হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৮
সাঞ্জেনা শাজ
ঠিক দু’দিন পর দ্বীপের খোঁজ পাওয়া গেলো। সেদিন রাতে বুকফাটা হাহাকার নিয়ে মা’য়ের কবরের কাছে গিয়েছিল, গ্রামে। সেখান থেকেই আসার পথে উদ্ভ্রান্তের বাইক চালাতে গিয়ে এক্সিডেন্ট ঘটিয়েছে। গ্রামের মানুষ গুলো সেখানের উপজেলার এক হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে রেখেছিলো। পর পর দু’দিন ভালো করে কোন হুশ জ্ঞান ছিলো না দ্বীপের।
গত দু’দিন যাবৎ সেখানে ভর্তি থেকে আজ ছেলেকে ঢাকা নিয়ে এসেছেন দ্বীপের বাবা। বিজনেসের কাজে দেশের বাইরে ছিলেন ভদ্রলোক। ছেলের দুশ্চিন্তায় পাগলপ্রায় হয়ে ছেলের বেখবরের কথা শুনে তৎক্ষনাৎ দেশে ফিরে খোঁজে বের করেছেন ছেলেকে। ভদ্রলোক বড়োই অমায়িক মানুষ। স্ত্রী বিয়োগের পরেও দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করেন নি। এক ছেলেই জীবন। মেয়ের বিয়ের পর থেকেই বাবা ছেলেই দু’জন দু’জনার সঙ্গী বলা চলে। তার ছেলেটা বড়াবড়ই মা’য়ের নেউটা ছিলো, বুকে দুঃখ কষ্ট জমলেই মা’য়ের কাছে এসে শান্ত হয়।
সেই আন্দাজই গ্রামে খবর নিয়ে জেনেছেন ছেলের এ দুরবস্থার কথা। অসহায় তিনি ছেলের দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছেন একদম।
মেহরাদ যখন দ্বীপের খবর পেলো তখন পূব আকাশে লালিমার আস্তরণ। সত্যিই বলতে তার নিজেরও বেশ দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো ছেলেটার জন্য। তাই যখন খবর পেলো তৎক্ষনাৎ সকল কাজকর্ম ছেড়ে ছুড়ে হাসপাতালে ছুটলো।সাথে আদনানকেও নিয়ে নিলো।
মেহরাদকে হাসপাতালে দেখে দ্বীপের বাবা যেন অনেকটাই স্বস্তি পেলেন। বুক ভরে শ্বাস টানলেন। বিপদের সময় দূরের মানুষগুলোও খুব আপন হয়ে যায় কখনো কখনো। সেখানে তালুকদার বাড়ির বড়ো ছেলেকে কে না চিনে! সকলেরই মেহরাদ তালুকদার সম্পর্ক জানা। তিনি মেহরাদকে দেখে তাদের দিকে এগিয়ে যেতেই মেহরাদ উদ্বিগ্ন নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আসসালামু আলাইকুম আংকেল। দ্বীপের কি অবস্থা এখন? আমি চেষ্টা করছিলাম ওর খোঁজ নেওয়ার জন্য। কিন্তু কোন খোঁজ ই পাচ্ছিলাম না।”
ভদ্রলোক ব্যাথাতুর দ্বীর্ঘ শ্বাদ ফেললেন। আক্ষেপ মিশ্রিত স্বরে বললেন,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম বাবা। হাতে ফ্র্যাকচার হয়েছে। সাড়তে সময় লাগবে জানালো ডাক্তার। তবে আজ বাসায় নিয়ে যেতে পারবো জানালো ডক্টর। ”
আদনান জিজ্ঞেস করলো,
“ওর এক্সিডেন্ট কোথায় হয়েছিলো আংকেল? ”
“গ্রামের দিকে। সেখানেরই হাসপাতালে ভর্তি ছিলো দু’দিন।”
“আমরা দেখে করতে যাবো ওর সাথে? ডক্টর এলাও করবে?” মেহরাদ জিজ্ঞেস করলো নমনীয় কন্ঠে।
ভদ্রলোক আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ছেলের দুশ্চিন্তায় অনেকটাই ভেঙে পরেছেন। অসুস্থ লাগছে দেখতে। মেহরাদ ওনাকে নিয়ে বসলো ওয়েটিং চেয়ার গুলোতে। বড়ো ছেলের মতো ওনার একটা হাত হাতের মুঠোয় পুরতেই তিনি ব্যাথাক্লিষ্ঠ কন্ঠে বললেন,
“ছেলেটা আমার সাথে কথা বলছে না, বাবা। জ্ঞান ফেরার পর থেকে একটা শব্দও বলেনি। আমার ও ছাড়া কেউ আছে বলো? কতো আশা নিয়ে একটা আবদার করেছিলো সেই কবে, কিন্তু আমি গুরুত্ব দেই নি। তাই বলে এই কষ্ট উপহার দিবে বাবাকে? ও ছাড়া আমি আর কি নিয়ে থাকবো বলো! ”
“আমি দেখছি আংকেল। আপনি কষ্ট পাবেন না প্লিজ। আমি কথা বলছি ওর সঙ্গে। ”
“হ্যাঁ, বাবা একটু কথা বলে দেখো না। ও যা চাওবে সব হবে। তবুও বলো যেন আর কখনো এরকম পাগলামো না করে। “”
“ও কি চেয়েছিলো আংকেল? আপনি নিষেধ ই কেন করেছিলেন? আমাদেরব ত বলতে পারতো ছেলেটা!” আদনানের কন্ঠে উপচে পড়া আক্ষেপ।
দ্বীপের বাবা আলগোছে মেহরাদের দিকে তাকালো একবার। ছেলের জন্য হাহাকার নিয়ে বলে উঠলো,
“তালুকদার বাড়ির এক রত্নকে চেয়েছিলো। ছেলের নিছকই ছেলেমানুষী আবদার ভেবে গ্রাহ্য করিনি আমি। এমন যুগে কেউ তার থেকে বয়সে বড়ো কাউকে ভালোবাসে বলো? সমাজ মানবে? সবচেয়ে বড়ো কথা, বিপরীত পক্ষ মেয়েকে দিতে চাইবে বয়সে ছোট ছেলের কাছে? আমি টালবাহানা করে এড়িয়ে গিয়েছি।
বুঝিনি ওর ভালোবাসার গভীরত্বটা। ছেলেটা মাঝেমধ্যে সুযোগ পেলেই হাসিঠাট্টা করে বলতো, ‘বাবা তোমার ছেলের বউ কিন্তু দেখা আছে। দ্রুত প্রস্তাব পাঠাও তালুকদার বাড়ি। আমি গিয়ে বউ নিয়ে আসি। ‘ আমি গুরুত্ব দেই নি সেই কথাগুলোই। কিন্তু ছেলে যে এতে অভিমান পুষেছে তা কি করে বুঝবো আমি! আজ ছেলে অভিমান ভেঙেছে, মুখ ফুটে শুধু জানিয়েছে সে হেরে গিয়েছে। তার ভালোবাসা অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে।। ছেলের কাপা কন্ঠ শুনে, আমার বুক ভেঙে এসেছে বিশ্বাসকরো? কিন্তু এখন আমার হাতে কিছুই করার নেই। আমি শুধুই এক ব্যার্থ বাবা তার সামনে। সমাজ, মানুষের কথা ভেবে ছেলেকে নিঃশেষ করে দিলাম। আমার ছেলেটা কি ক্ষমা করবে কখনো আমায়? ”
আদনানের মাথার উপর দিয়ে গেলো সব। সে আশ্চর্য চোখে মেহরাদের দিকে তাকিয়ে। তালুকদার বাড়ির কোন মেয়ে? শান্তা? শান্তাকে দ্বীপ ভালোবাসে! আল্লাহ!
মেহরাদ মুখশ্রীতে গম্ভীরতা লেপ্টে।এ বিষয়ে উনাকে শান্তনা দেওয়ার মতো কোন অভিব্যক্তি তার মধ্যে দেখা গেলো না। সে আলগোছে উঠে দাঁড়ালো বসা হতে। দ্বীপের সাথে দেখা করাটা জরুরি। চারদিকের সকল ঝামেলা গুলো খুব দ্রুত হ্যান্ডেল করতে চাচ্ছে সে। সময় খুব কম হাতে। সে রাশভারি কন্ঠে দ্বীপের বাবার উদ্দেশ্যে বলল,
“দ্বীপ সম্পূর্ণ ভুল জানে আংকেল। মিসয়ান্ডার্স্টেন্ডিং হয়েছে। আমি বলবো, আপনি যদি আপনার ছেলের উর্ধে সমাজ দেখেন তাহলে আমার কিছুই বলার নেই আংক।এটা সম্পূর্ণ আপনার দৃষ্টিভঙ্গী, মতামত। তবে আমাদের দিক বিবেচনা করে এগোতে না চাইলে বলবো, আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তালুকদাররা কখনোই কাউকে ফেরায় না। সাধ্য মতো সকলকেই আপন করে নেই। যেখানে শরিয়তের সম্মতি আছে সেখানে সমাজ কি! আপনার আমন্ত্রণ রইলো আগামীকালের। আসবেন। এসে আমাদের আতিথেয়তা গ্রহন করবেন। দ্বীপের সাথে দেখা করে আসি। ভালো থাকবেন। ”
দ্বীপের সাথে দেখা করে আরও বেশ কিছু কাজ শেষ করে বাড়িতে পৌছাতে পৌছাতে রাত প্রায় দশটা বেজে গেলো মেহরাদের। প্রথমেই মা বাবা সহ সকলকে জানালো দ্বীপের কথা। সে সাথে আদনানের পরিবারকেও আসতে বলেছে তা-ও জানালো।
আলতাফ তালুকদার প্রথমেই এক বাক্যে না করে দিলেন দ্বীপের বিষয়ে। আমজাদ তালুকদার ভাইয়ের সাথে একমত। মেহরাদ অতিশয় শান্ত স্বরে বাবাকে বলল,
“নিষেধ কেন করছো? দ্বীপের ফল্ট কোথায়? ছেলে হিসেবে অযোগ্য ও?”
“তুমি বুঝতে পারছো না মেহরাদ। ওর বয়স কম, আজ ভালোবাসে বলছে, দু’দিন পর বয়স বাড়ার সাথে সাথে সব শেষ হয়ে গেলে? আমাদের মেয়েটার কি হবে? আমি কিছুতেই মত দিবো না এতে। তাছাড়া সমাজের লোক কি বলবে? আমরা একটা সোসাইটিতে বসবাস করি মেহরাদ!”
“সোসাইটি মাই ফুট! সোসাইটি কি বাবা? সোসাইটি দেখে আমরা জীবন নির্বাহ করবো না বাবা। মনে রেখো, সোসাইটি আমাদের তৈরি করে নি, আমরাই সোসাইটি তৈরি করেছি। সেই সোসাইটির দোহায়ে নিজেদের বন্দি করে রাখা, দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে যাওয়ার কোন মানে নেই। ওরা দু’জন দু’জনকে ভালোবাসে এর বেশি কি চাও তোমরা? যে ছেলেটা ওর বিয়ের কথা শুনে ম’রতে ম’রতে বেচে এসেছে তার ভালোবাসার ডেফিনিশন কি দিয়ে দিবো আমি তোমাদের? “”
ছেলে হিসেবে দ্বীপ মোটেও খারাপ নয়। যথেষ্ট ভদ্র সভ্য ছেলে। শুধু একটু দাপট গিড়ি দেখায় এলাকায় বাইক চালিয়ে। টাকার পাওয়ার আর কি! এ বয়সে এমন হ’ই।তার মানে এই না যে ছেলে খারাপ। এতে ছেলে খারাপ হলে তো তার নিজের ছেলেই সবচেয়ে বড়ো মাস্তান! এ দ্বীপ থেকেও দশ গুন উপরে!
মনে মনে এসব ভেবে নির্মল কন্ঠে ছেলেকে জানালেন আলতাফ তালুকদার,
“আচ্ছা আসতে বলেছো যেহেতু আসুক। আমরা কথা বার্তা এগিয়ে রাখি! জীবন তো সবেই শুরু! প্রয়োজন হলে আংটি পড়িয়ে রাখুক! আদনানদেরও না-হয় তা-ই বলি…”
“এরকম হলে প্রয়োজন নেই। নিষেধ করে দিবো আসতে তাহলে। এসব আংটি টাংটি নাটক ঝুলিয়ে লাভ নেই। হারাম সম্পর্কে জড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই। যেদিন তোমাদের সম্মতি থাকবে জানিয়ো, তখন না-হয় আকদ করিয়ে রাখবে। ভালোবাসলে অপেক্ষা করা কোন আহামরি কিছু নয়। অপেক্ষা করুক! ” বাবাকে স্ব’দাপটে থামিয়ে নিজের বাক্য উপস্থাপনা করলো মেহরাদ। মুখশ্রী অতিশয় গম্ভীর। দুই কর্তি কেবল একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছে। বাড়ির ছোট সদস্যরা এখানে অনপুস্থীত।
ছেলেটার গমগমে গলায় আওয়াজের পিছনে আলতাফ তালুকদার নাখোশ চিত্তে কপাল গোটালেন। বললেন,
“তোমার সব কথাই তাহলে থাকুক বাবা! আমাদের আর জিজ্ঞেস করছো কি? তুমি করো তোমার মতো করে সব! দিয়ে দাও দু বোনকে বিয়ে! রোজার সময়েও তো নিজেই মাতব্বরি করলে, আরেকজন তো না জানিয়েই বিয়ের কাজ সম্পন্ন করেছো। এখনেও নিজেদের আহামরি কোন গুরুত্ব আমার চোখে পড়ছে না বাবা। ”
মেহরাদ বাবার দিকে গম্ভীর চোখেই তাকিয়ে রইলো। তাকে যে অপমান করছে বেশ বুঝছে সে। তবুও বিনা বাক্য ব্যায়েই জানালো,
“তাহলে সে কথাই থাক, আগামীকাল ওনারা আসলে দিন তারিখ ঠিক করে রাখো। শুক্রবার দিন আমাদের ফ্লাইট আছে। জানোই তো, সময় নেই হাতে। আমি ছাড়া তোমাদের এসব হ্যান্ডেল করতে ঝামেলা হয়ে যাবে। তাই সময় নষ্ট করতে নিষেধ করছি।’
ছেলের কথায় এবার মন খারাপ করলেন জাহানারা বেগম। তবে ভালোও লাগছে। বেশ কিছুদিন যাবৎ’ই শুভ্রতাকে দেশের বাহিরে ট্রিটমেন্ট করানোর জন্য ভিসা প্রসেসিং করছে ছেলেটা,সকলেরই জানা। এখন সব ঠিক ঠাক হয়ে এসেছে। শুভ্রতা সুস্থ হয়ে যাবে ভেবে আনন্দে লাগছে, আবার বাড়িটা খালি খালি হয়ে যাবে সেটা ভেবেও মন খারাপ হচ্ছে তাদের।
আলতাফ তালুকদার এবার আর ছেলের সাথে তেছড়া স্বরে কিছু বললেন না। ছেলের দায়িত্বজ্ঞান প্রবল এটা তার জানা। স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলেন,
” কবে আসা পড়বে তোমাদের?”
“দেখি কতদিন সময় নেয় ডাক্তার! একেবারে সব কমপ্লিট করেই আসবো। ”
“তাড়াতাড়ি চলে আসবি কিন্তু, বাবা? আমাদের ত তোদের ছাড়া একদম ভালো লাগবে না ” বাচ্চাদের মতো ছেলের কাছে আর্জি করলেন জাহানারা বেগম।
মেহরাদ ওঠে গিয়ে মা’কে জড়িয়ে ধরলো। তার মা টা এতো উইক তাকে নিয়ে! গম্ভীরতা হাটিয়ে কন্ঠে মমতা টেনে জানাল,
“খুব শিগগিরই চলে আসবো, মা।দোয়া করো যেন সব ঠিক হয়ে যায় দ্রুত।”
“হ্যাঁ রে মেহরাদ, শুভ্রতাকে জানিয়েছিস তো যাওয়ার ব্যাপারে?” সুরাইয়া বেগম জিজ্ঞেস করলেন স্বন্দিগ্ধ স্বরে।
“ওকে আজ জানাবো ফ্লাইটের কথা। তোমরা এ বিষয়ে টেনশন না করে আগামীকালের জন্য আয়োজন করো। সব কিছু যেন ঠিম ঠাক হয়ে যায়। তোমাদের কোন আপত্তি নেই তো মেজো মা? মেজো বাবা?”
স্বামী দু’জনেই মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালেন। মেয়েদের খুশির উপর উনারা কখনোই হস্তক্ষেপ করেন না। তারউপর ছেলে তো মা শা আল্লাহ যথেষ্ট ভালো। এমন দিনে চেনাপরিচিত এরকম হাতের ছেলে পা’ই বা ক’জন!
শুভ্রতা গাল ফুলিয়ে ঢোল বানিয়ে শুয়ে আছে রুম অন্ধকার করে। সে আজ দেহে শাড়ি চড়িয়েছিলো স্বামীর রাগ ভাঙ্গাতে। শুক্রবারে পর থেকে মেহরাদ আর তার মধ্যে সুক্ষ্ম একটা রাগের আচ নীরবে তাদের দুজনের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে হয় শুভ্রতার। লোকটা দু’দিন হবে তাকে একটু আদর করে ছুয়ে দিচ্ছে না। শুভ্রতার ত জান যায় যায় অবস্থা! যতই লজ্জা পাক,ভালোবাসার মানুষের আদুরে ছোয়া গুলো তার বেশ পছন্দের। অনেকটা বেশিই।
তাই আজ নিজ উদ্যোগে স্বামীর রাগ ভাঙ্গিয়ে আদর নেওয়ার জন্য শাড়ি চড়িয়েছিল বেচারি। কিন্তু আফসোস, আজ ভদ্রলোকের রুমেই বোধহয় আসতে ভুলে গিয়েছে।
রাত এগারোটা বেজে গিয়েছে, আসার কোন নাম গন্ধ না পেয়ে মেয়েটা এবার নাক ফুলালো। চিকন নাকের পাটা ফুলে ফেপে উঠলো বেশ কয়েকবার। তিরতির করে কাপছে কৃষ্ণচূড়ার লালিমায় রাঙ্গানো ওষ্ঠ যোগল। মেয়েটা সেভাবেই শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকারে উপরের দিকে তাকিয়ে রইলো। সে দেখবে আজ লোকটা ঠিক কোন সময় রুমে আসে।
মেহরাস রুমে আসলো বারোটার কাছাকাছির দিকে। রুম অন্ধকার দেখে লাইট আর অন করলো না। নিজের মতো ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার নিয়ে বের হলো। পরনে শুধু ঢিলে ঢালা ট্রাউজার জড়িয়ে, কোনরকম বিপদ সীমার উপরে। এলোমেলো হাতে ভেজা তুলে তাওয়ালে চালিয়ে অন্ধকারেই সোফায় ছুড়ে মা’রলো কাউচের দিকে আন্দাজে। বিছানায় অবস্থিত রমনী যে এখনো নির্ঘুম ব্যাপারটা সম্পূর্ণ তার জানা। তবুও বিন্দুমাত্র কনসার্ন দেখালো সে সেদিকে। নিজের মতোই অবিন্যস্ত ভেজা চুলে আঙুল চালিয়ে দন্ডায়মান অবস্থাতেই ঝুকে ল্যাপটপটা অন করলো একটা মেইল চেক করবে।
বিছানায় লেপ্টে থাকা অষ্টাদশীর নাজুক তনু প্রকম্পিত হচ্ছে অস্থির নিশ্বাসের প্রবাহে । নিয়ন্ত্রনহীন ঘোড়ার মতো ছুটছে ভেতরের অবাধ্য যন্ত্রটা। এতক্ষনের ভেতরার সুপ্ত অভিমান ছাপিয়ে সেখানে আধিপত্য গেড়েছে মুগ্ধতা, বিমোহিতা।চারপাশের অন্ধকারকে ম্লান করে ল্যাপটপের কৃত্রিম জোছনায় সম্মুখের দন্ডয়মান মানবের তীক্ষ্ণ নাক, চিবুক আর চোখের চাউনিকে প্রদীপের মতো ফুটিয়ে তুলেছে তার অন্তস্থলে।
বুকে ঝর বয়ে যায় শুভ্রতার তীব্র অনুভূতির। চেনাজানা শিহরণ ছুয়ে দেয় দেহের প্রতিটি লোমকূপ। কাছে না এসে এভাবেও কাউকে নিজের জন্য ব্যাকুল করা যায়! নিজের বেহায়া, বেলাগাম চোখ গুলোকে আচ্ছামত বকাঝকা করে শুভ্রতা। এতটা অবাধ্য এরা কবে হয়েছে! তার এখন উচিৎ লোকটার উপর কঠোর রাগ হওয়া। কিন্তু তার নির্লজ্জ চোখ, অবাধ্য অনুভূতি গুলো হতে দিলে তো!
মেয়েটা অস্থির শ্বাস ফেলে। কণ্ঠনালী শুকিয়ে তাপদাহ বের হচ্ছে দু’কান ধেয়ে । ব্যাকুল শ্বাস প্রশ্বাসের খেলায় উঠানামা করছে ধনুকের মতো বাকানো সুডৌল উপত্যকা দুটো । এতটা অস্থিরতা কেন অনুভব হচ্ছে! এসির নিচেও মাথা যেন ভনভন করছে। দু’চোখকে শাসিয়ে নাজুক দেহটাকে টেনে ওপাশ ঘুরে গেলো মেয়েটা। বেহাল শাড়ির কল্যাণে পৃষ্টদেশের সামান্য আবরনটুকু শুভ্র পেলব অংশটুকু ঢেকে রাখিতে অপারগ। মেঘের মতো কেশরাশি গুলো বিছানায় লেপ্টে এলোমেলো কায়দায়। মেয়েটা কুজু হয়ে আসে, দু বাহু
আকড়ে ধরে গুটিয়ে যায়৷
মেহরাদের চলন্ত আঙুল জোড়া থেমে গেলো অস্পষ্ট আওয়াজে। ঘার বাকিয়ে কাধ বরাবর দৃষ্টি ফেলতেই ল্যাপটপের আঙুল গুলো কি একটু বেশিই দেবে গেলো! দৃষ্টি থমকালো বোধহয় বিছানায় লেপ্টে থাকা নাজুক রমনীর সিংহভাগ উন্মুক্ত মসৃন পৃষ্টদেশে। সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটুকু মস্তিষ্ক জমাট বাধিয়ে দিতে সক্ষম যেন। শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত প্রবাহিত হতেই টানটান হয়ে দাড়ালো মেহরাদ। ল্যাপটপের স্ক্রিনটা অন রেখেই দু’হাতের এলোমেলো ভঙ্গিতে অর্ধ ভেজা চুল গুলো ঠেলে দিলো পিছনে। তপ্ত শ্বাস ঝেড়ে মনে মনে আওড়াল,
“এতো চালাক কবে হয়ে গেলো মেয়েটা? ”
সে ল্যাপটপ সচল রেখেই বিছানার দিকে এগিয়ে গেলো। বিছানায় হাটু গেড়ে উঠতেই শুভ্রতা আরেকটু গুটিয়ে গেলো। ভেতরের অস্থিরতার পারদ আকাশ ছুয়েছে ততক্ষণে মেয়েটার। যে সাহস নিয়ে নিজেকে সাজিয়েছে লোকটার জন্য তা এখন শূন্যের কোঠায়। খুব করে ঘুম বাবাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইছে। কিন্তু বেয়াদপব ঘুমটা আজ তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে। অনুভূতির জোয়ারে তোলপাড় রক্তচলাচলের ধরুন পাল্লা দিয়ে বারছে নাজুক দেহের তাপমাত্রা।
মেহরাদ জানে শুভ্রতা সম্পূর্ণ জেগে। মেয়েটা কি তাকে নিশ্বাস আটকে মা’রতে চায়! এহেন সাজসজ্জার মানে কি! সেদিন না পায়ে ব্যাথা পেলো! মেহরাদ এতো ধৈর্য, সংযম কার জন্য করে! সে দু হাটু গেড়ে বিছানায় উঠতেই অর্ধ দন্ডায়মান অবস্থাতে সহনশীলত দৃঢ়তায় শুভ্রতার বাহু টেনে নিজের দিকে করলো। মূহুর্তেই আবারও সেই অস্পষ্ট আওয়াজটা কর্নকুহোর হলো মেহরাদের। দু’চোখের দৃষ্টি স্থীর। অপার্থিব দৃশ্যের মোহে বিমোহিত হলো দু’ নয়ন। চারিপাশে মো মো করা নারীদেহের সুব টুকু সুভাস বুক ভরে টেনে নিয়ে অস্থির শ্বাস ফেললো সে। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে গ্রীবা বাকিয়ে শুভ্রতার দিকে ঝুকতে ঝুকতে হাস্কিস্বরে আওড়াল,
“এটা কি আমার জন্য? আমার জন্য হলে একদম ভালো করিস নি শুভ্রা। তোকে আবারও ব্যাথা পেতে হবে ভেবে আমার কষ্ট হচ্ছে। বাট আ’ম আ’ম…”
তৎক্ষনাৎ দু’চোখ খিচে নিলো লাজুক অষ্টাদশী। তলপেটের নাম না জানা প্রজাতিগুলো আজ বড্ড বেসামাল ভাবে হয়রান করছে তাকে। কৃত্রিম রাঙা ঠোঁট দুটো চেপে নিলো মুখের ভেতরে। হৃদয়ের লাভডাভ কম্পন ছড়িয়ে পরছে সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে। প্রকম্পিত হচ্ছে নাজুক তনু।
মেলে রাখা ল্যাপটপের কৃত্রিম আলোয় রুমে মৃদু আলোর ঝলকানি। শুভ্রতাকে বেশ ভালো ভাবেই দেখছে মেহরাদ। এলোমেলো শাড়ীর আঁচল কোন রকম জড়িয়ে। গমরঙা পেলব উদর উন্মুক্ত। শুভ্রতাকে ছুতে তার কোন দ্বীধা নেই। কোন কালেই ছিলো না। তাই অনবিবিলম্বে বরফ শীতল বলিষ্ঠ হাত খানা বাকানো কটিদেশ আকড়ে ধরলো। মূহুর্তেই সেই অস্পষ্ট আওয়াজের উৎস ধরে ফেলিলো। একটা কপট হাসি খেলে গেলো ছেলেটার অধরের বাকে।
শুভ্রতা শিউরে উঠলো হাতের শীতলতায়। শিহরণে লোমকূপ দাড়িয়ে গেলো দু’বাহুর। বেসামাল অনুভূতির লাগামে মেয়েটা আরেকটু খিচে নিলো চোখ মুখ। লোকটা নিশ্চিত বুঝে ফেলেছে তার উদ্দেশ্য। তখন খুশি মনে সব করলেও এখন লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে মন চাচ্ছে মেয়েটার।
মেহরাদ যেন বুঝলো বউয়ের মনস্কামনা। হাতের প্রগাঢ়তা বাড়িয়ে এগিয়ে গেলো দম খিচে রাখে রমনীর কানের কাছে। ফিসফিস করে জানালো,
“এতো লজ্জা পেতে হবে কেন? সী? আ’ম টু মাচ হ্যাপি! সারাদিনের ক্লান্তি অবসাদ তোকে দেখতেই ভ্যানিস হয়ে গিয়েছে। ম্যাজিক হাহ!”
শুভ্রতা আটকে রাখা দম ছাড়লো। মেহরাদের শান্ত আদুরে স্বরে মেয়েটার হৃৎপিণ্ডের অসহ্য লাফালাফি একটু আয়ত্তে আসছে। দু’চোখের পাতা ঝাপটিয়ে মেলে ধরতেই মেহরাদের দৃষ্টিতে দৃষ্টি আটকালো। ঘোর ওই দু’চোখের চাহনিতে তার নারীদেহ আবার নেতিয়ে আসতে চায়। মেয়েটা অস্ফুটে স্বামীকে জিজ্ঞেস করএ,
“আপনার রাগ কমেছে? ”
“আমি রাগ করেছি! কখন!” আশ্চর্যতা মেহরাদের কন্ঠে। গত দু’দিনের কাগজপত্র প্লাস দ্বীপের জন্য ছুটাছুটিতে মেয়েটাকে একটু সময় কম দেওয়া হয়েছে। ও কি ভেবেছে সে রাগ করেছে! মনে মনে হেসে উঠলো সে। রাগ ভাঙ্গানোর এতো সুন্দর অভিনব পন্থা হলে সে রোজ বউয়ের রাগ ভাঙ্গানো উঠভোগ করতে চায়। একদম শতভাগ।
এদিকে শুভ্রতা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। এ লোক রাগ করেনি! সে উল্টো ভাবলো, যে শাড়ির জন্য রাগ করেছে
সে শাড়ি পরেই রাগ ভাঙ্গাবে। তাই শাড়ি হাতড়ে গিয়ে মেহরাদের দেওয়া ওয়েস্ট চেইনটাও জড়িয়েছে কোমড়ে।
নিজের জন্য লোকটার চোখে, ঘোর মুগ্ধতা দেখেও শুভ্রতা এক জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে অনায়াসে।
“তাহলে দু’দিন আপনি একটুও ভালোবাসেন নি আমায়। তাহলে কি আমি ভাববো না আপনি বোধহয় রাগ করেই আছেন আমার উপর! তা-ই তো….” মেয়েটার দু’গাল ফুলেফেঁপে উঠলে আহ্লাদী মিছে অভিমানে। সখের পুরুষের কাছে সে বরাবরই ছোট্ট বালিকা। অকপটে সব বলতে পারে। আদর চাইতে পারে, আহ্লাদী হতে পারে।
মেহরাদ ওঁকে মাঝ রাস্তাতেই থামিয়ে বলল,
“ব্যাস্ত ছিলাম। দ্বীপের জন্য দুশ্চিন্তায় ছিলাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে তুই ঘুমিয়ে যেতি। রাগ কখন হবো! আদর’ই কখন করবো! সমস্যা নেই,আজ পুষিয়ে দিবো হু?” বলেই রাঙা ওষ্ঠ জোড়ায় ঠোঁট ছোয়ালো। আবারও ছেড়ে দিলো। পরপর জানালো,
“শুক্রবার দিন ফ্লাইট সিঙ্গাপুরের। আমাদের বেশ কিছুদিন সেখানেই থাকা হবে। ডক্টরের ওখানে সব স্যাটেল করা।”
শুভ্রতা চুপ করে গেলো। হটাৎ করেই অন্যমনস্ক হয়ে গেলো যেন মেয়েটা। অস্ফুট স্বরে কেবল বলল,
“ওহ।”
তার জানা তাদের যাওয়ার কথা। কিন্তু কবে সেটা জানতো না। সে ভেবেছিলো দেরি হবে বোধহয়। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি হওয়ায় একটু যেন খারাপ ই লাগলো তার। সকলকে ছেড়ে যেতে তার একটুও ভালো লাগলো না।
মেহরাদ ওর মন খারাপ আন্দাজ করে আবারও ঠোঁট ছোয়ালো কপালে। গাঢ় স্বরে বলল,
“এই বুদ্ধি কার থেকে নেওয়া হয়েছে শুনি ম্যাডাম? ”
শুভ্রতার অন্যমনস্কতা যেন ভাঙ্গলো। লাজুক হেসে অকপটে জানালো,
“মেয়েরা তাদের সখের পুরুষের জন্য এগুলোতে সব সময়’ই পারদর্শী। আর আপনার জন্য তো আমি পুরোই দিওয়ানা….” তার কন্ঠে নিজের জন্যই নিজের বাহবা।
মেহরাদ হেসে ফেললো, শব্দহীন হাসি। দাত দ্বারা অধর পিষে দু ভ্রু উচাতেই শুভ্রতা তৎক্ষনাৎ শাসিয়ে বলে উঠলো,
“এ…এরকম কিরবেন না একদম। আপনার এ লুকটা আমার দুনিয়া তোলপাড় করে। পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে তকমা টা তখন আপনার গা’য়ে ছুড়ে দিতে মন চায়। এরকম করে ঠোঁট…. ”
আগ্রাসী ঠোঁটের ধমকে কথা মাঝপথেই আটকে গেলো মেয়েটার। তোতাপাখির এতো আদুরে কথায় ধৈ,র্য সংযম দুটোই শিকোয় তুলেছে মেহরাদ। অস্থির শ্বাস প্রশ্বাসের খেলায় প্রেয়সীর কোমল ওষ্ঠজোড়া নিজ আধিপত্যে। আরেকটু টেনে মেয়েটাকে নিজ বরাবর করে নিলো। দু’হাতের অবিন্যস্ততায় বেহাল দশার শাড়ি এবার বলিষ্ঠ মানবের ধৃষ্টতায় ফ্লোরে লুটোপুটি খাচ্ছে।
সরু দু হাতের বাধা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করছে সে। শুভ্রতা হাপিয়ে উঠেছে। নিজেকে ছাড়াতে মরিয়া। কিছু বলতে চায় সে। লোকটা সুযোগ ই দিচ্ছে না। এতো অধৈর্য!
শুভ্রতার আকুতি বুঝি বুঝলো মেহরাদ। এক হাতের মুঠোয় মাথার উপর বিছানায় চেপে ধরএ মেয়েটার সরু দু’হাত। দু’ঠোঁট ফুলে উঠেছে দূশ্য মানবের ছোয়ায়। সুযোগ পেয়ে শুভ্রতা কোনরকম জিজ্ঞেস করলো,
“এতো অধৈর্য আপনি! একটু বলতে দিবেন তো কিছু!”
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৭
“দ্রুত বল। ফাস্ট…..” উপচে পড়া বেপরোয়া উন্মাদনা তার কন্ঠে। নাকে মুখে মৃদু গুঞ্জন তুলে আবারও মুখ ডোবালো মেয়েটার কমনীয় গ্রীবায়। এরপর শুভ্রতা তোতাপাখির মতো কি আওড়াল তার কানে কম’ই গেলো। বেপরোয়া ধমকে গ্রাস করে নিলো প্রেয়সীর সমস্ত অনিন্দ্য সৌন্দর্য টুকু। এহেন উন্মাদনার কবলে মেয়েটা সব ভুলে স্বামী নামক প্রণয় পুরুষের নিকট নিজেকে সপে দিলো। একজোড়া প্রেমিক যুগোলের ভালোবাসার মধুরলগ্নে প্রকৃতির নির্মল বাতাবরণ যেন খুশিতে পুলকিত হেসে উঠলো। তাদের নিবিড় প্রণয়ের জোয়ারে ব্যাকুল হয়ে রুক্ষ ধরিত্রীর বুকে নেমে এলো কাঙ্ক্ষিত মেঘমল্লারের ঝড়ো বৃষ্টি। প্রেমিক যুগোলের প্রণয়াচ্ছ্বাসের ন্যায় দমকা হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড চারিধার।
