Home ওরা মনের গোপন চেনে না ওরা মনের গোপন চেনে না শেষ পর্ব 

ওরা মনের গোপন চেনে না শেষ পর্ব 

ওরা মনের গোপন চেনে না শেষ পর্ব 
বৃষ্টি শেখ

পনেরো দিন প্রায় অসহযোগ আন্দোলন চলল শহর জুড়ে। জনগন হিংস্র হয়ে উঠল খুব দ্রুত। মিছিলে মিছিলে ঘিরে গেল গোটা ঢাকা শহর। রাস্তা অবরোধ করে সরকারের নিকট দাবি উপস্থাপন করল সাধারণ মানুষ। এ পুরো আন্দোলন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তদারকি করল আফিম মির্জা। দল তৈরি, দলের মানুষদের নির্দেশনা, সরকারকে ভাঙার মূলমন্ত্র সবই গড়ে তুলল আফিম। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে দিন রাত রাস্তাঘাটে পড়ে রইল সে। বাড়িতে ফেরার সময় পেল না ছেলেটা, গর্ভবতী স্ত্রীকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে পারল না। মৃত্তিকার পেটে বাচ্চা আসার সময় আফিম প্রতিজ্ঞা করেছিল মৃত্তিকার কাছে কাছে থাকবে, তাকে সব রকম সাহায্য করবে, মৃত্তিকার সর্বক্ষেত্রে সঙ্গী হবে সে। মৃত্তিকাকে সময় দেয়ার যে পণ সে করেছিল তা ভেঙে ফেলেছে আফিম। মাঝ রাতে সে বাড়ি ফেরে, মৃত্তিকা তখন ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকে। আফিম ভুল করেও মেয়েটিকে জাগায় না। পাশে শুয়ে প্রিয়তমার মেয়েলি দেহের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে নেয় নিজ দেহে। তৃষ্ণার্ত চোখ গুলোকে শান্তি দেয়। যেটুকু সময় ঘরে থাকে, তার অর্ধভাগ কাটে মৃত্তিকার মুখ পানে চেয়ে।
জাহানারা ইরফানকে দুধ খাইয়ে ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। মেহমেত ফিরেছে ঘন্টাখানেক আগে। ঘর ঝাড় দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে সে মেহমেতের পাশে এসে বসল। একটু সময় চুপ থেকে বলল,

“- মৃত্তিকা অনেকদিন হলো এ বাড়িতে আসে না। ফোন দিয়ে বলো ঘুরে যেতে”।
মনোয়ারা নাতিকে নিতে এসেছিল। জাহানারার মুখে এ কথা শুনে সে অবাকই হলো। বলল,
“- মৃত্তি ওখানেই ভালো আছে। এখানে আসলে সারাদিন ফাই-ফরমায়েশ খাটতে হবে। ও বাড়িতে মানুষ কম, কাজ-কাম ও কম। মেয়ে আমার ও বাড়িতেই থাকুক”।
জাহানা তপ্ত শ্বাস ফেলল। বলল,
“- অনেকদিন হলো আসে না। ঘুরে যাক একটু। শুক্রবার আপনার ছেলে গরুর মাংস আনল, একটু পোলাও-মাংস রেঁধে খাওয়াতাম”।
বিদ্রুপাত্মক সুরে মনোয়ারা বলল,
“- ননদকে কবে থেকে এত ভালোবাসতে শুরু করলে”?
জাহানারা মৃদু হেসে বলল,
“- যবে থেকে ইরফানের মা হয়েছি, তবে থেকে। মৃত্তিকাকে কতই না গালমন্দ করেছি, দিন শেষে এই মেয়েটাই আমার পাশে ছিল। ইরফান হওয়ার সময়টায় মৃত্তিকা আমাকে সাহায্য করেছিল, হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিল। সেসব ভুলিনি”।
মেহমেত বলল,

“- একা একা বাড়িতে কেমন থাকে কে জানে?ফোন দাও, এসে দুদিন থেকে যাক। আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসবো”।
মনোয়ারা তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের কথা শুনে তৃপ্ত হলো। তখনই মৃত্তিকাকে ফোন করে আসতে বলল। মৃত্তিকা জানাল সে আজই আসবে। একা একা ভালো লাগছে না বাড়িটায়। কথাটা শোনামাত্র জাহানারা ফ্রিজ থেকে ডিম, দুধ, মাংস বের করল। ইরফানকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেই রান্নাঘরে ঢুকল। মনোয়ারা অবাক হয়ে বলল,
“- তুমি রান্না করবে নাকি”?
জাহানারা হেসে উত্তর দিল,

“- আমিই আমার ননদকে রেঁধে খাওয়াবো। বিয়ের পর থেকে ননদের হাতের রান্নাই তো খেয়েছি”।
মৃত্তিকার পেটের বাচ্চার বয়স সবে তিন মাস। ভালো করে কিছুই খেতে পারে না সে। একটু ভারী খাবার খেলেই গা গুলিয়ে বমি আসে, মথা ঘোরে। এ দুমাসেই দুর্বল হয়ে পড়েছে সে। আফিমের চিন্তায় আরো শুকিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। তবে আফিমকে বুঝিয়ে লাভ নেই। সে বেপরোয়া ধাঁচের। থেমে যাওয়া তার স্বভাবে নেই। রাত-দিন ক্লাবে থেকে শহরের ছেলেপেলেদের নিয়ে মিটিং করে। বাড়িমুখো হওয়ার কিঞ্চিৎ তাড়া দেখা যায় না তার মাঝে। মৃত্তিকা নীল পাড়ের সাদা শাড়ি পড়ে বেলকনিতে বসে ছিল। সময় কাটে না তার। আশরাফ মির্জার সাথে টিভি দেখেছে কিছুক্ষণ আগে। লুডু আর দাবাও খেলেছে বাপ-মেয়ে মিলে। দাদু হবার আনন্দে রীতিমতো হই হই ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।
মেহমেত নিজে নিতে এসেছে মৃত্তিকাকে। এ বাড়িতে সে আগে কখনো আসেনি। আজ বড় ভাইকে নিজের বাড়িতে পেয়ে মৃত্তিকা খুব খুশি হলো। বেশ কিছু সময় আশরাফ মির্জার সাথে কথা বার্তা বলে মেহমেত মৃত্তিকাকে নিয়ে বাড়ি ফিরল। মৃত্তিকার ব্যাগ বহন করল মেহমেত। মৃত্তিকা গাল ভরে হাসল। ভাই তার সাথে সহজ হয়ে উঠেছে। আফিমের সাথে চলে আসার পর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাদের। এতে অবশ্য দোষ নেই কারো। অমন বখাটে, বেকার, ভবঘুরে ছেলের সাথে কোনো ভাইই তার বোনকে বিয়ে দিতে চাইবে না। মেহমেত ও চায়নি। সে মৃত্তিকাকে ভালো ঘরে, ভদ্র ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। মৃত্তিকা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভেবে রেগে আর যোগাযোগ করেনি। এখন মৃত্তিকার পেটে বাচ্চা আছে, আফিমের সাথে মৃত্তিকা অনেক ভালো আছে জানার পর বোধহয় তার রাগটা কমেছে।

মৃত্তিকা বাড়িতে এসে তার জন্য বিশাল আয়োজন দেখতে পেল। পোলাও এর ঘ্রাণ আসছে রান্নাঘর থেকে। গরুর মাংস রান্না করছে জাহানারা। মৃত্তিকাকে দেখেই সে হাসল। ড্রইংরুমের ফ্যান ছেড়ে দিল। ইরহাম মনির কোলে উঠতে চাইলেই চোখ পাকিয়ে ইরহামকে ধমক দিল জাহানারা। রাগী সুরে বলল,
“- গাড়িতে চড়ে এসে মনি অনেক ক্লান্ত। পরে কোলে উঠো, মনিকে আরাম করে বসতে দাও”।
মৃত্তিকা জাহানারার এহেন পরিবর্তনে বিস্মিত হলো ভীষন। ইরফানের ঘুম ভেঙে গেল। জাহানারা তাকে ড্রইংরুমে এনে বুকের দুধ দিল। মনোয়ারা ওই সময়ে রান্নাঘরে ঢুকল। মৃত্তিকা ভাবিকে জিজ্ঞেস করল,
“- কেমন আছো? দুটো বাচ্চা নিয়ে কেমন যাচ্ছে দিন”?
জাহনারা হেসে বলল,

“- তুমি নেই, একা একা দুটো বাচ্চা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি মৃত্তিকা। তুমি পাশে থাকলে সবকিছু সহজ লাগে”।
জাহানারার অকপটে বলা স্বীকারোক্তি ঠিক হজম হলো না মৃত্তিকার। জাহানারা বুঝতে পারল বিষয়টা। বলল,
“- তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি মৃত্তিকা। এতদিন পর বুঝতে পেরেছি তুমি অসাধারণ একজন মানুষ। ইরফানকে একা সামলাতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি আমাকে তুমি ঠিক কতটা সাহায্য করে এসেছো দিনের পর দিন। বাচ্চা পেটে নিয়ে কোনোদিন রান্না করিনি। ভার্সিটি, টিউশন সামলে তুমি ঘরের কাজ করেছো, ইরহামকে রেখেছো। আমার সাথেও কোনলদিন খারাপ ব্যবহার করোনি। অথচ দিনের পর দিন আমি শুধু তোমাকে ব্যবহারই করে গিয়েছি, তোমার ভালোমন্দ না বুঝে কেবল নিজের কাজ করিয়েছি”।
মৃত্তিকার ভীষণ অস্বস্তি হলো কথাগুলো শুনে। পর মানুষের মুখে প্রশংসা শুনতে খুব ভালো লাগলেও আপন মানুষের মুখে দুটো ভালো কথা শুনলে খুব অস্বস্তি হয়, বিব্রত লাগে। সে লজ্জা পেয়ে বলল,

“- এসব থাক ভাবী। আপনি, ইরহাম ওরা আমার আপন। তাই করেছি”।
অসহায় মুখ করে জাহানারা বলল,
“- আমাকে মাফ করে দিও মৃত্তিকা। অনেক দুর্ব্যবহার করেছি, ক্ষমা করে দিও”।
মৃত্তিকা জাহানারার হাত চেপে ধরল। বলল,
“- সব ভুলে যাও। যা হয়েছে তা তো হয়েছেই”।
মৃত্তিকা ইরফানকে দুধ খাইয়ে উঠতে উঠতে বলল,
“- বসো, শরবত আনি।”

ইরফানকে ড্রয়িংরুমের দোলনায় শুইয়ে জাহানারা মৃত্তিকাকে শরবত এনে দিল। শরবতের গ্লাস মৃত্তিকার হাতে দিয়েই ফের ছুটল রান্নাঘরে। আতিকুর রহমান এসে মেয়ের পাশে বসলেন। এটা-সেটা জিজ্ঞেস করলেন। মৃত্তিকা দুয়েকবার কল করল আফিমকে। তার দেখাই পাওয়া যায় না আজকাল। ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।
রাতের খাবার খেতে বসে মৃত্তিকা কিছুই খেতে পারল না। গাল ভরে বমি করে ভাসাল সে। একটু গরম দুধ আর সিদ্ধ ডিম খেল শুধু। আজই কি মনে করে যেন আফিন সন্ধ্যায় ফোন করল মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকার চিত্ত চনমনে হয়ে উঠল। লোকটার সাথে ইদানীং কথা হয় কম। যতটুকু হয়, ততটুকুতে মন ভরে না মৃত্তিকার। বলতে বলতেই লোকটা ফোন কেটে দেয়। আগে অনেক মন খারাপ হতো। এখন সে নিজের মনকে মানিয়েছে, বুঝিয়েছে। বখাটেদের বউদের অত মন খারাপ করলে চলে না। দেশের জন্য লড়াই করা মানুষদের ঘরে আটকে রাখা চলে না। তাদের বউদের মন শক্র হতে হয়, ইস্পাতের মতো দৃঢ়। তবেই সংসার টিকে থাকে। অবুঝের মতো স্বামীর কাছে আহ্লাদ করাটা সাজে না মৃত্তিকার। কারণ সে সব বোঝে, সব জানে। মাঝে মাঝে মৃত্তিকার মনে হয় সে অবুঝ, নাদান হলেই ভালো হতো। বেশি বোঝে বলে সবাই ওকে বুঝদার ভেবে বোঝাতে আসে না, মানাতে আসে না। কারণ তারা জানে, মৃত্তিকা বোঝে। তাকে বোঝানোর কিছু নেই, সে অযথা রাগ করার মেয়ে না, পাগলামি করার মতো মেয়ে না। অথচ মৃত্তিকা জানে, তার কতটা পাগলামো করতে ইচ্ছে হয়, অবুঝের মতো আফিমকে আটকে রাখতে ইচ্ছে হয়, সর্বক্ষণ মানুষটাকে চোখে চোখে রাখতে সাধ জাগে।
ফোনটা ধরল মৃত্তিকা। ওপাশ থেকে আফিম বলল,

“- বাড়ি ফিরছি, বাবু কি খাবে? কি আনবো বাবু আর বাবুর মায়ের জন্য”?
মৃত্তিকা মুখ গোমড়া করে বলল,
“- আমি বাড়িতে নেই। কিছুই আনতে হবে না”।
একটা নীরবতায় ছেয়ে গেল ওপাশ। আফিম শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-” কোথায় আছো”?
“- ভাইয়া নিয়ে এসেছে। কয়েকদিন থাকবো মায়ের কাছে”।
“- ঠিক আছে, আমি আসছি”।
মৃত্তিকা ত্যক্ত সুরে বলল,
“- আসতে হবে না।”
আফিম অবাক সুরে প্রশ্ন করল,
“- কেন”?
মৃত্তিকা জবাব দিল,
“- এসে কি করবেন? কতই আর সময় হবে আপনার? একটু পরই তো চলে যাবেন। এর চেয়ে ভালো বাড়ি ফিরে যান”।
আফিম চট করে ধরে ফেলল মৃত্তিকার অভিমানের পরিমাণ। আদুরে স্বরে শুধাল,

“- রাগ করেছো মৃত্ত”?
“- না”।
“- এভাবে কথা বলছো কেন”?
মৃত্তিকা বুঝল, সে শুধু শুধু কড়া কথা বলছে। তার কণ্ঠ আপনা-আপনি, অযথাই রূঢ় শোনাচ্ছে। সে নিজেকে শুধরে বলে,
“- স্যরি আফিম, আমার মুড সুইং হচ্ছে। এজন্য আরকি কথা এমন শোনাচ্ছে”।
আফিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাইকের গতিটা কমাল। বড্ড আক্ষেপের সুরে বলল,
“- তুমি এত বোঝো কেন পাখি? এতটা বুঝদার হয়েছো কেন? আমাকে রাগ ভাঙানোর সুযোগ দাও না, অভিমান-অভিযোগ কমানোর সুযোগ দাও না। কেন এত ম্যাচিওর হয়েছো মৃত্ত”?
মৃত্তিকা বেলকনির দরজা খুলল। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল,
“- আপনি তো এমন পরিপক্ব বউই চেয়েছিলেন আফিম। মনে নেই? আপনি বলেছিলেন ন্যাকামো, আহ্লাদ করা মেয়েদের আপনার পছন্দ নয়। আপনার শক্ত মনের মানুষ পছন্দ”।

“- বলেছিলাম। কিন্তু এখন আমার মৃত্তর আহ্লাদী, আদুরে কথা শুনতে ইচ্ছে করে। অভিমানে বুঁদ হয়ে গাল ফুলিয়ে রাখা সুন্দরীর গালে টপাটপ চুমু খেয়ে হৃদয়কে প্রশান্ত করতে ইচ্ছে করে”।
মৃত্তিকা লাজে লাল হলো। চিবুক ছুঁলো কণ্ঠদেশে। শাড়ির আঁচল আঙুলে পেঁচিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“- ড্রাইভ করার সময় বেশি কথা বলতে নেই। কল কাটুন”।
“- তুমি লজ্জা পাচ্ছো মৃত্ত? কতদিন হলো তোমার লাজে রাঙা মুখটা দেখি না।”
“- আপনি বেশি কথা বলেন। কাজ হয়েছে ওদিকের?”
“- আজ সরকারী মিটিং বসবে, কাল জানা যাবে। আশা রাখছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর আইনমন্ত্রীর পদত্যাগ হবে। আর ওদের জন্য এই আন্দোলনে যারা যারা মারা গিয়েছে, সবার মৃত্যুর শাস্তি ওদের পেতে হবে”।
“- যাক, এতদিনে তবে আপনার কাজ কমল। ঘরে ফেরার সময় হলো”।
আফিম হাসল। বলল,

“- আমি আসছি, বাবুর খেয়াল রাখো”।
মৃত্তিকা কল কাটল। কিছুক্ষণ পরই আফিম ফিরল। মনোয়ারা আফিমকে পেয়েই খেতে বসাল টেবিলে। মেহমেত অন্যান্য দিনের তুলনায় আফিমের সাথে ভালো ব্যবহার করল, গল্প করল। সবার কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে তবেই আফিম মৃত্তিকার ঘরে ফিরল। মৃত্তিকা তখন ওয়াশরুম থেকে মুখ ধুয়ে বেরিয়েছে। পানির ছেটায় সাদা ব্লাউজ আর বুকের কাছের আঁচলের অংশ ভিজে গিয়েছে। আফিমকে দেখে সে অভিব্যক্তি জানাল না। গামছা দিয়ে মুখটা মুছে বলল,

“- বসুন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন”?
আফিম বাধ্য ছেলের মতো বসল বিছানায়। বলল,
“- শাড়ি বদলে এসো”।
মৃত্তিকা ললাটে ভাজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,
“- শাড়ি বদলাবো কেন”?
“- ভিজে গেছো, সর্দি লাগবে”।
মৃত্তিকা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“- কিছুই হবে না। পাখার নিচে একটু দাঁড়িয়ে থাকলেই হবে।”
আফিম উঠে ঘরের দরজা আটকে দিল। মৃত্তিকা ভ্রু কুঁচকে ফেলল। আফিম মৃত্তিকার ওয়ারড্রবে খুলে একটি সবুজ রঙের শাড়ি ও ম্যাচিং ব্লাউজ বের করে মৃত্তিকার দিকে এগিয়ে দিল। বলল,
“- বদলে এসো, শাড়ি আমি পড়িয়ে দিচ্ছি”।
মৃত্তিকা শাড়িটা সরিয়ে বলল,
“- এসব আহ্লাদ ভালো লাগছে না। আপনি সাথে না থাকাকালীনও আমি ভালো ছিলাম। আমি নিজের যত্ন নিতে জানি”।
আফিম শাড়িটা ফের মৃত্তিকার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,

“- পারো, পারারই কথা। আমার স্ত্রী, আফিম মির্জার অর্ধাঙ্গিনী সবকিছুতেই পারদর্শী। আমি জানি সেটা। কিন্তু স্বামী হিসেবে আমার দায়িত্ব তাকে আহ্লাদ, যত্নে, ভালবাসায় ভরিয়ে রাখা।”
“- এতদিন এ দায়িত্ব পালন করেননি কেন?”
আফিম প্রত্যুত্তর না করে মৃত্তিকার ললাটের একদম মাঝ বরাবর নিজের পুরু ঠোঁট চেপে ধরল। দু আঙুলে চেপে ধরল মৃত্তিকার গাল। ঠোঁট ললাট থেকে সরিয়ে ঠোঁটের মাঝে ডুবিয়ে দিল তড়াক করে। মৃত্তিকা বিস্মিত হয়ে গেল। আফিম ঘোরে নেই। সে মৃত্তিকার ঠোঁট চুষে নিতে ব্যস্ত। থামা থামির নাম নিল না। বেশ অনেকটা সময় মৃত্তিকার অধর যুগলে চুমু খেল আফিম। দুজনের ঠোঁটই স্পর্শের তোপে লাল হয়ে উঠল। আফিম ঠোঁট উঠিয়ে নেশালো চোখে চেয়ে গভীর কণ্ঠে বলল,

“- নেশাআআআআআ”।
মৃত্তিকা উত্তর দিল না। আফিম বলল,
“- তুমি আমার নেশার মতো মৃত্ত। এই কয়েকটা দিন আমি কিভাবে তোমার শরীরের নেশা থেকে দূরে থেকেছি, আমিই জানি। তোমার গায়ের ঘ্রাণ আমাকে নেশার মতো টানে, আমি ভালোবাসি তোমার দেহের ঘ্রাণ।”
বলেই মৃত্তিকার বক্ষমাঝে মুখ ডুবিয়ে গভীর শ্বাস টানল আফিম। বারংবার শুকে নিল মৃত্তিকার গায়ের ঘ্রাণ। অথচ মৃত্তিকা কোনোদিনই পারফিউম ব্যবহার করে না। তাহলে কোন ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয় আফিম?

“- সরুন”।
“- উঁহু”।
“- কেন”?
“- আমার ভালো লাগছে”।
“- আমার লাগছে না।”
“- কেন? আমার স্পর্শ, আমার সান্নিধ্য তোমার ভালো লাগে না প্রাণ”?
মৃত্তিকা আড়ষ্ট হলো। বলল,
“- তেমন না”।
“- কেমন”?
আফিম সহসা একটুখানি কঠিন হলো। মৃত্তিকার বুক থেকে মুখ উঠিয়ে তপ্ত সুরে বলল,
“- আমায় ভালোবাসো না তুমি”?
মৃত্তিকা সাথে সাথেই জবাব দিতে চাইল না। তবে আফিম অধৈর্য্য, অস্থির হয়ে উঠল। ফের মৃত্তিকার গালে চাপ প্রয়োগ করে বলল,
“- বলো, ভালোবাসো না আমায়? আমি যে তোমায় ভালোবাসি, আদর করি, তোমায় ছাড়া বাঁচি না। তোমার এমন হয় না? আমায় ভালোবাসতে ইচ্ছে করে না তোমার”?
মৃত্তিকা মনে মনে হাসল। আফিম কোনোদিন ভালো হবে না। ভালো হবার লক্ষ্মণ নেই তার মাঝে। একটুতেই লোকটার মাথা গরম হয়ে যায়, অশান্ত, অধৈর্য্য হয়ে বসে। অথচ মৃত্তিকা খুব শান্ত গোছের। সে খানিক সময় নিয়ে বলল,

“- আমারও আপনাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে”।
“- কবে বাসবে”?
অধৈর্য্য হয়ে বলল আফিম। মৃত্তিকা ফিক করে হেসে ফেলল। তার হাসির উচ্ছ্বসিত আওয়াজ প্রবল আলোড়ন তুলল আফিমের হৃদয়ে। সে রেগে বলল,
“- হাসছো কেন ফাজিল? আমার বাচ্চা পেটে নিয়ে বলো আমাকে ভালোবাসো না? বদ মেয়ে, থাপড়ে সোজা করে দেবো”।
“- কখন বললাম ভালোবাসি না”?
“- ভালোবাসো, সেটাও তো বলোনি”?
মৃত্তিকা দুরে সরে দাঁড়াল। শাড়ি আর ব্লাউজ নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো শাড়ি পড়ে। আফিম রেগে গেল। বলল,
“- বলেছিলাম আমি শাড়ি পড়িয়ে দেবো তোমাকে”।
মৃত্তিকা মৃদু হেসে বলল,
“- আপনি শাড়ি পড়াতে জানেন”?
আফিম বিব্রত সুরে বলল,
“- জানি না তো কি? দুজন মিলে ঠিক করে নিতাম”।
“- শুনলাম খাওনি তুমি”।
মৃত্তিকা আয়নায় দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বলল,

“- খেতে পারিনি, মাছ-মাংসের গন্ধ সহ্য হয় না আফিম”।
কাতর, অসহায় শোনাল মৃত্তিকার কণ্ঠ। আফিম হাঁটু গেঁড়ে বসে মৃত্তিকার শাড়ির কুঁচি ধরল। অনেকটা সময় নিয়ে কুঁচি গুলো ঠিক করে দিল মৃত্তিকার নির্দেশনা মেনে। অতঃপর মৃত্তিকার গালে হাত বুলিয়ে বলল,
“- খুব কষ্ট হচ্ছে না? আমাদের বেবি প্ল্যানিং করা উচিত ছিল। শুকিয়ে গেছো একদম, তোমাকে দেখে আমার ভালো লাগছে না। আমি তোমার উচ্ছ্বাস কেড়ে নিয়েছি না”?
মৃত্তিকা আফিমের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকাল। সফেদ শুভ্র শার্ট আফিমের গায়ে। গলায় রুপালি চেইন, হাতে কয়েক প্রকার ব্যাচ। শার্টের টপ বাটন খুলে রেখেছে সে। চোখ জোড়া অত্যন্ত সুন্দর দেখাচ্ছে। আফিম সত্যিই আকর্ষণীয়। নজর কাড়ার মতো সৌন্দর্য আছে তার। মৃত্তিকা এক হাত তুলে আফিমের গালে হাত বুলাল। চোখ বুজে নিল আফিম। চোখ বুজেই তার গালে রাখা মৃত্তিকার হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল সে। বলল,

“- তুমি ছুঁয়ে দিলে কেন? আমি ছুঁলেই তো দোষ হয়ে যায়”।
মৃত্তিকা মিছে রাগ দেখিয়ে বলল,
“- দোষ দেই আমি? ছুঁয়ে ছুঁয়েই তো আপনার বাচ্চার মা বানিয়ে দিলেন”।
আফিম গা দুলিয়ে হেসে ফেলল। বলল,
“- আমার সাথে থেকে তুমি কথা বলতে শিখে গেছো”।
মৃত্তিকা ভেংচি কেটে বলে,
“- হ্যাঁ, আপনারই অবদান”।
আফিম হাসল গাঢ় ভাবে। বলল,
-” কাল ডক্টরের কাছে যাবো। দুর্বল হয়ে পড়েছো, মেডিসিন নিতে হবে”।
মৃত্তিকা বাঁধ সাধল না। বলল,
“- ঠিক আছে”।

আজ ঢাকা শহরে অবরোধ। পুরো শহর আনন্দে মাতোয়ারা। মিছিল এখন আনন্দ উল্লাসে পরিণত হয়েছে। তদন্ত করার পর আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নানারকম অনৈতিক কর্মকাণ্ড ধরা পড়েছে, তাদের দূর্নীতি সকলের সামনে এসেছে। এতে জনগন আরো ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে। জনগনকে নিরাপত্তা দিতে আদালত ওদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছে। নতুন সরকার গঠনের কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে কিছুদিনের মধ্যে।
এই পুরো ব্যাপারটায় সবচে বেশি খুশি আফিম। সারাদিন সারারাত খেটেখুটে মরেছে সে। নিজের সর্বোচ্চ দিয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে লড়েছে সে। সবাই তার জয়ধ্বনি গাইছে। খুশি মৃত্তিকা নিজেও। স্বামীর এত গুরুত্বপূর্ণ কাজে সে অত্যন্ত খুশি। মৃত্তিকার কাছে খবর এসেছে, ইয়াসিন বিছানায় শায়িত। বিভিন্ন ধরণের অসুস্থতা ঘিরে ধরেছে তাকে। অপরদিকে রুবির বাবা রুবিকে ত্যাজ্য করেছে। তার কাজকর্ম ইদানীং উগ্র, ব্যাভিচারে পরিণত হয়েছে। গার্মেন্টসে এখন কাজ খুঁজছে সে। সারাদিন বিভিন্ন পোশাক কারখানার গেটে গিয়ে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে রুবি। মৃত্তিকার কাছে খবরটা এনে দিয়েছে আফিম নিজেই। মৃত্তিকার অতীত নিয়ে তার কোনো রকম আক্ষেপ নেই। সে এ নিয়ে কোনো প্রশ্নও তোলে না। ওদের দুরবস্থা শুনে মৃত্তিকা তেমন একটা পাত্তা দিল না। কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল “ ওরা যেটুকু করেছে, সেটুকুর ফল পাবেই পাবে। আমার অভিশাপ দিতে হবে না। আমি ওদের নিয়ে আর ভাবিও না। আমার বর্তমান, আমার অতীতের চেয়ে শতগুণ সুন্দর”।
পরিশিষ্ট

হাসপাতালের করিডোরে ক্রমাগত পায়চারি করছে আফিম। হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে ওর। এতটা নার্ভাস আফিম কখনো হয়নি। খুব ভয় কাজ করছে তার ভেতরে, দাউ দাউ করে পুড়ছে বুক। মৃত্তিকার প্রসব বেদনা ওঠার আগেই আফিম তাকে হাসপাতালে এডমিট করেছে। মৃত্তিকার পরিবার নর্মাল ডেলিভারি করাতে চেয়েছিল, কিন্তু আফিম কারো কোনো কথা শোনেনি। মৃত্তিকার যন্ত্রণা তার সহ্য হবে না বলেই আগেভাগে মৃত্তিকাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে সে। আজ মৃত্তিকার সিজার করা হবে। করিডোরে মৃত্তিকার পরিবারের সবাই বসে আছে। আশরাফ সহ বাকিরাও মনে মনে মৃত্তিকার জন্য প্রার্থনা করছে।
শান্ত এসেছে কিছুক্ষণ আগে। রাইমার সাথে শান্তর সম্পর্ক এখন অনেকটা সহজ হয়ে উঠেছে। যে রাইমা নিজ হাতে পানিটুকু ঢেলে খেতো না, সেই রাইমা অফিস সামলে ঘরও সামলায়। প্রতিমাসে বেতন পেয়ে নির্দিষ্ট টাকা ব্যাংকে রাখে। শাশুড়ির সাথে প্রতিদিন বসে বসে একটি নিজেদের ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করে সে। তার সংসারকে ঘিরেই তার জীবন চলছে।

শান্তর মা প্রথম দিকে রাইমাকে মানতে পারেনি। কিন্তু রাইমা তার বাচালতা, পরিশ্রম আর ভালোবাসা দিয়ে শ্বশুরবাড়ির সবার মন জয় করে নিয়েছে। শান্ত এখন তাকে সাহায্য করে। রাইমা যখন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে রান্নাঘরে ঢোকে, শান্ত হাতে হাতে তার কাজ এগিয়ে দেয়। শান্তর মা রাইমাকে চাকরি করতে দিতে চাননি, কিন্তু রাইমা অনেক বুঝিয়ে, সবকিছু ঠিক ভাবে ব্যালেন্স করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাকরিটা করে যাচ্ছে। এ সবই সে করছে শান্তর জন্য। শান্তকে বড্ড ভালোবাসে মেয়েটা। ভালোবাসার জন্য সব রকম ঝুঁকি নিতে সে রাজি। শান্ত বোঝে, কিন্তু নিজেকে বোঝাতে পারে না।
রাইমা স্থির হয়ে বসে থাকতে পারল না। শান্তকে বলল,

“- কতক্ষণ লাগে? আমার জানামতে সিজার করতে সর্বোচ্চ ত্রিশ মিনিট লাগে”।
শান্ত গুমোট স্বরে বলল,
“- স্থির হন রাইমা। ডক্টর বেরিয়ে আসবে একটু পরই”।
রাইমা হাস্যজ্বল মুখে বলল,
“- ইশশ, আমার যে কি ভালো লাগছে! আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না। আফিম ভাইয়ার বাচ্চারা আফিম ভাইয়ার মতোই কিউট হবে”।
শান্তর মুখটা আরো গম্ভীর হয়ে উঠল। রাগ দেখিয়ে বলল,
“- ভাবীও তো সুন্দর, সবসময় আফিমের দিকে নজর দেন কেন আপনি”?
রাইমা নিজের দু গালে তিনবার চাপড় মেরে বলে,
“- তওবা তওবা, আমি মেয়ে হয়ে মেয়েদের দিকে নজর দিতে যাবো কেন? আপনার কি মনে হয়, আমার চরিত্রে সমস্যা আছে”?
ধমকে উঠল শান্ত। বলল,

“- বাজে কথা বলবেন না রাইমা”।
রাইমা মিটিমিটি হেসে বলে,
“- আপনি এত রাগছেন কেন? জেলাস হচ্ছেন”?
শান্ত মুখ ফিরিয়ে বলল,
“- মোটেও না”।
“- তাহলে হাসুন?, আজকের দিনে গোমড়ামুখে থাকতে নেই সাহেব”।
“- আপনি কথা কম বললেই হয়”।
“- আমার জামাই কথা কম বলে, আমিও কম বললে কি করে হয়”?
শান্ত দমল। একটু পর বলল,
“- কিছু এনে দিবো? খাবেন”?
রাইমা বলল,

“- না খাবো না, ওয়াশরুমে যাবো”।
“- যান”।
“- আপনি আমার সাথে চলুন, আমার ভয় লাগে”।
শান্ত হাসল মৃদু। রাইমার হাতটা ধরে বলল,
“- আপনি এত ভীতু কেন”?
শান্তর বাহু চেপে রাইমা বলল,
“- কারণ আমার জামাই সাহসী।”
“- আমি না থাকলে কী করবেন”?
“- আপনাকে কাছে রাখার ব্যবস্থা করবো”।
“- আপনি অনেক নির্লজ্জ রাইমা”।
রাইমা আশপাশে তাকিয়ে টুপ করে চুমু খায় শান্তর গালে। বলে,
“- ভাগ্যিস আমি একটু আধটু বেহায়া, নইলে আপনার মতো ভীতু, লাজুক মানুষটাকে আমার পাওয়াই হতো না”।

মৃত্তিকার পেটে দুটো বাচ্চা ছিল। আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে বিষয়টা নিশ্চিত করেছিলেন ডক্টর। মৃত্তিকার একটি ছেলে আরেকটি মেয়ে বাচ্চা হবে। জানার আগে থেকেই সৃষ্টিকর্তার নিকট লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করেছে মৃত্তিকা। জীবনের প্রথম, নতুন অনুভূতিটা উপভোগ করেছে সে। বাচ্চাদের ঘিরে আফিমের পাগলামো খুব বাড়াবাড়ি বলে মনে হতো। প্রেগ্ন্যাসির এই সময়টায় আফিম সব রকমের সহায়তা করেছে তাকে। সিঁড়ি বেয়েও একা নামতে দেয়নি। বাচ্চাদেরকে দেখতে পাবার, ছুঁয়ে দেবার জন্য কত যে পাগলামো করেছে লোকটা। মৃত্তিকার সেসব ভাবলেই হাসি পায়। খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম ঠিক করে দিয়েছে আফিম। গুণ্ডামি, মাস্তানি ছেড়ে মৃত্তিকার কাছে থেকেছে সে।
অপারেশন থিয়েটার থেকে বাচ্চাদেরকে তোয়ালে দিয়ে মুড়িয়ে নিয়ে এসেছে ডক্টর। আফিমের দিকে মেয়ে বাচ্চাটিকে বাড়িয়ে দিতেই আফিম নিজের সন্তানকে উপেক্ষা করে বলে,
“- আমার স্ত্রী কেমন আছে”?
ডক্টর বললেন,
“- ভালো আছে। একদম চিন্তা করবেন না, বাচ্চাটাকে ধরুন”।
আফিম ধরল না নবজাতককে। তার প্রাণ গুমড়ে মরছে। মৃত্তিকাকে দেখার জন্য চোখ জোড়া ছটফট করছে। মৃত্তিকা কেমন আছে? কতটা কাটা হয়েছে তার পেট? কতটা রক্ত বেরিয়েছে? ভেবেই আফিম ঘাবড়ে যাচ্ছে। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে তার। মৃত্তিকার মা আর ভাবি বাচ্চা দুটোকে আগলে নেয় বুকে। আফিম কম্পিত সুরে বলে,
“- আমি মৃত্তিকার সাথে দেখা করতে চাই”।
ডক্টর বললেন,

“- পেশেন্ট এখন ঘুমোচ্ছে। কিছুক্ষণ পর দেখা করুন”।
আফিম বারণ শুনল না। ধীর পায়ে মৃত্তিকার কেবিনে ঢুকল সে। টুল টেনে মৃত্তিকার পাশে বসল। মৃত্তিকা ঘুমোচ্ছে, চোখ মুখ ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে মেয়েটার। আফিম মৃত্তিকার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। চুপ করে মৃত্তিকার পাশে বসে রইল সে। একটুও টু শব্দ করল না। মৃত্তিকার ঘুম ভাঙল ত্রিশ মিনিট পর। পাশেই আফিমকে দেখে মৃত্তিকা ভেঙে পরল। ঝরঝর করে কেঁদে বলল,
“- আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, ওরা আমাদের, ওরা আমাদের ভালোবাসার ফল”।
আফিম মৃত্তিকার হাত চেপে ধরে। মেয়েটার হাতের তালুতে চুমু খায় আফিম। চোখ, মুখ, গাল, কপাল সর্বত্র নিজের অধর চেপে ধরে সে। মৃত্তিকা চোখ বুজে নেয়, প্রশান্তিতে গাল ভরে হাসে। আফিম কৃতজ্ঞ হয়ে বলে,
“- আমার নেশা, আমাকে বাবা হবার অনুভূতি দেয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমি খুব খুশি, খুব খুশি, এতটা আনন্দিত আমি আগে কখনো হইনি”।
বলতে গিয়ে আফিমের সবুজাভ চোখ ঝাপসা, ঘোলাটে হয়ে এলো। যেন চোখের পাতা এক হলেই অশ্রু ঝরবে। মৃত্তিকা কোমল সুরে বলল,

“- বাচ্চাদের ছুঁয়ে একটা কথা দেবেন”?
“- কী”?
“- আপনি গুণ্ডামি করবেন না, মাস্তানি করবেন না। খুব ভদ্র-সভ্য হয়ে যাবেন। কথা দিন, কথা দিন কাউকে আঘাত করবেন না। সৎ থেকে নিজের কাজ করবেন। বাজে ছেলেদের সাথে আড্ডা দেবেন না, গসিপ করবেন না। একদম ফ্যামিলি ম্যান হয়ে যাবেন।”
আফিম ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“- আমি কিন্ত গুণ্ডামি করা কমিয়েছি মৃত্ত ”।
“- শুধু কমালে হবে না। এ পথ থেকে একেবারে সরে আসতে হবে। আমি আপনার কোনো ক্ষতি সহ্য করবো না। আমার বাচ্চারা যেন তার বাবাকে দেখে বখে না যায়, তার জন্য আমাকেই তৎপর হতে হবে”।
আফিম ভাবতে বসল। মৃত্তিকা তাড়া দিয়ে বলল,
“- নইলে আমি আপনার সাথে থাকবো না আফিম। আমি বাচ্চাদের নিয়ে আলাদা থাকবো। ওরা ওদের বাবাকে এভাবে দেখুক, আমি তা চাই না”।
আফিম অসহায় চোখে চেয়ে বলল,
“- তুমি আমাকে কষ্ট দিচ্ছো। ওদের ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো? কষ্ট কি তুমি একাই করেছো? ওদেরকে আনতে গিয়ে আমি কষ্ট করিনি? ওদের বাবা আমি। আমার থেকে তুমি ওদের কেড়ে নিতে পারো না”।
মৃত্তিকা মুখ ঘুরিয়ে বলল,

“- যাই বলুন, আমি আপনার সাথে বাচ্চাদের রাখবো না”।
আফিম মেনে নিল। পরক্ষণেই মৃত্তিকা আরেকটি আদেশ করে বসল,,
“- সিগারেট ছাড়তে হবে।”
“- সিগারেট না খেলে আমার ভালো লাগে না। তুমি তো জানো।”
মৃত্তিকা হাসে। বলে,
“- আপনি বলেছিলেন হাত আর ঠোঁট ব্যস্ত রাখতে আপনি পছন্দ করেন । সেজন্যই সিগারেট খান। আমি যদি রোজ আপনাকে চুমু দিই, আপনি সিগারেট খাবেন না বলেছিলেন। মনে আছে”?
আফিম মনে করল। হ্যাঁ সে বলেছিল। বিয়ের আগে মৃত্তিকাকে এ কথাটা সে বলেছিল কয়েকবার। মৃত্তিকা কথাটা মনে রেখেছে ভেবে হাসল আফিম। বলল,

“- তার মানে তুমি আমায় রোজ চুমু দেবে? আমি দিনে দশ-বারোটা সিগারেট খাই মৃত্ত। তোমাকে প্রতিদিন আমাকে অনেকগুলো চুমু দিতে হবে কিন্তু। ভেবেচিন্তে বলো”।
মৃত্তিকা ঘন শ্বাস ফেলল। খুব নিচু স্বরে লাজুক হেসে বলল,
“- আমি আপনাকে ভালোবাসি আফিম। সত্যি বলছি, অনেক ভালোবাসি। আপনাকে ছাড়া আমার কিছুই ভালো লাগে না। আপনাকে চুমু খেতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আপনি শুধু আমার হয়ে থাকুন”।
দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পর অবশেষে মৃত্তিকার মুখ থেকে ম্যাজিক ওয়ার্ড গুলো শুনে আফিমের মনটা ভালো হয়ে গেল। কান্না পেল তার। তবুও গাল ভরে হেসে উঠল সে। মৃত্তিকা মুখ বাড়িয়ে আফিমের ঠোঁটে ঠোঁট দাবিয়ে দিল। অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পরও মৃত্তিকা ঠোঁট সরাল না। আফিমের ঠোঁটের ভাঁজে ঠোঁট গলিয়ে অনেকটা সময় চুমু খেল সে। আফিম চোখ বুজে নিল। মৃত্তিকার দেহটা নিজ দেহে আলতো করে মিশিয়ে নিয়ে বলল,

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৫

“- সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার আর কিছু চাওয়ার নেই”।
মৃত্তিকা তার গালে গাল ঘষে বলল,
“- আমারও না”।

সমাপ্ত