Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৯

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৯

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৯
সানজিদা আক্তার মুন্নী

নিশুতি রাত। এমন এক প্রহর যখন পৃথিবী নিজের সমস্ত কোলাহল ভুলে ঘুমিয়ে পড়েছে, আর জেগে আছে শুধুই ভালোবাসা। শহরের বুক থেকে মুছে গেছে গাড়ির হর্ন, দূরের কোনো বাড়ির জানালায় নিভে গেছে শেষ আলোটুকুও। শুধু জেগে আছে এই ঘরটি, যেখানে আজ রচিত হচ্ছে এক প্রেমকাব্য, যার প্রতিটি অক্ষর লেখা হচ্ছে হৃদয়ের কালিতে, শরীরের পরতে পরতে।
নিঝুম প্রহরের ঘরের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি বাতাসের কণায় বেজে চলেছে ভালোবাসার এক ইন্দ্রজালিক সুর। এমন এক মূর্ছনা যার কোনো লিপি নেই, সুরকার নেই, তবু তা এক মোহময় জাদু ছড়িয়ে দিয়েছে, মনে হয় সময় নিজেই থমকে দাঁড়িয়েছে এই সুর শুনতে। চাঁদের আলো এসে বিছিয়ে পড়েছে তৃষ্ণার স্ফটিকস্বচ্ছ শরীরের ওপর। তার দুধসাদা ত্বকে চাঁদের আলো গলে গলে পড়ছে, তাকে করে তুলেছে অলৌকিক এক অপ্সরার তুল্য। তার এলোমেলো চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে আছে কালো রেশমি ঢেউয়ের মতো, যার প্রতিটি গুচ্ছে জড়িয়ে আছে ভালোবাসার সুবাস। তার কপালে জমে থাকা ঘামের বিন্দুগুলো চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করছে হীরকখণ্ডের মতো, আর তার আধো-বোজা চোখের পাপড়িতে কাঁপছে অজস্র না-বলা কথা।

তৃষ্ণা শরীরের প্রতিটি বাঁকের ওপর ওয়াসেম আজ এঁকে চলেছে তার অনুরাগের সুনিপুণ, সূক্ষ্ম নকশা। তার প্রতিটি স্পর্শ এক একটি রঙিন তুলির টান, প্রতিটি চুম্বন এক একটি মূল্যবান রত্ন হয়ে খচিত হচ্ছে। তৃষ্ণার সারা শরীরজুড়ে আজ ওয়াসেমের তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের একচ্ছত্র রাজত্ব চলছে। মনে হচ্ছে এক সম্রাট বহু যুগ পর হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পেয়ে তার প্রতিটি ইঞ্চিতে নিজের ছাপ রেখে যেতে চাইছে। তার প্রতিটি ছোঁয়ায় সে লিখে চলেছে না-বলা এক প্রেমকাব্য, যে কাব্যের একমাত্র পাঠিকা তৃষ্ণা, শ্রোতাও সে নিজেই।
ওয়াসেমের এই বন্য উন্মাদনায় আজ মিশে আছে শুধু গতকাল অথবা পরশুর নয়, বরং জন্মজন্মান্তরের জমে থাকা ভালোবাসার আকুলতা। তার প্রতিটি স্পর্শে দীর্ঘ প্রতীক্ষার হাহাকার, প্রতিটি চুম্বনে না-পাওয়ার তৃষ্ণা, প্রতিটি আলিঙ্গনে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা।
উদ্দাম আবেগের এই উত্তাল স্রোতে ভেসে তৃষ্ণাও আজ ক্রমশ পাগলপ্রায়। প্রথমে ছিল লজ্জার আবরণ, তারপর দ্বিধার কম্পন, আর এখন সম্পূর্ণ, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। সে নিজেকে সঁপে দিয়েছে প্রিয় মানুষটির প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি হৃদস্পন্দনে।

তীব্র অথচ পেলব আদরের এক উষ্ণ চাদরে ওয়াসেম তাকে এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছে, ঠিক এক দুর্লভ প্রজাপতি, যাকে সামান্য জোরে ধরলেই তার পাখা ভেঙে যাবে। তৃষ্ণার প্রতিটি অস্ফুট আর্তনাদ, প্রতিটি মিষ্টি কম্পন, প্রতিটি চাপা দীর্ঘশ্বাসের ভাষাহীন সাক্ষী হয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে ঘরের চার দেয়াল।
শীতাতপ যন্ত্রের হিমেল হাওয়া আজ সম্পূর্ণ পরাজিত, একেবারে অসহায়। যে যন্ত্র সারা ঘরকে বরফজমাট করে রাখার অসীম ক্ষমতা রাখে, সেও আজ মাথা নত করেছে দুটি হৃদয় থেকে উৎসারিত অলৌকিক উষ্ণতার কাছে। উত্তেজনায় দুজনের শরীর ঘেমে একাকার, ঘামের প্রতিটি বিন্দু এক একটি মুক্তোদানা, যা চাঁদের রুপালি আলোয় ঝিলমিল করে জ্বলছে। ওয়াসেমের প্রশস্ত বুকে জমে থাকা ঘামের ফোঁটাগুলো তৃষ্ণার মসৃণ গালে মিশে গিয়ে তৈরি করছে ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব রসায়ন।

তাদের তপ্ত নিঃশ্বাসের সুবাসে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের বাতাস। দেয়ালঘড়ির কাঁটা ধীরপায়ে হেঁটে এখন রাত তিনটে ছুঁয়েছে। তার টিকটিক শব্দটাও আজ ভয় পাচ্ছে এই দুই হৃদয়ের ছন্দকে বিঘ্নিত করতে, তাই সে চলছে অত্যন্ত সন্তর্পণে। সময় থেমে নেই, কিন্তু এই ঘরের ভেতরে সময়ের কোনো অস্তিত্বই আজ নেই। ওয়াসেমের চোখের অতলে জ্বলতে থাকা অনুরাগের দাবানল এতটুকু নিভে আসেনি, বরং রাত যত বাড়ছে, ততই আগুন আরও প্রখর, আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। তৃষ্ণাকে বুকের খাঁচায় চিরকালের জন্য বন্দি করে রাখার আকুতি তার প্রতিটি স্পর্শে আরও তীব্র, আরও গাঢ় হয়ে ফুটে উঠছে।
অবশেষে ক্লান্তির ভার আর বহন করতে পারে না তৃষ্ণার পেলব শরীর। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে, বুক ওঠানামা করছে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তীব্র গতিতে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে তার কোমল একটি পা তুলে ওয়াসেমের প্রশস্ত, বলিষ্ঠ বুকে আলতো একটি ধাক্কা দেয়।
তার গোলাপ-রঙা ঠোঁট দুটি কেঁপে কেঁপে ওঠে, চোখের পাতা আধো-বোজা, দৃষ্টি ঝাপসা কুয়াশার মতো। কাতর, প্রায় ভেঙে পড়া মিষ্টি কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে সে বলে ওঠে, “আর না, আর না!”
তার মিনতিমাখা কণ্ঠস্বর ঘরের নিশ্চুপ পরিবেশকে চিরে দিয়ে ভেসে বেড়ায় বাতাসে। কিন্তু ওয়াসেম থামে না, থামার কোনো প্রশ্নই তার নেই। বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক মৃদু, রহস্যময়, প্রেমময় হাসি, যে হাসিতে লুকিয়ে আছে হাজারো প্রতিশ্রুতি।

সে নিবিড় যত্নে, ধ্যানমগ্ন সাধকের মতো তৃষ্ণার দিকে ঝুঁকে আসে তৃষ্ণার সুডৌল গলার সূক্ষ্ম ভাঁজে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম অত্যন্ত সন্তর্পণে মুছে দেয়।
এরপর তৃষ্ণার ধাক্কা দেওয়া কোমল পা-টিকে সে নিজের বুক থেকে সরিয়ে অত্যন্ত আলতো করে, ভঙ্গুর ফুলের ডাঁটা ধরার মতো যত্নে টেনে নেয় নিজের দিকে। তারপর তৃষ্ণার দুধসাদা পায়ের পাতায়, পেলব গোড়ালির ঠিক ওপরে, এঁকে দেয় এক গাঢ়, দীর্ঘ, অন্তহীন চুম্বন।
চুম্বন শেষে সে তৃষ্ণার ছলছল চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে সে বলে, “এবার আরেকটু সহ্য করে নে, জান। মাঝপথে থামার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই।”
তৃষ্ণা আবারও নিজের পা ছাড়িয়ে নেওয়ার এক বৃথা চেষ্টা করে ভেজা চোখে, কাঁপা কণ্ঠে বলে, “আর না ওয়াসেম… আর কতবার?”
ওয়াসেম এবার ধীরে ধীরে তৃষ্ণার মুখের ওপর ঝুঁকে আসে। তার চুল এসে পড়ে তৃষ্ণার কপালে, নাকের ডগায় লেগে যায় তার তপ্ত নিঃশ্বাস। ওয়াসেমের চোখে গাঢ় নেশা, ঠোঁটের কোণে অভাবনীয় এক প্রেমময় দৃঢ়তা। গমগমে অথচ স্নেহমাখা স্বরে সে বলে, “আরেকটু ব্যথা লাগবে, জান। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নে। আমি এখনই শেষ করছি না!”

নিরুপায় তৃষ্ণা কম্পিত দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওয়াসেমের গলা, আজ এই একটি মানুষই তার শেষ আশ্রয়, তার একমাত্র ঠিকানা। ওয়াসেমও আকুল আবেশে তৃষ্ণার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়, তাদের চুম্বনে মিশে থাকে হাজারো না-বলা কথা, অজস্র প্রতিশ্রুতি। ঠোঁট সরিয়ে সে তৃষ্ণার কপালে আরেকটি পবিত্র চুমু এঁকে দিয়ে ফিসফিস করে বলে, “তোর এই কষ্টটুকু শুধুই আমার জন্য, জান। এটা ভেবেই নিজেকে শান্ত কর। কারণ এই কষ্টের নামই তো ভালোবাসা।”
এ বলে ওয়াসেম আবারো আকুল, আবেগঘন আবেশে তৃষ্ণার কম্পিত, গোলাপি ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। তাদের দীর্ঘ, প্রগাঢ় চুম্বনে মিশে থাকে হাজারো না-বলা কথা, অজস্র অকথিত প্রতিশ্রুতি, অসংখ্য বোনা স্বপ্নের বীজ, যা কোনোদিন ভাষার আশ্রয় খুঁজে পায়নি। একটি চুম্বনেই সে বলে দিতে চাইছে জীবনের সমস্ত অব্যক্ত কথা, সাত জন্মের সমস্ত অভিযোগ, সমস্ত ভালোবাসা, যা ভাষায় প্রকাশ করলে হয়তো কোটি কোটি পৃষ্ঠাও কম পড়ে যাবে।
চুম্বনে ছিল বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার হিমেল স্পর্শ, ছিল মরুভূমির তৃষ্ণার্ত পথিকের কাছে মরূদ্যানের জলের স্বাদ। তৃষ্ণার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত অভিযোগ, সমস্ত অভিমান চুম্বনে গলে গলে মিশে যায়।
দেয়ালঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে, চাঁদ ঢলে পড়তে থাকে পশ্চিমের কোলে।
একটু পর —-

সাদা বিছানার চাদরের কোমল বুকে এলিয়ে পড়ে আছে তৃষ্ণার ক্লান্ত শরীরটা। ঠিক কোনো দক্ষ ভাস্করের যত্নে গড়া পাথরের মূর্তি, কিছুক্ষণ আগেও যার প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বয়ে গেছে প্রবল এক ঝড়। তার সারা গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে এক অবর্ণনীয়, নেশাতুর ঘোর, যার তুলনা অন্য কোনো সুরায় খুঁজে পাওয়া কঠিন। ওয়াসেমের উষ্ণ, প্রগাঢ় চুমুর একটানা ছোঁয়া আর বাঁধভাঙা ভালোবাসার তীব্র স্রোতে তাদের প্রথম মিলনের সব আড়ষ্টতা, সব সংকোচের অলক্ষ্য দেওয়াল আজ ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে। তার দুধে-আলতা মেশানো ফর্সা ত্বকের প্রতিটি ইঞ্চিতে এখন খোদাই হয়ে আছে একচ্ছত্র অধিকারের নিখুঁত চিহ্ন।তার গলার সুন্দর বাঁক থেকে শুরু করে কলারবোনের খাঁজ, তারপর খোলা কাঁধের ফর্সা, মসৃণ ত্বক, সব জায়গায় ফুটে উঠেছে কালচে-লালচে দাগের স্পষ্ট আলপনা। উন্মাদনার তীব্রতায় তৃষ্ণার সামান্য ফোলা, রক্তিম ঠোঁটজোড়া নিঃশব্দে প্রমাণ দিচ্ছে কিছুক্ষণ আগে বয়ে যাওয়া সদ্য সমাপ্ত ভালোবাসার প্রলয়ের। তার ঠোঁটের কোণে এখনো লেগে আছে ওয়াসেমের চুম্বনের অস্পষ্ট রেশ, দেখলে মনে হবে মৌচাক ভেঙে ফোঁটা ফোঁটা মধু গড়িয়ে পড়েছে।

তার চওড়া কপালে, নাকের ডগায় আর গলার খাঁজে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম হালকা আলোতে জ্বলজ্বল করছে ঠিক ভোরের শিশিরকণার মতো, যা নিখুঁত আর অপরূপ। তার ঘামে ভেজা, অবাধ্য চুলগুলো মুখের দুই পাশে এলোমেলোভাবে লেপ্টে আছে, দেখলে মনে হবে কোনো উদাসীন শিল্পীর তুলির অগোছালো টান। তার বুকের ওঠানামায় এখনো লেগে আছে অসম, দ্রুত ছন্দ, প্রতিটি নিঃশ্বাসে বেজে উঠছে অভাবনীয় এক পূর্ণতার সুর। তার চোখের বড় পাপড়িগুলো ভেজা আর কম্পমান, তাকালে মনে হবে এইমাত্র কোনো অতল জলরাশি থেকে ভেসে উঠেছে সে।
প্রথমবার নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেওয়ার কারণে তার শরীরের নিম্নাঙ্গের স্পর্শকাতর পেশিতে এখনো অনুভূত হচ্ছে একটি হালকা, চিনচিনে ব্যথা। ওয়াসেম এখনো তাকে নিজের দৃঢ় বাহুডোরে অধিকারবোধের সাথে জড়িয়ে রেখেছে, তার ভাবগতি দেখে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে হাতের বাঁধন সামান্য শিথিল করলেই তৃষ্ণা বাতাসে মিলিয়ে যাবে, কোনো স্বপ্নের মতো উবে যাবে।
তার শক্তপোক্ত কিন্তু অসম্ভব মোলায়েম হাত তৃষ্ণার অনাবৃত, মসৃণ পিঠে একটানা আদরের পরশ বুলিয়ে চলেছে। তৃষ্ণার কপালের চারপাশে লেপ্টে থাকা ভেজা, অগোছালো চুলগুলো খুব যত্নে, অনেকটা ঘোরের মধ্যে সরিয়ে দিয়ে ওয়াসেম যখন উন্মুক্ত ললাটে পবিত্র আর নিবিড় একটি চুম্বন এঁকে দিলো, তখন তৃষ্ণার পুরো শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল একটি মিষ্টি, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো শিহরণ। শিহরণ শুধু শরীরে সীমাবদ্ধ থাকল না, ছড়িয়ে পড়ল অন্তরাত্মার একদম তলদেশে।

ওয়াসেমের উষ্ণ, ভারী নিঃশ্বাস বারবার আছড়ে পড়ছে তৃষ্ণার স্পর্শকাতর ঘাড়ের বাঁকে। দুজনের শরীরের মিলিত ঘ্রাণ, ঘামের নোনতা সুবাস, সুগন্ধির হালকা রেশ আর ভালোবাসার চেনা গন্ধ বদ্ধ কক্ষের উষ্ণতার সাথে মিশে তৈরি করেছে এক মোহনীয় পরিবেশ, অবিকল কোনো নিষিদ্ধ উদ্যানের গোপন সুরভি।
জানালার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়া চাঁদের ম্লান, রুপোলি আলো তৃষ্ণার ফর্সা বক্ররেখায় গড়িয়ে পড়ছে শব্দহীনভাবে, ঠিক কোনো তরল রুপোর মতো। চন্দ্রালোকে তার সিক্ত ত্বক মায়াবী দ্যুতিতে চকচক করছে। কক্ষের নিস্তব্ধতা ভাঙছে শুধুই দুটি হৃদস্পন্দনের সম্মিলিত ছন্দে, তৈরি করছে এক ধীর, সুরেলা সংগীত, বোধ হচ্ছে প্রকৃতিও তাদের এই মিলনের নির্বাক সাক্ষী হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে।
চোখ বন্ধ করেই তৃষ্ণা অনুভব করতে পারছে তার নারীত্বের অনবদ্য, অভাবিত এক পূর্ণতা।

ওয়াসেম আলতো হাতে তৃষ্ণার এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিচ্ছে। তার আঙুলগুলো কাঁপছে সামান্য, ঠিক একটি ভাঙা জিনিস জোড়া দেওয়ার ভয়ে। ওর চোখেমুখে এক অচেনা আকুলতা জমে আছে, এমন ব্যাকুলতা যা এই মানুষের মুখে কেউ কখনো দেখেনি। তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে গাঢ়, প্রায় ফিসফিসে স্বরে সে বলে ওঠে, “তৃষ্ণা… আমি তোর সাথে একটা সুন্দর সংসার চাই।”
কথাটা তৃষ্ণার কানে পৌঁছাতেই সে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এমন এক দীর্ঘশ্বাস যার ভেতরে গলে আছে কত দিনের জমানো ক্লান্তি। ওয়াসেমের প্রশস্ত বুক থেকে নিজেকে কিছুটা ছাড়িয়ে নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকায় সে। তার দৃষ্টি দেয়ালের দিকে, হতে পারে দেয়ালেরও আরও অনেক ওপারে নিবদ্ধ। কণ্ঠে তার চাপা অভিমান আর কষ্টের স্পষ্ট ছাপ। সে বলে, “আপনি তো আমায় ঘৃণা করেন। আমার মতো একটা মেয়ের সাথে কী করে আপনি শুতে পারলেন? আমি তো আপনার কাছে রাস্তার কুকুরের মতোই ছিলাম, তাই না? এতে আপনার আত্মসম্মানে লাগবে না?”
তৃষ্ণার এমন ধারালো কথায় ওয়াসেমের ভেতরটা শিউরে ওঠে। প্রতিটি শব্দ তার বুকে আঘাত হানছে, অথচ সে জানে, এই আঘাত পাওয়ার যোগ্যতা তার আছে। সে আর এই দূরত্বটুকু সহ্য করতে পারে না। এক টানে তৃষ্ণাকে আবারও নিজের শক্ত বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়, তার ভয় হয়তো ছেড়ে দিলেই মেয়েটি হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য। অসীম মমতায় ওর কপালে দীর্ঘ একটা চুমু এঁকে দিয়ে ধরা গলায় বলে, “নাহ! ওটা শুধু তোকে জোর করে বিয়ে করানোর একটা অন্ধ রাগ ছিল মাত্র!”

তৃষ্ণা আজ আর চুপ থাকে না। আজ তার ভেতরের সদা শান্ত থাকা মেয়েটি আর নেই। বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সবটুকু সাহস এক করে স্থির কণ্ঠে বলে, “আপনার জন্য হয়তো ওটা শুধুই রাগ ছিল, কিন্তু আমার জন্য? আমার জন্য কাটানো দিনগুলো ছিল প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর সমান।”
কথাগুলো তীরের মতো বিঁধে যায় ওয়াসেমের বুকে। অপরাধবোধে তার কণ্ঠ বুজে আসে, চোখের কোণে অস্ফুট কিছু জমে ওঠে। তৃষ্ণাকে আরও শক্ত করে নিজের মাঝে আগলে নিয়ে সে প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে, “আমি জানি… আমি জানি আমার আচরণ পশুর মতো ছিল। কিন্তু তৃষ্ণা, আমাকে আর একবার বাঁচার সুযোগ দেওয়া যায় না? আমার সাথে কি থাকা যায় না?”
তৃষ্ণা শান্ত ভঙ্গিতে আরেকবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নিস্পৃহ, প্রায় নির্জীব গলায় বলে, “থাকতে তো হবেই। আপনি ছাড়া আমার আর কে-ই আছে যে তার কাছে যাব? কিন্তু…” সে থামে মুহূর্তের জন্য, তারপর বলে, “আমি কখনো আপনার বলা ওই জঘন্য কথাগুলো, আপনার দেওয়া অমানুষিক কষ্টগুলো ভুলতে পারব না।”
অসহায়ত্বে ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। সে তৃষ্ণার বুকের মধ্যে নিজের মাথাটা গুঁজে দিয়ে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে। তাকে দেখতে ঠিক আশ্রয় খোঁজা শিশুর মতো লাগছিল। তারপর মৃদু স্বরে বলে, “তোকে একটা কথা বলি?”

তৃষ্ণা নিরাসক্ত গলায় জবাব দেয়, “কী?”
ওয়াসেম দ্রুত বলে ওঠে, কথাটা তার বলা খুবই জরুরি। সে বলে, “ঐদিন… ঐদিন একটা মেয়েকে নিয়ে আমি ঘরে এসেছিলাম, বিশ্বাস কর, ওর সাথে আমি কিচ্ছু করিনি। আমাকে তুই ভুল বুঝিস না।”
তৃষ্ণা এবার ভিন্ন এক শূন্যতা নিয়ে ওয়াসেমের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। স্নেহে নয়, অভ্যাসেও নয়, শুধুই এক অনুভূতিহীন অচেনা ভাব নিয়ে সে কাজটা করে। শুষ্ক, ভাবলেশহীন গলায় বলে, “ওসবে আমার কিছুই যায় আসে না। আমি কে? আমার কী যোগ্যতা আছে বলুন তো যে আপনাকে ভুল বুঝব? যার দয়ায় খাচ্ছি, পড়ছি, তাকে নিয়ে অধিকার খাটানোর মতো সাহস আমার নেই।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৮

কথাটা শুনে ওয়াসেমের বুকটা আক্ষরিক অর্থেই খচ করে ওঠে। শ্বাস প্রায় আটকে আসতে চায় তার। ‘যার দয়ায় খাচ্ছি, পড়ছি’, কথাটাই তার পুরো পাপের আয়না হয়ে দাঁড়িয়ে যায় চোখের সামনে। বুকফাটা যন্ত্রণায় তৃষ্ণাকে জাপটে ধরে সে শুধু বলে, “আমি তোর স্বামী, তৃষ্ণা! দোহাই তোর, অন্তত তুই এমন করে বলিস না।”
তৃষ্ণা শান্ত কণ্ঠে, অথচ মারাত্মক আঘাত হেনে উত্তর দেয়, “হুম… স্বামী। তবে শুধু নামেই। আর আজ থেকে হয়তো শুধুমাত্র আপনার চাহিদার জন্যও।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৭০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here