৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪
রুপান্জলি
২৯/০২/২০১৯
,,,,ক্লাস শেষ হতেই বাহিরে বেড়িয়ে এলো পারমিতা, তার সাথে একজন মেয়েও যুক্ত হয়েছে। মেয়েটির নাম মেধা। ক্লাস চলাকালীন সময়ে কথা বার্তা হতে হতে দুজনের মাঝে একটা বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বাহিরে রোদ্রের তাপ প্রখর। প্রচন্ড গরেমে হাত পায়ের ব্রক্ষ তালু পর্যন্ত জ্বলে উঠছে। এই মুহুর্তে ঠান্ডা পানিতে হাত মুখ ধুতে পারলে বেশ ভালো লাগতো। অগত্যা মেধাকে নিয়ে কমন রুমে চলে গেলো, সেখানেই মেয়েদের ওয়াসরুম রয়েছে। তবে সেখানে গিয়ে ইচ্ছানুরূপ কিছুই পেলোনা। প্রখর রোদের তাপ মাত্রায় ট্যাংকের পানি গরম হয়ে রয়েছে। এই গরম পানিতে হাত মুখ ধোয়ার চেয়ে না ধোয়াই বেটার। পারমিতা মেধার হাত ধরে মিনমিনে স্বরে বললো–
,,,,, মেধা!! এখানে কোনো টিউবওয়েল নেই? আমার হাত পায়ের তালু খুব জ্বলছে, অনেকটা অস্বস্তি হচ্ছে। হাত মুখ ধুতে পারলে ভালো লাগতো।
,,,মেধা বললো– আছে, তবে ক্যাম্পাসের একদম শেষের দিকে, চলো তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।
,,,পারমিতা মাথা ঝাকিয়ে মেধার সাথে পা বাড়ালো। সে খুব ইন্টোভার্ট আর বোকাসোকা ধরনের মেয়ে চাইলেও হুট হাট কারোর সাথে মানিয়ে নিতে পারেনা। তবে মেধা মেয়েটা খুব ভালো, সে এখানকার স্থানীয়। তাই ভার্সিটির আনাচে কানাচের সবটাই চিনে। হাটতে হাটতে ওরা যখন টিউবওয়েল পাড়ে পৌছালো, তখন সেখানে গতকালের সেই সিনিয়রদের দেখে পারমিতার পা দুটো থমকে গেলো। সবকয়টা না থাকলেও গতকালের দুজন ছেলে আছে, আর তাদের সাথে সেই দ্বীপ জোহান মির্জা। দ্বীপকে দেখেই পারমিতার ভয়ে হাত পায়ের কাপন ধরা শুরু হয়ে গেলো, গতকাল কিনা এই লোকের থেকে সে সি*গারেট চেয়ে আনলো? বাপরে!! পারমিতা গতকাল ক্লাসে যাবার পর সবাই ওর দিকে একপ্রকার ঝাপিয়ে পরেছিলো। দ্বীপ মির্জার সাথে তার কি কথা হয়েছিলো, বলার সাথে সাথেই কেনো সিগারেট দিয়ে দিলো? এসব নানান ধরনের প্রশ্ন খুলে বসেছিলো তার সামনে। শেষে এই মেধাই তো তাকে সবার হাত থেকে বাচালো। ক্লাস মেইটদের থেকে যতটুকু জানতে পেরেছে তার দরুন বলা যায়,, দ্বীপ জোহান মির্জা হচ্ছেন ডাকসুর বিপি, তার উপর শহরের নাম করা বিজনেসম্যান মাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে। উনার মেজো চাচ্চু শাহিন মির্জা হচ্ছেন অর্থ মন্ত্রী, ছোট চাচা মাহিন মির্জা এখানকার এমপি, রমনার রাজনীতি তো ওদের হাতেই বন্ধি। সাথে ক্ষমতা ক্ষমতা খেলা নাকি ওনাদের বাম হাতের খেলা। বাপ চাচা এবং তাদের ছেলেরা দিন দুপুরেই মানুষ খুন টুন করে ফেলে। এখন যদি সিগারেট চাওয়ার অপরাধে তাকেও খুন টুন করে বসে? তখন তার বাবা মায়ের কি হবে? সেসব ভয় ডর থেকেই মেধার হাত শক্ত করে টেনে ধরলো। পিছনের দিকে টেনে নিতে নিতে তারাহুরো করে বললো,,,
,,,চলো মেধা!! আমরা পরে আসবো, চলো প্লিজ!!
,,, মেধা পারমিতাকে আটকাতে চেয়ে বললো — আরে, আরে, কি হয়েছে? চলে যাচ্ছো কেনো? দ্বীপ ভাইয়াকে ভয় পাচ্ছো? আল্লাহ!! এই মেয়ে এসব কি করে? পারু এই পারু, পারু!!
,,,পরিচিত কন্ঠে নিজের নাম শুনে ফিরে তাকালো দ্বীপ। প্রচন্ড গরমে ঘেমে নেয়ে সেও হাত মুখ ধুতে এসেছিলো, এতোক্ষন প্লান মাফিক তাই করছিলো। হঠাৎ নিজের নাম শুনে তাকাতেই গতকালের সেই মেয়ে আর মেধাকে দেখতে পেলো। কি মনে করে যেনো একপ্রকার গম্ভীর কন্ঠেই ডাকলো — এই মেয়েরা দাড়াও।
,,,,থমকে দাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো পারমিতা, সাথে মেধাও দাড়িয়ে পরলো। মেধা মাথা ঘুরিয়ে টিউবওয়েল পারের দিকে তাকিয়ে, পারমিতার হাত টেনে ওকেও টিউবওয়েল এর দিকে তাকাতে ইশারা করলো। পারমিতা ভদ্র মেয়ের মতো পিছন ফিরে তাকাতেই দ্বীপের সাথে চোখাচোখি হলো। আবারো সেই চোখ, দ্বীপের চোখ জোড়া এতো সুন্দর কেনো বুঝে পায়না মেয়েটা। এমন কঠোর মানবের চোখ এতো সুন্দর হতে হয় বুঝি? গতকাল শুধু চোখ দেখলেও আজ পুরো দ্বীপটাকেই পর্যবেক্ষণ করলো পারমিতা। লোকটা বেশ লম্বা আনুমানিক ৫ ফিট ১১ কিংবা ৬ ফিট হবেই, গায়ের রং একদম দুধ সাদা, নাকটা চোকালো এবং খারা , জু- লাইন যুক্ত গালে খোচা খোচা চাপ দাড়ি, চুল গুলো ঘার ছুই ছুই, সবগুলো চুল বোধয় এক নিয়মে কাটা যার ফলে সব চুল গুলো আকাবাকা হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সদ্য মুখ ধোয়ার দ্বরুন কয়েকটা চুল কপালে লেপ্টে রয়েছে। সাথে পানি ঝাপ্টা দেওয়ার কারনে, কিছু কিছু পানি চুলের উপরিভাগ এবং গলার কাছটায় জমা হয়ে রয়েছে। যা সূর্যের আলোয় ছোট ছোট মুক্তর ন্যায় জ্বল জ্বল করছে। পারমিতা যখন দ্বীপের সর্বত্র পরখ করতে ব্যাস্ত তখন দ্বীপ কিছুটা কর্কশ স্বরেই বললো —
,,,এই মেয়ে,, এসে আবার ফিরে যাচ্ছিলে কেনো? ক্লাস তো শেষ, এদিকে ঘুর ঘুর করার কারন কী? শুনি।
,,,পারমিতা কিছুটা কেপে উঠলো তবে বারবার এই মেয়ে বলাটা তার পছন্দ হচ্ছেনা। তার কি কোনো নাম নেই? বড়ো চাচ্চু কতো শখ করে তার নাম রেখেছে, আর উনি কিনা তাকে সেই নাম না ডেকে এই মেয়ে এই মেয়ে বলে বেড়ান? এরকম ভাবনা ভেবেই মনে মনে নিজেকে কষে চর বসালো পারমিতা। তার নাম যে পারু এটা তো দ্বীপ জানেনা, শুধু তার সাথের দুটো ছেলে জানে। তাহলে উনি তার নাম ধরে ডাকবে কি করে? পারমিতাকে চুপ থাকতে দেখে দ্বীপ এবার ধমকে বললো — কি ব্যাপার!! কানে সমস্যা আছে নাকি? যখনি কিছু বলি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকো কেনো?
,,,,পারমিতা আবারো কেপে উঠে মেধার হাত শক্ত করে ধরলো। মেধা তারাহুরো করে বললো — আসলে ভাইয়া!! পারুর হাত পা জ্বলছিলো তাই আমরা টিউবওয়েলের পানিতে হাত মুখ ধুতে এসেছি।
,,,বিহান মুখে হাসি ফুটিয়ে মেধার দিকে ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো — তাহলে চলে যাচ্ছিলো কেনো তোমার বান্ধবী?
ফাহাদ বললো— আসো তেলবতী তোমার মাথায় তেল, থুক্কু চোখে মুখে পানি দিয়ে দেই।
,,,বিহান চোখ পাকিয়ে ফাহাদের দিকে তাকাতেই ব্যাচারার মুখটা চুপসে গেলো। বিহান আবারও ওদের উদ্দেশ্যে বললো — কি হলো আসো, মেধা তুমিও আসো হাত মুখ ধুয়ে নাও। আজকে গরম টা একটু বেশি ই তীব্র। এই দ্বীপ!! তুই একটু সর, আমি ওদের টিউবওয়েল চেপে দিচ্ছি।
,,,দ্বীপ বাকা নজরে পারমিতার দিকে তাকিয়ে বললো — আমি আছি, ওদেরকে আসতে বল।
,,,কথাটা বিহানকে বললেও চোখ ছিলো পারমিতার উপর, যেনো ইনডিরেক্টলি তাকেই বলেছে,, বেশি কথা না বাড়িয়ে এখানে আসো নয়তো ডিরেক্ট খুন। দ্বীপের এই শান্ত দৃষ্টিতেই কাজ হলো বোধয়। পারমিতা ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গেলো, মেধাও গেলো তার পিছু পিছু। দুজন কাছে যেতেই দ্বীপ টিউবওয়েল চাপতে লাগলো, তা দেখে পারু মিনমিন করে বললো–
,,,ভাইয়া আপনি সরুন, আমি পারবো।
,,, দ্বীপ এক ভ্রু উচিয়ে কর্কষ শব্দে বললো — আমি তোমার জন্য নয় আমার বোনের জন্য দিচ্ছি। মেধা!! যা করার তারাতাড়ি করে এখান থেকে ভাগ।
,,,এই কথাটাও পারমিতার দিকে তাকিয়েই বলেছে। সে মনে মনে ঠোঁট উল্টালো, সব কথা ওর দিকেই তাকিয়ে বলে কেনো এই লোক? সে আর কথা বাড়ালোনা। চুপচাপ হাত মুখ ধুতে থাকলো। এদিকে দ্বীপের কার্যক্রম দেখে ফাহাদ বিহানের কাধে ঢলে পরে বললো– ভাই!! আমি যা দেখছি তুই ও কি তাই দেখিস? ডাকসুর বিপি কিনা একটা গ্রামের তেলবতীর জন্য টিউবওয়েল চাপছে? একটু আমাকে ধর, আমি কিছুক্ষণের মাঝে হার্ট অ্যাটাক করতে যাচ্ছি।
,,,,,ফাহাদ কথাটা একটু জোরেই বলেছে যার ফলে কথাটা সকলেই শুনতে পেয়েছে। এটুকু কথা কেনো যেনো পারমিতার মনটা খারাপ করে দিলো, আচ্ছা!! মাথায় তেল দেওয়া কি খারাপ জিনিস? নাকি গ্রামে বাড়ি হওয়াটা অপমানের? সে তো নিজেকে এবং নিজের গ্রামকে নিয়ে বড্ড গর্ভ করে। তার খুব করে প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করছিলো বাট এদের সাথে লাগতে গেলে পরে দেখা যাবে তাকেই ভার্সিটি থেকে বের করে দিবে। হাত মুখ ধুয়ে উড়নার আচলে মুখ মুছতে মুছতে কল পাড় থেকে নেমে অনেকটা দূরে গিয়ে মেধার জন্য দাড়িয়ে রইলো পারমিতা। মেধা মুখ হাত ধুয়ে পারমিতার কাছে পৌছাতেই পারুর মুখ দেখে চরম বিস্মিত হলো। মেধা পরুর মুখে হাত ছুইয়ে বললো — এই পারু!! তুমি কি তোমার মুখেও তেল মাখো?
,,,হে!! কেনো? আমি তো ছোট থেকেই হাতে, পায়ে, মুখে তেল ইউজ করি।
( এটুকু পড়ে অর্পনা সশ্বব্দে হেসে বললো– হায়রে তেলোবতীরে, তর জন্যই আজ তেলের এতো চাহিদা )
,,,মেধা মুখ টিপে হেসে বললো — তো!! কোন তেল ইউজ করো মুখে?
,,,সরিষার তেল, আমাদের ক্ষেত থেকে উৎপাদিত খাটি সরিষার তেল।
,,,ওহ!! ভালো ভালো, তোমাদের বুঝি তেলের কারখানা আছে?
,,,না না!! আমাদের কিছু জমি আছে, সেখানে শীতকালে সরিষা চাষ করা হয়। তারপর সেগুলো পাকলে রোদে শুকিয়ে বাজার থেকে ভাঙ্গিয়ে আনলেই তো তেল হয়ে যায়।
,,,ওহ জানতামনা, তবে আমাদের ও তেলের কারখানা আছে। কিন্তু কখনো যাওয়া হয়নি বলে কিভাবে তৈরি করা হয় আমি জানিনা।
,,,ওহ!! তাই? তোমরা তাহলে দেখছি খুব ধনি।
,,, হুম কিছুটা। ঐযে দ্বীপ ভাইয়াকে দেখলেনা? ওটা আমার বড়ো ভাইয়া, মানে আমার বড়ো আব্বুর একমাত্র ছেলে।
,,,পারমিতা অবাক হয়ে মেধার দিকে তাকালো পরপর একবার পিছন ফিরে দ্বীপের দিকে , দ্বীপ এতোক্ষণ ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিলো যার ফলে আবারো দুজনের চোখাচোখি হলো। চোখাচোখি হতেই পারমিতা চোখ সরিয়ে মেধার দিকে তাকিয়ে বললো— এজন্যই উনি তোমাকে বোন বলেছিলেন?
,,, মেধা শায় জানিয়ে বললো — হে!!
,,, পারমিতা মাথা ধুলিয়ে বললো –ওহ বুঝলাম।
১ / ০৩/২০১৯
,,,হোস্টেলের তৃতীয় তলায় জানালার পাশের রুমটা পারমিতার। এসে থেকে এই জিনিসটা পারুর খুব পছন্দ হয়েছে। তাদের বাড়িতে তো টিনের ঘর, সেখানে তার রুমে একটা বড়ো জানালা করে দিয়েছেন আব্বু। সে প্রতিদিন সেই জানালায় দাড়িয়ে স্নিগ্ধ চাদের আলো গায়ে মাখতো। এখনো তাই করতে মন চাচ্ছে, যদিও মেঘের আড়ালে চাদ ঢাকা পরেছে তবুও রাতের কিছুটা স্নিগ্ধতা গ্রহন করার প্রবল আকাঙ্খা জাগলো তার মনে। পারমিতা পড়ার টেবিল থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাড়ালো, পরপর জানালার একটা ফটক খুলে বাহিরে উকি দিতেই লেম্প পোস্টের আলোতে ঢাকার রাস্তায় নজর বুলাতেই হঠাৎ একটা জায়গায় নজর আটকালো। কিছুটা দূরে দ্বীপ এবং দুটো ছেলে দাড়িয়ে, সেখানে লেমপোস্টের আলো পুরোপুরি পৌছায়না। হালকা হালকা আলোয় সি*গারেটের আগুনটা জ্বল জ্বল করছে। এখনো ঐ লোকের হাতে সিগারেট? আচ্ছা!! এই লোকের কি সিগারেট খাওয়া ব্যাতিত আর কোনো কাজ নেই? আজব!! নিজের শরীরের কথা ভেবে হলেও তো সি*গারেট কম কম করে খাওয়া উচিৎ। পারমিতা অকারনেই দ্বীপের দিকে তাকিয়ে রইলো, সে মুলত দেখতে চায় এই লোক ঠিক কতোটা সময় নিয়ে সিগারেট খেতে পারে। তার এমন মনোভাব হওয়ার কারন সে নিজেও জানেনা। তবুও এই খারাপ পুরুষ টার প্রতি তার খুব আগ্রহ হচ্ছে, লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার সাধ জাগছে মনপুটে। এভাবে দেখতে দেখতে দ্বীপের হাতের সি*গারেট ফুরিয়ে এলো। পরপর আরেকটা ধরালো, পারমিতা এখনো ডেবডেব করে তাকিয়ে আছে। ওকে এভাবে জানালার ধারে দাড়িয়ে থাকতে দেখে রুমের সবচেয়ে কর্কষ ধ্বনির মেয়েটা ধমকের স্বরে বললো-
,,, এভাবে জানালার ধারে দাড়িয়ে আছো কেনো? কিছু হয়েছে?
,,,পারমিতা তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বললো– না আপু!!! এমনি, ভালো লাগছে তাই দাড়িয়ে আছি।
,,,মেয়েটা আর কিছুই বললোনা, রাতের খাবার খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, তাই ওকে খাবার খাওয়ার কথা বলে নিজের প্লেট নিয়ে নিচে চলে গেলো। পারমিতা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো রুমে কেউ নেই। সে সহ তারা রুম মেইট তিনজন। আপাততঃ বাকি দুজনের মধ্যে দুজনি খাবার খেতে নিচে গিয়েছে। এটাই তবে মোক্ষম সুযোগ , এখন যেহেতু কেউ নেই তখন ঐ দ্বীপ জোহান মির্জাকে কিছু একটা বলা উচিৎ। কি বলবে সেটা মনে মনে ঠিক করে, বলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো। শরীরের যত শক্তি আছে তার সবটুকু কন্ঠে ঢেলে উচ্চ স্বরে বললো —
,,,সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, কারন এটা খেলে ক্যান্সার হয়।
,,,বলেই দৌড়ে সেখান থেকে পালালো, আপাতত সে এই রুমের ত্রিসিমানায় ও থাকবেনা। যদি আবার সেই লোক তাকে কোনো না কোনো ভাবে দেখে একেবারে খুন টুন করে দেয়? সে তো এইটুকু বয়সে কিছুতেই মরতে চায়না। এখনো জীবনে কতোকিছু দেখা বাকি, সেসব না দেখেই মরে গেলে চলবে?
,,,আকষ্মিক কোনো মেইলি স্বরে চিরো পরিচিত জ্ঞান শুনে ভ্রু কুচকে এলো দ্বীপের, সে তার নজর সোজা হোস্টেলের তৃতীয় তলার জানালায় তাক করলো। আপাতত সেখানে কেউ নেই,, তবুও সে ঐদিকেই তাকিয়ে রইলো। তার সাথে থাকা বিহান আর আহাদ ও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলে সেদিকেই। আহাদ ঠোটের কোনে কিছুটা হাসি চাপিয়ে বললো — ল্যে ঠেলা!! এবার মেয়ে মানুষ ও তকে নাক ছিটকাচ্ছে। এবার অন্তত এসব খাওয়া বাদ দে ভাই, নয়তো দেখবি বিয়ের জন্য কপালে ভালো মেয়েই জুটবেনা।
,,,বিহান ও সহমত পোষন করে বললো — একেবারে না ছাড়, খাওয়াটা একটু কমিয়ে দে ভাই। এগুলো খাওয়া সত্যি ই অস্বাস্থ্যকর।
,,,দ্বীপ এখনো ঠোঁট কামরে পারুর জানালার পানেই তাকিয়ে আছে, হয়তো কে কথাটা বলেছে তাকে দেখার অপেক্ষা করছে। বিহান আর আহাদের কথা শুনে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো দ্বীপ, সেই ধূসর রঙা বিড়াল চোখে দুজনের দিকে একবার একবার ঘুড়িয়ে আবারও সেই জানালায় তাকিয়ে বললো — সি*গারেটের আগে আমি আমার বাবা মাকেও স্থান দেইনা, সেখানে মেয়ে মানুষ তো ইচরে পোকা।
( এটুকু পড়ে অর্পনা মুখ বাকালো বিরবির করে বললো– বিড়াল চোখা স্মোকার!! আই ডন্ট লাইক ইট )
,,,,, খাওয়া দাওয়া শেষ করে রুমে ঢুকলো পারু, আপাতত সে জানালার আশপাশ ও ঘেষবেনা। সে আসার আগেই রুমে একজন রুম মেইট এসেছিলো, তার নাম সিমি। পারুর আর সে সেইম বেচ তবে অন্য ডিপার্টমেন্ট। নিজেকে বাচাতে পারু সেই মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো–
,,,,সিমি!! আমার এখানকার জানালাটা একটু লাগিয়ে দিবে? প্লিজ প্লিজ!!
,,, সিমি মাথা ঝাকিয়ে বললো — তা দিচ্ছি ঠিকি,, কিন্তু তুমিও তো দিতে পারতে। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে খুব ভয়ে আছো। এতো ভয় পাচ্ছো কেনো? তুমি কি ভুতে ভয় পাও?
,,, সিমির কথায় এবার একটা ভালো মতো অজুহাত পেলো সে, দ্রুত মাথা ঝাকিয়ে বললো — হ্যা!! খুব ভয় পাই। তাইতো ঝানালা লাগানোর সাহস পাচ্ছিনা, যদি ওপাশ থেকে কেউ হাত টেনে ধরে? প্লিজ একটু লাগিয়ে দাও।
,,,পারুর বাচ্চামু কথায় সশ্বব্দে হাসলো সিমি। এগিয়ে গিয়ে ঝানালা আটকে দিয়ে পারমিতার বেডে পা ভাজ করে বসলো। পরপর পারমিতার দিকে তাকিয়ে বললো — এতো ভয় পেওনা মেয়ে, তোমার ভুত জামাই আর তোমার হাত টেনে ধরতে পারবেনা। আসো এখানে আসো, আমরা একটু ভালো করে পরিচিত হই।
,,,পারমিতা মুচকি হেসে সিমির পাশে বসলো। সিমি এক গাল হেসে পারমিতার গাল টেনে বললো — তুমি খুব চুপচাপ, তবে আমি অতো চুপচাপ থাকতে পারিনা। বুঝলে পারু!! এইখানে আমরা সকলেই বাবা মাকে ফেলে একা একা জীবন কাটাই। সুতরাং আমাদের শেষ ভরসা হচ্ছে রুম মেইট। একটা সময় দেখবে আমি আর তুমি এতোটাই ফ্রী হয়ে যাবো যে, আমাদের বন্ডিঙের কাছে পরিবার ও ফেইল করবে।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩
,,,বলেই আবারও হাসলো মেয়েটা, ওর সাথে সাথে পারু ও হাসলো। সত্যি বলতে, কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে রুম মেইটগুলোই আমাদের পরিবারের জায়গা দখল করে নেয়। নয়তো বছরের পর বছর বাবা মাকে ছেড়ে শত শত স্টুডেন্ট নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারতোনা। সুতরাং, আমাদের সফলতার পিছনে পরিবারের সাথে সাথে অনেক আউট সাইডার থাকে। তাদের মধ্যে রুম মেইটরা একজন,, যারা আমাদের কেউ না হয়েও অনেক কিছু।
