Home ওরা মনের গোপন চেনে না ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৫

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৫

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৫
বৃষ্টি শেখ

ঢাকার এই বড় রেস্টুরেন্টের পরিবেশটা সুন্দর। একদম নিরিবিলি, ছিমছাম জায়গাটা। গ্লাস দিয়ে বাইরের রাস্তাটা স্পষ্ট দেখা যায়। একটি টেবিল বুকড করে বসে আছে মীরা। বারংবার ফোনের দিকে তাকিয়ে সময় দেখছে সে। বিরক্তও হচ্ছে খানিক। মেয়েটা বলল দুটোয় আসবে। আড়াইটা বেজে গেলেও তার খবর নেই।
বিরস মুখে বাইরে তাকাতেই সদ্য বিয়ে হওয়া কাঙ্খিত মেয়েটিকে শাড়ি পরিহিত রূপে দেখে মীরার কপালের ভাঁজ কেটে গেল। বলে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটির পানে। নীল রঙের শাড়িটায় রাইমাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে। বেশ পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে তার অবয়বে। আচ্ছা, বিয়ের পর মেয়েরা বুঝি আরো সুন্দর হয়ে যায়?
চটপটে ভঙ্গিতে মীরার সামনের চেয়ারটিতে বসল রাইমা। ঘন ঘন দম ফেলে বলল,

“- চল্লিশ মিনিট লেইট। আমার শাশুড়িটা খুব ঘাড়ত্যাড়া। তাকে মানিয়ে তবেই বের হতে হলো। উনি কি বলে জানিস? বলে নতুন বউদের ভর দুপুরে বের হতে হয় না। নজর লাগে”।
বলেই ফিক করে হেসে ফেলল রাইমা। তার হাসিতে সঙ্গ দিল মীরা নিজেও। বলল,
“- ব্যাপার না। শান্ত তোকে মেনে নিয়েছে”?
হাসি থেমে গেল রাইমার। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“- এখনই? মাস ছয়েক তো লাগবেই”।
মীরা হাসল। ওয়েটারকে ডেকে দুটো কাচ্চির প্লেট অর্ডার করল। রাইমা স্মিত হেসে বলল,
“- তুই না থাকলে এসব কিছুই হতো না। আমাকে হয়তো তোরা এভাবে পেতিস না।”
“- সব তো তুই করলি। অপমানিত তুই হলি, বেয়াদব, বেহায়াও তুই হলি। আমি হলাম ভিক্টিম। সবাই আমাকে সমবেদনা জানাল, সান্ত্বনার বাণী শোনাল, তোকে শোনাল কটু কথা”।

রাইমা চুপ করে গেল। ভালোবাসার মানুষকে পেতে কতই না নিচে নামতে হলো তাকে। এরকমটা কি হবার খুব দরকার ছিল? মীরা একসময় রাইমার ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড ছিল। পরিচিতি বাড়তে বাড়তে এখন তাদের মাঝেকার সম্পর্ক সোশ্যাল সাইট ছেড়ে বাস্তব জীবনেও
ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। একই শহরে থাকায় দেখাও হয় মাসে দুবার। শান্তর বিয়ে, কথাটা জানার পর রাইমা সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল। সবার সাথে যোগাযোগ রাখাও বন্ধ করে দিয়েছিল। এক প্রকার বিষণ্ণতায় তার দিনগুলো কাটছিল। সে একা একা কাদতো, গুমড়ে মরতো, অপেক্ষা করতো শান্তর ফেরার। কিন্তু শান্ত কখনো আসেনি তার দ্বারে। বরং বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল আপনমনে।

মীরা শান্তর চাচাতো বোন। শান্তর বাবা মারা যাওয়ার পর তাদের মাঝে অতটা ভালো সম্পর্ক ছিল না। কালেভদ্রে চাচার বাড়ি যেত শান্ত, ফোনে কথা হতো মাসে একবার। ওইসময়েই মীরার সাথে তার কথা হতো, দেখা হতো। ওরা দুজন দুজনকে জানতো না তেমনভাবে। শান্তর মা হঠাৎ জমি-জমা নিয়ে বিপদে পড়লে মীরার বাবা এগিয়ে আসেন। ওই সময় কাজের জন্য শান্তর সাথে অনেকটা সময় কাটান তিনি। শান্তর ব্যবহার, আচরণ, জ্ঞান, চাকরির পদ দেখে তিনি মুগ্ধ হন। ঠিক করেন একমাত্র মেয়ে মীরার সাথে শান্তর বিয়ে তিনি দেবেন।

যেই ভাবা সেই কাজ, মীরার সাথে শান্তর বিয়ে ঠিক হলো। দুজনের কেউই প্রস্তুত করতে পারল না নিজেদের। তবে মানিয়ে নেয়ার এবং সংসার স্থাপনের সত্যটা মেনে নিল। মীরা রাইমাকে বিয়ের কার্ড পাঠাবে বলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও পারল না। কারণ তার আগেই রাইমা শান্তর বিয়ের ব্যাপারটা জেনে গিয়েছিল। তখনও রাইমা জানতো না পাত্রী তারই বান্ধবী মীরা। শান্তর থেকে কার্ডটা হাতে পাওয়ার পর রাইমা এতটাই অবাক হয়েছিল যে পাত্রীর নাম দেখেনি সেসময়। রাইমার খোঁজ না পেয়ে ওর বাড়িতে বিয়ের কার্ড দিতে এসেছিল মীরা। বিয়ের কার্ডে শান্তর নাম দেখতেই ভড়কে গিয়েছিল রাইমা। অনেক যাচাই-বাছাই করে সে জানতে সক্ষম হয়েছিল শান্তর হবু বউ আর কেউ নয়, তারই বন্ধু মীরা।

রাইমার জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়তো বা চুপ করে থাকতো। বন্ধুর কথা ভেবে সরে আসার চেষ্টা করতো। কিন্তু রাইমা মীরাকে অনেকদিন ধরে চিনতো বলে সে নিশ্চিত ছিল মীরার ভালোবাসার মানুষ নেই। বিয়েটা হচ্ছে মীরার বাবার ইচ্ছেতে। তাই শেষ বারের মতো প্রিয় মানুষটিকে পাবার সুযোগ ফেলে দিতে পারেনি রাইমা। তার মনের কথা সে নির্দ্বিধায় জানিয়েছিল মীরাকে। জানার পর মীরা একটুও দুঃখ পায়নি, বরং সে প্রতিজ্ঞা করেছিল কিছুতেই এ বিয়েটা সে করবে না। শান্তর সাথে রাইমার সম্পর্কটা সে গুছিয়ে দেবে। কিন্তু ততদিনে বিয়ের কার্ড বিলি হয়ে গেছে, মীরার বাবা কোনোমতেই বিয়েটা ভাঙবে না বুঝতে পেরেছিল মীরা। শান্তর প্রতি ছোট ছোট অভিযোগ ছুঁড়লেও মীরার বাবা বিয়েটা ভেঙে দেবার চেষ্টা করেনি। ওদিকে শান্তকে বারবার বুঝিয়েও বিশেষ লাভ করতে পারেনি রাইমা। শান্ত বিয়েতে রাজি, রাইমার প্রতি তার কোনো অনুভূতি নেই। এমতাবস্থায় দুজনই কোনো উপায় খুঁজে পায়নি। মীরা যদি বিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় তাহলেও শান্ত রাইমাকে বিয়ে করতো না। তাই জোর করে, ভয় দেখিয়ে, আত্মহত্যার নাটক করে ভরা আসরে শান্তকে পাওয়ার জন্য মিথ্যে নাটক করেছিল রাইমা। এবং সবশেষে, রাইমা তার প্রিয় মানুষকে পেয়েছে। সে দোষী হয়েছে, মান-মর্যাদা খুইয়েছে ঠিকই, তবুও তো কল্পণার পুরুষকে নিজের করতে পেরেছে। এতেই রাইমার শান্তি।
রাইমা বলল,

“- শান্ত হয়তো আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না”।
মীরা বলল,
“- এরকম করে ভাবিস না”।
“- তুই ছিলি বলেই আমি ওকে পেলাম”।
মীরা হেসে বলল,
“- আমার নাটক কেমন হয়েছিল বল? তুই তো জানিস, ঝগড়া করতে গেলে আমার মুখ থেকে অটোমেটিক গালি চলে আসে। শান্তকে খুব গালিগালাজ করেছি”।
“- রাগারাগি না করলে নাটকটা হতো না”।

রাইমা আর মীরা সমস্বরে হেসে উঠল। অতঃপর দুজন মিলে লাঞ্চ করল গল্প-আড্ডার সাথে। খুব দ্রুত বিদায় নিতে হলো রাইমাকে। আগেকার জীবনের সাথে তার এখনকার জীবনের বিস্তর ফারাক। আগে সে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতো, কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু এখন সে অন্য একটা সংসারে ঢুকেছে। সেখানে সবাই নিয়মনীতি মেনে চলে। এতক্ষণ বাইরে থাকাটা রাইমার শাশুড়ি পছন্দ করবে না, কথা শোনাবে। সব জেনে বুঝে রাইমা থাকল না বেশিক্ষণ। তার এ তটস্থ আচরণ, ফেরার তাড়া, ব্যগ্র অঙ্গ ভঙ্গি দেখে মীরা খুব অবাক হলো বিস্ময়ে বিমূঢ় সে। একটা ভীতু, বোকা, সাধারণ মানুষকে পাওয়ার জন্য রাইমা নিজেকে এতটা বদলাল? নিজের স্বভাব, আচরণ, চলাফেরা সব পরিবর্তন করে ফেলল, কেবল প্রিয় মানুষটার সাথে সুখে সংসার করবে বলে? নারী জাতি এতটা সরল, এতটা সাদামাটা হয়? এতটা আত্মত্যাগ তারা কী করে করতে পারে? এই রাইমা অকপটে, কাটকাট কথা বলতো। আর এখন শাশুড়ির রাগ, কটু কথার ভয় করে সে, কোনো প্রতিবাদ করে না। কেন? শান্তর সাথে থাকতে চায় বলে?

হরতাল চলছে শহর জুড়ে। শহরে শহরে মারামারি, হানাহানি এবং উৎপাতের তান্ডবলীলা চলছে। আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে পথে নেমেছে জনগন। কিছু সংখ্যক স্বৈরাচারী এমতাবস্থায় দেশকে আরো নিচে নামানোর জন্য অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে, গোলাবারুদ ছুঁড়ে পরিস্থিতিকে আরো বিপর্যস্ত করে তুলছে। পরিপ্রেক্ষিত পুলিশদের ভোগান্তি বেড়েছে, সাধারণ জনগনের উপর ক্ষেপে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, ইট ছুঁড়ছে।

গুলশানের এক পথে এ ধরণের তাণ্ডব দেখে বাইক থামায় আফিম। তার এলাকার একটি ছেলেকে রাস্তায় পেটাচ্ছে পুলিশ। আন্দোলন এখন হয়ে উঠেছে লা*শের গোরস্থান। পুলিশ আর সাধারণ মানুষের মধ্যে শুধু মত বিরোধই নয়, হানাহানিও চলছে। আফিমের হিসেব মতে স্বৈরাচারী গুলো আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরই লোক। নিজেদের করা দূর্নীতির প্রমাণকে ধামাচাপা দিতে নতুন চাল চালছে ওরা, সাধারণ মানুষকে দমিয়ে দিতে পুলিশদের লেলিয়ে দিয়েছে রাস্তায়। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে শহরের দুরবস্থা, দেশের শত্রুদের অতর্কিত হামলা, খুন, বোমা বিস্ফোরণ। সব কিছুর উর্ধ্বে দেশের শত্রু হটানোর দাবি তুলে ধরে নিজেদের বাঁচাতে চাইছে সরকারী দল। ভালো মানুষ সাজবে বলে সব কিছুকে সরিয়ে দেশকে রক্ষা করা, জনগনকে রক্ষা করার মিথ্যে ছল কষে নিজেদেরকে এই মামলা থেকে সরিয়ে ফেলতে চাইছে ওরা। কিন্তু আফিম তা কি করে হতে দেয়? সাধারণ জনগনকে বাঁচাবে, সরকারকেও নামাবে।
আফিম বাইক থেকে নেমে পুলিশের লোহার লাঠি ঠেলে সরায় ছেলেটির উপর থেকে। ক্ষিপ্ত, হিংস্র কণ্ঠে প্রশ্ন তোলে,

“- ওকে মারছেন কেন? কি করেছে ও? যারা হামলা করছে, গোলা ছুঁড়ছে তাদের ধরুন। নিরপরাধদের শাস্তি দিচ্ছেন কেন”?
পুলিশ শুনল না আফিমের কথা। বলল,
“- সর এখান থেকে। সবগুলোকে মেরে তাড়াবো।”
“- কি দোষ করেছে ওরা? সরকারের দূর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এজন্য মারছেন”?
পুলিশ রেগে বলল,
“- কিসের দূর্নীতি? সব দেশের শত্রুদের চক্রান্ত। সরকারকে নামানোর নাম করে দেশকে নষ্ট করবে”।
আফিম ক্ষেপে গিয়ে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
“- দূর্নীতিবাজদের হয়ে সাফাই গাইতে এসেছেন?, আমি থাকতে ওদের গায়ে হাত তুলতে দেবো না”।
আফিম কথাটা বলার সাথে সাথেই একটি লোহার বারি পরল আফিমের কাঁধে। আফিমের কাঁধ বেঁকে এলো তৎক্ষনাৎ। রেগে গিয়ে পুলিশের কলার চেপে ধরল সে। ধাক্কা দিয়ে পুলিশকে সরিয়ে সাথে সাথে ফোন উঠিয়ে কল করল কাউকে। নিজের দলবলকে একত্র করতে তার একটি ফোন-কলই যথেষ্ট। আরো কয়েকটি পুলিশ আফিমের দিকে তেড়ে এলে আফিমও সমানতালে লড়তে শুরু করল। একটি চ্যালাকাঠ তুলে প্রহার করে একের পর এক সরিয়ে দিল কয়েকটি পুলিশকে। পুরো রাস্তা সে একাই পরিস্কার করল পুলিশকে বারি দিয়ে সরিয়ক। আফিমকে দেখে সাধারণ মানুষও হিংস্র হয়ে একযোগে হাত তুলে বলল,

“- আইনমন্ত্রীর পদত্যাগ, দাবি এক, দফা এক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ, দাবি এক, দফা এক।”
শুরু হলো দু পক্ষের লড়াই। আফিমের মাথায় আসে না প্রমাণ থাকা সত্বেও এখনো ওদেরকে নামানো হচ্ছে না কেন পদ থেকে? এখনও কলকাঠি নাড়ার সুযোগ পাচ্ছে কি করে ওরা? আফিম ভাবল রাতে মিটিং এ বসবে পাড়ার ছেলেপেলের সাথে। যেভাবেই হোক বন্দরের সব দূর্নীতিকে ধামাচাপা দিতে দেয়া যাবে না।
একজন পুলিশ আফিমের গালে ঘুষি মারল। গাল কেটে ছুঁড়ে গেল না ঠিকই, তবে ফর্সা গালটায় কালসিটে দাগ পরল। তখনই একটি ফোন এলো আফিমের নাম্বারে। পুলিশদের চোখের আড়াল হয়ে, অসংখ্য মানুষের ভিড়ে লুকিয়ে সে ফোনটা সামনে মেলে ধরল। স্ক্রিনে অত্যন্ত সুন্দরী এক তরুণীর হাস্যজ্বল মুখ ভেসে উঠল। মাথায় ওড়না চেপে মেয়েটি রাস্তার পাড়ে হাঁটছে, চোখে মুখে একরাশ মায়া মেয়েটার। আফিমের ঠোঁটের কোণ বিস্তৃত হলো। সপ্তাহ খানেক আগে মৃত্তিকাকে একটি ফোন কিনে দিয়েছে আফিম। তার নম্বর এড করে দিয়েছে ফোনে। মৃত্তিকা সচরাচর তাকে ফোন করে না। আফিম নিজেই ফোন করে বউকে বিরক্ত করে। মৃত্তিকা ভার্সিটিতে গিয়েছিল সকালে। দুপুর হয়েছে, ফিরবে এখনই।
আফিম ফোনটা কানে তুলে বলল,

“- হ্যাঁ, বলো মৃত্ত”।
ওপাশ থেকে মৃত্তিকার স্বর ভেসে এলো না। বরং অন্য একটি মহিলার মোটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
“- আপনি মৃত্তিকার হাসব্যান্ড বলছেন? আপনার স্ত্রী রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছে। আসতে পারবেন”?
আফিম উত্তেজিত হয়ে পরল। মৃত্তিকার কি হলো হঠাৎ? সাথে সাথে জিজ্ঞেস করল,
“- ও ঠিক আছে? আঘাত পায়নি তো”?
ওপাশ থেকে ঠাণ্ডা স্বরে মহিলা বলে উঠল,
“- না, বড়সড় কিছু হয়নি। টেনশন করবেন না। হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গিয়েছে, জ্ঞান হারায়নি। ফুটপাতে পড়ে যেতে নিলে আমি ধরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এসেছি”।
আফিমের কথা পেঁচিয়ে এলো। ধরফর করে উঠল বুক। উত্তেজনা, আতঙ্ক কমল না মোটেও। বরং শুষ্ক ঠোঁট জিভে ভিজিয়ে বলল,

“- ওর পাশে একটু থাকুন, আমি আসছি”।
ঠিকানা জেনেই আফিম ভিড় থেকে বেরিয়ে বাইকে উঠল। বাইকের স্পিড বাড়িয়ে ছুটল মৃত্তিকার খোঁজে। বাতাসের তোপে আফিমের শুভ্র শার্ট উড়ে বুক, ঘাড়, উন্মুক্ত হয়ে উঠল। খুব অসহায় দেখাল আফিমকে। ঘাবড়ে গেল সে। মৃত্তিকার টেনশনে মাথাটা চক্কর কাটছে এবার। আফিম নির্দিষ্ট স্থানে এসে মন্তর পায়ে মৃত্তিকার দিকে এগিয়ে গেল স্থান, কাল ভুলে। মৃত্তিকা একটি গাছের নিচে সিমেন্টের বেঞ্চে বসে আছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি চল্লিশোর্ধ্ব মহিলা। আফিমকে দেখে দু কথা বলে তিনি বিদায় নিলেন। আফিম তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলল না।
মৃত্তিকা চোখ বুজে আছে। মাথাটা এমন ভাবে ঘুরছে, মনে হচ্ছে পৃথিবী দুলছে। আফিম তড়িৎ করে মৃত্তিকার পাশে এসে গা ঘেঁষে বসল। আঁকড়ে ধরল মেয়েটির নরম গা তার বুকের একপাশে। চিন্তিত, আহত সুরে বলল,

“- খুব খারাপ লাগছে? আমাকে আগে কল করলে না কেন? একা একা আসতে কে বলেছে তোমায়”?
মৃত্তিকা নিজের মাথাটা চেপে ধরল। বলল,
“- তেমন কিছু হয়নি”।
আফিম মৃত্তিকার কথায় মোটেও নিজের দুশ্চিন্তাকে উড়িয়ে দিতে পারল না। পাশে রাখা পানির বোতল দেখিয়ে বলল,
“- পানি খাবে? সকালে কিছু খেয়েছিলে”?
মৃত্তিকা মাথা নেড়ে বলল,
“- পানি খেয়েছি।”
“- পেছনে হসপিটাল আছে। কষ্ট করে ওঠো তো”।
আফিম দাঁড়িয়ে মৃত্তিকার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। মৃত্তিকা অসহায়ের মতো তাকাল আফিমের দিকে। নজরে পরল আফিমের কালসিটে দাগ পড়া মুখটা। আঁতকে উঠল সে। হাত বাড়িয়ে আফিমের গালে আঙুল ছুঁয়ে বলল,

“- আবার মারামারি করেছেন? ইশশ, কতটা লেগেছে!”
“- মারামারি করিনি, এক্সারসাইজ করতে গিয়ে লেগেছে”।
মৃত্তিকা এই সময়েও চোখ পাকিয়ে তাকাল আফিমের দিকে। তেজ দেখিয়ে বলল,
“- একদম মিথ্যে কথা বলবেন না। মিথ্যুক কোথাকার”।
আফিম ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল। বলল,
“- ঠিক আছে, তোমার স্বামী মিথ্যুক। এবার চলো, তোমাকে ডক্টর দেখিয়ে আসি।”
মৃত্তিকার মাথাটা আবার ঘুরতে শুরু করল। সাথে পেটের ভিতরের নাড়িভুঁড়িতেও জট পাকিয়ে উঠল মেয়েটার। ওয়াক ওয়াক করে হঠাৎই রাস্তায় বমি করে দিল মৃত্তিকা। ঝাঁঝে চোখ বেয়েও পানি গড়াল। আফিম সাথে সাথে মৃত্তিকার দিকে পানির বোতল বাড়িয়ে দিল। পিঠের কাছটায় হাত বুলিয়ে উৎকণ্ঠিত সুরে বলল,

“- মৃত্ত, একটুও যত্ন নাও না শরীরের। অসুস্থ হলে কিভাবে?”
মৃত্তিকা মলিন হাসে। পেটে আর কিচ্ছুটি নেই ওর। আফিমের হাত থেকে পানির বোতল নিয়ে পানি পান করে মৃত্তিকা, চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে নেয়। আফিম মৃত্তিকার ওড়নার কোণা টেনে এনল মুছে দেয় মৃত্তিকার মুখে লেপ্টে থাকা পানির কণা। সযত্নে হাতের আঙুল গলিয়ে দেয় মৃত্তিকার চুলের ফাঁকে। আফিমের মুখটাও মলিন হয়ে উঠেছে, প্রচণ্ড চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। এ মুহুর্তে লোকটাকে ভীষণই আদুরে, যত্নবান, দায়িত্ববান পুরুষ বলে মনে হয় মৃত্তিকার। তার উৎকণ্ঠা, ব্যতিব্যস্ততা উপভোগ করে মৃত্তিকা। মানুষটাকে না পেলে তার বড় ক্ষতি হয়ে যেতো।
“- আমি হাসপাতালে যাবো না। সরাসরি বাড়ি যাবো”।
আফিম ধমকে উঠল,

“- বমি করলে, মাথা ঘুরছে, ডাক্তার না দেখিয়ে বাড়ি যেতে চাইছো কোন আক্কেলে? আমার মেজাজ গরম করবে না মৃত্ত, কয়েকদিন ধরে তুমি খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম করছো। আমি কিছু বলছি না বলে তুমি যা ইচ্ছে করছো”।
মৃত্তিকা ঘাড় বাঁকিয়ে দেখে মানুষটাকে। মুগ্ধ চাহনি ফেলে হাসে নিঃশব্দে। বলে,
“- আপনি জানেন আমি অনিয়ম করছি”?
“- জানবো না? তোমার প্রতিটি মুভমেন্ট আমার জানা”।
মৃত্তিকা সগর্বে হেসে উঠল। বলল,
“- আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে আফিম। বাড়িতে গিয়েই বলবো। আমিই সর্বপ্রথম আপনাকে কথাটা জানাতে চাই। বাড়ি ফিরে চলুন”।
আফিমের ললাটে ভাঁজ দেখা দিল। বলল,

“- কি হয়েছে বলো তো”?
“- এখানে বলা যাবে না”।
আফিম তৎক্ষনাৎ মৃত্তিকাকে তুলে নিল কোলে। মৃত্তিকা প্রস্তুত ছিল। বরাবরের মতো ঘাবড়ে গেল না সে, পড়ে যাওয়ার ভয়ও পেল না। আফিম তাকে পাজোকোলে তুলে নিতেই সে আরাম বোধ করল। দু হাতে আঁকড়ে ধরল আফিমের গলা। চোখ বুজে গুটিশুটি মেরে পড়ে রইল চওড়া, প্রশস্ত বুকে।

বাড়িতে এসে মৃত্তিকা চোখ বুজে শুয়ে রইল বিছানায়। আফিম বাড়ি ফেরার পরপরই প্রশ্ন ছুৃঁড়ল না। মৃত্তিকাকে সময় দিল সে। গরম দুধ, আর ফলমূল এনে রাখল টি-টেবিলে। মৃত্তিকা রয়েসয়ে বলল,
“- একটু কাছে আসুন তো”।
বলতে দেরি হলেও আফিম প্রিয়তমার গা ঘেঁষে ঘনিষ্ঠ হতে দেরি করল না। বাচ্চামো সূলভ আচরণ করে পটাপট চুমু খেল মৃত্তিকার শুষ্ক ঠোঁটে। তার এহেন পাগলামিতে নতজানু হলো মেয়েটা। লজ্জায় গাল জোড়া রক্তিম হলো বেশ। আফিম মৃত্তিকার চিবুক উঁচিয়ে নিজের মুখ বরাবর রেখে বলল,
“- আমায় এত কষ্ট দাও কেন বোকা চাঁদ”?
মৃত্তিকা হাসল। বলল,
“- আমার কিছু হলে আপনি এত কষ্ট পান-ই বা কেন? বলেছি আমি? বলেছি আমার জন্য চিন্তা করুন? ব্যগ্র হন? অস্থির, উত্তেজিত হয়ে পড়ুন”?
আফিম চিবুকে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“- বলতে হবে কেন? তুমি আমার না”?
মৃত্তিকা কথা বলল না। তার নিরবতা মোটেই পছন্দ হলো না মাস্তানটার। অস্থির হয়ে উঠল সে। মৃত্তিকার চিবুকে আফিমের খসখসে আঙুলের চাপ দৃঢ় হলো। ভালোবাসার ছাপ যেন আৃকতে চাইল ফর্সাটে রমণীর চিবুকে। ব্যাকুল চিত্তে রাগ দেখিয়ে লোকটা ফের শুধাল,
“- বলো, তুৃমি আমার না”?
মৃত্তিকা জবাব দিল না। বলল,
“- পাগলামো করছেন কেন? একটা জরুরি কথা বলতে চেয়েছিলাম। মনে আছে? শুনবেন না কথাটা”?
আফিম দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“- প্রথমে বলো তুমি আমার”।
মৃত্তিকা হার মেনে নিচু সুরে বলল,
“- হু, আপনার”।
আফিম স্থির হলো। দুরত্ব বজায় রেখে বসল। বলল,

“- বলো”।
মৃত্তিকার নজর স্থির হলো আফিমের চোখের দিকে চেয়ে। কথাটা বলতে বড্ড অস্বস্তি, সংকোচ হচ্ছে তার। সামনের মানুষটি উক্ত কথার পরিপ্রেক্ষিতে কিরকম অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে তা তার জানা নেই। লজ্জায়, আড়ষ্টতায় নুইয়ে পরল মৃত্তিকা। তার লাজুক মুখশ্রী আফিমকে আরো অস্থির করে তুলল। বলল,
“- বলছো না কেন”?
মৃত্তিকা নিজেকে সহজ করার চেষ্টা চালিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
“- আপনি বাবা হতে চলেছেন আফিম”।

ব্যাস। মৃত্তিকার মিনমিনে আওয়াজের নতুন শব্দ গুলো শুনে থমকে গেল আফিম। পুরো ঘরটায় আর কোনো শব্দ শোনা গেল না। আফিম নিশ্চুপ, নির্জীব৷ কথা বলার সমস্ত শক্তি সে হারিয়েছে। কণ্ঠনালি চিঁড়ে একটা শব্দও বের করতে পারল না সে। ওদিকে মৃত্তিকা অধীর আগ্রহে আফিমের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য অপেক্ষা করল। ভাবল আফিম খুশিতে হয়তো চিৎকার করে উঠবে। কিন্তু তেমন কোনো লক্ষ্মণ তার মাঝে না দেখে আশাহত হলো মৃত্তিকা। মাথা নত হলো তার। আফিম কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পরল, অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল মৃত্তিকার পানে। দু হাতে নিজের পুরো মুখ ঢেকে ফেলল সে। লাল হয়ে উঠল তার ফর্সা মুখ। অভিব্যক্তি প্রকাশ করার যুক্তিযুক্ত শব্দ খুঁজে পেল না সে। ‘বাবা’,শব্দটার ভার কতটা? আফিম বাবা হবে? ছোট্ট একটি প্রাণ তার বুকে লেপ্টে থাকবে? বাবা বাবা বলে বুলি আওড়াবে? তখন কেমন অনুভুত হবে? কতটা আনন্দে প্রাণ কাঁদবে?
কোনো উত্তর না পেয়ে মৃত্তিকা মাথা তুলল। দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে সোজাসাপটা প্রশ্ন করল,

“- আপনি খুশি হননি?”
আফিম কোনো কথা বলল না। কেবল মৃত্তিকার ডান হাত টেনে নিজের বুকের বা পাশে চেপে ধরল। মৃত্তিকা অনুভব করল আফিমের হৃৎস্পন্দন খুব দ্রুত প্রবাহিত হচ্ছে। ধক ধক করছে বুক। আফিম অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“- আমি জানি না। তুমি বুঝে নেবে একটু? আমি বুঝতে পারছি না”।
পরক্ষণেই আফিম মৃত্তিকার একটু কাছে এসে বলল,
“- তুমি শিওর মৃত্ত? তোমার পেটে আমাদের বাচ্চা আছে? কোনো ভুল হচ্ছে না তো”?
মৃত্তিকা সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি প্রেগ্ন্যাসি কিট বের করল। কিটটা আফিমের দিকে ঘুরিয়ে ধরতেই আফিমের সবুজাভ চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ঢোগ গিলে পুনরায় অদ্ভুত প্রশ্ন ছুঁড়ল
“- ও কি নড়াচড়া করছে? ব্যথা দিচ্ছে তোমাকে”?
মৃত্তিকা বিরক্ত সুরে বলল,

“- ও কেবলই ছোট্ট একটা ভ্রুণ। মাত্র কয়েক সপ্তাহর”।
আফিম এক দৃষ্টিতে মৃত্তিকার পেটের দিকে তাকিয়ে রইল। লজ্জা পেল মৃত্তিকা। ওড়না দিয়ে ঢাকল তলপেট। আফিম নিজেকে ধাতস্থ করতে কিছুটা সময় নিল। অতঃপর হামলে পরল মৃত্তিকার উপর। মৃত্তিকার কোমর আঁকড়ে ধরে মিশিয়ে নিল নিজের সাথে। এক নাগারে চুমু দিয়ে ভিজিয়ে দিল মৃত্তিকার ঘাড়। বলল,
“- এত সুখ আমি রাখবো কোথায়? আমার মৃত্ত, আমার বোকা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। অনেক অনেক ভালোবাসি পাখি।”
মৃত্তিকা গাল ভরে হাসল। হঠাৎই আফিম মৃত্তিকার ঘাড়ে নাক ঘষে কাতর, অসহায় সুরে বলে উঠল,
“- জান, প্লিজ ওকে মেরে ফেলিস না। ওকে আসতে দিস। আমি ওকে ছুঁয়ে দেখবো”।
আফিমের হঠাৎ এই পরিবর্তনে মৃত্তিকা অবাক হলো। তাকে কিছু বলতে না দিয়ে আফিম মৃত্তিকার গালে হাত বুলিয়ে বলল,

“- অ্যাবরেশন করিস না প্লিজ। মৃত্ত, আমি তোকে কথা দিচ্ছি, তোর ক্যারিয়ারের কোনো ক্ষতি হবে না। তোর ফিটনেস নষ্ট হবে না। পেইন ওঠার আগেই আমি তোকে হসপিটালে এডমিট করাবো। তবুও ওকে মারিস না প্লিজ। আমার রক্ত, আমার জাত, আমার বংশকে আমার হাতে তুলে দিস মৃত্ত। আমি কোনোদিন তোর কাছে কিছু চাইবো না।”
মৃত্তিকা আফিমের এক নাগারে বলা উদ্ভট কথাগুলো শুনে থমকে গেল। বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
“- আমি ওকে মারবো কেন? ও আমারও সন্তান। মা হয়ে আমি ওকে শেষ করবো কেন”?
আফিম তোয়াক্কাই করল না মৃত্তিকার কথার। সে আচমকা উত্তেজিত, অস্থির হয়ে পড়েছে। আফিম আবারও বলে ওঠে,
“- আমাদের বিয়ের বয়স বেশি হয়নি, তোর ক্যারিয়ার ও গোছানো হয়নি। তাই বলে ওকে তো শেষ করে দেয়া যায় না। আমরা তো এখনই চাইনি ওকে, কিন্তু আল্লাহ্ দিয়েছেন। আমাদের ওকে ভালোবাসা উচিত তাই না”?
মৃত্তিকা নাজুক কণ্ঠে বলল,

“- আমি কি এসব বলেছি কখনল? আপনি এগুলো বলছেন কেন”?
আফিমকে নিজের ঘাড় থেকে সরায় মৃত্তিকা। আফিমের মুখোমুখি হয় সে। আফিমকে তার অচেনা মনে হচ্ছে। সর্বক্ষণ হম্বিতম্বি করা মানুষটাকে আজ বড্ড অসহায় দেখাচ্ছে। মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করল,
“- কে আপনাকে এসব বলেছে? ক্যারিয়ারের জন্য আমি আমাদের বাচ্চাকে মেরে ফেলবো আপনি ভাবলেন কী করে”?
আফিম তাচ্ছিল্য করে হাসে। মৃত্তিকার হাতের তালুতে বেশ কয়েকবার ঠোঁট বসিয়ে বলে,
“- আমার আম্মু আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, যখন আমি তার গর্ভে ছিলাম। তোমাকে বলেছিলাম আমার আম্মু তার প্রেমিকের সাথে পালিয়েছিল বাবার সবকিছু নিয়ে?”
মৃত্তিকা মাথা নাড়ল। আফিম বলতে শুরু করল,

“- আম্মু যার সাথে পালিয়েছিল অর্থাৎ লিজার যে বাবাকে তুমি দেখলে, তার সাথে আম্মুর প্রেম ছিল বাবার সাথে বিয়ে হবার আগে থেকেই। কোনো একটা কারণে তাদের দুজনের ব্রেকআপ হয়ে যায় আর বাবার সাথে আম্মুর বিয়ে হয়ে যায়। ওদিকে ওই লোকও বিয়ে করে বসে। দুজন দু দিকে চলে গেলেও আম্মু তার প্রাক্তনকে ভুলতে পারেনি। বাবাকে সে কখনোই মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। তাদের সংসারটা নামেই একটা সংসার ছিল। প্রকৃত অর্থে আম্মু মনে মনে ভালোবাসতো তার প্রাক্তনকেই। বাবা বিয়ের কিছুূদিন পরেই কথাটা জেনেছিলেন। কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন সব ঠিক হয়ে যাবে। সংসার করতে করতে ঠিক আম্মু মানিয়ে নেবে সবকিছু, ভালোবেসে ফেলবে বাবাকে। কিন্তু আম্মু ভালোবাসার অভিনয় করেছে কেবল। এর মধ্যে আমি আম্মুর গর্ভে আসি। ক্যারিয়ার আর ফিটনেসের দোহাই দিয়ে আম্মু অ্যাবরেশন করাতে চেয়েছিল বারবার। কিন্তু আল্লাহ্ তা চায়নি বলেই আমার নানু আম্মুকে গর্ভপাত করতে দেয়নি। সেজন্যই আমি পৃথিবীতে আসতে পেরেছি। আমি হওয়ার পর আম্মু অবশ্য আমাকে ভালোবাসতো, আমার খেয়াল রাখতো। মাতৃত্বের টানে আমার দেখভাল করতো। আমি হওয়ার কয়েক বছর পর ওই লোকের স্ত্রী মারা গেলে আম্মু আবারও যোগাযোগ করে তার প্রাক্তনের সাথে। এবার তাদের অবৈধ প্রেম পরিণত হয় পরকীয়ায়। আর তারপর সব ছেড়ে, আমার মায়া ত্যাগ করে সে চলে যায় তার প্রেমিকের সাথে। বাবাকে কাঁদায়। আমি চাইনি বাবা তার মৃত্যুর সংবাদটা জানুক। এতে বাবা আবার কষ্ট পাবে, কাঁদবে। আমি চাই না বাবা ওই মহিলার মুখদর্শন করুক”।
মৃত্তিকা সবটা শুনে থ হয়ে গেল। আফিমের ঘাড়ে হাত রেখে তাকে আশ্বস্ত করে বলল,

“- আমি এমন কিছু করবো না, কথা দিচ্ছি”।
আফিম প্রশান্ত হয়ে বলে,
“- এসব আমাকে কে বলেছে জানো? আমার নানু। তিনি আম্মুকে ত্যাজ্য করেছিলেন”।
আফিম ঘর থেকে বেরিয়ে গেল উৎফুল্ল চিত্তে। সোজা ছুটে গেল বাবার ঘরে। আশরাফ মির্জা খবর দেখছিলেন টিভিতে। আফিম তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,
“- একটু দাঁড়ান তো”।
আশরাফ মির্জা দাঁড়াতেই আচমকা আফিম জড়িয়ে ধরল বাবাকে। এতটাই প্রবল চাপে বাবার সাথে কোলাকুলি করল সে যে স্তব্ধ হয়ে গেলেন আশরাফ মির্জা। তব্দা বনে গিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“- হঠাৎ বাবার সাথে এত খাতির”?
আফিম গাল ভরে হাসল। তাকে অত্যধিক সুখী দেখাল তাকে। খুশিতে আটখানা হয়ে সে বলল,
“- আমি বাবা হতে চলেছি। আপনি দাদু হচ্ছেন”।
খুশিতে লাফিয়ে উঠলেন আশরাফ মির্জা। অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে বললেন,
“- কি বলো? আমি দাদু হচ্ছি? আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ্।

রাতের দিকে গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে আফিমের। শুধু কি কেবল জ্বর? মাথা ব্যথা, বুক ব্যথা, শরীর ব্যথা সব একত্রে জেঁকে ধরেছে তাকে। কম্ফোর্টার জড়িয়ে শুয়ে আছে সে। মৃত্তিকা বিচলিত হয়ে পরল আফিমের অসুস্থতায়। জোর করে খাইয়ে দিয়ে ঔষধ খাওয়াল তাকে, জলপট্টি দিল মাথায়। তবুও জ্বর কমার লক্ষণ নেই। শেষমেশ আফিমের মাথায় পানি ঢালবে বলে ওয়াশরুমের ট্যাপ ছেড়ে দিল মৃত্তিকা। পানি পড়ার শব্দ শুনে আফিম উচ্চৈস্বরে ডাকল মৃত্তিকাকে। রেগেমেগে বলল,
“- অ্যাই, তুমি এত রাতে গোসল করবে নাকি”?
মৃত্তিকা ভেংচি কেটে বলল,
“- গোসল করবো কেন? আপনার মাথায় পানি ঢালবো।”
আফিম চোখ মেলে তাকাল। জ্বরে মুখ তেঁতো হয়ে আছে। মাথায় যন্ত্রণায় চোখ মেলে রাখা দায়। তবুও হুংকার ছেড়ে বলল,

“- চটকনা মেরে গাল ফাটিয়ে দেবো তোমার। নাটক করো নাকি? বালতি টেনে নিয়ে আসো, পা ভাঙবো তোমার। আমার বাচ্চা ব্যথা পাক শুধু”।
মৃত্তিকা রেগে গেল। জ্বরে গা পুড়ছে, তবুও লোকটার জেদ কমে না। এত রূঢ় আচরণ করার কি আছে? কথাটা ভালোভাবে বললেও তো হয়। এমন হুংকার ছেড়ে কথা বলার কি হয়েছে? ত্যক্ত বিরক্ত সুরে মৃত্তিকা জবাব দিল,
“- থাপড়াবেনই তো। বিয়ের আগে থেকে এ অবধি আমাকে মেরেই যাচ্ছেন”।
আফিমের সবুজাভ চোখ ঝাপসা। অবাক সুরে সে বলল,
“- তোমাকে কবে মেরেছি আমি? ফাউল কথা বলো কেন”?
মৃত্তিকাও সমান রেগে বলল,
“- আঘাতে মারেননি ঠিকই, কথায় তো মারছেন। এভাবে কেউ কারো স্ত্রীর সাথে কথা বলে? ভদ্রতা নেই একটুও। মাস্তানি সব জায়গায় চলবে না”।

আফিম উঠে বসল চট করে। মৃত্তিকা ঘাবড়ে গেল। এখন আবার তেড়ে আসবে নাকি লোকটা? জ্বরে হুঁশ হারিয়েছে বোধহয়। কারণ ছাড়াই রেগেমেগে অস্থির হচ্ছে কেন? আফিম মারামারি করেছে, আঘাত পেয়েছে। এ কারণেই জ্বরে ভুগছে। লোকটা ঠিক কী কারণে মারামারি করেছে মৃত্তিকা জানে না। আফিম তেড়ে এলো ঠিকই, কিন্তু মৃত্তিকার গায়ে হাত তুলল না। মৃত্তিকাকে আচমকা কাঁধে তুলল সে। একটানে কাঁধে তুলে বিছানায় নিয়ে বসাল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“- কাল থেকে বাড়ির কোনো কাজ করবে না। আমি না করেছি মানে না। নাচানাচি করতে হলে বাপের বাড়ি গিয়ে করবে”।
মৃত্তিকা মিটিমিটি হেসে বলল,

“- ঠিক আছে, কালই বাবার বাড়ি চলে যাবো।”
আফিম দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“- পুঁতে ফেলবো একদম। আমার বাচ্চা পেটে নিয়ে আমাকে দাম দাও না? কদর করো না? স্বার্থপর, বেইমান মেয়ে”।
“- জ্বরে হুঁশ হারিয়েছেন? মাত্র বললেন চলে যেতে, আর এখন বলছেন গেলে মারবেন”?
আফিম দু কোমরে হাত চেপে বলল,
“- চলে যেতে বললে ঠিকই শোনো, থেকে যেতে বললে তালবাহানা করো।”
“- আছিই তো, সবার বিরুদ্ধে গিয়ে আপনার কাছে থেকেছি না? মিথ্যে অভিযোগ করছেন কেন”?
আফিম হাঁটু গেড়ে বসল মৃত্তিকার পায়ের কাছে। মৃত্তিকা বিচলিত হয়ে বলল,
“- আপনার জ্বর আফিম, মেঝে ঠাণ্ডা। নিচে বসছেন কেন”?
আফিম বারণ শুনল না। বিছানায় পা দুলিয়ে বসা মৃত্তিকার কোলে মাথা গুঁজল সে। তলপেটে কাপড়ের উপরেই চুমু বসিয়ে বলল,

“- হাত বুলিয়ে দাও মাথায়”।
“- আপনি উঠুন আগে”।
“- ওর সাথে কথা বলবো”।
“- কার সাথে”?
“- আমার রক্ত, আমার জাত”।
“- ও বড় হয়নি তো”।
“- তুমি বিরক্ত করো না। আমি ওর অস্তিত্ব টের পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। ওর পেটে আসা থেকে শুরু করে কোলে আসার মুহুর্ত গুলো ইনজয় করবো। ও জানুক, ওর পাপা ওকে কতটা ভালোবাসে”।
“- আর বাবুর মাকে? বাবুর মাকে ভালোবাসেন না”?
আফিম রেগে গেল। ধমকে বলল,

“- মৃত্ত, ওর সাথে কোনো তুলনা তুলবে না তুমি। আমার পছন্দ না। আমার বংশের সাথে তোমার কিসের শত্রুতা?”
“- ওকে বেশি ভালোবাসবেন?”
“- তোমাকে কম বাসি”?
মৃত্তিকা প্রত্যুত্তর করল না। আফিম ফের অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“- তোমাকে কম ভালবাসি আমি”?
মৃত্তিকা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“- উঁহু, অনেক ভালোবাসেন”।

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৪

শোনা মাত্রই আফিমের বুকের ভার নেমে গেল। প্রশান্তি অনুভব করল সে। জ্বরের ঘোরে বলল,
“- আমাকে একটু ভালোবেসো বউ। বিশ্বাস করো, তোমায় পেতে যতটা মরিয়া হয়েছি, যতটা উন্মাদ হয়েছি, ততটা ব্যাকুল আমাকে কেউ কখনো হতে দেখেনি। তোমার সামনে যতটা নত হয়েছি, ততটা নত কেউ আমায় করতে পারেনি। আমি সত্যি বলছি, আমি তোমার পাগল, তোমাতে পাগল”।

ওরা মনের গোপন চেনে না শেষ পর্ব