হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৩
সাঞ্জেনা শাজ
শুভ্রতা ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলো এক প্রকার। নিজেকে এখনো মেহরাদের রুমেই আবিষ্কার করলো। গা’য়ের জামার অবস্থা নাজেহাল। ওড়না? ওড়না তো এ রুমেই নেই। গতকাল তো এভাবেই চলে এসেছিলো। তারপর? তারপর মেহরাদের ওসব পাগলামো। কিখন ঘুমিয়েছে তীব্র অনুভূতির চাপাকলে সেটারও খেয়াল নেই।
সে এদিক সেদিক তাকিয়ে বিছানায় নিজেকে একাই পেলো। বেড সাইড টেবিলে ছোট এলার্ম-ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রায় আটটা বেজে গিয়েছে! সিরিয়াসলি? সে এতোক্ষন ঘুমিয়েছে? উনিও ডাকলো না আমায়? সয়তান লোকটা কোথায় এখন?
তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে থেকে নামলো শুভ্রতা। পড়নের জামাটা টেনেটুনে ঠিক করে নিলো। কাধটা গার সহ জ্বলে উঠলো কিছুটা। এদিকে জামাটা বাজে ভাবে কুচকে আছে খুব। সে এতসব কিছুতে ধ্যান দিলো না। আশেপাশে মেহরাদকে না দেখে তার অস্থিরতা আরও বাড়ল। নিশ্চয়ই নাস্তা করতে নিচে চলে গিয়েছে! তাকে একবার ডাক দিবে না? আশ্চর্য! সকলের সামনে কি একটা লজ্জায় পড়তে হবে এখন তাকে!
রুমের ভেজানো দরজা খুলে মাথাটা বের করে করিডরে উঁকি দিলো শুভ্রতা। ফাঁকা করিডর। এক দৌড়ে রুমে চলে যাবে। ব্যাস! গায়ে তো ওড়না নেই, হাত দুটো বুকের উপর ভাজ করে রাখলো। কাধে টান পড়লো আলতো। উফফফফ! গতকাল রাক্ষসটা কামড়ে রাখেনি। নরখাদক একটা! জখম করে ছেড়েছে একদম।
চোখ মুখ স্বাভাবিক করলো শুভ্রতা৷ ভেবে নিলো, এভাবেই এক দৌড়ে রুমে চলে যাবে। দিলো’ও দৌড়। কিন্তু তার পরিকল্পনায় সমবেদনার এক বালতি পানি ঢেলে দিলো সোহানা।
মেয়েটা দরজা খুলে রুম থেকে বেড়িয়েছে। আজ তো কলেজ নেই, আগামীকাল পরিক্ষা। সকলে ভেবেছে হয়তো রুমে পড়ে সে , কিন্তু সে আসলে পরে পরে ঘুমিয়ে একটু আগে উঠেছে। আর উঠেই ফ্রেস হয়ে নিচে যাচ্ছিলো নাস্তা সাড়তে। পেটে ইদুর মামা আকুলিবিকুলি করছে।
শুভ্রতাকে দেখলো ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসতে। আচমকাই ভয় পেয়ে থমকে দাড়ালো। এদিকে শুভ্রতার চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। ওঁকে এখনিই বের হতে হলো রুম ছেড়ে! কথায় আছে না, যেখানে বাঘের ভয়; সেখানেই রাত পোহায়! এটা তার বেলা একদম একশোতে একশো মিলে যায় সবসময়। এই মেয়ে এখন তাকে টিটকারি করে জ্বালিয়ে মা’রবে। আর সময় পেলো না!
“এই দাড়া দাড়া, এভাবে কোথা থেকে আসছিস? অলিম্পিক রেস লেগেছিস না-কি? যেই দৌড় দিচ্ছিস!” অবাক বিস্মিত স্বর সোহানার।
শুভ্রতা ব্রেক কষলো পা’য়ের, না চাইতেও। তবে একটু থেমেই সোহানাকে সহ টেনে তার রুমের দিকে নিয়ে দরজা আটকে দিলো। ভুজুংভাজুং কিছু বোঝাতে হবে মেয়েটাকে। নিচ থেকে কেউ যদি দেখে ফেলে তার এই এলোমেলো অবস্থা! এতক্ষণ নিচে কি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ভদ্রলোক, কে জানে!
সকালের নাস্তার টেবিল থমথমে, ইদানীং অফিসে খুব চাপ যাচ্ছে। সেই হিসেবে আলতাফ তালুকদার, মেহরাদ তার মেঝো চাচু ওনারা খুবিই ব্যাস্ত। নাস্তার টেবিলে বসেছেনও একসাথে তাড়াতাড়ি। নাস্তা সেড়েই বেরিয়ে যাবে অফিসের উদ্দেশ্যে। এখন কথা হচ্ছে, সকাল থেকেই জাহানারা বেগম, সুরাইয়া বেগম ক্ষনে ক্ষনে তাকাচ্ছে একে অপরের দিকে আড়ে আড়ে।
সুরাইয়া বেগম শুভ্রতার রুমের দরজা হাট করে খোলা পেয়েছে ভোরে যখন উঠেছিলো নামায পড়তে তখন। ভেবেছে, এক্সাম হয়তো পড়তে ভোরে উঠে গিয়েছে! সুরাইয়া বেগম এসেছিলেন নিজের মেয়েকেও দেখতে, মেয়ের রুমের দরজা বন্ধ। শুভ্রতার টা হাট করে খোলা। খুশিতে, আবেগে তিনি আপ্লুত হয়েছিলেন বেশ। ‘মেয়েটাকে মা শা আল্লাহ পরিক্ষা এলে পড়তে বসতে বলতে হয় না। আর আমার টা!!’ মেয়েকে মনে মনে এরকম আরও ভর্ৎসনা করে এগিয়ে গিয়েছিলেন শুভ্রতার রুমের দিকে।
ওমাহ! গিয়ে দেখে রুম খালি। শুভ্রতা উধাও! নেই। কোথাও নেই! কই গেল! সবে তখন সকাল ছয়টা! শুভ্রতা কই গেল!কাউকে না জানিয়ে কোথায় গেল! তিনি চিন্তিত বদনে দু মেয়ের দরজায় টোকা দিয়ে দেখলেন, দুটোই লক করা৷ পরপর নিচে এসে দেখলেন বড় জা রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। তিনি গিয়ে শুভ্রতার কথা জানালেন। জাহানারা বেগমও বেশ চিন্তিত হলেন। তবে তাদের চিন্তার অন্ত ঘটিয়েছে মেহরাদ নিজেই। জগিং এর জন্য বের হয়েছিলো। রাতে ঘুম হয়নি ভালো করে। অস্থির চিত্তে শুধু মেয়েটার সাথে মিশে ছিলো। বক্ষপ্টে আগলে রেখেছিলো। বারবার নিজের করে নিতে মন চেয়েছিলো। কিন্তু আটকিয়েছে নিজেকে। আটকাতে হয়েছে। আগামীকাল এক্সাম। সে ধরলে নাজেহাল করে ছাড়বে। তার নিজের-ই নিজের উপর বিশ্বাস নেই। তাই বেসামাল অনুভূতিকে লাগাম টেনেছে। শুভ্রতার অস্থিত্বে ডুবে যেতে চাওয়া পাগলা ঘোড়াটাকে লাগামে রেখেছে।
বডি ফ্রেশনেসের দরকার। তা না হলে জরুরি অঙ্গ-প্রতঙ্গ গুলো কোন ঠাসায় কোমায় চলে যেতে পারে! পড়নে জগিং সুট, সিড়ি বেয়ে মেহরাদ নামতেই জাহানারা বেগম ছেলেকে চিন্তিত বদনে শুভ্রতার কথা জানাতেই তাকে এক বাক্যে অবাক করে দিয়ে ড্রয়িং রুমে রেখে গিয়েছে। তিনি খুবিই ব্যাতিব্যস্ত হয়ে ছেলেকে জানালেন,
“মেহরাদ, শুনছিস; শুভ্রতা বাড়িতে নেই। বাড়ির বাইরেও নেই। কোথায় গেলো মেয়েটা বলতো!”
ভদ্রমহিলার ছেলে বড়োই অভদ্র ভাবে মমতাময়ী মা’কে জানিয়েছে,
“ও আমার রুমেই। ঘুমচ্ছে। রাতে লেট করে ঘুমিয়েছে। ডেকো না এখন। ঘুমোক। ”
দু জা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছে শুধু ছেলের গমন পথ। এরপর আর টু বাক্যও বলেনি। তাদের কথা, তারা জেনেছে, জেনেছে। আর কেউ না জানুক! কখন আবার অনর্থ শুরু হয়ে যায়!
তবে তাদের কথা আর রাখা হয়নি। অনর্থ হয়েছে। লাগিয়েছে মেহরাদ নিজেই।
আলতাফ তালুকদার নাস্তা করতে বসে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বাড়ির মেয়েদের খবরাখবর জিজ্ঞেস করছিলেন। মেহরাদ সহ তখন তিনজন শুধু খাবার টিবিলে। আর পরিবেশনে সুরাইয়া বেগম আর জাহানারা বেগম ছিলেন।
বাড়ির মেয়ে দুটোর পরিক্ষা,অথচ ব্যাস্ততায় মেয়ে দুটোকে একটু কথাও বলা হয়নি। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন,
“দ্বীপ না-কি কি যেন নাম ছেলেটার! ও পড়ায় তো ঠিক মতো ওঁদের?”
“হ্যাঁ, পড়ায় তো ভালোই, দেখি। ছেলেটাও বেশ ভদ্র সভ্য।” জাহানারা বেগম বললেন।
“হু। ভালো বলেই আদনানটা পাঠিয়েছে। একজনকে তো বলেছিলাম! সে তো কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছিলো।” আড়চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন আলতাফ তালুকদার। মেহরাদ ভাবলেশহীন। জগিং শেষে একেবারে শাওয়ার নিয়ে রেডি হয়ে বের হয়েছে। শুভ্রতাকে ডাকে নি। ঘোমটা পূরক, তারপর সুন্দর করে পড়া গুলো আয়ত্তে রাখতে পারবে।
মেহরাদকে যে খোচা মে’রে বলা হয়েছে সেটা সকলেই বুঝেছে। তাই এক নজর সকলেই ওর দিকে তাকালো, ওঁকে ভাবলেশহীন দেখে আবারও চোখ ফিরিয়ে নিলো।
“মুখে বড়ো বড়ো বুলি আওড়ালেই হয় না। ভালোবাসলে রাগ, জেদ, ইগো সব এক সাইডে রেখে সব সময় পাশে থাকতে হয়৷ সব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয়। ”
“হুম৷” মেহরাদ মৃদু মাথা নাড়াল।
আলতাফ তালুকদার যেন চটে গেলেন এবার ছেলের নির্লিপ্ততায়৷ মেয়েটাকে এভাবে গা ছাড়া ভাবে ছেড়ে রাখার কারণ কি? কতো দিন যাবৎ এসব দেখে আসছে।
“আমি শুভ্রতা মা’কে ডেকে বলে দিবো, তোমার আশেপাশেও যেন না যায়। যেসব মানুষের ইগো আকাশ ছোঁয়া, তাদের থেকে দূরে থাকাই ভালো। ও আরও উত্তম কাউকে ডিজার্ভ করে!”
এযাত্রায় মেহরাদ মুখ খানা বেশ গম্ভীর করলো। বাবা হয়ে ছেলের বউ কে বলছে আরও উত্তম কাউকে ডিজার্ভ করে মানে কি? সে ভালো না? উত্তম না? সে গম্ভীর মুখে কপালে ভাজ ফেলেই বললো,
“বলার জন্য ডেকে দিবো? আমার রুমেই ঘুমোচ্ছে। ওয়েট, নাস্তাটা সেড়ে রুমে গিয়ে ডেকে দিবো।”
আলতাফ তালুকদার যেন আকাশ থেকে পরলেন। ওর রুমে মানে? ওর রুমে কেন মেয়েটা? সে চোখ পাকিয়ে ছেলেকে শাসানোর ভঙ্গিতে বললেন,
“তোমার রুমে মানে কি, অভদ্র ছেলে? শুভ্রতা মা ওখানে ঘুমোবে কেন? তুমি কি করেছো ওর সাথে?” কথার তালে তালে তিনি রেগে এটাও বলে ফেললেন।
জাহানারা বেগম সুরাইয়া বেগম মুখে আঁচল চাপলেন। কি করেছো মানে কি? এ ছেলে দিন দিন যে ঠোঁট কাটা হচ্ছে! উল্টো পাল্টা না কিছু বলে ফেলে!
মায়ের মন, ছেলেকে চিনতে একটুও ভুল করেনি। এই যেমন মেহরাদ ভাবলেশহীন ভাবে টেবিলে বিস্ফোরণ ঘটলো কিছুক্ষণ আগে। একিই ভাবে আবারও বললো রাশভারি কন্ঠে,
“আমার বউ, আমার রুম। ওখানে ঘুমোবে না তো কোথায় ঘুমোবে। আন্ড ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন ; আমি তেমন কিছুই করিনি। বাট গ্যারান্টি নেই!!”
আকরাম তালুকদার কেশে উঠলেন ভাতিজার কথায়। আলতাফ তালুকদার তো বোবা বনে গেলেন এক প্রকার।বনিজের কথার এরকম বেফাঁস জবাব তিনি মোটেও কাম্য করেন নি। ছেলেটা দিন দিন এতো নির্লজ্জ হচ্ছে! তবুও তিনি দমলেম না। ছেলে এখনো তাদের সামনে কিছুই পরিস্কার করে বলেনি বিয়ে বিষয়ে।
“তোমার বউ? বিয়েটা আদও বৈধ তো? তুমি কিন্তু এখনো কিছু ক্লিয়ার করো নি।”
মেহরাদের খাওয়া শেষ। সে এবার উঠে যাবে। এমতাবস্থায় বাবার প্রশ্নের জবাবটা দেওয়া তেমন প্রয়োজন মনে করলো না সে। একজন কে ক্লিয়ার কাট এ বিষয়ে জবাব দিয়ে দিয়েছে সে। এখন আবার এদিকে। এতো প্যারা তার ভালো লাগে না। তাই চুপ থেকেই উঠে যেতে নিলো। কিন্তু থেমে গেল রিমা খানের আগমন দেখে। সেদিকে একবার তাকিয়ে এবার বড্ড আয়েশ করে বসলো। বসে খুব-ই আত্নবিশ্বাস আর অহমিকার সাথে বললো,
“এতো ক্লেরেফিকেশন আমার ভালো লাগে না। ছোট চাচ্চুকে এজ এ গার্ডিয়ান ;শুভ্রার বাবা হিসেবে সকল বিষয়ে অবগত করেছি। স্টিল তোমরা যেহেতু অজানা। আমি আবারও ক্লিয়ার করছি, শুভ্রা আমার লিগেল ওয়াইফ। ইটস লাউড এন্ড ক্লিয়ার। ওর আর আমার বিয়ে সম্পূর্ণ আইন মোতাবেকই হয়েছে। এবার বলবে, বয়স তাহলে? দ্যা আন্সার ইজ- বয়সও কাগজে কলমে আঠারো বানিয়ে তারপরই রেজিষ্ট্রি করা হয়েছে। এখন বলবে ধর্ম! ধর্ম মোতাবেকও বিয়ে বৈধ। আমি শুভ্রতাকে ভালোবাসি, শুভ্রতাও আমায় ভালোবাসে। এরপরও তোমরা আমাদের বিয়ে অমত করতে? দুজন কে আলাদা করার চেষ্টা করতে? উঁহু, আমার বিশ্বাস অনুযায়ী করতে না। তবে এটা ঠিক। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। স্টিল পোড়াচ্ছি। তবে সেটা কোন ব্যাপার না। সব পুড়ে কয়লা হয়ে যাক, ও আমার বউ হিসেবে সম্পূর্ণ হালাল রুপে আমার কাছে আছে এটাই যথেষ্ট আমার জন্য। এবার, মানুষের মন পুড়ুক, অহংকার পুড়ুক নতোবা দুনিয়া পুড়ুক! আই ডোন্ট ক্যায়ার! ও আমার! আমার ভালো থাকতে এটাই যথেষ্ট। ”
সকলেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো মেহরাদের কথার জালে ডুবে গিয়েছিলো। আসলেই তো!ওর বলা একটা কথাও তো ভুল না। তারা তো ছেলে মেয়ে দুটোর নিজেদের জন্য এতো পাগলামো দেখে এদের আর আলাদা করতে পাড়তেন না, ঠিকনা? তবুও আলতাফ তালুকদার ছেলের ভুল ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“যা-ই বলো, তোমার আমাদের সাথে আলাপ করার প্রয়োজন ছিলো এ বিষয়ে। সব কিছুরই একটা সামাজিকতা নিয়ম কানুন আছে।”
মেহরাদ উঠে দাড়ালো। রুমে যাবে সে। টেবিল ছেড়ে পা বাড়াতে বাড়াতে বললো,
“এইসব আলাপ টালাপ ইজ লেন্দি প্রসেস ফর মি। ডাইরেক্ট বিয়েই পারফেক্ট। তাছাড়া, সামাজিকতা নিয়মকানুন যা আছে পালন করো না এখন! না করলো কে? তখন এসবের ধার ধারতে বসে থাকলে আমার মাথাই অর্ধেক ফেটে যেতো, কিছু মানুষের মেলোড্রামাতে। বিয়ে হয়ে গেছে। ও আমার আছে। এবার যা খুশি তা করো। আই ডোন্ট হেভ এনি প্রবলেম। ”
কি শেয়ানা ছেলে ভাবা যায়! ছেলেটা সব সময় তীক্ষ্ণ বুদ্ধি নিয়ে চলে। মনে মনে বললেন জাহানারা বেগম। সাথে মা শা আল্লাহ ও আওড়ালেন। কেউ নজর না লাগাক তার ছেলেকে!
আলতাফ তালুকদারও উঠে দাড়ালেন ছেলের সাথে সাথে। কিছুটা গম্ভীর স্বরে আদেশ ছুড়লেন ছেলের উদ্দেশ্যে,
“সব-ই মেনে নিলাম। কিন্তু তুমি মেয়েটার কাছ থেকে দূরে থাকবে। মেয়েটাকে আর কোন বিষয়ে ডিস্টার্ব হতে দেওয়া যাবে না। তারউপর পরিক্ষা মেয়েটার। ওঁকে আপাতত ওর মতো থাকতে দাও৷ আমরা বড়ো’রা মিলে এটা পারিবারিক ভাবে মীমাংসা করার চেষ্টা করবো।”
“ওকেই। কি মীমাংসা টিমাংসা করবে তোমরা জানো! তবে আমি ওর কাছ থেকে দূরে টূরে থাকতে পারবো কি না সন্দেহ! গেলাম। অফিসে আরলি পৌছতে হবে। মিটিং এ দেখা হবে৷ ” নির্লিপ্তে কাধ উঁচিয়ে বলে রিমা বেগম কে পাশ কাটিয়ে চলে গেল মেহরাদ ডাইনিং ছেড়ে।
ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখলো শুভ্রতা আর সোহানা দাঁড়িয়ে। বুঝতে বাকি রইলো না এরা এতোক্ষণ তার বলা সব কিছু শুনেছে। শুনুক! তাতে কোন সমস্যা না। কিন্তু মেয়েটা কেমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এ দৃষ্টিতে কি? গর্ভ বোধ? না-কি তার জন্য অঘাত ভালোবাসা? না-কি নিগূঢ় বিশ্বাসের ছাপ!
সে ব্রু কুচকেই ওর সামনে গিয়ে দাড়ালো। সোহানা সড়ে গেল মেহরাদ যাওয়াতে। তার কাছে তার ভাইকে দুনিয়ায় বেস্ট প্রেমিক পুরুষ মনে হলো। গর্ভে বুক ফুলে উঠেছে তার। তার ভাইটা এতো জোশশ! শুভ্রতার তো শাহী কপাল! রাজ কপাল একদম!
“কি ব্যাপার ঘুম শেষ?” শুভ্রতাকে শুধালো মেহরাদ।
শুভ্রতা যেন কোন ঘোরে এখনো। প্রতিউত্তর করলো না কোন। তাকিতেই রইলো শুধু। মেহরাদ ওর নাকে টোকা দিলো দু আঙুলে। হুশ ফিরলো শুভ্রতার। বেশ লজ্জা পেল মেয়েটা৷ কিন্তু মনটা খুশিতে আনন্দে আটখানা। তার মেহরাদকে খুব করে জড়িয়ে ধরতে মন চাইলো কিন্তু ড্রয়িং রুম বিধায় পাড়লো না। তবে মুখে ঠিকি হাসি ঝুলে উঠলো। কিছুটা চাপা স্বরে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো,
“ডেকে দিলেন না কেন?”
“কে যেন, আমায় জড়িয়ে এভাবে ঘুমিয়ে ছিলো ;যেন আজন্ম নির্ঘুম সে। তাই ডাকতে ইচ্ছে হয়নি। তো নির্ঘুম রাত জাগা পরী।, রাতের ঘুম ভালো হয়েছে তো আপনার ভালোবাসার বুকে?” মেহরাদও কিছুটা চাপা স্বরে দুষ্টমি মিশিয়ে শুধালো।
শুভ্রতা লজ্জায় আরক্তিম হলো। মাথা মৃদু উপর নিচ করে হ্যাঁ বোঝালো শুধু। সাথে সাথেই হাফ সাফ করে উঠলো লজ্জায় মেয়েটা। এভাবে সরাসরি কেউ লজ্জা দেয়? একারণেই তো সে দূরে দূরে থাকে। কখন আবার কাছে গেলে কিভাবে লজ্জা দিয়ে বসে!
মেহরাদের হাতে সময় কম। তার অফিস যেতে হবে। তাই আর লজ্জায় ফেললো না মেয়েটাকে। নিজের বেহাল ক্ষত করা ঘারের নিচের অংশ কাধরা নজরে আসলো তার। ফর্সা দেহে অতিরিক্ত লাল দাগ পড়ে গিয়েছে। ঠোঁট দুটো আবারও নিশপিশ করে উঠলো চুমুতে ভরিয়ে দিতে। কিন্তু জায়গাটা পার্ফেক্ট না। হাত উচিয়ে কাধের ওড়নাটা আরেকটু ভালো ভাবে ঢেকে দিলো জায়গাটায়। ঘারে আলতো হাত ভুলিয়ে উপদেশ দিলো,
“নাস্তা করে পড়তে বসবি, হু? আর রাতে সময় পেলে আমি একবার চেক দিবো। সোহানাকেও বলে দিবি। আর ড্রয়ারে জেল রাখা আছে লাগিয়ে নিবি ওখানে হু?” ইশারায় কাধের ক্ষত দেখালো মেহরাদ।
শুভ্রতা মাথা নাড়াতে,তাদের অদেখা তার পাশ দিয়ে ফুসতে ফুসতে তোফানের মতো শব্দ করে রুমে গেলো রিমা খান। কত বড় বেয়াদব গুরুজন কিছু মানে না। মানুক না মানুক শাশুড়ী তো হই! তাকে দেখেও এমন করবে! ইচ্ছে করে করলো না এসব! এই কারনেই তো সে এ বেয়াদব ছেলেটাকে জামাই হিসেবে মেনে নিবে না কখনো। সময় তারও আসবে। খান বাড়ির মেয়ের সাথে এই পুচকে ছেলের টক্কর! তাও তার মেয়ে নিয়ে!
ফুসতে ফুসতে ঠাস করে দরজা লাগানোর শব্দে সচকিত হলো সকলে। শুভ্রতাও ভয় পেল কিছুটা। তবে মেহরাদ ভাবলেশহীন। সে জানে কার কর্ম এটা। ইচ্ছে করেই আরও এমন করেছে। দেখুক!জ্বলুক!
“আমার রুমে ড্রয়ার থেকে জেল নিয়ে নিবে, হুম!আসছি আমি।” বলেই মেহরাদ সিড়ি ভেঙে উপরে উঠে গেল।
শুভ্রতা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো সেখানটায়। তার ডাইনিং এ আর যেতে ইচ্ছে হলো না। নাস্তা পরে খাবে, আগে জেলটা লাগিয়ে আসুক। জ্বলুনিটা একটু কমুক। ভুলেও কারো চোখে পরলে তার লজ্জার শেষ থাকবে না।
রুমে মেহরাদ নিজের অফিস ব্যাগটা গুছিয়ে নিলো। টাই’য়ের নটটা ঠিক করে উপরের সুটটা নিবে এর আগেই আগমন ঘটলো শুভ্রতার।
“দেখি,কোন ড্রয়রে জেল? এটা আগে লাগিয়ে নেই। খুব জ্বলছে।কারো চোখে পরলে আমায় না লজ্জায় পড়তে হবে। আপনার তো কিছু না।” খুব ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বললো সে। আসলে তার লজ্জা হচ্ছে তাই এই তাড়াহুড়ো।
মেহরাদ ঠোঁট ঠোঁট চাপলো। গাঢ় চোখে চাইলো উড়ন্ত মেয়েটার দিকে। যে ব্যাস্ত ভঙ্গিতে ঝুকে পিছু ঘুরে ড্রয়ার হাতড়াচ্ছে।
মেহরাদ কিয়ৎপল দাঁড়িয়ে কপাল চুলকে এগিয়ে গেল। তার মুডের কখন যে কি হয়ে যায়! সে এগিয়ে গিয়ে শুভ্রতার উপর দিয়ে গিয়ে ঝুকে নিজেই বের করলো জেলটা। পৃষ্ঠদেশে বলিষ্ঠ দেহের ছোঁয়া পেতেই শুভ্রতা থেমে গিয়েছে। তবে পিছু ঘুরেনি। অবাধ্য অনুভূতি জেগে উঠছে মন পিঞ্জিরায়। দেহে উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। দু হাত সমানে কচলাচ্ছে সামনে রেখে।
মেহরাদ সামনে ঘুরালো মেয়েটাকে। চোখে চোখ পড়লো দু’জনার। শুভ্রতা তৎক্ষনাৎ চোখ সড়িয়ে নিল। এ চোখের চাহনি বড্ড নেশালো। তাকে এলোমেলো করে দেওয়ার। সে মিনমিন সুরে আওড়ালো,
“দিন আমি লাগিয়ে নিচ্ছি। আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে না?”
“উঁহু, আমিই লাগিয়ে দিচ্ছি। আর একটু দেরি হলে কিচ্ছু হবে না। অফিস আর বউ দুটো তো আমার-ই। ” বলেই শুভ্রতার গা’য়ের ওড়না টা টেনে ছুড়ে দূরে ফেলে দিলো। ফেলতে ফেলতে বললো,
“আমার সামনে ওড়না টোড়না এসবের ঢং করবি, মা’র খাবি ।”
শুভ্রতা হাফসাফ করে উঠলো। বক্ষদেশ ঢাকতে চাওয়া হাত দুটো এমনিতেই শীতল হয়ে গেল মেহরাদের হুমকি শুনে। ভিতরের লজ্জায় অস্থিরতায় কুঁকড়ে গেল মেয়েটা। রেড চেরির মতো চেহারা রং ধরেছে। কপোল, ললাট, কান, গলা সব লালিমায় ছেয়ে গেছে।
মেহরাদ থ বনে দাঁড়িয়ে আছে। ওড়না ফেলেছে বিরক্তিতে। তার সামনে এসব নিয়ে টানাটানি দেখলে তার প্রচুর বিরক্ত লাগে। কিন্তু এই…এটা….
মেহরাদ মোহিত হলো কোন ঘোরে আচ্ছাদিত হয়ে। জেলটা হাতে রেখেই ছুয়ে দিলো ওষ্ঠ দ্বারা ঘার।
ঝটকা খেলো শুভ্রতা। মৃদু শব্দ করে আরও খিচে নিলো অক্ষিযুগোল। মেহরাদের হুশ নেই। নিচে নামাতে চাইলো আরও । মোহাচ্ছন্ন হয়ে ওষ্ঠ জোড়া এগিয়ে নিতে থাকলো । তবে গভীরে কিছু ছোঁয়ার আগেই নিজেই ছিটকে আসলো দূরে। হাতে থাকা জেল খানা বিছানায় ছুড়ে ফেললো। নিজেকে তাপদাহ সূর্যের বেশ নিকটে মনে হচ্ছে। রুদ্ধশ্বাসে আওড়ালো,
“নিজে লাগিয়ে নিস। গড নোজ, আদারওয়াইজ আই’ল গিভ ইউ মোর পেইন, মোর স্ক্রেচ।” বলেই মেহরাদ ঘুরে দাঁড়িয়ে দু হাতে কোমর চেপে বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিলো। আচমকা আবার কি হলো, শুষ্ক ওষ্ঠ জোড়া শুভ্রতার ঈষৎ কাপা ঠোঁটে ডুবিয়ে দিলো। তবে, সময় নিলো না বেশি। ছেড়েই বড়ো বড়ো কদমে বেড়িয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে ধ্বনিত হলো,
“ওখানে না দেই এখানে দিতেই পারি। তবে আমার গ্যারান্টি নেই, কখন ওখানে পৌছে যাই। ইন দেট কেস, আ’ম সো মাচ্ কন্ট্রোললেস৷”
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩২ (২)
গাড়ির আওয়াজ পেল শুভ্রতা। চোখ খুলে চেস্টে হাত চেপে নিশ্বাস টানলো বড়ো বড়ো। চেস্টে এখনো মেহরাদের আঙুলের ছোঁয়া অনুভব করছে। কেমন লজ্জা মিশ্রিত সুক্ষ্ম অনুভূতি দাবানলে জ্বলে উঠছে নারীদেহ। দূরের ফ্লোর থেকে নিজের ওড়না টা তুলে নিলো শুভ্রতা। ছুট লাগালো বারান্দার দিকে। যেতে যেতে দেখলো প্রনয় পুরুষ গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে গেট পেড়িয়ে। শুভ্রতা ভালো লাগার মিষ্টি আবেশে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। ঠোঁটের কোনায় মৃদুমন্দ হাসি।
