Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৪

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৪

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৪
সাবা খান

নিশুতি অন্ধকার শহরটাকে ঘিরে রেখেছে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাক, আর মাঝেমধ্যে বাতাসে দুলে ওঠা গাছের পাতার শব্দ ছাড়া আর কিছুই নেই। এই নিস্তব্ধতার মাঝেই আকাশ ছোঁয়া সেই বিলাসবহুল হায়দারদের কুখ্যাত
‘স্কাই পেন্টহাউস’ দাঁড়িয়ে আছে।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় কোনো ধনী মানুষের বিলাসী আশ্রয়স্থল। কাঁচের দেয়াল, উঁচু ব্যালকনি, নীল আলোয় ঝলমলে সুইমিং পুল। কিন্তু ভিতরেই পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। আর সেই পেন্ট হাউসের দিকে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটা ছায়া। কালো জ্যাকেট পরা, মাথায় হুড টানা সারহাদ চৌধুরী।
তার হাতে ধরা একটা ভারী বেসবল ব্যাট। ব্যাটটা সে এত শক্ত করে ধরে আছে যে তার আঙুলের গিঁটগুলো পর্যন্ত সাদা হয়ে উঠেছে। গেটের কাছে পৌঁছাতেই ভিতর থেকে কয়েকজন লোক দ্রুত এগিয়ে আসে। তারা সন্দেহ জনিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে একজম এগিয়ে এসে গর্জে ওঠে,

-“এই, কে রে তুই?”
আরেকজন সামনে এসে সারহাদের পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-“এই সময় এখানে কি করছিস?
কথা বলছিস না কেন?”
-“ভাই, মনে হচ্ছে বোবা”
লোক গুলো তার মজা উড়িয়ে তাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে। কিন্তু সারহাদের তরফ থেকে কোন শব্দ এলো না। সে শুধু মাথা একটু তোলে কাঁধের দিকে তাকায় যেখানে একটু আগে ঐ লোকটা ধাক্কা দিয়েছিল। তারপর সামনে তাকায়। তার কৃষ্ণকালো চোখ দুটো অদ্ভুত ঠান্ডা। তারপর এক সেকেন্ডও দেরি না করে ব্যাটটা ঘুরিয়ে সজোরে আঘাত করে,
”ধাম”

প্রথম লোকটার মাথায় সরাসরি আঘাত লাগে। মাথার হাড় ভেঙে যাওয়ার তীব্র শব্দ হয়। কিন্তু লোকটার মুখ থেকে কোন শব্দ বেরুলো না। সে সোজা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। দ্বিতীয় লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ব্যাট তার চোয়ালে লাগে। চোয়াল একপাশে বেঁকে যায়, র*ক্ত ছিটকে পড়ে মেঝেতে। তৃতীয় ব্যক্তি ঝাঁপিয়ে পড়তে যায় সারহাদের উপর তার আগেই সারহাদ ঘুরে দাঁড়ায়, ব্যাটটা নিচ থেকে উপরে তুলে তার পাঁজরে আঘাত করে।লোকটা মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকে। কিন্তু সারহাদ থামে না। সে আবার ব্যাট তুলে আরেকটা আঘাত হানে, এইবার সরাসরি মাথায়। র*ক্ত ছিটকে দেয়ালে লাগে। বাকি লোকগুলো তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। সারহাদ বাঁকা হেসে একসাথে তাদের উপর আঘাত হানতে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে
মেঝেতে পড়ে থাকে কয়েকটা নিথর দেহ। র*ক্ত ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ঠিক তখনই ভিতর থেকে আরেক দল বেরিয়ে আসে, এইবার তারা বন্দুকধারী। তাদের হাতে অটোমেটিক রাইফেল। একজন চিৎকার করে বলে,
-“শুট…”

কিন্তু ট্রি**গার চাপার আগেই সারহাদের পিছন থেকে একের পর এক গুলির শব্দ আসতে থাকে। দুজন বন্দুকধারী সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যায়। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে দুই মানব এজাজ আর ইয়ান। দুজনের হাতেই বন্দুক, চোখে একটুও দ্বিধা নেই। এক মুহূর্ত সারহাদের দিকে তাকায় পর মুহূর্তে আবার দক্ষ হাতে বন্দুক চালাতে থাকে। প্রতিটা গুলিতে একজন করে পড়ে যাচ্ছে। দুজনের নিশানা নিখুঁত, একটা গুলি একটা মৃত্যু।মুহূর্তের মধ্যে পুরো হলওয়ে গুলির শব্দে ভরে যায়। সারহাদ তখনও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
সে দুই হাত দুদিকে বাড়াতেই এজাজ আর ইয়ান কোনো কথা না বলেই একটা করে পিস্তল তার হাতে ছুড়ে দেয়। সারহাদ পিস্তল দুটো ক্যাচ করে। তার ঠোঁটে ধীরে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে ওঠে। তারপর সেও গুলি ছুড়তে থাকে। তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। আর পেছনে পড়ে থাকছে লাশের সারি।আজকের রাতটার জন্য সারহাদ বহু বছর অপেক্ষা করেছে। আজ সে জানতে পেরেছে, রনি হায়দার আবার বেরিয়েছে। বহু বছর আগে ‘সারহাদ ঐরাতে ভারতে খায়রুল বাসার কে খু*ন করেছে’ এটা জানতে পেরে সে গা ঢাকা দিয়েছিল, আর বের হয়নি। কিন্তু এত বছর কেটে গেছে, সারহাদ কিছু করেনি। তাই রনি ভেবেছে, হয়তো তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। এই ভুলটাই আজ তার শেষ ভুল।

নিজেকে নিরাপদ রাখতে সে এতদিন আশ্রয় নিয়েছিল সেই কুখ্যাত আলফা টিমের।সোফিয়ার সেই ভাড়াটে মারাত্মক সিকিউরিটি স্কোয়াড। কিন্তু আজ রনি এসেছে এখানে।নিজের বিলাসী পেন্টহাউসে। আজ সে এসেছে আনন্দ করতে। মদ, সংগীত, আর অচেনা নারীদের সাথে রাত কাটাতে। বাড়িতে তার স্ত্রী আর সন্তান থাকা সত্ত্বেও সে আজ অন্য নারীদের বাহুতে রাত কাটাতে এসেছে।

সারহাদের চোখে তখন আ*গুন জ্বলছে বহু বছরের প্রতিশোধের। সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে। এজাজ আর ইয়ান তার পিছনে।পেন্টহাউসের করিডোরে এখন শুধু পড়ে আছে র*ক্ত আর নিথর দেহ। সারহাদ শেষ সিঁড়িটা পেরিয়ে উপরে ওঠে। তার সামনে একটা বড় দরজা। মিউজিকের শব্দ ভেসে আসছে ভেতর থেকে সাথে হাসির আওয়াজ, নারীদের কণ্ঠ। সারহাদ দরজার সামনে এসে থামে। ঠোঁটে ধীরে একটা ভয়ংকর হাসি ফুটে ওঠে।
সারহাদ দরজায় টক… টক… টক… করে তিনবার নক করে। ভিতর থেকে কয়েক সেকেন্ড পরে দরজাটা খুলে যায় সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে চোখ নিচু করে। সে একবারও সারহাদের দিকে তাকায় না। চুপচাপ তার হাতে একটা ছোট চিপ তুলে দিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায়। এই পেন্টহাউসে আজ যেই মেয়েগুলো আছে
সবগুলোই সারহাদের পাঠানো। সারহাদ ধীরে ভেতরে ঢুকে পড়ে। রুমের ভিতরে লাল নীল নীয়ন আলো জ্বলছে সাথে জোরে জোরে গান বাজছে।

মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে রনি হায়দার। তার গায়ে শুধু ছোট একটা শর্টস, শরীর নেশায় দুলছে। চারপাশে তিনটা মেয়ে তাকে ঘিরে নাচছে। রনি হায়দার হাসতে হাসতে তাদের কোমর জড়িয়ে ধরছে, বারবার অযাচিতভাবে স্পর্শ করছে। তার চোখে নেশা আর বিকৃত আনন্দ। তার খেয়ালই নেই, রুমের ভেতরে আরেকজন মানুষ ঢুকে পড়েছে। সারহাদ কোনো শব্দ না করে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে রুমের একটা কোণে থাকা ক্যামেরার দিকে তাকায়। ছোট একটা ক্যামেরা সেখানে, যেখান থেকে পুরো দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যায়। তারপর সারহাদ বাঁকা হেসে রুমের এক কোণায় থাকা বারের দিকে গিয়ে গ্লাস তুলে নিজেই একটা ড্রিঙ্ক বানাতে শুরু করে।
বরফ ফেলে, হুইস্কি ঢালে তারপর গ্লাসটা হাতে নিয়ে ধীরে চুমুক দেয়। এরপর সে মেয়েগুলোর দিকে না তাকিয়েই শুধু আঙুল দিয়ে ইশারা করে। মেয়েগুলো এক সেকেন্ডও দেরি না করে চুপচাপ দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু রনি হায়দার এতটাই নাচে মগ্ন, সে বুঝতেই পারে না কখন তারা চলে গেল।কয়েক সেকেন্ড পরে সে চোখ খুলে চারদিকে তাকায়। মুহূর্তে তাদের না দেখে তার ভ্রু কুঁচকে যায়। সে হেসে তাদের ডাকতে থাকে,

–বেবি…হোয়ার আর ইউ?”
তোমরা লুকোচুরি খেলছো নাকি?
তার ঠোঁটে নোংরা হাসি ফুটে ওঠে,
-“আই লাইক হাইড এন্ড সিক…”
এই বলে চোখ ঘুরাতেই দৃষ্টি গিয়ে থামে বারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানবের উপর। রনি হায়দারের মুখের হাসি হঠাৎ জমে যায়। তার চোখ বড় হয়ে ওঠে, ঠোঁট কাঁপতে থাকে ভয়ে। কণ্ঠস্বর থেকে ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে,
-“সা… সারহাদ… চৌধুরী…”
সারহাদ কোনরূপ উত্তর দেয় না। সে শুধু গ্লাসে আরেক চুমুক দিয়ে, তার ঠোঁটে ধীরে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে রনির দিকে এগিয়ে আসে। রনি হায়দার পিছিয়ে যেতে থাকে। তার পা কাঁপছে। হঠাৎ পিছনে সোফায় ধাক্কা খেয়ে সে বসে পড়ে।সারহাদ তার সামনে এসে ঝুঁকে নিচু স্বরে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
-“এতক্ষণ যা যা করেছিস…এখানে আসার পর থেকে”
সে মাথা ঘুরিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকায়,

-“সব ওই ক্যামেরায় রেকর্ড হয়েছে। কাল সকালেই এগুলো হবে নিউজের হেডলাইন। দেশের সবচেয়ে বড় সমাজসেবক, সাবেক লেপটেন্যান্ট জেনারেল রনি হায়দার মেয়েদের সাথে মাতাল হয়ে উলঙ্গ নাচছে। সাথে তোর অবৈধ ব্যাবসার সব রেকর্ডিং। ভাবতে পারছিস কি হবে?”
তার বাক্য টুকু শ্রবণ হতেই রনি হায়দারের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। হঠাৎ সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সারহাদের পায়ে। পা ধরে বারবার আকুতি মিনতি করতে থাকে,
-“না, না, প্লিজ এটা করিস না। আমি ভুল করেছি। আমি তোকে সব দেব’
কিন্তু বিপরীতে থাকা সারহাদের চোখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে ধীরে গিয়ে সোফায় বসে পড়ে। রনি হায়দার এখনো তার পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছে,

-“আমার পরিবার আছে, আমার ছেলে আছে”
সারহাদ ঠান্ডা গলায় শুধায়,
-“হুম, কাল এগুলো তোর ছেলে দেখবে, তোর বউ দেখবে”
রনি হায়দার আগের থেকে আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে,
-“না না, বউ না, বউ না”
সারহাদ ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-“কেন? বউকে ভালবাসিস? তাহলে এতক্ষণ কি করছিলি? ওরা কি তোর বোন ছিল নাকি জানোয়ারের বাচ্চাআআআ…..”

কথাটা শেষ না হতেই সারহাদ হাতে ধরা গ্লাসটা তুলে নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে সোজা রনির মাথায় ছুড়ে মারে। মুহূর্তে গ্লাসটা ভেঙে যায়। রনি হায়দার চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়ে। র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে তার কপাল থেকে।
সারহাদ পকেট থেকে ধীরে একটা সাদা রুমাল বের করে। তার হাতের চারপাশে পেঁচিয়ে নেয়। তারপর মেঝে থেকে গ্লাসের ভাঙা কাচের টুকরোগুলো তুলে নেয়। তার চোখে এখন এক অদ্ভুত শান্তি, সে ধীরে রনির হাত ধরে। তারপর ‘ছ্যাঁক’ করে কাচটা তার হাতে বসিয়ে দেয়। রনি হায়দার আত্মা চিৎকার করে ওঠে। তারপর আরেকটা আঘাত এইবার তার পায়ে। প্রতিটা আঘাতে রনির ভেতর থেকে গলা ফাটানো আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে। কিন্তু সারহাদের মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। সে যেন একটা যান্ত্রিক কাজ করছে, ধীরে ঠান্ডা মাথায়। কিছুক্ষণ পরে রনি হায়দারের শরীর আর নড়তে পারে না। তার গলা শুকিয়ে গেছে, চিৎকার করার শক্তি টুকিও নেই। সে র*ক্তে ভেজা অবস্থায় পড়ে আছে। সারহাদ ধীরে তার কাছে ঝুঁকে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,

-“ডোন্ট ওয়ারি, আমি তোকে মারব না। কারণ তোর জন্য অন্য কাউকে ডেকেছি”
সে একটু থামে, ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে পৈশাচিক হাসি ফুটে ওঠে,
-“তুই যদি এখনই মরে যাস, তাহলে বুঝবি কিভাবে আত্মসম্মান হারানোর যন্ত্রণা?
যদিও তোদের আত্মসম্মান বলে কিছু নেই।
কাল তোকে কোর্টে তোলা হবে। যারা কাল পর্যন্ত তোকে সমাজসেবক বলত, তোর পায়ে মাথা ঠুকত, তারাই কাল তোর গায়ে থুতু ছিটাবে”
সারহাদের চোখে তখনও আ*গুন জ্বলছে। সে ফিসফিস করে আওড়ায়,
-‘মনে আছে আঠারো বছর আগে তুই কি করেছিলি?
আমার বাবাকে…
বাকি কথাটুকু বলার আগে সে থেমে যায়। তার গলা ভারী হয়ে আসে। চোখ বন্ধ করে ফের বলে,
-“আমার সামনে উ*লঙ্গ করে পিটিয়েছিলি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার ড্যাড আমার চোখের দিকে তাকাতে পারেনি, লজ্জায়…”

সে ধীরে রনির কলার ধরে তাকে তুলে বসায়। তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“তুইও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোর ছেলের চোখের দিকে তাকাতে পারবি না”
ঠিক তখনই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এজাজ আর ইয়ান এগিয়ে আসে। দুজন দুই দিক থেকে রনি হায়দারকে ধরে তার র*ক্তাক্ত শরীরটা টেনে তুলে। তারপর ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে নিচে নামতে শুরু করে। আর সারহাদ তাদের সামনে নিচে নামতে থাকে।
পেন্টহাউসের নিচের ফ্লোরে তখন অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এসেছে। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে গুলির শব্দ, ধস্তাধস্তি আর চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, এখন সেখানে শুধু পড়ে আছে নিথর দেহ আর গুলির ধোঁয়ার গন্ধ। বাইরের গেটের সামনে এসে থেমে আছে একটা সিআইডির গাড়ি। গাড়ি থেকে ধীরে নামলেন এসিপি সিতারা আদিল। রাতের অন্ধকারে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল সে। তার মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঘুরছে। কিছুক্ষণ আগেই একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল। শুধু একটা কথাই বলা হয়েছিল তাকে,

-“পেন্টহাউসে আসুন… সত্যিটা পাবেন”
লোকটা নিজের নাম বলেনি আর না পরিচয়। প্রথমে সে আসতে চায় নি, কিন্তু কণ্ঠে এমন একটা অদ্ভুত নিশ্চয়তা ছিল, যেন সে জানে সে কি বলছে। সেই কণ্ঠের টানেই সিতারা এখানে এসেছে। সে বন্দুক হাতে সামনে কয়েক পা বাড়াতেই সারহাদের সেই নৃশংস খু*ন গুলো দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়। সিতারা এখানো মূর্তির ন্যায় বন্দুক তাক করে আছে কিন্তু সামনের মানব তার দিকে তাকিয়েই পর মুহূর্তে পরপর দুটো গুলি চালিয়ে দেয়। সিতারা এক বিন্দু পরিমাণ টললো না, সে ধীরে ধীরে পিছনে ঘুরে তাকায়। নজরে আসে তার পিছনে দৌড়ে আসছিল রনি হায়দারের দুজন লোক। কিন্তু এখন তারা মাটিতে পড়ে আছে। দুজনেরই কপালের মাঝখানে নিখুঁত গুলির দাগ। সিতারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, তারপর ধীরে সামনে তাকায়। দৃষ্টি স্থির হয় কালো জ্যাকেট, ঠান্ডা চোখ, ঠোঁটে মৃদু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারহাদ চৌধুরী। সিতারা অজান্তেই একটা ফাঁকা ঢোক গিলে ফেলে।

তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। ঠিক তখনই সারহাদের পিছন দিয়ে এগিয়ে আসে এজাজ আর ইয়ান।তাদের মাঝে আধমরা অবস্থায় ঝুলে আছে রনি হায়দার। তার সারা শরীর র*ক্তে ভেজা, মাথা নিচু হয়ে আছে। সিতারা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। তারপর গাড়ির দিকে চোখ ঘুরিয়ে ইশারা করে। গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে আবু আর দিহান। তারা দ্রুত এগিয়ে এসে রনি হায়দারকে নিয়ে যায়। ধীরে ধীরে তাকে গাড়িতে তুলে ফেলে। রনি হায়দারকে গাড়িতে তোলার সময়ও সে কাতর গলায় কাঁপছে। সবকিছু যেন খুব দ্রুত ঘটে গেল সে কিছু বুঝে উঠতেই পারেনি। সারহাদ চাইলেই এখানে রনি কে মারতে পারত কিন্তু সে চেয়েছিল তার বাবা যেমন অসম্মানিত হয়েছে তাকে সেভাবেই মারতে। সেজন্য একজন আইনের লোকের দরকার ছিল আর তাই সে সিতারাকে কল করে ডেকেছে।
এখন সামনে দাঁড়িয়ে আছে শুধু দুজন মানুষ, সিতারা আর সারহাদ। সারহাদ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে। সিতারা তার নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে চোখ রেখে বলে,

-“মিস্টার চৌধুরী…এইসব কাজ আইন করতে পারত। আইন ওদের অবশ্যই শাস্তি দি….”
তার বাক্যটুকু সম্পন্ন করার আগেই হঠাৎ সারহাদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। শীতল, তাচ্ছিল্যভরা, আর ভয়ংকর সেই হাসির দিকে সিতারা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারছে না এই হাসির মানে। কিছুক্ষণ পরে সারহাদ হাসি থামিয়ে তীব্র বিদ্রুপ করে বলে,
-“আইন? আপনার সেই আইন এই আঠারো বছর কোথায় ছিল?
আমি তো আঠারো বছর ওদের মারিনি। কই আপনার আইন তো ওদের ধরতে পারেনি”
হঠাৎ সে চিৎকার করে বলে,
–“আরে আজ পর্যন্ত এটাই প্রমাণ করতে পারেনি আমার বাবা আর দাদাকে খু*ন করা হয়েছিল, এক্সিডেন্ট হয়নি। আর আজ আপনি আমাকে বলছেন ‘আইনের উপর বিশ্বাস রাখতে?'”
সিতারা ঠান্ডা গলায় প্রত্যুত্তর করে,

-“আপনি কখনো আইনের কাছে সাহায্য চাননি। আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি নিজেই অস্বীকার করেছিলেন”
-“মিস আদিল ইউ নো, যেদিন আমার বাবা আর দাদাকে মে*রে ফেলা হয়েছিল, সেদিন আমার মা নিজের সন্তান, নিজের সম্মান, সবকিছু ছেড়ে প্রতিটা পুলিশ স্টেশনে দৌড়েছে। কিন্তু কেউ রিপোর্ট পর্যন্ত লিখতে রাজি হয়নি। যেই পুলিশ কাল পর্যন্ত আমার দাদার চামচামি করেছে, তারা ওই দিন তার নাম শুনে আমার মাকে ধাক্কা মেরে পুলিশ স্টেশন থেকে বের করে দিয়েছে, একেই বলে ক্ষমতা, এটাই আপনার আইনের ক্ষমতা। আর আপনি আমাকে বলছেন
“আইনের উপর ভরসা রাখতে?”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতায় কেটে যায়। বিপরীত পাশের রমণীর থেকে কোন জবাব আসে না। সে কি বলবে বুঝতেই পারছে না। সারহাদ হালকা হেসে ফের বলে,
-“সেদিন থেকেই আমার আইনের উপর বিশ্বাস উঠে গেছে। আমি তখন একটা জিনিস বুঝেছিলাম ‘এই পৃথিবীতে যার হাতে ক্ষমতা, আইনও তার হাতেই থাকে”
সিতারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তার চোখে দ্বন্দ্ব। সারহাদের প্রশ্ন গুলোর উত্তর তার কাছে নেই। সত্যিই তো কেন সেদিন বিচার হয়নি?
সেদিন না হোক আজ আঠারো বছর হয়ে গিয়েছে, আজ পর্যন্ত কেন হলো না। হয়তো সবাই তার বাপ দাদাকে ভুলে গিয়েছে। কিন্তু ঐ ছেলেটা কীভাবে ভুলবে যার সামনে তাদের খু*ন করা হয়েছিল। ঠিক তখন সারহাদ পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে লাইটার জ্বালিয়ে আ*গুন ধরায়। গভীর একটা টান দেয়। ধোঁয়া ধীরে বাতাসে ভেসে ওঠে। সিতারা আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে,

-“কেন নিজের ভেতরটা আরও জ্বালানোর চেষ্টা করছেন?”
সারহাদ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে আওড়ায়,
-“ভেতরটা তো অনেক আগেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, অফিসার। এখন আর আ*গুনে কি হবে?”
পরের মুহূর্তেই সে সিগারেটটা হাতে চেপে ধুমড়ে ফেলে। তারপর হঠাৎ বলে,
-“ভাইকে খুঁজে পেয়েছেন?”
কথাটা শুনে সিতারার চোখ বড় হয়ে যায়। তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে কিন্তু কোন শব্দ বের করতে পারছে না। সে ধীরে মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝায়। সারহাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।তারপর পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে মুখে চেপে ধরে আ*গুন ধরাতে ধরাতে বলে,

-“বেঁচে আছে”
সিতারার বুকটা কেঁপে ওঠে, অজান্তেই তার চোখের কোণ ভিজে ওঠে। এই একটা খবর শুনার জন্য এই ছয় বছর সে কী কী না করেছে। সারহাদ বাতাসে ধোঁয়া ছেড়ে ধীরে বলে,
-“জাওয়ান ম্যানশনের বেজমেন্টে। ভাইয়ের মতো একা যাওয়ার বোকামি করবেন না”
তারপর পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে এগিয়ে দেয়,
-“ওনার কাছে যেতে পারেন”
সিতারা কার্ডটা হাতে নিয়ে সে মাথা তুলে কিছু বলতে যাবে কিন্তু তখনই দেখে সারহাদ আর সেখানে নেই। সে ইতিমধ্যে সামনের গভীর অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। শুধু রাতের বাতাস হালকা নড়ছে। সিতারা ধীরে কার্ডটার দিকে তাকায়। অল্প আলোয় নামটা পড়ে,
-“জাইফেরা, দিলরুবা খানম”
কয়েক সেকেন্ড সে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।তারপর ধীরে একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে ভিতর থেকে। কমপক্ষে একটা জিনিস নিশ্চিত, তার ভাই এখনও বেঁচে আছে। অনেক দিন পর, তার ভেতরে একটু হলেও মানসিক শান্তি ফিরে আসে। এখন যেভাবেই হোক সে তার ভাইকে বের করে নিয়ে আসবে।

ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল জানালার পর্দার ফাঁক গলে প্রত্যুষের হালকা সোনালি আলো ঢুকে পড়েছে রুমের ভেতর। রাতের গভীরতা কেটে গিয়ে চারপাশে এক ধরনের শান্ত নীরবতা বিরাজ করছে। বাইরে বাগানের গাছে পাখিরা ডাকছে, বেলকনিতে থাকা গোলাপের সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। হালকা বাতাসে কক্ষের পর্দা একটু একটু নড়ছে। বিছানার উপর এখনও ঘুমিয়ে আছে আরজে। তার মুখে ঘুমের ক্লান্ত শান্তি, এমন মনে হচ্ছে বহুদিন পর সে শান্তিতে ঘুমিয়েছে। তার পাশেই আধশোয়া হয়ে বসে আছে সানা।

সে অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে গেছে। কিন্তু বিছানা ছেড়ে ওঠেনি। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরজের মুখের দিকে। যেন এই মুখটা সে নিজের চোখ দিয়ে গিলে ফেলতে চায়। যেন এই মানুষটাকে সে আবার হারিয়ে ফেলতে পারে এই ভয়টা এখনও তার ভেতরে কোথাও লুকিয়ে আছে। তবে তার এই শান্তির ঘুম রমণীর সহ্য হচ্ছে না, সারারাত তাকে জ্বালিয়ে এখন নিজে কী সুন্দর শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। একবার ভাবে, ঐদিনের মতো তার নাক চেপে ধরবে পর মুহূর্তে ভাবে, থাক একটু ঘুমাক। সানা ধীরে ধীরে হাত বাড়ায়। তার আঙুলগুলো খুব আস্তে করে ছুঁয়ে দেয় আরজের কপাল, তারপর ভ্রু, তারপর চোখের পাতা, তার স্পর্শ এত হালকা যে, যেন বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর রমণী যেন প্রতিটা স্পর্শ দিয়ে এই মুখটাকে নিজের মনে গেঁথে নিতে চাইছে। তার আঙুল ধীরে ধীরে নেমে আসে গালে, চোয়ালে, শেষে এসে থামে আরজের অ্যাডামস অ্যাপেলে। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ আরজে এক ঝটকায় সানার হাতটা ধরে ফেলে, একই সাথে চোখ খুলে ফেলে। রমণী এক মুহূর্তের জন্য একেবারে থতমত খেয়ে যায়। তারপর তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে ফেলে। এবং লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলে আরজের চওড়া বুকের মধ্যে। আরজে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে একটা দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। সে পুরুষালি হাস্কিস্বরে আওড়ায়,

-“মনে হয় ম্যাডামের রাতের বেলা…”
আরজে কথাটা শেষ করার আগেই সানা তাড়াতাড়ি হাত তুলে তার মুখ চেপে ধরে চোখ গরম করে বলে,
-“অসভ্য লোক, আর একটা কথা বললে আমি আপনার কানের নিচে এমন বাজাবো, তিনদিন বাজতেই থাকবে”
তার কথার বিপরীতে আরজে মজা পেয়ে হাসে। ধীরে তার হাতটা নিজের মুখ থেকে নামিয়ে দেয়। সানা এক পলক তার দিকে তাকিয়ে তারপর হঠাৎ মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে ছোট বাচ্চাদের মতো অভিমানী মুখ করে। তারপর গম্ভীর গলায় শুধালো,
-“আমি আপনার সাথে কথা বলবো না”
আরজে ভ্রু তোলে তাকায়, প্রথমত সে সানাকে এমন করতে কখনো দেখেনি, তার উপর বাচ্চাদের মতো মুখ ফুলানো তো কখনই না। তাকে আরও কাছে টেনে জিজ্ঞেস করে,

-“কেন?”
-“আপনি আমাকে এক মাস ধরে ইগনোর করেছেন, একদম কথা বলেননি। আমিও একমাস আপনার সাথে কথা বলবো না”
এই বলে সে আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়। আরজে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
-“তুমি যে আমাকে ছয় বছর একা ফেলে চলে গেলে, ওই সময়টার কি হবে?”
সানা তার জবাবে কিছুক্ষণ চুপ থেকে। তারপর ধীরে আবার আরজের দিকে ফিরে আসে। রমণী স্বামীর বক্ষস্থলে মাথা রেখে নরম গলায় বলে,

-“আমি শুধু আমার সন্তানের কথা ভেবেছিলাম”
-“তোমার কি মনে হয় আমি আমাদের সন্তানকে প্রটেক্ট করতে পারতাম না?”
-“আমি… বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সাইমা বলেছিল, থমাস আপনার খুব কাছের কেউ। তিনি বলেছিলেন সেটা জ্যাকও হতে পারে, কাইলিনও হতে পারে। তারপর ওই মার্কান সে তো আপনার একদম কাছের মানুষ। তার উপর আপনার মায়ের কথা…এই সব কথা এক মাস ধরে আমার মাথার ভেতর ঘুরছিল।আমি বুঝতেই পারছিলাম না কি করব। আমি শুধু একটা জিনিস জানতাম, আমাদের সন্তানকে বাঁচাতে হবে”
কিছুক্ষণ নীরবতা কাটিয়ে তারপর হঠাৎ আরজে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। এত শক্ত করে যেন আবার তাকে হারাতে চায় না। সানা নিচু গলায় আওড়ায়,

-“আচ্ছা, আর যাব না”
-“তুমি আর যেতেও পারবে না”
সানা তার এমন কথায় একটু মাথা তুলে তার দিকে তাকায়। তার চোখে দুষ্টু ঝিলিক। সে হেসে হেসে বলে,
-“আপনি কি আমাকে বন্দি করে রাখবেন?”
-“হ্যাঁ, একদম আজীবন কারাদণ্ড”
সানা হেসে ফেলে। তারপর আবার মাথা রেখে দেয় তার বুকে। যদি রমণী আরেক বার চোখ তুলে তাকাতে তাহলেই বুঝতে পারতো আরজের চোখের সেই অন্ধকার আ*গুন। সানা কথাটাকে হেসে উড়িয়ে দিলেও আরজে একদম সিরিয়াস ভাবে কথাটা বলেছে।
সকালের সেই নরম আলোয় কিছুক্ষণ পাশাপাশি শুয়ে থাকার পর আরজে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসে। আজ তার গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে ‘জাইফেরার’ সাথে। সে একটু স্ট্রেচ করে, তারপর বিছানা থেকে নেমে শাওয়ারের দিকে হাঁটতে যায়।
ঠিক তখনই পিছন থেকে সানার বিরক্ত গলা শোনা যায়,
-“বুঝি না বাপু, ছেলেদের শাওয়ার নিতে এক ঘন্টা কেন লাগে?”
আরজে দরজার সামনে গিয়ে থেমে যায়। ধীরে ধীরে আবার ঘুরে দাঁড়ায়। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসি। সে ভ্রু তুলে বলে,

-“আজকে এক ঘন্টা না, দুই ঘন্টা লাগবে”
-“কিহহ!! ও আচ্ছা তো এটা বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকবে। তাহলে তো আপনি বুড়ো হতে হতে চব্বিশ ঘন্টাই ওয়াশরুমে বসে থাকবেন'”
আরজে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে গভীর ভাবে শুনছে রমণীর কথা। সানা থামে না, তার গায়ে আরজের শার্ট জড়ানো। সে বালিশটা কোলে তুলে বলে,
-“আমি বরং এক কাজ করি, আপনার কাঁথা বালিশ সব ওখানেই দিয়ে দিই। আপনি ওয়াশরুমেই থাকেন’
আরজে হালকা হেসে ধীরে ধীরে তার দিকে হাঁটতে শুরু করে। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে আওড়ায়,
-“উহু…সুইটহার্ট, আজ একসাথে শাওয়ার নেব, তাই দুই ঘন্টা লাগবে’
কথাটা শুনে সানার চোখ প্রায় কপালে উঠে যায়। সে এক লাফে বিছানা থেকে সরে যায়। দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে বলে,

-“কিহ!!না না না, অসম্ভব ব্যাপার স্যাপার। আপনি দশ ঘন্টা বসে থাকুন ওয়াশরুমে, আমি লাইফেও আর কিছু বলব না, তওবা তওবা”
বিপরীতে আরজে থামে না, সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। তার চোখে এক ধরনের দুষ্টু ঝিলিক। সানা তাকে এগোতে দেখে পিছিয়ে যেতে থাকে। আরজে মৃদু গলায় বলে,
-“তুমি আবার টাইম আউট হয়ে গিয়েছো, ওয়াইফি। ইটস শাওয়ার টাইম বেইবি, কাম”
সানা তার দিকে তাকিয়ে একটা বালিশ তুলে ছুড়ে মারে,
-“গুলি মারুক আপনার শাওয়ারে”
বালিশটা এসে আরজের বুকের সাথে লাগে। আরজে সেটা ধরে ফেলে। সানা এবার সত্যিই একটু নার্ভাস হয়ে যায়। সে আবার পিছিয়ে যেতে যেতে বলে,

-“দেখুন…আপনি ভদ্রভাবে বাথরুমে যান।আমি এখানে শান্তিতে বসে থাকব”
আরজে কিছু না বলে এবার হঠাৎ সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক মুহূর্তে সানাকে ধরে ফেলে। রমণী চিৎকার করে ওঠে,
-“রানভীরররর….”
কিন্তু আরজে ইতিমধ্যেই তাকে এক টানে কোলে তুলে নিয়েছে। সানা অবাক হয়ে তার কাঁধে ধাক্কা দেয়,
-“ছাড়ুন আমাকে”
আরজে হাসতে হাসতে বাথরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
-“আজকে ছাড়া নেই”
সানা তার কাঁধে হাত-পা ছুঁড়ে মারতে থাকে। রমণী হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে তার কাঁধে জোরে কামড় বসিয়ে দেয়। আরজে নির্বিকার চিত্তে সামনে এগিয়ে যায়। সানা মাথা তুলে খেঁকিয়ে উঠে,
-“কু*ত্তা, বদলোক, অসভ্য….”
-“হ্যাঁ…সব তোমারই”
তারপর এক ঝটকায় বাথরুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে দুই কপোত-কপোতী, আর দরজাটা ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।

সকালের ব্রেকফাস্ট শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই সানা চুপচাপ চলে এসেছে আরভির রুমে। ব্ল্যাক ম্যানশনের এই রুমটা অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। দেয়ালে কার্টুনের ছবি, খেলনার তাক, বড় একটা রেসিং কারের বিছানা, সব মিলিয়ে পুরো রুমে একটা শিশুসুলভ প্রাণচাঞ্চল্য। আরভি মেঝেতে বসে রিমোট দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। সানা এসে বিছানার ধারে বসে তাকে কাছে টেনে নেয়।
তারপর খুব যত্ন করে ছেলের চুলে হাত বুলিয়ে বলে,
-“লিসেন ভীর”
-“হুম মম?”
-“আজকে থেকে তুমি ড্যাডকে বলবে, মম শুধু তোমার”
আরভি একটু অবাক হয়ে বলে,
-“ড্যাডের না?”
-“না…ড্যাড অনেক বড় হয়ে গেছে, তাকে আর মমের দরকার নেই”
আরভি চিন্তিত মুখে বলে,
-“কিন্তু ড্যাড তো বলে, মম শুধু মাত্র তার”
-“কবে বলেছে”
-“প্রথম দিনই বলে দিয়েছে”

বাক্যখানা শ্রবণ হতেই সানা মনে মনে দন্ত খিঁচিয়ে গালি দেয়, “কু*ত্তা কেমন নির্লজ্জ, ছেলেকে এই সব বলে” রমণী তড়িঘড়ি করে মুখে বলে,
-“না না, ওটা ভুল। মম শুধুমাত্র ভীরের”
সে ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে বলে,
-“আজকে থেকে মম তোমার রুমেই থাকবে।ড্যাডের রুমে যাবে না”
আরভির চোখ চকচক করে ওঠে আনন্দে,
-“সত্যি?”
-“হ্যাঁ, তুমি ড্যাডকে বলবে,
‘লিসেন ড্যাড, মম ইজ অনলি মাইন”
–“ওকে”
এদিকে রমণীর মনে মনে চলছে অন্য কথা, অসভ্য লোক, আজকে এমন একটা শিক্ষা দেব, সারাজীবনে মনে রাখবে। সে মুচকি হেসে আবার ছেলেকে উস্কে দেয়,

-“আর বলবে, মম আজকে থেকে আমার রুমেই থাকবে”
আরভি গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। ঠিক তখন দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে আরজে। সে এক ঝলক তাকিয়ে দেখে, মা ছেলে দুজন একসাথে বসে আছে। তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু কিছু না বলে সে আড়চোখে তাকিয়ে সোজা আয়নার সামনে গিয়ে টাই ঠিক করতে থাকে। আরজে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, তার ওয়াইফি তার উপর রেগে এখানে এসেছে।
এদিকে আরভি মায়ের শেখানো কথা মনে করে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে বুক ফুলিয়ে বলে,
-“লিসেন ড্যাড”
আরজে ভ্রু তুলে নিচে তাকায়,
-“হুম?”
আরভি গম্ভীর গলায় শুধায়,

-“মম শুধুমাত্র আমার। কালকে থেকে মম আমার সাথেই থাকবে। ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?”
আরজে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে,
-“নো, মাই বয়, ইটস নট পসিবল। আমার বউ আমার সাথেই থাকবে। এই বিষয়ে কারো মতামত গ্রহণযোগ্য না। ছেলে হলেও না”
আরভি সাথে সাথে দুই হাত কোমরে রেখে শক্ত কণ্ঠে বলে,
-“নো ড্যাড, মাই মম ইজ অনলি মাইন”
-“লিসেন মিস্টার জুনিয়র, তোমার মম পরে হয়েছে, কিন্তু তার আগে সে আমার বউ। আর আমার বউ শুধুমাত্র আমার”
ছোট আরভি রেগে যায়,

-“নো, মম মাই”
-“ওয়াইফি মাইন”
-“মম আমার রুমে থাকবে”
-“ইম্পসিবল”
এদিকে তাদের তর্ক শুনে সানা দূরে দাঁড়িয়ে লিপস্টিকের কালার মিলিয়ে দেখছে। তার মুখে গোপন আনন্দের হাসি। অবশেষে দুজনেই একসাথে তার দিকে তাকায়। আরভি সেখান থেকে বলে,
-“মম তুমি বলো, তুমি কার?”
আরজেও ঘুরে দাঁড়ায়, ঠোঁটে দুষ্ট হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-“হ্যাঁ ওয়াইফি, বলো তুমি শুধু রানভীরের”
সানা ধীরে আয়না থেকে মুখ ঘুরিয়ে বিরক্ত সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাদের দুজনের উপর। সে হাত নেড়ে বলে,
-“না আমি ছেলের, না আমি বাপের, আমি শুধু আমার, সানা খানের আর কারোরপতির”
তারপর গানের সুরে টেনে টেনে বলে,
-“আমি যে কে কারোরপতিরররর……”
সে হাঁটতে হাঁটতে দরজার দিকে যায়,
-“যাই… গিয়ে একটু কালনাগিনী আর বিট্কেলকে লুটে আসি”
ঠিক তখনই আরভি তাকে শুধরে বলে,

-“মম…ওটা তো ‘আমি যে কে তোমার হবে’
সানা পা থামিয়ে ধীরে পিছনে ঘুরে তাকায়। বিরক্তি মাখা কণ্ঠে বলে ওঠে,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ জানি, জানি, সবাই শুধু ডিগ্রি নিয়ে বসে থাকে আমার ভুল ধরার জন্য”
সে দরজার দিকে যেতে গিয়েও আবার ফিরে এসে ধপ করে খাটে বসে পড়ে। তার এই কাণ্ড দেখে আরজে ঠোঁট কামড়ে হেসে নিজের টাই ঠিক করে। তারপর ছেলেকে কোলে তুলে সানার সামনে আসে। ছেলের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলে,
-“রিশ, বি আ গুড বয়। আমার বউকে একদম বিরক্ত করবে না”
আরভি সাথে সাথে কোল থেকে নেমে খাটে দাঁড়ায়। তারপর বাবার দিকে আঙুল তুলে বলে,
-“আমি আমার মমকে বিরক্ত করব, তোমার বউকে না”

সে দৌড়ে গিয়ে সানাকে জড়িয়ে ধরে। রমণী হাসতে হাসতে তাকে বুকে টেনে নেয়। আরজে কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখে অদ্ভুত একটা সন্তুষ্টির ছায়া। সে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে মা আর ছেলের দিকে। তার মনে হচ্ছে, এই দৃশ্যটাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। এই হাসি, এই ছোট্ট ঝগড়া, এই ঘরভর্তি উষ্ণতা, এটাই তো সে চেয়েছিল। রক্ত, প্রতিশোধ, ক্ষমতার খেলায় ভরা জীবনের বাইরে এই ছোট্ট পরিবারটাই তার আসল জয়। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে। সে ধীরে এগিয়ে এসে সানার কপালে একটা চুমু খায়। তারপর হঠাৎ ছেলের চোখ দুই হাত দিয়ে ঢেকে দেয়। আর পরের মুহূর্তেই সানার ঠোঁটে দ্রুত একটা চুমু খেয়ে ফেলে। সানা অবাক হয়ে কিছু বলার আগেই আরজে দরজার দিকে হাঁটতে থাকে। সানা ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে। তারপর হঠাৎ তাকে কাতুকুতু দিতে শুরু করে। আরভি হাসতে হাসতে চিৎকার করে ওঠে,
-“মম, নো….”
রুমটা আবার হাসির শব্দে ভরে ওঠে।

আরজে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই পুরো ব্ল্যাক ম্যানশন আবার শান্ত হয়ে আসে। রুমের ভেতরে তখন শুধু সানা আর ছোট আরভি। আরভি বিছানার উপর বসে মোবাইলে গেমস খেলছে। আর সানা অল্প বিরক্ত মুখে ফোন স্ক্রল করতে করতে বসে আছে। আরও কিয়ৎকাল পর হঠাৎ একসাথে কয়েকটা গুলির শব্দ বাইরে থেকে কানে আসে রমণীর। সানার ভ্রু কুঁচকে যায়। সে মাথা তুলে তাকায়। আরভিও থেমে যায়,
-“মম… এটা কি?”
সানা কোন উত্তর না দিয়ে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার বুকের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি জন্মাচ্ছে। সে দ্রুত জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে পর্দাটা একটু ফাঁক করে নিচের দিকে তাকাতেই তার চোখ বড় বড় হয়ে যায় নিচের দৃশ্য দেখে।

ব্ল্যাক ম্যানশনের সামনে একটার পর একটা এসে থামছে সাদা রঙের ভারী এসইউভি, গাড়িগুলোর গায়ে কালো চিহ্ন। প্রতিটা গাড়ি থেকে নেমে আসছে ভারী বডি আর্মার পরা মানুষ, যাদের মাথায় কালো হেলমেট, মুখে অর্ধেক ঢাকা মাস্ক, হাতে অত্যাধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল। সানার বুক কেঁপে ওঠে। সে তাদের ভালো মতো চিনতে পেরেছে, এদের ব্যাপারে ডক্টর সাইয়েদা তাকে সতর্ক করেছে। এরাসোফিয়া জাওয়ানের কুখ্যাত ব্যক্তিগত বাহিনী, আলফা টিম। যাদের নাম শুনলেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই টিমের সদস্যরা মানুষ না, নরপশু। এরা কখনও খোলা আকাশের নিচে আসে না। সবসময় থাকে জাওয়ান ম্যানশনের বেজমেন্টে। আজ পর্যন্ত কেউ তাদের বাইরে দেখেনি। কিন্তু আজ তারা পুরো বাহিনী নিয়ে এসেছে ব্ল্যাক ম্যানশনে। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে শুরু হয়ে যায় ধ্বংসযজ্ঞ।মেশিনগানের অবিরাম শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। আলফা টিমের হাতে অ্যাসল্ট রাইফেল, পিস্তল, ভারী এলএমজি মেশিনগান। আর শরীরজুড়ে ট্যাকটিক্যাল আর্মার।

তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্ল্যাক ম্যানশনের গার্ডদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। আরজের গার্ডরা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যেন ঝড় নেমে এসেছে। উপর থেকে হঠাৎ একটা প্রচণ্ড শব্দ শোনা যায়। সানা মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকায় নজরে আসে দুইটা ব্ল্যাক কমব্যাট হেলিকপ্টার ব্ল্যাক ম্যানশনের মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে। তাদের দরজায় বসে আছে দুজন করে শুটার। তাদের হাতে ভারী মিনিগান। পরের মুহূর্তেই মিনিগানের গুলি নিচে ঝড়ের মতো নেমে আসে। ব্ল্যাক ম্যানশনের গার্ডরা একে একে পড়ে যেতে থাকে। চারদিকে চিৎকার, রক্ত, ভাঙা দেয়াল, ধোঁয়া। কয়েকজন গার্ড পাল্টা গুলি চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু উপর থেকে আর সামনে থেকে একসাথে হামলার কারণে তারা ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারে না। মুহূর্তের মধ্যে ম্যানশনের সামনে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো অবস্থা।

সানা জানলার আড়াল থেকে সব দেখছে।তার বুকের ভেতর ধকধক করছে। এই মুহূর্তে আরজে, জ্যাক বা কাইলিন কেউই নেই। আর সানা জানে মিসেস দিলরুবা খানমের সাথে সে আন্ডারগ্রাউন্ডের মিটিংয়ে গেছে।
তার ভাবনার মধ্যেই সব সাদা এসইউভির মাঝখানে এসে থামে একটা বিলাসবহুল কালো রোলস রয়েলস। গাড়িটা ধীরে ব্ল্যাক ম্যানশনের সামনে এসে থামে। চারপাশে সাথে সাথে আলফা টিমের সদস্যরা প্রতিরক্ষামূলক বৃত্ত তৈরি করে দাঁড়ায়। দুইজন লোক সামনে এগিয়ে আসে, আব্বাস আর জিহাদ। আব্বাস গাড়ির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। জিহাদ চারপাশে একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হয় সব ঠিক আছে। তারপর আব্বাস ধীরে গাড়ির দরজা খুলে দেয়। ভেতর থেকে ধীরে নেমে আসে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৩

“সোফিয়া জাওয়ান”
কালো লম্বা কোট পরা, চোখে ঠান্ডা, ধারালো দৃষ্টি। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আলফা টিমের সদস্যরা মুহূর্তে আরও সতর্ক হয়ে যায়।সোফিয়া ধীরে মাথা তুলে ব্ল্যাক ম্যানশনের দিকে তাকায়। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে এক ঠান্ডা, বিপজ্জনক হাসি। সে জিহাদের দিকে তাকাতেই সে বলে,
-“লেডি, আরজে স্যার নেই আর না জ্যাক। পুরো ম্যানশন ফাঁকা”
সোফিয়া ঠোঁটে সন্তুষ্টির হাসি খেলে গেল। সে ধীরে ধীরে পা বাড়ায় ম্যানশনের ভিতরের দিকে উদ্দেশ্য,
“আরভি”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৫