Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

“এই মেয়ে, সর এখান থেকে। ”
বিয়ের রাতে স্বামী নামক পুরুষের এহেন আচরনে অবাকের সপ্তম আকাশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও তার লেশ মাত্রও দেখা গেলো না হুমায়রার মুখে। মেয়েটা একেবারে স্বাভাবিক। যেন এমন ঘটনা তার কাছে প্রত্যাশিতই ছিলো। ঘোমটার আড়াল থেকে এবার মুখ তোলে নেশায় বুদ হওয়া স্বামীর পানে একনজর তাকাল সে। পরপর কোনো বাক্য বিনিময় ছাড়াই বিছানার এক কোনায় গুটিশুটি মেরে বসে রইল। তাকে সরে বসতে দেখে তালমতাাল শরীরটা নিয়ে বিছনায় উঠতে নিল কৃশান- পথিমধ্যেই পুরো বিছান জুড়ে ফুলের রাজত্ব দেখে ভ্রু গুটিয়ে ফেললো। ধমকে বলল,

“ এই আবর্জনা পরিষ্কার কর এক্ষুনি! ”
কৃশানের ধমকে কিছুটা কেঁপে উঠল হুমায়রার নরম, সরম কায়া। তৎক্ষনাৎ হাত দিয়ে ফুল গুলো ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে কাঁপা গলায় উত্তর করল,
“ ক.. করছি। ”
বিছানা পরিষ্কার হতেই ধপাস করে শুয়ে পড়লো কৃশান। সেদিকে কিছুক্ষণ থম মেরে তাকিয়ে রইল হুমায়রা। কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যাচ্ছে বারংবার। এক পর্যায়ে সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে বলেই ফেলল,
“ আজ রাতে দুরাকাত নফল নামাজ আদায়… ”
বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারল না সে তার আগেই ওপাশ থেকে গম্ভীর স্বরে কৃশান বলে উঠলো,

“ তোকে শখ করে বিয়ে করিনি আমি, ঘুমে ডিস্টার্ব করবি মেরে তুন্দরি বানিয়ে দিব একদম। ”
এমন গুন্ডা মার্কা কথার পরিপ্রেক্ষিতে আর কথা বলার সাহস বা ইচ্ছে কোনোটাই হলো না মেয়েটার। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে। এক পর্যায়ে একাই চলে গেলো নামাজ আদায় করতে। সকল হতাশাকে এড়িয়ে বসে পড়লো সৃষ্টিকর্তার দরবারে।প্রতিদিন যেখানে একজন উত্তম জীবনসঙ্গী চাইত আজ সে জায়গায় নিজের স্বামীর হেদায়েত চাইল।
নামাজ শেষ করে নিঃশব্দে বিছানায় এসে এক কোনায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো হুমায়রা। চোখ বুজতেই ঘুমের পরিবর্তে ধরা দিলো নিজের এই অব্দি আসার অতীত।

“ একটা মধ্যবিত্ত দুঃখী পরিবারের একমাত্র সুখের ছায়া হয়ে জন্ম হয়েছিল তার। বিয়ের পাঁচ বছর পর একমাত্র সন্তানের মুখ দেখে সেদিন খুশিতে আত্মহারা ছিলেন তার বাবা কাদের হোসেন ও মা আমেনা বেগম। এরপর থেকে মেয়ে #হুমায়রা_জান্নাত_হিমি কে নিয়ে বেশ ভালোই কাটছিল তাদের জীবন। কিন্তু হুমায়রার বয়স পাঁচে পড়া মাত্রই পুরো জীবন বদলে গেলো তাদের। সহসাই একদিন মায়ের নিথর দেহ দৃষ্টিগোচর হতেই পুরো দুনিয়া থমকে গেল ছোট্ট হুমায়রার। এতো অল্প বয়সে মাকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল সে। সেই নিঃস্ব জীবনটাকে একেবারে পথ হারা করে মায়ের মৃত্যুর তিন মাস পরেই বিয়ে করে সৎ মা ঘরে আনল তার বাবা। প্রথম প্রথম সৎ মা তাকে ভালোবাসলেও কিছুদিন যেতেই ভদ্রমহিলার চোখের বিষ হয়ে পড়ল সে। এক পর্যায়ে তার মামার বাড়ির একটা কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে তাকে সেখানেই রেখে চলে গেলেন কাদের হোসেন। এভাবেই দিন পেরোতে থাকল তার। মাঝে মাঝে ছুটিতে মামার বাড়িতে গেলেও মামির কটু কথায় সেটাও কমিয়ে দিলো।

সে যখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার এ উত্তীর্ণ হয় তখনই অন্য মাদ্রাসা থেকে এসে নতুন ভর্তি হয় ইকরা নামক একটি মেয়ে। মেয়েটা ছিলো বেশ মিশুক ও প্রাণবন্ত। একদম তার বিপরীত চরিত্রের। জীবনে এতো বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মানুষের সাথে সহজে কথা বলতো না হুমায়রা। যার দরুণ তার বান্ধবী তেমন ছিল না। কিন্তু ইকরা মাদ্রাসায় এসেই তার সাথে মিশতে চেষ্টা করতো। সৌজন্যতা বজায় রাখতে হুমায়রাকে না চাইতেও কথা বলতে হতো। তার এমন স্বভাবে সবাই তার থেকে দূরে থাকলেও ইকরার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটলো ভিন্ন। মেয়েটাকে যতো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো ততই তার সাথে মিশতে চাইত। তাই শেষ অব্দি আর দূরে থাকা হলো না তার পক্ষে। একটা বছর যেতেই হুমায়রার জীবনের সবচেয়ে ভালো মিত্র হয়ে উঠল ইকরা। দিন দিন তাদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হলো। মাদ্রাসা থেকে শুরু করে তাদের পরিবার সহ তাদের বন্ধুত্বের খবর জানতে পারল। হুমায়রার সাথে তার মামার বাড়িতেও গিয়েছিল ইকরা এবং হুমায়রার মামির থেকে ভালো আচরনও পেয়েছে। ভদ্রমিহলা আর যাই হোক অচেনা মানুষের সামনে নিজের আসল রূপ দেখাননি।

তবে সে হুমায়রার বাড়িতে গেলেও হুমায়রা কে হাজার চেষ্টা করেও তাদের বাড়িতে নিতে সক্ষম হয়নি। এর মাঝেই একদিন দেশে আসলো ইকরার বাবা। সে উপলক্ষে হুমায়রার অজান্তেই মাকে দিয়ে নিজের ও হুমায়রার জন্য মাদ্রাসা থেকে ছুটির ব্যাবস্থা করে নিলো ইকরা। সে তথ্য পরে হুমায়রা জানতে পারলে যাওয়ার জন্য এক কথায় নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে দিলো। ইকরা তো নাছোড়বান্দা, তার কান্ডে উপায় না পেয়ে মামা- মামির উছিলা দিলো হুমায়রা। কিন্তু এতেও লাভ হলো না। ইকরা তার মাকে দিয়ে তার মামির থেকেও অনুমতি নিয়ে নিলো। অগ্যতা ইকরা দের বাড়িতে আসতেই হোলো তাকে।

অবস্থার দিক দিয়ে ইকরাদের পরিবার উচ্চবিত্ত। ইট সিমেন্টের দেয়ালে ঘেরাও করা দীর্ঘ জমিনের মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে ছাদবিশিষ্ট একতলা একটি বড়ো ভবন। ভবনটির নেমপ্লেটে বড়ো বড়ো অক্ষরে লিখা “ মির্জা ভবন “। আকারে বড় হওয়ায় এক তলা হলেও দুতলা বিল্ডিংয়ের কান কাটে তা। বাড়ির সামনে স্থান পেয়েছে রঙ বেরঙের ফুল গাছের। পেছনেও ফাঁকা জায়গা আছে বেশ খানেক। ইকরার বাবা জলিল মির্জা ও তার বড়ো ভাই খলিল মির্জা দুজনে তাদের পরিবার নিয়ে এক সাথেই থাকেন। জলিল মির্জার স্ত্রী ইয়াসমিন বেগম। তাদের এক ছেলে এক মেয়ে। বড়ো ছেলে #কৃশান_মির্জা এবার অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে। পড়ে বললে ভূল হবে ভার্সিটি তে গিয়ে নেশা, মারামারি আর গাদ্দারি ছাড়া কিছুই করে না সে। আর ছোটো মেয়ে ইসরাত সুলতানা ইকরা কওমি মাদ্রাসায় এবার ইন্টার পরীক্ষা দিবে। মেয়েটাকে মানুষ করতে পারলেও ছেলেকে মানুষ করতে সক্ষম হননি তারা। ছেলেকেও মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন তবে সেই ছেলেকে হুজুররাও ধরে রাখতে পারেনি। অন্যদিকে খলিল মির্জার স্ত্রী আজমিন বেগম। তাদের এক ছেলে আলভি মির্জা পড়ালেখা শেষ করে জাপান গিয়েছে। কৃশানের একেবারে বিপরীত চরিত্র সে- এক কথায় যোগ্য পাত্র। যাকে দেখা মাত্রই মেয়ের মায়েরা পাগল হয়ে যায়।কৃশানের থেকে দু- বছরের বড়ো সে।

ইকারাদের বাড়িতে গিয়ে কৃশান ব্যাতিত সবার সাথেই দেখা ও কথা হয়েছে হুমায়রার। কৃশান তো বাড়িতেই থাকে না আর থাকলেও বা কী? হুমায়রা তো সারাক্ষন ইকরার ঘরেই বসে থাকত। ইকরার যে বড়ো ভাই আছে সেই বিষয়ে জানতই না সে। ভালোয় ভালোয় দুদিন একসাথে ছুটি কাটালো দুই বান্ধবী। ইকরার মা- চাচি দের সাথেও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল। তাদের এতো সুন্দর আচরনে তেমন একটা আনইজি ফিল হয়নি তার। এইদিকে হুমায়রার চরিত্রেও বেশ মুগ্ধ হয়েছিল ইকরার পরিবার- তাদের চেহারার মধ্যেই সেই মুগ্ধতা ফুটে উঠত। সেই মুগ্ধতা থেকেই একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন তারা। আর সেটা বাড়িতে ফিরে আসার পরদিনই অবগত হয়েছিল হুমায়রা। মামির থেকে যখন জানতে পারে ইকরার ভাই কৃশানের জন্য তার প্রস্তাব এসেছে তৎক্ষনাৎ প্রবল নিষেধাজ্ঞা জানিয়েছিলো সে। নিষেধ করার কারণ হলো কৃশানের চরিত্র। বাড়িতে ফিরে আসার আগের দিন কৃশানের সাথে দেখা হয়েছিলো তার। বিকেলের দিকে ইকরাদের বাগানে হাঁটছিলো দুই বান্ধবী। সহসা ইয়াসমিন বেগমের ডাকে হুমায়রাকে অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল ইকরা। ফুল গুলো দেখতে দেখতেই একটা ফুলের মধ্যে পোকা নজরে পড়তেই এক হাতে ঘোমটা ধরে রেখে অপর হাতে সেটা সরাতে নিচ্ছিলো সে। তখনই পেছন থেকে ভেসে আসলো একটা গমগমে স্বর,

“ এই মেয়ে, কে রে তুই? আমার গাছের ফুল ছেঁড়ার সাহস তোকে কে দিলো? ”
বুকের ভিতরটা এক লহমায় ভয়ে ছ্যাৎ করে উঠল মেয়েটার। পরপর সেই ভয় পরিণত হলো ঘৃণায়। প্রথম সাক্ষাতেই কারো মুখে তুই শব্দ উচ্চারিত হতে আজ অব্দি হয়ত দেখেনি হুমায়রা। তাও আবার একটা ছেলে হয়ে অচেনা একটা মেয়েকে এভাবে কথা বলে! তার তো ছেলেদের সাথে আজ অব্দি কখনো কথা হয়নি বললেই চলে তবে তাদের ম্যানার্স সম্পর্কে ধারণা আছে। নিশ্চই এটা ভালো ম্যার্নাস সম্পন্ন কোনো ছেলে নয়। তার ভাবনার মাঝেই কৃশান আবারও বলে উঠল,

“ এখানে কী? কোথা থেকে এসেছিস? আগে তো দেখিনি! ”
মাটির দিক তাকিয়ে রইল হুমায়রা। একবারও চোখ তোলে তাকালো না। আর নাতো কোনো উত্তর দিলো। তাকে চুপ থাকতে দেখে কড়া কিছু বলতে নিবে কৃশান তার আগেই সেখানে উপস্থিত হলো ইকরা। বলল,
“ এইগুলো কেমন আচরন ভাইয়া! ও আমার বান্ধবী হুমায়রা জান্নাত হিমি। ”
“ ওহ তোর মতোই মাদ্রাসার ভন্ড হুজুরিনী ”
“ ভাইয়া ঠিক করে কথা বলো। ”
“ আমার মুখ আমি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে কথা বলবো। বেশি বাড়বি মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে আসার উপায় বন্ধ করে দেবো। ”
পরপরই স্থান ত্যাগ করতে করতে বলল,

“ এইগুলো নাকি মাদ্রাসায় পড়ে বড়ো ভাইয়ের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় এইটুকুও জানে না। ”
“ তুমি ভালো হলে ভালো করে কথা বলতাম। ”
“ আমি কী আর তোর মতো মাদ্রাসায় পড়েছি। পরলে তোর মতো এমন ম্যার্নাসলেস হতাম না। ”
“ শয়তান একটা ”
কৃশান যেতেই বিড়বিড় করে বলল ইকরা। জঘন্য শব্দটি শুনতেই হুমায়রা শাসনের স্বরে বলল,
“ এই শব্দ উচ্চারণ করছিস কেন? ”
“ তো এর মতো অমানুষকে আর কী বলবো। সারাক্ষন নেশা করে বেড়ায়। আম্মু- আব্বু কারো কথা শুনে না। নিজের যা ইচ্ছা তাই করে। আর নিজেতো মাদ্রাসায় পড়তে পারেনি এখন আমি পড়ছি বলে আম্মু- আব্বু আমার প্রশংসা করে তাই আমাকে ওর সহ্য হয়না, সারাক্ষন আমাকে অপমান করতে তৎপর হয়ে থাকে। ”
” তোর ভাই এগুলো রাগের বশবর্তী হয়ে করে। আর তুইও রেগে গিয়ে নিজের আচরন খারাপ করিস? কেউ চাইলেই কী তোকে নিচু করতে পারবে? সৃষ্টিকর্তা আমাদের ভাগ্যে যতটুকু মর্যাদা লিখেছেন ততটুকু আমরা পাবই। ”
“ তোর অনেক ধৈর্য্য। এর জন্যই আমি বলি তুই হলি সর্বোত্তম।”
“ প্রত্যেকেই সর্বোত্তম। ”

সেই দিনের এইটুকু সাক্ষাতেই কৃশানের প্রতি বুক ভরা ঘৃণা সৃষ্টি হয়েছিল হুমায়রার। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এমন একটা মানুষের সাথেই তাদের টাকা দেখে কোনোকিছু না ভেবেই তাকে বিয়ে দিয়ে দিল তার মামা- মামি। অথচ মেয়েটা জীবনের প্রত্যেকটা মোনাজাতে একজন আদর্শ পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চেয়েছিলো। সৃষ্টিকর্তা তো উত্তম পরিকল্পনাকারী হয়তো তার এই পরিকল্পনার শেষ পাতায় লেখা থাকতে পারে সুন্দর কিছু। সেই অব্দি যতো কষ্টই হোক না কেন সে যেন ধৈর্য্য ধারণ করতে পারে। এসব ভাবতে ভাবতেই এক সময় ঘুমিয়ে পরলো হুমায়রা।

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২