Home ওরা মনের গোপন চেনে না ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৩

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৩

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৩
বৃষ্টি শেখ

মাঝরাতে একটি দুঃস্বপ্ন দেখে ক্ষণে ক্ষণে ফুঁপিয়ে উঠছে মৃত্তিকা। গা দুলছে মেয়েটার। গাঢ় শ্বাস ফেলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আফিমের বুকে মাথা রেখে, আফিমের শার্ট হাতের মুঠোয় চেপে ধরে কাঁদছে মৃত্তিকা। আফিমের গায়ের সাথে পুরোপুরি লেপ্টে আছে সে। মৃত্তিকার চোখের পানিতে আফিমের শার্ট ভিজে যাওয়ায় ঘুমটা আলগা হয়ে আসে আফিমের। ঘুমের রেশ কেটে যেতেই নড়েচড়ে চোখ মেলে তাকায় ছেলেটা। মৃত্তিকাকে নিজের সাথে মিশে থাকতে দেখে মুচকি হাসে সে। পরক্ষণেই মৃত্তিকার ভেজা গাল, কান্নার শব্দ শুনে সে অস্থির হয়ে ওঠে। ঘুমের ঘোরেই কাঁদছে মৃত্তিকা। চোখ বেয়ে অঝরে পানি গড়াচ্ছে। আফিম চিন্তিত হয়ে পড়ে কিছুটা। উদ্বেগ মেশানো কণ্ঠে ডাকে মৃত্তিকাকে,

“- মৃত্তওও, অ্যাই”।
মৃত্তিকা নড়েচড়ে ওঠে। তড়াক করে চোখ মেলে তাকায় সে। চোখ মেলেই উষ্কখুষ্ক চুলের আফিম নামক সুদর্শন পুরুষটিকে দেখে তব্দা খায় সে। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মানুষটার পানে। তার চোখ জোড়া আফিমের পুরো মুখে নজর বুলায়। মৃত্তিকার অবাক, অবিশ্বাস্য দৃষ্টি আফিমকে আরো চিন্তিত করে তোলে। মৃত্তিকা বিশ্বাসী করতে পারছে না আফিম তার পাশে শুয়ে। সে তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মৃত্তিকার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে আফিম বলে,

“- কাঁদছো কেন? খারাপ স্বপ্ন দেখেছো”?
মৃত্তিকা উত্তর দেবার অবস্থায় নেই। সে কাঁপা কাঁপা হাতে আফিমের মুখে হাত রাখে। খুব ধীরে, নরম হাতে আফিমের চোখে, ঠোঁটে, নাকে হাত বুলায় সে। যখনই সে উপলব্ধি করতে পারে আফিম তার ভ্রম নয়, রক্তে মাংসে গড়া দেহ, তখনই মেয়েটা ঝাঁপিয়ে পড়ে আফিমের বুকে। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে সে। কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা কণ্ঠে সে বলে,
“- খুব বাজে স্বপ্ন ছিল, আমি কিছুতেই মানতে পারছি না। স্বপ্নটা সত্য বলে মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সব সত্য।”
আফিম জড়িয়ে ধরে মৃত্তিকাকে। সাথে সাথেই গাদা গাদা প্রশ্ন করে মৃত্তিকাকে কষ্ট দিতে চায় না সে। কিছুটা সময় নেয় আফিম। মৃত্তিকাকেও সময় দেয়। মেয়েটার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় পরম আদরে । ধীরস্থির কণ্ঠে বলে,
“- স্বপ্ন ছিল, কেঁদো না।”

মৃত্তিকা আফিমের শার্ট ছাড়ে না কোনোমতেই। বরং মানুষটার বুকে আরো মুখ গুঁজে থাকে। হেঁচকি তুলে বলে,
“- সব একদম বাস্তব মনে হচ্ছিল। আমি কিছুতেই আমার কান্না থামাতে পারছি না”।
আফিম টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিল। উঠে বসল। মৃত্তিকাও আফিমের শার্ট আঁকড়ে ধরে উঠে বসল। আফিম চট করে মেয়েটাকে পাজোকোলে তুলে নিল। বিস্ময়ে কান্না থেমে গেল মৃত্তিকার। গাল মুছে সে উত্তেজিত সুরে বলল,
“- কোলে তুললেন কেন”?
আফিম গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“- মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে দিয়েছো। শাস্তি দেবো। বেলকনি থেকে ফেলে দিলে কেমন হয়”?
আঁতকে ওঠে মৃত্তিকা। জড়িয়ে ধরে আফিমের কাঁধ। হাত পা ছুঁড়ে সে বলে,
“- নামান আমাকে, আফিম, ফেলবেন না প্লিজ”।
আফিম মিছে রাগ দেখিয়ে বলল,

“- ফেলে দেবো। শুধু শুধু কান্না করবে কেন”?
মৃত্তিকা চট করে মুখ মুছে নিল। বলল,
“- আর কাঁদবো না। ফেলে দেবেন না প্লিজ। ওখান থেকে পড়লে মরেই যাবো”।
আফিম ফিক করে হেসে ফেলে। ভড়কে যায় মৃত্তিকা। অবুঝের ন্যায় তাকিয়ে থাকে প্রাণ খুলে হাসতে থাকা মানুষটার দিকে। আফিম থাই গ্লাস ঠেলে মৃত্তিকাকে নিয়ে আসে বেলকনিতে। সেখানকার একটি রকিং চেয়ারে বসিয়ে দেয় মৃত্তিকাকে। শনশনে বায়ু এসে ধাক্কা দেয় মৃত্তিকাকে। শীত করতে আরম্ভ করে তার। আফিম মৃত্তিকাকে বেলকনিতে রেখে ঘরে ঢোকে। যেতে যেতে বলে,

“- আসছি, একটু বসো”।
মৃত্তিকা বসে রইল। আফিম একটি মোটা চাদর এনে মৃত্তিকার গা ঢেকে দিল। মৃত্তিকা আরক্তিম হয়ে দেখল কেবল। মৃত্তিকার পায়ের নিচে বসল আফিম। মৃত্তিকা থমকাল। অজানা অনুভুতিতে পিষ্ট হলো হৃদয়। বিব্রত হলো খুব। আফিম তার প্যান্টের পকেট থেকে একটি চকচকে সোনার নুপুর বের করল। মৃত্তিকার এক পা টেনে সামনে আনতেই মৃত্তিকা চেঁচিয়ে উঠল। বলল,
“- পা ধরছেন কেন? আমার সুরসুরি লাগছে”।
আফিম শুনল না। মৃত্তিকার দু পা তার খসখসে হাতে ধরে সামনে টেনে দু পায়ে নুপুরটা পড়িয়ে দিল। বিস্মিত হলো মৃত্তিকা। নুপুরটির দিকে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ। খুশিতে চোখ জোড়া চকচকে হয়ে উঠল মেয়েটার। পা নাড়িয়ে নুপুরের ঝুনঝুন শব্দ তুলল সে। নিস্তব্ধ, সুনসান রাতে তার পায়ের নুপুরের ঝুনঝুন শব্দ বেশ প্রকট শোনাল। মেয়েটা হেসে উঠল বাচ্চাদের মতো করে। বলল,

“- কি সুন্দর!
“- পছন্দ হয়েছে”?
মৃত্তিকা মাথা নেড়ে সায় জানাল,
“- খুউউব”।
আফিম মেঝেতই দু হাঁটু এক করে বসল। বলল,
“- আজ আর ঘুমোতে হবে না। চলো গল্প করি”।
“- গল্প”?
“- হু, আমার, তোমার, আমাদের গল্প”।
মৃত্তিকা চেয়ার ছেড়ে আফিমের মতো করেই দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসল। হাঁটুর উপর হাত রেখে সেখানে মাথা রেখে ঘাড় বাঁকিয়ে চাইল আফিমের দিকে। বেশ কিছুটা সময় কাটতেই মৃত্তিকা বলে উঠল,
“- মিশন থেকে ফেরার পর আপনি আমাকে একটা পেনড্রাইভ দিয়েছিলেন, আমি ফুটেজটা দেখেছি”।
আফিম হেসে বলল,

“- ভালো করেছো। কালই ভিডিওটা পোস্ট করা হবে”।
মৃত্তিকার তৎক্ষনাৎ সেই দুঃস্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেল। বক্ষমাঝে তোলপাড় শুরু হলো মেয়েটার। উত্তেজিত স্বরে সে বলে উঠল,
“- আপনি এই কেসটা থেকে বেরিয়ে আসুন আফিম। ওরা আপনাকে মেরে ফেলবে। আপনি ওই ভিডিও গুলো কোথাও আপলোড করবেন না, আমি করতে দেবো না”।
আফিম শান্ত সুরে জিজ্ঞেস করল,
“- কেন”?
“- ওদের অনেক ক্ষমতা। ওরা আপনাকে খু’ন করে ফেলবে আফিম। আপনি কিছুতেই ওদের বিরুদ্ধে লড়তে যাবেন না”।

আফিম রেগে গেল না। এই হুটহাট না রেগে যাওয়ায় সে ভারী অবাক হলো। এমনিতে তার মেজাজ থাকে তুঙ্গে। বেহুদা কথায় মেজাজ চড়ে যায়। সেখানে মাঝ রাতে মৃত্তিকার করা অদ্ভুত কথাবার্তায় আফিমের অসম্ভব রেগে যাওয়ার কথা। মৃত্তিকার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে আফিম বোধহয় গালি দিতো, চড়ও দিতো দু একটা। কিন্তু মৃত্তিকাকে সে মারতে পারে না, আঘাত করতে পারে না। ইদানিং সে বড্ড ভীত, নরম হয়ে উঠেছে। খুব ছোট বিষয়েও রাগ করে মুখ ফুলিয়ে রাখে। আফিম মেয়েটাকে রাগ দেখাতে পারে না, উপেক্ষা করতে পারে না। মেয়েটার মুখ পানে তাকালেই রাগ কমে আসে, মেজাজ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সে মৃত্তিকার চোখে চোখ রেখে বলে,
“- এটা আমার প্রফেশন মৃত্ত”।
বাকি কথা বলতে দিল না মৃত্তিকা অধৈর্য্য হয়ে বলল,
“- আমি কিচ্ছু জানি না। আপনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর আইনমন্ত্রীর অনৈতিক কর্মকাণ্ড ফাঁস করবেন না। যাদের ধরে লকাপে রেখেছেন, ওদেরকেও ছেড়ে দিবেন”।
“- ওরা আমার কিছুই করতে পারবে না মৃত্ত। শোনো আমার কথা”।
মৃত্তিকা শুনল না কিছুই। বলল,
“- আমি স্বপ্নে দেখেছি ওরা আপনাকে মেরে ফেলেছে। আমি কিছুতেই আপনাকে এ কেসে জড়াতে দেবো না। আপনার কিছু হলে আমার কি হবে ভেবেছেন? ওরা অনেক ক্ষমতাশালী। ওদের পিছে লাগলে ওরা যা খুশি করতে পারে”।

আফিম দুরত্ব কমিয়ে হাত রাখল মৃত্তিকার মাথায়। খুব ঠাণ্ডা মাথায়, নিচু স্বরে সে বলল,
“- তোমার জন্য আমাকে বেঁচে থাকতে হবে মৃত্ত। তোমায় ছাড়া আমি কোথাও গিয়ে ভালো থাকবো না”।
আফিমের হাতটা মুঠোয় গুঁজে নিল মৃত্তিকা। টলমলে, ভাসা চোখে চেয়ে করুণ সুরে বলল,
“- আপনি কথা দিন, আপনি ঠিক থাকবেন। আপনি কাজ শেষে আমার কাছে সবসময় ফিরে আসবেন। কথা দিন আমাকে”।
আফিম হাসল। হাসলে তাকে চমৎকার লাগে। মৃত্তিকার গাল টেনে বলল,
“- আমি নিজেকে রক্ষা করবো। আমার কিছু হবে না। দলের সব ছেলেপেলে সবসময় আমার সাথে থাকবে, অন্যান্য এজেন্টের সাথেও কথা হয়েছে। সমস্ত প্রটেকশন পাবো আমি”।
মৃত্তিকা দমে গেল ঠিকই, তবে মনটা শান্ত হলো না পুরোপুরি। নাক টেনে সে বলল,
“ আমি স্বপ্নে দেখেছি ওরা আপনার ক্ষতি করেছে”।
আফিমের স্বর জোরালো হলো। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,

“- এজন্য কাঁদছিলে”?
মৃত্তিকা প্রত্যুত্তর করল না। নামিয়ে নিল চোখ। দুরুদুরু কাঁপল বুক। আফিম তাকে সহজ করতে ডাকল,
“- মৃত্তিকা”?
আফিম সর্বদা মৃত্ত বলে ডাকে মৃত্তিকাকে। হঠাৎ তার মুখে নিজের আসল, পুরো নামটা শুনে মৃত্তিকা চমকাল। তৎক্ষনাৎ আফিমের দিকে তাকাল সে। আফিম হেসে বলল,
“- ভয় পেও না। আমি আছি তো। আমি পালাবো না”।
মৃত্তিকা শুনল। গভীর চোখ জোড়া উচ্ছ্বসিত হলো কিছুটা। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দুজনই তাকাল রাতের শহরটার দিকে। মৃত্তিকা দেখল নিস্তব্ধ পৃথিবীর এক টুকরো অংশকে, অথচ আফিম চেয়ে রইল তার পুরো জগতটার দিকে।

ভার্সিটির ক্যাম্পাস আজ আনন্দে মুখরিত। ভার্সিটির ভিপি নির্বাচনের ফল প্রকাশ পেয়েছে আজ। আগে যিনি ভিপি ছিলেন, তিনি খুব একটা শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দিতেন না। তাই এ বছর ভিপি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছিল। আজ ফল প্রকাশ পাওয়ায় চারপাশে কলরব শুরু হয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে ছাত্ররা শিস বাজাচ্ছে, হই হুল্লোর করছে, বিজয়ীকে উৎসাহিত করছে। এবারে সহ সভাপতি হিসেবে বিজয়ী হয়েছে মুশফিক ভাই। তিনি পড়াশোনায় তেমন একটা ভালো নন। বছর দুই ধরে একই ক্লাসে পড়ে আছেন। তার মাস্টার্স পাশ করার কথা ছিল চব্বিশে। অথচ ছাব্বিশে এসেও তিনি মাস্টার্সেই পড়ে আছেন। তবুও তিনি বিজয়ী হয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ স্টুডেন্টদের ভোট পেয়ে। সবাই তাকে পছন্দ করে। নির্বাচনের আগে সব শিক্ষার্থীদের সাথে তিনি মিশে গিয়েছিলেন। অনেকেই তার উদ্যোগ, তার কাজ ও ব্যবহার দেখে ভোটটা দিয়েছে।

মুশফিক ভাইকে মৃত্তিকা চেনে তেইশ সাল থেকে। এক সময় লোকটা মৃত্তিকার পিছু পড়েছিল। পাশের ফ্ল্যাটেই থাকতো মুশফিকরা। মৃত্তিকাকে খুব পছন্দ করতো সে। সদ্য কিশোরী হয়ে ধরা দেওয়া মেয়েটির প্রেমে এক সময় হাবুডুবু খেয়েছিল মুশফিক। মৃত্তিকা রিজেক্ট করেছিল তাকে। মুশফিক ছিল গায়ে পড়া স্বভাবের ছেলে। সেধে সেধে জ্বালাতন করা ছিল তার স্বভাব। মৃত্তিকার এসব পছন্দ ছিল না কোনো কালেই। কলেজে যাবার পথে মুশফিক দাঁড়িয়ে থাকতো, সরাসরি প্রপোজ করতো। এতে বিরক্ত হতো মৃত্তিকা। তার থেকে বারবার রিজেক্ট হয়ে মুশফিক নিজেও ধৈর্য্য হারিয়ে, বিরক্ত হয়ে মৃত্তিকার উপর থেকে মন সরিয়ে ফেলেছিল। এর পরেই মুশফিকের বাবা উত্তরায় জমি কিনে বাড়ি গড়ে তোলায় ওরা চলে যায় উত্তরায়। মৃত্তিকার সাথে তার সাক্ষাৎ হয় খুব কম। মৃত্তিকা যে মুশফিকদের ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে, তা সে জানায়নি মুশফিককে। তাদের ডিপার্টমেন্ট, বিল্ডিং সবই আলাদা। তাই তাদের দেখা হয়নি বললেই চলে। মৃত্তিকা ছেলেটার মুখোমুখি হয়নি তেইশ সালের পর। আজ অনেকদিন পর মুশফিককে দেখে অতীতের কথা কথা মনে পরল মৃত্তিকার।

মুশফিকের দু পা ধরে উঁচু করে তাকে শুন্যে তুলে নিয়ে তারই বন্ধুরা। হই হই করতে করতে, জয়ী ধ্বনি বাজাতে বাজাতে ছুটছে সকলে। মৃত্তিকার পা থামল। ওদের কে যেতে দেবে বলে রাস্তার এক পাশে সটান হয়ে দাঁড়াল। মুশফিক হাসতে হাসতে এক নজর দেখল মৃত্তিকাকে। কোনো কথা বলল না সে। মৃত্তিকাও ক্লাসে চলে এলো। ঘন্টা দুয়েক পরে ভার্সিটি থেকে বের হতেই মুশফিককে আবার দেখল মৃত্তিকা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে মুশফিক ধমকে উঠল,
“- ভিপিকে দেখে সালাম দিতে হয়, এটুকু ভদ্রতা জ্ঞান নেই তোমার”?
মৃত্তিকার গতি রোধ হলো। অবাক হলো লোকটির এমন ব্যবহারে। তবে মৃত্তিকা বাকবিতন্ডায় জড়াল না। বলল,
“- আমি দেখতে পাইনি”।
“- এখন তো পেয়েছো, সালাম দাও”।
মৃত্তিকার রাগ হলো কিছুটা। দমে সালাম জানাল,
“- আসসালামু আলাইকুম”।
টেনে টেনে উত্তর নিল মুশফিক,

“- ওয়া আলাইকুমুস সালাম। তুমি এ ভার্সিটিতে পড়ো?, কই কোনদিন তো দেখিনি। নাকি ঘুরতে এসেছো?”
মৃত্তিকা ওড়না কাঁধ থেকে মাথায় তুলে বলল,
“- আমি এখানেই পড়ছি”।
মুশফিক পৈশাচিক হাসি দিল। বলল,
“- সাবধানে থেকো। দিনকাল ভালো না, কবে কি হয়ে যায়”।
মৃত্তিকার ললাটে ভাঁজ পরল। বুঝতে না পেরে বলল,
“- কি বলতে চাইছেন”?,
মুশফিক কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভাবলেশহীন হয়ে বলে,
“- নাথিং, ভার্সিটির স্টুডেন্টদের এলার্ট করা আমার রেসপন্সিবিলিটি”।
মৃত্তিকা কথা বাড়াল না। মনটা কেমন যেন করে উঠল। সেখান থেকে ঝটপট পা বাড়িয়ে চলে এলো সে।

রাইমা অফিস থেকে রিজাইন নিয়েছে। তার হঠাৎ এভাবে রিজাইন নেয়ার কারণটা কেউ জানে না। সপ্তাহ খানেক ধরে মেয়েটা হঠাৎই গায়েব হয়ে গিয়েছে। কারো ফোন তোলে না, যোগাযোগ রাখে না। এ বিষয়টায় শান্ত জড়িয়ে পড়েছে। অফিসের অনেকেই ওদের অন্য চোখে দেখতো। ভাবতো ওরা হয়তো দুজন দুজনকে ডেট করছে। হঠাৎ রাইমা অফিস থেকে লিভ নেয়ায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে শান্ত।
আজ শান্তর বিয়ে। বিয়ের প্রতি শান্তর অনীহা কাজ করছে। শান্তর বিয়ে হচ্ছে তার বাবার এক আত্মীয়র মেয়ের সাথে। কেউ তাকে বিয়ের জন্য জোরজবরদস্তি করেনি। তবুও এক প্রকার বাধ্য হয়ে বিয়েটা করতে রাজি হয়েছে শান্ত।

শান্তর মায়ের গ্রামে কিছু জমি আছে। জমির সংখ্যা তুলনামূলক বেশি আছে তার ভাগে। বর্তমানে এর বাজারমূল্য কোটি টাকা। কিন্তু সমস্যা একটাই, শান্তর মামারা কোনোমতেই জমি গুলো শান্তর মাকে দিতে চাচ্ছে না। নানারকম কুটনৈতিক চাল চালছে তারা। মামলা মোকাদ্দমা করেছিল ওরা, বিভিন্ন মিথ্যে দলিল সাজিয়ে হেনস্তা করেছিল ওদের। ঠিক ওই সময়টায় শান্তর বাবার দূর সম্পর্কের ভাই তাদের এ বিপদ থেকে উদ্ধার করে। উকিল ধরা, আদালতে যাওয়া, টাকা-পয়সার সব ব্যবস্থা তিনিই করেন। উক্ত ঝামেলা মিটে যাওয়ার পর তিনি তার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব পাঠান শান্তর মায়ের কাছে। মেয়ে জামাই হিসেবে শান্তকে নাকি তার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। কিছু না ভেবেই এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেছে শান্তর মা। শান্ত যখন বিষয়টা জানল তখন না করার সাধ্য নেই তার। এছাড়া তার জীবনে এমন কেউ নেই যার জন্য বিয়েটা সে ভেঙে দেবে। বিয়ে ভাঙার কোনো যুতসই কারণ খুঁজে পায়নি শান্ত। মায়ের কথা রাখতে অত্যাধিক সরল ছেলেটা বিয়েতে রাজি হয়েছে বিনা দ্বিধায়। উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ বিয়ের ব্যাপারে দ্বিমত করেনি সে। এমনকি মেয়েটার ছবিও দেখেনি শান্ত। বোকা-সোকা লাজুক ছেলেটা হবু স্ত্রীর সাথে দেখা করার প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়েছে।
অফিসের সবাইকে দাওয়াত দেয়ার সময় রাইমাকেও কল করেছিল সে। কিন্তু রাইমা তার ফোনটা তোলেনি। রাইমা বিয়েতে না আসায় অফিসের সবার মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছে। অন্তত বন্ধুত্বের খাতিরে হলেও রাইমাকে এখানে আশা করেছিল সবাই।

মৃত্তিকা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে একটি কালো শাড়ি পড়েছে, দু হাত ভর্তি চুরি পড়েছে। চোখে কাজল দিতে গিয়ে বারবার লেপ্টে যাচ্ছে। বিরক্তিতে গা রি রি করছে মৃত্তিকার। ওদিকে আফিমের বাড়ি ফেরার খবর নেই। শান্ত সবার আগে আফিমকে কার্ড পাঠিয়েছিল। আজ ওদের শান্তদের বাড়িতে বিয়ের নিমন্ত্রণ আছে। আফিম বলেছিল সন্ধ্যায় চলে আসবে। কিন্তু সে আসেনি। একদিকে আফিমের উপর রাগ, অপরদিকে কাজলটা চোখে ঠিকভাবে লাগাতে পারছে না তার ক্ষোভ। সব মিলিয়ে রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে মৃত্তিকার।
আফিম ফিরেছে রাত আটটায়। রাগ আর জেদের মিশেলে মৃত্তিকা চুপ করে বসে আছে ঘরে। আফিম ঘরে ঢুকেই বুঝতে পারে মৃত্তিকা রেগে আছে। তড়িঘড়ি করে সে দ্রুত পায়ে ঢুকে পড়ে ঘরে। মৃত্তিকা তাকে দেখেই বাজখাঁই গলায় বলে ওঠে,

“- ফেরার সময় হলো আপনার? আসার কথা ছিল ছ টায়। এখন আটটা বাজে।”
আফিম দ্রুত ওয়াশরুমে ছুটে গেল। মেরুন শার্ট আর কালো স্যুট পড়ে পাঁচ মিনিটে তৈরি হয়ে নিল। হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বলল,
“- চলো চলো। ফুটেজ গুলো বুঝিয়ে দিতে সময় লাগল”।
মৃত্তিকা আঁতকে ওঠে। বলে,
“- ফুটেজ দিয়ে ফেলেছেন? তাহলে বাদ, আমরা কোথাও যাবো না। বাড়িতেই থাকবো”।
আফিম ত্যক্তবিরক্ত হয়ে বলল,
“- মৃত্ত, নাটক করবে না এখন। শান্ত বারবার কল করছে। ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।
মৃত্তিকা তার কানের দুল খুলে ফেলতে নিলে তার হাত টেনে ধরল আফিম। চোখ পাকিয়ে বলল,
“- একদম ন্যাকামো করবে না। কোন মাদারবোর্ড আমার কোন চুল ছেড়ে আমি দেখে নিবো”।
মৃত্তিকা রাগ দেখিয়ে বলে,

“- হ্যাঁ, আমার সবকিছুই আপনার নাটক মনে হয়। কেউ যদি আমাদের উপর অ্যাটাক করে? কি হবে ভেবেছেন”?
“- আমি আছি না? তোকে প্রটেক্ট করার দায়িত্ব আমার. ভয় পাচ্ছিস কেন”?
“- আমাকে নিয়ে আমি ভাবছি না। আমি জানি, আপনি আমার কোনো ক্ষতি হতে দেবেন না।”
“- তাহলে”?
“- আমি আপনাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছি। আমার তো মুরোদ নেই আপনার হয়ে লড়ার।”
আফিম শান্ত হলো। রাগটা দমে গেল। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“- আরো ছেলেপেলে যাবে আমাদের সাথে। কিছুই হবে না বোকা। আমি সব সামলে নিবো”।
মৃত্তিকা কথা বলল না আর। আফিম মেয়েটার আপাদমস্তক দেখে নিল চোখ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে। মৃত্তিকাকে সুন্দর লাগছে। কালো শাড়ির সাদা কারুকাজ চকচক করছে। মৃত্তিকার ঠোঁটের কাছে ঠোঁট এগিয়ে দিয়ে আফিম বলল,
“- এত সেজেছো কেন”?
তাকে এগোতে দেখে ভড়কে যায় মৃত্তিকা। বলে,

“- বিয়ে বাড়িতে যাবো, সাজবো না”?
“- এখন তো আমার কথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। আগুন সুন্দরীকে দেখে লোভ লাগছে। একটা চুমু খাই”?
মৃত্তিকা গোপনে হাসে। মিছে রাগ দেখিয়ে বলে,
“- আপনি কবে থেকে অনুমতির ধার ধারছেন”?
হাসল আফিম। খুব শান্ত ভঙ্গিতে সে ঠোঁট রাখল মৃত্তিকার অধরে। পরপর কয়েকবার চুমু দিল ঠোঁটের মাঝ বরাবর। কোমর চেপে ধরে মৃত্তিকার গাল গুলোতেও ঠোঁট বসিয়ে দিল। অস্বস্তিতে নত হলো মৃত্তিকা। কাঁপুনি অনুভব করল সে। বলল,

“- যাবেন না”?
আফিম ফিচেল হেসে বলল,
“- মাত্রই না বললে যেতে হবে না।”
“- তাই বলে আপনি আমায় এভাবে চেপে ধরবেন”?
“- এভাবে সাজলে তো ধরবোই।”
“- আপনি বলেছিলেন মেয়েদের প্রতি আপনার আগ্রহ কম।”
“- আরো বলেছিলাম আমি মোটেও ভদ্র নই। তোমাকে দেখলে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি না।”
“- আপনি না একজন এজেন্ট? এত অধৈর্য্য হলে হয়”?
আফিম মৃত্তিকার গালে গাল ঘষে। কেঁপে ওঠে মৃত্তিকার সর্বাঙ্গ। আফিম ফের মৃত্তিকার নরম গালে ঠোঁট ডুবিয়ে বলে,
“- স্বামী হিসেবে আমি এক রক্তিও ছাড় দেবো না।

বিয়ের আয়োজন খুব বড়সড় করে হয়নি। তবে যা হয়েছে তাতে মন্দ বলা যায় না। একটা বড় স্টেজ সাজানো হয়েছে, প্যান্ডেল টানানো হয়েছে। এলাকা ও আত্মীয়দের অনেক জনকে ইনভাইট করা হয়েছে। স্টেজে বসে আছে শান্ত আর তার হবু স্ত্রী মীরা। কনের বাড়িতেই এসেছে আফিম আর মৃত্তিকা। আশরাফ মির্জা আফিমের সাথে কিছু গার্ডকে পাঠিয়েছে। ওরা সবাই ঘিরে রেখেছে আফিম আর মৃত্তিকাকে। মেয়েটাকে দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মৃত্তিকা। শান্তর পাশে মেয়েটাকে মানাচ্ছে। মেয়েটা হাস্যোজ্জ্বল মুখে বসে থাকলেও শান্তর মুখে হাসি নেই। কেমন মিইয়ে আছে ছেলেটা। চোখ-মুখ অন্ধকার লাগছে। মৃত্তিকা পরখ করল শান্তকে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে বিয়ের মণ্ডপে এসে বসল ওরা।
কবুল বলার আগ মুহুর্তে একটি মেয়ে ছুটে আসে স্টেজের সামনে। মেয়েটির হাতে ধারাল ছুড়ি। হুট করেই সে ছুটে স্টেজের উপরে আসে। কোনো রকম কথাবার্তায় না জড়িয়ে মেয়েটা শান্তর কাছে এসে দাঁড়ায়। হাতে থাকা ছুড়িটা সবেগে শান্তর গলায় চেপে ধরে সে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল সকলে। বুঝতে পারে না কেউ কিছুই। শান্ত ভড়কায়। রাইমাকে এ মুহুর্তে এ অবস্থায় দেখে চমকে ওঠে সে। গলায় আটকে রাখা ছুড়িটার ধারাল অংশের কিছুটা চাপ লাগে গলায়। চামড়া একটুখানি কেটে রক্তের দেখা মেলে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে শান্ত প্রশ্ন করে,

“-, আপনি এসেছেন রাইমা”?
রাইমার পরনে লাল জামদানী শাড়ি। হাতে পায়ে অলংকার চকচক করছে, চুল বেঁধে দোপাট্টা পড়েছে মেয়েটা, প্রসাধনী মেখেছে মুখে। হুবহু বিয়ের কনে লাগছে রাইমাকে। সৌন্দর্যের কমতি নেই তার। মনে হচ্ছে নবরুপা বেরিয়ে এসেছে। পরপাটি লাল শাড়িতে তার বয়স বেড়ে গেছে। তাকে বিয়ের বেশ ভুষায় দেখে শান্ত চেয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। রাইমা উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“- আপনি যদি এই মেয়েটাকে বিয়ে করেন, তাহলে এই মন্ডবে আপনার লাশ ফেলে যাবো আমি”।
ভয়ানক, কর্কশ শোনাল রাইমার স্বর। উন্মাদ মেয়েটাকে দেখে সবাই ভয় পেল। কানাঘুষা শুরু হলে সকলের মাঝে। আৃতকে উঠল সবাই। রাইমা চেঁচিয়ে বলল,
“- যে আমাকে আটকাতে আসবে, তাকেই খুন করবো। বড় ছোট কিছুই মানবো না আমি“।
শান্তর রাগ হলো। নিজের গলার দিকে চেয়ে একদম স্থির থেকে বলল,
“- আপনি ভুল করছেন রাইমা”।

রাইমা হিংস্র হয়ে উঠেছে। তার জ্ঞান হুঁশ কিচ্ছু নেই। তার ছুড়ির চাপে শান্ত আহত হচ্ছে। এতেও যেন তার কোনো কষ্ট হচ্ছে না বরং সে শান্তি পাচ্ছে। শান্তর কথায় অট্টহাসি দিয়ে রাইমা বলল,
“- আপনাকে মেরে ফেলার পর আমি নিজেও মরবো। আপনাকে আমি না পেলে অন্য কেউ পাবে না। আপনাকে যদি আমি ছুঁতে না পারি, অন্য কেউ আপনাকে ছুঁতে পারবে না। আমি হতে দেব না। আমি তো মরবোই, আপনাকে সাথে নিয়ে মরবো”।
ফিসফাস করতে লাগল সবাই। পুলিশকেও কল করল কয়েকজন। রাইমার দৃষ্টি ভয়ানক। সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছে সে। যেন একটু নড়লেই ছোবল দিয়ে বসবে। দুরের চেয়ারটিতে পায়ের উপর পা তুলে বসে আফিম দেখে সবটাই। মৃত্তিকা ভয় পেয়ে যায়। আফিমের দিকে ঘুরে বলে,
“- আপনি বসে আছেন? শান্ত ভাইয়ার গলা কেটে গেছে”।
আফিম থুতনিতে আঙুল ঘষে বলে,

“- মেয়েটা পাগল নয়। ভয় পেও না”।
“- মনে হচ্ছে শান্ত ভাইয়াকে খুব ভালোবাসে”।
“- শান্তর কলিগ হয়”।
“- আপনি কি করে জানেন? বলেছে আপনাকে এই মেয়েটার কথা”?
“- না, বন্ধুদের খোঁজ আমি রাখি। ওর সাথে শান্তকে বেশ কয়েকবার দেখা গিয়েছে একসাথে। দেখি মেয়েটা কি করে”?
রাইমা অস্থির উত্তেজিত হয়ে শান্তর কলার চেপে ধরে। বলে,
“- বিয়ে করো আমায়। নইলে তোমাকে মারবো, আমিও মরবো। তুমি কি চাও আমি মরি? চাও না তো।”
শান্ত চটে গিয়ে বলল,

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩২

“- এসব সম্ভব নয় রাইমা”।
রাইমা মীরার দিকে তাকায়। মেয়েটা ভয়ে চুপসে গেছে। সে হেসে মীরাকে বলে,
“- এই ছেলেটাকে তুমি বিয়ে করবে? সুখ পাবে না কিন্তু। আমি তোমাদের সুখী হতে দিবো না।”

ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩৪