Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (২)
রুপান্জলি

আকাশটা মেঘলা হলেও কক্সবাজারের বাতাস বেশ গরম, চারদিক হতে আসা তপ্ত এবং ভীত নিশ্বাস গুলো জায়গাটাকে আরও ভারি করে তুলছে। ক্ষনে ক্ষনে এমন অনুভত হচ্চে যে,, যখন তখন বিশাল বিষ্ফোরনে পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ছাদের ঠিক মাঝ বরাবর পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে দ্বীপ,, গভীর মনোযোগে সামনে দাড়ানো গার্ডদের পর্যবেক্ষণ করছে। আর গার্ডরা ভীতু নজরে তার দিকেই তাকিয়ে, হাত পায়ে কাঁপন,, নিশ্বাসটা নিতেও ভয় পাচ্ছে। দ্বীপ নামক চ্যাপটারটা কিছুটা অন্যরকম,, এই চ্যাপটারে থাকা প্রতিটি ব্যাক্তি খুব দামি হয়। সেটা ঘরের বউ হোক কিংবা দেহ রক্ষা করার কর্মচারী। সবাইকেই আলাদা একটা রুল্স রেগুলেশনের মাঝে রাখা হয়। দ্বীপ বেইমানি জিনসটা সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে। এই বেইমানির ক্ষেত্রে তার কাছে সবাই সমান। তাই জীবনে কাউকে প্রবেশ করানোর আগে গোটা করে ডকুমেন্ট তৈরি করে নেয়। যেই ডকুমেন্টের প্রধান শর্ত হলো কোনো মতেই বেইমানি করা যাবেনা। আর যদি কেউ বেইমানি করে তাহলে তার শাস্তি হবে নিজের হাতে নিজের মৃত্যুর পরোয়ানা তৈরি করা। তারপর সসম্মানে নিজের মাথায় নিজ হাতে স্যুট করা।

দ্বীপ কখনোই মসা মেরে হাত লাল করা পছন্দ করেনা,, তাই নিকৃষ্ট কাজগুলো নিকৃষ্ট ব্যাক্তি দ্বারাই করানো অত্যাধিক প্রেফার করে। বিহান দ্বীপের দিকে দুটো ফোন এগিয়ে দিলো,, অর্পনার লাস্ট লোকেশন বের করার পর বালির উপরে অর্পনা আর ইরার ফোন দুটো পাওয়া গিয়েছে। দ্বীপ ভালো মতোই জানে অর্পনাকে কে কিডন্যাপ করেছে,, এখন জানতে হবে ওরা ঠিক কোথায় আছে। তবে সেসব জানার আগে কিছু নিয়ম মাফিক কাজ সারতে হবে। দ্বীপ ফোন গুলো ঘুরিয়ে পেচিয়ে দেখে বললো — আদ্রিয়ান লাস্ট দুমাসে কার সাথে কতোটা কথা বলেছে সব ডিটেল চাই আমার। ওর একার পক্ষে এতো বড়ো কাজ করার সাহস হবে না, নিশ্চই কেউ ওকে সেল্টার দিচ্ছে।
,, বিহান শায় জানিয়ে যেতে নিলে আবারও পিছন থেকে ডাকলো দ্বীপ,, বিহান ফিরে তাকাতেই সে শক্ত কন্ঠে বললো– নেক্সট সেহরিটা আমি ভেলোরার সাথে করতে চাই,, চাই মানে চাই। যদি না হয় তাহলে তর বউয়ের জন্য থান কিনে রাখ,, আর বাচ্চার আশাও ছেড়ে দে।

,,, দ্বীপের মুখে এরুপ কথা শুনে বিহানের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। দ্বীপ যা বলে তাই করে,, এর মানে কি? ওকে ওপেন থ্রেট দিলো? সে কি অর্পনার জন্য নিজের পরিবার ধ্বংস করতেও দুবার ভাববে না? মনে মনে আঘাত পেলেও দ্বীপের কথায় শায় জানিয়ে প্রস্থান নিলো বিহান। ইতিমধ্যে অর্পনার খোজে আকাশে ১৫৪ টা ড্রোন ছাড়া হয়েছে,, প্রতিটি ড্রোনের সাইজ ২ মি.মি। এগুলো মসার থেকেও ছোট তবে আকৃতি মসার মতো। ড্রোন গুলোর কন্ট্রোলে আছে ২০০ + দক্ষ ইনভেস্টিকেটর। আগে অর্পনার এক্সেক্ট লোকেশন বের করতে হবে,, বাকিটা স্রিফান আর তার দলবল বুঝে নিবে। বিহান চলে যেতেই দ্বীপ পকেটে হাত গুজে খুবি শান্ত ভঙ্গিতে ৮ ইঞ্চি সাইজের একটি ননলাইসেন্স সাউন্ডপ্রুভ গান বের করলো। সেটা দিয়ে সদ্য ট্রিম করা দাড়িতে আলতো করে ঘর্ষন করার সাথে সাথে মনে পরে গেলো অর্পনা ধারালো নখের কথা। অর্পনা প্রায়সই নোখ দিয়ে তার দাড়িতে নোখ বুলায়,, দ্বীপের শান্ত চোখ জোড়ায় লাভার বিস্তর ঘটলো,, শরীরের প্রতিটি শিরায় শিরায় আগুনের ফুলকি বইছে। সে সারি সারি হয়ে দাড়িয়ে থাকা ৩৮ জন গার্ডদের উদ্দেশ্যে নিরব বানী ছুড়লো —

,,, আমার হিসেবের খাতাটা বরই অদ্ভুত,, এটাতে যা লিখা হয়ে যায়,, সেটা বেদ বাক্যের ন্যায় জ্বলজ্বল করে। আমার সাথে বেইমানি করা উচিৎ হয়নি।
,,, দ্বীপের ভয়াঙ্কর দৃষ্টিতে সকলেই থরথর করে কাপছে, তারা দ্বীপের কেনা চাকর। জীবন বিক্রি করে এই পেশায় নিয়োজিত হয়েছে,, যুক্ত হওয়ার আগে গোটা করে স্টেটম্যান্ট দিয়েছে কখনো বেইমানি করলে নিজেই নিজের প্রান দিবে, তারপরেও কয়েকজন মোটা অঙ্কের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। তারা জানে তারা মরবে,, তারপরেও কোনো না কোনো সার্থে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। একজন গার্ড চারটি ফাইল নিয়ে হাজির হয়েছে,, ফাইলগুলো ডকুমেন্ট রাইটারের হাতে দিতেই ৩৮ জন গার্ডের মধ্যে থেকে চারজন হাটু গেড়ে নিচে বসে পরলো,, সাথে সাথে তাদের দিকে বন্দুক তাক করলো বাকি গার্ডরা।দ্বীপ সেদিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসলো। গম্ভীর মুখে এই হাসিটা বড্ড মানায় যেনো হাসিটার উৎপত্তি হয়েছে দ্বীপ মির্জার ঠোট দখল করার উদ্দশ্যে। দ্বীপ গান উচিয়ে গার্ডদের সরে যাওয়ার জন্য ইশারা করতেই সবাই সরে গেলো। এতোক্ষণ সারিবেধে দাড়িয়ে থাকলেও চারজনকে স্পেস দিয়ে তারা ছাদের রেলিঙের কাছে দাড়ালো। ডকুমেন্ট রাইনার নতুন চারটে দলিল রেডি করেছে,, সেখানে স্পষ্ট করে লিখা “” আমি আমার মালিকের সাথে বেইমানি করেছি যার ফল স্বরুপ নিজ হাতে নিজের আত্মহতি দিচ্ছি””
তার নিচে বড়ো করে লিখে ” অপরাধীর সাক্ষর”

,,, ডকুমেন্ট রাইটার দলিল চারটে এগিয়ে দিতেই দ্বীপ গার্ডদের ইশারা করলো। চারজন গার্ড দ্রুততার সাথে এগিয়ে এসে দলিল চারটে নিয়ে হাটু গেড়ে বসে থাকা গার্ডদের সামনে এগিয়ে দিলো। চারজন অজোরে কান্না করছে,, দ্বীপ মির্জার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কোনো স্কোপ নেই কারন দ্বীপ মির্জা তাদের লা*শ দেখার অপেক্ষায়। চারজন সেই দলিলে সাইন করে নিজেদের হাতে থাকা গান মাথায় ঠেকালো,, দ্বীপ তার গান দিয়ে ইশারা করতেই পরপর চারটে গুলির শব্দ হলো। কাতরাতে কাতরাতে ছাদের মেঝেতে লুটিয়ে পরলো চারটি রক্তাক্ত দেহ। অনেকটা সময় নিয়ে গলা কাটা মুরগীর ন্যায় ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরলো চারটি প্রান। দ্বীপ মনোযোগ দিয়ে দেখলো সেই দৃশ্য, তার চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে এই দৃশ্যে সে ভিষন তৃপ্তি পেয়েছে। দ্বীপ উঠে দাড়ালো, তার মেজাজ খুব চড়ে আছে,, মারাত্মক রকমের জেদ চেপেছে অন্তরে। একবার আদিকে পেলে ওকে পাগলা কুকুরদের হাতে ছেড়ে দিবে,, কামর খেতে খেতে মরবে ঐ আদ্রিয়ান কাইসার। রাগ মিটাতে গানের সবকয়টা গুলি চারটে লাশের উপর প্রয়োগ করলো।

প্রতিটি গুলিতে মৃত লাশগুলোর মৃত কোশ গুলো ও কেমন করে যেনো লাফিয়ে উঠলো। রিভলবার ফাকা হওয়ার পরেও অনেকটা সময় স্যুট করলো দ্বীপ, মনের রাগ মিটছে না। বুকের বাম পাশটা থমকে আছে, নিশ্বাস নিতে গেলে ব্যাথা করছে,, মাথার পিছনে কষ্ট হচ্ছে,, মাথা কাজ করছেনা। শরীরটা অসার হয়ে আসছে,, ভালোবাসায় এতো যন্ত্রণা জানলে মা মরে যাওয়ার পরেই মরে যেতো দ্বীপ। তাহলে পারুকে হাড়ানোর যন্ত্রণায় পুড়তে হতো না আর অর্পনার আগমনে দ্বীতিয়বার মরতে হতো। দ্বীপ হাটু গেড়ে ছাদের মেঝেতে বসে পরলো,, বুক পকেট এখনো অর্পনার রুমালটা বন্দি। এই রুমালটা অর্পনার আগের গিটারে সবসময় বাধা থাকতো, অর্পনা তাকে বলেছিলো যেনো ফিরার সময় এটা সাথে করে নিয়ে আসে। বর্তমান গিটারে এই রুমালটাই বাধতে চায় সে,, দ্বীপ শুধু এই রুমালটা আনার জন্য ক্লাব থেকে বাড়ি গিয়েছিলো অথচ যার জন্য আনলো সে নেই। সে বলেছিলো অপেক্ষা করবে,, নিজেকে সাজিয়ে রাখবে,, কথা দিয়েছিলো ফিরলে দেখা হবে। কথা রাখেনি সে,, কেউ কথা রাখেনা। শুধু আশা দেয়, ভরসা দেয় আর সুযোগ বুঝে যন্ত্রণা। অর্পনা একটা ঠক, জোচ্চর, চোর, ডাকাত, সব অর্পনা। দ্বীপের অন্তরটা চুরি করে ডাকাতের ন্যায় আঘাত করে পলাতক হয়েছে সে। এই মেয়েকে ছাড়বে না দ্বীপ,, কাছে পেলে সব হিসেব মিটিয়ে নিবে। ঐ রমনি জানেনা, সে কার? দ্বীপ মির্জা কে? সাহস হলো কি করে কথা না রাখার? দ্বীপকে কষ্ট দেওয়ার? এতো সাহস কে দেয় ঐ রমনিকে? কে?

,,,,জানেম!! ও জানেম!! জান, একটু তাকাও।
,,, অর্পনার চেতনা ফিরতেই চোখে মুখে ভেজা কিছু অনুভব করলো, সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাতেই ঝাপসা চোখে দ্বীপকে দেখতে পেলো,, অথচ তার নিওরনে স্পষ্ট সেইভ করা রয়েছে তাকে আদ্রিয়ান কিডন্যাপ করেছে। নিওরন থেকে ব্রেইনে সিগন্যাল পৌছাতেই অর্পনার ঝাপসা চোখ ক্লিয়ার হলো। চোখের সামনে দ্বীপ নয় বরং আদ্রিয়ান ঝুকে আছে,, অর্পনা অনুভব করলো তার হাত, পা, কোমর বাধা। এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝলো সে এক অচানা জায়গায় অবস্থান করছে এবং জায়গাটা বেশ পুরোনো এবং অদ্ভুত। চারদিকে এন্টিকের আসভাবপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা,, বড্ড অগোছালো একটা পরিবেশ। অর্পনাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে আদি ওর গাল ছুলো,, অর্পনা বিরক্ত হয়ে মুখ সরিয়ে নিলো,, আদি বেহায়ার মতো ফের ওর গাল ছুলো। অর্পনা আবারও মুখ সরাতে চাইলে আদি শক্ত করে ধরে রাখলো। অর্পনা সাবধান বানী ছুড়লো — হাত সরান,, আমি আমার হাসবেন্ড ব্যাতিত অন্য কারোর স্পর্শ এলাও করিনা।

,,,, অর্পনার কথায় ব্যাথিত হলো আদি, চোখ জোড়া লাল,, সে ঠিক মতো ঘুমাতে পারেনা, খেতে পারেনা, নিশ্বাস নিতেও বড্ড কষ্ট হয়। অর্পনা একবার তাকালো আদির চোখে পরোক্ষনেই নজর সরিয়ে নিলো। আদ্রিয়ান সরে এসে অর্পনার মুখোমুখি চেয়ারে বসে পরলো। অহিন নামের কাউকে ডেকে খাবার আনতে বললো,, অর্পনা অনুভব করলো তার গায়ে উড়না নেই,, এমন নয় যে সে আদির সামনে কখনো উড়না ব্যাতিত থাকেনি। আগে তো সে উড়নাই পরতো না তবে আজ কেমন যেনো লাগছে। আদ্রিয়ান তাকে ভালোবাসে,, হয়তো আদির দৃষ্টিতে ভালোবাসা ব্যাতিত কিছুই নেই তবুও অর্পনার ভালো লাগছেনা, ভিতরটা হাসফাস লাগছে। সে দ্বীপের আমানত, রক্ষা করা তার কর্তব্য। অর্পনা ভিতরে হাসফাস করলেও কন্ঠে কাঠিন্যতা ঢেলে বললো — আমার উড়না দিন, আমি অস্বস্তি ফিল করছি।
,,, আদি এদিক ওদিক তাকিয়ে উড়না খুজলো, পেয়েও গেলো, সুন্দর করে অর্পনার মাথায় পেচিয়ে দিলো সেটা। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো — এই রুপে তোমায় বউ বউ লাগে জানেম,,

,,, অর্পনা কন্ঠে গাম্ভীর্যতা ঢেলে বললো — আমি সত্যি বউ, দ্বীপ মির্জার ওয়াইফ,, বউ বউ লাগাটা আবশ্যেক।
,,, অর্পনার বলা কথাগুলো আদ্রিয়ানের ভিতরটা ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে। হয়তো এই মেয়েটার সাথে সে চরম অন্যায় করেছে কিন্তু ভালো ও তো বেসেছে। এতোটাই ভালোবেসেছে যতটা অর্পনার বাবাও ওকে বাসেতে পারেনি। তবুও মেয়েটা তাকে মানছে না,, আদ্রিয়ানের চোখে পানিরা ভীর করলো,, সে অত্যন্ত কাতর কন্ঠে বললো– এভাবে বলো নাগো জানেম,, প্লিজ!! আমার খুব আঘাত লাগে,, এইযে বুকের এইখানটায় মারাত্মক যন্ত্রনা হয়। আমার সাথে এমন করোনা জান,, এই দুইটা মাসে আমি তোমায় ছাড়া পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। দ্বীপ মির্জা বরাবর আমার থেকে তোমায় আড়াল করে রেখেছে,, তোমায় একটুখানি চোখের দেখাও দেখতে পাইনি আমি।
,,, আদ্রিয়ানের কান্না, কাতরতা অর্পনার মন ছুতে পারেনা, তার ভাবনায় শুধু ইরাদ আর দ্বীপ। ইরা কোথায়? ওর সাথেই তো ছিলো মেয়েটা। ওকেও কি কিডন্যাপ করেছে? ইরার সাথে আদির যোগসূত্র তৈরি হলো কি করে? আর তার লোকটাইবা এখন কি করছে? সময় তো অনেকটা গড়িয়েছে,, রাত হয়েছে বোধয়। লোকটা কি ইফতার করেছে নাকি তার মতোই না খেয়ে রয়েছে? তাকে ছাড়া কি অবস্থা হয়েছে উনার? অর্পনা কৌতুহল বসত প্রশ্ন করলো — এটা কোথায়? আমরা কোথায় আছি? এখন কয়টা বাজে? এশার আজান দিয়েছে?

,,, আদি ঘড়ি দেখলো,, আদিকে ঘরি দেখতে দেখে অর্পনা নিজের হাতে তাকালো,, ঘড়ি নেই,, আগে সে বরাবর ঘড়ি পরতো এখন দ্বীপের জন্য চুড়ি পরে। লোকটার জন্য অর্পনার ভীতরটা পুড়ে যাচ্ছে, সে নিশ্চিৎ লোকটা কিছু খাবে না। সকাল বেলায় সে একটু দূরে গিয়েছিলো বলে কত্ত পাগলামি করলো,, এখন তো সে অনেকটা দূরে আছে,, লোকটা ঠিক থাকবে তো? এরমধ্যে অহিন নামক ছেলেটা একটা বিশাল প্লেট ভর্তি খাবার নিয়ে এলো। আদ্রিয়ান সেটা নিয়ে খাবার মেখে অর্পনার মুখের সামনে ধরতেই সে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আদ্রিয়ান একহাতে অর্পনার গাল ছুয়ে বললো– মাগরিবের আজান পরেছে অনেকক্ষণ,, খেয়ে নাও প্লিজ!!
,,, অর্পনা রেগে গেলো,, আদির হাত থেকে গাল সরিয়ে বিরক্তিকর কন্ঠে বললো — আপনার কি মনে হয়, আমি ভিষন ফুর্তিতে আছি? দ্বীপ না খেয়ে আছে,, ওকে ছাড়া এখানে আমি গাণ্ডেপিণ্ডে গিলবো? ইরাদ কোথায়? ওর সাথে কি করেছেন আপনি? আমার ইরাদের কোনো ক্ষতি হলে আপনাকে আমি নিজ হাতে খুন করবো বিশ্বাস করুন। আর যদি দ্বীপ আমায় না পেয়ে পাগলামি করেছে বা অসুস্থ হয়েছে তাহলে আপনার বংশই আমি নির্বংশ করে দিবো। কসম!!

,,, অর্পনার আচরনে অবাক হলো আদি,, চোখ থেকে পানি গড়ালো। খাবারের প্লেট টা কোলের উপর রেখে আষ্টে হাতেই অর্পনার হাত ছুলো,, তাতে কপাল ঠেকিয়ে বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে উঠলো।
— জানেম!! আমার জান!! তোমার দোহাই লাগে আমার সামনে অন্য কারোর জন্য মায়া করো না। আমিও তো মানুষ বলো,, জীবনে একটা ভুল করেছি। একটা না অসংখ্য ভুল করছি,, আমার কারনে তোমার জীবন নষ্ট হয়েছে,, তোমার সতিত্বে আচড় লেগেছে,, তোমার সাথে বাজে ব্যাবহার করেছি,, অপমান করেছি,, তোমার বডি সেইম করেছি,, সব করেছি আমি। এই পৃথিবীতে স্রেষ্ঠ পাপি আমি,, তবুও তো তোমায় ভালোবেসেছি। আমার ভালোবাসায় তো কোনো পাপ নেই,, কোনো খামতি নেই,, আমায় এভাবে যন্ত্রণা দিও না। তোমার মুখে অন্য কারোর নাম,, আমায় কলিজা ছেড়ার মতো যন্ত্রণা দেয়।

,,, বলতে বলতে বাচ্চাদের মতো শব্দ করে কেদে দিলো আদি,,অর্পনা শক্ত হয়ে বসে আছে। একটা সময় যখন সে ট্রমাটাইস্ড ছিলো,, পাপ্পাকে ভয় পেতো। পাপ্পাকে দেখলে মনে হতো পাপ্পা ও ঐ লোকেদের মতো খারাপ। তখন অর্পনার মস্তিষ্কে খুব করে একটা কথা বাজতো,, “” একদিন আমারো দিন আসবে,, সেদিন আপনি কাদবেন আদি,, আমাকে পাওয়ার জন্য গলা কাটা মুরগির ন্যায় ছটফট করবেন। আমি সেদিন শুধু দেখবো আর হাসবো “” অর্পনা তার কথা রাখতে পারেনি। হাসবে বলেও আজ হাসতে পারছে না,, কাদতে ইচ্ছা করছে খুব কিন্তু কাদবে না। কার জন্য কাদবে? যে তার জীবনটা নরক করে দিয়েছিলো? এই প্রোফেসরের প্রতি তার সামান্য পরিমান মায়া আসাটাও অন্যায়,, মারাত্মক অন্যায়। পাথরের ন্যায় বসে থাকা অর্পনার হাত দুটো শক্ত করে মুঠোয় পুরে সেই হাত সমেত নিজের কপালে আঘাত করতে করতে আদি চিৎকার করে বললো– আমায় মেরে ফেলো তুমি,, প্লিজ মেরে ফেলো। আমি আমার ভালোবাসার ভার আর বইতে পারছিনা। আল্লাহ!! কেনো আমার অন্তরে তোমার লাগি এতো মায়া দিলো? কেনো তোমার লাগি আমার পরানটা আর্তনাদ করে কাদে? তুমি তো একটা পাথর,, যতোই মাথা ঠুকি তোমার মন গলবে না,, তাহলে আমার কি হবে বলো ? আমি কোথায় গেলে এক ফালি শান্তির সন্ধান পাবো। আমাকে তুমি মেরে ফেলো জান,, মেরে যেখানে খুশি চলে যাও,, আমি বাধা দিবো না।

,,, অর্পনা শক্ত পোক্ত ঢোক গিললো। আমাদের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকে যার অনিষ্ঠ চেয়েও তার অনিষ্ঠ দেখতে পারিনা। অর্পনা জোর করে হাত সরিয়ে নিলো।আদ্রিয়ান আবারও হাতগুলো আকরে ধরলো। অর্পনা ব্যার্থ হয়ে কিছুটা নরম স্বরে বললো– প্রোফেসর!! শান্ত হোন,, কান্নাকাটি কোনো সমাধান নয়।
,,, আদ্রিয়ান বাচ্চাদের মতো মায়া ভরা দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকালো। একজন পুরুষ কতোটা অসহায় হলে বাচ্চাদের মতো ফোপায় তার ধারনা করাটা বড্ড কঠিন,, এই বিষয়টা বরই জটিল। আদি ফোপাতে ফোপাতে আগ্রহ ভরা কন্ঠে বললো — তাহলে কোনটা সমাধান? বলে দাও আমি তাই করবো। তোমার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইবো? বলো,!! মাফ করবে আমায়? একটাবার ক্ষমা করে আমার সাথে চলো আমি তোমায় পৃথিবীর সকল সুখ এনে দিবো।
,,, আমার তো সুখ চাইনা প্রোফেসর,, আমি আমার দ্বীপকে চাই,, উনার সাথে কয়েকটা বছর বাচতে চাই। আমার জীবনটা তো নষ্ট হয়েই গেলো,, এবার একটু বাচতে দিন।
,,, আমি কি দোষ করেছি? তুমি তো আমাকে ভালোবাসতে। ভালোবাসা এতো সহজে ভুলা যায়? কিভাবে পারো? বলোনা!! আমায় বলে দাও,, আমিও তোমায় ভুলে যাচ্ছি। জানেম বলোনা,, কিভাবে ভুললে আমায়? এখন এটা বলোনা যে তুমি আমায় কখনো ভালোই বাসোনি,, তুমি আমার জন্য একটা সময় পাগল ছিলে,, অস্বীকার করতে পারবে?

,,, অর্পনা শক্ত থাকতে পারলো না, চোখে পানিরা ভীর করলো, অথচ ঠোটে খিন হাসি। মান্সপটে ভাসছে তার কিশোরকালের পাগলামি গুলো। অর্পনা সরল স্বীকারুক্তি দিলো — অস্বীকার করবো কেনো? “”আমি আমার জীবনের অন্তিম মুহুর্ত পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য,, কাইসার বাড়ির বড়ো সন্তান আমার কিশোর মনে তান্ডব চালানো প্রথম পুরুষ। “”
,,, অর্পনার কথার প্রেক্ষিতে আদি একটি মারাত্বক কথা বললো যা অর্পনার কাম্য ছিলো না —
“” তুমি তোমার জীবনের অন্তিম মুহুর্তে গিয়েও স্বীকার করতে বাধ্য হবে,, কাইসার বাড়ির বড়ো সন্তানের মতো ভালো তোমায় কেউ বাসেনি। তোমার স্বামী ও না আর তোমার বাবা ও না। “”
,,, অর্পনার বুকটা ধ্বক করে উঠলো, মস্তিষ্ক জানান দিলো এটা সে সত্যি হতে দিবে না। আদ্রিয়ানের ভালোবাসার কাছে সে কোনোদিন মাথা নত করবে না। অর্পনার মস্তিষ্কে অগ্নির ন্যায় তাপ সৃষ্টি হলো। সে ফুসে উঠে বললো– লিমিট রেখে কথা বলুন,, আপনি নিজেও জানেন না দ্বীপ আমায় কতোটা ভালোবাসে!!
,,, আদির কান্না ভেজা মুখে বেঙ্গাক্তক হাসি ফুটলো — ভালোবাসে মাই ফুট!! ও পারুকে ভালোবাসে। আর যদি তোমাকে বাসেও তাহলে ওই ভালোবাসাটাকে দ্বিতীয় ভালোবাসা বলে। আমি শুধু তোমায় আর শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। আমার আর দ্বীপের ভালোবাসায় হাজার প্রচ্ছেদ ফারাক জানেম। দ্বীপ মির্জার জীবনে তুমি জাস্ট একটা অপশন। বেচে থাকার জন্য তোমায় রেখেছে,, বিশ্বাস না হলে নিজেকে জিজ্ঞেস করো। ও তোমায় কখনো ভালোবাসি বলেছে?

,,, অর্পনার মস্তিস্কে চলা তাপ অগ্নিকুণ্ডের রুপ নিলো। বাধা পা দিয়েই বসে থাকা চেয়ারে লাত্থি মারলো। চেয়ারের সাথে কোমর বেধে রাখায় তার খোবের তোপে লোহার চেয়ারটাও দুলে উঠলো। অর্পনা দাতে দাত চেপে বললো– ভালোবাসি ভালোবাসি বললেই ভালোবাসা হয়ে যায়না। ভালোবাসি তো তারাও বলে যারা একটা মেয়েকে ইউজ করে ছুড়ে ফেলে দেয়। ভালোবাসি তো তারাও বলে যারা বউ রেখে শতো নারীর শরীরে মত্ত হয়। আমার পুরুষ আমার,, আর উনি আমায় ভালোবাসুক আর না বাসুক,, কিছু আসে যায়না আমার। আমি বাসি,, উন্মাদের মতো ভালোবাসি উনাকে। আ’ম অবসেস্ট উইথ হিম,, উনি চাইলেও ওনাকে আমার জীবনে থাকতে হবে আর না চাইলেও আমার জীবনেই থাকতে হবে। থাকতে না চাইলে থাকতে বাধ্য করবো,, প্রয়োজনে আবারও সেচ্ছায় পাগল বানিয়ে দিয়ে নিজের সাথে আটকে রাখবো। রাখবো মানে রাখবোই।
,,, অর্পনার আচরনে অবাক বনে গেলো আদ্রিয়ান,, শক্ত করে ধরে রাখা অর্পনার হাতটা শিথিল হয়ে এলো। আদিকে অবাক হতে দেখে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো অর্পনা। বহুদিন ধরে মনের মাঝে জমিয়ে রাখা কিছু সত্যি অবলীলায় প্রকাশ করলো—

,,, এতো অবাক হচ্ছেন কেনো? অবাক হওয়ার কিছু নেই,, আপনার কি মনে হয়? দ্বীপ আমায় তুলে নিয়ে আটকে রেখেছে? ইট্স এবসোলোটলি রং। দ্বীপ নিজেও জানে সে আমায় আটকে রেখেছে,, আমি তাকে চাইনা,, তার কাছে থাকতে চাইনা,, আমি তার প্রতি বিরক্ত। কিন্তু সত্যি হচ্ছে,, আমি উনাকে আটকে রেখেছি,, এই সবটা আমার নিজের তৈরি করা একটা গেইম। দশ মাস আগে আমি যখন দ্বীপকে প্রথম দেখেছিলাম,, সেদিন একমুহূর্তর জন্য থমকে গিয়েছিলাম,, মন বলেছিলো এই লোকটাকে তর লাগবে,, বিষয়টা ভালো লাগার নয়,, এটাকে একপ্রকার আশক্তি বলে। হয়তো লোকে বলতে পারে একটা পাগলকে দেখে আসক্তি জমার কোনো মানেই হয়না,, এটা অস্বাভাবিক। আমি তাদের বলবো,, আমি কোনোকালেই স্বাভাবিক ছিলাম না। আমার মতো অস্বাভাবিক ব্যাক্তির থেকে স্বাভাবিক কোনোকিছু আশা করা ব্যামানান। সেদিন আমি সেচ্ছায় উনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আমার মত না থাকলে বিহান কেনো ওর ১৪ গুষ্টি এসেও যদি আমার পায়ে ধরতো তাহলেও আমি দ্বীপের দিকে ফিরে তাকাতাম না। যা করেছি নিজের সার্থের জন্য করেছি।

,,,আমি জানতাম উনি সুস্থ হলে আমাকে ছেড়ে দিবেন,, তাই উনাকে এমন ভাবে নিজের সাথে অভ্যস্ত করেছি যে,, উনি আমায় ছাড়া একটা দিন কেনো একমুহুর্ত ও দূরে থাকতে পারবে না। তবে মানুষ যা চায় তার সম্পূর্নটা হয়না,, কিছুটা খামতি থেকে যায়। এই জায়গায় খামতিটা হচ্ছে উনার ভিতরে থাকা পারুর প্রতি ভালোবাসা। লোকটা পারুকে বেশ ভালোবাসে তাতে আমার কোনো প্রবলেম নেই,, প্রথম ভালোবাসা থাকতেই পারে,, আমারো ছিলো। সেই ভালোবাসার দোটানায় উনি টানা দশদিন আমার থেকে দূরে ছিলো,, আমি বেশ কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু এটা তো হওয়ার ই ছিলো, আমি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম এর জন্য।
,,আমি জানতাম দশ দিনের মাথায় দ্বীপ বাড়ি ফিরে আসবে,, তাই আগের দিন বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাই। উনাকে অনুভব করাই আমি আর পাঁচটা মেয়ের মতো স্বামীর কাঙাল নই। উনি ভেবেছিলো বাড়িতে আসলে আমায় পাবে,, আমি তার হাতে পায়ে ধরবো যেনো আমায় না ছাড়ে। অথচ উনার ভাবনা মতো ও কিছু হলো না,, আমি ই উনাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য উষ্কানি দিলাম। ভাবতে বাধ্য করালাম উনি আমার কেউ না, আমার উনাকে প্রয়োজন নেই। উনাকে জাস্ট দয়া করেছি আমি।

,,, মানুষ বরাবরই নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট থাকে, দ্বীপের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। উনি আমার খোজ নেওয়া শুরু করলো, জানতে চাইলো উনাকে ছাড়া আমি কেমন আছি। যখন আমার ডিভাইজ হেক করতে চাইলো তখন আমার ফোনে মেসেজ এসেছিলো,, বিষয়টাতে আমি সমর্থন করছি কিনা বা ওপাশের ডিভাইজ হেক কারির সম্পর্কে আমার ধারনা আছে কিনা,, আমি এগ্রিতে ক্লিক করে দিয়েছিলাম। নয়তো আমার মতো মানুষের ডিভাইস হেক করা এত্তো ইজি? ইউ নো না? আমি এসবে কতোটা পারফ্যাক্ট? আমি জানি সেদিনের পর থেকে উনি আমার প্রতিটা পদক্ষেপ লক্ষ্য করেন, জেনেও এখনো না জানার ভান ধরে রয়েছি। আমি জাস্ট উনাকে প্রশ্রয় দিয়েছি।
আমি যেদিন অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম সেদিন সকালে পাপ্পার সাথে উনার কথা হয়,, কি কথা হয় সবটা আমি জানি। উনি জানেন যা কথা হয়েছে তা উনার আর পাপ্পার মাঝে হয়েছে,, আমি কিছুই জানিনা অথচ পাপ্পা আমার সামনে বসে কথা বলেছিলো,, আমি যা শিখিয়ে দিয়েছি তাই বলেছে।
,,, আদির অবাকতা আকাশ ছুলো,, আঙ্কেল দ্বীপকে সুযোগ দিয়েছে? আঙ্কেল? কি করে হতে পারে? আঙ্কেল তো তাকে কথা দিয়েছিলো অর্পনাকে তার হাতে তুলে দিবে। আদিকে অবাক হতে দেখে অর্পনা মারাত্মক ভাবে হাসলো।
— প্লিজ অবাক হবেন না,, পাপ্পা আজও দ্বীপকে মানতে রাজি নয়,, কেনো যেনো পছন্দ করেনা, হয়তো আপনার জন্যই করেনা নয়তো পছন্দ করে তবে প্রকাশ করেনা। সেদিন রাতে যখন আমার ছিন্ন ভিন্ন হাত আর মেঝেতে পরে থাকা নিথর দেহটা পেলো,, পাপ্পা না চাইতেও সবটা মেনে নিয়েছিলো,, দ্বীপের কল ধরতে বাধ্য হয়েছিলো সাথে তাকে আরও একটা সুযোগ দিতেও।

,,সেদিন একটা কথা জেনে অবাক হয়েছিলাম,, পাপ্পা আমায় শুরুতে ত্যাগ করলেও কখনো আমার পিছু ছাড়েনি, বরাবর আগলে রেখেছে। পাপ্পা নাকি সেচ্ছায় দ্বীপকে আরও দুবার সুযোগ দিয়েছিলো,, অবিশ্বাস্য না? সেদিন আরও একবার অনুভব করেছিলাম আমার পাপ্পা বেস্ট। আমি হাজারটা খু*ন করলেও পাপ্পা আমায় এপ্রিসিয়েট করবে।
,,,অস্ট্রেলিয়া যাবার দিন আমার মুখ চেয়ে পাপ্পা উনাকে তৃতীয় এবং শেষবারের মতো সুযোগ দেয়েছিলো। দ্বীপ সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে,, উনি যখন আমার পথ আটকে আমায় তুলে নিয়ে গেলেন। সেদিন আমি সেচ্ছায় উনার সাথে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম উনি আসবে, তবে এভাবে আসবে ভাবতে পারিনি। এর মধ্যে যেই রিয়্যাকশন গুলো ছিলো ঐগুলো স্রেফ নাটক, অভিনয় করেছিলাম। আমি শুধু উনাকে এটা ফিল করাতে চেয়েছি যে উনি আমায় জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন আর উনার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। উনাকে আমি সহ্যই করতে পারিনা।
,,, এরপর উনি আমাকে সবার সামনে সম্মান দিয়ে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, আমি ইচ্ছা করে সিনক্রিয়েট করেছি। উনি আমায় কাছে টানতে চেয়েছেন আমি বরাবর ডিভোর্স চেয়ে এসেছি। উনাকে এটা মানতে বাধ্য করেছি, আমি যখন তখন উনাকে ছেড়ে দিতে পারি। এরপর থেকে উনি আমাকে হাড়ানোর ভয় পেতে থাকলেন। আগলে রাখার পরিমানটা বেড়ে গেলো। অনেক কেয়ার করতে থাকলেন,, এতোটাই কেয়ার করতেন যে আমি কখনো আমার যত্ন কিংবা পাপ্পার অভাব বোধ করিনি। এই ব্যাপার গুলোতে আমার ভিষন ভালো লাগা কাজ করতো,, মন চাইতো স্বীকার করি উনাকে আমি ভালোবাসি,, আপন করে নেই ,, কিন্তু আমার চাওয়াটা এই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো না।আমার সবটা চাই,, উনার প্রতিটি শিরায় শিরায় আমি আমার বিস্তার অনুভব করতে চাই।

,,, নিজের উদ্দেশ্য সফলের জন্য উনাকে দিনের পর দিন অবহেলা করেছি আবার কখনো কখনো প্রশ্রয় দিয়েছি। কখনো ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছি আবার কখনো কাছে আসার সুযোগ দিয়েছি। উনি যখন রাতে আমায় স্পর্শ করেন, উনি জানেন আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অথচ আমি সামান্য পাতা পরার শব্দেও জেগে যাই। লোকটা আমার অভিনয় বুঝতে পারেনি,, রাজনীতিতে কুটিল হলেও বউনীতিতে লোকটা বড্ড কাচা।
,, আপনি জানেন? দ্বীপ মির্জা মারাত্মক হাড়ে নে*শা করতেন,, যাকে এক কথায় নে*শাখোর বলে। অথচ আমার নেশা পছন্দ না,, এমন নয় যে উনি আমি পছন্দ করিনা বলে নেশা ছেড়েছেন,, তবে উনি আমার জন্যই নেশা ছেড়েছেন। নেশা করার অপরাধে আমি যখন উনাকে আবারও অবহেলা দিলাম, দূরে রাখলাম, বারবার বুঝালাম উনি আমার মনের মতো না। তখন উনি আমার মনের মতো হওয়ার জন্য উঠে পরে লাগলেন। কিন্তু এই জায়গায় ও পারুর প্রতি দোটানা ছিলো। উনি নেশা করলে পারুকে পাবেন আর নেশা না করলে আমাকে পাবেন। উনি দোটানায় হিমসিম খাচ্ছিলেন। এমন একটা পর্যায়ে এসে উনার দোটানা কাটাতে ট্যালিপেথি এন্ড প্যারাসাইকোলজির সুযোগ নিয়েছি আমি। এই সম্পর্কে আপনার ধারনা রয়েছে নিশ্চই ? থাকাটা স্বাভাবিক তবে শিক্ষিত মানুষ এসবে বিশ্বাস করেনা। ট্যালিপ্যাথি এন্ড প্যারাসাইকোলোজি মাধ্যমে একজন ব্যাক্তি অন্য একজন ব্যাক্তির স্বপ্নে প্রবেশ করে তাকে নিজের ইচ্ছা মতো স্বপ্ন দেখাতে পারে। কয়েকদিন আগে আমি উনার ব্রেইনকে খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখতে বাধ্য করেছিলাম,, উনি এতোটাই ভয় পেয়েছিলেন যে কয়েকমিনিটের মধ্যে সেই দোটানা কাটিয়ে নেশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও হাজারটা ঘটনা রয়েছে যা দ্বারা প্রকাশ পায় উনি আমায় ভালোবাসেন,, হয়তো উনার ভালোবাসা পেতে আমি হাজারটা ছলনা করেছি,, মিথ্যা অভিনয় করেছি। পরিশেষে আমি সফল ও হয়েছি। উনি আমায় ভালোবেসেছেন,, আর খুব শীগ্রই আমায় ভালোবাসিও বলবেন। তার ব্যাবস্থা করার দায়িত্বটা আমার। অর্পনার নিয়মটা কিছুটা আলাদা প্রোফেসর,,

“” তাকে ভালোবাসি মানে এমন নয় যে,,
আমি তার পিছু পিছু ঘুরবো।
প্রয়োজনে তার জীবন থেকে সকল সুখ কেড়ে নিয়ে জীবনটা নরক বানিয়ে দিব,,
সুখ পাওয়ার লোভে সে এমনি আমার পিছু ছুটবে।””
“”মোট কথা, কাউকে কন্ট্রোল করতে চাও কিংবা ধ্বংস করতে চাও,, প্রথমে তাকে নিজের প্রতি অভ্যস্ত করে ছেড়ে দেও। সে তোমার জন্য তরপাবে,, তোমার কাছে আসতে চাইবে,, গলা কাটা মুরগির ন্যায় ছটফট করবে। তারপর তুমি ডিসাইড করবে সামনের মানুষটাকে তুমি কন্ট্রোল করবে নাকি ধ্বংস করবে। কন্ট্রোল করতে চাইলে রেখে দাও আর ধ্বংস করতে চাইলে ছেড়ে দাও।”” দেট্স ইট। আমি বরাবর নিজের নিয়মে চলি। আমাকে কেউ কারোর নিয়মে চালাতে পারেনা। অর্পনাকে আটকে রাখা কারোর কাম্য নয় আপনার ও না দ্বীপ মির্জার ও না। আমার লাইফে কি হবে সেটা আল্লাহ এর পর আমি নিজে ডিসাইড করবো। নট আদার্স পিপল।

,,, অর্পনার আচরন আর কথাবার্তায় ভিতর থেকে ভেঙে পরলো আদি,, তার বুঝতে বাকি নেই অর্পনা দ্বীপ আর তাকে নিয়ে গেইম খেলেছে। গেইমের নিয়মটা একই ছিলো কিন্তু ফলাফলটা ভিন্ন। অর্পনা দ্বীপকে কন্ট্রোল করছে আর তাকে ধ্বংস করেছে। আদ্রিয়ান অর্পনাকে চিনতে পারছেনা। ওর মুখভঙ্গি আর কথাবার্তায় ওকে সাইকোপ্যাথ বলা চলে। অর্পনা ম্যান্টাল্লি সিক,, বছর খানিক আগেও কান্টিনিওয়াসলি তাকে ঔষধ খেতে হতো। এখন খায় কিনা সেই সম্পর্কে ধারনা নেই আদির। ট্যালিপ্যাথি এন্ড প্যারাসাইকোলজি কোনো সাধারণ মানুষ আয়ত্ত করতে পারেনা। এর জন্য অনেক সাধনা করতে হয়,, বহু বছর অনুশীলন করার পর এটা আয়ত্ত করা যায়। তারমানে অর্পনা আগে থেকেই এটা জানতো,, তার আয়ত্তে ছিলো। প্রয়োজনের খাতিরে ব্যাবহার করতো। আদ্রিয়ান অর্পনার কঠোর মুখশ্রির দিকে তাকিয়ে করুন স্বরে বললো —

,,, তোমায় আমি চিনতে পারছিনা জানেম!! তোমায় কেমন ভয়াঙ্কর লাগছে,, আমার অর্পন তো এমন ছিলো না। সে ছোট, অবুঝ, বাচ্চা একটা মেয়ে ছিলো। আমি বাংলাদেশে এলে সে আমার দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকিয়ে থাকতো,, খাবার টেবিলে খাবারের চেয়ে বেশি আমায় দেখতো। আমার স্টাইল কপি করার চেষ্টা করতো,, আমার কাছে নিজেকে পরিপাটি করার ভিষন তাড়া থাকতো তার। আমার সেই অর্পনটা কই জানেম? আমি কোথায় গেলে তাকে খুজে পাবো? বলোনা,, একটু বলো।
,,, অর্পনার মুখের সেই রহাস্যাতক হাসি মিলিয়ে গেলো, মুখে নেমে এলে ঘন মেঘের পরশা। বুকের বাম পাশটা চিনচিন করে উঠলো,,

—+ ঐ অর্পনা তো মরে গিয়েছে প্রোফেসর,, তাকে আপনি নিজ হাতে খুন করেছেন। আপনি আমার খুব শখের ছিলেন,, আমার কিশোর বয়সের আবেগ,, আমার মনটা আপনি সযত্নে ভেঙে দিয়েছেন। যখন ঐ লোক গুলো আমার পিছু করেছিলো আমি আপনাকে কল করেছিলাম। বেশি দূরত্ব ছিলোনা প্রোফেসর,, আপনি একমুহূর্তে পৌঁছে যেতে পারতেন। অথচ আপনি বলেছেন আমি নাকি মেয়ে না। আমার মাঝে এমন কিছু নেই যার মাধ্যমে কেউ আকৃষ্ট হবে। আমার মাঝে কিছু নেই? কিছু না? আমি মেয়ে ছিলাম না? কি না থাকার কথা বলেছিলেন? পারফ্যাক্ট শরীর? আকৃষ্ট হতে শরীর লাগে বুঝি? আমি তো এখনো আগের মতোই আছি,, চিকন, জিরো ফিগার, সাজতে পারিনা, পরিবর্তন হয়েছে শুধু চুলে। আপনি এই চুলে মজেছেন? আমি বলিনি আমি চুল লম্বা করবো? বলিনি আপনার জন্য নিজেকে পাল্টে ফেলবো? আচ্ছা আমায় না মানতেন,, ফুপাতো বোন হিসেবে সেদিন বাচাতেন। না বাচান, ঠিক আছে, ওসব বাদ। আমার জন্য ফিরে আসতেন, একবার অর্পনার খোজ নিতেন। আপনি পৃথাকে খুজেছেন,, আমার মাঝে পৃথা নেই, বিশ্বাস করুন। এই শরীরটা অধ্বপ্রান্ত অর্পনার। পৃথা ঐ ফোনে আছে,, যেটা সবাই ইউজ করে। আপনি ওখানে আপনার পৃথাকে খুজে নিন। আমার বাধা নেই,, তাকে নিয়ে হাজার বছর সংসার করুন। শুধু আপনার জন্য আমি নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি,, আপনার জন্য আমার এতো রুপ থাকা সত্তেও নিজেকে সুন্দর ভাবতে পারিনা।আপনি আমার মন, জীবন,আত্মা সব নষ্ট করে দিয়েছেন । আপনার আর আমার মাঝে দ্বীপকে আনবেন না,, ওটা আমার পবিত্র ভালোবাসা। ওখানে কোনো ভুল নেই, খাদ নেই, উনাকে ছাড়া আমার পক্ষে বাচা অসম্ভব,, আমায় যেতে দিন,, আমি মুক্তি চাই,, এবার অন্তত আমায় বাচতে দিন।

,,,, আদি চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে বসে পরলো,, এরুপ কান্ডে কোলের উপর থাকা ভাতের প্লেটটা ছিটকে পরলো মেঝেতে। আদ্রিয়ান অর্পনার পা জড়িয়ে কোলে মাথা রেখে শব্দ করে কাদতে কাদতে বললো–
তাহলে আমায় মেরে ফেলো,, আমি বেচে থাকতে তোমাকে অন্যের হতে দেখতে পারবো না। আমি তোমার পায়ে ধরি জানেম,, হয় আমায় ক্ষমা করো নয়তো আমায় মেরে ফেলো। দয়া করো জানেম,, দয়া করে আমায় মেরে ফেলো। তুমি আমায় এতো কঠিন ভাবে ধ্বংস না করলেও পারতে। আমি পাপ করেছি, আমি পাপি,, আমার পাপের অনেক ধরনের শাস্তি হতে পারতো। এটা কেমন শাস্তি দিলেগো? আমি তো মরতেও পারছিনা বাচতেও পারছি না। আল্লাহ কেনো আত্মহত্যার বৈধতা দিলো না? আমার মতো পাপিষ্ঠের উপর কি আল্লাহ এর দয়া হয়না? “” শাস্তি দেওয়ার প্রন্থা হিসেবে ভালোবাসা নামক বিষ আমার অন্তরে না ছড়ালেও পারতে জানেম,,তুমি বরই নিষ্ঠুর। আমার নিষ্ঠুর প্রিয়া তুমি,, তোমার ভালোবাসার তরে নাশ হয়ে গেলাম। “”

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩

,,, বেধে রাখা চেয়ারটায় মাথা হেলিয়ে দিলো অর্পনা, চোখের কোন ঘেঁষে অনবরত পানি গড়াচ্ছে। তার জীবনটা কতো বিষাক্ত,, একজনকে ধ্বংস করতে গিয়েও বিষে নীল হচ্ছে সে। অর্পনা সত্যি ই একটা বিষ,, যে সেচ্ছায় পান করে সেও মরে আর যাকে জোর করে পান করানো হয় সেও মরে। আর অর্পনা, মানুষ হওয়ার দরুন নিজের বিষে নিজেই দগ্ধ হয় বারংবার।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here