হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩১
সাবা খান
ঘন অমানিশার মতো নিশিটা যেন পৃথিবীর বুকে নেমে আসা কোনো অভিশপ্ত অধ্যায়। আজ আকাশজুড়ে চাঁদের লেশমাত্র নেই, নেই কোনো নক্ষত্রের ক্ষীণতম জ্যোৎস্নাও। চারপাশের বাতাসে এক অদ্ভুত পচা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ মিশে আছে যেন বহু মৃত আত্মার চাপা দীর্ঘশ্বাস জমাট বেঁধে রাতের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দূরে কোথাও একঝাঁক শেয়ালের করুণ হাঁক ভেসে আসছে, আর সেই আওয়াজ আরও ভয়ংকর করে তুলছে সমগ্র পরিবেশকে।
সেই ভয়াবহ নিশির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে “ব্ল্যাকস্টোন প্রিজন” দেশের সবচেয়ে কুখ্যাত কারাগারগুলোর একটি। বিশাল কালো দেয়ালগুলো যেন অন্ধকার গিলে খেয়ে আরও কৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠেছে। কারাগারের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া, বিশাল টাওয়ারে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা লাল বাতি আর ভারী অস্ত্রধারী প্রহরীরা পুরো স্থানটাকে মৃত্যুকূপের মতো করে তুলেছে। কিন্তু কারাগারের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটা হলো তার অন্তঃস্থল, ভিআইপি সেল ব্লক। সাধারণ বন্দিদের জন্য যেখানে নোংরা, দুর্গন্ধময় কুঠুরি বরাদ্দ, সেখানে এই ভিআইপি সেলটা যেন বিলাসিতার আরেক নাম। বিশাল কক্ষ, দেয়ালে দামি কাঠের প্যানেলিং, নরম সোফা, কাচের সেন্টার টেবিল, দামি কার্পেট, এমনকি এক কোণে মিনি বারও রাখা। যেন কোনো ধনকুবেরের ব্যক্তিগত লাউঞ্জ।
এইরকম একটি সেলের মাঝখানে একটা বিশাল দাবার বোর্ড পেতে বসে আছে দু’জন মানুষ। তার এক পাশে ওয়াসিম হায়দার। তার চোখ মুখে স্পষ্ট ধূর্ততা আর ঠোঁটের কোণে সর্বক্ষণ বিদ্রুপের হাসি। অন্য পাশে আলী মির্জা যার মুখভর্তি বয়সের রেখা পড়ে গেলেও চোখে এখনও সেই পুরনো হিংস্রতা বিদ্যমান। তাদের চারপাশে কয়েকজন কয়েদি চাকরের মতো ঘুরছে। কেউ ওয়াসিম হায়দারের কাঁধ টিপে দিচ্ছে, কেউ আলী মির্জার পায়ে ম্যাসাজ করছে। আরেকজন গ্লাসে দামি জুস ঢেলে সামনে ধরছে। ওয়াসিম দাবার একটা ঘুটি সরিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠল,
–“এই দেশের আইনরে সালাম জানাই মির্জা, বাইরে মানুষ দুই বেলা ভাতের জন্য যুদ্ধ করে, আর আমরা জেলের ভিতরে বসে রাজাদের মতো জীবন কাটাই”
আলী মির্জাও তীক্ষ্ণ হাসি হেসে বলল,
–“আইন? হাহ, এ দেশে আইন টাকার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকে। আইন শুধু ক্ষমতাবানদের হাতের পুতুল”
একজন কয়েদি তৎক্ষণাৎ তোষামোদী কণ্ঠে বলে উঠল,
–“মির্জা সাব, আপনি না থাকলে এই জেলের অফিসাররাও নিঃশ্বাস নিতে ভয় পায়”
কয়েদির বলা বাক্যটা ভীষণ পছন্দ হলো তার। নিজের প্রসংশা কে না শুনতে ভালোবাসে? আলী মির্জা হো হো করে হেসে শুধালো,
–“ওদের ভয় পাওয়াই উচিত। কারণ আমরা বাইরে থাকি বা ভিতরে, রাজত্ব আমাদেরই’
ওয়াসিম হায়দার এবার ওয়াইনের গ্লাসটা হাতে নিয়ে দোলাতে দোলাতে বলল,
–“শুনছো মির্জা? বাইরে এখন মানুষ ভাবে আমরা শাস্তি পাচ্ছি। অথচ বাস্তবে দেখো, জেলের ভিতরে আমাদের জীবন বাইরের মন্ত্রীদের চেয়েও আরামে কাটছে”
অতঃপর দুজনেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ভেসে এলো ভারী বুটের শব্দ। কিছুক্ষণ পর লোহার দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে ডিসিপি সাজেদুল হক। মুখে চাপা অস্বস্তি, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম নিয়ে তিনি তাড়াহুড়ো করে একটা আসনে বসে পড়েন। ওয়াসিম হায়দার ভ্রু তুলে তাকিয়ে অলস ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুঁড়ে,
–“কী খবর, সাজেদুল? বাইরে কী অবস্থা?”
সাজেদুল হক একটু ইতস্তত করে চাপা সুরে বলে,
–“বাইরে সোফিয়াকে নিয়ে অনেক মাতামাতি হচ্ছে। খবর ছড়িয়েছে, সে মারা গেছে”
আলী মির্জা কথাটা শুনে হাত নেড়ে বিরক্তিভরে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিল। তারপর ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ টেনে বলল,
–“তোমার খবরের সোর্স এত দুর্বল কেন সাজেদুল?”
সামবে থাকা ওয়াসিম হায়দার ও একগাল হেসে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,
–“তোমার খুচররা যদি আরেকটু ভালো হতো তাহলে শুনতে পেতে সোফিয়াকে বাঁচিয়ে নিয়ে গেছে”
–“আরজে থাকতে তার মাকে ফাঁসিতে ঝুলাবে? এটা শুধু এই দেশের আইনের দিবাস্বপ্ন। ওই ছেলে নিজের মায়ের জন্য পুরো শহর জ্বালিয়ে দিতে পারে”
ওয়াসিম হায়দারও মুচকি হেসে আলী মির্জার কথার বিপরীতে বলে,
–“ওই জাওয়ানদের রক্তই আলাদা। ওরা মরবে, কিন্তু নিজেদের মানুষকে মরতে দিবে না”
কিন্তু সাজেদুল হকের মুখের আতঙ্ক কমল না। সে আরও একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
–“তোমরা বুঝতে পারছো না। এবারের হিসাবটা আলাদা। এবার সোফিয়ার পিছনে পড়েছে দিলরুবা খানম”
আলী মির্জা ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
–“দিলরুবা? আবার এই ডাইনি কোথা থেকে টপকালো?
এমনিতেই তো সোফিয়ার শত্রুর অভাব নেই”
সাজেদুল গলা নামিয়ে নিচু স্বরে বলতে শুরু করে,
–“আরে মির্জা সাব ভুলে গেলেন, বিশ কি ত্রিশ বছর আগে ভারতের সীমান্তে আমরা যে টেরোরিস্ট হামলা করেছিলাম… ওই হামলায় মারা যাওয়া কমান্ডোর স্ত্রী এই দিলরুবা”
তার বলা বাক্যটা নিঃসৃত হওয়ার পর পরই একমুহূর্তে ঘরের পরিবেশ বদলে গেল। ওয়াসিম হায়দারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে আর আলী মির্জা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ হেসে উঠেন উচ্চস্বরে,
–“মানে এক ডাইনির পিছনে আরেক ডাইনি পড়েছে”
কিন্ত ওয়াসিম হায়দারের মুখ এখনো অন্ধকার। তিনি বিষয় টা কিছুটা আঁচ করতে পেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,
–“আমি জানতাম এমনটাই হবে। ওই আরজে আগেই সব বুঝে নিজের মাকে সরিয়ে ফেলেছে। আর আমরা এখানে মরার জন্য পড়ে আছি। মির্জা, এখানে অনেক বড় চক্কর চলছে”
সাজেদুল হকও উৎকণ্ঠিত চোখে চারপাশে তাকাল। কিন্তু আলী মির্জা যেন এসবের কিছুই পরোয়া করল না। সে হেলান দিয়ে বসে শান্ত স্বরে প্রতুত্তর করে,
–“আরে হায়দার সাব, এত টেনশন করছেন কেন?
শুধু শুধু ভিপি হাই হয়ে যাবে। কালই তো আমরা বের হয়ে যাচ্ছি”
সে দাবার রাজাকে আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি ফুটিয়ে ফের বলল,
–“আমার ছেলে রানা সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। শুধু আপনাদের প্রপার্টির থার্টি পার্সেন্ট আমাকে দিবেন সৌজন্যতা হিসেবে”
ওয়াসিম হায়দার কটমট করে তাকালেও শেষমেশ হেসে ফেলল,
–“তুই মরার আগেও ব্যবসা ছাড়বি না, মির্জা”
আলী মির্জা বুক চাপড়ে অহমিকার সাথে বলে,
–“ব্যবসাই আমার প্রথম প্রেম”
সাথে সাথে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল পুরো কক্ষে। একজন কয়েদি তাড়াতাড়ি গ্লাস বাড়িয়ে দিল আলী মির্জার দিকে। আরেকজন তাকে তোষামোদের সুরে বলে,
–“মির্জা সাব, বাইরে সরকার বদলায়, কিন্তু আপনাদের রাজত্ব বদলায় না”
আলী মির্জা তৃপ্তির হাসি হেসে গ্লাসে চুমুক দিল। সবকিছু যেন আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। ঠিক তখনই…ধপ করে পিছনের অন্ধকার করিডোর থেকে হঠাৎ ভারী কিছু পড়ার শব্দ ভেসে এল। মুহূর্তে সবার মুখের হাসি থেমে গেল। সবাই একসাথে চমকে উঠে। ওয়াসিম হায়দারের ভ্রু কুঁচকে গেল। সাজেদুল হক দ্রুত দুইজন কয়েদির দিকে তাকিয়ে ইশারা করে,
–“যাও, দেখে আসো”
দুজন কয়েদি সাবধানে অন্ধকার করিডোরের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর আর কোনপ্রকার শব্দ এলো না শুধুই নিস্তব্ধতা। এক মিনিট, দুই মিনিট করে সময় গড়িয়ে গেল পাঁচ মিনিট। কিন্তু কেউ আর ফিরেও এলে না। হঠাৎ,
–“আআআহহহ….”
করে একটা ভয়ংকর আত্মচিৎকারে পুরো সেল কেঁপে উঠে। ওয়াসিম হায়দারের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। সে এবার চোখ দিয়ে সাজেদুল হককে ইশারা করে গিয়ে দেখার জন্য। সাজেদুল এবার বাকি তিনজন কয়েদিকে নিয়ে নিজেই এগিয়ে গেল অন্ধকারের দিকে। তারা অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার পর আবারও সেই একই নিস্তব্ধতা, কোনরূপ শব্দ নেই। মিনিটগুলো যেন অস্বাভাবিক ধীর হয়ে গেল। এদিকে দশ মিনিট পার হয়ে গেল কিন্তু কেউ ফিরে এল না। এবার আলী মির্জাও অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল। ওয়াসিম হায়দার উঠে দাঁড়াতে যাবে ঠিক তখনই, টলতে টলতে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল সাজেদুল হক। তার পুরো শরীর রক্তে ভেজা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত রক্ত গড়িয়ে পড়ছে টুপ টুপ করে, তার চোখ দুটো আতঙ্কে বিস্ফোরিত। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে কিছু একটা বলতে চাইছে,
–“ও… ওখানে… সে… সে…”
আলী মির্জা আর ওয়াসিম হায়দার আতঙ্কিত চোখে তার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই পরপর দুটো গুলি সোজা গিয়ে লাগল সাজেদুল হকের মাথায়। তার মাথার পিছন দিকটা বিস্ফোরিত হয়ে রক্তের সাথে মস্তিষ্ক সহ বেড়িয়ে ছিটকে পড়ে চারপাশে। মুহূর্তেই তার নিথর দেহটা ধপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পুরো কক্ষটা জমে গেল মৃত্যুভয়ে। ওয়াসিম হায়দারের শ্বাস আটকে আসছে। আলী মির্জারও ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। দুজনেই ধীরে ধীরে তাকাল সাজেদুল হকের পিছনের অন্ধকারে। সেই কৃষ্ণগহ্বরের ভিতর থেকে ধীরে ধীরে একটা কালো অবয়ব বেরিয়ে আসছে। তার পায়ের ভারী বুটের শব্দ ভীষণ অসহ্যকর ঠেকলো তাদের দুজনের নিকট বরং প্রতিটা পদক্ষেপ যেন মৃত্যুর ঘোষণার মতো মনে হলো। লোকটার গায়ে লম্বা কালো ওভারকোট। মাথায় কালো হ্যাট। হাতে ধোঁয়া ওঠা বন্দুক। সে যত সামনে এগিয়ে আসছে ততই দুজনের বুকের ভিতরটা ভয়ে বরফের মতো জমে যাচ্ছিল। ওয়াসিম হায়দারের হাত কাঁপছে। আলী মির্জার গলাও রীতিমতো শুকিয়ে কাঠ, তিনি বহু চেষ্টা করেও কাউকে ডাকতে পারছে না। তাদের মনে হচ্ছিল, কোনো মানুষ নয়, অন্ধকার নিজেই হেঁটে তাদের সামনে চলে আসছে। অবশেষে সেই ব্যক্তি থামল। ধীরে ধীরে মাথা থেকে কালো হ্যাটটা সরাতেই স্পষ্ট হয়ে উঠল মুখটা,
“সারহাদ চৌধুরী”
সাজেদুল হকের রক্তাক্ত নিথর দেহটা তখনও মেঝের উপর পড়ে আছে। তার মাথার পাশ দিয়ে টপটপ করে গাঢ় রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সাদা মার্বেলের উপর। পুরো ভিআইপি সেলটায় এখন মৃত্যুর কাঁচা গন্ধ। নিঃশ্বাস নিতেও যেন বুক কেঁপে উঠছে। আর সেই রক্তাক্ত নীরবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সারহাদ চৌধুরী।
কালো ওভারকোটে মোড়া দেহ, এক হাতে বন্দুক, অন্য হাতটা পকেটে ঢুকানো। চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত। অথচ সেই শান্তির গভীরে এমন এক বিভীষিকা লুকিয়ে আছে, যা একজন মানুষের আত্মা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিতে পারে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক বাঁকা, ভয়ংকর হাসি প্রসারিত হয়ে উঠল। হঠাৎই সে ঠোঁটটা আরও বাঁকিয়ে দু’হাত দুইদিকে ছড়িয়ে উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলে উঠে,
–“সারপ্রাইজ”
তার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি এতক্ষণের নিস্তব্ধ সেলের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে ফিরে এল। সারহাদ আবারও হীম ধরা কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“কেমন লাগল সারপ্রাইজটা, বল?”
ওয়াসিম হায়দার আর আলী মির্জা দুজনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন তাদের শরীর থেকে সমস্ত রক্ত মুহূর্তেই সরে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। ঠোঁট কাঁপছে কিছু বলার জন্য কিন্তু কোন শব্দ বের হচ্ছে না। সারহাদ ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে তাদের কাছে এগিয়ে এল। সে এসে প্রথমে আলী মির্জার কাঁধে চাপ দিয়ে হাত রাখল। তারপর ওয়াসিম হায়দারের কাঁধেও হাত রেখে মাথা কাত করে ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর হাসি ফুটিয়ে আওড়ায়,
–“কী রে? এত চুপচাপ কেন? একটু আগেও তো খুব হাসাহাসি হচ্ছিল। এই দেশের আইন নিয়ে বড় বড় জোকস মারছিলি না?
এখন আইন কই?”
তার প্রশ্নের বিপরীতে কেউ উত্তর দিল না। সারহাদ আবার হেসে উঠে,
–“আরে, তোরা তো ভিআইপি কয়েদি। তোদের জন্য আলাদা রুম, আলাদা সার্ভিস, দাবা খেলার ব্যবস্থা… বাহ্”
সে হঠাৎ নিচু হয়ে সাজেদুল হকের লাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“দুঃখের বিষয়, ডিসিপি সাব খেলাটা শেষ পর্যন্ত দেখতে পারল না”
আলী মির্জার কপাল বেয়ে চিকন ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। ওয়াসিম হায়দারের বুক এত জোরে উঠানামা করছে, যেন তার শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। সারহাদ এবার ধীরে ধীরে সেই রাজকীয় চেয়ারটার দিকে এগিয়ে গেল, যেখানে এতক্ষণ ওয়াসিম হায়দার বসেছিল। সে আরাম করে গিয়ে চেয়ারটায় বসে এক পা অন্য পায়ের উপর তুলে হেলান দিল। তারপর বন্দুকটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে তাদের দিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে আদেশ ছুঁড়ে,
–“বস”
তার বলা সামান্য এই ছোট শব্দটাই যেন তাদের ভয় আরও একধাপ বাড়িয়ে দিল। ওয়াসিম হায়দার আর আলী মির্জা দুজনেই একে অপরের দিকে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে সামনে এসে বসে পড়ল দাবার বোর্ডের দুই পাশে। সারহাদ তাদের দেখে তীর্যক হেসে দাবার গুটিগুলোর দিকে তাকিয়ে তারপর নিচু গলায় বলল,
–“কেমন কাটছে তোদের দিনকাল কারাগারে?”
কিছুক্ষণ থেমে সে ফের বলে,
–“খুব ভালোই তো, তাই না?
বাইরে মানুষ তোদের অভিশাপ দেয় আর ভিতরে তোরা রাজাদের মতো দাবা খেলিস”
সে একটা কালো গুটি হাতে নিয়ে আঙুলে ঘুরাতে বলে,
–“তোদের দেখলে মাঝে মাঝে ভাবি… মানুষ এত নিচে নামতে পারে কিভাবে?”
ওয়াসিম হায়দার দাঁত চেপে বসে আছে। তার এই মুহূর্তে ইচ্ছা করছে, সারহাদের মাথাটাকে দু টুকরো করে ফেলে। কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছাটাকে দামাচাপা দিতে হয়েছে বন্দুক টার দিকে তাকিয়ে। আলী মির্জা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। সারহাদ হঠাৎ সামনে ঝুঁকে বলে,
–“জানিস? আমার খুব ইচ্ছা করছে তোদের দুজনকে এখানেই গুলি করে দেই”
এই বলে সে কিছুক্ষণ থেমে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে লালচে হয়ে উঠছে। তারপর আবারও হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
–“কিন্তু না… এত সহজ মৃত্যু তোদের জন্য খুব ছোট শাস্তি হয়ে যাবে”
তার এতগিলো বাক্যের বিপরীতে এই পর্যন্ত দুজনেই টু শব্দটি করল না। কিন্তু এবার ওয়াসিম হায়দার বুক ভরে সাহস সঞ্চয় করে বলে,
–“দাম বল”
সারহাদ ভ্রু তুলে তাকায়, ওয়াসিম কাঁপা কণ্ঠে বাকিটা বলে,
–“নিজের দাম বল, আমি পরিশোধ করে দিব। শুধু মুক্তি চাই”
কথাটা শুনে সারহাদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। ভয়ংকর ঝং ধরা সেই হাসি পুরো নিস্তব্ধ সেলটাকে কাঁপিয়ে তুলে। সে হাসতে হাসতেই পায়ের উপর পা তুলে বলে,
–“ওকে, নিজের দাম দুইভাবে পরিশোধ করতে পারবি”
সে ধীরে ধীরে আরও সামনে ঝুঁকে, মুহূর্তে তার চোখের দৃষ্টি আরও ধারালো হয়ে উঠে। দন্ত পাটি চেপে বুলি আওড়ায়,
–“ফাস্ট, আমার ড্যাডকে ফিরিয়ে দে”
কথাটা শুনে আলী মির্জার বুক ধক করে উঠল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, এটা অসম্ভব। সে ভয়ে ভয়ে শুকনো ঠোঁট জিব দিয়ে চেটে জিজ্ঞেস করে,
–“সেকেন্ড?”
সারহাদ সাথে সাথে উত্তর দিল,
–“আমাকে দাবাতে হারাতে হবে”
সে দাবার বোর্ডের দিকে তাকিয়ে একটা সাদা গুটি সামনে এগিয়ে দিল,
–“যদি তোরা জিতিস… তাহলে তোদের বাঁচিয়ে দিব”
অতঃপর তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। সে বন্দুকটা তুলে টেবিলে ঠক করে রেখে বলে,
–“আর যদি হারিস…তাহলে এই চেকমেটের সাথে তোদের লাইফেরও চেকমেট হয়ে যাবে”
ওয়াসিম হায়দারের গলা শুকিয়ে গেল পুরোপুরি, আলী মির্জার আঙুল কাঁপছে। খেলা শুরু হয়ে যায় সাথে সাথে। প্রথম চালটা দিল সারহাদ একদম নিখুঁত ভাবে। বিপরীতে ওয়াসিম হায়দার বহু বছরের দাবাড়ু। কারাগারে বসেও শত শত ম্যাচ খেলেছে। আজ পর্যন্ত তাকে কেউ হারাতে পারেনি। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে আজ তার হাত কাঁপছে। অতিরিক্ত ভয়ে নাকি অন্য কিছু বুঝা গেল না। সে একটা চাল দিল। সারহাদ মুচকি হেসে মুহূর্তেই তার গুটি কেটে দিল। আলী মির্জা এবার অন্যদিক থেকে চাল দিল। সারহাদ যেন আগেই সব হিসেব করে রেখেছিল। প্রতিটা চালের বিপরীতে তার কাছে প্রস্তুত উত্তর। সাদা গুটিগুলো একে একে আটকে যেতে লাগল কালো গুটির ভিড়ে। ওয়াসিমের কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম পড়ছে। আলী মির্জা বারবার ভুল চাল দিয়ে ফেলছে। তারা দুজন মিলে খেলছে তবুও একজন সারহাদের সামনে দাঁড়াতে পারছে না। কিংবা বলা যোতে পারে অতিরিক্ত টেনশনে তাদের মাথা কাজ করছে মা। সারহাদ মাঝেমধ্যে হেসে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলছে,
–“এই চাল?”
–‘আহ্… এত বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই খেলবি?”
তার প্রতিটা বাক্য যেন তাদের আত্মসম্মানে ছুরি চালাচ্ছে। তবুও তারা নিশ্চুপ। ধীরে ধীরে বোর্ডের উপর তাদের সমস্ত গুটি আটকে গেল। শেষে শুধু রাজাটা পড়ে রইল, একটা অসহায়, কোণঠাসা রাজা। সারহাদ ধীরে ধীরে নিজের শেষ গুটিটা তুলে নিয়ে তারপর সেটাকে সামনে এগিয়ে রেখে শান্ত কণ্ঠে বলে,
–“চেকমেট”
নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে তার এই শব্দ টা উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই মুহূর্তেই পুরো কক্ষটা যেন জমে গেল। সারহাদ বন্দুকটা টেবিলের উপর ঠক করে রাখল। ওয়াসিম হায়দার আর আলী মির্জার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তাদের বুকের ভিতর কেবল একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,
–“চেকমেট”
মুহূর্তটা এত দ্রুত ঘটল যে চোখের পলক ফেলারও সুযোগ পেল না কেউ। ওয়াসিম হায়দারের বহু বছরের অপরাধজগতের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও সুযোগ খুঁজতে হয়। আর ঠিক সেই সুযোগটাই সে খুঁজে পেল টেবিলের একপাশে পড়ে থাকা অর্ধেক ভর্তি মদের গ্লাসটায়। সারহাদের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য দাবার বোর্ডের দিকে সরতেই ওয়াসিম হায়দার সমস্ত শক্তি দিয়ে গ্লাসটা ছুঁড়ে মারল তার মুখ বরাবর। ঝাঁঝালো ড্রিংকস ছিটকে পড়ল সারহাদের চোখে মুখে। পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই ওয়াসিম সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে টেবিলের উপর রাখা বন্দুকটা তুলে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আলী মির্জাও সুযোগটা নষ্ট করল না। সে দাঁত চেপে উঠে এসে সারহাদের হাঁটু বরাবর সজোরে একটা লাথি মারল। সারহাদ ভারসাম্য হারিয়ে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে পড়ে গেল। একদিকে চোখে ভীষণ জ্বালা করছে, অন্যদিকে অতর্কিত হামলা, কয়েক সেকেন্ডের জন্য সত্যিই প্রস্তুত ছিল না সে। আর সেই দৃশ্য দেখে ওয়াসিম হায়দার ও আলী মির্জার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। ভয়ের ভিতর থেকেও হঠাৎ তারা যেন সাহস ফিরে পেল। ওয়াসিম বন্দুকটা হাতে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
–“হাহ, শেষমেশ তুইও ভুল করলি, সারহাদ”
সে বন্দুকের নলটা সারহাদের কপাল বরাবর তাক করে তীব্র বিদ্বেষের সুরে বাক্য ছুঁড়ে,
–“তোরা চৌধুরীরা সত্যিই হতভাগা। তোর বাপ দাদার হাতে পুরো দেশ শাসন করার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু কী করল?
সততা দেখাতে গেল”
সে হঠাৎ উচ্চশব্দে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে চারপাশে তাকিয়ে আবারও সারহাদের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলে,
–“বল তো, আজকাল সৎ লোকদের কোনো দাম আছে?”
আলী মির্জা সাথে সাথে বিকৃত হাসিতে যোগ দিয়ে বলে,
—”এই দুনিয়ায় সৎ মানুষরা শুধু ইতিহাসের বইয়ে ভালো লাগে। বইয়ের বাইরে তারা শুধু পরাজিত সেনা”
ওয়াসিম আবারও বলে,
—”তোদের জন্য মাঝে মাঝে সত্যিই দুঃখ হয়। কারো কপাল এতটা খারাপ হতে পারে, তোদের না দেখলে বুঝতাম না”
সে ধীরে ধীরে ট্রিগারের উপর আঙুল রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
—”ভালো হতো সেদিন সোফিয়ার উপর ভরসা না করে তোকে নিজের হাতে মেরে ফেলতাম। তাহলে আজ এই ঝামেলাই থাকত না”
বাক্যটা উগড়ে দিয়েই সে সে ট্রিগার চাপল। আলী মির্জা চোখ খিঁচিয়ে নিল। কিন্তু কিছুই হলো না, কোনো গুলিই বের হলো না। ওয়াসিমের মুখের ক্রুর হাসিটা মুহূর্তেই জমে গেল। সে আবার ট্রিগার চাপল, আবারও শূন্য। তার আর বুঝতে বাকি নেই পুরো বন্দুক ফাঁকা, একটাও গুলি নেই। মুহূর্তে দুজনের কপাল কুঁচকে গেল। আর ঠিক তখনই, তাদের বিস্মিত আদল কে আরও বিপর্যস্ত করার জন্য হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থাতেই সারহাদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। অন্ধকার সেলের মধ্যে সেই জংধরা হাসিটা যেন মৃত মানুষের কবর ভেঙে বেরিয়ে আসা কোনো অশুভ শব্দ। আলী মির্জার বুক কেঁপে উঠল সেই তীক্ষ্ণ শব্দে। সে অজান্তেই কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। ওয়াসিমের হাত কাঁপতে কাঁপতে বন্দুক টা মেঝেতে পড়ে গেল। সারহাদ ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে আছে, আর সেই সাথে ঠোঁটের কোণে ভয়ংকর হাসি। সে ধীরে ধীরে হাঁটু থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর ওয়াসিমের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,
–“আমার বাপ যে ভুলটা একবার করেছে… তুই ভাবলি কিভাবে তোকে বিশ্বাস করে আমি সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করব?”
সে আর একটু সামনে এগিয়ে এসে ফের বলে,
—”একবার মনে করে দেখ… আঠারো বছর আগে আমার গ্র্যান্ডপা তোকে কী বলেছিল?”
কথাটা শুনতেই ওয়াসিম হায়দারের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই রাত, জাওয়ান ম্যানশনের অন্ধকার বেজমেন্টের রাত। চারপাশ রক্তে ভেজা, আজাদ চৌধুরীকে চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে, তার শরীরের প্রতিটা অংশ ক্ষতবিক্ষত। তবুও…তবুও তিনি সাইন করেননি। ওই একটা সাইন করলেই তাদের অবৈধ সাম্রাজ্য বৈধ হয়ে যেত। কিন্তু মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও আজাদ চৌধুরী রক্তভেজা ঠোঁটে হেসে বহু কসরতে আওড়ান,
–“চৌধুরীদের রক্তকে কখনো হালকা ভেবো না। আমরা মরে যাই, কিন্তু আমাদের প্রতিশোধ মরে না…”
এটুকু বলেই তার স্বর থেমে যায়। তিনি রক্ত কাশতে কাশতে ফের বলেন,
–“আজ না হোক কাল… কাল না হোক বিশ বছর পর, চৌধুরীদের রক্ত নিজের হিসাব বুঝে নেয়। চৌধুরীদের শেষ করতে গেলে আগে নিজের কবর খুঁড়ে রেখো… কারণ চৌধুরীরা জীবিত থেকেও ভয়ংকর… মৃত থেকেও….”
স্মৃতিটা মনে পড়তেই ওয়াসিম হায়দারের সারা শরীর শিরশির করে উঠল। এদিকে আলী মির্জা পিছিয়ে যেতে যেতে দরজার কাছে পৌঁছে গেছে। সে উন্মাদের মতো দরজা ঠেলছে, জোর লাগিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে সাথে চিৎকার করছে,
—”দরজা খোলো…..”
কিন্তু বাইরে কোনো শব্দ এলো না, দরজাটা বাইরে থেকে লক করা। মুহূর্তে তার আতঙ্ক দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে পিছনে ফিরতেই, সরাসরি চোখাচোখি হলো সারহাদের রক্ত ঝরা চক্ষুর সাথে। সারহাদ একপলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বিরক্ত গলায় বলল,
–“চিৎকার করে মাথা ধরিয়ে ফেলছিস”
পরমুহূর্তেই সে পিছন থেকে আরেকটা বন্দুক বের করে আলী মির্জা কিছু বুঝে উঠার আগেই পরপর ছয়টা গুলি চলে যায় সারহাদের বন্দুক থেকে। সবগুলো আলী মির্জার শরীরে গিয়ে বিঁধল। কিন্তু একটাও হার্টে নয়, একটাও মাথায় নয়। সারহাদ এমনটা ইচ্ছে করেই করেছে। আলী মির্জা চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার পুরো শরীর ছটফট করছে, রক্তে মেঝে ভেসে যাচ্ছে। তার শেষ নিঃশ্বাস টা যেন নাকের ডগায় এসে আটকে আছে। তীব্র যন্ত্রণায় তার সেই আর্তচিৎকার পুরো সেল কাঁপিয়ে তুলল। ওয়াসিম হায়দারের নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর কাঁপতে কাঁপতে অনুরোধের সুরে আওড়ায়,
–“ক্ষমা করে দে… প্লিজ, আমি ভুল করেছি”
বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে গরগর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তবুও বলছে,
–“আমাকে ছেড়ে দে…”
সারহাদ ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ায়, তারপর এক ঝটকায় ওয়াসিমের চুলের মুঠি চেপে ধরে মুখটা উপরে তুলল। ওয়াসিম যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে তবে সারহাদ তার বিন্দু মাত্র তোয়াক্কা না করে দাঁত চেপে বলে,
—”বল… বন্ধুদের ধোঁকা দিতে কেমন অনুভূতি হয়?
আমার বাপকে ধোঁকা দেওয়ার সময় তোর এই কলিজাটা কোথায় ছিল?”
সে আরও জোরে চুল টেনে ধরে চিৎকার করে ওঠে,
–“একবারও কাঁপেনি, বল?
ওয়াসিম কাঁদতে কাঁদতে আকুতি মিনতি করে,
—”প্লিজ…”
কিন্তু বিপরীতে মানবের চোখে বিন্দুমাত্র দয়া নেই বরং সে দন্ত খিঁচিয়ে হিসহিসিয়ে উঠে,
—”আজ নিজের মৃত্যু দেখে কেন কাঁপছে?”
পরমুহূর্তেই সে ওয়াসিমকে সজোরে ছুঁড়ে মারল দেয়ালে। সাথে সাথে ওয়াসিমের মুখ ফেটে রক্ত বের হয়ে এল। তারপর শুরু হলো সারহাদের নির্মম প্রহার। কখনো ঘুষি, কখনো লাথি৷ কখনো টেবিলের ধাতব অংশ দিয়ে আঘাত। প্রতিটা আঘাতে যেন বছরের পর বছর জমে থাকা প্রতিশোধ ঝরছে। ওয়াসিম হায়দার কখনো তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করছে, কখনো তার পা ধরে কাঁদছে, কখনো ক্ষমা চাইছে। এভাবেই চলতে থাকল যতক্ষণ না সারহাদ পৈশাচিক তৃপ্তি পেল।
সেলের ভেতর তখন এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। চারদিকে শুধু রক্তের কটু গন্ধ, মেঝের উপর ছড়িয়ে থাকা লাশ, ভাঙা টেবিল, ছিটকে পড়া দাবার গুটি, আর মাঝখানে আধমরা অবস্থায় পড়ে আছে ওয়াসিম হায়দার। তার বুকটা ধীরে ধীরে উঠছে নামছে। নিঃশ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। শরীরের প্রতিটা হাড় যেন গুঁড়িয়ে গেছে। ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে। চোখ দুটো আধখোলা, তবুও সেখানে মৃত্যুভয় স্পষ্ট।
সারহাদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ওভারকোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা চিকন তার বের করে। স্টিলের সরু তারটা ম্লান আলোয় চিকচিক করে উঠে। ওয়াসিম হায়দারের দৃষ্টি তারটার উপর পড়তেই তার বুকের ভেতরটা যেন বরফের মতো হীম হয়ে গেল। সে বুঝে ফেলেছে, সম্পূর্ণ বুঝে ফেলেছে সারহাদ এখন কী করতে চলেছে। কিন্তু তার আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। করবেই বা কী?
হাত পা ভাঙা, শরীরে শক্তি নেই, চিৎকার করার শক্তিটুকুও যেন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। সে কেবল আতঙ্কে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। সারহাদ ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে তারটা ওয়াসিমের গলায় পেঁচিয়ে ধরল দুই পাক দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে টান দিল।ওয়াসিমের গলা দিয়ে বিকৃত শব্দ বেরিয়ে আসছে। সারহাদ এবার তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করে আওড়ায়,
—”মনে আছে তো?
ঠিক আঠারো বছর আগে এভাবেই তুই আমার গ্র্যান্ডপার গলায় তার পেঁচিয়ে ধরেছিলি আমার চোখের সামনে। তারপর আমার ড্যাডের হাতে গ্র্যান্ডপাকে গুলি করিয়েছিস। ওইদিন আমার মনে হয়েছিল… তুই আমার গ্র্যান্ডপার না… আমার নিজের গলাতেই তারটা পেঁচিয়েছিস”
ওয়াসিমের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। সারহাদ ঠান্ডা গলায় আবার বলে,
—”মৃত্যুর আগে একটা সত্য জেনে নে খুব ভালো করে”
সে তারটা আরও একটু টেনে ধরে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে নিচু স্বরে আওড়ায়,
—”তোর ছেলে রাকেশ হায়দার… যার জন্য তুই পৃথিবীর সব সুখ অর্জন করেছিস। তুই জানিস… সেই ছেলে তোর রক্ত না?”
কথাটা শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই শুনতেই ওয়াসিমের চোখ বিস্ফোরিত হয়ে উঠে। নিজের শরীরে একফোঁটা শক্তি না থাকা সত্ত্বেও সে অবিশ্বাস্য চোখে সারহাদের দিকে তাকায়। সারহাদ আরও ঝুঁকে এসে নির্মম বিদ্রূপের সুরে ফিসফিস করে,
—”হ্যাঁ… তোর বউ তোকে রোজ ধোঁকা দিয়েছে। আর তুই এই বয়স পর্যন্ত সেটা বুঝতেই পারলি না। যে বন্ধুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে… সে অন্যের থেকে বিশ্বস্ততা আশা করে কিভাবে?”
সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলে,
—”ধোঁকাবাজদের শেষটা এমনই হয়, ওয়াসিম হায়দার”
এই বলে সে হঠাৎ সমস্ত শক্তি দিয়ে তারটা চেপে ধরল। “চিড়রর” করে একটা ভয়ংকর শব্দে ওয়াসিমের গলা চামড়া প্রায় অর্ধেক ছিঁ*ড়ে গেল। তার চোখ দুটো কোটর থেকে প্রায় বেড়িয়ে এসেছে। শরীরটা একবার কেঁপে উঠে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল। শেষ, সব শেষ, পৃথিবীর যাত্রা শেষ। সারহাদ কিছুক্ষণ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ক্লান্ত শরীরে ধীরে ধীরে উঠে এসে রক্তমাখা সোফাটায় বসে পড়ল। কৃষ্ণকালো চোখ জোড়া দুটো বন্ধ করে ফেলল। মানস্পটে ভেসে ওঠে চারপাশে শুধু মৃত্যু, রক্ত, প্রতিশোধ, আর লাশ। অথচ তার ভিতরটা আশ্চর্য রকম শূন্য। মনে হচ্ছে এতগুলো বছর ধরে যে আগুন তাকে জ্বালিয়ে রেখেছিল, সেই আগুন হঠাৎ নিভে গেছে। কিন্তু আগুন নিভে যাওয়ার পরেও ধোঁয়াটা থেকে গেছে বুকের মধ্যে। এভাবেই কিছুপল কেটে গেল। তারপর ধীরে ধীরে সেলের ভারী দরজাটা খুলে গেল। সারহাদ চোখ না খুলেই বুঝে ফেলল কেউ এসেছে আর কে আসতে পারে সেটাও জানে সে। সেই পায়ের শব্দটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার সামনে থামল। সারহাদ চোখ মেলে তাকায় নজরে আসে, সিতারা আদিল।
সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার মুখটা আজ ভীষণ ফ্যাকাশে, চোখ দুটো লাল। অথচ সে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে সারহাদের দিকে। সারহাদ একবার তার পাশ দিয়ে পড়ে থাকা লাশগুলোর দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে অদূরে পড়ে থাকা নিজের কালো হ্যাটটা তুলে ঝেড়ে মাথায় পরে নিল। একবার সিতারার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,
—”থ্যাংক ইউ”
ব্যাস ছোট্ট একটা শব্দ, এই বলে সে সামনে এগিয়ে যেতে নিলেই সিতারা হঠাৎ তার পথ আটকে দাঁড়ায়। সারহাদ থেমে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকায়। রমণীর চোখ তখন জলে টলমল করছে। সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
—”আপনার… আর কিছু বলার নেই?”
বিপরীতে সারহাদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধায়,
—”মিস আদিল… প্লিজ আমার কোম্পানিতে আসা বন্ধ করুন”
বাক্যটা শুনেই সিতারা তাজ্জব বনে গেল। সারহাদ জানল কীভাবে?
তারমানে সারহাদ তাকে লক্ষ করেছে। সারহাদ চোখ নামিয়ে ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসি ফুটিয়ে বলে,
—”আপনি হয়তো ভাবছেন আমি কিছুই বুঝি না। আই অলসো উইশ… আমার কারো চোখ পড়ার অভিজ্ঞতা না থাকত, তাহলে হয়তো আমার জীবনটা একটু সহজ হতো”
সিতারা নির্বাক হয়ে তার কথা শুনছে। সারহাদ ধীরে ধীরে আবার বলে,
—”আর আপনি এটাও ভাবছেন, আমি ভালো মানুষ”
বিপরীতে রমণী কিছু না বলে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। সারহাদের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হয়। সাথে চোখে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সে চারপাশের রক্তাক্ত দৃশ্যগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে,
—”আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি সেই ভার্সিটিতে পড়ুয়া চুপচাপ ছেলেটা আর নেই। এই রক্ত, এই প্রতিশোধ, এই খুন, এই অন্ধকার এগুলোই আমার নির্মম বাস্তবতা”
সিতারার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে। সারহাদ এবার নিচু স্বরে ফের আওড়ায়,
—”আর একটা সত্যি কি জানেন… যেটা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। সেই গিনির খুনটা আমি করেছিলাম”
বাক্যটুকু শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই সিতারা হতভম্ব হয়ে গেল। তার চোখ অধিক বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠে। সারহাদ ঠান্ডা গলায় আবার শুধালো,
—”ওর অপরাধটা জানেন? ওই বাস্টার্ডটা সানামকে ধাক্কা দিয়েছিল”
কথাটা বলতে গিয়েই সারহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। সাথে তার চোখে হঠাৎ উন্মাদনার ঝলক ফুটে উঠে। সে ধীরে ধীরে সিতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
—”একবার ভাবেন… ওর একটা ধাক্কায় আমি একটা জীবন নিয়ে নিতে পারি। তাহলে ওর একটা ‘হ্যাঁ’ আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে?”
বিপক্ষে কোন প্রকার শব্দ উচ্চারিত হলো না। সারহাদ এবার নিস্তেজ কণ্ঠে অনুরোধের সুরে আওড়ায়,
—”প্লিজ, মিস আদিল… আমার থেকে কিছুই এক্সপেক্ট করবেন না কখনো”
এই বলে সে তাকে পাশ কাটিয়ে সামনে হাঁটতে শুরু করল। সিতারা তখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে গড়গড় করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে আটকাতে চাওয়া সত্ত্বেও পারছে না। বুকের ভেতরটা কাঁচের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। তবুও… তবুও সে জানে, আজ যদি সারহাদ চলে যায়, তাহলে আর কোনোদিন ফিরে তাকাবে না আর না আসবে। সেই ভয়েই হঠাৎ সে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে পিছনে ফিরে চিৎকার করে উঠে,
—”আমি সবটা মেনে আপনার দিকে এগোলে আপনি কি আমাকে আগলে নিবেন?”
সারহাদের চলন্ত পা থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত সে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ওভারকোটটা সামনে আনতেই নজরে এলো, রিয়ানার কালো ডায়েরিটা। মুহূর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একজোড়া বিষণ্ন বাদামি চোখ। একটা মেয়ে…যে তাকে ভালোবেসে নিজের জীবনটাই পুড়িয়ে ফেলেছিল। সারহাদ চোখ বন্ধ করে মনে মনে ভাবে,
“না…সে আর কোনো রিয়ানা তৈরি করতে চায় না। সে আর কারো জীবন নিজের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে চায় না”
ধীরে ধীরে আবার সামনে হাঁটতে হাঁটতে তার কণ্ঠ নিস্তব্ধ করিডোরে প্রতিধ্বনিত হয়,
—”আমি এক নারীতে আসক্ত পুরুষ, মিস আদিল।
সে বহুদূরে হলেও
আমার নিঃশ্বাসে তরই বসতি,
সে অন্যের বাহুডোরে হলেও
আমার হৃদয় তারই বন্দিত্বে।
সে আমার হলেও আমার,
সে আমার না হলেও আমি তার”
এই বলে সে সামনে এগিয়ে চলে গেল। একবারও পিছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না। কি দরকার, যেখানে তার দ্বারা সম্ভব হবে না কিছু সেখানে কেন আয়ানের মতো আরেকটা মানুষ কে কষ্ট দেওয়া। রিয়ানাতো ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে দেখেছিল, কিন্তু কি হয়েছে শেষ পর্যন্ত?
সারহাদ চলে গেল, আর পিছনে, সিতারা আদিল ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে মেঝেতে। দু’হাতে মুখ চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। তার মনে হচ্ছে কেউ তার বুকের মাঝখানটা ছিঁড়ে নিয়েছে। সে প্রথমবার বুঝল, একতরফা ভালোবাসা শুধু মানুষকে অন্ধ করে না, ধীরে ধীরে ভিতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়।
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে যেন আরও অলৌকিক হয়ে উঠেছে “ব্ল্যাক ম্যানশন”। দূর থেকে তাকালে মনে হচ্ছিল অন্ধকার নগরীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো রাজপ্রাসাদ যার প্রতিটি কার্নিশে, প্রতিটি বারান্দায়, প্রতিটি ঝাড়বাতির আলোয় খুশির উচ্ছ্বাস চিকচিক করছে। পুরো ম্যানশন জুড়ে আজ এক অন্যরকম আবহ। কারণ আজ ব্ল্যাক ম্যানশনে সুখবর এসেছে,
“সানা মা হতে চলেছে”
এই একটি খবর যেন পুরো বাড়ির শিরায় শিরায় আলো জ্বেলে দিয়েছে। উপরে সানার রুমে তখন ছোটখাটো মেয়েদের আড্ডা বসেছে। ঈশানী, ইবেলিনা, সানিতা আর সানানচারজন মিলে বিশাল কিংসাইজ বেডের উপর গোল হয়ে বসে গল্প করছে। কেউ ফল কাটছে, কেউ জুস খাচ্ছে, কেউ আবার সানাকে নিয়ে একের পর এক উপদেশ দিচ্ছে। ইবেলিনা হেসে হেসে বলে,
—”দেখবে, এখন থেকে আরজে তোমাকে আট মাটিতেও নামতে দিবে না”
সানিতাও তার সাথে তাল মিলিয়ে আওড়ায়,
—”নামতে দিবে না মানে?
আমি তো শিওর, কাল থেকে উনি সানা সিসকে কোলে করেই ঘুরবে”
সবাই তাদের কথায় হেসে উঠে। সানা লজ্জায় মাথা নিচু করে বলে,
—”তোরা থামবি?
আর কালনাগিনী তুই বিয়ে কবে করবি, বিয়ের বয়স শেষ হওয়ার পর। কোথাও তোর এরকম প্ল্যান নেই তো, থাক এদের বুড়ো হয়ে যাওয়ার পর বিয়ে করবো। তাহলে শুন বুড়ো হয়ে গেলেও তোর বিয়েতে একটা লেগপিসও কম খাবো না কিন্তু'”
সানার কথা শুনে সবাই একযোগে হেসে ফেললো। এভাবেই চলতে থাকল রমণীদের আড্ডা। কিছুক্ষণ পর সবাই ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ঠিক তখনই দরজাটা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে আরজে। তার কোলে আধোঘুমে ঢুলতে থাকা আরভি। আরভি তার মমকে দেখার সাথে সাথে যেন মুহূর্তেই চাঙ্গা হয়ে উঠল। সে ঝট করে আরজের কোল থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে সানাকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে,
—”মমমমম”
সানা সাথে সাথে তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় চুমু খেল,
—”আমার সোনা ভীরটা…”
আরভি ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
—”তুমি জানো আমি তোমাকে কত মিস করেছি আজ? অনেক অনেক অনেক”
সানা আদুরে কণ্ঠে প্রতুত্তর করে,
—”আমিও তো আমার বাবুকে অনেক মিস করেছি”
—”রিয়েলি”
—”হুম, একদম সত্যি”
আরভি ছোট্ট হাতে আলতো করে সানার গাল ধরে বলে,
—”তাহলে তুমি আমাকে রেখে হসপিটালে গেলে কেন?”
—”কারণ তোমার ছোট্ট একটা পার্টনার আসবে, তাই”
এই কথা শুনতেই আরভির চোখ দুটো গোল হয়ে গেল। সে আচমকা উত্তেজিত হয়ে বলে,
—”ওহহহ হ্যাঁ মম, ড্যাড বলেছে আমার সিস্টার আসবে”
তারপর সে চারপাশে একপলক তাকিয়ে বলে,
—”কোথায় আমার সিস্টার?
এখনো আসেনি কেন?”
সানা চোখ বড় বড় করে একবার আরজের দিকে তাকায়। আরজে তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের হাতা ঠিক করতে ব্যস্ত, যেন পৃথিবীর কোনো কিছুই তার কানে যায়নি। সানা দাঁতে দাঁত চেপে শান্ত গলায় শুধালো,
—”সিস্টার আসবে সোনা, কিন্তু এখন না। আরো আট নয় মাস পর আসবে”
আরভির মুখ মুহূর্তেই গোমড়া হয়ে গেল,
—”নাহ, আমার এখনই লাগবে”
—”এখন আসবে না সোনা”
—”কেন?”
—”কারণ বেবি এখন ঘুমাচ্ছে”
আরভি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে কিছু একটা ভেবে বলে,
—”আমি তো পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাই, ও কেন আট নয় মাস ঘুমাবে?”
আরজে পিছনে দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। সানা কপালে হাত ঠেকাল, এখন এই সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলেকে কীভাবে বুঝাবে। তারপরও শান্ত স্বরে বলে,
—”কারণ সে খুব ছোট্ট”
কিন্তু বিপরীতে আরভি থামল না। সে জেদ করে বেডের উপর পা ঠুকতে শুরু করে,
—”না, আমি এখনই সিস্টার চাই, এখনই”
সানা এবার বিরক্ত হয়ে গেল ভীষণ। এই ছেলেকে সে বুঝাতে পারবে না। তাই একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে,
—”তুমি তোমার ড্যাডকে জিজ্ঞেস করো, কেন আসবে না”
ব্যাস। আরজে যেন এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলে,
—”রিশ, তুমি বরং তোমার মমকে জিজ্ঞেস করো উনি কেন তোমার ড্যাডকে ছয় বছর দূরে রেখে দিয়েছিল”
সানা সাথে সাথে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে তার দিকে। কিন্তু আরজে সে সব কিছুর তোয়াক্কা না করে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
—’না হলে তো এতদিনে তোমার তিন চারটা সিস্টার চলে আসতো আর……”
আরজে আর কিছু বলার আগেই কানে এলো সানার ঘর কাঁপানো চিৎকার,
—”রানভীর….”
সানা এমনভাবে গর্জে উঠল যে আরভি পর্যন্ত চমকে গেল। কিন্তু পর মুহূর্তে আরজে থামলেও আরভি থমে নেই। সে বরং উল্টো প্রশ্ন করে বসে,
–“বাট মম তো বলল, তুমি দূরে ছিল”
সানা একপলক আরজের দিকে কটমট করে তাকিয়ে পরমুহূর্তে ছেলের সামনে নিজের সাফাই গাইতে শুরু করে,
–“ভীর সোনা, ঐ একটা হলেই হলো’
—”কীভাবে?”
–“লিসেন, বিষয় টা এইরকম যে,
তোমার ড্যাড দূরে ছিল তাই আমি দূরে ছিলাম, আমি দূরে ছিলাম মানে তোমার ড্যাডও দূরে ছিল। দুজনে দূরে থাকার কারণেই দূরে ছিলাম। এবার বুঝতে পেরেছ। বল, কে দূরে ছিল তাহলে?”
এই বলে সানা আরভির দিকে তাকায়। এদিকে ছোট্ট আরভি সবটা কেমন গুলিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সে সব কিছু ছেড়ে আবারও বলে,
—আম টোটালি কনফিউজড, মম। কে দূরে ছিল?
বাট রাইট নাউ, আই নিড মাই সিস্টার”
ক্ষণিকে সানার মুখরা আবার ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আরজে সানার অবস্থা বুঝে সে আর বিরক্ত করল না। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে অত্যন্ত যত্ন করে আরভিকে কোলে তুলে নিল। আরজে খুব ভালো করেই জানে নিজের ছেলেকে কীভাবে বুঝাতে হয়। সে আরভি কে নিয়ে বেড়িয়ে গেল তার কক্ষের উদ্দেশ্য। পিছনে সানা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
রাত তখন ধীরে ধীরে গভীরতার দিকে ঢলে পড়ছে। ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল করিডোরজুড়ে আধো অন্ধকারের স্তর জমে আছে। দূরের দেওয়ালঘড়িটার টিকটিক শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। জানলার বাইরে চাঁদের আলো এসে কার্পেটের উপর রূপালি রেখা এঁকে দিয়েছে। সেই নরম আলোয় সানার শ্যামবর্ণ মুখটা আরও কোমল, আরও মায়াবী দেখাচ্ছে। আরভিকে ঘুম পাড়িয়ে রুমে ফিরতেই আরজে দরজার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে সেই মায়াবী আদল টার দিকে তাকিয়ে থাকল কিয়ৎকাল। এদিকে বেডের উপর বসে আছে সানা। দুই হাত বুকের সামনে গুটিয়ে রাখা। ঠোঁট ফুলে আছে একদম শিশুর মতো, চোখ দুটো রাগে টকটকে। আরজে দরজা বন্ধ করে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বলে,
—”ওহ, কে আবার আমার কিউট রেড চিলিটাকে রাগিয়ে দিয়েছে?”
সানা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে,
—”আমার সাথে কথা বলবেন না”
—”কেন? আমি আবার কি করলাম?”
—”আপনি ভীরের সামনে যা তা কথা বলেন কেন?”
–“ওকে ম্যাডাম, আর বলব না, সরি। নাউ হ্যাপি”
বিপরীতে রমণী আর বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারল না। সেও হেসে দিল। হঠাৎ আরজে নিচে নেমে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে আলতো করে তার উদরের উপর ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে,
—”ইউ নো ওয়াইফি… আই ক্যান্ট ওয়েট”
সানা তার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলে,
—”আপনি তো ভীরের থেকেও বেশি অধৈর্য হয়ে যাচ্ছেন”
—”অবশ্যই, আমি আমার প্রিন্সেস হার্টের জন্য ওয়েট করছি”
আরজে আরো কিছুক্ষণ কথা বলে তারপর দুজনে শুয়ে পড়ল। রুমের আলো নিভিয়ে শুধু বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। মৃদু হলদে আলোয় চারপাশটা নরম উষ্ণতায় ভরে আছে। সানা ধীরে ধীরে সরে এসে আরজের বুকের উপর মাথা রাখে।তার উন্মুক্ত বুকে আঙুল দিয়ে এলোমেলো আঁকিবুঁকি কাটতে লাগল। আর আরজে তার চুলে বিলি কেটে মৃদু স্বরে বলে,
—’ঘুমাও এবার”
—”ঘুম আসছে না”
—”কেন?”
—”এমনি”
—”মাথায় আবার কি ঘুরছে?”
সানা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে তার দিকে তাকায়। আরজেও চোখ নামিয়ে তার চোখের গভীরে তাকাল। কিছুক্ষণ এভাবেই নিঃশব্দে কেটে গেল। তারপর সানা খুব আস্তে প্রশ্ন ছুড়ে,
—”আচ্ছা মিস্টার জাওয়ান… আমি আপনার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?”
হঠাৎ সানার মুখে প্রশ্নটা শুনে আরজে যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে কোমল হয়ে এলো। সে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল রমণীর দিকে, যেন শব্দ খুঁজছে। অথচ শব্দগুলো তার কাছে এত ছোট লাগছিল যে কোনোটাই যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না।
শেষমেষ সে ধীরে ধীরে সানার মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে নিচু স্বরে আওড়ায়,
—”ভালোবাসা গোপনে সুন্দর, ওয়াইফি…”
সানা ভ্রু কুঁচকাল। উত্তর টা তাকে তুষ্ট করতে পারেনি তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে,
—”এইটা কোনো উত্তর হলো?”
—”হুম”
—”না, হয়নি”
রমণী রেগেমেগে সরে যেতে চাইল। কিন্তু আরজে শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরা হাত ছুটাতে ব্যর্থ হলো সে। তাই রুক্ষ স্বরে বলে,
—”ছাড়ুন আমাকে”
—”নো”
—”আমি রেগে যাচ্ছি”
—”ওকে”
—”অসভ্য লোক”
–“তোমারই তো”
সানা ঠাস করে সে আরজের বুকে একটা কিল বসিয়ে দিল। আরজে এবার হেসে ফেলল। রমণী সাথে সাথে একটা কামড়ও বসিয়ে দিল। আরজে কিছু বললো না বরং সানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল তাড়াতাড়ি নিদ্রা যাওয়ার জন্য। কিন্তু সানার তখনকার বলা প্রশ্ন টা এখনো তার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। সে মনে মনে কয়েকবার আওড়ায়, “গুরুত্ব” শব্দ টা। তারপর নিঃশব্দে ভাবল,
“গুরুত্বপূর্ণ? এই শব্দটা তোমার সামনে ভীষণ তুচ্ছ, মাই লাভ। গুরুত্বপূর্ণ তো মানুষ হয়, তাই তুমি আমার কাছে গুরুত্ব নও… তুমি আমার অস্তিত্ব। আই উইশ… তুমি যদি একবার আমার বুকের ভেতরটা দেখতে পারতে। দেখতে পারতে, কত গভীরে তুমি শিকড় গেড়ে বসে আছো। ঠিক যেন শতবর্ষী কোনো অন্ধকার বৃক্ষ, যার শিকড় আমার সমস্ত শিরা উপশিরা জড়িয়ে ধরে আমাকে ধীরে ধীরে তোমার দাস বানিয়ে ফেলেছে”
আরজে ধীরে তার খসখসে পুরুষালী হাতটা রমণীর নরম তুলতুলে গালে ছুঁইয়ে ফের আওড়ায়,
“তুমিহীনা আমার জীবন অমাবস্যার ন্যায়,
নিভে যাওয়া আকাশ, দিকহারা রাত, শ্বাসরুদ্ধ অন্ধকার। আর সেই অন্তহীন অমানিশার বুক চিরে এক ফোঁটা জ্যোৎস্নার জন্য আমি কতটা ব্যাকুল হয়ে পুড়ছি, তুমি যদি একবার অনুভব করতে। তুমি আমার শান্তি নও, ওয়াইফহ। তুমি আমার সবচেয়ে সুন্দর বিশৃঙ্খলা। তুমি সেই বিষ, যেটা ধীরে ধীরে আমার রক্তে মিশে আমাকে শেষ করে দিচ্ছে…অথচ আমি প্রতিদিন স্বেচ্ছায় সেই বিষ পান করি”
এই ভেবে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু এসব কিছুই মুখল বলল না। কারণ কিছু অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। করতে গেলেই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর সে খেয়াল করল সানার নিশ্বাস ধীরে ধীরে গভীর হয়ে এসেছে, মানে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। আরজের ঠোঁটে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। সে আলতো করে তাকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে বেডে শুইয়ে দিল। তারপর কমফোর্টারটা টেনে ভালো করে ঢেকে দিল। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে। এই মেয়েটাকে দেখলে তার ভেতরের সমস্ত ঝড় থেমে যায়। ধীরে ধীরে ঝুঁকে সানার ললাটে একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দিল সে। তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বলে,
—”তুমি কবে আমাকে আমার মতো করে ভালোবাসবে, ওয়াইফি?”
সানা ঘুমের মধ্যেই সামান্য নড়েচড়ে উঠল। আরজে মৃদু হেসে তার গাল ছুঁয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে কাবার্ড খুলে একটা কালো লেদার জ্যাকেট বের করে গায়ে জড়িয়ে নিল সাথে মাথায় কালো ক্যাপ চাপাল। মুখে মাস্ক পরে রুম থেকে বের হওয়ার আগে আবারও একবার ফিরে তাকাল সানার দিকে। চোখ দুটো মুহূর্তেই অদ্ভুত কোমল হয়ে এলো। সে নিচু স্বরে আওড়ায়,
—”আই হ্যাভ সামথিং টু ডু… বাট আই প্রমিস ইউ… তুমি ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমি ফিরে আসবো”
এরপর দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
আর অন্ধকার করিডোর গিলে নিল তাকে ধীরে ধীরে।
গুলশানের অভিজাত সীমান্ত ছুঁয়ে, বারিধারার নিভৃত উচ্চবিত্ত অঞ্চলের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল এক ফার্মহাউস,
“নূর-ই-সাফা এস্টেট”
দূর থেকে দেখলেই মনে হয়, আধুনিক রাজপ্রাসাদ। উঁচু কালো গেট, গেটজুড়ে ডিজিটাল সিকিউরিটি, চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া, আর তার ভেতরে সারি সারি বিদেশি পামগাছ। প্রায় মধ্য রাতের দিকে ফার্মহাউসের বিশাল গেটের সামনে এসে থামল পরপর দুটো সাদা গাড়ি। প্রথম গাড়ির দরজা খুলে নামলেন,
“মিসেস দিলরুবা খানম”
গাঢ় কালো শাড়ির উপর লম্বা কোট জড়ানো। তার চোখে তীক্ষ্ণতা, মুখে রাজকীয় কঠোরতা। তার পিছনেই নেমে এল তার ব্যক্তিগত অ্যাসিস্ট্যান্ট রায়ান। আর পিছনের গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে চারপাশ ঘিরে দাঁড়াল পাঁচ ছয়জন সশস্ত্র বডিগার্ড। দিলরুবা খানম দ্রুত পদক্ষেপে ভিতরে প্রবেশ করতেই থমকে গেলেন কেননা পুরো হলরুম অন্ধকার। একফোঁটা আলো পর্যন্ত নেই। তার ভ্রু কুঁচকে গেল, তিনি জোরে হাঁক ছুঁড়েন,
—”হ্যালো? কেউ আছো?”
তার কণ্ঠস্বর বিশাল হলরুমে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো কিন্তু বিপরীতে কোনো সাড়া নেই।তিনি এবার বিরক্ত হয়ে চিৎকার করলেন,
—”সার্ভেন্ট, রহমান, কেউ আছো?”
নাহ, এবারও কোন শব্দ নেই শুধুই নিস্তব্ধতা। রায়ান দ্রুত চারপাশে তাকায়, বডিগার্ডদের একজন এগিয়ে গিয়ে দেয়ালের সুইচবোর্ড চাপে। মুহূর্তেই ঝলমল করে জ্বলে উঠল পুরো হলরুম। আর আলো জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে সবার দৃষ্টি গিয়ে আটকাল সামনের বিশাল কালো সোফাটার দিকে। সেখানে বসে আছে এক ব্যক্তি। পুরো শরীর অন্ধকারে ডুবে ছিল বলে এতক্ষণ বোঝাই যায়নি। হঠাৎ তাকে দেখেই বডিগার্ডদের কয়েকজন চমকে পিছিয়ে গেল। দিলরুবা খানমও বুকের উপর হাত চাপড়ে একবার জোরে শ্বাস নিলেন,
—”ইয়া রাব্বা”
তারপর চোখ কুঁচকে তাকালেন সামনে। নজরে আসে কালো ওভারকোট জড়ানো সারহাদ কে, তার মাথায় কালো হ্যাট টানা। কিন্তু, তার সারা মুখ রক্তে ভেজা। গালের পাশ দিয়ে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত নেমে এসেছে গলা পর্যন্ত। হাতের আঙুলগুলোতেও লেগে আছে টাটকা লালচে দাগ। এমনকি তার জুতোর নিচেও জমাট বাঁধা রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। দৃশ্যটা এতটাই বিভৎস, যেন কোনো মানুষ নয়, রাতের অন্ধকার ছিঁড়ে উঠে আসা কোনো প্রতিশোধপিপাসু ছায়ামানব বসে আছে সেখানে। দিলরুবা খানম বিরক্ত গলায় বললেন,
—”এভাবে অন্ধকারে বসে ছিলে কেন? আরেকটু হলে তো সত্যিই আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত”
তিনি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে বিপরীত সোফায় বসলেন। তারপর আবার সারহাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—”এত রাতে তুমি এখানে কি করছো?”
বিপরীতে সারহাদ নিশ্চুপ। দিলরুবা খানম এবার চোখ সরু করে তার মুখের রক্তের দিকে তাকিয়ে বলেন,
—”আর এই রক্ত?”
তবুও কোনো উত্তর নেই। তিনি ঠোঁট বাঁকিয়ে ফের বললেন,
—”কাকে খু*ন করে এসেছো এবার?”
তারপর যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই সামান্য সামনে ঝুঁকে বলেন,
—”কোথাও তুমি ওই বাস্টার্ড দুটোকে মেরে ফেলোনি তো?
দেখো, আমি ওদের জন্য আলাদা প্ল্যান করে রেখেছি। কাল ওরা পালানোর চেষ্টা করবে। আর সেই পালানোর সময় আমি অ্যাটাক করবো। ওদের মৃত্যুটা আমি উপভোগ করতে চাই”
তিনি একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার বিপরীতে বসে থাকা মানবটা পাথরের মতো নিশ্চুপ। এমন নীরবতা ধীরে ধীরে বিরক্তিকর হয়ে উঠল দিলরুবা খানমের কাছে। তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন,
—”তুমি কিছু বলছো না কেন?”
ঠিক তখনই সারহাদ ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়। তার চোখদুটো অস্বাভাবিক স্থির। সে খুব ধীরে নিজের মাথার কালো হ্যাটটা খুলে সামনে কাঁচের টেবিলের উপর রাখল। তারপর ওভারকোটের ভিতর থেকে একটা বন্দুক বের করে টেবিলের উপর ঠক করে রাখল। বডিগার্ডরা সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হয়ে উঠে। রায়ান এক পা এগিয়ে এল। কিন্তু সারহাদ কারও দিকে তাকাল না। সে এবার ওভারকোটের পকেট থেকে ধীরে ধীরে বের করল একটা কালো ডাইরি। ডাইরিটার উপর রক্তের শুকনো ছোপ। কভার জুড়ে শুধু একটা লেখা,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (৫)
“মি আমর”
ডাইরিটা সে টেবিলের উপর রাখল। দিলরুবা খানমের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল। তার চোখে এক ঝলক অস্বস্তি খেলে গেল। ঠিক তখনই সারহাদ ধীরে ধীরে বন্দুকটা আবার হাতে তুলে নিল। তারপর ঠান্ডা, ভয়ংকর স্থির চোখে সরাসরি দিলরুবা খানমের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
—”রিয়ানাকে কেন খুন করেছেন?”
