৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬২
রুপান্জলি
তিনমাসের ফলো আপ শেষ করে আজ বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলো অর্পনা। দ্বীপ তার স্ত্রীকে যত্নের সহিত আগলে রেখেছে নিজের বাহু ভাজে। অপারেশনের এতোদিন পরেও অর্পনা দ্রুত কদমে হাটতে পারে না তাই ধীরে ধীরে কদম ফেলে বউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে হাটছে দ্বীপ। তাদের পিছনে বিহান, পরশী, মেধা, আরিব ও অর্পনার পঞ্চ মুর্তি রয়েছে। তারা সবাই মিলে অর্পনাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে গিয়েছিলো। অর্পনার দেশে ফিরার কথা শুনে বাড়িতে অনেকের আগমন ঘটেছে,,দ্বীপের পরিচিত, বন্ধুবান্ধব,, রাজনৈতিক সম্পর্কের অনেকেই। সাথে দ্বীপের নানির বাড়ির লোকজন,, নানান দিকের আত্মিয় স্বজন ও রয়েছেন। সবাই মাত্রই খাওয়া দাওয়া শেষ করে বসার ঘরে বসেছেন। বাড়িতে ঢুকে সবাইকে একসাথে দেখে অর্পনা হাসফাস করে উঠলো। এখন আর বেশি মানুষ সহ্য হয়না তার,,কেমন অস্বস্তি ফিল হয়।
দ্বীপ বিষয়টা খেয়াল করলো,, তাই কারোর সাথে কোনোরুপ বাক্য ব্যায় না করেই অর্পনাকে ধীরে ধীরে কোলে তুলে নিলো,, এই সময়টাতে পাজা কোলা করা মানা,, হার্টে চাপ পরতে পারে তাই কোমর পেচিয়ে উপরে তুলে নিলো। বসার ঘরে থাকা অনেকেই অসন্তুষ্ট হয়েছে বিষয়টা নিয়ে,, দ্বীপের মামাতো ভাই বোন যারা ছিলো সবাই আবার বিষয়টা নিয়ে হইহই করে উঠেছে। দ্বীপ সেসবে পাত্তা দিলো না,, অর্পনাকে নিয়ে সিরি বেয়ে নিজেদের রুমের দিকে হাটা দিলো। দ্বীপ অর্পনা উপরে চলে যেতেই সাথি বেগম বিহান, মেধা, পরশী ও অর্পনার চার মুর্তিকে খাবার খেয়ে নেওয়ার জন্য তাড়া দিলেন। সকল আত্মিয় স্বজন একসাথে আসার দরুন বাড়িতে ভালোই আয়োজন করা হয়েছে। রুমে এসে অর্পনাকে বিছানায় বসিয়ে দিলো দ্বীপ,, পিছনে বালিশ রাখতেই তাতে হেলান দিয়ে শুয়ে পরলো অর্পনা সাথে টেনে ধরলো দ্বীপের কলার। অর্পনার আকষ্মিক কান্ডে খেই হাড়ালো দ্বীপ,, বিছানায় হাত রেখে অর্পনার দিকে ঝুকে গেলো,, অর্পনার চোখে মাদকতা,, দ্বীপ এক ভ্রু বাকালো,, এক নজর কলারে রাখা অর্পনার হাতের দিকে তাকিয়ে আবার অর্পনার চোখে চোখ রেখে সুধালো– মতলব কি?
,,, অর্পনা উত্তর করলো না,, কলার থেকে হাত সরিয়ে এডাম্স অ্যাপলে আঙুল চালাতেই শক্ত পোক্ত ঢোক গিললো দ্বীপ,, মুহুর্তেই নিশ্বাস ভারি হয়ে এলো,, অর্পনা ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি ফুটিয়ে বললো – আপনাকে বিরক্ত করা,, আপনাকে বিরক্ত করতে আমার খুব ভালো লাগে।
,,, এই পর্যায়ে দ্বীপের ভ্রু জোড়া গুটিয়ে এলো,, দাতে দাত চাপলো। একটা মেয়ে কি পরিমান বে*য়াদব আর ফা*জিল হলে হাসবেন্ডকে বিরক্ত করার খাতিরে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার মতো ভুল করে। অর্পনার ভাগ্য ভালো দ্বীপের ধৈর্য ক্ষমতা অসীম নয়তো এমন একটা মুহুর্তে দূরে থাকা দায়,, দ্বীপের ধৈর্য ক্ষমতায় যদি একটুখানি ও চিড় থাকতো তাহলে অর্পনার সর্বনাশ আজ নিশ্চিৎ ছিলো। দ্বীপকে রাগতে দেখে অর্পনার ঠোঁটের হাসি আরেকটু প্রসারিত হলো,, এই পর্যায়ে দ্বীপের ঠোঁটেও পৈশাচিক হাসি ফুটলো,,এই হাসি দেখে দমে গেলো অর্পনা। দ্বীপ এবার আরও খানিকটা ঝুকে এলো,, অর্পনা মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইলে হাত দিয়ে আটকে দিলো দ্বীপ,, সেকেন্ডেই আকরে ধরলো অর্পনার নরম উষ্ঠ যুগল সাথে সাথে বাহির হতে কারোর পদাচরনের শব্দ ধেয়ে এলো,, হয়তো তাদের ঘরের দিকেই আসছে কেউ। দ্বীপের সেসবে ধ্যান না থাকলেও অর্পনা মৃধু ধাক্কায় দ্বীপকে সরিয়ে দিলো। তখনি খাবার হাতে রুমে ঢুকলেন রোমানা বেগম। মাকে খাবার নিয়ে রুমে ঢুকতে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পরলো দ্বীপ,, অর্পনাও কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। ভাগ্যিস তার মস্তিষ্ক সজাগ ছিলো নয়তো কতোটা লজ্জার সম্মুখীন হতে হতো। ভাবা যায়? রোমানা বেগম ছেলে ছেলের বউয়ের হাব ভাবে কিছুই বুঝলেন না বরং দ্বীপের উদ্দেশ্যে বললেন– ফ্রেস হয়ে নিচে যাও,, সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
,,, দ্বীপ উত্তর করলো না তবে ওয়াসরুমের দিকে চলে গেলো,, যাকে নিরবে মায়ের কথায় শায় দেওয়া বলে। ছেলে চলে যেতেই রোমানা বেগম অর্পনার গালে গলায় হাত রাখলেন,, শরীর কিছুটা গরম। সুধালেন– জ্বর আসবে নাকি? ঔষধ খেয়েছো? ওহ!! দুপুরে তো তোমরা ফ্লাইটে ছিলে,, খাবার ই তো খাওনি।
,,, শ্বাশুড়ির কথায় আরও অপ্রস্তুত হলো অর্পনা,, রোমানা বেগম ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলেন পরক্ষণেই বিষয়টা মাথা থেকে ঝেরে ফেলে সাথে করে নিয়ে আসা খাবার প্লেটে তরকারি ঢেলে মাখাতে মাখাতে বললেন — ওখানকার খাওয়া দাওয়া কেমন? এভাবে শুকিয়েছো কেনো? শরীরে তো হাড়গুঁড় ব্যাতিত কিছুই পাওয়ার সুযোগ নেই।
,,, বলেই গরুর মাংসের টুকরো সহ লোকমা তুলে দিলেন,, অর্পনা উত্তর করলো– কি আবার? ফ্যানা ভাত,, লাউ সিদ্ধ, কলা সিদ্ধ, ওট্স, নানান পদের স্যুপ, ঘাসপাতা এসবি। সব দোষ আব্রাহামের,, ছেলেটা আপনার ছেলেকে কিসব যেনো শিখালো সেই থেকে আপনার ছেলে আমাকে এসবের উপরেই রেখেছে তিনমাস।
,,, বলেই লোকমাটা মুখে নিলো অর্পনা। রোমানা বেগম অসন্তুষ্ট হতে পারলেন না,, হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট এর পর কয়েকটা ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ঔষধ খেতে হয় যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যার ফল স্বরুপ ঝাল মসলা খাবার খেলে পাকস্থলীতে জ্বালা, অ্যাসিডিটি বা আলসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এইযে এই খাবারটা অর্পনার জন্য এক্সট্রা করে রান্না করেছেন তিনি,, সবটাই আব্রাহামের থেকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছেন। যতই শ্বাশুড়ি হোন না কেনো ডক্টরের কথার বাহিরে তো যাওয়া যায়না। অর্পনা খেতে খেতে হাত দিয়ে মুখে বাতাস করতে করতে বললো– আল্লাহ!! এটা তো ঝাল। আপনার ছেলে তো ঝাল খেতে নিষেধ করেছে।
,,,রোমানা বেগম পানি এগিয়ে দিয়ে বললেন — ঝাল না,, বহুদিন পর খেলে তো তাই এমন লাগছে,, আর দু লোকমা খাও ঠিক হয়ে যাবে। আর আমি আব্রাহামের থেকে জিজ্ঞেস করেই রান্না করেছি।
,,, বলেই আরেক লোকমা তুলে দিলেন,, অর্পনা সেটা নিয়ে শ্বাশুড়ির দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো,, রোমানা বেগম ভ্রু গুটালেন। অর্পনা খাবার চিবুতে চিবুতে গুরো করে বললো — কি ব্যাপার শাশুমা? এতো কেয়ার করছেন যে? পাম পট্টি দিয়ে জায়গা সম্পদ লিখিয়ে নিবেন না তো? আসলে আমি বেশ বড়োলোক তো,, স্বামী শ্বশুরের সব সম্পত্তি তো আমারি আবার সাথে বাপেরটাও আছে।
,,, বলেই মুখের খাবারটা গিলে নিলো,, রোমানা বেগম আরও এক লোকমা তুলে দিয়ে বললেন– স্বামী,, শ্বশুর বোধহয় একা তোমারি আছে,, আমার বুঝি নেই?
,,, আছে,, বাট আপনার স্বামী তো আর আপনার নামে নিজের পঞ্চাশ পার্সেন্ট সম্পত্তি লিখে দেয়নি তাইনা?
,,, তুমি কিভাবে জানো দিয়েছে নাকি দেয়নি?
,,, দিলে দলিল দেখান,, নয়তো বিশ্বাস করবো না।
,,,, তুমি আসলেই একটা বে*য়াদব,,
,,, এতোক্ষণ এই কথাটা শুনারি অপেক্ষা করছিলাম শাশুমাআআআ।
,,, এই একদম এভাবে ডাকবে না,, অসহ্য লাগে।
,,, শাশুমাআআআআআআ!!
,,, অভদ্র বউমা!!
,,, শশুমা!!
,,, কেটে গিয়েছে আরও মাস খানিক,, সপ্তাহ খানিক আগেই আরশাদ জামান আর সুহাসিনীর রেজিস্ট্রি ম্যারেজ সম্পন্ন হয়েছে। এক প্রকার অর্পনার মন রাখতেই বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছেন আরশাদ জামান তবে সুহাসিনীর বিষয়টা ধরা যাচ্ছে না। সপ্তাহ খানিক আগেই অর্পনা ফোন দিয়ে লাস্ট বারের মতো জিজ্ঞেস করেছিলো রাজি আছে কিনা? তিনি রাজি হয়েছেন। যার ফল স্বরুপ তাদের বিয়ের আজ সপ্তাহ পেরিয়ে আটদিন। বিয়ের পর থেকে আরশাদ জামানের ফ্লাটেই থাকছেন সুহাসিনী,, অর্পনা নিজ দায়িত্বে নিয়ে এসেছে উনাকে। এই ফ্লাটে স্টোর রুম সহ মোট পাচটি রুম,, মাঝখানে মাঝারি সাইজের বসার রুম আর কিচেন। আগে তিনটা রুম ঠিক করা ছিলো একটাতে আরশাদ জামান, অন্যটাতে অর্পনা আর তিন নম্বরটাতে আদি থাকতো। আদির রুমটা এখনো সেই আগের মতোই আছে,, অর্পনা সেখানে কাউকে ঢুকতে দিতে রাজি না। কেনো রাজি না তাও প্রকাশ করতে নারাজ,, বিষয়টা অবশ্য দ্বীপ জানেনা,, জানলে আরও এক দফা ঝামেলা হতো দুজনার মাঝে। আদির রুম তালা মারা থাকায় পরবর্তী রুমটা রাত্রি আর ইরার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। স্টোর রুমটা বর্তমানে ইরার আর্ট এন্ড ক্রাফ্ট রুম হিসেবে ব্যানহৃত হচ্ছে। ইরার বর্তমানে কিছুটা ভালো সময় যাচ্ছে,, তার বিজনেস পেইজ এই তিন-চার মাসে ভালোই রানিং হয়েছে,, ১৫-১৬ দিন আগেই একটা আর্ট ভিডিও ভাইরাল হয়েছে,, সেটা ছিলো তাদের পাঁচ জনার একসাথে তোলা একটা ছবি। ইরাদ সুনিপুণ ভাবে সেটা অঙ্কন করেছে,, বুঝার যো ই নেই আসল নাকি আর্ট। সেই ছবির নিচে ক্যাপশন ছিলো “” বেস্ট সোলম্যাট ফোরেবার”” ইরার বিজনেস পেইজের নাম ও এটাই। তারপর থেকেই অর্ডার আসা শুরু হয়েছে। এই পনেরো দিনে মোট ছয়টা ফটো আর্টের অর্ডার এসেছে যার সবকয়টা অর্ডার ই বেস্ট ফ্রেন্ডদের গ্রুপ থেকে করা। মাঝে মধ্যে ওয়্যাল ক্লক, চুড়ি, কানের দুল,কাপল ফটোফ্রেমের ও অর্ডার আসছে। এভাবে চলতে থাকলে খুব শীগ্রই আলাদা একটা ভাড়া বাসা নিবে ইরাদ তারপর মাকে নিয়ে আসবে নিজের কাছে।
,,, খাবার টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজাচ্ছেন সুহাসিনী,, মেয়ে দুটোকে ডাকলেন কয়েকবার,, এখনো খেতে আসছে না। তিনি আবার খুবি পরিপাটি ধরনের মানুষ,, ঠিক আটটায় সবাইকে খাবার টেবিলে চাই,, ছোট থেকে রাতকে এই নিয়মেই বড়ো করেছেন। আরও একবার ডাকতেই আরশাদ জামানের পিছু পিছু রাত্রি আর ইরাদকে আসতে দেখা গেলো। রাত্রি এখন আর উনাকে আরশাদ আঙ্কেল বলে সম্মোধন করে না,, মুখ ভরে পাপ্পা বলে ডাকে। বিষয়টা খারাপ লাগেনা উনার,, আগে থেকেই এদেরকে মেয়ের মতো করে দেখে এসেছেন এখন আদরের পরিমান ক্ষানিকটা বেড়েছে। বিয়ের সাতদিন পেড়িয়ে যাবার পরেও আরশাদ জামান কিংবা সুহাসিনী মাঝে কোনোরুপ বাক্য ব্যায় হয়নি। আরশাদ জামান ও মেয়ে দুটো খাবার টেবিলে বসতেই খাবার এগিয়ে দিলেন সুহাসিনী। আরশাদ জামান খাবারের দিকে তাকিয়ে একবার সুহাসিনীর দিকে তাকালো,, এই প্রথম বারের মতো চেয়ারে বসার ইশারা করে বললেন– একসাথে খেয়ে নিন।
,,, আপত্তি করলেন না সুহাসিনী,, তিনি বরাবরি বাবা মায়ের বাধ্য সন্তান ছিলেন আজ নাহয় স্বামীর বাধ্য স্ত্রী হলেন। মাম্মা পাপ্পাকে কিছুটা স্বাভাবিক হতে দেখে মনে মনে খুশি হলো রাত্রি। এভাবে একটু একটু করে সব ঠিক হয়ে যাক।
,,, খাওয়া শেষ হতেই রাত্রি আর ইরা নিজেদের রুমে চলে গেলো,, আরশাদ জামান ও উঠে দাড়ালেন,, তাকে ডিউটিতে যেতে হবে। সুহাসিনী তখন খাবারের ঝুঠা গুলো সাইড করছিলেন,, আরশাদ জামানকে উঠতে দেখে আকষ্মিক বলে বসলেন —
,,, আপনি কি উনাকে এখনো ভালোবাসেন?
,,, সুহাসিনীর কথায় চোখ তুলে তাকালেন আরশাদ জামান,, সহসা বুঝে গেলেন সুহাসিনী কি বুঝাতে চেয়েছে। বিনিময়ে তিনি গম্ভীর কন্ঠে বললেন — অন্যের স্ত্রীকে ভালোবাসা ব্যাক্তিত্বহীনের কাজ,, আমাকে কি আপনার ব্যাক্তিত্বহীন মনে হয়?
,,, স্বল্প কথায় বলা উত্তর টুকু পছন্দ হলো সুহাসিনীর,, আরশাদ জামান আবারও যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই সুহাসিনী ফের সুধালো — তাহলে কি ধরে নিবো নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসা ব্যাক্তিত্ববানের কাজ?
,,, এই পর্যায়ে ও সুহাসিনীর বলা কথাটার মানে চট করেই বুঝে গেলেন আরশাদ জামান। বুঝাটা স্বাভাবিক,, ক্রিমিনালের চোখের দিকে তাকিয়ে ক্রাইম সম্পর্কে ধারনা করতে পারা আরশাদ জামানের কাছে এটুকু বাক্যার মানে বুঝা আহামরি কোনো ব্যাপার না। তিনি দুপা এগিয়ে সুহাসিনীর সামনে গিয়ে দাড়ালেন,, খরখরা পুরুষালী হাতটা সুহাসিনীর মাথায় রেখে ঠোঁটে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটিয়ে বললেন– আমি চেষ্টা করবো৷
২৩-০৭-২০২৬
,,, আগামীকাল জুলাইয়ের ২৪ তারিখ পারুর মৃত্যু বার্ষিকি,, যার ফল স্বরুপ পাঁচ দিন আগে থেকেই আয়োজনের তোরজোর চলছে। বস্ত্রদানের জন্য কেনা পোষাক থেকে শুরু করে এতিম শিশু,গরিব, দুঃখিদের খাওয়ানোর জন্য বাজার সদাই পর্যন্ত সবটাই করা হচ্ছে পাঁচদিন যাবত। এমনকি আগামীকাল সারাদিন ব্যাপি জয়পুরহাট কেন্দ্রিয় কলেজ ক্যাম্পাসে “”পারমিতা হামিদ”” নামক ফ্রী মেডিকেল ক্যাম্পেইন ও হবে। সেখানে বাংলাদেশের বড়ো বড়ো ডক্টর রা উপস্থিত থাকবেন,, সমাজের উচ্চ, মধ্য এবং নিম্নবিত্ত, সকল মানুষ ই ফ্রীতে চিকিৎসা পাবে,, ঔষধ পর্যন্ত ফ্রীতেই দেওয়া হবে,, হেল্থ চেক করা হবে ,, তাতে যদি কারোর মারাত্মক কোনো অসুখ ধরা পরে তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিবে দ্বীপ। পারুটাকে তো বেশিদিন পেলো না,, একমাসের টানাপোড়েন,, দুমাসের প্রেম আর দুমাসের অসুস্থতা তারপর সবকিছুর ইতি। পারু বেচে থাকতে ওর জন্য তেমন কিছুই করতে পারেনি দ্বীপ,, আল্লাহ তায়ালা তাকে সেই সময় টুকুই দেয়নি। তাই মৃত্যুর পর যতোটা করা সম্ভব সবটাই করবে দ্বীপ।
,,, সন্ধার আগ আগ সময়টাতেই পরিপাটি ভাবে রেডি হয়ে নিলো দ্বীপ,, আজ রাতটা সে জয়পুর গোরস্থানেই কাটাবে। আগামীকাল পারুর মৃত্যু বার্ষিকির মিলাদ শেষ করে ফিরতে ফিরতে হয়তো রাত পেরিয়ে যাবে তাই এক্সট্রা কিছু ড্রেস নিয়ে নিলো। সে আবার খুব একটা এলোমেলো হয়ে চলতে পারেনা,, দিনে চার পাচ বার ড্রেস চেন্জ না করলে কেমন অস্বস্থি হয়। ইদানিং গরম হওয়ায় বিষয়টা আরও কয়েক ধাপ বেড়েছে। পরশীকে কয়েকটা ম্যাথ সল্ভ করে দিয়ে ঘরে এলো অর্পনা,, সে এখন অনেকটাই সুস্থ,, একা একা হাটা চলা,, টুকটাক কাজ করা,, সবটাই পারে তবে দ্বীপ কিংবা বাড়ির কেউ সেটা করতে দেয় না। সেই সাথে সিরি বেয়ে উপরে উঠা, নিচে নামা সম্পূর্ণ নিষেধ। দ্বীপকে রেডি হতে দেখে ড্রয়ার খুলে ওয়ালেট বের করে তাতে প্রয়োজনীয় কার্ডগুলো ভরে দিলো,, নিচের ড্রয়ার খুলে কিছু ক্যাস নিয়ে সেটাও রাখলো ওয়ালেটে। বিছানার উপর থেকে ফোন নিয়ে এগিয়ে গিয়ে ওয়ালেট আর ফোনটা দ্বীপের পকেটে রেখে দিলো। ইদানীং সে এই কাজ গুলো করছে,, কিছুদিন আগে দ্বীপের হুট করেই কি যেনো হলো,, সেদিন রাতে এসে কয়েক বান্ডিল টাকা এগিয়ে দিলো অর্পনার দিকে,, অর্পনা কিছুটা অবাক হয়েছিলো। কেনো দিয়েছে জিজ্ঞেস করতেই বললে “” আজ থেকে আমার সকল টাকার হিসেব নিকেস তোমার কাছে থাক,, আমার ওয়্যালেট গোছানো থেকে শুরু করে ওয়্যালেট এগিয়ে দেওয়া তোমার দায়িত্ব “” অর্পনা মেনে নিয়েছে,, এখনো তা পালন করে যাচ্ছে। অর্পনা সরে যেতে নিলে হাত টেনে ধরলো দ্বীপ,, এখন আর মেয়েটাকে হুট হাট টেনে বুকে এনে ফেলা যায় না,, এতে প্রবলেম হবে,, সবটা ঠিকঠাক হতে হতেও বছর খানিকের ব্যাপার৷ অর্পনাকে ধীরো গতিতে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো দ্বীপ,, সামনে আসা চুলগুলো কানের পিঠে গুজে দিয়ে সুধালো–
— জয়পুরহাট যাবে?
,,, অর্পনা কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পরলো — আমি কেনো?
,,,, নিজের জন্মস্থানে একবার যাবে না? কাল পারুর মৃত্যু বার্ষিকি,, আয়োজন ও আছে,, সবাই ই যাবে,, তুমি গেলে আমার ভালো লাগবে।
,,, বিনিময়ে উত্তর করলো না অর্পনা উল্টো প্রশ্ন করলো — আপনি কবে থেকে জানতেন আমি জয়পুরের মেয়ে?
,,,, শুরুতে বললে ভুল হবে,, জানতে একটু লেইট হয়েছে,, প্রথম দিকে পাপ্পা স্বীকার করতে রাজি হয়নি।
,,, অর্পনা যেনো এবার বেশ অবাক হলো — পাপ্পা জানতো আমার জন্মস্থান জয়পুর?
,,, দ্বীপ ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে চিরুনি নিয়ে অর্পনাকে টেনে বিছানায় বসে পরলো,, অর্পনাকে বসালো হাটুর উপর। খোপা করা এলোমেলো চুলগুলো খুলে দিয়ে তাতে চিরুনি চালাতে চালাতে বললো– তোমার আমার বিয়ের শুরুতেই বুঝেছিলেন,, তাই প্রথম দিকে আমার জীবনে না আসার জন্য তোমাকে অনেক ফোর্স করেছিলেন। ভয় পেয়েছিলেন তুমি যদি সত্যিটা জেনে যাও। তবে তুমি তা মানোনি,, আমার কাছে চলে এসেছিলে যার ফল স্বরুপ তুমি আমি আজ একসাথে।
,,, অর্পনা কোনোরুপ রিয়্যাকশন দিলো না,, দ্বীপের শার্টের কলার খুটতে খুটতে প্রশ্ন করলো– আর কে কে জানতো?
,,, হামিদ আব্বু ছাড়া আর কেউ না।
,,, পারুরপুর মা জানেন না?
,,, উনি তোমার ও মা।
,,, এন্সার প্লিজ!!
,,, নাহ!! জানেন না,, উনি মারা গিয়েছে সারে ছয় বছর।
,,, অর্পনার ভাব গতি কেমন স্থিতিশীল হলো– মারা গিয়েছে? কিভাবে?
,,, কার এক্সিডেন্ট।
,,, ওহ!! ভালো,, পারুপুর বাবা কখনো দেখেছে আমাকে?
,,,, বহুবার!!
,,,, কোথায় দেখেছে?
,,, ভার্সিটির ক্যাম্পাসে।
,,, লুকিয়ে দেখেছে? সামনে আসেনি কেনো?
,,, উনার চেহারা পেয়েছো তোমরা দুবোন,, একদম কাটায় কাটায় মিলে।
,,, তাতে কি?
,,, উনাকে দেখলেই তুমি সন্দেহ করতে তাই আমি রিস্ক নিতে চাইনি।
,,, অর্পনা এই পর্যায়ে চোখ তুলে দ্বীপের চোখের দিকে তাকালো– আমি ই কি সেই অপরাজিতা?
,,, দ্বীপ অর্পনার চুলে বেনি পাকাতে পাকাতে উত্তর করলো — হুম!! অপরাজিতা হামিদ।
,,, নামটা সুন্দর।
,,, জয়পুর যাবে?
,,, গেলে দেখা হবে উনার সাথে?
,,, হবে না,,
,,, কেনো?
,,,উনি ও মারা গিয়েছেন
,,, কবে?
,,,তুমি অসুস্থ হওয়ার পর তোমার চিন্তায় হার্ট এটাক করেছেন। তারপর হসপিটালে ভর্তি ছিলেন দুদিন,, তিনদিনের মাথায় পরলোক ঘমন করেছেন।
,,, এই পর্যায়ে অর্পনাটা কেমন করে যেনো হাসলো,, এই হাসিতে কতোটা ব্যাথা ফুটে উঠলো জানা নেই তবে দ্বীপের বুকটা কেমন মুচড়ে উঠলো।হুট করেই মেয়েটার হাসি আরও চওড়া হলো চোখে চিকচিক করা পানি — ভালো!! খুব ভালো,, তারমানে এখানেও আমি নিশ্ব,, নিজের বলতে কেউ নেই? কপাল রে,, এতো ভালো কপাল নিয়ে কেউ জন্মায়? স্যালুট অর্পন। ওপ্স সরি অপরাজিতা। অপরাজিতার তো আবার পরাজয় নেই কারন তার যুদ্ধের ময়দান ফাকা। ইসস!! বিনা যুদ্ধে জয় অর্জন করে নিলাম,, অপরাজিতা ইজ অ্যা উইনার,, আ’ম অ্যা উইনার।
,,,, বলেই শব্দ করে হাসতে লাগলো অর্পনা,, বাচ্চারা যেমন খুশিতে লাফায় তেমনি লাফাতে থাকলো। দ্বীপের কিযে হলো,, শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অর্পনাকে,, যেনো বুকের ভিতর লুকিয়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। অর্পনা তখনো পাগলের মতো হাসতে লাগলো,, হাসতে হাসতে হুট করেই শব্দ করে কেদে দিলো মেয়েটা। ঠোঁট ফুরে বেড়িয়ে এলো — অর্পনার কেউ নেই,, অপরাজিতার ও কেউ নেই,, আমার কেনো নিজের কেউ নেই? আমি কেনো এতোটা নিঃস্ব?
,,, ধীরে ধীরে পাগলামি বাড়তে লাগলো মেয়েটার,, দ্বীপ থামানোর চেষ্টা চালিয়েও থামাতে পারছেনা। অগত্যা অর্পনার গলায় মুখ গুজে দিলো,, উষ্ঠের আদুরে স্পর্শে রাঙিয়ে দিলো রমনির এক পাশের কাধ, গলা। একপর্যায়ে শান্ত হয়ে গেলো অর্পনা,, খামচে ধরলো দ্বীপের পিছনের চুল। ক্ষিন হাসলো দ্বীপ ,, মেয়েটাকে শান্ত করতে তার স্পর্শ জড়িবুটির ন্যায় কাজ করে। দ্বীপের উষ্ঠ জোড়া এবার অর্পনার কান ছুলো,, তাতে চুমু খেয়ে আওড়ালো– কে বলে তোমার কেউ নেই? আমি আছি,, তোমার হাসবেন্ড,, তোমার সোলম্যাট,, সেই সাথে তোমার ভাই ও আছে,, আরাফাত!
,,, অর্পনা অস্ফুট স্বরে সুধালো– আমার আপন ভাই?
,,, হুম!!
,,, আমার?
,,, তোমার!!
,,, আপন?
,,,একদম!!
,,, অর্পনা দ্বীপের শার্টের কলারে চোখ, গাল মুছে মুখ তুলে দ্বীপের দিকে তাকালো,, লম্বা শ্বাস নিয়ে আবদার করলো– তাহলে তাকে ফিরার পথে নিয়ে আসবেন,, বলবেন তার আপু তার অপেক্ষায়।
,,, দ্বীপ আবারো অর্পনার চোখ মুছে দিলো,, চোখের পাতায় চুমু খেয়ে বললো– বাবা মা, বোনের কবরটা একবার দেখবে না?
,,, ওরা বেইমান,, আমি বেইমানদের পছন্দ করিনা।
,,,, বেইমান?
,,, হুম!! যারা দায়িত্ব রেখে পালিয়ে যায় তারা বেইমান,, বেইমানদের সাথে আমার কোনো সাক্ষাৎ নেই।
,,, অর্পনা জয়পুর যেতে রাজি হয়নি বিদায়,অর্পনাকে আরশাদ জামানের কাছে রেখে গিয়েছে দ্বীপ। মেয়েটা এখানে আসতেও রাজি হয়নি তারপরেও জোর জবরদস্তি করে দিয়ে গিয়েছে। এতো বড়ো সত্যিটা জানার পর অর্পনার সেফ জোন দ্বীপের পর একমাত্র তার পাপ্পা আর বন্ধু মহল যার সবটাই অর্পনার বাবার বাড়িতে রয়েছে। বর্তমানে অর্পনা তার নিজের রুমে ঘুমিয়ে আছে। সন্ধায় এসেই শুয়েছিলো আর উঠেনি,, রাত্রিটা এসে বহুবার উঁকিঝুঁকি দিয়ে গিয়েছে কিন্তু অর্পনার স্নিগ্ধ ঘুমটা ভাঙাতে ইচ্ছে করেনি। ইরাদ ও নিজের কাজের ফাকে ফাকে এসে উকি ঝুঁকি দিয়ে গিয়েছে আবার ঘুমন্ত অর্পনার প্রতি মায়া হয়েছে বিদায় ফিরে গিয়েছে৷ রাত নয়টা নাগাত হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন আরশাদ জামান। উনাকে এতো হন্তদন্ত হয়ে ফিরতে দেখে অবাক হয়েছিলেন সুহাসিনী,, রাত্রি তো বললো উনার ফিরতে নাকি লেইট হবে তাহলে এতো দ্রুত ফিরলেন যে? তবে প্রশ্ন করার সাহস পেলেন না,, আরশাদ জামানকে তিনি মোটামুটি আকারের ভয় পান আবার শ্রদ্ধা ও করেন। আরশাদ জামান ফিরে এসেই সোজা মেয়ের ঘরে ঢুকে গেলেন,, অর্পনাকে গভীর ঘুমে দেখে মাথার কাছে বসলেন। মাথাটা সন্তর্পণে টেনে কোলের উপর তুলে বাচ্চাদের ন্যায় মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি কখনোই কোনোদিন মেয়েকে সোজা সাপ্টা ডাকেননি,, পাছে যদি মেয়ে ভয় পেয়ে যায়। ঘুমের মাঝেই মুচকি হাসলো অর্পনা আরেকটু মিলিয়ে গেলো বাবার কোলে,, পেটে মুখ গুজে ঘুম ঘুম কন্ঠে ডাকলো — পাপ্পা!!
,,, বলো মাম্মা!!
,,, এতো দ্রুত চলে এলে যে? তোমার তো আরও দেরিতে ফিরার কথা ছিলো।
,,, দ্বীপ কল দিয়ে বললো তুমি নাকি ওর কল ধরছো না তাই,,
,,, তোমরা যে কেনো আমায় নিয়ে অতো ভয় পাও!! আমি কি এখনো বাচ্চা আছি?
,,, বলেই বালিশের তলা থেকে ফোন বের করলো,, চাপ লেগে সাইলেন্ট হয়ে গিয়েছিলে বোধহয়,, লোকটা ১২৩ বার কল করেছে,, পাগল নাকি এই লোক? অর্পনা আপাতত কল বেক করলো না টেক্সট পাঠালো পরপর পাপ্পার দিকে তাকিয়ে সুধালো — দিনকাল কেমন যাচ্ছে আপনার? আজ অতো লেইট হওয়ার কারন?
,,, আরশাদ জামান মেয়ের মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বললেন — ইদানীং খুবি টাফ একটা কেইসে আটকে গিয়েছি মাম্মা। গতো সাত মাস যাবত শহর, গ্রামের অলি গলি থেকে কয়েকদিন পরপর মানুষ মিসিং হয়ে যাচ্ছে তাও সব ছেলে, মধ্য বয়স্ক পুরুষ, কয়েকজন অর্ধ বৃদ্ধ। তাদের কোনো খোঁজ মিলছে না,, এমনকি লা*স ও পাওয়া যায়নি কোথাও। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়টি কি জানো? প্রতিটি পারশন রে*প কেইসের সাথে জরিত। তাদের হুল বেগ্রাউন্ড চেক করার পর এরকম কয়েকটা কেইস থাকবেই মাস্ট।
,,, বলেই চিন্তিত হলেন আরশাদ জামান,, হুট করেই চোখে হাসলো অর্পনা। তার স্বামীটা ভড্ড ভদ্রলোক,, তার ভদ্রতার তুলনাই হয়না। এইযে কদিন পর পর সিঙ্গাপুরে তাকে ঘুমের ঘোরে রেখে বাংলাদেশে এসে যাবার পথে এটা ওটা নিয়ে গিয়েছিলেন,, এখনো যে নিয়ে আসে,, এগুলো তো ভদ্রলোকদের ই কাজ। অর্পনা মুচকি হেসে দ্বীপকে টেক্সট পাঠালো “” প্রাউড অফ ইউ হাসবেন্ড”” ফোনের স্ক্রিন অফ করে পাপ্পার উদ্দেশ্যে বললো — এতে খারাপ কি? সমাজের আবর্জনা পরিষ্কার হচ্ছে,, এইতো মাস কয়েক আগেও রামিসা নামক এক মেয়েকে এক ন*রপশু নি*র্মম ভাবে হ*ত্যা করেছে,,আসিয়াকে তার বোনের শ্বশুর বাড়ির পুরুষেরা অমানুষের মতো নি*র্যাতন করেছে। তোমাদের সরকার কি আদেও তাদেরকে ন্যায় দিতে পেরেছে? কই, দেখলাম না তো। এখন হুট করে কেউ লুকিয়ে থেকে যদি তাদেরকে ন্যায় দেয় তাহলে ক্ষতি কি?
,,,, ক্ষতির কিছু নেই মাম্মা,, বিষয়টা নিয়ে আমিও সন্তুষ্ট তবে আইনি একটা পদক্ষেপ তো থেকেই যায়।
,,, অর্পনা ব্যাঙ্গাক্তক কন্ঠে আওড়ালো — তোমরা যতোটা সময় ন্যায় এর অপরাধ খুজতে তৎপর থাকো ততোটা অন্যায়ের বেলায় দেখা যায় না। রামিসা, আসিয়া কিংবা বাকি ভিক্টিমদের বাড়ি কতোবার গিয়েছো? এক-দুবার!! অথচ এখন,, রাত দিন ২৪ ঘন্টা উঠে পরে লেগেছো এরকম ন্যায় কে দিচ্ছে,, তাকে গ্রেফতার করার উদ্দেশ্যে। এজন্যই তোমাদের পেশাটা আমার ভালো লাগেনা পাপ্পা,, আর না তোমাদের দেশ ব্যাবস্থা আর সরকারকে ভালো লাগে। বাংলাদেশ আগে যেমন ছিলো এখনো তেমনি আছে,, কোনো ব্যাতিক্রম কিছু পেয়েছো কি? আগে চেয়ারম্যানের সাক্ষর নিতে হাজার টাকা পেইড করতে হতো এখনো তাই করতে হয় নয়তো চেয়ারম্যানের হাতে কলম উঠে না। এমপি মন্ত্রীর কথা বাদ ই দিলাম,, ঘরেই তো আছে দুজন। বাড়িতে ন্যায় পরায়ন হলেও দলীয় অফিসে নিশ্চয়ই আসল রুপ ই নেন,, সু বোরিং।
,,,, আরশাদ জামান বলার মতো ভাষা পেলেন না,, দিন শেষে তাদেরকে সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী চলতে হবে। তাদের কাজ ঐ পর্যন্তই যতোক্ষণ না ক্রিমিনালকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে,, বাকিটা আইন আর সরকারের হাতে। প্রতিটি রে*প কেইসে ক্রিমিনাল খুজে বের করা হয় দুই বা তিনদিনের মাঝে কিন্তু আদালত রায় দিতে সময় নেয় বছরের পর বছর। তাতে ডিটেকটিভদের কি করনীয়? বাবা মেয়ের আলোচনার মাঝেই কফির ট্রে নিয়ে হাজির হলেন সুহাসিনী। অর্পনা আড় চোখে তাকালো সেদিকে,, আরশাদ জামানের সাথে সুহাসিনীর বিয়ে হওয়ার পর সুহাসিনী আন্টির সাথে ফোনে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে অর্পনার,, পাপ্পা কি পছন্দ করে না করে সেসব সম্পর্কেই ধারনা দিয়েছে উনাকে। পাপ্পা কাজ থেকে ফিরে এক কাপ কফি বেশ প্রেফার করে। সেই মাফিক কাজ করতে দেখে মনে মনে সস্থি পেলো অর্পনা। তার পরেও আরও একজন তার পাপ্পার খেয়াল রাখার জন্য তৈরি হচ্ছে যে তাই। সুহাসিনী আরশাদ জামানের দিকে একটা কাপ এগিয়ে দিলেন, পরপর অর্পনাকে দিতেই সে উঠে বসে সেটা গ্রহন করলো। সৌজন্যতার সহিত বললো — আপনার জন্য বানান নি?
,,, সুহাসিনী ইশারায় শায় জানালো,, অর্পনা বললো– নিয়ে আসুন,, ইরাদ আর রাতকেও ডাকুন।
,,, বলেই কফির কাপে চুমুক দিলো,, সুহাসিনী রুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন,, মেয়ে দুটোকে কফি খাওয়ার জন্য আগেই বসার রুমে ডেকেছিলেন। ওদেরকে আসতে দেখে অর্পনার ঘরে যেতে বলায় হুরমুরিয়ে অর্পনার ঘরে ঢুকলো দুজন। আরশাদ জামান জায়গা ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে বিছানার অন্য পাশে বসলেন,, রাত্রি ছুটে এসে অর্পনার পাশাপাশি বসে পরলো,, ইরাদ এলো ধীরে সুস্থে,, সুহাসিনী ট্রেতে করে আরও তিন কাপ কফি নিয়ে এলেন,, রাত্রি ইরাকে দিয়ে তিনিও এক কাপ নিয়ে বিছানার অন্যপাশে বসতে নিলে অর্পনা মানা করলো। আরশাদ জামানের পাশে বসতে বললে কিছুক্ষণ ইতস্তত করলেও পরবর্তীতে অর্পনার কঠোর চোখ রাঙানিতে বসতে বাধ্য হলেন। ধীরে ধীরে আড্ডা জমে উঠলো,, সবাই সবার মতো কথা বলছে তবে অর্পনা কিছুই বলছে না শুধু শুনছে। অর্পনা অনুভব করলো সে পুরো এক ঘর মেলার মাঝে বসে আছে,, সবাই মিলে যেনো একটা সুন্দর সংসার। অথচ এখানে কেউ কারোর আপন না,, কেউ কারোর নিজের না। তার আর রাতের সাথে আরশাদ জামানের রক্তের সম্পর্ক নেই তবুও তারা আরশাদ জামানের মেয়ে,, সুহাসিনীর সাথে রাতের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই তবুও রাত সুবাসিনী আন্টির মেয়ে। ইরাদ তাদের বন্ধু তবুও আরশাদ জামান আর সুহাসিনী তাকে মেয়ের মতোই ট্রিট করছে। “”মাঝে মাঝে রক্তের সম্পর্ক থেকেও আত্মার সম্পর্ক গুলো বেশ আপন হয়ে উঠে,, রক্ত তো শিরায় শিরায় বয়,, আত্মা তো থাকে অন্তরের সন্নিকটে। “”
,,, গভীর নিস্তব্ধতা ঘেরা পরিবেশে আলোচনা প্রবাহিত হচ্ছে দুটো প্রানের মাঝে। একজনার অস্তিত্ব পৃথিবীতে বিরাজমান অন্যজন নেই কোথাও,, তবুও মিশে আছে কাচা পাটির সোঁদা ঘ্রানে। দ্বীপ মির্জা এক পা ভাজ করে অন্য পা ছড়িয়ে বসে আছে পারমিতা হামিদের কবরে হেলান দিয়ে। জয়পুর কেন্দ্রীয় গোরস্থানের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে,, বর্তমানে তার নাম “” ইস্ক মোহাব্বত “” অর্থাৎ””গভীর ভালোবাসা””। এখানে থাকা প্রতিটি কবরের সান বাধানো হয়েছে,, সাদা টায়েল্সে খোদাই করা হয়েছে মৃত এর নাম। সবার কবর পুরোপুরি সান বাধানো হলেও পারমিতা হামিদের কবর খানা শুধু চারদিক থেকে বাধানো হয়েছে,, গোটা গোটা অক্ষরে লেখা হয়েছে মৃত-এর নাম, স্বামির নাম, পিতার নাম আর মৃত্যুর তারিখ ২৪ এ জুলাই। মাঝখানের অংশটাতে ইট ছোয়ানো হয়নি,, সেখানে এখনো রয়েছে কাচা মাটি,, পারু চোখ বুঝার আগে একবার বলেছিলো “” কে বলে আমি থাকবো না? আমায় পাবে দ্বীপ,, যখনি আমার কবরে নাক ঠেকাবে তখনি মাটির ঘ্রানে আমাকে পাবে।”” সেই কথার ভিত্তিতেই কবরের মাঝখানটা খালি রাখা হয়েছে।
দ্বীপ সেখান থেকে এক খাবলা মাটি নিয়ে নাকে ঠেকিয়েছে,, ঘ্রান নিয়েছে প্রান ভরে আবার সেই মাটি গায়েও মেখেছে। দ্বীপ কথা বলছে পারুর সাথে,, কি নিয়ে যেনো গভীর আলোচনা চলছে তার আর পারুর। তবে সেটা মৌখিক নয় আত্মিক,, মনে মনেই বহু কথা সেরে নিচ্ছে দ্বীপ তার অবাধ্য প্রেমিকার সাথে। এই গভীর আলোচনার ভাটা ফেলতে হুট করেই বিদ্যুৎ চমকালো,, শব্দ হলো বিকট করে। চারদিক হতে হাওয়া বইতে লাগলো,, গোরস্থানের চারপাশে দেওয়াল তৈরি করা,, গম্ভুজ আকৃতির ঝানালা রয়েছে কয়েকটা তবে তা সবসময় খোলাই থাকে,, বন্ধ করার যো নেই। মাথার উপর ছাদ দেওয়া হয়েছে,, মসজিদ, মাদ্রাসার ও একই হাল। ছাদ দিয়ে দেওয়াল তৈরি করে আস্ত্র করা হয়েছে মাত্র। এখনো কাজ চলছে প্রতিনিয়ত,, আশা করা যায় বছর খানিকের মাঝেই সব কাজ ফুরাবে৷ বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে তীব্র বাতাসে জ্বলে থাকা মোম বাতি গুলো নিভে গেলো তবে আগরের সুবাস কমলো না মোটে। ধীরে ধীরে প্রকৃতির তান্ডব বাড়তে থাকলো,, একটার পর একটা বাজের শব্দ,, এই সময়টা শ্রাবণের শুরু,, এখন ঝড়, বাদলা খুবি স্বাভাবিক ব্যাপার। তবুও দ্বীপের মনে হলো এই ঝড় টুক তার জীবনকে কেন্দ্র করেই ঘুড়ছে,, জীবন তাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেলো ভাবতে গেলেই তার মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে যায়। ধমকা হাওয়ার সাথে বৃষ্টির ঝাপটা এসে মুখে বারি খেতেই পাশে এসে বসলো কেউ। দ্বীপ নরলো না, মুখে আছড়ে পরা পানিটুকু মুছলো না,, বসে রইলো। ওপাশ থেকে ভেষে এলো — ভালো আছো?
,,, আছি!!
,,, কতোটা?
,,, যতোটা থাকা যায়।
,,, আমাকে মিস করো?
,,, করাটা অস্বাভাবিক?
,,, এতো ত্যাড়া জবাব দিচ্ছো যে?
,,, আমি তো এমনি।
,,, অর্পনার সাথে থেকে শিখেছো?
,,, তুমি কি জীবিত? এভাবে কথা বলতে পারো কিভাবে? তুমি সবটা কিভাবে জানতে পারো?
,,, আমি তোমার মনের তৈরি করা বিভ্রম,,,যা তুমি নিজে তৈরি করেছো।
,,, আমার কি এই বিভ্রম থেকে বেরুনো উচিৎ?
,,,, পারু উত্তর করলো না,, উল্টো প্রশ্ন করলো — আমার আর অর্পনার মধ্যে তোমার জীবনে কার গুরুত্ব বেশি?
,,, দ্বীপ সোজা সাপ্টা উত্তর করলো না বরং প্যাচিয়ে বললো — তুমি আমার ভোরের প্রথম সূর্যালোক, আর অর্পনা আমার শ্রান্ত বিকেলের শান্ত বাতাস।”
,,, সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলো,, আমি অতো কঠিন ভাষা বুঝিনা।
,,, তুমি আমার পথ চলার প্রেরণা, আর অর্পনা আমার অন্তরের প্রশান্তি।”
,,, তাহলে আমি বলবো,, তোমার এই বিভ্রম থেকে বেরুনো উচিৎ,,
,,,, অর্পনা আর মেধা ব্যাতিত পুরো মির্জা বাড়ির সদস্যদের আগমন ঘটেছে জয়পুরহাটে। অর্ধ তৈরিকৃত মসজিদ, মাদ্রাসায় খাওয়া দাওয়ার আয়োজন চলছে। পুরুষ গন সব দুপুরের নামাজ আদায় করে তবারত খাওয়ায় মত্ত হয়েছেন অপরদিকে মহিলাগনকে জায়গা দেওয়া হয়েছে মাদ্রাসায়। মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানার সামনের বড়ো মাঠ টাতে মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে,, সেখানে নরম স্বরে ইসলামিক গজল পেশ করা হচ্ছে। খাওয়া দাওয়া শেষ হলেই মিলাদ পড়ানো হবে,, এরপর বিকাল হতে ছোট খাটো মাহফিল শুরু হবে আর সন্ধা হতে বড়ো বড়ো কয়েকজন মাওলানা সাহেব এসে মাহফিল করবেন৷
,,, সন্ধা নাগাত, পারুদের বাড়িতে এলো দ্বীপ আর বিহান,, আজ যতো রাত ই হোক ফিরে যাবে ঢাকায়। প্রয়োজনে একদম সকাল সকাল পৌঁছে তারপর ঘুমাবে,, মাহফিল শেষে সারা রাত ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরবে নাহয়,, তবুও আজ তার বাড়ি ফিরা চাই। পারুদের বাড়িতে টিনের চালার তিনটে ঘর,, একটা বড়ো ঘর যেখানে আগে পারু,, পারুর বাবা মা আর আরাফাত থাকতো। আরেকটা গোয়াল ঘর,, এখানে ৫ টা গরু রয়েছে,, অন্যটি রান্না-খাওয়ার ঘর। আরাফাত মাত্রই বোনের মৃত্যু বার্ষিকির আয়োজন শেষ করে বিছানায় গা হেলিয়েছে অমনি বাহির থেকে বিহানের ডাক শুনা গেলো। আরাফাত বড়ো ঘরে শুয়েছিলো,, দরজার কপাট খুলে বেরুতেই বিহান বললো — রেডি হয়ে নাও,, মাহফিল শেষ হলে একেবারে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিবো।
,,, আরাফাত বোধয় বুঝলো না তাই দ্বিধান্মিত কন্ঠে সুধালো — আমি কেনো?
,,, তোমার আপু তোমাকে যেতে বলেছে।
,,, আরাফাত আশ্চর্য হলো — আপু? অপরাজিতা আপা?
,,, হুম!!
,,, উনি জানোন আমার কথা?
,,, জানে!!
,,, আরাফাত কিছুক্ষন ভাবলো। অপরাজিতা আপা তার নিজের আপা। তবে কখনো কোনোদিন দেখা হয়নি,, কথা হয়নি,, আপা কি তাকে ভাই বলে মানবে? কেমন আচরন হবে আপার? শুনেছে অপরাজিতা আপা পারু আপার মতোই দেখতে,, আচরন কি পারু আপার মতোই হবে? তার কি যাওয়া উচিৎ? উচিৎ বোধহয়,, আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে সে এই বাড়িটাতে একা থাকে,, ছোট চাচির ঘরে খায়,, এ নিয়ে চাচির কাছে খোটা ও শুনতে হয়। প্রথম দিকে সবাই মায়া দয়া করলেও এখন আর তেমন মায়া করে না কেউ। তার এখন ১৫ বছর,, ক্লাস নাইনে পড়ে,, কাজ বাজ করেনি কোনোদিন,, আব্বা করতেই দেয়নি। বর্তমানে এই পাঁচটা গরুর মাঝে তিনটে গাভী ই ভরসা। প্রতি সকালে দুধ দুয়িয়ে যা পায় তার সবটা টাকা ছোট চাচির ঘরে দেয় তবুও খাওয়ার জন্য তাকে হাজারটা খোটা দেন চাচি। এই বছর যা ধান হয়েছে সব দিয়ে দিয়েছে তবুও চাচির মন ভরেনি। এমতাবস্থায় আপাই আরাফাতের ভরসা,, আব্বা বেচে থাকতে কোনোদিন দুলাভাইয়ের থেকে চার আনা নেননি,, আরাফাতকেও নিষেধ করেছেন,, তাই আব্বা মরার পরে আরাফাত ও এক টাকা নিতে রাজি হয়নি। তবে অপরাজিতা আপা তো তার নিজের আপা,, আপার কাছে থাকলে নিশ্চয়ই আত্মসম্মান খোয়াতে হবেনা? ভেবেই রাজি হলো আরাফাত,, মাথা ঝাকিয়ে বললো — আচ্ছা!! একেবারে রেডি হয়েই আসবো,, আসেন আপনারা ভিতরে আসেন,, ভাইয়া আসেন।
,,, বিহান চোখের ইশারায় না করলো,, এখন তারা বড়ো মাওলানা সাহেবকে রিসিভ করতে যাবে,, রাস্তায় ছেলেপুলেরা অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে পারুর ছোট চাচি, বড়ো চাচির আগমন ঘটলো,, ছুটে এসে নানান কথা বলে দ্বীপ বিহানকে আপ্পায়ন করতে লাগলো,, দ্বীপ ফিরেও তাকালো না। সে খুব ভালো করেই জানে আরাফাতের সাথে তারা কি ব্যাবহার করেন। দ্বীপ বহুবার আরাফাতকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছে কিন্তু ছেলেটা বাবা আর ছোট বোনের মতো তীব্র আত্মসম্মানি হয়েছে। জান দিবে তবুও মান দিবে না,, আরাফাত চাচিদের তোষামোদ দেখে বিরক্ত হলো। বড়োলোক দেখলেই লোভী মহিলাদের রুপ বদলে যায়।
,,, সন্ধা নাগাত বাড়ি ফিরে এলো অর্পনা,, বাড়িতে আপাতত মেধা ব্যাতিত কেউ নেই,, যদিও মেইডরা আছে তবে ওদেরকে তো আর বাড়ির লোক বলা যায় না। পার্কিং লটে বাইক রেখে ধীরো কদমে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো ,,দন্ডায়মান হয়ে দাড়িয়ে থাকা গার্ডদের পেরিয়ে কলিং বেল চাপতেই মেইড এসে দরজা খুলে দিলো। সোফার রুমে বসে আছে মেধা,, সামনে এক গাদা ফাস্ট ফুড,, নিশ্চয়ই বাড়িতে কেউ নেই সেই সুযোগে বাহির থেকে অর্ডার করেছে? অর্পনাকে বাড়িতে আসতে দেখে মুখ চোরা করে ওর দিকে তাকালো মেধা ,, অর্পনা বুকে হাত বেধে চোখ ছোট ছোট করে এগিয়ে গেলো মেধার পানে,, একটা আঙুল খাবার গুলোর দিকে তাক করে বললো — এগুলো কি?
,,,, পিউর সুতি কাপরের ম্যাক্সি পরা রমনির মুখটা আরও চোরা হয়ে উঠলো। মেয়েটার সাত মাস চলে,, পেট ফুলে ঢোল,, হাটতে গেলে কোমরে হাত দিয়ে হাটে,, বিষয়টা দেখলে হাসি পায় অর্পনার। অর্পনাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেধা ঠোঁটে নিস্পাপ হাসি রেখে বললো — পিজ্জা, বার্ডার, শর্মা আর শিঙাড়া।
,,, বাহির থেকে আনিয়েছো?
,,, না, না ওমা আন্টি বানিয়ে দিয়েছে।
,,, অর্পনা বিশ্বাস করলো না। ওমা নামক মেইডকে ডেকে পাঠাতেই ছুটে এলেন তিনি। প্রথম দিকে মধ্যবয়সি ওমা মেধার কথায় শায় জানালেও পরবর্তীতে অর্পনার চোখ পাকানিতে সত্যি বলতে বাধ্য হলো। অর্পনা তপ্ত শ্বাস ফেলে সরিয়ে নিলো সব খাবার,, মেধা কন্সিভ করার পর থেকে বিহান ওকে বাহিরের খাবার খেতে দেয়না। কারন প্র্যাগন্যান্সির সময় বারতি ঔষধ খাওয়া যায় না,, হুট করেই পেট খারাপ হলে কিংবা পেট ব্যাথা করলে কোনোরুপ ঔষধ খাওয়ানো যাবে না। তখন মেধাকে সারাক্ষণ সেই যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে। বিহান মেধার প্রতি বেশ পসেসিভ,, এতোটাই পসেসিভ যে ওর জন্য রেগুলার বাজার করা হয়,, আগের দিনের বাসি সবজি তার জন্য রান্না করা হয়না। মির্জা বাড়িতে বরাবর সরিষার তেল খাওয়া হয়,, এই ক্ষেত্রে মেধার জন্য অলিভ ওয়েল দিয়ে রান্না করা হয়। মেধার প্রতিদিনকার জামা প্রতিদিন কাঁচা হয়,,যেনো কোনোরুপ জীবানু না ছড়ায়,, মেধাকে ছুতে হলে ভালো মতো হাত ধুয়ে নিতে হয় আরও নানান ধরনের রেস্টিকশন তো আছেই৷ মেধা এসব নিয়ে মাঝেমধ্যে বেশ বিরক্ত হয়,, এতো আহ্লাদ করতে হবে কেনো? সে কি বাচ্চা? অর্পনা খাবারগুলো আরিব আর পরশীর জন্য সাইড করে রেখে ওমাকে বললো এসব খাবার বাড়িতে বানিয়ে দিতে। তবে এতে তীব্র বিদ্বেষ জানালো মেধা,, এক প্রকার কান্না জুড়ে দিয়ে বললো — আসলেই তোমরা ভাই বোন দুটো যা তা,, আমার ভালো তোমাদের সহ্য হয়না। আমি ওদের বানানো টা খাবো না,, পিজ্জা বক্স থেকে খাবার খাবো।
,,, অর্পনা বিরক্ত হলো,, মেয়েটা ইদানীং সাপের পাঁচ পা দেখেছে,, রাত বিরেতে এটা ওটা আবদার করছে আর বিহান সেটা মিটাতে না পারলে কান্না কাটি জু্রে দিচ্ছে। প্রেগন্যান্ট হলে এতো বাচ্চামু করতে হবে কেনো? মানুষ কি আর প্রেগন্যান্ট হয়না? মেধা তখনো কাদছে,, অর্পনা তপ্ত শ্বাস ফেলে পিজ্জা বক্স রেস্টুরেন্টে কল করলো,, এখানকার খাবার তার ও বেশ পছন্দ তাই নম্বর ফোনেই সেইভ করা ছিলো। মানুষ রেস্টুরেন্টে ফোন করে খাবার অর্ডার করার জন্য অথচ অর্পনা ফোন করেছে সের্ফ অর্ডার করার জন্য। ইতিহাসে বোধহয় এটাই প্রথম অর্ডার যেখানে রেস্টুরেন্ট হতে খাবারের বদলে মানুষ অর্ডার করা হলো। প্রথম দিকে অর্পনার কথায় রেস্টুরেন্টের ম্যানাজার দ্বিমত করলেও অর্পনা যখন বেশি টাকা অফার করলো তখন ম্যানাজার রাজি হয়ে গেলো। অর্পনার কথায় ম্যানাজারের পাশাপাশি মেধাও বেশ অবাক হয়েছিলো,, এরকমটা হয় নাকি? রেস্টুরেন্ট থেকে লোক এসে রান্না করে দিয়ে যায়? তবে যখন দেখলো লোকটা রাজি হয়ে গিয়েছে তখন মেধার চোখ জোড়া চকচক করে উঠলো। এরকম হুটহাট অবিশ্বাস্য কাজ বোধয় অর্পনার দ্বারাই সম্ভব। অর্পনা কথা বার্তা শেষ করে ফোন কেটে মেধার উদ্দেশ্যে বললো — বসো এখানে,, আমি ফ্রেস হয়ে আসছি। সের্ফ এলে মেইডদের বলবে কোথায় কি রাখা আছে বলে দিতে।
,,, মেধা মাথা ঝাকালো,, পরপর টিভি অন করে টি টেবিলে পা তুলে টিভিতে মনোযোগি হলো। অর্পনার আচরনে বড্ড অবাক হলেন ওমা – মেইড। মেয়েটার প্রতিটি পদাচরনে উদ্ধত বিরাজ করে,, কথায় ঝড়ে ক্ষমতার ত্যাজ। যেনো টাকা থাকলেই সব পাওয়া যায়,, আর ঐ টাকা টা অর্পনা জামানের রয়েছে। সে অন্যের টাকায় নয় বরং নিজের টাকায় টাকার দাঁড় দেখায়,,
,,, ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে মেধার পাশে বসলো অর্পনা,, কিচেনে সের্ফ রান্না করছে,, মেইডরা সাহায্য করছে তাকে। অর্পনাকে পাশে বসতে দেখে মেধা বাটিতে থাকা পপকর্ন এগিয়ে দিয়ে বললো — খাবে?
,,, অর্পনা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — অনাহিতা আপু যখন প্রেগন্যান্ট ছিলো তখন আপু কিছু খেতে পারতো না অথচ তুমি সারাদিন খাও। এতো খাই খাই কবে থেকে হয়ে গেলে বলোতো?
,,, মেধা নিস্পাপ হেসে পেটে হাত রাখলো — যবে থেকে আমার পেটে আরও একটা প্রানের সঞ্চার হয়েছে তবে থেকে। এসব তো আমি খাইনা,, আমাদের ছেলে খায়।
,,, তোমার ছেলে হবে,, তুমি কি করে জানলে?
,,, ডক্টর বলেছে,,
,,, অর্পনা কিছু বললো না,, তাকিয়ে রইলো মেধার দিকে। বাচ্চার কথা বলতেই মেয়েটার মুখ কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কি আছে এই বাচ্চার মাঝে? মা হওয়ার অনুভুতিটা ঠিক কেমন? সে তো বাচ্চা পছন্দ করেনা। অর্পনার কৌতুহল হলো,, সে বোকার মতো প্রশ্ন করলো — তোমার কেমন ফিল হয়? মা হওয়াতে কি খুব আনন্দ থাকে? এটা কেমন ফিলিংস?
,,, মেধা অর্পনার হাত টেনে নিজের পেটে রাখলো,, অর্পনা তখনো বোকা বোকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। অনেকটা সময় পেরুনোর পর অর্পনা অনুভব করলো তার পায়ে লাত্থি মেরেছে কেউ। অর্পনা ঢোক গিলে মেধার দিকে তাকালো,, মেধা ভ্রু নাচিয়ে সুধালো — কেমন ফিল হলো?
,,, অর্পনা কিছু বলতে পারলো না,, এই অনুভুতির নাম তার জানা নেই। সে প্রকাশ করতে অপারগ। অর্পনা ভাবলো,, মেধা আর বিহান ভাইয়ের সন্তানের অস্তিত্ব টের পেয়ে যদি তার এমন অবস্থা হয় তাহলে তার পেটে যদি দ্বীপ আর তার নিজের বাচ্চার অস্তিত্ব টের পায় তখন কেমন অনুভুতি হবে?এর থেকেও গাড়ো হবে কি?
,, ফাকা রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে দ্বীপের কালো রঙা গাড়িখানা,, ড্রাইভিং সিটে বসে আছে দ্বীপ আর তার পাশে বিহান। রাত ৩ টা পেরিয়ে যাওয়ায় আরাফাত বেক সিটে ঘুমাচ্ছে। গাড়ি হাই স্পিডে কোনো যানজট হীন চলার দরুন ভালোই ঘুম হচ্ছে ছেলেটার। দ্বীপকে এতো স্পিডে গাড়ি ড্রাইভ করতে দেখে বিরক্ত হলো বিহান,, সুধালো — আমি নাহয় বাড়িতে প্রেগন্যান্ট বউ রেখে এসেছি,, তর এতো তাড়া কিসের ভাই? বাড়িতে গিয়ে কি করবি?
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬১
,,, বিহানের কথার বিপরীতে দ্বীপ বাড়ির স্পিড আরেকটু বাড়িয়ে উত্তর করলো — উই পোক চিনিস? তর বোন হচ্ছে উই পোকা। সারাক্ষণ আমার বুকের বামপাশের হৃদযন্ত্রটা কূট কূট করে কামড়ে ক্ষত বিক্ষত করে দেয়। তাই নিজের হৃদয় বাচাতে তর বোনের সাক্ষাৎ বড্ড প্রয়োজন,, সেটা যতো দ্রুত সম্ভব।
