সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯
তানিয়া হুসাইন
রাতটা যেন এক বিভীষিকার নাম হয়ে উঠেছিল দুইটি পরিবারের জন্য। ইশায়া আর সাফার হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা যেন সবাইকে এক অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
এতো কিছু করেও তারা এখন পর্যন্ত কোন খবর পায়নি।
পুলিশ তদন্ত করছে, ড্রাইভারের লা*শ তার ফ্যামিলির কাছে হ্যান্ডওভার করা হয়েছে।
___আবির আর আদ্রিয়ান দৌড়াদৌড়ি করছে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় তাদের থামার নাম নেই। একবার থানায়, একবার হাসপাতাল, একবার বন্ধুদের বাসায়, কোথাও কিছু না পেয়ে আবার রাস্তায় গাড়ি নিয়ে দৌড়,
—শুধু একটা খোঁজ পাওয়ার আশায়। আবির কখনো নিজের ফোন, কখনো ইশায়ার ছবি হাতে নিয়ে এখানে-সেখানে গিয়ে মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করছে,
এই মেয়েটাকে দেখেছেন? ও আমার বোন…”
সবাই শুধু তাকিয়ে দেখছে দুটো ছেলের ছটফট।
___আদ্রিয়ানের মুখে কথা নেই, কেবল চোখে আগুন আর ব্যথা।আমার সাফা কোথায়?আমার বোন কই, এই প্রশ্নটা যেন মাথায় বাজছিল প্রতি মুহূর্তে।
_____অন্যদিকে, সায়মা রহমান ও ফারজানা আহমেদ দুই মা—
সারারাত চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে চোখ শুকিয়ে ফেলেছেন। একজন বারবার বলছে, “আমার ইশু কি খেয়েছে আজ? ও আমাকে না বলে গেল কী করে?ও কোথায় গেছে।
আমার বাচ্চাটা কই,
___আরেকজন কাতর কণ্ঠে বলছে, আমার সাফা কি এখনও বেঁচে আছে।
আমার মেয়েটা কই।
আল্লাহ আমার সন্তান আমার বুকে ফিরিয়ে দাও।
এভাবেই ওদের রাতটা কাটে প্রত্যেকটা মূহুর্ত যন্ত্রনায় আর আহাজারিতে।
__আদনান সাহেবর বুকে ব্যাথা ওঠে যায়,তারপর ও সে নিচে বসে একের পর এক কল করে যাচ্ছে মেয়ের নাম্বারে।
______সকালবেলা একদল পথচারী তাদের কাজের উদ্দেশ্য যাচ্ছিলো।হাঁটতে
হাঁটতে হঠাৎ রাস্তার পাশের জঙ্গলে এক নারীর অর্ধদগ্ধ লাশ ও আরেক নারীর পুরো আগুনে ঝলসে যাওয়া দেহ খুঁজে পায়।
এগুলো দেখে ভয় পেয়ে যায় তারা।
দেশে আজকাল কি হচ্ছে বুঝতে পারছেনা কেউ,
সবাই একটা আতঙ্কের মাঝে আছে ।
ওরা পুলিশে খবর দেয়, দ্রুত যায় টহল দল। পরিচয় না মিললেও গতকালকের নিখোঁজ হওয়া দুটি মেয়ে হতে পারে সন্দেহ করে তারা তখনি দুটো পরিবারের একজনকে ফোন দেয়।
____হঠাৎ ফোন বেজে ওঠায় হকচকিয়ে ওঠে সবাই,
আবির দ্রুত ফোন রিসিভ করে।
___ হ্যালো, আপনি কি
মিস ইশায়াঁ বা সাফার ফ্যামিলির কেউ?
যারা কালকে নিখোঁজ হয়েছিল?
___আবিরের গলা কাপছে,
সে কোন রকমে বলে,
__জি…
আমার বোন।
___অপর পাশ থেকে বলে,দয়া করে পরিবারসহ এই ঠিকানায় চলে আসুন,
ফোনের পর মুহূর্তেই পুরো বাড়িতে আতঙ্কের স্রোত বয়ে যায়। আদনান রহমান ছুটে এসে বলেন,
___চলো, এখনই ওখানে যেতে হবে।
____ওরা যেই না ঘটনাস্থলে পৌঁছায়,
চারপাশে এত এত মানুষ দেখে ভয় পেয়ে যায় সবাই। একটু সামনে এগিয়ে আসতেই মুহূর্তেই যেন সবকিছু থমকে যায়।
এক পাশে একটা অজ্ঞাত দেহ, আরেক পাশে আগুনে ঝলসে যাওয়া সাফার নিথর শরীর।
___ফারজানা ছুটে গিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সাফা,সাফা ! আমার বাচ্চা…
কি হয়েছে মা।
তুই কথা বল! আমি এসেছি মা।
____সায়মা নিজের শরীরের ভার রাখতে না পেরে মাটিতে বসে পড়েন, কাঁপতে কাঁপতে ইশায়ার পড়নের লেহেঙ্গার পুড়ে যাওয়া ওড়নার একপাশ ধরেন,এটা তার মেয়ে ভাবতেই তার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। বারবার মেয়ের পা ধরে বলছেন, মা… একবার চোখ খোল! আমি এসেছি…
মা আমার”
ওদের আহাজারিতে চারপাশে ভয়ংকর একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সবাই তাকিয়ে দেখিয়ে ওদের অবস্থা।
ফারজানা বেগম গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদছেন।
___আদ্রিয়ান এতোক্ষন স্থির দাঁড়িয়ে ছিলো।
সে এগিয়ে যায় এবার কাছে,
সাফার শরীরটা বুকে চেপে ধরে, একেবারে শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরে বলে,
লম্বা একটা স্বাস নেয়।
বুকে ধরে মাথায় হাত বোলায়,
___তুই কিভাবে চলে গেলি…তুই কথা দিয়েছিলি, আমার থাকবি,আমার বউ হবি। তুই ঠকালি আমায়!
সাফা, তুই ঠকালি আমায়,
জান আমার উঠ না।
আমি কিভাবে থাকবো জান।
উঠ না জান,
কথা বল আমার সাথে।
আমি কিভাবে বাঁচবো তোকে ছাড়া।
উঠ না বেইবি।এভাবে যাস না,আমি পারবোনারে, আমি কিভাবে থাকবো।
বলতে বলতেই কেঁদে ওঠে আদ্রিয়ান।
আবারো কথা বলতে থাকে সাফার সাথে।
মানুষ বলে ছেলেরা কাদেনা,
আদ্রিয়ানকে দেখলে আজ বুঝতো একটা ছেলে ভালোবাসার জন্য কি করতে পারে।
জান্নাত এসে আদ্রিয়ানকে ধরে।
__সায়মা রহমান অজ্ঞান হয়ে পরেন তাকে এসে ধরে আদনান সাহেব।
___আবির দাঁড়িয়ে আছে ইশায়ার মাথার পাশে, কান্না আটকে রাখতে পারছে না। তোকে বাঁচাতে পারলাম না, বোন…আমি তো তোর ভাই! আমি কিভাবে মুখ দেখাব!
___ জান্নাত কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরলো আবিরকে,
সে কয়জনকে সামলাবে।
প্রত্যেকটা মানুষের পাগল প্রায় অবস্থা।
__কামরুল আহমেদ স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছেন,
তার মেয়েকে এমনভাবে দেখতে হবে,
তিনি কোনদিন কল্পনা ও করেননি।
মেয়ের মাথার পাশে বসে আছেন।
একমাত্র মেয়ে তার।
কত স্বপ্ন কত ইচ্ছা আকাঙ্খা ছিল এই মেয়ে নিয়ে তার।
এসব ভাবতে ভাবতেই চোখের পানি মুছেন তিনি।
____ইশায়ার বাবা আদনান রহমান মেয়ের নিথর দেহটাকে আকড়ে ধরে বসে আছেন।
কিন্তু আদতেও কি এটা তার মেয়ে।
সময় গড়ায়,ওদের আত্মীয়-স্বজন আসে এসে সবাইকে থামায়।
___সাফা,ইশায়ার মৃ*ত দেহ বাড়িতে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
সায়মা রহমান আর ফারজানা আহমেদ কে ছাড়ানো যাচ্ছিলো না,
তারা মেয়েদের আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
সবাই মিলে ওদেরকে ছাড়ায়।
কান্নার রোল পড়ে যায়।
নামাজে জানাজা শেষে সবাই দাঁড়িয়ে,
নিঃশব্দ, স্তব্ধ পরিবেশে যেন শুধু বাতাসে ভেসে আসছে কান্নার শব্দ।
সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো দুই নারীকে মাটির গহ্বরে নামিয়ে দেওয়া হয়।
আদ্রিয়ান নিজ হাতে ধরে নামিয়ে দিয়েছে, হাত কাঁপছিল তার।
___একবার চোখ পড়তেই আর সহ্য হলো না, গলা ফাটিয়ে কেঁদে উঠল আবির, তোকে আমি কথা দিয়েছিলাম বোন সবসময় তোকে রক্ষা করবো… এইভাবে চলে গেলি।
____কামরুল আহমেদ এক কোণে দাঁড়িয়ে চুপচাপ, চোখে জল জমেছে, বুক ফেটে কান্না আসছে কিন্তু মুখে শব্দ নেই।
___আদনান সাহেব মাটিতে বসে আছেন কবরের পাশে,
আবির আর আদ্রিয়ান মিলে শেষ মুঠো মাটি তুলে কবর ঢেকে দেয়। মাটি ঢাকার সেই আওয়াজ যেন দুই পরিবারের বুক ফাটিয়ে দিচ্ছিল।
___আদনান সাহেবকে কেউ টেনে তুলতে পারছেনা।
তিনি যেতে চাইছেন না।
বার বার বলছেন আমি আমার মেয়েকে রেখে যাবোনা,
আমার ইশু ভয় পায় অন্ধকার।
আমার মেয়ে কিভাবে থাকবে এখানে।
_আদ্রিয়ান এসে কামরুল সাহেবকে ধরে,
কামরুল সাহেব হাত ছাড়িয়ে বলে,
___আমি যাবোনা বাবা।
আমি ফারজানা কে কি জবাব দিবো।
আমি গেলে আমাকে বলবে,
আমি কিভাবে তার মেয়েকে একা ফেলে চলে এলাম।
___বাবারা শক্ত হয়।
তাদের কাঁদতে নেই।
কিন্তু মেয়েদের হারিয়ে আজ তারা অসহায়।
তাদের এই অসহায়ত্ব চোখে দেখার মতোনা।
আদ্রিয়ান এক কোণে দাঁড়িয়ে সাফার একটা রাবার ব্যান্ড হাতে নিয়ে চুপ করে তাকিয়ে আছে। চোখে অন্ধকার, মনে হচ্ছে জীবনই থেমে গেছে তার।
আদ্রিয়ান বেলকনিতে দাঁড়িয়ে, সিগারেট জ্বালিয়ে একের পর এক তাদের কাটানো মুহূর্তের কথা মনে করছিল,
___সাফার হাসি,
একসাথে কফি খাওয়া,
সাফার বলা কথা, তুমি না বড্ড বিরক্তিকর
আর সেই শেষ ফোনকল
—ভালো থেকো…
____তাদের সাজানো গোছানো সংসারের স্বপ্নটা এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।
___ফারজানা সাফার মার একটাই কথা বলে যাচ্ছে,
__ আমার সোনামণি আর ঘরে ফিরবে না।
আমার কোলটা খালি হয়ে গেলো।
আমার ১ টা সন্তান,ওকে এভাবে কেড়ে নিলে।
কি অপরাধ করেছিলাম আমি খোদা, কেন করে নিলে আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে।
____ইশায়ার মা সায়মা রহমান বারবার বলছেন,
__আমার মেয়ে, আমার মেয়ের মুখটা ও দেখতে পারলামনা শেষবারের মতোন।
কার কি ক্ষতি করেছিলো আমার বাচ্চা মেয়েটা,
ওর সাথেই কেনো এমন হলো।
জান্নাত ওদেরকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে কাল থেকে কেউ কিছু মুখে তুলে নি।
এভাবে চলতে থাকলে ওরা অসুস্থ হয়ে যাবে।
আবির ও এসে সবাইকে খাওয়ার কথা বলছে,
কিন্তু কেউ শুনছেনা।
আবির জান্নাতকে পাঠায় আদ্রিয়ানকে ডাকতে।
এখানে যে আদ্রিয়ানের হারানোর পাল্লা টা একটু ভারী।
____এদিকে, ভীর এর প্রাইভেট জেট প্রস্তুত। নিকো, ডিয়েগো আর তার বডিগার্ড নিয়ে সে মেক্সিকোর পথে রওনা দেয়।
ইশায়া তখনো বেহুশ,
তাকে অচেতন করে রাখা হয়েছে ভীরের নির্দেশে।
____কেবিনের ভিতরে ওকে একটি সুসজ্জিত বিছানায় রাখা হয়েছে। এলোমেলো চুল, মলিন মুখ—কিন্তু তবুও এক অপার্থিব সৌন্দর্য ঝলক দিচ্ছে।
এই এক দিনেই নেতিয়ে পড়েছে মেয়েটা।
____ভীর ডিয়েগোর সাথে কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলছিল।
কথা বলা শেষ করে সে ওখান থেকে প্রস্থান নেয়,
হাটে তার কাঙ্খিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে,
___ভীর দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে,
কেবিনে, বিছানার মাঝে শুয়ে থাকা মেয়ের দিকে চোখ যায় তার।
তখনকার ভারী সাজ এখন আর নেই।
সুতির একটা গাউন পড়নে তার
চেয়ারে বসে ইশায়ার দিকে তাকায় ভীর।
তার নজর পরে ইশায়ার উন্মুক্ত সাদা সাদা ধবধবে হাতের উপর।
মেয়েটার সৌন্দর্যে সে অভিভূত।
এক দেখাতেই তার মস্তিষ্কে বিচরণ করছে সে।
যার কারণেই এত কিছু করা।
____ওদিকের সব ইনফরমেশনই তার কাছে এসেছে।
___ ভীর মুখের একপাশে মৃদু হাসি নিয়ে বলে,
তোমার জন্মস্থান থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তুমি একবারও তাকিয়ে দেখলে না তোমার দেশ… সো স্যাড।”
আর এই জীবনে এখানে কোনদিনও তোমার পা রাখা হবে না।
এই পৃথিবীর বুকে তুমি এখন মৃত ইশায়া জারিন।
তোমার অস্তিত্ব তাই আমি বিলীন করে দিয়েছি।
___ভীর ইশায়ার গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়,
বাহুতে হাত ছোয়ায়,
উড়তে থাকা চুল সরিয়ে দেয়।
___তারপর গম্ভীর গলায়
বলে,
তুমি জানো না মেয়ে তুমি কার কাছে এসেছো…
আমার চোখ তোমার উপর পড়াটাই তোমার জীবনে কাল হয়ে দাড়িয়েছে।
তুমি আমার চোখে পড়েছো…আমার মতো মানুষ কাউকে একবার চোখে ধরলে ছাড়ে না…
মৃত্যু ছাড়া তুমি আমার কাছ থেকে দূরে যেতেও পারবে না।
দূরে তো দূর আমার দৃষ্টি সীমানার বাইরেও না।
____তোমার বোনের মত সাহসী হয়ে তুমি মরতে পারবে না,
এরকম কিছু আমি হতে দেব না।
আমার ক্ষমতা সম্পর্কে মেয়ে তোমার ধারণা ও নেই।
___মেক্সিকো পৌছাতে ওদের প্রায় 20 ঘন্টার ও বেশি সময় লাগে।
গুয়াদালাহারায় পৌঁছানোর পর পর-ই ভীর
ইশায়ার জন্য পাঁচ জন মেক্সিকান মহিলা গার্ড ঠিক করে। এগুলো ওর বিশ্বস্ত গার্ড।
__এসব সে আগে থেকেই ডিয়েগোকে বলে দিয়েছিল সবকিছু এরেঞ্জ করার জন্য।
তাদের কে সবকিছুর নির্দেশনা দেওয়া হয়।
_এই মেয়েকে সে চোখের আড়াল হতে দিবে না।
সাফার এই কাজটার পর ভীর সতর্ক হয়ে গেছে।
সাফার মৃত্যুতে তার কিছু যায় আসে না,
কিন্তু এই মেয়ে এমন কিছু করবে এটা সে কল্পনাতেও আনতে পারছে না।
এজন্য-ই এতো কিছু।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮
__সোনার খাঁচায় বন্দি করে রাখবে সে এই মেয়েকে।
পাঁচজন গার্ড রোটেশনে ২৪ ঘন্টা পাহারা দিবে তাকে।
প্রতিটি দরজায় বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি লক, এই লক শুধু ভীর আর তার অনুমোদিত গার্ডরা খুলতে পারবে।
এই পাঁচজন তো রুমের ভিতর ওর সাথে থাকবে সর্বক্ষণ।
রুমের বাইরে সহ পুরো বাড়ি জুড়ে হাজারো বডিগার্ড আছে।
সে চায় না ইশায়া সাফার মতো কিছু করুক। তার প্রতিটি পদক্ষেপ থাকবে ভীরের নজরে।
