Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০
সাবা খান

রাতের শেষ প্রহর যখন অন্ধকারের গাঢ় কালিমা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে, আর নিস্তব্ধতার বুক চিরে দূরে কোথাও ভোরের প্রথম নিশ্বাস শোনা যায়। আকাশে তখনও অন্ধকারের চাদর টানানো, কিন্তু তার ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা কৃষ্ণতা নীরবে সরে যেতে শুরু করেছে। এই শেষভাগের রাত যেন সব গোপন কান্না, চাপা আর্তনাদ আর অদৃশ্য অপেক্ষার সাক্ষী হয়ে আছে। চারপাশে এমন এক নিঃশব্দতা বিরাজ করছে যেখানে মানুষের হৃদস্পন্দনের শব্দও যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। মনে হয়, পৃথিবী কোনো এক অজানা ঘটনার পূর্বাভাসে স্থির হয়ে আছে সবকিছু।
কিন্তু এই স্থিরতা অনেক টা ম্লান হয়ে এসেছে শহরের দিকে। গুলশানের সেই বিলাসবহুল এলাকা যেখানে রাতও যেন একটু বেশি পরিপাটি, একটু বেশি নীরব। উঁচু উঁচু কাঁচের বিল্ডিংগুলো দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দ প্রহরীর মতো। এরিমধ্যে ‘গ্রীনলাইট’ সোসাইটির প্রতিটা ফ্ল্যাট গভীর ঘুমে ডুবে আছেে। শুধু মাত্র একটা ফ্ল্যাট ছাড়া যেখানে রাতের আলো এখনো জ্বলছে। ভেতরে সারা রাত জাগা আয়ান হাঁটছে। একই রুমের ভেতর অবিচল পায়চারী করছে এদিক থেকে ওদিক আবার ওদিক থেকে এদিকে। তার কোলে থাকা ছোট্ট কিয়ারা তার কাঁধে মাথা রেখে অনবরত মেয়েটা কেঁদেই চলছে।

অতিরিক্ত কান্নার তোপে তার ছোট্ট গোলগাল মিষ্টি মুখখানি লাল হয়ে গেছে, চোখে জল জমে আছে। কিন্তু কোন থামার নাম নেই বরঞ্চ আরও বেশি করে হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদছে। আয়ান নিজেও ক্লান্ত ভীষণ। কালকের সন্ধ্যা থেকে তার চোখে ঘুম নেই, শরীর ভেঙে পড়েছে তবুও সন্তানের জন্য একপলকও থামছে না। সে আলতো করে কিয়ারার পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনার জন্য নরম কণ্ঠে আওড়ায়,
–“শশ… কিউটিফাই… শশ…পাপা আছে তো। কিছু হয়নি, সব ঠিক হয়ে যাবে”
সে একটু দোলানোর মতো করে ফের আওড়ায়,
–“পেটটা আবার ব্যাথা করছে, তাই না?
একটু পর ঠিক হয়ে যাবে প্রমিজ…”
তার এমন স্নেহমাখা কণ্ঠের বিপরীতে কিয়ারা কি থামছে? না বরঞ্চ কাঁদতে কাঁদতেই ফিসফিস করে পাপার কানে,
–“আমি মাম্মামের কাছে যাবো.. পাপা মাম্মামের কাছে….”
এই একটাই কথা কখন থেকে সে বারবার পুনরাবৃত্তি করছে আর কাঁদছে। আয়ানের বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে ওঠে। সে একটু থেমে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তারপর মৃদু হেসে শুধালো,

–“যাবো… যাবো, একটু সকাল হোক। আমরা একসাথে যাবো, ঠিক আছে?”
কিয়ারা কানেও তুললো না তার বাক্যটুকু, সে মাথা নাড়িয়ে কাঁদতে থাকে,
–“না… এখনই যাবো। আমি এখনই মাম্মামের কাছে যাবো”
তার ছোট্ট হাত দিয়ে আয়ানের শার্ট চেপে ধরে হেচকি কাঁদতে থাকে। আয়ান অসহায় চোখে ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে তাকিয়ে থাকে মেয়ের দিকে। সে নিজেও বুঝতে পারছে না কীভাবে থামাবে ওকে। কিয়ারার এই সমস্যা টা ছোটবেলা থেকেই। ছোট থেকে তার যখনি এমন পেটে ব্যাথা হতো তখন সারা রাত-ই সে একাধারে কেঁদেই যেত। কেউ তাকে থামাতে পারত না। শুধু কয়েক বার আরজে তাকে থামাতে পেরেছে তাও বহু কসরতে। এখন এত রাতে সে কীভাবে আরজে কে কল করবে তাও বুঝতে পারছে না। আর এত রাতে কীভাবে রিয়ানার কাছে নিয়ে যাবে?
আয়ান কিয়ারার পিঠে স্নেহের চাপড় মেরে ফের আওড়ায়,
–“এখন তো রাত সোনা, মাম্মা তো ঘুমাচ্ছে। সকাল হলে আমরা যাবো… প্রমিজ। পাপা তোমাকে নিয়ে যাবে”
কিন্তু বিপরীতে কিয়ারা শুনছে না আর না তার কান্না থামছে। এদিকে রুমের অন্য পাশের সোফায় বসে আছে কিয়ান। তার চোখ আধো বন্ধ আধো খোলা, ঘুমে ঢুলছে। তবুও সে বারবার মাথা তুলে বোনের দিকে তাকাচ্ছে। নিজের আদর মাখা কণ্ঠে শুধালো,

–“কিয়া… কাঁদিস না…মাম্মা আসবে। আমরা যাবো মাম্মার কাছে”
সে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও আবারও ঘুমের তোপে বসে পড়ে। একটা হামি তুলে আয়ানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে,
–“পাপা, ওকে পানি দিবো?”
আয়ান তাকিয়ে বলে,
–“না বেটা, দরকার নেই। তুমি ঘুমাতে যাও। তোমার ঘুম পাচ্ছে”
–“না… আমি থাকবো, কিয়া একা থাকবে কেন?”
আয়ান তার প্রত্যুত্তর শুনে ফোঁস করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। আয়ান নিজেও খুব ভালো করে জানে কিয়ান যে তার বোন কে ছেড়ে কোথাও যাবে না। কিয়ারার এমন হলে কিয়ান প্রয়োজনে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে পড়ে যাবে তবুও বোনের পাশ থেকে নড়বে না। সে উঠে এসে আয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে তার ছোট্ট হাত দিয়ে কিয়ারার মাথায় হাত রেখে নরম কণ্ঠে বুলি আওড়ায়,
–“কিয়া… শোন, আমি আছি, পাপা আছে, কাঁদিস না”
কিয়ানের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে তবুও সে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ান একবার তাকিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে আবারও কিয়ানকে বলে,

–“কিয়ান বেবি প্লিজ, তুমি গিয়ে একটু শুয়ে পড়ো। আমি আছি তো..”
কিন্তু কিয়ান তো ভীষণ জেদী ছেলে ঠিক তার মামার মতো। সে একবার যেটা বলবে সেটাই হবে। আর কারো কথা গ্রাহ্যই করবে না। তাই রুক্ষ স্বরে আওড়ায়,
–“না…আমি যাবো না। কিয়া ঘুমালেই আমি ঘুমাবো”
আয়ানের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে কিন্তু চোখে ক্লান্তির ছাপ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। সে দুই সন্তানকে একসাথে বুকের কাছে টেনে নিয়ে যায়।
রাত এভাবেই কেটে যায় ধীরে ধীরে। কিয়ারা কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে আসে তার কান্না গুলোও ক্ষীণ হয়ে আসে তবুও থামছে না। কিয়ানের চোখ একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে সোফাতেই হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আর জানালার বাইরে রাতের আঁধার কাটিয়ে ধীরে ধীরে আলো ফোটে। আকাশের গাঢ় নীল ভেঙে হালকা রঙ ছড়িয়ে পড়েছে। পাখিরাও ডাকতে শুরু করেছে।
আয়ান নিজের পা থামিয়ে একপলক জানালার দিকে তাকায়। কাঁচের জানালা বেদ করে প্রত্যুষের আলোক রশ্মি আয়ানের চোখে মুখে আঁচড়ে পড়ে। সে চোখ নামিয়ে নিচে তাকায় দুই সন্তানের দিকে। কিয়ারা আধো ঘুমে নিঃশ্বাস নিচ্ছে আার কিয়ান সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। তাদের একটু ঘুমাতে দেখে আয়ান মনে মনে ভাবে হয়তো আজ রিয়ানার কাছে যাবে না কিন্তু তার ভাবতে দেরি কোলে থাকা কিয়ারার নড়েচড়ে ওঠতে দেরি হয়নি। সে দুই হাতে নিজের চোখ ঢলে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,

–“পাপা, চলো না মাম্মামের কাছে যাই”
আয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর ধীরে বলে,
–“চলো, তোমাদের নিয়ে যাবো মাম্মার কাছে”
আয়ান খুব যত্ন করে কিয়ানকে জাগায়,
–“বেটা… উঠো, আমরা যাচ্ছি”
কিয়ান সাথে সাথে আধো আধো চোখ মেলে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে,
–“মাম্মার কাছে?”
–“হ্যাঁ, মাম্মার কাছে”
কিয়ারা আধো ঘুমেই ফিসফিস করে,
–“মাম্মা”
আয়ান তাকেও কোলে তুলে দুজনকেই বুকে জড়িয়ে নেয়। তারপর তিনজন মিলে এই সাতসকালে বেড়িয়ে পড়ে রিয়ানার সাথে দেখা করতে।

ভোরের শুরুটা যেন এক নিঃশব্দ কবিতার মতো হাজার টা রঙবেরঙের পঙতি নিয়ে হাজির হয়েছে। এই যেমন, চারদিকে হালকা কুয়াশার চাদর, মাটির গায়ে জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো প্রথম সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে। ঘাসের ডগায় ছোট ছোট জলকণা যেন কেউ রাতভর আকাশের চোখের জল ছড়িয়ে রেখে গেছে। দূরে কোথাও পাখিদের কিচিরমিচির, কেউ ডেকে উঠছে, কেউবা ডানা ঝাপটাচ্ছে, আবার কেউ যেন নতুন দিনের খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এই শান্ত, স্থির, প্রায় নিঃসঙ্গ সকালের বুক চিরে ধীরে ধীরে এসে থামে একটা মার্সিডিজ। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশের নীরবতা যেন আবার ফিরে আসে। ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে প্রথমে নামে এজাজ। সে চারদিকে একবার সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে তারপর পেছনের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজাটা খুলতেই ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামে সারহাদ চৌধুরী। সে নেমেই নিজের কোর্টটা ঠিক করে নিয়ে চারপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। নজরে আসে সামনের বিস্তৃত সমভূমি, এই বিশাল, শুনশান জায়গাটা যেন কিছু লুকিয়ে রেখেছে। তার নির্ভীক কৃষ্ণ কালো অনুভূতিহীন আঁখি জোড়া ফিরিয়ে সামনের দিকে কদম বাড়ায়।

কিয়ৎকাল পরেই তার পিছন থেকে আরেকটা গাড়ির শব্দ আসে। আরেকটা কালো জিপ গাড়ি এসে থামে সারহাদের গাড়ির পাশে। সেখান থেকে নামে এসপি। তাট চোখে সেই চিরচেনা তীক্ষ্ণতা আর ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি। তার পিছনেই হুরমুরিয়ে নামেন খুশদিল ফারুকী। তিনি নেমেই আগে খোলা হাওয়াতে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেন। আর একটু হলেই তার নিঃশ্বাস আটকে আসার যোগাড় হতো। কেননা এসপি গাড়ি না, উনার মতে প্লেন চালিয়েছে। নাহয় এত স্পিডে কেউ আরো গাড়ি চালায় নাকি? নাহ ওনার তো জানা নেই। এই মুহূর্তে নিজেকেই নিজের গালি দিতে ইচ্ছা করছে। কেন যে এই ছেলের গাড়তে উঠতে গেছে কে জানে?
খুশদিল ফারুকী ভেবেছিলেন এসপির সাথে আসবে আর তার সাথে সানিতার ব্যাপারে কথা বলবে। যাতে সানিতাকে একমাসের জন্য তিনি নিজের কাছে রাখতে পারেন। তিনি শুধু এই বাক্যটা বের করতে দেরি হয়েছে কিন্তু এসপির গাড়ি টান দিতে দেরি হয়নি। সেই একটানে এখানে এসে থেমেছে। তিনি নিজেকে সামলে একবার সামনে তাকায় মুহুর্তে দুজনের চোখ একসাথে পড়ে একে অপরের উপর। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা কাটিয়ে এসপি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

–“ওহো শ্বশুর জি, দেখলেন তো কত সকাল করে নিয়ে আসলাম আপনাকে। একটা ধন্যবাদ আমিও ডিজার্ভ করি, কী বলেন?”
খুশদিল ফারুকী ফের নিজের চিরাচরিত রূপে ফিরে আসেন। তিনি রাগটাকে গিলে ভ্রু তুলে তাকিয়ে তার মতো করেই জবাব দেয়,
–“তোমার মতো অলস জামাই হলে তো সকাল দেখাই পাপ হয়ে যেত”
এসপি হালকা হেসে একচোট টিপ দিয়ে বলে,
–“উহু, শ্বশুর জি, আপনার জামাই অলস না, আপনার জামাই সিলেক্টিভলি অ্যাকটিভ। মানে যেখানে দরকার, সেখানেই একশন। যেমন এখন আমার আপনার মেয়ের কাছে….”
খুশদিল ফারুকী এসপির কথা বুঝে তাকে আর বাকিটা বলতে না দিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলে,
–“হ্যাঁ, সেটা তো দেখেছি, বিয়ের সময়ও খুব ‘অ্যাকটিভ’ ছিলে, না?”
–“কি করবো বলেন, আপনার মেয়ে নিজেই তো আমাকে বেছে নিয়েছে। আমি আপনার মানে আমার কান ছুঁয়ে বলছি, আমি কিছুই করিনি”
খুশদিল চোখ মুখ কুঁচকে প্রত্যুত্তর করে,

–“এই ‘কিছু করিনি’ কথাটার জন্যই তোমাকে এখনো সহ্য করছি। না হলে…”
এসপি ওনার কথায় ফোঁড়ন কেটে বলে,
–“নাহলে কি করতেন শ্বশুর জি?
আমাকে বদলি করে নতুন জামাই আনতেন?
–“অবশ্যই চেষ্টা করতাম। কিন্তু আমার পুরো জীবনে তোমার মতো বেয়াদব আর দুটো পাইনি”
বিপরীতে এসপি ওনার খোঁচা মারা কথা বুঝেও হেসে আওড়ায়,
–“শ্বশুর জি এটা কিন্তু আমি কমপ্লিমেন্ট হিসেবে নিচ্ছি। কারণ জানেন-ই তো ইউনিক জিনিসের দাম বেশি হয়”
খুশদিল ফারুকী এসপির দিকে এক পলক বিরক্তিসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুখ বাঁকিয়ে আওড়ালেন,
–“তুমি আমার মেয়ের একদম যোগ্য না”
তার বলা বাক্যটা শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই এসপির চিরাচরিত মুখের ভাবটা বদলে গেল। সে নিজেও নাক-মুখ কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা তিক্ত হাসি দিয়ে ভাবে,
যদি আমি যোগ্য না-ই হতাম, তাহলে ছয় বছর মেয়েকে আমার কাছে রেখে দিলেন কেন? আর এমনভাবে বলছে, যেন আমি যোগ্য হলেও দয়া করে মেয়ে দিয়ে দিতেন। শা*লা… কত কষ্ট করে বিয়েটা করতে হয়েছে একবার। এখন আবার রোজ রোজ যোগ্যতা নিয়ে লেকচার ছাড়ে।
মনের কথাখানি মনেই রেখে এসপি ঠোঁটের কোণে একটা চওড়া ব্যঙ্গাত্মক হাসি টেনে নিজের স্বভাবসুলভ নির্লজ্জ ভঙ্গিতে বলে উঠল,

–“আচ্ছা মানে, শ্বশুরজি আপনি জীবনে এত যোগ্যতা নিয়ে কী করেছেন? সেই তো সারা জীবনে একটা মেয়েই পয়দা করলেন। আমি আবার ভেবেছিলাম, একটা শালী-টালী থাকলে অর্ধেক ঘরওয়ালী করে নিয়ে আসবো। কিন্তু তা আর হলো কই?”
সে একটুও থেমে আরো একটু সামনে এগিয়ে এসে ইচ্ছে করেই আগুনে ঘি ঢেলে বাক্য ছুঁড়ে,
–“আর আমাকে দেখেন… এই অযোগ্যতা নিয়েই মাত্র ছয় বছরে আপনার সমান হয়ে গেলাম। দোয়া করবেন, সামনের বছরই যেন ডজনখানেক নাতি-নাতনি আপনার কোলে হিসু-পটি করতে পারে। শ্বশুর জি জোরে বলুন
আমিনননন”
এসপির বলা বাক্যগুলো বিপরীতে পৌঁছাতেই চারপাশের পরিবেশ এক মুহূর্তে জমে গেল। খুশদিল ফারুকীর চোখের মণি সহ কেঁপে উঠেছে তীব্র অপমানের তোপে। এই হাঁটুর বয়সী ছেলল ওনাকে ওনার সারাজীবনের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করছে। তার ইচ্ছে করছে এই ছেলেটার গালে চপাৎ করে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। শুধু থাপ্পড় না তার ঠোঁটের এই নির্লজ্জ হাসিটাকেই মুছে দেয় চিরতরে। কিন্তু সমাজ, অবস্থান, সম্পর্ক এই তিনটা অদৃশ্য শিকল তাকে আটকে রাখল। তিনি বহু কসরতে নিজের অদম্য রাগটাকে চেপে রেখে দন্তপাটি পিষে বলেন

–“তোমার মতো অসভ্য ছেলেকে আমি দেখে নেব”
এসপি তার কথার অন্তর্নিহিত হুমকি বুঝেও
আরেকটু উসকে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারল না। সে ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি লুকিয়ে রেখে, একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
–“ছি ছি ছি, শ্বশুরজি। এই বুড়ো বয়সে কী অবনতি হলো আপনার। দেখলে তো আপনার মেয়ে দেখবে… আপনি কেন দেখবেন?’
এইবার যেন খুশদিল ফারুকীর ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম। তার রাগের পারদ চরম সীমায় উঠে গেল। কিন্তু খুশদিল ফারুকী খুব ভালো মতে জানে, এই ছেলেটার সাথে কথা বাড়ানো মানেই নিজের মর্যাদা কমানো। “কথায় কথা বাড়ে”
এই প্রবাদটা তিনি জীবনে বহুবার সত্যি হতে দেখেছেন। তাই তিনি আর একটি শব্দও খরচ করলেন না। শুধু দাঁত কিরমির করে, চোখে জমে থাকা আগুনটাকে গিলে নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন সরাসরি সারহাদের দিকে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এসপি এবাট শব্দ করে হেসে দিল।
সকালের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি।
শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হালকা রোদ গড়িয়ে পড়ছে এই বিশাল ফাঁকা জায়গাটা চারদিক থেকে ঘেরা বিভিন্ন রকমের গাছগাছালিতে, দূরে দূরে কিছু পুরনো গাছ, মাঝখানে সমতল জমি। সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে সারহাদ, এসপি আর খুশদিল ফারুকী। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট হাতে ব্লুপ্রিন্ট, ট্যাবলেট, নকশা। এটা কোনো সাধারণ প্রজেক্ট না। এটা গিনির মানে চৌধুরীদের নতুন সাম্রাজ্যের ভিত্তি।
একজন ইঞ্জিনিয়ার এগিয়ে এসে সারহাদের সামনে ব্লুপ্রিন্ট খুলে ধরে আঙুল দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে বলে,

–“স্যার, এখানে আমরা মূল কমপ্লেক্সটা রাখবো। এই সেকশনে থাকবে কর্পোরেট টাওয়ার। এর পাশে আলাদা রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইউনিট। আর পিছনের অংশে প্রাইভেট সিকিউরিটি জোন’
খুশদিল ফারুকী ভ্রু তুলে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
–“সিকিউরিটি জোন এতটা বড় কেন?”
ইঞ্জিনিয়ার একটু থমকে ইতস্ততের সহিত প্রতুত্তর করে,
–“স্যার… প্রজেক্টটা যেহেতু হাই ভ্যালু….”
সারহাদ তার কথা কেটে গম্ভীর স্বরে বুলি আওড়ায়,
–“হাই ভ্যালু না, হাই রিস্ক। কিন্তু এখানে যা হবে, সেটা সবাই জানুক এটা আমি চাই না”
ইঞ্জিনিয়ার মাথা নেড়ে তার কথায় সম্মতি জানায়। সারহাদ আর কিছু না বলে ব্লুপ্রিন্টটা নিজের হাতে নিয়ে দেখতে শুরু করে। কিয়ৎকাল পরই সে ইঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকিয়ে নিজের চিরাচরিত রুক্ষ পুরুষালী কণ্ঠে শুধালো,

–“এখানে ভুল আছে’
ইঞ্জিনিয়ার চমকে ওঠে তার কথায়,
–“জি..জি স্যার?
সারহাদ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ফের শুধালো,
–“এই এন্ট্রি পয়েন্টটা…এটা খুব ওপেন। একটা সাধারণ আক্রমণো পুরো কমপ্লেক্স এক্সপোজড হয়ে যাবে”
ইঞ্জিনিয়ার একটা ফাঁকা ঢুক গিলে নিজের ভুল ঢাকার জন্য তাড়াতাড়ি সাফাই গাইতে শুরু করে,
–“স্যার, আমরা এখানে সিকিউরিটি গেট…”
সারহাদ কথা কেটে দেয়,
–“না, গেট দিয়ে কিছু হবে না। আমি মাল্টিলেয়ার সিকিউরিটি চাই, আন্ডারগ্রাউন্ড এন্ট্রি, ফেস রিকগনিশন আর একটা ডেড জোন”
ইঞ্জিনিয়ার থমকে যায়। বিস্মিত স্বরে আওড়ায়,
–“ডেড… জোন?”

এক মুহূর্তে সারহাদের চোখে একটা অদ্ভুত ঝিলিক খেলে যায়। নিজের রহস্যময় কণ্ঠে শুধালো,
–“হ্যাঁ, একটা এলাকা যেখানে কেউ ঢুকলে, সে আর বের হতে পারবে না”
চারপাশে মুহূর্তেই একটা ভারী নীরবতা নেমে আসে। কারো মুখ থেকে টু শব্দটি বের হচ্ছে না বরং সবাই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সারহাদ আবারও ব্লুপ্রিন্টে চোখ বুলিয়ে বলে,
–“আর এই রিসার্চ ইউনিট, এটা আলাদা বিল্ডিংয়ে না। মেইন স্ট্রাকচারের ভেতরে রাখো”
ইঞ্জিনিয়ার নিজের দ্বিধা দ্বন্দ্বিত গলায় মিনমিনিয়ে আওড়ায়,
–“স্যার, সেফটির জন্য আলাদা রাখাটা….”
সারহাদ এবার চোখ তুলে তাকায়। তার দৃষ্টি এতটাই কঠিন যে সাথে সাথে ইঞ্জিনিয়ারের কথা থেমে যায়। জিহবা খসে আর বাকিটা বের হলো না। সারহাদ শক্ত কণ্ঠে বলে
–“আমি যেটা বলছি, সেটাই হবে। সেফটি আমি দেখবো”

এরপর আর একটা শব্দও উচ্চারণ হলো বরং বলা যায় আর কেউ সাহস করলো না। সারহাদ আবারও ইঞ্জিনিয়ার দের বলতে শুরু করে। তাদের কথা বলার মধ্যেই অদূরে রাস্তার বিপরীত পাশে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা একটা বড় ফটকের সামনে এসে থামে একটা সাদা টয়োটা। গাড়িটা থামতেই এসপির চোখ সেদিকে চলে যায়। নজরে আসে গাড়ির দরজা খুলে নামে আয়ান তার কোলে কিয়ারা। মেয়েটা মাথা এলিয়ে রেখেছে তার কাঁধে। আয়ান তার পিঠে একহাতে সান্ত্বনার মতো করে বুলিয়ে দিচ্ছে আর অন্য হাতটা ধরে আছে কিয়ানের ছোট্ট হাত।
এসপির ভ্রু কুঁচকে আসে। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“এই সানডে মানডে এখানে কী করছে”
এসপি তার দিকে সন্দেহ জনিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছুটা সামনে এগিয়ে যায়। কিন্তু বিপরীতে আয়ান তাদের দিকে একবারও তাকায় না। সে সোজা হেঁটে ফটকের ভেতরে ঢুকে যায়। কিয়ান তার হাত শক্ত করে ধরে আছে আর কিয়ারা নিঃশব্দে তার কাঁধে রেখে আছে। ধীরে ধীরে ফটক বন্ধ হয়ে যায়। এসপি থমকে যায়। মনের কোণে হাজার টা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। এসপির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সারহাদ একবার শুধু তাকায় ওই ফটকের দিকে। সেও আয়ান কে দেখেছে কিন্তু তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই আর না কোন প্রশ্ন। সে আবারও নিজের কাজে ফোকাস করে।
ধীরে ধীরে সকালের কুয়াশা একটু একটু করে পাতলা হয়ে আসছে কিন্তু বাতাসে এখনো সেই ঠান্ডা, নিস্তব্ধ ভারটা রয়ে গেছে। এসপি ইতিমধ্যে কয়েক কদম এগিয়ে এসেছে। তার চোখ এখনো সেই বিশাল ফটকের দিকে। কিন্তু এসপি পৌছানোর আগেই আবারও নীরবতা চিরে এসে থামে একটা কালো বিএমডব্লিউ। এসপির ভ্রু কুঁচকে যায়। মনে মনে ভাবে, এখন এটা আবার কে?

এদিকে গাড়ির দরজা খুলে প্রথমে নামে আরজে। তার মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব আর চোখে অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণতা। সে চারপাশে একবার নজর বুলিয়ে তারপর ধীরে গাড়ির বিপরীত পাশের দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটি খুলে দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় ভেতরের দিকে। ভেতর থেকে সেই হাতটা ধরে নেমে আসে সানা। হালকা সাদা কুয়াশার ভেতর রমণীর আদলটা স্পষ্ট হলেও, চোখে এক ধরনের অস্বস্তি। নামতেই সে চারদিকে তাকিয়ে তার ভ্রু কুঁচকে ওঠে। সে আরজের দিকে তাকিয়ে একে একে প্রশ্ন করতে থাকে,
–“রানভীর, রিয়ানা এখানে?
কিন্তু এখানে কিভাবে এলো?
আপনি তো বলেছিলেন ওকে অন্য কোথাও রাখা হয়েছে। এই জায়গাটা কি?”
রানভীর, আপনি আমাকে কিছু বলছেন না কেন?”
তার এমন বিচলিত প্রশ্নের বিপরীতে আরজের তরফ থেকে কোনো প্রতুত্ত্যর আসে না। সে শুধু তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে নিচু স্বরে আওড়ায়,
–“চলো”

তার বিপরীতে রমণী আর কথা বাড়ালো না। সেও আরজের সাথে পা বাড়ায়। ঠিক সেই মুহূর্তে আরজে সামনে তাকায়। আর তার চোখ গিয়ে আটকে যায় এসপির উপর সাথে তার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সারহাদের উপরও। সারহাদও তখনই মাথা তুলে তাকিয়েছে। সাথে সাথে দুজনের চোখাচোখি হয়ে যায়। একটা মুহূর্তে যেন সময় থেমে যায়। সারহাদ একপলক দেখে দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকায় আরজের পাশে। নজরে আসে বহু দিনের অপেক্ষায় থাকা সেই মায়াবী আদল। হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা যেন শূন্য হয়ে আসে। তার গলাটা কেন জানি শুকিয়ে আসছে। সাথে শ্বাস আটকে যায় কিছুক্ষণের জন্য। এতদিন পর এভাবে হঠাৎ সানাকে দেখে তার ভেতরের জমে থাকা সবকিছু যেন একসাথে নড়ে ওঠে। সে কল্পনাও করেনি এভাবে দেখবে। ব্যস শুধু এক মুহূর্তের জন্যই তারপরই তার দৃষ্টি সরে যায় আরজের দিকে। নাহ, সরে যায়নি বরং আরজে সানার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে আড়াল করে ফেলেছে। আর সে তাকিয়ে আছে সারহাদের দিকে রক্তচক্ষুতে। মনে মনে আরজে ভীষণ বিরক্ত এই দুই ভাইয়ের উপর। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এই দুই সমস্যা টা কোন জায়গায়। না মানে সে তার বউকে নিয়ে যেখানেই যাবে এই দুই ভাই হাজির। এই মুহূর্তে আরজের ইচ্ছা করছে দুটোকেই এক বুলেটে উড়িয়ে ফেলে, এক ঢিলে দুই পাখির মতো। এদিকে তার পিছনে থাকা রমণীর এসব কিছুর দিকেই ধ্যান নেই। সে এখনো ঐ ফটকের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, রিয়ানা এখানে কী করছে।
অন্য দিকে আরজের সাথে চোখাচোখি হতেই সারহাদের চোখও মুহূর্তেই বদলে যায়। তার ভেতরের সব দুর্বলতা ঢেকে যায় শুধু কঠিন, ঠান্ডা দৃষ্টি ভেসে ওঠে। আরজে বিরক্ত হয়ে ওঠে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। নিচু স্বরে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,

–“ড্যাম ইট… ইডিয়টের দল”
সে সানার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে
এমনভাবে যেন কাউকে কিছু দেখতেও দিতে চায় না। সানাকে ভালো করে আড়াল করে সরাসরি ফটকের ভেতরে হাঁটা শুরু করে।সানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ভিতরে ঢুকে যায়। ফটকটা আবার বন্ধ হয়ে যায়। আরজের এমন কাজে এসপি তাজ্জব বনে গেল। এটা কী হলো?
আর ভিতরেই বা কী এমন আছে যার জন্য আজকে সবাই এখানে আসছে। এসপি নিজের অদম্য কৌতূহল কে একপ্রকার আটকাতে না পেরে কোন কিছু না ভেবে পা বাড়ায় সেদিকে।
সারহাদ তখনও স্থির দাঁড়িয়ে আছে তবে তার দৃষ্টি সেই ফটকের উপর। কিয়ৎকাল পর ইঞ্জিনিয়ার তাকে পিছন থেকে ডেকে ওঠে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৯

–“স্যার… প্ল্যানটা….স্যার, এই সাইডটা”
কিন্তু বিপরীতে মানব কোন কিছুই শোনছে না। সে কোন এক অজানা টানে যন্ত্রের ন্যায় পা বাড়ায় সামনে। তার পুরো মনোযোগ এখন একটাই জায়গায়, ওই ফটক।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (২)