Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১১

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১১

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১১
সাবা খান

সময়ের চাকা ঘুরে গেছে প্রায় এক মাস। ঐদিন আরজের পায়ের আওয়াজ শুনে থমাস আরজের রুমের সামনে থেকে সরে গিয়েছে। যার কারনে আরজে এসে কাউকে দেখতে পায়নি। কিন্তু সেদিন রাতে সানা অনেক ভেবেচিন্তে আরজের কাছে থমাস আর মার্কারের ব্যাপারটা বলে দিয়েছে সব। তারপর থেকে সবকিছু যেন অদৃশ্যভাবে বদলে গেছে। তখন থেকেই আরজে ভেতরে ভেতরে আরও বেশি সতর্ক হয়ে ওঠে। বাইরে থেকে হয়তো বোঝা যায়নি। কিন্তু ভেতরে, সবকিছু বদলে গিয়েছিল। সে প্রথমেই নিজের পুরো সিকিউরিটি টিম চেঞ্জ করে দেয়। পুরনো গার্ডদের সরিয়ে দিয়ে নতুন লোক বসায়। প্রতিটা প্রবেশদ্বার, প্রতিটা করিডোর, প্রতিটা ক্যামেরা, সব নিজে দাঁড়িয়ে চেক করেছে। ডার্ক লোটাস ভিলার নিরাপত্তা যেন এখন দুর্গের মতো।

শুধু তাই না, নিজের দলের লোকেদের মধ্যেও বারবার খোঁজ চালিয়েছে থমাসের। কিন্তু এই এক মাসে, থমাস যেন বাতাসের মতো উধাও হয়ে গিয়েছে। কোথাও তার কোনো চিহ্ন নেই। এই এক মাসে আরজের ‘ব্ল্যাক নাইট’ মুভির শুটিং শেষ হয়েছে। দীর্ঘদিনের কাজ শেষ করে এখন সবাই দেশে ফিরতে প্রস্তুত। আগামীকাল সকালেই তারা সবাই বাংলাদেশে ফিরে যাবে।
এই এক মাসে অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি নজরে পড়ার মতো যে জিনিসটা, তা হলো আরজে আর আরভির সম্পর্ক। আরভি এখন তার ড্যাড ছাড়া কিছুই বোঝে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম প্রশ্ন,
-“ড্যাড কোথায়?”
খাওয়ার সময়,
-“ড্যাড আমার পাশে বসবে”
রাতে ঘুমানোর আগে,
-“ড্যাড লাগবে….”

আরজেও যেন পুরো পৃথিবী ভুলে গেছে। সে এখন বেশিরভাগ সময়ই ছেলের সাথেই কাটায়। কখনো তাকে সাইকেল চালানো শেখায়। কখনো সুইমিং পুলে নিয়ে যায়। কখনো আবার দুজনে মিলে লিভিং রুমে বসে কার্টুন দেখে। আরভির হাসির শব্দে পুরো ভিলা ভরে থাকে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও একটা জিনিস ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে।। সানা আর আরজের মাঝে যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে। তারা একই বাড়িতে থাকে, একই টেবিলে বসে বসে কিন্তু কথা হয় খুব কম। চোখে চোখ পড়লেও দুজনেই দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। একটা নীরব অবহেলার খেলা তাদের মাঝখানে জমে উঠেছে।
এই দীর্ঘ সময়ে আরেকটা জিনিস চলছে লোকচক্ষুর সামনে তা হলোে লুকোচুরির খেলা। ঈশানী ও এসপি ভুল করেও আরজের সামনে আসে না। ঈশানী কদাচিৎ আসলেও এসপি আরো একধাপ এগিয়ে, সে আরজের থেকে একশ হাত দূরে থাকে। সামনেই সে বাপ হতে চলছে, তার আগে সে উপরে যেতে চায় না।
আর এদিকে আরভি কয়েকবার নিজের অজান্তেই সানার মান সম্মান সব ড্যামেজ করে দিয়েছে আরজের সামনে। একদিন রাতে আরজে আরভিকে কোলে বসিয়ে গল্প করছিল। আরভি তার ড্যাড কে বলছিল তার ভ্যালির ব্যাপারে। সানাও কবার্টের সামনে কাপড় খোঁজার বাহানায় তাদের দুজনকে দেখছিল। সানা বুঝতে পারছে না তার সর্বদা চুপচাপ গম্ভীর থাকা ছেলেটা যেন হঠাৎ বাপকে পেয়ে বাচাল হয়ে গেল কীভাবে? সারাক্ষণ বাপের সাথে বকবক করবে। তার ভাবনার মধ্যে হঠাৎ আরভি বলে,

-“ড্যাড, মম বলেছে কেউ একটা দিলে তাকে দশটা লাগাতে”
আরজে চোখ সরু করে একবার রমণী কে পরখ করে আরভিকে আবার প্রশ্ন করে,
-“মম তোমাকে আর কি কি শিখিয়েছে?”
-“মম আমাকে কারোরপতি হতে শিখিয়েছে”
-“কিভাবে কারোরপতি হবে তা শিখিয়েছে?”
আরভি সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে হাঁ বোঝায়। তারপর বলে,
-“ব্যাংক লুটে কারোরপতি হবো”
তার এমন জবাবে আরজে ভ্রু জোড়া কুঁচকে যায়। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সানা তড়িঘড়ি করে একটা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। তার ইচ্ছা করছে এখন কবার্টের মধ্যে ঢুকে যায়। আরজে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আবারো জিজ্ঞেস করে,

-“কিভাবে লুট করবে সেটাও বলেছে নিশ্চয়?
-“না, ওটা বড় হলে বলবে বলেছে”
আরজে আড়চোখে সানার দিকে তাকিয়ে জোরে তাকে খোঁচা মেরে বলে,
-“একজন আছে, যে নিজের ছেলেকে লুটেরা বানাতে চায়”
এদিকে রমণী সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের কপাল চাপড়ে বলে,
-“চুপ কর, আমার বাপ। একদিনেই মায়ের সব পোল খুলে দিবি নাকি”
পর মুহূর্তে ভাবে, এই লোকের কাছে হেরে যাওয়া যাবে না। তাই সেও চিৎকার করে তার মতো করে বলে,
-“একজন আছে, যে নিজের বউয়ের ভুলের পিছনে সারাক্ষণ পড়ে থাকে। নিজেরটা দেখে না, শয়তান।
বাই দ্যা ওয়ে, সবারই স্বপ্ন থাকতে পারে”
-“লুটা কার স্বপ্ন হতে পারে?”
-“সানা মানে ইউনিক কিছু। সবাই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হলে দেশ তাড়াতাড়ি উন্নতি হয়ে যাবে, তাই ইউনিক কিছু করতে হবে”
ছোট আরভি নিজের মা-বাবার এই নীরব যুদ্ধ সম্পর্কে অবগত না। তাই সে নিজের মতো করে বলতে থাকে,

-“ড্যাড, ইউ নো মম আর আন্না মিলে গ্র্যান্ডফার বাগান থেকে আপেল নিয়ে এসেছে”
সাথে সাথে আরজে বলে,
-“কিভাবে এনেছে?”
আরভির তরফ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর আসার আগে রমণী সেখান থেকে ধুপধাপ কদম ফেলে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, নিজের গলা চড়া করে বলে,
-“কীভাবে এনেছে মানে কী, হ্যাঁ? আমরা কোনো চুরি টুরি করে আনিনি। ওটা হাদিয়া ছিল, উনি আমাদের হাদিয়া দিয়েছেন”
আরজে এক পলক চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে আবারো আরভির দিকে তাকায়। তার যা বোঝার সে খুব ভালো মতোই বুঝতে পেরেছে। আরভি আবারো বলে,
-“মম আর আন্না মিলে সব জায়গায় ছোট পাপাকে ফাঁসিয়ে দিত। তারপর গ্র্যান্ডপা ছোট পাপাকে সারাক্ষণ বকতো”
এই বাক্যটা শুনে এতক্ষণ পর আরজের মনের মধ্যে কোথাও একটা প্রশান্তির ঢেউ বয়ে গেলো। তাহলে ওই বারোভাতারিটাও শান্তিতে ছিল না, তার বউ-বাচ্চার সাথে থেকে। একটা স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে সানাকে শুনিয়ে বলে,

-“এতদিন পর তোমার মম একটা ভালো কাজ করেছে। না হয় সব সময় তো উল্টোপাল্টাই করে বসে”
এবার আর সহ্য হলো না রমণীর। সে ঘুরে একদম আরজের সামনে দাঁড়ায়, কোমরে হাত রেখে আরভিকে বলে,
-“সোনা, নিজের চোখ ঢাকো”
আরভি মায়ের আদেশ মতো চোখ ঢেকে ফেলে। এদিকে আরজে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সানা ধুমধাম কয়েকটা তার বাহুতে লাগিয়ে একটা কামড় দিয়ে এক ন্যানো সেকেন্ড অপেক্ষা না করে দৌড়ে চলে যায়।
আরজে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হাসি টেনে ফিসফিস করে বলে,
-“রাগ কেউ এভাবে মিটায়? একটা কিস করলেও তো পারত”
এই মুহূর্তে নিজের রুমের বিছানায় বসে সেই সব কথাগুলোই ভাবছিল সানা। তার মনে হচ্ছে, এই এক মাসে আরজেকে দেখে হয়তো সত্যিই তার ভুল হয়েছিল। আরজে কে একবার বলা উচিত ছিল। কিন্তু এটা এখন আরজের কাছে স্বীকার করা যাবে, সে কোন মতেই নিজের ইগো হার্ট করতে পারবে না।
তার বিভ্রম ছুটিয়ে হঠাৎ দরজার শব্দ হয়।সানা মাথা তুলে তাকায়। দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে আরজে। সে এতক্ষণ ছিল আরভির রুমে, ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছে। আরজে রুমে ঢুকে একবারও সানার দিকে তাকায় নি। সে সরাসরি কবার্ট থেকে একটা টাওয়াল বের করে চলে যায় ওয়াশরুমের দিকে। সানা একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আরজে যাওয়ার পর রুমটা আবার নিঃশব্দ হয়ে পড়ে। আর সানা বসে থাকে, একটা অদ্ভুত ভারী অনুভূতি নিয়ে।

প্রায় এক ঘণ্টা পরে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে আরজে। ভেজা চুল, গায়ে জড়ানো শুরু মাত্র একটা টাওজার। তার পেটানো বডির সম্পূর্ণটা দৃশ্যমান। হাতের তোয়ালাটা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে রুমে ঢোকে। দরজার কাছে এসে এক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি আড়চোখে ঘুরে যায়, সানার দিকে। নজরে আসে সানা এখনো ঠিক আগের মতোই বিছানার একপাশে বসে আছে, একই ভঙ্গিতে। মনে হয় যেন এতক্ষণ সে নড়েওনি।
আরজে কিছু না বলে নিজের ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ে তার পাশে। সে জেবির পাঠানো ফাইন্ডিং রিপোর্ট দেখতে শুরু করে। ফাইলের পর ফাইল খুলছে, কিন্তু তার মন পুরোপুরি সেখানে নেই। কেননা তার সম্পূর্ণ খেয়াল জুড়ে আছে পাশের রমণীতে যে অন্য প্রান্তে বসে থেকে এখনো তার দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আরজে সেটা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। তাই সে মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকাচ্ছে সানার অগোচরে। হঠাৎ নজরে আসে, সানা ধীরে হামি তুলছে, তার চোখে ক্লান্তি স্পষ্ট। আরজে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। তারপর ল্যাপটপটা বন্ধ করে রেখে শুয়ে পড়ে, এক হাত মাথার নিচে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
সানা আরও কিয়ৎকাল বসে থেকে তারপর ধীরে ধীরে সে আরজের দিকে তাকায়। রমণী চোখ সরু করে দেখে, আরজে কি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে?

সে একটু ঝুঁকে ভালো করে তাকায় নজরে আসে আরজের শ্বাস প্রশ্বাস শান্ত। মনে হচ্ছে সত্যিই ঘুমিয়ে গেছে। সানা ঠোঁট উল্টে নাকের পাটাতন ফুলিয়ে বিরক্ত গলায় ফিসফিস করে,
-“বাহ… কী দারুণ, আমি এখানে বসে বসে আছি…আর ওনি ঘুমিয়ে পড়েছেন”
সে একটু ঝুঁকে আরও কাছে তাকিয়ে দন্ত চেপে আওড়ায়,
-“একবার জিজ্ঞেস করার দরকার মনে হলো না, আমি কেন বসে আছি?
বড্ড অহংকার আপনার। কী ভাবেন নিজেকে?
পৃথিবীর রাজা নাকি?
বদলোক একটা, অসভ্যলোক…কু*ত্তা”

এই বলে হঠাৎ ঝুঁকে আরজের উন্মুক্ত বুকের উপর জোরে একটা কামড় বসিয়ে দেয়। তারপর সঙ্গে সঙ্গে সরে এসে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়ে, যেন কিছুই হয়নি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সানার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে মানে সে ঘুমের অতল গভীরে হারিয়ে গেছে। আর ঠিক তখনই এতক্ষণ মুঠো করে ধরে রাখা বিছানার চাদরটা ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয় আরজে। তার আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে উঠেছে। তার অ্যাডামস অ্যাপল দ্রুত ওঠানামা করছে। মনে হচ্ছে সে এতক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করে নিজেকে থামিয়ে রেখেছিল। মনের কোণে নিষিদ্ধ চাহনারা উঁকি দিচ্ছে বারবার। ধীরে ধীরে সে চোখ খুলে পাশে তাকায়, দৃষ্টি পড়ে সানার উপর। অন্ধকারে মেয়েটার মুখটা শান্ত দেখাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখে পড়ে আছে। আরজে ধীরে নিঃশ্বাস ছেড়ে মনে মনে আওড়ায়,
-“এই মেয়েটা…, আমার ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা নিচ্ছে”
তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সে নিজের বুকের সেই জায়গায় হাত রাখে, যেখানে একটু আগে সানা কামড় দিয়েছিল। ব্যথা আছে, কিন্তু সেই ব্যথার মধ্যেই অদ্ভুত একটা প্রশান্তি ও আছে। তার ঠোঁটের হাসিটা আরও চওড়া হয়। সে নিঃশব্দে উঠে বসে
তারপর ঝুঁকে পড়ে রমণীর মুখের উপর। আলগোছে তার এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দেয় মুখ থেকে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিয়ৎকাল। তারপর খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে,

-“ঘুমিয়ে পড়লেই বীরাঙ্গনা হয়ে যাও, তাই না?
জেগে থাকতে এত সাহস কোথায় থাকে?
আমাকে বদলোক বলো, কু*ত্তা বলো”
সে মৃদু হেসে বলে,
-“তুমি বুঝতেই পারো না, তোমাকে এভাবে কাছে পেলে, নিজেকে থামিয়ে রাখা কতটা কঠিন”
সে কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে ছিল এটা তারই অজানা। ধীরে ধীরে আরজে নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল রমণীর গ্রীবায়। লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে ঘোর লাগা কণ্ঠে আওড়ায়,
-“ডু ইউ নো, ওয়াইফি
দিনভর তোমাকে এড়িয়ে চলি আমি। কারণ জানি, তোমার কাছে গেলেই আমার সব রাগ, সব প্রতিশোধ গলে যাবে। কিন্তু রাত নামলেই আমি হেরে যাই।
এই অন্ধকার ঘরে শুধু তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ গুনি, আর বুঝি, এই পৃথিবীতে এমন কিছু আছে যাকে আমি জয় করতে পারি না, ‘সেটা তুমি”
আরজে নিজের মুখ তোলে রমণীর কপালে অধর ছুঁইয়ে, তার সারা আদলে হাত বুলিয়ে ফের আওড়ায়,

-“তুমি আমার দুর্বলতা না,তুমি আমার উন্মাদনা।
তুমি আমার ভালোবাসা না, তুমি আমার আসক্তি,
এমন এক রোগ যার কোনো চিকিৎসা নেই।
তোমার এই নীরবতা, এই দূরত্ব, এগুলো আমাকে পাগল বানিয়ে দিচ্ছে, মাই লাভ”
সে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে সানাকে টেনে আনে নিজের বুকের উপর। সানার মাথা তার বুকে এসে ঠেকে। আরজে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।যেন কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে। তারপর চোখ বন্ধ করে ফেলে। রোজকার মতো রমণীকে বুকের মধ্যে নিয়েই সে ঘুমিয়ে পড়ে।

রাত ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছে। পুরো ভিলা ঘুমে ডুবে আছে। তবে এই গভীর রাতেও করিডোরের শেষ প্রান্তের একটা রুমে এখনো আলো জ্বলছে। কাঁচের বিশাল জানালা দিয়ে হালকা সোনালি চাঁদের আলো ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতর। চারদিকে নিস্তব্ধতা, কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক। এক হাতে সে নিজের কপাল ঘষছে। অন্য হাতে ধরা ফোনের স্ক্রিনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
সে একটু আগেই নিচ থেকে এসেছে। কিন্তু বিছানায় শুয়ে থেকেও ঘুম তার চোখে আসেনি। দুচোখের ঘুম যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা বারবার উঁকি দিচ্ছে। এমনটা তার সাথে কখনো হয়নি। জ্যাক এমন মানুষ নয়, যে কোনো কিছুর জন্য ভেতরে ভেতরে অস্থির হবে। সম্পর্ক, অনুভূতি এসব শব্দের সাথে তার জীবনের কোনো সম্পর্ক থাকার কথা ছিল না। সে নিজের জন্য অনেক আগেই একটা রোবোটিক পৃথিবী বানিয়েছে। একটা এমন পৃথিবী, যেখানে অনুভূতি নামের শব্দটা নিছক অর্থহীন। যেখানে ভালোবাসা, টান, অপেক্ষা এসব দুর্বলতা।

সে সবসময়ই ভাবত, মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো সম্পর্কের বেড়াজালে নিজেকে আটকে ফেলা। কিন্তু আজ, আজ সে নিজেই সেই বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আর এ সবকিছুর জন্য দায়ী, ওই মেয়েটা, ওই রাজস্থানী রমণী। মনে হতেই তার হাতের মুঠোয় ধরা ফোনটা হঠাৎ আরও শক্ত হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। এক মুহূর্তের জন্য সে সত্যিই ফোনটা তুলে সোজা দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে মারতে যাচ্ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে থেমে যায়। একটা গভীর শ্বাস নেয়। তার এখন নিজের উপরেই রাগ হচ্ছে।নিজের দুর্বলতার উপর। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ধীরে ধীরে আবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। স্ক্রিনে একটা নাম্বার জ্বলজ্বল করছে। সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই নাম্বারের দিকে। অবশেষে সে কল করে দিল। জ্যাক জানে না বিপরীত পাশের রমণী ফোন তুলবে কিনা। সে এখনো জেগে আছে কিনা তাও জানে না।। কারণ জ্যাক কদাচিৎ তাকে ফোন করে, শুধু বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে। না হলে প্রায় কখনোই না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে প্রথম বারেই কলটা রিসিভ হয়ে যায়। বিপরীত পাশ থেকে ভেসে এল এক মেয়েলি রিনরিনে কণ্ঠস্বর,

-“হ্যালো?”
মুহূর্তে জ্যাক যেন থমকে গেল। তার ভ্রু কুঁচকে আসে। হঠাৎ করেই তার রাগ হচ্ছে, মেয়েটা ফোন কেন তুলল। সে নিজেই বুঝতে পারছে না কেন এমন লাগছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলে,
-“এত রাত পর্যন্ত কেন জেগে আছো?
বিপরীত পাশে থাকা ইবেলিনা ভ্রু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকায়, এটা আবার কেমন প্রশ্ন। নিজেই কল করেছে, আবার তাকেই জিজ্ঞেস করছে কেন সে জেগে আছে!
তাই সে একটু বিরক্ত গলায় উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
-“আপনিও তো জেগে আছেন?”
জ্যাক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে জানালার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
-“আমি জেগে থাকি আর না থাকি সেটা আমার ব্যাপার”
ইবেলিনা ঠোঁট বাঁকিয়ে একটু সাহস করে বলে,
-“তাহলে আমারটা কেন আপনার ব্যাপার হলো?”
জ্যাক একটু থেমে গেল। এই প্রশ্নটার উত্তর তার কাছে নেই। সে নিজেই বুঝতে পারছে না কেন ফোন করেছে? কেন কথা বলছে? কেন এমন লাগছে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে হঠাৎ বলে,

-“ঘুমাওনি?”
ইবেলিনা বিছানায় বসে জানালার বাইরে তাকায়, চারদিক অন্ধকার কিছুই নজরে আসছে না। রমণী ধীরে বলে,
-“ঘুম ভেঙে গেছে”
-“কেন?”
-“হয়তো কেউ ফোন করবে বলে”
এই কথাটা শুনে জ্যাক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত কিছু একটা নড়ে উঠে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের চিরাচরিত রূপ থেকে বেড়িয়ে এসে ঠান্ডা স্বরে বলে,
-“বেশি ভাবতে শেখো না”
বিপরীতে থাকা রমণী আজ যন্ত্রমানবের ব্যবহারে অনেক টা অবাক হয়েছে বটে। একেতো জ্যাক তাকে কখনো কল করে না তারউপর করলেও তাদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা হয়। আজ জ্যাক নিজ থেকে বলছে, সে হালকা হেসে ফেলে,

-“আমি ভাবি না”
-“তাহলে?”
-“আপনিই ভাবেন”
জ্যাক ভ্রু কুঁচকে বলে,
-“আমি?”
-“হ্যাঁ, না হলে এত রাতে আমাকে ফোন করতেন কেন?”
জ্যাক কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল রাতের আঁধারের দিকে যদিও কৃত্রিম আলোয় তা বুঝা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর সে নিচু গলায় প্রশ্ন করে,
-“আশ্রমে সব ঠিক আছে?”
ইবেলিনা একটু বিস্মিত হয়, কেননা জ্যাক সাধারণত এভাবে জিজ্ঞেস করে না। সে ধীরে বলে,
-“সব ঠিক আছে”
আবার কিছুক্ষণের নীরবতা কাটিয়ে হঠাৎ ইবেলিনা বলে,

-“আপনি ঠিক আছেন?”
-“আমি সবসময় ঠিক থাকি”
-“মিথ্যে”
-“কেন?”
ইবেলিনা ধীরে প্রত্যুত্তর করে,
-“আপনি যদি ঠিক থাকতেন…তাহলে এতরাতে আমাকে ফোন করতেন না”
এই কথাটা শুনে জ্যাক দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখ স্থির হয়ে গেল শহরের দিকে। হয়তো এই প্রথমবার সে বুঝতে পারছে, তার যান্ত্রিক পৃথিবীর নিয়মটা সত্যিই ভেঙে গেছে। আর সেই নিয়ম ভেঙেছে, একজন রাজস্থানী রমণী। যাকে সে যত দূরে রাখতে চেয়েছে, ততই সে কাছে চলে এসেছে।
একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে লাইনের দুপাশে। শুধু মাঝে মাঝে দুজনের শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে মনে হচ্ছে যেন তারা কথার বদলে একে অপরের নিঃশ্বাস গুনছে। জ্যাকের ভ্রু কুঁচকে আসে, সে নিজেই বুঝতে পারছে না, সে কেন এখনো ফোনটা কাটেনি? কেন এই মেয়েটার সাথে কথা বলছে? কেন এতক্ষণ লাইনে আছে? তার মাথায় হঠাৎ একটা যুক্তি আসে।

সে তো তার স্ত্রী, হয়তো সেই কারণেই।
পরমুহূর্তেই সে বিরক্ত হয়ে ওঠে নিজের উপর। তার মনে হয়, ফোনটা কেটে দেওয়া উচিত এখনই। সে আঙুলটা স্ক্রিনের দিকে বাড়িয়েও থেমে যায়।
অদ্ভুত ব্যাপার কিছুক্ষণ আগে যে অস্থিরতা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, এখন সেটা নেই। একটা অদ্ভুত শান্তি নেমে এসেছে।সে আর কিছু বলে না, ওপাশেও কোনো কথা নেই। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে খুব ধীরে ইবেলিনার কণ্ঠ ভেসে আসে,
-“কবে আসবেন?”
জ্যাক সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করে,
-“যখন সময় হবে”
-“কখন সময় হবে আপনার?”
জ্যাকের ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠে। সে একটু ব্যঙ্গ মিশিয়ে বাক্য ছুঁড়ে,
-“কেন? আমাকে মিস করছো নাকি?”
বিপরীত পাশে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। জ্যাক নিজেই আবার বিদ্রূপের সুরে বলে,
-“ইন্টারেস্টিং, আগে তো চাইতে তুমি কখনো না আসি।
আমাকে তো ধ*র্ষণকারী ও বলেছিলে”
তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে,

-“এখন কি সেই ধ*র্ষককেই ভালোবেসে ফেলেছ?
তাহলে বলব, তুমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছ, মেয়ে”
জ্যাকের বলা বাক্য গুলো শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই মুঠোফোনের ওপাশে থাকা ইবেলিনা একদম থমকে গেল। মুহূর্তে যেন তার বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠে। হ্যাঁ, এই কথাগুলো, এই একই কঠিন কথাগুলো, সে নিজেই বলেছিল। বিয়ের পর, রাগে, অপমানে, ভয়ে। আজ সেই কথাগুলোই উল্টো হয়ে ফিরে এল। তার মনে হলো বুকের ভেতর কেউ যেন ভারী কিছু চাপিয়ে দিয়েছে। সে ভাবতেও পারেনি, এই মানুষটা এত ঠান্ডা গলায় আবার সেই কথাগুলো বলতে পারবে। তার গলা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠে, চোখ জ্বালা করছে। আর পরের মুহূর্তেই নিজেকে আটকাতে না পেরে ইবেলিনা কেঁদে ফেলে। ফোনের ওপাশে তার চাপা ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ ভেসে আসে। এই পাশের মানুষটা মুহূর্তে অস্থির হয়ে যায়। জ্যাকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,

-“আর এক ফোঁটা চোখের পানি পড়লে…
আই সোয়ার, লিনা, আমি তোর অবস্থা খারাপ করে ফেলব”
ওপাশে কান্না থামেনি, ইবেলিনা কাঁদতে কাঁদতেই বলে,
-“হ্যাঁ…আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করে ফেলেছি…এখন আপনি খুশি তো?”
রমণী একটু থেমে তারপর কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
-“এবার… আপনি আসবেন?”
এই কথাটা শুনে জ্যাকের বুকের ভেতর জমে থাকা রাগটা যেন হঠাৎ একটু নরম হয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ইবেলিনার মুখে এমন স্বীকারোক্তি সে আশা করেনি। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠে, অদ্ভুত এক সন্তুষ্টির হাসি। সে এবার আগের চেয়ে অনেক নরম গলায় বলে,

-“হুম, আসবো”
বিপরীত পাশে হঠাৎ কান্নার মাঝেই একটা উজ্জ্বলতা ফুটে উঠে। ইবেলিনা তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলে দ্রুত বলে,
-“আমি আপনার অপেক্ষায় থাকব। আর এবার যখন আসবেন…আপনার সাথে আমাকে নিয়ে যেতে হবে, আমি সানার বাচ্চাকে দেখতে চাই”
জ্যাক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর শুধু ছোট করে বলে,
-“ওকে.. ”
এর বেশি কিছু না বলে পরের মুহূর্তেই সে ফোনটা কেটে দিল। ফোনটা হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দিল বিছানার উপর। ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে আসে। জ্যাক কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে এখনো সেই হালকা হাসিটা রয়ে গেছে
যেন সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না, সে কেন আসার কথা বলে ফেলল।

সকালের নরম আলো ধীরে ধীরে ঘরের পর্দা ভেদ করে ভেতরে ঢুকছে। আলোটা বিছানার একপাশে এসে পড়েছে। বিছানায় শুয়ে থাকা রমণী ধীরে ধীরে চোখ মেলে। কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে থাকে। তারপর একটা লম্বা হামি তুলে একটু কাত হয়ে চারদিকে তাকায়। নজরে আসে বিছানার পাশটা ফাঁকা, আরজে নেই। সানা চোখ আধখোলা অবস্থায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেই খালি জায়গাটার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসে।
চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কাঁধে পড়ে আছে। ঠিক তখনই তার নাকে একটা পরিচিত গন্ধ এসে লাগে। সে একটু থেমে ধীরে ধীরে গভীর একটা নিঃশ্বাস টেনে নেয়। একটা মিশ্র গন্ধ, কফি আর ভ্যানিলার। এই গন্ধটা সে খুব ভালো করেই চেনে। এটা আরজের পারফিউমের স্মেল। মনে হয় যেন সেই গন্ধ তার পুরো শরীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। যেন কিছুক্ষণ আগেও সে এখানে ছিল। সানা আবার গভীর করে নিঃশ্বাস টানে। তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা ছোট্ট হাসি ফুটে ওঠে। এই মুহূর্তে আরজে কোথায় আছে সে খুব ভালোভাবেই জানে। সে বিছানা থেকে নামতে নামতে নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে,
-“আমার ছেলেটাকে আবার নিজের মতো বডি বানানোর মিশনে নিয়ে গেছে বদলোক টা”
সে ধীরে ধীরে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটে।চুলগুলো ঠিক করতে করতে ফের বলে,
-“পাঁচ বছরের বাচ্চাকে সকাল সকাল জিমে নিয়ে যাওয়া লাগে নাকি”
ওয়াশরুমের দরজার কাছে পৌঁছে আবার বলে,
-“দাঁড়া… আসছি আমি। আজ দেখি আপনাদের সেই বডি বানানোর ট্রেনিং”

ডার্ক লোটাস ভিলার ভেতরের জিম রুমটা সকালবেলায় অন্যরকম থাকে। চারদিকে বড় বড় কাচের দেয়াল। সেই কাচ ভেদ করে সকালের আলো ঢুকে পড়েছে ভিতরে। রুমের এক পাশে সারি সারি ডাম্বেল। অন্য পাশে ট্রেডমিল, বেঞ্চ প্রেস, পাঞ্চিং ব্যাগ। মেঝের উপর কালো রাবারের ম্যাট। আর সেই জিমের মাঝখানে, দুই বাবা ছেলে নিজেদের মতো ব্যস্ত।
আরজে হালকা ঘাম ঝরিয়ে পুশ-আপ দিচ্ছে। তার মাংসপেশি টানটান হয়ে উঠছে প্রতিটা মুভমেন্টে। আর তার সামনে ছোট্ট আরভি একইভাবে পুশ-আপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।কিন্তু সে পুরোটা নামতেই পারছে না। দুই হাত মাটিতে রেখে শরীরটা নামানোর চেষ্টা করছে, তারপর হঠাৎ করেই ধপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। সে উঠে আবার চেষ্টা করে। আরজে পাশ থেকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলে,

-“কাম অন মাই বয়,
ড্যাডের মতো স্ট্রং হতে হলে আরও পাঁচটা”
আরভি গম্ভীর মুখে মাথা নাড়িয়ে বলে,
-“ওকে ড্যাড”
সে আবারও চেষ্টায় লেগে পড়ে। এইবার কোনোভাবে একটা পুশ-আপ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বুক ফুলিয়ে বলে,
-“ড্যাড, আই ডিড ইট”
আরজে বেঞ্চ থেকে উঠে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
-“গুড জব”
তারপর সে একটা ছোট্ট ডাম্বেল আরভির হাতে দিয়ে বলে,
-“এবার এইটা”
আরভি দুই হাতে ধরে ডাম্বেল তুলতে থাকে। মাঝে মাঝে কষ্টে মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে হাল ছাড়ছে না। ঠিক তখনই, জিম রুমের দরজা খুলে যায় ভিতরে প্রবেশ করে সানা। সে একটা বড় হুডি পরে আছে। চুলগুলো এলোমেলোভাবে কাঁধে পড়ে আছে। ঘুমের ছাপ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সে দরজার কাছে দাঁড়াতেই, দুই বাবা ছেলে একসাথে চোখ তুলে তাকায়। আরভির চোখ চকচক করে ওঠে। মুহূর্তে উৎফুল্ল চিত্তে ডেকে ওঠে,

-“মম….”
সে ডাম্বেল ফেলে দিয়ে দৌড়ে যায় সেদিকে। সানার কাছে গিয়ে লাফিয়ে উঠে পড়ে তার কোলে। সানা হেসে তাকে জড়িয়ে ধরে। তার গালে দুটো চুমু খেয়ে বলে,
-“গুড মর্নিং, ভীর..”
আরভি গর্বের সাথে বলে,
-“মম, আমি জিম করছি”
সানা চোখ বড় বড় করে তাকায়,
-“ওহ! তাই নাকি?”
তারপর ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-“আমার পাঁচ বছরের বাচ্চাকে সকাল সকাল জিমে টেনে আনার জন্য তোমার ড্যাডকে আমি একটু পরে দেখছি”
সানা তাকে কোলে নিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে আরজের দিকে। আরজে এতক্ষণ দুই মা ছেলেকে দেখছিল। কিন্তু সানা তারদিকে আসতেই আবার নিজের ওয়ার্কআউটে ব্যস্ত হওয়ার ভান করছে। সে একবার তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে ফেলে। সানা সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর মাথা কাত করে বলে,
-“ওহ… ভেরি ইমপ্রেসিভ, বডি বিল্ডিং করছেন”
আরজে তার বিপরীতে কিছুই বললো না। সে ডাম্বেল তুলতে থাকে। সানা চারদিকে তাকিয়ে বলে,
-“এই সব করে কি হবে?
শেষে সিনেমায় শার্ট খুলে দেখানোর জন্য?”
ছোট আরভি হেসে ফেলে। আরজে এবার ধীরে মাথা তুলে তাকায় তাকায় তার দিকে। কণ্ঠে রুক্ষতা মিশিয়ে বাক্য ছুঁড়ে,

-“সাবধানে কথা বলো”
সানা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
-“কেন?
এই বডি দিয়ে কি আমাকে ভয় দেখাবেন নাকি?”
তারপর হাত বাড়িয়ে আরজের বাইসেপে ঠোকাঠুকি করে বলে,
-“হুম… খারাপ না”
পরের মুহূর্তেই রমণী কিছু বুঝে উঠার আগেই আরজে এক ঝটকায় তার কব্জি ধরে ফেলে। সানা অবাক হয়ে বলে,
-“এই, কী করছেন, বাচ্চার সামনে?”
আরজের তরফ থেকে কোনো উত্তর আসে না। সে হঠাৎ সানাকে কোমর ধরে তুলে নেয়। আর তাকে কাঁধের উপর তুলে স্কোয়াট করতে শুরু করে। সানা চমকে উঠে চেঁচিয়ে ওঠে,
-“রানভীর…আর ইউ ম্যাড?”
এদিকে আরভি হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে,
-“ড্যাড, ড্যাড, আরেকটা”
সানা নিজের দন্ত খিঁচিয়ে বাক্য ছুঁড়ে,
-“আমাকে নামান, অসভ্য লোক। আমি পড়ে গেলে দুই বাপ ছেলের একটাকেও ছাড়বো না। দুটোর কানের নিচে এমন বাজান বাজাব”
কিন্তু কারোই তার কথায় ধ্যান নেই, আরভি হাততালি দিয়ে বলে,

-“মম ডোন্ট বি আফ্রেইড, ড্যাড ইজ স্ট্রং”
কয়েকটা স্কোয়াট শেষ করে আরজে অবশেষে সানাকে নামিয়ে দেয়। সানা চুল ঠিক করতে করতে বিরক্ত সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে খেঁকিয়ে উঠে,
-“আপনার মাথা ঠিক আছে?”
ঠিক তখনই ঈশানী দরজায় দাঁড়িয়ে আরভিকে ডাকে ব্রেকফাস্টের জন্য। আরভি দৌড়ে দরজার দিকে চলে যায়। আর সেই মুহূর্তেই, আরজে হঠাৎ সানার হাত ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে আনে। রমণী কিছু বোঝার আগেই, সে ঝুঁকে সানার ঠোঁটে একটা দ্রুত চুমু খেয়ে ফেলে একেবারে আচমকা। কয়েক সেকেন্ড, তারপর সে সোজা হয়ে আর কিছু না বলে হাঁটতে শুরু করে। এদিকে সানা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ বড় হয়ে গেছে, চোখে মুখে বিস্ময়। সে বুঝতেই পারেনি, কি থেকে কি হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে, তার ঠোঁটের কোণে একটা মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে। সে ঠোঁট ছুঁয়ে মাথা নেড়ে নিজের মনে বলে,
-“অসভ্য লোকটা…”
তারপর ধীরে ধীরে সেও হাসতে হাসতেই তাদের পিছনে হাঁটা শুরু করে।

ডার্ক লোটাস ভিলার সামনে সকালটা আজ অন্যরকম ব্যস্ততায় ভরা। সামনের বিশাল ড্রাইভওয়েতে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা কালো গাড়ি। গার্ডরা এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছে। কারও হাতে লাগেজ, কেউ আবার গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সবাই ফিরবে বাংলাদেশে। এই যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে তিনটা মানুষের গলা, এসপি, ঈশানী আর সানার।
বিশেষ করে ঈশানীর গলা আজ একটু বেশি তীক্ষ্ণ। কারণ, এসপি আবারও ভুল করে তাকে ‘মিসেস নাগিন’ বলে ফেলেছে। ঈশানী কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলছে,
-“বিটকেলের বাচ্চাআআআ, মিস মিস নাগিন”
এসপি বিরক্ত মুখে বলে,
-“আরে আপনি বিয়ে করে নিলেই তো হয়, তাহলেই তো আর আমার ভুল হয় না”
ঈশানী চোখ বড় করে বলে,
-“ভুল? সকাল থেকে এই পর্যন্ত এক ঘন্টায় এই ছেলে আমাকে বিশ বার বলেছে মিসেস। এই ডাইনির বাচ্চা, তুই একে কিছু বলবি নাকি আমি এর বউয়ের কাছে বলবো”
সানা অদূর থেকে চিৎকার করে বলে,

-“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওর বউয়ের কাছে গিয়ে উল্টো পাল্টা বলে আয়”
এসপি তড়িঘড়ি করে তাকে আটকাতে গিয়ে আবারো বলে,
-“আরে দাঁড়ান, মিসেস নাগিন….”
ঈশানী রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে খেঁকিয়ে উঠে,
-“ডাইনি, আবার ‘মিসেস নাগিন’ বলেছে,
এই ছেলেকে আমি তো…..”
এসপি আর এখানে নেই, সে চলে গিয়েছে সানিতার কাছে। ঈশানী এখনো তার ওপর চিৎকার করছে।
ওদিকে সানার ব্যাগগুলো ইতিমধ্যে গার্ডরা গাড়িতে তুলছে। সানা সামনে দাঁড়িয়ে একদম জেনারেলের মতো তদারকি করছে। সে একটার পর একটা ব্যাগ দেখছে,
-“ওটা সাবধানে রাখেন,
না না, ওইটা ওই গাড়িতে না।
এই ব্যাগটা আগে রাখেন”
আজ তার ব্যাগে কোনো খাজানা নেই। তবুও সে একটা ব্যাগও হারাতে রাজি নয়। সবকিছু সে নিজে দাঁড়িয়ে দেখে নিচ্ছে।
ড্রাইভওয়েতে এই হাসাহাসি, ঝগড়া, দৌড়াদৌড়ির মাঝেই উপরে ভিলার দ্বিতীয় তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে একটা অন্ধকার ছায়া। দূর থেকে কেউ তাকে লক্ষ্যই করছে না, বরং রেলিংয়ের উপর তার হাত শক্ত হয়ে আছে। একদম আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে উঠেছে। তার চোখ নিচের দৃশ্যের উপর স্থির, সেই দৃষ্টি অগ্নির মতো জ্বলছে। নিচে সবাই হাসছে, কেউ ঝগড়া করছে, কেউ ব্যস্ত। কিন্তু তার কাছে এই দৃশ্যটা অসহ্য লাগছে।তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। ঠিক তখনই তার পকেটে রাখা মুঠোফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে,

“ড্যাড”
সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। তারপর কলটা রিসিভ করে গম্ভীর গলায় বলে,
-“ইয়েস, ড্যাড”
বিপরীত পাশ থেকে কিছু প্রশ্ন আসে। থমাস ধীরে প্রতুত্তর করে,
-“আমি এতদিন এখানে থেকেও কিছু করতে পারিনি”
তার চোখ তখনও নিচের দিকে স্থির, যেখানে সবাই গাড়িতে উঠছে।। সে দাঁত চেপে বলে,
-“আরজে নিজের সব গার্ড চেঞ্জ করে ফেলেছে। পুরো সিকিউরিটি নতুন। আর প্রতিটা জায়গা সে নিজে চেক করছে। একটা সুযোগও নেই”
ফোনের ওপাশ থেকে শান্ত একটা কণ্ঠ ভেসে আসে,
-“রিল্যাক্স, মাই সান। আমরা এত বছর ধৈর্য ধরতে পেরেছি। আর কয়েকটা দিনও পারব। ওদের বাংলাদেশে আসতে দাও। তারপর বাকিটা এখানে দেখা যাবে”
থমাস কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটিয়ে বলে,
-“ওকে, ড্যাড”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০ (৩)

সে কলটা কেটে নিচে তাকায়, গাড়িগুলো একে একে স্টার্ট নিচ্ছে। গার্ডরা শেষবারের মতো চারপাশ চেক করছে।। আরজে, সানা, আরভি আর বাকিরা গাড়িতে উঠছে। সে নিজের ঠোঁটের কোণে মেকি হাসি ফুটিয়ে আওড়ায়,
-“থমাস, নাউ ইয়োর অ্যাক্টিং বিগিনস”
তারপর সেও নিচে নেমে সবার সাথে সহজভাবে মিশে যায়। একসাথে কয়েকটা কালো গাড়ি ধীরে ধীরে ভিলার গেট পার হয়ে বেরিয়ে পড়ে। তাদের গন্তব্য
“সাংহাই পুডং ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট”
সেখান থেকেই, তারা ফিরবে বাংলাদেশে।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১২