হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫ (২)
সাঞ্জেনা শাজ
শুভ্রতা নাক ফুসাতে ফুসাতে কেবিনের সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখল এসিট্যান্ট রাসেল বের হয়ে আসছে দ্রুত কদমে। দু’জন মুখোমুখি হলো। রাসেল সাহেব আশ্চর্য হলেন শুভ্রতামে দেখে। আরও আশ্চর্য হলেন ওর কান্নায়, রাগে, ক্ষুভে বেহাল মুখশ্রী দেখে।
তার স্যার তাকে আজই আউট করে দিবে! ম্যাম এখানে কি করছে! সে বিচিলিত কন্ঠে শুধালো,
“এনি প্রবলেম ম্যাম? আপনি এখানে?”
শুভ্রতা থামলো। একদম মিটিং রুমের পাশে দাড়ানো তারা। রাগে কাপতে থাকা নাকের পাটা ফুলিয়ে বললো,
“আপনার স্যার কই? ”
“স্যার তো মিটিং এ ম্যাম। ”
“এই মেয়ে তোমায় বলেছি না স্যার মিটিং এ? সিনক্রিয়েট করছো কেন? বেয়াদব মেয়ে কোথাকার!” পিছন থেকে এগিয়ে এসে ওঁদের সামনে দাড়িয়ে বললো রিংকি মেয়েটি।
রাসেল সাহেবের চোখ কপালে। বেয়াদব? কে? ম্যাম? ভদ্রলোকের কলিজার পানি শুকালো।
“হুশ, হুশ, এই মেয়ে কি বলেন আপনি??? কাকে কি বলছেন?” হাত নাড়িয়ে মেয়েটাকে থামানোর উদ্দেশ্যে বললো লোকটা।
“কেন স্যার? এই মেয়েটাকি বলছি। ফাজিল মেয়েটা কতক্ষণ যাবৎ সিনক্রিয়েট করছে অফিসে এসে। নিজেকে কি না কি বলছে!”
শুভ্রতা সময় ব্যয় করলো না মুখ খুলে। এসব অন্ধ মানুষদের বুঝালেও বুঝবে না। উল্টো নিজের বস্তি পচা শব্দ গুলো উগলে দিবে। সে সহজে মুখ চালাতে পারে না। সোহানা হলে বড় ছোট মানতো না, বাজিয়ে দিতো একদম।
রাসেল সাহেবকে ক্রস করে মিটিং এর দরজার সামনের কাছে গেল শুভ্রতা। তার পিছু পিছু রাসেল সাহেবও গেল ডাকতে ডাকতে,
“ম্যাম ওয়েট করুন। মিটিং চলছে। স্যার রেগে যেতে পারে!”
শুভ্রতা শুনলে তো! সে বিনা অনুমতিতে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতে গেলে দেখলো প্রজেক্টের আলো ব্যাতিত রুম অন্ধকারে ঘেরা। রুম ভর্তি বাহারি মানুষ টেবিলের আসন ঘেরে। তার পা দুটো আপনা আপনিই দরজায় আটকে গেল। সকলের দৃষ্টি কারলো শুভ্র রঙা কলেজ ড্রেসের শুভ্র মেয়েটা।
মেহরাদ কপাল গোটাল। মিটিং টেবিলে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
“ডিসমিস নাও, লিভ। ” এমনিতেও শেষ পর্যাতেই ছিলো মিটিং।
সকলে না চাইতেও আরেকটি বার দরজায় স্থীর শুভ্রতার দিকে তাকাতে চাইলো। মেহরাদের মোটেও পছন্দ হলো না তা৷ গলার স্বর আরও চড়া হলো তখন থেকে,
“লিভ অল। উই উইল মিট এগেইন।”
সকলে মিটিং রুমের অন্য দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। সাথে বাহিরের ক্লায়েন্টদেরও পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল।
সাথে সাথেই বদ্ধ রুমের সকল জানালা খুলে বাহির থেকে তপ্ত মাঝ দুপুরের আলোয় ছেয়ে গেল মিটিং রুম। এর কিছুটা সাথেই মেহরাদের লাগোয়া বিশাল কেভিন।
শুভ্রতার দিকে কদম বারাতেই শুভ্রতা আহ্লাদী হতে চাইলো। ভাসা ভাসা টলটলে চোখ দুটোই অভিযোগের পষরা। মেহরাদের কদম অস্থির হলো যেন! তার জানটা’র চোখ দুটোয় অভিযোগ কেন? কখন এলো? একা কেন?
ততক্ষণে রিংকি মেয়েটা আর রাসেল সাহেবও এগিয়ে এসেছেন দরজার কাছটায়৷ ধীরে ধীরে লাঞ্চ সেড়ে সকলেই নিজের জায়গায় এসেছে কাজে। তারা আর বসেনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা বুঝার চেষ্টা করছে।
মেহরাদ শুভ্রতার নিকট এগিয়ে যেতেই কিছু বলবে এর আগেই চোখ গড়িয়ে পরা জল নিয়ে শুভ্রতা কাপা কন্ঠে শুধালো,
“আমি কে আপনার? ” ভিতরে অসীম রাগ। কিন্তু সে তো তার চেয়েও বেশি কোমল! তাই তার রাগ জেদ থেকে আবেগ কাজ করে বেশি। দুঃখ ছুয়ে দেয় বেশি,নিগূঢ় ভাবে।
চোখের জল শুভ্রতার কাপা কন্ঠে মেহরাদের যে কি হলো! সে শুভ্রতার এক বাহু টেনে নিজের প্রশস্ত বুকটায় চেপে ধরতে ধরতে আওড়াল,
“আমার জান! আমার সুইট লিটেল ওয়াইফ! মাই এভ্রিথিং! হোয়াট হেপেন্ড?”
উপস্থিত সকলে বাকরুদ্ধ বিস্ময়ে। ওয়াইফ মিনস? আর এ কাকে দেখছে তারা? সব সময় অফিসে গম্ভীর্য বজায় রাখা তাদের তাশদীদ স্যার এটা? কিছুক্ষন আগের গমগমে আওয়াজ তুলে বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে ডিল করা তাশদীদ মেহরাদ তালুকদার এটা? এই স্বর তাদের অজাণা। এই স্বীকারোক্তি, অভ্যন্তরের সম্পর্ক নিয়ে তাদের অজানা। এই সম্পূর্ণ মানুষিই তাদের অজানা!
শুভ্রতা আহ্লাদ পেয়ে হর হর করে অভিযোগের পসরা খুঁলে বসলো। বুকে মুখ রেখেই পিছনে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে থাকা রিংকি নামক মেয়েটাকে আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখিয়ে বললো,
“এই কিরকম মেয়ে রেখেছেন অফিসে আপনি? হে? আমার সাথে খুউব বাজে ব্যাবহার করেছে৷ একে এক্ষুনি বের করবেন। এক্ষুনি মানে ওক্ষুনি! ” গলায় জেড ঢেলে বললো সে।
“ডিড শী??”
মেহরাদ কঠোর চোখে তাকালো মেয়েটার দিকে। এই প্রথম খেয়াল করলো মেয়েটার প্রতি। অফিসে স্টাফ নিয়োগ দেওয়া ইন্টারভিউ নেওয়া এগুলো তার পর্যায়ে আসে না তেমন। অন্যান্যরা সামলায়। মেয়েটাকে দেখেই তার চোয়াল শক্ত হলো। কি ধরন এটা পোশাকের!
সে শুভ্রতার মাথাটা বুকের কাছে রেখেই শান্ত ভঙ্গিতে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলেছেন আপনি ওঁকে? এই অডাসিটি পেলেন কোথা থেকে? আন্সার মি?”
মেয়েটা কেপে উঠলো শক্ত কন্ঠের হুংকারে। সেই সাথে সকলেও ভীত হলো কিছুটা। নিজেদের কিছুটা আড়াল করে সিনারি দেখতে চাইলো।
“নিজে বুড়ি হয়ে কুড়ি সাজতে এসে আমায় ছাপড়ি বলে। বুড়ি বাম।” শুভ্রতা মুখ ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে বললো।
ওর কথার ধরনে সকলেই একটু হেসে ফেললো। হাসলো না মেহরাদ। রাসেল সাহেব, রিংকি মেয়েটা। মেয়েটার চোখ মুখ ঘাট হয়ে আছে। অপরাধ বোধে না-কি ইর্ষায়! কে জানে!
মেহরাদের কঠোরতা আরও বাড়ল। দাউ দাউ করে উঠলো মস্তিষ্ক। কীসব লেইম ওয়ার্ড ইউজ করেছে মেয়েটা তার ভালোবাসার জন্য! সাচ্ আ বি*চ্!
“মি. রাসেল! মি. রাসেল! ”
“জ্বী…জ্বী স্যার।”
“ডিসমিসাল লেটার দিন৷ এক্ষুনি এই মহিলাকে বের করবেন আমার অফিস থেকে। রাইট নাও। এসব ম্যানারলেস কে এপোয়েন্ট করেছে? ”
রিংকি মেয়েটা শুভ্রতার দিকে শক্ত চোখে তাকিয়ে তখনো। জব গেলে যাবে। এমনিতেও তার জবের প্রয়োজন নেই। সে তো এসেছে শুধু এ লোকটার টানে যার বুকে এই অসভ্য মেয়েটা। হিংসেই জ্বলে পুড়ে গেল মেয়েটা। তাকে বুড়ি বলে!
“কাউকে বের করতে হবে না। আর এই অসভ্য চ*টি মেয়েকে আমি দেখে নিবো। চিনে আমি কে!” হিসহিস করে বলেই ঘুরতে নিলে, মেহরাদ হুংকার ছেড়ে ডেকে উঠলো,
“রাসেল সাহেব!!!”
ডাক শেষ হওয়ার আগেই স্ব জোরে থাপ্পড় পড়লো মেয়েটার গালে। কতো বড় ফালতু মহিলা। তার সামনে দাড়িয়ে তার ওয়াইফ কে বাজে ওয়ার্ড বলে! হাও ডেয়ার শী???
থাপ্পড় মেরেছে রাসেল সাহেব। রিংকি মেয়েটার চোখে মুখে হতভম্ব ভাব। সেই সাথে সকলেরই। স্বাভাবিক মেহরাদ আর রাসেল সাহেব। এটা তার জব। তার স্যার কখনোই হাত নোংরা করেন না। মহিলাদের ক্ষেত্রে তো আরও না। এই ডাকের পিছনের কারণ তার জানা। ভালো করেই জানা। এসিস্ট্যান্ট তো আজকে ধরে না!
মেহরাদ এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে শুভ্রতাকে রেখে, শুভ্রতা নিজেই সড়ে গেছে পরিস্থিতি দেখে। সে ভয়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ়। কি থেকে কি হয়ে গেল? এতটা রেগে গিয়েছে!
“আপনি কে সেটা তালুকদারদের জানার কোন প্রয়োজন নেই৷ ইঞ্চিও না। ইউ নো হোয়াট? জানার তো দূরে থাক, এরকম লেইম এন্ড শেইম লেস গার্লদের সাথে আমি মেহরাদ কি? তার জুতোও কথা বলতে যায় না। জানবে কি? শী ইজ মাই ওয়াইফ৷ দ্যা ওনার অফ মাই হার্ট অলসো ইন দিজ কোম্পানি। সে সরি টু হার। রাইট নাও। আদারওয়াইজ ? আপনার কলিজা হাতে ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি এই আমি।”
রিংকি মেয়েটা অপমানে জর্জরিত হয়ে ফুপিয়ে উঠলো।। কিঞ্চিৎ ভয় পেল না-কি বুঝা গেল না। মুখের উপর আছড়ে পরা চুল গুলো সড়িয়ে আরও একবার শুভ্রতার দিকে তাকালো। শক্ত ঘাট হয়ে এক নিশ্বাসে ‘সরিহ’ বলে তারপর দৌড়ে অফিস থেকে বের হয়ে গেল।
সকলে যেন হাফ ছেড়ে বাচল। তাদের নজর আটকালো শুভ্রতার দিকে। স্যার কি বললো? মেয়েটা ওনার ওয়াইফ? কবে বিয়ে হলো? আর মেয়েটাতো বোধহয় ওনার কাজিন! আগেও তো এসেছে মনে হয়! তারা দেখেছে।
শুভ্রতা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ফেলফেল করে তাকিয়ে। এরপর কি হবে বা সে কি করবে, বলবে তার মাথায় আটছে না কিছু। মূহুর্তেই পরিবেশ কেমন থমকানো।
“এই মেয়েটাকে কে এপোয়েন্ট করেছে? মিস্টার রাসেল? এই মেয়েটার চিরতরে জব করার এন্ড এই অফিসে পা দেওয়ার রাইট গুচিয়ে দিবেন। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু সি হার, নেভার এভার।” বলেই আবারও গটগট পায়ে শুভ্রতাকে নিয়ে নিজের কেবিনের দিকে গেল।
মিটিং রুমের পাশেই কেবিন৷ সকলে সেদিকে তাকিয়ে রইলো উন্মুখ হয়ে৷ গ্লাসের দেয়ালের ভিতরের দৃশ্য স্পষ্ট, ফকফকে সকলের সামনে। সেই সাথে তুমুল কৌতহল মনে। স্যারের ওয়াইফ? হাউউউউউ?
মেহরাদ শুভ্রতাকে এনে সোজা তার অফিস চেয়ারে বসালো। যেখানটাই সে বসে কোম্পানির সব তদারকি করে। নিজে ঠেস দিয়ে দাড়ালো শুভ্রতার সামনে কাচের টেবিলের সাথে৷ ঝুকে শুভ্রতার মাথার হিজাবের পিন গুলো খুলে দিতে দিতে বললো,
“এখনো কষ্ট হচ্ছে? বের করে দিয়েছি তো বেয়াদব মেয়েটাকে৷ আমার জানকে ইনসাল্ট করে! হাও ডেয়ার শী? তুই চাইলে মেয়েটার এগেইন্সটে কায়েসের কাছে ফাইল করে দেই একটা!”
শুভ্রতা চোখ বড় বড় করে মেহরাদের হাত চেপে ধরলো।
“পাগল হলেন? কিসব বলছেন? আমার কোন কষ্ট টষ্ট হচ্ছে না। আর কিচ্ছুটি প্রয়োজন নেই করার। বিদেয় হয়েছে এতেই সন্তুষ্ট আমি৷ আপনি ঠান্ডা হন।”
মেহরাদ ঠান্ডা হলো না। অস্থির ভঙ্গিতে শুভ্রতার মাথার হিজাবটা সড়িয়ে দিলো। টেবিলের উপর থেকে ট্যিসু নিয়ে শুভ্রতার তেল চিটচিটে নাকটা মুছিয়ে দিতে দিতে বললো,
“বাকি দুটো কই? আমায় জানাবে না, বাড়িতে না গিয়ে এদিকে আসছে? তাহলে তো আমি আরও আগেই মিটিং শেষ করে দিতাম। তোকে কষ্ট পেতে হতো? ”
শুভ্রতা ভুবন ভোলানো হাসি দিলো ঠোঁট চেপে । লোকটা কীসব করছে। বাহিরের স্টাফরাও অতিশয় আশ্চর্য। এই নরম কোমল পেশেন্টস স্যারকে তারা চিনে না। একদম না। আজ চিনলো শুধু।
মেহরাদের হাত শুভ্রতার মুখশ্রী হতে নেমে যাওয়ার আগেই শুভ্রতা হাত দুটো চেপে ধরলো গালের কাছটাতেই সাহস নিয়ে। মেহরাদ প্রগাঢ় চোখে চাইলো। গভীর সে চাহনি। সেই সাথে প্রশ্নের ঝাট৷
শুভ্রতা উপেক্ষা করলো ভিতরের সব অস্থিরতা আজ। তার মনে আজ প্রসন্নতা, ভালো লাগার দোলাচল। মেহরাদের হাতটা গাল থেকে ঠোঁটের কাছটায় টেনে নিতে নিতে ফিসফিস করে শুধালো,
“এ হাত দুটোতো সব সময় আমায় ছোঁয়ার জন্য না!” ঠোঁট চাপলো আলতো ভাবে। খুশি মনে। তার এতো ভালো লেগেছে! মেহরাদ ভাই মেয়েটার গায়ে হাত তোলেনি এতে! এই বুড়ি মেয়েকে মা’রার জন্য হলেও মেহরাদ ভাই ছুঁলে সে জ্বলে পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যেত নিশ্চিত!
মেহরাদ বুঝেছে শুভ্রতার বাক্যের মানে। হাসলো কিছুটা নিঃশব্দে। শুভ্রতার কপালের লেপ্টানো দু একটা চুল গুছিয়ে দিতে দিতে বললো,
“এগুলো সব সময় আমার ভালোবাসাকে ছোঁয়ার জন্য। আর আসল ভাবে তো এখনো ছু-ই নি। আরও কতো কাজ বাকি! ” দুষ্টমির আভাস কন্ঠে।
শুভ্রতা বুঝেও না বুঝার মতো রইলো। তবুও গাল দুটো বেঈমানী করলো কুছুটা লাল আভা ধারণ করে। এর মধ্যেই মেহরাদ আবারও বললো,
“খুব খারাপ লেগেছে তাই না? কত্তো বড় সাহস বি*চটার? আমার জানকে কষ্ট দেয়! ”
“কষ্ট পাচ্ছি কই? আপনি শান্ত হোন। আচ্ছা, আমাকে নামিয়ে আদনান ভাইয়া সোহানাকে নিয়েই আবার কোথায় যেন চলে গেল। একটু কল করে দেখুন তো!আমার তো মোবাইল নেই সাথে। ”
মেহরাদ কপালে ভাজ ফেললো। ওঁকে নিয়ে কোথায় গিয়েছে? চেয়ে দেখলো মোবাইল নেই তার কাছে। মিটিং এর আগে এসিস্ট্যান্ট কে দিয়েছিলো। ইন্টারকমে কল করে মোবাইল দিয়ে যেতে বললো। তার ধ্যান জ্ঞান সব আবারও শুভ্রতার উপর ন্যাস্ত করলো।
“এক্সাম কেমন হলো? ”
“ভালো হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। ”
“খাওয়া হয়েছে কিছু?”
শুভ্রতা এদিক সেদিক মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। পরিক্ষার পরিই এখাবে এসে পড়েছে। খাবে কখন?
মেহরাদ সময় দেখলো,প্রায় দুটোর উপরে বাজে। আবারও ইন্টারকমে কল দিয়ে লাঞ্চ নিয়ে আসতে বললো একেবারে। সে নিজেও লাঞ্চ করেনি।
“ওই যে রেস্ট রুম৷ ওখানে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আয়৷ লাঞ্চ নিয়ে আসতে বলেছি। এখুনি চলে আসবে।”
“উঁহু, এখন না। এখন না। বাসায় গিয়ে খাবো একেবারে।”
“বেশি কথা বলবি, মা’র খাবি। ফ্রেশ হতে যাহ। না-কি কোলে করে নিয়ে যাবো? ”
ছোট্ট একটা বাক্য! শুভ্রতার চেহারায় আবারও লাজেরা উঁকি ঝুঁকি দিতে শুরু করলো। তার সমস্যাই এটা। লোকটার অল্প স্বল্প কথাতেই সে কোপোকাত। সে নিজে উঠে পা বাড়ালো রেস্ট রুমের দিকে। এ রুমে আগেও গিয়েছে সে। সাদা ফকসকে বেড, কাবার্ড ,সব৷ চারদিকে সব কেমন ঝিলিক দিয়ে থাকে!
গা’য়ের হিজাবটা বেডে রেখে ক্রোস বেল্ট, কোমর বেল্ট গুলোও খুলে ফেললো শুভ্রতা। তারপর গেলো ওয়াশরুমে হাত মুখ ধুতে।
ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখলো মেহরাদ রুমে হাতে বাক্স। সেগুলো টি টেবিলের উপর রেখে তার দিকে তাকালো। শুভ্রতা আড়ষ্ট হলো। ঘুরে হিজাব খুঁজতে শুরু করলো।
মুখ ধোয়ার পানির ঝাপটাতে বুকের কাছটায় ভিজে গিয়েছে। এমনিতেই ভি শেপ নেক। তারউপর ভিজে লেপ্টে আছে। সে হিজাব হাতে নিয়ে জড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলো। নরম তুলতুলে বিছানা৷ আহা!কি আরাম!
মেহরাদ চোখে দেখে গেল সব। তারপর নিজেও হাত ধুয়ে বিছানার উপরই বসলো খাবার নিয়ে। শুভ্রতা উন্মুখ হয়ে বসে খেতে। তার ভাব টাবই এমন যে মেহরাদ খায়িয়ে দিবে সে টুপ গিলবে শুধু।
আসলে হলোও তাই, মেহরাদই খাবার মুখের সামনে ধরলো ওর। শুভ্রতা টুপ করে মুখে পুড়ে নিলো। হা হা, সে তো এটাই চেয়েছিলো।
দুজনেই খেয়ে নিলো একসাথে। হাত ধুয়ে এসে শুভ্রতার সামনে বসে পানির বোতলের মুখ খুলে শুভ্রতার হাতে দিলো। শুভ্রতা পানি মুখে পুড়েছে এ অবস্থায় মেহরাদ ভাবলেশহীন ভাবে বলে উঠলো,
“সাদার সাথে সাদা পড়তে হয়। পিংক আসলে যায় না। সামনে আড়াল করতে হলে ওড়না সামনে রাখতে হয় দুপাশে ফেলে রাখলে কি আড়াল হয়!।”
ফুস করে সব পানি মুখ থেকে বের হয়ে গেল বেচারির । শুভ্রতা কেশে উঠলো সাথে সাথেই। পানি তালুতে উঠে গেছে বোধহয়। কাঁশতে কাঁশতে মুখের পানি সব আবারও ফেলে পুরো ড্রেস ভড়ালো।
মেহরাদ এক হাতে তালুতে মৃদু চাপড় মারতে মারতে আরেক হাতে শুভ্রতার গা’য়ের পানি ঝাড়তে লাগলো। আওড়াল,
“রিল্যাক্স, রিল্যাক্স। ”
শুভ্রতা শান্ত হবে কি, অশান্ত হলো আরও। মেয়েটার নিশ্বাস আটকে যাওয়ার যোগার। ধাতস্থ হওয়ার আগেই উরঃদেশ বেয়ে পানি ঝাড়ানো মেহরাদের হাতটা চেপে ধরলো। খিঁচে নেওয়া চোখ দুটো আস্তে আস্তে ধাতস্থ হয়ে খুললো,
“এতোদিকে নজর দেন কেন,হে? চোখ দুটো আটকে রাখতে পারেন না? ”
“আটিকে রাখলে দেখবো কিভাবে? সামনে পিছনে, উপরে নিচের সকল অনিন্দ সৌন্দর্য তো আমারিই উপভোগ করার জন্য! ”
শুভ্রতা মেহিরাদের হাত ছেড়ে দিলো তড়িৎ। আবারও হিজাব ঠিক করলো পুরো পুরি। মেহরাদ আবারও উপরের দিকে হাত বাড়াতে যাবে শুভ্রতা তড়িৎ রসগোল্লার মতো চোখ করে হাত চেপে ধরলো। চোখের চাহনিতেই স্পষ্ট বুঝালো, আবার????
মেহরাদ ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে বললো,
“দেখি হাত ছাড়। হাতে মূল্যবান কিছুর ছোঁয়া আছে। এগুলো চলে যাবে না?” বলেই সন্তপর্ণে চুমু খেলো। দৃষ্টি স্থীর শুভ্রতার দিকে।
শুভ্রতার পা দুটো শিরশির করে উঠলো যেন শিহরনে। লোকটার চোখ দুটো যেন কত অনিন্দ বেলাগাম কথা বলে দিচ্ছে! শুভ্রতার কি সেগুলো বুঝতে বাকি আছে!
উঁহু নেই। একদম নেই। আর নেই বলেই সে থরথর করা পা নিয়ে নরম বিছানা থেকে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাড়ালো। তিন তলায় তারা। এখান থেকে মেইন গেট দেখা যায়। বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে বললো,
“সো…সোহানাদের খিবর নিয়েছিলেন? কোথায় ওরা?”
উঠলো মেহরাদও শুভ্রতার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঝুকলো হাত দুটো খোলা জানালার উপর চেপে। কাধের কাছে মুখ নিতেই শুভ্রতা আরেকটু চেপে আস্তে চাইলো। কিন্তু চেপেও আরও মিশে গেল মেহরাদের বক্ষপটে। মেহরাদও মুখটা এগিয়ে নিতে নিতে বললো,
“টেক্সট দিয়ে রেখেছে। লাঞ্চ করে আসবে ওরা। ফোন ধরেনি আমার।”
“ওহ।” শুভ্রতা আস্তে করে কোনরূপ আওড়াল শুষ্ক কন্ঠঃনালী দিয়ে।
“কি ব্যাপার? এতো অস্থিরতা কেন? আমিতো কিছু করিনি।”
“আপ…আপনি….”
“হু? আমি? হ্যাঁ, হাতে চুমু খেলাম যে? তাই? ”
“আপনার নজর ভালো না?”
“কেন, কোথায় বাজে নজর দিলাম?”
“এ-ই যে… ”
“কি যে…?”
“আমার দিকে আপনি আর ওভাবে তাকাবেন না।”
“কিভাবে তাকাবো না?”
“ওই যে একটু আগে দিলেন! সে নজরে। ভালো নজরে তাকাবেন।”
“ভালো নজর আবার কি? আমিতো ভালোবাসার নজর তাকাই। ” বলেই শুভ্রতার কাধে চুমু খেলো।
শুভ্রতা মুষড়ে উঠে বললো,
“এটাকে ভালোবাসার নজর বলে? লু*চু নজর বলে। আমি বুঝি না ভেবেছেন?”
মেহরাদ হেসে দাত বসালো আবারও। তারপর বললো,
“হ্যাঁ, পাগলিই পাগলকে চিনতে পারে৷ এই যেমন তুই লু*…….”
শুভ্রতা নিজের কথার ফাসে নিজে আটকে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কেমন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে শুনিয়ে দিলো!
“আপনি আমায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অপমান করলেন?”
“কোথায় অপমান করলাম? এটাতো সম্মান। তোর জ্ঞানের প্রশংসা। ”
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫
“এ্যাহ্! এটাকে সম্মান বলে? আমি বুঝিনা ভেবেছেন? ”
“নাহ, তোকে কোলে নিয়ে বললে সম্মান বুঝাতো?”
“ইশশ! আপনার দেওয়া সম্মানে তো আমার পা মাটিতেই পড়ছে না ! ” ব্যাঙ্গ করে বললো শুভ্রতা।
“আচ্ছা, মাটিতে পড়তে হবে না৷ কাধে উঠিয়ে রাখবো। ঠিকাছে??”
এ-যাত্রায় শুভ্রতার সকল বুলি উঁড়ে গেল। এতো সম্মান তো সে চায় না! সে বাবাহ এমনিই ভালো! মৃদু আওয়াজ করে বার কয়েক আওড়ালো,
“নির্লজ্জ নির্লজ্জ নির্লজ্জ….. ”
