেয় সে।
দুই হাত দিয়ে নিজের মাথার চুল চেপে ধরে।চোখ বন্ধ করে এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে।
___আর একটুর জন্য। তার গলায় চাপা গর্জন।
এদিকে বাইরে রোসাস, মেন্দোজা, রাফা দৌড়ে বেরিয়েই দেখতে পায় একটা কালো হেলিকপ্টার ইতিমধ্যেই উঠতে শুরু করেছে। রাফা চিৎকার করে গু*লি চালায়।ট্রিগার চাপার শব্দে রাত আবার কেঁপে ওঠে।গু*লির পর গুলি ছোড়া হয় আকাশের দিকে।
কিন্তু কোনো লাভ হয় না।হেলিকপ্টারটা অনেকটাই ওপরে উঠে গেছে।ওরা পৌঁছানোর আগেই সে পালিয়ে গেছে।
রোসাস দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ তার বুক উঠানামা করছে রাগে।
সে নিজের রি*ভলভারটা মাটিতে ছুড়ে মারে।
রাগে চিৎকার করে বলে,
____ড্যাম ইট!

______ভোর তখনও হয়নি পুরোপুরি।আলো আর অন্ধকারের মাঝামাঝি এক নরম সময়।যেখানে চারপাশে সবকিছু শান্ত, নিস্তব্ধ।ইশায়ার ঘুম ভাঙে তখন।কোনো শব্দে না একটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে।
চোখ খুলতেই বুঝতে পারে হালকা ব্যথা ছড়িয়ে আছে হাত-পা, পিঠ, কোমরে।বুকেও চিন চিন ব্যাথা করছে।
ইশায়া নড়তে চায়,কিন্তু ঠিক তখনই বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে এক ঢেউ,বমি বমি ভাব। হঠাৎ করেই মুখটা বিকৃত হয়ে যায় তার।চোখ কুঁচকে উঠে বসে পড়ে বিছানায়।গলা শুকিয়ে আসে, বুক ভারী লাগছে।
কিছুক্ষণ সে চুপচাপ বসে থাকে।নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে।এই অনুভূতি নতুন না,কিন্তু প্রতিদিনই যেন নতুন করে অসহ্য লাগে।ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে।
পা দুটো মেঝেতে রাখতেই একটু কেঁপে ওঠে শরীর।
শব্দে ইলারা আলভারেয ও উঠে যান,ইশায়াকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন এর আগেই সে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।
অনেকক্ষণ পর যখন বের হয়,তার চোখ লালচে, মুখ ফ্যাকাসে, ঠোঁট শুকনো।
ইশাকে বের হয়ে আসতে দেখে ইলারা বলে,

__এসময় এরকম একটু হয় চিন্তা করোনা,সব ঠিক হয়ে যাবে।
ইশায়া কিছু বলে না,সে আয়নার সামনে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে নিজের দিকে।এই কি সে?এই ক্লান্ত, ভাঙা, অবসন্ন মেয়েটা?হাতটা ধীরে ধীরে চলে যায় নিজের পেটের উপর।খুব বেশি কিছু বোঝা যায় না এখনও তবুও সেখানে একটা প্রাণ আছে।একটু পেট উচু হয়েছে কি।তার ভেতরে তারই একটা অংশ।
ইশায়ার মাথা ঘুরছে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। আর সামলাতে না পেরে সে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
ইলারা আলভারেয তার মাথার কাছে বসেন। মমতায় ভরা হাতে আস্তে আস্তে ইশায়ার চুলে হাত বুলাতে থাকেন। সেই স্পর্শে ইশায়া খুব শান্তি পায়, একধরনের অদ্ভুত শান্তি।
মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তিনি নরম গলায় বলেন,
___ওঠো, কিছু খেয়ে নাও। ঔষধ খেতে হবে।
ইশায়া চোখ বন্ধ রেখেই মাথা নাড়ে। ক্লান্ত কন্ঠে বলে,
___না গ্র‍্যানি… এখন ভালো লাগছে না কিছু।
ইলারা আর কিছু বলেন না। শুধু চুপচাপ তার মাথায় হাত বুলাতে থাকেন,ভাবেন আজই একবার ডাক্তারকে ডাকবেন। কারণ ইশায়া বারবার বমি করছে।নরম হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
এরপর এভাবেই নীরবতার মাঝে কাটে কিছু সময়।
কিছুক্ষন পর হঠাৎ ইশায়া বলে ওঠে,

___গ্র‍্যানি… তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
ইলারা ইশায়ার কথায় সায় দিয়ে বলে,
___হ্যাঁ বলো, কী কথা?
ইশায়া এবার চোখ খুলে তাকায়। দৃষ্টিতে দ্বিধা, তবুও বলে,
___সত্যি বলবে তো?
ইলারা হালকা হাসেন ইশায়ার কথায়,
___মিথ্যা কেন বলবো, নাতবউ? বলো তুমি কি জিজ্ঞেস করবে? ভীরের কথা?
ইশায়ার গলা এবার আরও শান্ত হয়,
___আমি… ওনার অতীত সম্পর্কে জানতে চাই। ওনার মা-বাবা ছোটবেলার সব কিছু।
প্রশ্নটা শুনে নিস্তব্ধ হয়ে যান ইলারা আলভারেয। তার হাতের গতি থেমে যায়।
ইলারাকে চুপ হয়ে যেতে দেখে ইশায়া উঠে বসে।
কণ্ঠে অনুরোধ, চোখে কৌতূহল আর অজানা আশঙ্কা,
___বলো না গ্র‍্যানি আমাকে। আমি শুনতে চাই,প্লিজ।
ইলারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকান তার দিকে,
___এগুলো শুনে কী করবে তুমি?
ইশায়া কাতর গলায় বলে,

___আমি জানতে চাই, গ্র‍্যানি,প্লিইইইজ!
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ইলারার বুক থেকে। যেন ভারী কোনো বোঝা নামাতে যাচ্ছেন তিনি।
তারপর তিনি বলেন,ঠিকাছে শুনো তাহলে,
___রিকার্দো আলভারেয আমার একমাত্র ছেলে। সে ছিল সিনালোয়ার বাদশাহ।তার প্রথম স্ত্রী ছিল নাজিয়া তাসনিম,ভীরের মা।রিক আর নাজিয়ার ছেলে রাজভীর।এতটুকু বলেই থেমে যান ইলারা। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। স্মৃতিগুলো একসাথে ভিড় করে আসে মস্তিষ্কের ভেতর।
ইশায়া অধীর হয়ে বলে ওঠে,
___ওদের কী হয়েছিলো?
ইলারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করেন,সবকিছু ভালোই চলছিলো শুরুতে।নাজিয়াকে রিকের পছন্দ হয়।তার চাচার কাছ থেকে কিনে আনে ওকে রিক।অবশ্য পরে তাকে বিয়ে ও করে।

___কিন্তু নাজিয়া ছিল একেবারেই সাধারণ একটা মেয়ে।সে এই অন্ধকার জগত এই র*ক্ত, খু*ন, ক্ষমতার খেলাগুলো কিছুই মেনে নিতে পারেনি।এসব তার কাছে ঘৃণ্য ছিল,সাথে রিক ও।
সে সবসময়ই এগুলোর বিরোধিতা করতো।এই নিয়ে রিকের সাথে তার ঝামেলাও হতো।কিন্তু রিক এসব নিয়ে কখনো মাথা ঘামাতো না।তার কাছে এগুলোই ছিল স্বাভাবিক তার র*ক্তে মিশে ছিল এই অন্ধকার।
আর নাজিয়ার যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না।সে চাইলে এখান থেকে পালিয়েও যেতে পারবে না।রিক তাকে যত্ন করতো, নিজের মতো করে ভালোবাসতোও।
ইশায়া ইলারা আলভারেয এর কথাগুলো মন দিয়ে শুনতে থাকে।

___প্রথম প্রথম নাজিয়া বিরোধিতা করতো,লড়াই করতো নিজের মতো করে।কিন্তু একসময় এখানে থাকতে থাকতে সে বাধ্য হয়ে সব মেনে নেয়।কারন মেনে নেওয়া ছাড়া তার কাছে আর কোন রাস্তা ছিলো না।
এরপর সবকিছু স্বাভাবিক-ই চলছিলো।সময়ের নিজস্ব গতিতে দিন গড়াচ্ছিলো, আর মাঝেই নাজিয়ার পেটে ভীর আসে।এই খবরটা যেন অন্ধকারের ভেতর এক ফালি আলো হয়ে আসে আমাদের জীবনে।রিক অনেক খুশি হয়।কিন্তু সুখের এই আলো বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
ধীরে ধীরে সব কিছু বদলে যেতে শুরু করে।
রিকের মেয়েদের সাথে মেলামেশা করাটা নাজিয়ার চোখে পরে।এগুলো সে সহ্য করতে পারেনা।
সে এটা কিছুতেই মানে না।সব কিছু মানলেও এটা সে মানতে পারেনা।এই যন্ত্রণা, এই অপমান তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে থাকে।
আর একসময় সেই ভাঙা মন নিয়ে নাজিয়া ভীরকে পেটে নিয়েই সু*ইসাইড করার চেষ্টা করে, রিক রেগে যায় অনেক এতে।

কারণ ওর সন্তান ছিলো নাজিয়ার পেটে,আর নাজিয়াকেও মুখে না বললেও ভালোবাসতো আমার ছেলে।নাজিয়ার এরকম কাজে রিক তাকে নজরবন্দী করে ফেলে একেবারে।চারপাশে পাহারা,সবসময় পাহারার মাঝে থাকতে হতো তাকে,যাতে ও নিজের কোন ক্ষতি না করতে পারে।এই বন্দিত্ব, এই শ্বাসরুদ্ধ সময়ের মধ্যেই ভীরের জন্ম নেয়।
নিজের ছেলেকে পেয়ে রিক অনেক খুশি হয়ে যায়।
অনেক বেশি খুশি হয়,কিন্তু সেই আনন্দের বিপরীতে নাজিয়া দিন দিন সবকিছুর প্রতি উদাসীন হয়ে ওঠে।তার চোখে আর কোনো আলো ছিল না,
না ভালোবাসার, না জীবনের।এ নিয়ে রিক ওকে মারধোর করতো, ঝামেলা হতো কিন্তু নাজিয়া কিছুতেই রিকের সাথে মানিয়ে নিতে চাইতো না।আর রিকও নাজিয়াকে ছাড়বে না।এই টানাপোড়েন, এই বিষাক্ত সম্পর্কের মাঝেই ভীর বড় হতে থাকে।
বাবা-মা এর এই ঝামেলা ভীরের উপর অনেক প্রভাব ফেলতো।ছোট্ট মন, অথচ চারপাশে শুধু অশান্তি,
আর ভীর তো ওর মাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না।
নাজিয়া চায় নি তার ছেলে এসবের মাঝে জড়াক।
সে ছেলেকে সবসময় এসব বুঝাতো…ছোট্ট ভীর কিছুই বুঝতো না মায়ের কথার মানে,
তবুও মাকে খুশি করতে মায়ের কথায় সায় দিতো।
আমি ও নাজিয়াকে অনেক বুঝাতাম কিন্তু ও কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলো।তার চোখে তখন এক অদ্ভুত শূন্যতা, এক নিঃশব্দ চিৎকার বাসা বেঁধেছিলো।

____তারপর একদিন কি হয় রিক ক্যাটালিনাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।
সেদিন নাজিয়া সহ্য করতে পারেনি, ছু*ড়ি দিয়ে হাতের শি*রা কে*টে ফেলে।
ভীর তখন আমার সাথে ছিলো। রুমে গিয়ে তার মাকে র*ক্তাক্ত অবস্থায় দেখে তার কি কান্না।
তারপর সাথে সাথে ট্রিটমেন্ট শুরু করা হয় নাজিয়ার।
রিক আসে,অনেক ক্রিটিকাল অবস্থা হয়,৪৮ ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরে নাজিয়ার।
নাজিয়া এরপর ধীরে ধীরে সুস্থ হলেও ভীরের ভয়টা আর কাটেনা।এরপর এক মূহুর্তও ভীর নাজিয়াকে একা ছাড়তো না।প্রতিটা সময় ওর পাশে পাশে থাকতো।মাকে নিয়ে কি আহাজারি তার,কত বলতো
আমাকে ছেড়ে যেও না মা।আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবোনা।
নাজিয়াও ছেলেকে আগলে নিতো, যেন সেই একটুকরো ভালোবাসাই তার বেঁচে থাকার শেষ কারণ।
রিকের জীবনে তখন ক্যাটালিনা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ।ক্যাটালিনা সবসময় উস্কাতো নাজিয়াকে।
নাজিয়া সহ্য করতে পারতো না সব কিছুর পরেও নিজের স্বামীর ভাগ তো কাউকে দিতে চায়না কেউ।নাজিয়া এটা কখনোই মেনে নিতে পারেনি।

এ নিয়ে আমারও তার সাথে কথা কাটা কাটি হয় রিকের সাথে।
কিন্তু রিক কারোর কথাই মানেনা।ক্যাটালিনাকে ঘিরে নাজিয়ার সাথে রিকের সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যেতে থাকে।
রিক নাজিয়ার এসব পাগলামিতে একসময় বিরক্ত হয়ে যায়।
তারপর একদিন কি হয়, আমরা কেউ জানিনা।তখন না জানলেও এখন বুঝতে পারি ক্যাটালিনা নাজিয়াকে সুযোগ করে দিয়েছিলো,নাহলে এটা হওয়ার ছিলো না ।
নাজিয়া প্যালেস থেকে পালিয়ে যায়।
ভীর সকালে ঘুম থেকে ওঠে, মাকে খুজে,কোথায় তার মা। মা কে না পেয়ে তার কি অবস্থা,পুরো বাড়ি খোজেও নাজিয়াকে পাওয়া যায়নি।
একটা বাচ্চাএ পুরোও পৃথিবী মুহূর্তে ভেঙে পড়ে।
নাজিয়াকে না পেয়ে রিক পুরো সিনালোয়া তল্লাশি চালায়।সব জায়গা খোঁজা হয়।সবাই নেমে পড়ে খুঁজতে ওকে,কিন্তু কোথাও খোঁজে পায়না।দিন রাত পুরো সিনালোয়া তোলপাড় করেও,কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি নাজিয়ার।
ইশায়ার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে এই কথা গুলো শুনে।সে কাঁপা গলায় বলে,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৭

__ওনার কি হয়েছিলো,উনি কি ওনার বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন।
ইলারা আলভারেয চোখের পানি মুছে বলেন,
___তিনদিন পর মেক্সিকোর সিনালোয়ার কুলি য়াকান নদীর ধারে সেখানে নাজিয়ার লা*শ পাওয়া যায়।ক্ষত বিক্ষত অবস্থায়।
বলতে বলতেই ইলারা আলভারেয কেঁদে ওঠেন।
ইশায়ার বুক কেঁপে ওঠে এই কথা শুনে।পুরো শরীর হিম হয়ে আসে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৯