Home ওরা মনের গোপন চেনে না ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৪

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৪

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৪
বৃষ্টি শেখ

বিয়ে বাড়িতে যেন ডাকাত ঢুকেছে। সবাই বেজায় চিন্তিত। পাশাপাশি অনেকেই রাইমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে। রাইমার হিংস্র গর্জন সবাইকে অবাক, ভীতু করে তুলছে। আফিম খুব শান্ত। বসে বসে বন্ধুকে হেনস্তা হতে দেখেও খুব একটা টলল না সে। মৃত্তিকা ওদিকে অস্থির। বিয়েটা হবে তো?
ইতিমধ্যে মীরা উঠে দাঁড়িয়েছে। রাইমার মতোই রেগে আছে সে। শান্তর প্রতি রাগে তার শরীর কাঁপছে। মীরার বাবাও এসেছে স্টেজে। কিন্তু রাইমার জন্য কাছে এগোতে পারছেন না। মীরা পাশে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড রেগে শান্তর উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“- এই মেয়েটার সাথে আপনার প্রেম ছিল তাইনা? একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে থেকে আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করতে লজ্জা করে না জা*নোয়ার”।
আকস্মিক মীরার চিৎকারে শান্ত তব্দা খেয়ে যায়। তার গালি শুনে নত হয় শান্ত। খুব কষ্ট হয় বেচারার। শুকনো মুখে বলে,

“- বিশ্বাস করুন মীরা। আমার রাইমার সাথে ওইরকম সম্পর্কই ছিল না। উই আর জাস্ট কলিগস”।
রাইমা ছুড়িটা দুরে সরাল। সাথে সাথে মীরা শান্তর কলার চেপে ধরল। হিংস্র, আক্রমণাত্মক হয়ে সে শান্তকে বলল,
“- কলিগ? আমাকে বুঝাস? কুত্তার বাচ্চা। বিয়ে করতে এসে আরেক প্রেমিকাকে ভুলে বসিস তাইনা? কতদিনের প্রেম? বল?”
শান্ত হতবাক। কখনো কোনো মেয়ে তাকে এভাবে কটু কথা বলতে পারেনি। বলার সুযোগটুকুও দেয়নি শান্ত। বরাবরই মেয়েদের থেকে দুরত্ব বজায় রেখেছে সে। লাজুক আর ভীতু হওয়ায় প্রেম ও করতে পারেনি এই পঁচিশ বছরের জীবনেও। মীরার থেকে এমন অশালীন মন্তব্য পেয়ে থ বনে গেল সে। লজ্জায়, অপমানে নত হলো সে। রাইমা চুপ করে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মীরার বাআা এগিয়ে এসে শান্তর গালে কষে চড় লাগালেন। অশ্রাব্য গালিগালাজ ছুঁড়ে বললেন,
“- আমার টাকা দে। তোর মতো দু পয়সার ছেলেকে দাম দেওয়াই আমার ভুল হয়েছে। আমাদের সব টাকা ফেরত দিবি, কোনো দয়া করবো না আমি”।
শান্ত অপমানে চোয়াল শক্ত করে রইল। খুব নিচু কণ্ঠে বলল,

“- আঙ্কেল, আপনাদের ভুল হচ্ছে। আমি এমন ছেলে নই। রাইমার সাথে আমার কোনো বিশেষ সম্পর্ক নেই। আপনারা আমাকে বিশ্বাস করছেন না কেন”?
কেউই বিশ্বাস করল না শান্তকে। মীরা সহ তার পরিবারের লোকজন নানারকম অভিযোগ ছুঁড়তে লাগল। ঠিক সেই মুহুর্তে রাইমা বলল,
“- কত টাকা পান আপনারা? আমাকে বলুন। আমি দিচ্ছি”।
শান্ত রেগে উঠল। বলল,
“- রাইমা, চুপ করুন”।
রাইমাও সমান রেগে বলল,
“- ওরা আপনাকে কথা শোনাবে কেন?”
শান্ত নত সুরে বলল,
“- রাইমার সাথে আমার ওরকম কোনো সম্পর্ক নেই। ওর ভালোলাগা, ভালোবাসা পুরোটাই এক তরফা। আপনি যেহেতু টাকার কথা তুলেছেন, আমি বেতন পেয়ে সব টাকা পরিশোধ করে দেবো”।
মীরা বলল,

“- এই ছেলেকে আমি কিছুতেই বিয়ে করবো না। কালকের মধ্যে ও টাকা ফেরত দেবে। নইলে ওর এমন হাল করবো আমি”।
মীরার বাবা বলল,
“- এখনই ওকে পুলিশে দিচ্ছি”।
শান্ত হতবাক হয়ে তাকাল রাইমার দিকে। রাইমা স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
“- ডাকুন পুলিশকে। শান্তর এখানে দোষ নেই। আমি ওকে ভালোবাসি, আমি বিয়ে করে তবেই যাবো”।
সবাই আতঙ্কিত হয়ে পরল। রাইমার কথায় সমালোচনা শুরু হলো, চাপা গুঞ্জনে ভরে উঠল আশপাশ। মীরা বিয়ের আসন থেকে প্রস্থান করল। সে সরে যেতেই রাইমা বসল তার আসনে। ছুড়িটা নিজের পেটের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“- আজ হয় আমি শ্বশুরবাড়ি যাবো, নয়তো গোরস্থানে। সিদ্ধান্ত আপনাদের”।
রিল্যাক্স হয়ে বসল রাইমা। শান্ত কি করবে৷ বুঝতে পারল না। কনে চলে গেছে আসন ছেড়ে, রাইমাও মৃত্যুর ভয় দেখাচ্ছে শুনে শান্তর মা নিজেই ফোন করে শান্তকে বলল,
“- বিয়েটা করে আয় শান্ত। সমাজে তো আর মুখ দেখাতে পারবো না।”

টিফিন পিরিয়ডে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে যাচ্ছিল মৃত্তিকা। পথেই মুশফিক নামক মানুষটার সাথে দেখা। মৃত্তিকা একটু থামল, ভাবল যাবে কি যাবে না? অবশ্য সিদ্ধান্তটা খুব দ্রুতই নিল সে। পা ঘুরিয়ে আগের পথ ধরল। মুশফিক তার ব্যাচমেটদের সাথে কথা বলছিল। কয়েকদিন পর সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্টদের এইচএসসি। তাদের নিয়ে একটি ছোটখাটো আয়োজন করার পরিকল্পনা করছিল সে। কথা বলতে বলতেই মুশফিকের চোখ গেল মৃত্তিকার পানে। সেই স্নিগ্ধ মুখখানা নজরে পড়তেই সে ডেকে উঠল,
“- মৃত্তিকা”?
মৃত্তিকা চট করে পিছু ঘুরল। এবং তৎক্ষনাৎ উপলব্ধি করল তার পিছু ফিরে তাকানো উচিত হয়নি, না শোনার ভান করা উচিত ছিল। মুশফিক পুনরায় ডেকে উঠল,
“- এদিকে এসো”।
মৃত্তিকা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সেদিনের মতো ভুল না করে সালাম জানাল মুশফিককে। মুশফিক হাসল। বলল,
“- ক্যাফেটেরিয়ায় যাচ্ছো? কি খাবে বলো? চা নাকি কফি?”
মৃত্তিকা বিব্রত সুরে বলল,
“- না, কিছুু না। আমি এক ফ্রেন্ডকে খুঁজতে ওদিকে যাচ্ছিলাম”।
মুশফিক বলল,

“- আচ্ছা সমস্যা নেই। এসো, আজ আমি তোমাকে কফি খাওয়াবো। একসাথে কফি খাই চলো, বিল আমার”।
মৃত্তিকার অস্বস্তি হলো। অনেকদিন মুশফিকের সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ নেই। হঠাৎ এভাবে বসে একসাথে কফি খাওয়া অত্যন্ত বিব্রতকর। তাছাড়া গতকাল মুশফিক অন্য রকম ব্যবহার করেছিল, মনে হয়েছিল অতীতে মৃত্তিকার থেকে প্রত্যাখান হওয়ার ক্ষোভ তার মনে এখনো আছে। কিন্তু আজকের কথাবার্তায় তা মনে হলো না। মৃত্তিকা সংকোচ করে বলল,
“- ধন্যবাদ, কিন্তু আমি এখন কিছুই খাবো না”।
মুশফিক শুনল না। সাথের ছেলেগুলোকে বিদায় জানিয়ে মৃত্তিকার উদ্দেশ্যে বলল,
“- আরে এসো তো”।

মুশফিক এগিয়ে গেল। মৃত্তিকা পা বাড়াল তার পিছু পিছু। মুশফিক এখন আর আগের সাধারণ ছেলেটি নেই। ভার্সিটির অন্যতম পরিচিত মানুষ সে, সহ-সভাপতি। তার কথাকে আদেশ হিসেবে ধরে নেয়া উচিত। নইলে যদি আবার কথা শোনায়? কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে এড়িয়ে চলে যাওয়া যায়? মুশফিকের মতো সভাপতির কফির অফার কিভাবে রিজেক্ট করবে বুঝল না মৃত্তিকা। ক্যাফেটেরিয়ায় এলো সে। চেয়ারে বসে মুশফিক দুটো কফি আর দুটো পিজ্জা অর্ডার করল। মৃত্তিকার কোনো বারণই সে শুনল না। মৃত্তিকা নত হয়ে রইল।
খুব গোপনে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দূর্নীতি ফাঁস করে দিয়েছে আফিম। তার পরিচয় সে লুকিয়েছে। সম্পূর্ণ অজ্ঞাত প্রফাইল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্দরের লোকদের জবানবন্দির ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করেছে। রাজনীতির ময়দানে এখন চলছে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা। আফিম তার টিমের কাউকেই এ সত্যটা জানায়নি। তার সন্দেহ এজেন্টদের বসও আইনমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখোশ উন্মোচনে বাঁধা প্রয়োগ করবে। তাদের সাথে এজেন্টদের সম্পর্কও তুলনামূলক ভালো। তাই আফিম পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলে, সবার মুখ বন্ধ রেখে আড়ালে থেকে এসব করেছে। আফিম এসবে সফল হয়েছে শুধুমাত্র ন্যায়পরায়ণ সেই পুলিশ অফিসারের জন্য। তিনিই আফিমের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছেন, আফিমই যে তাদেরকে আদেশ দিয়ে লোকদের ধরেছে, ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করেছে, সেসব জেনেও তিনি চুপ আছেন। আফিম নিজের জন্য ভয় পায় না। তার ভয় মৃত্তিকাকে ঘিরে। মেয়েটা একা একা চলাফেরা করে, কোন শত্রু, কখন, কিভাবে আঘাত করে বলা যায় না। মৃত্তিকার আশেপাশে তার বিশ্বস্ত দুজন ছেলেকে পাঠিয়েছে আফিম। তারা মুশফিকের সাথে মৃত্তিকাকে দেখে ভড়কে গেল। সাথে সাথে কল করল আফিমকে।

‘- আসসালামু আলাইকুম ভাই”।
আফিম জবাব দিল,
“- ওয়া আলাইকুমুস সালাম, কি হয়েছে”?
“- ভাই, ভাবিকে মুশফিকের সাথে ক্যাফেটেরিয়ায় কফি খেতে দেখলাম। ওইযে, নতুন ভিপি হয়েছে যে”।
আফিমের ভ্রু কুঁচকে এলো। মুশফিককে যতটা ভালো মনে হয় সে আসলে ততটা ভালো নয়। মুশফিক জুয়াড়ি। কার্ড খেলে টাকা ইনকাম করে। তার এ গোপন তথ্য কেউই জানে না। জানবে কিভাবে? রাতের আঁধারে কার্ড খেলে মুশফিক। এলাকার পোলাপাইনদের নিয়ে রাতে কাঁঠালতলায় কার্ড খেলে। আফিম নিজেও তো মাস্তান, রাতে এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। সে ছাড়া এ খবর কে পাবে? তবে ছেলেটা শুনেছে ভার্সিটির ভিপি হয়েছে। কয়েকবছর চেষ্টা চালিয়ে তবেই এ বছরে জয়ী হয়েছে। কিন্তু মৃত্তিকার সাথে মুশফিক কি করছে? আফিম কল কাটার আগ মুহুর্তে বলল,

“- নজর রাখিস, আসছি”।
আফিম কাছেপিঠেই ছিল। তীব্র গতিতে, রাস্তার ধুলো উড়িয়ে সে কয়েকমিনিট বাদেই মৃত্তিকার ভার্সিটির সামনে পৌঁছাল। বাইকটা কোনমতো পার্ক করেই নাটকীয় ভঙিতে প্রবেশ করল ক্যাম্পাসে। ছেলেগুলোর সাথে দেখা হতেই ওরা দেখিয়ে দিল মৃত্তিকা আর মুশফিককে। দূর থেকেও আফিম বুঝতে পারল মৃত্তিকার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। মেয়েটা চুপচাপ কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে, মুখে একটুও হাসি নেই। থাকলেও তা যেন অনিচ্ছায়। আফিম এগিয়ে গেল তাদের দিকে। মৃত্তিকা দ্রুত গরম কফি পান করেছে। জিভ পুড়ছে তার। তাড়াতাড়ি মুশফিকের থেকে মুক্তি পাবার জন্য দ্রুত কফিটা শেষ করেছে সে। সে সরাসরি না করতে পারেনি মুশফিককে। এ নিয়েও একটা রাগ কাজ করছিল নিজের প্রতি। কফিটা শেষ করতেই মুশফিক টেবিলের গরম পিজ্জাটার দিকে তাকিয়ে বলল,

“- একটা স্লাইস নাও”।
মৃত্তিকা মৃদু হেসে বলল,
“- না, আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। ধন্যবাদ”।
মৃত্তিকা কোল থেকে ব্যাগটা কাঁধে নিতেই আফিম এসে দাঁড়াল ওদের সম্মুখে। তাকে এখানে দেখে মৃত্তিকা ভড়কাল না, অবাক হলো না। বরং সহজ হয়ে উঠল সে, ভরসা পেল বোধহয়। মুশফিক আফিমকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। আফিমের ক্ষমতা, দখলদারিত্ব সম্পর্কে সে অবগত। দেখা হলেই আফিমকে সালাম জানিয়ে সম্মান জানায় সে। আজ তার ব্যতিক্রম হলো না। আফিম মৃত্তিকার সাথে কোনো কথা না বলে মুশফিককে কিছু বলার পূর্বে মুশফিক নিজেই সালাম জানিয়ে বলল,
“- কেমন আছেন ভাই? হঠাৎ আমার এরিয়ায়”?
আফিম হাসল। তার পরনে ডেনিম শার্ট। বুকের কাছের বোতাম খোলা। চুলগুলো এলোমেলো। সবুজাভ তীক্ষ্ণ চাহনি পরল মুশফিকের দিকে। বলল,

“- ভিপি নির্বাচিত হয়ে কতটা বড়লোক হয়েছো সেটাই দেখতে এলাম”।
মুশফিক লাজুক হেসে বলল,
“- কি যে বলেন ভাই”?
আফিমের ঠোঁটে হাসি দেখা গেল না। সে খানিক গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“- বড়লোক না হলে অন্যের বউকে কফি অফার করতে”?
মুশফিক প্রতিবাদ করে বলল,
“- এই মেয়েটার কথা বলছেন? ও আমার পরিচিত। আমরা প্রায় চার বছর ধরে একে-অপরকে চিনি। মৃত্তিকা অবিবাহিত”।
আফিমের চোখ জোড়া আরো গাঢ়, ধারাল হয়ে উঠল। ক্ষোভে, রাগে জ্বলন্ত অগ্নির ন্যায় জ্বলে উঠল চোখ জোড়া। সবেগে এগিয়ে গিয়ে মুশফিকের কলার চেপে ধরল সে। আশেপাশে মানুষের অভাব নেই, সকলের দৃষ্টি আফিমের দিকে। ক্যাম্পাসের ভিতর ঝামেলা করবে না বলে সে মুশফিকের কলার শক্ত হাতে টেনে তীক্ষ্ম, অগ্নি ঝরা চোখে চেয়ে ফিসফিস করে বলে,

“- মৃত্তিকার আশেপাশে তোকে দেখলে কলিজা ছিঁড়ে ফেলবো আমি। কার সম্পদের দিকে হাত বাড়াচ্ছিস জানিস?”
মুশফিক অবাক হলো। ভার্সিটিতেই তার হম্বিতম্বি চলে এলাকায় তার তেমন দাপট বা ক্ষমতা দেখানোর সামর্থ্য নেই। পুরো শহর আফিমকে চেনে, মাস্তান শব্দটা শুনলেি আফিমের নাম উঠে আসে সর্বপ্রথম। তাই আফিমকে সে মান্য করে, তার সাথে ঝামেলায়ও জড়ায় না। সে ভার্সিটিতে খোঁজ নিয়ে মৃত্তিকার বিয়ের কথা জানেনি। আফিমের সাথে মৃত্তিকার নিশ্চয়ই কোনো সম্পর্ক আছে। বুঝতে পেরে আফসোস হয় ওর। আফিমের সাথে সম্পর্ক খারাপ করাটা ঠিক হবে না।
মুশফিককে কিছু বলার সুযোগ দিল না আফিম। মৃত্তিকার দিকে কেবল একবার তাকিয়ে সে পা বাড়াল। তার পিছু পিছু মৃত্তিকাও হেঁটে এলো। গেটের কাছে রাখা বাইকটায় চড়ে বসতেই মৃত্তিকাও ব্যাক সিটে বসল। হেলমেট পড়তে পড়তে মিনমিনে সুরে বলল,

“- উনি আমাকে খুব জোর করেছিলেন, না করতে পারিনি”।
আফিমকল খুব গম্ভীর, রাগী দেখাল। মৃত্তিকার স্বীকারোক্তির কোনে প্রত্যুত্তর করল না সে। বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে এলো মির্জা ভবনে। মৃত্তিকার সাথে কোনো রূপ বাক্য ব্যয় না করে গট গট করে চলে ঘরে। মৃত্তিকা নিজের ভুলটা ধরতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আফিমের এমন ব্যবহারের কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ সে খুঁজে পেল না। ব্যাগটা সোফায় রেখে হাত-মুখ ধুয়ে সে ঘরে ঢুকল। আফিম নেই ঘরে। ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ হচ্ছে। মৃত্তিকা আফিমের জন্য অপেক্ষা করল, একসাথে খেতে বসবে বলে। আফিম শাওয়ার নিয়ে বের হয়েও মৃত্তিকার সাথে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করল না। মাথা মুছে টাওয়ালটা সে বিছানায় ছুঁড়ে মারল। মৃত্তিকা এতে রাগ দেখিয়ে বলল,

“- আপনাকে না বলেছি ভেজা টাওয়াল বিছানায় রাখবেন না? দুর্গন্ধ ছড়ায়”।
আফিম ধারাল চাহনি নিক্ষেপ করল মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা চমকে গেল খানিক। আফিমের এ দৃষ্টি তার অজানা। আফিম রাগ দেখাশ, চোটপাট করে, কিন্তু চুপ হয়ে যায় না। কথা বলাও বন্ধ করে না। আজ কি সে খুব ক্ষেপেছে? চোখ দিয়েই ভস্ম করে দিতে চাইছে যে।
“- আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেন”?,
আহত কণ্ঠে কথাটা বলে বসল মৃত্তিকা। তাতেও ভ্রুক্ষেপ হলো না আফিমের। কাবার্ড থেকে স্কাই ব্লু রঙের শার্ট গায়ে জড়াল সে। আফিমকে চমৎকার দেখাল শার্টটাতে। অন্যরকম সতেজ দেখাল। মৃত্তিকার প্রিয় রং স্কাই ব্লু। আফিমকে এই রঙে দারুণ লাগে। শার্টটি হাফ হাতার। শক্ত-পোক্ত, মোটা বাহু উন্মুক্ত হয়ে আছে। মৃত্তিকা চেয়ে রইল প্রিয় পুরুষের দিকে। আফিম আয়নায় নিজেকে দেখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে নিলে মৃত্তিকা ডাকল। বলল,

“- কোথায় যাচ্ছেন? খাবেন না”?
আফিম এবারে উত্তর দিল বিরস মুখে। বলল,
“- না”।
“- আপনি আমার উপর রাগ করেছেন”?
আফিম ক্ষিপ্ত হয়ে মৃত্তিকার দিকে এগিয়ে গেল দু পা। চরম অনিচ্ছায় উত্তর দিল,
“- এখন একটা কথাও বলবে না মৃত্তিকা। আমার মাথায় আগুন জ্বলছে। আমি রেগে যাবো, কথা শোনাবো। তোমার তা ভালো লাগবে? না তো! তাহলে যেতে দাও”।
মৃত্তিকা এগিয়ে গিয়ে আফিমের খুব নিকটে এলো। আফিমের এক হাত ধরে বলল,
“- যাবেন না প্লিজ। সারাদিন আপনাকে দেখিনি।”

নারীর ভালোবাসা ভয়ঙ্কর। তার একটুখানি যত্ন, একটুখানি আহ্লাদ পুরুষকে খুব বাজে ভাবে ঘায়েল করতে পারে, ব্যক্তিসত্তাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এইযে মৃত্তিকা এতটা সাহস করে তার হাত ধরল, আদুরে কথা বলল, মৃত্তিকা কি জানে আফিমের হৃদয় কতটা শান্ত হলো? কতটা প্রশান্তিতে পুরো শরীরে জ্বলে ওঠা আগুন নিভে গেল? রেগে গেলে আফিম খুব খারাপ হয়ে যায়, অনেক রকম কটু কথা বলে। জেনে-বুঝেও মৃত্তিকা এই সময়ে আফিমের হাত ধরল। ওইযে একবার ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছিল মৃত্তিকাকে, জানার পর আফিম বেলকনি দিয়ে মৃত্তিকার ঘরে ঢুকেছিল। মৃত্তিকার হাতে আংটি দেখে ছেলেটা ছুড়ি, দা খুঁজছিল, মৃত্তিকার আঙুল কাটবে বলে। কতটা ওভার পজিসিভ ছিল সে, মৃত্তিকার মনে আছে। তার উগ্রতা, ব্যগ্রতা সবই মাথায় আছে। তবুও সে নিজেই এগিয়ে এলো। এটুকুই আফিমকে শান্ত করতে যথেষ্ট। কিন্তু আফিম নিজের সহজাত বজায় রেখে বলল,

“- সরে দাঁড়াও”।
মৃত্তিকা আরো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রইল মানুষটার কাছাকাছি। আঁকড়ে ধরল আফিমের শক্ত বাহু। তার নরম, মসৃণ গাল ঠেকাল আফিমের বাহুতে। আফিম ঝাঁঝ মেশানো কণ্ঠে বলল,
“- থাপড়ে সরাবো এখন? মেয়ে মানুষ এত আহ্লাদ করবে কেন?, দুরে সরো? ঘেঁষাঘেঁষি করো কেন এত?”
আফিমের কথায় মৃত্তিকার গগন কাঁপিয়ে হাসতে ইচ্ছে করল। কিন্তু অসময়ে হাসলে যে দুঃখ পেতে হবে তা বুঝতে পেরে সে গাল চেপে হেসে বলল,
“- আপনি যখন ঘেঁষাঘেঁষি করেন, লেগে থাকেন জোৃকের মতো, তখন?”
আফিম রাগ দেখিয়ে বলে,
“- আমি ছেলে মানুষ, আমার সহজাতই এমন। ঘরের বউকে দেখে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলবো না, আদর করবো না, ঘেঁষাঘেঁষি করবো না, তাহলে আমি কিসের পুরুষ হ্যাঁ?”
আফিম ফের বলল,
“- মুশফিকের সাথে কফি খেতে গিয়েছিলে। কেন? ওই শালা মাদারবোর্ডের সাথে তোমার চার বছরের পরিচয়, এ কথা আমাকে জানাওনি কেন। কি মনে করো? ভার্সিটিতে ঢোকার পর তুমি পুরোপুরি স্বাধীন? আমি তোমাকে দেখবো না? এত বাড় বেড়েছো তুমি মৃত্ত। আমার রাগে শরীর জ্বলছে। দুরে সরো, একদম সাফাই গাইবে না, কোনো যুক্তি শুনবো না আমি”।
এই কথার বিপরীতে মৃত্তিকা কি বলবে ভেবে পেল না। আফিম গা ঝাড়া দিয়ে চলে গেল। মৃত্তিকার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আফিম এতটা চটেছে? কথাই বলবে না তার সাথে?

বিয়ের পরদিন মেয়েরা যতটা আতঙ্কে থাকে, ভয় কিংবা সংকোচে মুড়িয়ে রাখে নিজেকে, তার কোনোকিছুই রাইমার কাজকর্মে কিংবা অভিব্যক্তিতে দেখা গেল না। সে খুব হাসিখুশিতে মজে আছে। রাইমার আব্বু-আম্মু রাইমাকে মেয়ে বলে অস্বীকার করেছে। মেয়ে হিসেবে তাকে মানবে না বলে বিতারিত করেছে। তাতে রাইমা প্রচণ্ড কষ্ট পেলেও প্রিয় মানুষকে পাওয়ায় তার কষ্ট লাঘব হয়েছে। তার মন খারাপ হলেও সে বুঝতে দিচ্ছে না। রাইমার ধারণা সে সুখে থাকলে তার বাবা-মা ঠিক তাকে বুঝবে, তাকে মেনে নেবে।

শান্তদের ঘরটা ছোটখাটো। ওরা ভাড়া থাকে এখানে। দুটো রুম, একটা ওয়াশরুম, একটা রান্নাঘর। এক রুমে ঘুমায় শান্তর মা। আরেক রুম শান্ত আর রাইমার জন্য বরাদ্দ। সারারাত একটুও ঘুমায়নি শান্ত। সে রাইমার সাথে কথা বলেনি আর। এভাবে বিয়ে হওয়ায় ছেলেটা বড্ড বিচলিত। সুনাম নষ্ট হওয়ায় হাঁসফাঁস করছে ছেলেটা। রাইমা শেষ রাতে ঘুমিয়েছিল। টানা কয়েকদিন ঠিকঠাক ঘুম না হওয়ায় পরের ঘরে এসেও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে সে। সকাল হতেই বাড়িতে প্রতিবেশীদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। একে একে শাড়ি পরিহিত নববধূ রাইমাকে সবাই দেখে যাচ্ছে। বিয়ে বাড়ির ঘটনাটা নিয়ে সমালোচনাও করছে খুব। শান্তর মা এসে বসেছে রাইমার পাশে। আত্মীয়দের সাথে কথা বলছে। পাশ থেকে এক আন্টি শান্তর মায়ের কানে কানে বলে,
“- পোলার বউরে দেইখা রাইখো। বিয়া বাড়িতে যা করল, কবে জানি তোমাগো গলায় ছুড়ি ধরে। এইসব মাইয়ারা ভালো না।”
রাইমা শুনল কথাটা। হেসে টিটকারি করে বলল,

“- যারা অন্যের কানে বিষ ঢালে, তারা বুঝি খুব ভালো”?
শান্তর মা নতুন বউয়ের লাগামহীন কথায় ধমকে উঠলেন। বললেন,
“- এত কথা বলো কেন? বড়দের মুখে মুখে তর্ক করতে হয় না”।
রাইমা নিভে গেল। অন্য কেউ এমন করে বললে সে দুটো কথা শুনিয়ে দিতো। কিন্তু শান্তর মায়ের সাথে তর্ক করতে মোটেও ইচ্ছুক নয় সে। সে চায় শান্তর পরিবারের মানুষের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে, ভালো সম্পর্ক স্থাপন করে সুখে থাকতে। তাই রাইমা চুল হয়ে গেল। মুখটা বন্ধ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। দুপুরের দিকে ভিড়ভাট্টা কমে যেতেই শান্ত ঘরে ঢুকল। রাইমা ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে বেরিয়ে গিয়েছিল, ফিরল মাত্র। রাইমা তাকে দেখে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,

“- সেই সকালে বেরিয়েছো, এখন ফিরলে? নতুন বউকে ঘরে রেখে কেউ বাহিরে বাহিরে ঘুরে বেড়ায়”?
শান্ত তির্যক চোখে চেয়ে বলে,
“- আপনি যা করেছেন, তারপরেও আপনার মনে হয় আমার সহজ হওয়া উচিত আপনার সাথে”?
খিলখিল করে হেসে ফেলল রাইমা। বলল,
“- বাহ্ রে ভাই বাহ্! যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর। শুনেন, আমার মতো কেউ আপনাকে ভালোবাসতে পারবে না বুঝেছেন? আমার মতো ভালোবাসার একটা মানুষ পেয়ে আপনার উচিত বুক ফুলিয়ে চলা। আমি অন্যদের মতো আবেগী নই যে, ভালোবাসার মানুষকে না পেয়ে আত্মহত্যা করবো। আমি শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছি। যতটা নিচে নামতে হয় ততটা নিচে নেমেছি, বাবা-মায়ের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হয়েছি, শুধুমাত্র আপনার সাথে সংসার করবো বলে। আর আপনি আমার বদনাম করছেন?”
“- সবার সামনে আমরা অপমানিত হয়েছি রাইমা”।
রাইমা হেসে বলল,

“- ব্যাপার না। প্রেম-ভালোবাসার উত্তাপে সমস্ত বদনাম ঘুচে যাবে”।
শান্ত জিভে কামড় দিল। ড্যাবড্যাব করে চাইল রাইমার দিকে রাইমার লাগামছাড়া কথায় তাজ্জ্বব বনে গেল সে। সতর্ক হয়ে বলল,
“- এসব কি বলছেন আপনি? আল্লাহ্, কেউ শুনে ফেললে”?
রাইমা দুষ্টু হেসে আঁচল টেনে মুখে চেপে লাজুক ভঙ্গিতে বলল,
“- শুনে ফেললে বুঝে যাবে আমাদের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা একটু বেশিই”।
শান্ত বুঝল, একে বলে লাভ নেই। সে এক নজর তাকাল রাইমার পানে। তার পরনে তারই মায়ের লাল জামদানী শাড়ি। মাথায় কাপড় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাইমা। অন্যান্য দিনের তুলনায় মেয়েটিকে একটু বড়, পরিপক্ব লাগছে। শান্ত তার চোখ ফিরিয়ে নিল। বলল,
“- খেয়েছেন রাইমা”?
সকালে বাড়িতে মানুষ আসার আগেই রান্নাঘরে গিয়ে বিয়ে বাড়ির খাবার খেয়ে ফেলেছে রাইমা। কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করেনি সে। খিদে পেলে খাবে, এতে আবার ঘটা করে অনুমতি নেয়ার কি আছে? তবে দুপুরে খাওয়া হয়নি ওর। মানুষের ভিড়ে উঠে যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

“- খাইনি”।
শান্ত ভ্রু কুঁচকে ফেলল। দরজার সামনে এসে তার আম্মাকে ডাকল দুবার। শান্তর মা ঘরের সামনে আসতেই শান্ত জিজ্ঞেস করল,
“- রাইমাকে খেতে দাওনি আম্মা”?
শান্তর মা বিব্রত হলেন। বাড়ি ভর্তি মানুষ ছিল সকাল থেকে। সবাইকে আপ্যায়ন করতে করতে রাইমার তার খেয়াল নেই। রাইমাকে সকালে একবার খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি। রাইমা জানিয়েছিল সে খেয়েছে। দুপুরে আর তার সাথে দেখা করেনি শান্তর আম্মা। তিনি বললেন,
“- তোর বউকে খেতে দিতে হবে কেন? সকালে নিজে বেড়ে খেয়েছে, দুপুরে খায়নি আমি কিভাবে জানবো”?
শান্ত আহত সুরে বলল,
“- তোমার একটু নজর রাখা উচিত ছিল আম্মা। সে এ বাড়িতে নতুন। আর তো কোনো মেয়ে মানুষ নেই বাড়িতে। তুমি যদি একটু খেয়াল না রাখো কিভাবে হবে”?
শান্তর আম্মা বললেন,
“- কত কাজ আমার, আমি কি বসে আছি? আমিও তো খাইনি সারাদিন”।
শান্ত মৃদু হাসল। বলল,
“- আচ্ছা, টেবিলে বসো। একসাথে খেতে বসি তাহলে”।

বিকেলে টিউশন পড়িয়ে ফেরার পথে মৃত্তিকাকে বড়ই উদাস দেখাল। আফিম বেরিয়ে গিয়েছিল, আর একটি কলও করেনি। বাড়িতেও ফেরেনি। লোকটা বুঝি মৃত্তিকাকে সন্দেহ করছে? আফিম এদিক থেকে খুবই সচেতন। তার খারাপ লাগে, রাগ হয়। কিন্তু কখনো মৃত্তিকাকে সন্দেহ করে না, চরিত্রের দিকে আঙুল তোলে না। প্রচণ্ড বিশ্বাস করে সে মৃত্তিকাকে। এতটা বিশ্বাস মৃত্তিকা নিজেও নিজেকে করে না।
মৃত্তিকা চুপচাপ, মাথা নিচু করে হাঁটছিল। কিছুই ভালো লাগছে না ওর। পা টেনে টেনে হাঁটছে সে। তন্মধ্যে রুবিকে দেখতে পায় সে। সামনের সরু গলি দিয়ে আসছে রুবি। পরনে ফ্যাকাসে রঙহীন শাড়ি, হাতে বড়সড় কাপড়ের ব্যাগ। মৃত্তিাকাকে দেখেই রুবি থামল। তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। মৃত্তিকার পা জোড়াও থামল। আহা, কত সুন্দর সম্পর্ক ছিল ওদের মাঝে। একসাথে কত জায়গায় ওরা ঘুরে বেরিয়েছে, তার হিসেব নেই। আড্ডা, মজা, গসিপে দুজন মেতে থাকতোক। মনে হতো ওরা একে অপরের প্রাণ। কাউকে ছাড়া কেউ বাঁচবে না। অথচ পরিস্থিতি, সময় ঠিক দেখিয়ে দিল প্রিয় মানুষদের হারিয়েও মানুষ বাঁচে, সময় তার আগের নিয়মেই প্রবাহিত হয়। পরিস্থিতি সব জ্বালা যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়। আজ ওরা অপরিচিত। দেখা হলে আগের মতো উচ্ছ্বাস, আনন্দ জেঁকে বসে না। বরং তিক্তটায় বক্ষমাঝে পীড়া শুরু হয়।
রুবি এগিয়ে এলো পা বাড়িয়ে। মৃত্তিকা মুখ ফিরিয়ে নিলেও রুবি টলল না। একেবারে মৃত্তিকার সম্মুখে এসে দাঁড়াল সে। জিজ্ঞেস করল,

“- কেমন আছিস”?
মৃত্তিকা জবাব দিল না অনেকটা সময় ব্যয় হলেও। রুবি নিজেই কথোপকথন অব্যাহত রাখল। বলল,
“- তোর ভাগ্য দেখে আমার খুব হিংসে হয় রে। ভেবেছিলাম ইয়াসিনকে হারিয়ে তুই ভালো থাকবি না। এখন দেখছি আগের চেয়েও অনেক ভালো আছিস”।
মৃত্তিকা ফিচেল হেসে বলল,
“- নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ রুবি, তোর আজ কি অবস্থা। অন্যের সুখ কেড়ে নিয়ে কেউ সুখী হয় না। তুইও হোসনি, হবিও না। আমার বর্তমান অতীতের চেয়েও সুন্দর”।
রুবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“- ইয়াসিন তোকেই ভালোবাসতো। আমার সাথে ও শুধু শুতে চেয়েছিল”।
রাস্তায় দাড়িয়ে এ ধরণের অশালীন কথা শুনে মুখ বিকৃত করে ফেলল মৃত্তিকা। অস্বস্তি ঘিরে ধরল তাকে। কথাটা বড় বিশ্রী শোনাল। রুবিকে আর কিছু বলতে না দিয়ে সে বলল,

“- আমি এসব শুনতে চাইনি।”
“- আমাদের হঠাৎ দেখা হলো কেন জানিস? যেন তুই আমার বর্তমান সম্পর্কে ধারণা করতে পারিস। জানিস কেমন আছি? ইয়াসিনের সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে। বাবার ঘাড়ে বসে খাচ্ছি। অভিশাপ দিয়েছিলি না? ফলেছে। তোর উপর খুব রাগ হয়। এত রাগ তোর? এত জেদ যে আমাদের সংসারটাকেই ভেঙে দিলি”?
মৃত্তিকা অবাক হলো। বলল,
“- আমি তোর সংসার ভেঙেছি”?
“- হ্যাঁ, কেন বেঁচে আছিস? তুই বেঁচে আছিস বলেই ইয়াসিন ঘুরে ফিরে তোর কাছেই যায়।”
মৃত্তিকা কঠোর হলো। চোখ পাকিয়ে কাটকাট কণ্ঠে বলল,
“ তোর স্বামীর নজর ভালো না। তাই ঘুরেফিরে আমার কাছে আসতে চাইতো। তোর কি মনে হয়? ইয়াসিনের মতো জানোয়ারকে আমি দ্বিতীয়বার সুযোগ দিবো? আমি এতটাই ফেলনা? ইউসড কাউকে জীবনে ঠাই দিবো ভাবলি কি করে? আমার অতীত আছে, তবে আমি কোনো রকম নোংরামি করিনি, হক মারিনি। তোদের সাথে আজ যা হচ্ছে, সব তোদের পাপের ফল।”
মৃত্তিকা দাঁড়াল না এক মুহুর্তও। রাগে, ক্ষোভে উন্মাদ হয়ে উঠল রুবি। পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল,
“- আমিও অভিশাপ দিলাম। তুই সুখ টিকবে না”।
মৃত্তিকা হাসল। আফিম মির্জার মতো মানুষ যার জীবনে আছে, সে সুখী না হয়ে পারে?

টং দোকানে বসে আছে আফিম। তার সাথে রয়েছে রূপক, রায়ান। শান্ত নতুন বিয়ে করেছে, ওকে আর কেউ ঘাটায়নি। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিল আফিম। মন মেজাজ ভালো নেই তার। প্রচণ্ড বিরক্ত সে। মুশফিকের মতো বদমাশ ছেলের সাথে মৃত্তিকাকে দেখে খুব রাগ হচ্ছে। বেশি রাগ হচ্ছে মৃত্তিকার আচরণে। সে কেন এসব গায়ে পড়া ছেলে মানুষ বরদাস্ত করবে?
বৃষ্টি পড়বে। বাজ পড়ছে। হাওয়া শীতল হয়ে আসছে, আরাম লাগছে খুব। আফিমের মনে পরল কয়েক মাস আগের কথা। এভাবেই সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল। মৃত্তিকা মিষ্টি রঙের একটি শাড়ি পড়ে হেঁটে যাচ্ছিল। একটা ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়েছিল ওরা। দুজনের মাঝে কথা হয়েছিল টুকটাক। মৃত্তিকা তখন তাকে সহ্যই করতে পারতো না। অপরিচিত একটি মেয়েকে বৃষ্টির মাঝে হেঁটে যেতে হৃদপিণ্ড অস্বাভাবিক ভাবে লাফাচ্ছিল আফিমের। মেয়েটির চোখের ভেজা অশ্রু নজরে পড়েছিল। দুর থেকেও সে বুঝেছিল মেয়েটি বিষণ্ণ।
আফিমের বাড়ি ফিরতে ফিরতে বৃষ্টি শুরু হলো মুষলধারায়। বৃষ্টিতে ভিজে গেল বেচারা। চটজলদি বাড়ির বাইরে বাইকটা ফেলে ঢুকল বাড়ির ভিতরে। মৃত্তিকা বিছানার মাঝ বরাবর বসে বাচ্চাদের পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করছে। আফিমকে এভাবে কাক ভেজা হয়ে ফিরতে দেখে সে উঠে তোয়ালে এনে আফিমের মাথা মুছিয়ে দিতে উদ্যত হলো। আফিম সরাল না সেই যত্নের হাত। চুপ করে দাড়িয়ে রইল সে। মৃত্তিকা তোয়ালে দিয়ে আফিমের ভেজা চুল মুছিয়ে দিল, বুক, ঘাড় মুছিয়ে দিল। আলতো হেসে বলল,

“- রাগ কমেছে”?
ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে আফিমের শার্টটা। বুক, পিঠ বোঝা যাচ্ছে। আফিম শার্টটা খুলে ফেলল। গমগমে সুরে বলল,
“- আর কখনো কোনো ছেলের সাথে মিশবে না তুমি। মনে থাকবে”?
মৃত্তিকা হাসল নিঃশব্দে। মাথা নেড়ে বলল,
“- মনে থাকবে”।
মৃত্তিকার মাথায় ওড়না। সে এতটাই ওড়না টেনে রেখেছে যে ওড়নার কারণে মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। আফিম তাতে বেশ বিরক্ত হলো। বলল,
“- ওড়না সরাও।”
মৃত্তিকা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে বলল,

“- কেন”?
“- ঝটপট কয়েকটা চুমু খেতে দাও”।
মৃত্তিকা লজ্জা পেল ভারী। সরে এসে বিছানায় বসতে বসতে বলল,
“- কাজ করছি, আপনি গিয়ে কাপড় বদলে নিন”।
“- চলো বৃষ্টিতে ভিজবো”।
মৃত্তিকা অবাক হলো খুব। আফিম না রেগে ছিল? এখন মানুষটাকে এতটা চনমনে দেখাচ্ছে কি করে? আফিম তাড়া দিল। মৃত্তিকার হাত ধরে টেনে ছুটল বাইরে। মৃত্তিকার পা চলল আফিমের সাথে সাথে। নূপুরের ঝনঝন শব্দটা ভীষণ স্পষ্ট শোনাল। আফিম তাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছুটে চলল ছাদে। ছাদ পুরো ভেজা। বৃষ্টির পানি স্বচ্ছ হয়ে ধরা দিয়েছে সেথায়। আফিম টেনে মৃত্তিকাকে ছাদের মাঝখানে দাড় করাল। মৃত্তিকা ভিজে গেল তৎক্ষণাৎ। প্রথমে খানিক লজ্জা পেলেও সময়ের সাথে সাথে লজ্জাটুকু কেটে গেল তার। আকাশের পানে তাকিয়ে দু হাত মেলে দিল মৃত্তিকা। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি কণা ছুঁয়ে দিল তার পুরো দেহ। শীতল হলো মন। আফিমের গা উন্মুক্ত। ফর্সা বুক চুইয়ে পানিধারা গড়াচ্ছে। সে এক হাতে মৃত্তিকার মুখে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল। চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে বলল,

“- তোমাকে অন্য কারো পাশে দেখতে চাই না। তোমাকে কেবল আমার সাথে ভালো দেখায়, আমার সাথেই মানায়”।
মৃত্তিকা চোখ মেলল না। লজ্জায়, অস্বস্তিতে আড়ষ্ট হলো সে। নতজানু হলো। চিবুক বেয়ে পানি গড়াতেই আফিম তার অধরজোড়া চেপে ধরল মৃত্তিকার চিবুকে। কামড়ে ধরল অংশ টুকু। মৃত্তিকা নড়চড় করার সুযোগ পেল না। আপনাআপনি তার হাত উঠে গেল আফিমের ঘাড়ে। আঁকড়ে ধরল পুরুষালী ঘাড়ের পিছন অংশ। সযত্নে মৃত্তিকার গালে চুমু বসাল গাঢ়ভাবে। মেয়েটার নাজুক গাল দেবে গেল শক্ত চুমুর অনিয়ন্ত্রিত চাপে। মৃত্তিকা আলতো হেসে বলল,
“- রাগ কমেছে তবে”?
আফিম ঠোঁট সরাল। বলল,
“- কমেনি”।
“- একটুও না”?
“- একটুও না”।
“- আপনি আমাকে সন্দেহ করেন”?
“- না। সন্দেহ নয়, তোমাকে অন্য কারোর সাথে সহ্য হয় না। বিয়ে করা বউ তুমি আমার। সমগ্র গ্রামবাসীকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করেছি তোমাকে। আমার সম্পদ, আমার প্রেম অন্যের অন্য কারো সাথে দেখতে চাই না”।

“- তার সাথে আমার অতটাও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না”।
“- আমি জানি”।
“- জেনেও এত রাগ? মাফ করা যায় না”?
“- যায়, তবে শর্ত আছে”।
“- কী শর্ত”?
“- জড়িয়ে ধরবে মৃত্ত”?
মৃত্তিকা হাসল গা দুলিয়ে বলল,
“- ব্যাস, এতটুকুই”?
আফিম ও হাসল। হাসলে তাকে দারুণ দেখায়। স্নিগ্ধ মুখ পানে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। আফিম সুন্দর, বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর। তার এই সৌন্দর্য ইর্ষা ধরায় মৃত্তিকার মনে। সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে বলে,
“- আপনি একটু নিচু হবেন”?
আফিম মানল। একু ঝুঁকে এলো মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা তার দু হাতে আগলে ধরল আফিমের বুক। নিজের গাল ঘষে দিল আফিমের গালে। বলল,

“- আমার খুব শখ ছিল বউ সাজার। বিয়ের আয়োজন নিয়ে অনেক রকম ফ্যান্টাসি কাজ করতো আমার। লাল টকটকে শাড়ি পড়ে বউ সাজার ইচ্ছে পূরণ করবেন আফিম? সবাই জানবে আমরা এক। জানবে আফিম মির্জা বিবাহিত, তার মন ও মস্তিষ্কে কারো প্রবেশ নিষিদ্ধ”।
আফিম মৃত্তিকার ললাটে চুম্বন একে বলল,
“- তোমায় বউ সাজে আবারও ঘরে তুলবো। পুরো শহর আমাদের বিয়ে সম্পর্কে জানবে। খুশি?”
মৃত্তিকা মাথা নেড়ে আফিমকে জড়িয়ে ধরল। হাতের বাঁধন দৃঢ় হলো তার। আফিম ব্যগ্র সুরে বলল,

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৩

“- ভালোবাসার মানুষকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখার কোনো মাধ্যম নেই? আমি তোমায় বক্ষমাঝে লুকিয়ে রাখতে চাই। একটু আধটু ছুঁয়ে নিজের পাপ কমাতে চাই। রাতের আঁধারে কিংবা দিনের পূর্ণ আলোয় প্রাণ ভরে দেখতে চাই তোমায়। এটুকু ইচ্ছে কী অসম্ভব?”?

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৫