৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫
রুপান্জলি
ইদানীং হুটহাট মাঝরাতে রমনার রাস্তায় দুটো কপোত-কপোতীর দেখা মিলে। প্রায়শই রমনার পথ ধরে উড়ে বেড়ায় তারা। উড়তে উড়তে কোথাও গিয়ে একটু থামে, দুজনার মাঝে একটু ভালোবাসাবাসি হয়, তারপর আবার এগিয়ে যায় গন্তব্যহীন। এগিয়ে যেতে যেতে আবার থেমে ঝগড়াঝাঁটিও করে। এই ঝগড়াটা আবার যে-সে ঝগড়া নয়, একদম সাংসারিক, ভালোবাসাময় ঝগড়া। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। রাত ১টা নাগাদ বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল দুজন। ডানা স্বরূপ সঙ্গে নিল সদ্য কেনা BMW k 1300 S সিরিজের বাইকটি। বিয়ের পর এই দেড় বছরে অর্পনা জামান দ্বীপ মির্জার নামে একটা অভিযোগ করারও ফুরসত পেল না। লোকটা সেই সুযোগই দেয় না। অর্পনা এতে বিরক্ত। বিষয়টা নিয়ে লোকটার সঙ্গে বেশ ঝগড়া করে। কেন তার সব কথা রাখতে হবে? কেন এত এত আদর-ভালোবাসা দিতে হবে? এসব পেতে পেতে অর্পনা হাপিয়ে যাচ্ছে না? কিন্তু দ্বীপ মির্জা ওসব ঝগড়াঝাঁটিতে কর্ণপাত করে না। করে কী লাভ? সে তো বাসবেই। ভালোবাসতে বাসতে অতিষ্ঠ করে ফেলবে অর্পনা জামান নামক রমনিকে। তবে এখানেও একটা কিন্তু থেকে যায়। দ্বীপ অর্পনার সব ইচ্ছা পূরণ করলেও একটা ইচ্ছা যেন দেখেও দেখে না। পূরণ করার চেষ্টাও করে না। উল্টো অর্পনা আবদার করলেই রামধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। নেহাতই অর্পনার ওসব হুটহাট সামান্য বিষয় নিয়ে রাগ-অভিমান করার ধাত নেই, নয়তো এতদিনে দুজনার মাঝে কয়েকবার বিচ্ছেদের ঘোষণা হয়ে যেত। অর্পনা তীব্র অনিহা নিয়ে বাইক রাইড করতে থাকা খারুস লোকটার দিকে তাকাল। কিভাবে গলায় থুতনি ঠেকিয়ে রেখেছে দেখো! যেন উনার বাপের টাকায় কেনা সম্পত্তি। অর্পনা লোকটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— আমাকে একটা মাওলানা সাহেবের কাছে নিয়ে যাবেন?
বড্ড ধীরে, স্লো গতিতে রাইড করছিল দ্বীপ। কোনো তাড়া নেই, কোনো গন্তব্য নেই; শুধু স্নিগ্ধ পরিবেশে একে অপরকে অনুভব করার চেষ্টা । দ্বীপ বাইকের গতি আরও খানিকটা কমিয়ে দিল। অর্পনার গলা থেকে থুতনিটা সরিয়ে এনে গালে গাল ঘষে শুধাল—
— কেন? কোনো প্রয়োজন?
নিজের নরম-সরম গালটায় লোকটার গালে থাকা শক্ত, খোঁচা খোঁচা দাড়ির আস্তরণ পড়তেই কেঁপে উঠল অর্পনা। মনে অনুভূতির জোয়ার বয়ে চলা সত্ত্বেও নিজেকে অটল রেখে শক্ত কণ্ঠে আওড়াল—
— আপনাকে একটু ঝাড়ফুঁক করিয়ে আনব। কথা-টথা শুনেন না যে, এই কারণে।
অর্পনার কথা ফুরানোর সঙ্গে সঙ্গে বাইক থেমে গেল। ভ্রু গুটিয়ে সরু চোখে অর্পনার মুখের দিকে তাকাল দ্বীপ, যেন বোঝার প্রয়াস চালাচ্ছে মেডামের কোন কথাটা সে রাখেনি বা শুনেনি। দ্বীপের দৃষ্টির মানে বুঝতে পেরে মুখ গোমড়া করে নিল রমণী। সে বাইকের সামনে বসে আছে, তবে দ্বীপের দিকে ফিরে। অর্পনা দ্বীপের পেট থেকে হাত সরিয়ে গলায় রাখল। মুখে নিষ্পাপ ভাবমূর্তি ধরে রেখে মাথাটা হালকা কাত করে আওড়াল—
— কী হয় একটু পিছনে বসলে? আমার খুব শখ, আপনি পিছনে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখবেন আর আমি বাইক রাইড করব। খুব স্পিডে।
— পিছন থেকে জড়িয়ে ধরা আমি পছন্দ করি না। যা হবে, সব সামনাসামনি।
— ঢং! ঘরের ভিতর যখন কাজ করি, তখন তো কোনো দিক মানেন না। সারাক্ষণ টানা-হেঁচড়া, ছুড়ে ফেলা আর নিজের দানবীয় ওজনটা ছেড়ে দেওয়া ব্যতীত কী পারেন আপনি? বদমাশ লোক।
— এর বাইরে কিছুই পারি না?
— ওহুম, পারেন।
অর্পনার কথা ফুরানোর আগেই ওর নাকের ডগায় দাঁত বসিয়ে দিল দ্বীপ। ব্যথায় ককিয়ে উঠল মেয়েটা। চোখে পানি জমল মুহূর্তেই। নাক অত্যন্ত নরম আর সেনসিটিভ জায়গা হওয়ার দরুন মানুষ না চাইলেও তার চোখ জ্বালা করে ওঠে। অর্পনার বেলাতেও তাই হয়েছে। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে দ্বীপের বুকে ধাক্কা মারল অর্পনা। ঠোঁট ফুঁড়িয়ে বেরিয়ে এল—
— রাক্ষস! খেয়ে ফেলবেন নাকি? আল্লাহ! আমার নাকটা এমনিই বোচা, তার ওপর একটা রাক্ষসের নজর পড়েছে। আমার নাকের কিছু হলে আপনাকে আমি খুন করে ফেলব। দেখিয়েন।
দ্বীপ দাঁতের চাপ আরেকটু বাড়াল। এই পর্যায়ে ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল রমণী। চোখের পানি গাঢ় হতেই দ্বীপ সরে এসে অর্পনার নাকটাতে চুমু খেল। অর্পনা গাল ফুলিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নাক ডলতে লাগল। দ্বীপ ওর মুখটা নিজের দিকে এনে আবারও নাকে চুম্বন করল। এই পর্যায়ে চুম্বনটা গভীর ছিল। অর্পনা এবার স্থির হয়ে পড়ল। থুতনিতে চুম্বন করতে নিতেই দ্বীপের মুখ চেপে ধরল অর্পনা। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল—
— না, না, একদম না। আপনার এই সর্বনাশা চুম্বন আমি এই মুহূর্তে অ্যালাও করব না।
দ্বীপ কি মানে সেসব? অবাধ্য, বেপরোয়া না সে? নিজের অবাধ্যতার প্রমাণ দিতে মুখ চেপে রাখা অর্পনার হাতের তালুতে ভেজা চুম্বন করল। তীব্র শিহরণে না চাইলেও কেঁপে উঠে চোখ বুজে নিল রমণী। লোকটা আবারও একই কাজ করতেই হাতটা অবশ হয়ে কখন যে নিচে পড়ে গেল, বুঝতেই পারল না মেয়েটা। দ্বীপের ঠোঁটে বিজয়ের হাসি। এই রমণীকে কীভাবে আয়ত্তে আনতে হয়, তা বেশ ভালো করেই জানা আছে তার। অর্পনার দিক থেকে কোনো বাধা না পেয়ে এবার সত্যি সত্যিই থুতনিতে ওষ্ঠ ছোঁয়াল দ্বীপ। থুতনিতে ওষ্ঠ ছোঁয়াতেই অর্পনার গা গুলিয়ে উঠল। জোরপূর্বক নিজেকে ছাড়িয়ে মুখ নামিয়ে ঝরঝর করে বমি করে দিল মেয়েটা। দ্বীপ যেন কিছুই বুঝল না। মুহূর্তেই হকচকিয়ে গিয়ে অর্পনাকে আগলে নিল। টেনে বুকের সঙ্গে মিশাতে নিতেই বমি করা থামিয়ে চোখ পাকাল মেয়েটা। সে এদিকে বমি করছে, তাকে বমি করার সুযোগ না দিয়ে লোকটা কিসব জড়িয়ে ধরা-টরা শুরু করে দিয়েছে! এভাবে জড়িয়ে ধরলে সে বমিটা করবে কী করে? অর্পনার চাহনিতে কেমন ভড়কে গেল দ্বীপ। মুখ হতে আসা বমির বিদঘুটে গন্ধে আবারও বমি করে দিল মেয়েটা। দ্বীপ এবার রয়েসয়ে অর্পনার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। মেয়েটা বমি করছে তো করছেই, থামার নামগন্ধ নেই। পেটের ভেতরে থাকা খাবার বের হয়ে যখন টক পানির আবির্ভাব ঘটল, তখনই বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে নিল অর্পনা। বমি করার ক্ষেত্রে এই বিষয়টাই সবচেয়ে বিরক্তিকর। মনে হয় যেন এখনই নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসবে।
অর্পনাকে কষ্ট পেতে দেখে অত সতো ভাবল না দ্বীপ।জোর করে টেনে ওষ্ঠযুগল দখল করে নিল। অর্পনা এবার অবাক হলো না। এর আগেও লোকটা এমন করেছে। পোড়াবাড়িতে সে যখন ওই কাটা জিভ, দাঁত আর হাতের আঙুল দেখে বমি করেছিল, তখনও লোকটা এভাবেই সামলেছে ওকে।
অনেকটা সময় পেরোনোর পর কিছুটা শান্ত হলো অর্পনা। ক্লান্ত মাথাটা হেলিয়ে দিতেই ছেড়ে দিল দ্বীপ। অর্পনার কোমল মুখটা খরখরে হাতের আজলায় নিয়ে গাল-মুখ মুছে দিতে দিতে বিচলিত কণ্ঠে আওড়াল—
— ভেলোরা! কী হয়েছে তোমার? কোথায় কষ্ট হচ্ছে? বলো আমাকে।
অর্পনা লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে দ্বীপের দিকে তাকাল। সব কেমন আবছা লাগছে, মাথা ঘুরছে। সে দ্বীপের গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে উত্তর করল—
— বমি আসছে, গা গুলাচ্ছে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকেও ব্যথা করছে। আমি মনে হয় জ্ঞান হারাবো, দ্বীপ। আপনি বিচলিত হবে,
সত্যি সত্যিই জ্ঞান হারাল মেয়েটা। পিছন দিকে হেলে পড়ল কিছুটা। দ্বীপ তাড়াহুড়ো করে আগলে নিল বুকে। গালে কয়েকবার চাপড় মেরে ডাকল, কিন্তু অর্পনা নির্বিকার। কোনো উত্তর নেই। অর্পনার থেকে কোনো রূপ উত্তর না পেয়ে আরও বিচলিত হলো দ্বীপ। উন্মাদের ন্যায় আচরণ করতে লাগল ছেলেটা। দ্বীপের একটা বদঅভ্যাস আছে। চরম মাত্রার বদঅভ্যাস, যাকে বলে। এই বদঅভ্যাসটা তৈরি হওয়ার পেছনে সম্পূর্ণ অর্পনার হাত রয়েছে। অর্পনা ওকে নিজের সঙ্গে এমনভাবে অভ্যস্ত করেছে যে, অর্পনা রাগ করে চুপ থাকলে কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্বীপের মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়। হাত ও কপালের রগ অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে থাকে। এখনও তার ব্যতিক্রম হলো না। দ্বীপের অসহনীয় মাথাব্যথা করছে। তবে সেসবের আপাতত মন নেই তার। সে এক হাতে অর্পনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে বাইক স্টার্ট দিল।
গভীর রাত আর পার্সোনাল মোমেন্ট হওয়ায় নিজের সঙ্গে কাউকে নিয়ে আসেনি। এখন কাউকে কল দিয়ে সময় নষ্ট করার সময়টুকুও তার কাছে নেই। অগত্যা ফুল স্পিডে শহরের অলিগলি, ভাঙাচোরা রাস্তা পাড়ি দিতে থাকল।নিজের মনকে শান্তনা দিতে আওড়াল
— কিছু হবে না, কিছু হবে না ভেলোরার। আমরা এখনই হাসপাতালে যাব, আর সব ঠিক হয়ে যাবে।
সকাল ৫টা ২৩।
মাত্রই জ্ঞান ফিরেছে অর্পনার। চোখ মেলে নিজেকে হাসপাতালের বেডে দেখে অবাক হওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। সে জানত, জ্ঞান ফেরার পর সে নিজেকে এখানেই পাবে। এই সাত মাসে এসব বহুবার হয়ে এসেছে। তবে সামনে বসা রমণীকে দেখে বড্ড আফসোস হলো তার। মহিলাটা কেমন ঘুমে ঢুলছে। নিশ্চয়ই মাঝরাতে লোক দিয়ে তুলে এনেছে তার চিকিৎসা করাতে। লোকটার এসব হুটহাট পাগলামিতে অর্পনা কী বলবে, তার ভাষা খুঁজে পায় না।প্রতিবার জ্ঞান হারানোর আগে লোকটাকে বিচলিত হতে নিষেধ করে। কিন্তু নাহ! বিচলিত হবেন কী? এই লোক তো পাগল হয়ে যায়। যেন উনারই দুনিয়াতে বউ আছে, আর কারোর নেই। অর্পনা ডক্টরের থেকে চোখ সরিয়ে আড়চোখে দ্বীপের দিকে তাকাল। চোখ-মুখের অবস্থা দেখো! যেন কতদিনের অনাহারী তিনি। বউ মরে যাওয়ায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছেন। অর্পনার জ্ঞান ফিরতে দেখে ডক্টর যেন স্বস্তি পেলেন। তিনি একজন গাইনি চিকিৎসক। হুট করেই মাঝরাতে নিজের দোরগোড়ায় কালো পোশাকধারী লোকেদের দেখে একপ্রকার মরি-মরি অবস্থা হয়েছিল উনার স্বামীর। ভেবেছিলেন ডাকাত এসেছে বোধহয়। কিন্তু হলো তার ব্যতিক্রম। লোকগুলো অত্যন্ত নম্র ভাষায় জানাল, দ্বীপ মির্জা উনাকে তলব করেছেন। এতগুলো দিনে এভার কেয়ার হাসপাতালের ডাক্তারদের কাছে দ্বীপ মির্জা রাজনৈতিক নেতার চেয়েও অধিক জনপ্রিয় একজন বউ-পাগল হিসেবে। এরকম রাতবিরেতে ডাক্তার তুলে আনা, হাসপাতালে এসে হাঙ্গামা-ভাঙচুর করা, ডাক্তারদের থ্রেট দেওয়া, নার্সদের ধমকাধমকি করা, নতুন কিছু নয়। অর্পনার যত্নে সামান্যতম অবহেলা হলেই কেমন উন্মাদ হয়ে ওঠে মানব।
,ডক্টর তাছলিমা অর্পনার থেকে নজর সরিয়ে আবারও রিপোর্টে মনোযোগ দিলেন। সমস্ত রিপোর্ট চেক করার পর চোখ-মুখে গম্ভীরতা ফুটিয়ে বললেন—
— অপারেশন হয়েছে সাত মাস। এর মধ্যে বেবি নেওয়ার খুব প্রয়োজন ছিল? আপনাদের ধারণা আছে বিষয়টা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? বাচ্চাটার ক্ষতি হয়ে গেলে কী করবেন?
ডক্টরের কথা শুনে চোখ ছোট ছোট করে তাকাল অর্পনা। ডক্টর বেশ সিরিয়াস। চোখে-মুখে অসন্তুষ্টি।
অর্পনা আবারও দ্বীপের দিকে তাকাল, পরপর নিজের পেটের দিকে। এরপর মুহূর্তেই খিলখিল করে হেসে উঠল মেয়েটা। ওকে এভাবে হাসতে দেখে ভড়কে গেলেন ডক্টর। দ্বীপ কেমন অনুভূতিশূন্য নজরে অর্পনার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন তার কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না।অর্পনা হাসতে হাসতে বেডে গা হেলিয়ে দিল। পেটে হাত রেখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আওড়াল—
— হোয়াট? আমি মা হব? মানে আমার পেটে বেবি আছে? ও আমার ভরসায় পৃথিবীতে আসবে? আমার? আমি ওকে লালন-পালন করে মানুষের মতো মানুষ বানাবো? আল্লাহ! আমি নিজেই তো মানুষ হতে পারিনি। সারাদিন ভণ্ডামি করে বেড়াই।(পেটের দিকে তাকিয়ে আবার বললো) আমি নিজেই ত্যাড়ামি করতে করতে তোর পাপ্পা আর নানুভাইয়ের জীবন অতিষ্ঠ করে দিই, বাপ। তোকে আমি কী বানাব?
বলেই আবারও হাসতে লাগল। অর্পনার এহেন আচরণে ডক্টর হাসবেন নাকি অবাক হবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। উনার আট বছরের ক্যারিয়ারে কত পেশেন্টকে মা হওয়ার সংবাদ জানিয়েছেন। কেউ অবাক হয়েছে, কেউ খুশি হয়েছে, আবার কেউ খুশিতে কেঁদে দিয়েছে। কিন্তু এমনভাবে হাসতে কাউকে দেখেননি। তার ওপর এসব কথাবার্তা! না চাইলেও ফিক করে হেসে দিলেন ডক্টর তাছলিমা। দ্বীপের দিকে না তাকিয়েই প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বললেন—
— বেশি সময় গড়ায়নি। প্রেগন্যান্সির মাত্র দুই সপ্তাহ চলছে। প্রপার খেয়াল রাখলে ডেলিভারিতে খুব একটা প্রবলেম হবে না। অবশ্যই রেগুলার চেকআপ এবং গাইডলাইনের মধ্যে থাকতে হবে। কিছু নিয়ম লিখে দিচ্ছি, তা অক্ষরে অক্ষরে মান্য করে চলতে হবে। আর আজকের মধ্যেই ডক্টর আব্রাহামের সঙ্গে আমাকে একবার যোগাযোগ করিয়ে দেবেন।
বলেই দ্বীপের দিকে প্রেসক্রিপশনটা এগিয়ে দিলেন।তবে দ্বীপের কোনো হেলদোল নেই। সে এখনও অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে আছে। অর্পনারও সেসব নিয়ে ভাবান্তর নেই। সে চুপচাপ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে।
দুই স্বামী-স্ত্রীর এহেন অবস্থা দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললেন তিনি। কিছুটা উচ্চস্বরে দ্বীপের উদ্দেশে বললেন—
— আপনি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন, মিস্টার মির্জা? কয়েকটা নরমাল মেডিসিন লিখে দিয়েছি। এগুলো নিয়ে আসুন। আপাতত হার্টের ওষুধ খাওয়াটা বন্ধ থাক। ডক্টর আব্রাহামের সঙ্গে আলোচনা করার পর যে ওষুধগুলো সিলেক্ট করা হবে, সেগুলোই খাওয়াবেন।
ডক্টরের কথায় যেন সম্বিত ফিরল দ্বীপের। সে তাড়াহুড়ো করে কোনোদিকে না তাকিয়েই প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে নিচে চলে গেল। অর্পনার এতেও ভাবাবেগ নেই। সে এখনও পেটে হাত রেখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ডক্টর হাতে থাকা ফাইলে অর্পনার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সকল রোগের রিপোর্ট ও ইনফরমেশনের দিকে নজর বুলিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললেন। উনার সামনে শুয়ে থাকা মেয়েটা একজন ম্যাসোকিস্ট, যাকে এক কথায় সাইকোপ্যাথ বলা চলে। অহেতুক বিভিন্ন ওষুধ খাওয়ার ফলে কিডনি, ফুসফুস, লিভার অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু মাস আগে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে। বর্তমানে এই সব রোগ নিরাময়ের ওষুধ একসঙ্গে চলছে। এত ওষুধ খাওয়ার পরও পেটে বাচ্চা আসার কথা না। এসেছেও যখন, এত ওষুধের মাঝে বাচ্চাটা আদৌ বাঁচবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বাচ্চাকে বাঁচাতে চাইলে অনেক ওষুধ বাদ দিতে হবে। তখন কি এই রমণীটা বাঁচবে? জানা নেই উনার। তবে চেষ্টা তো করতেই হবে। নিজের সুস্থতার জন্য একটা বাচ্চাকে যেমন বিসর্জন দেওয়া যায় না, তেমন বাচ্চাকে বাঁচাতে নিজেকেও বিসর্জন দেওয়া যায় না।নডক্টর তাছলিমা অর্পনার উদ্দেশে বললেন—
— মা হচ্ছেন। এখন থেকে এসব খামখেয়ালি বাদ দিন। জীবন মানেই ভাঙাগড়া। কেউ হারিয়ে যাবে, আবার কেউ নতুন করে আসবে। এতদিন মাকে হারিয়ে খামখেয়ালি করেছেন, এবার মা হয়ে সন্তানের জন্য এসব ছেড়ে দিন। মাথায় রাখুন, আপনার পেটে আপনার অংশ রয়েছে, যেটা একান্তই আপনার আর আপনার স্বামীর। আপনাদের নিজের। আর নিজের জিনিস আগলে রাখতে হয়।
এই পর্যায়ে ভাবুক অর্পনার চোখ থেকে দু-ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো— আমারও নিজের কেউ হবে? যার কাছে আমিই হব তার ফার্স্ট চয়েস? অন্য কারোর ব্যাকআপ হব না?
সকাল ৭টা ৫১ মিনিট।
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হলেও সত্যি একদিকে অর্পনার প্রেগন্যান্সির খবর, অপরদিকে মেধার লেবার পেইন উঠেছে। সকালে গার্ড যখন বিহানকে কল করে জানাল তাদের বড় স্যার বাবা হতে যাচ্ছেন, তখনই খুশিতে লাফিয়ে উঠেছিল মেধা। আর সেই লাফিয়ে ওঠাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েটার। মিনিটখানেকও পেরোতে পারেনি, পেটের চিনচিনে ব্যথা থেকে ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে ব্যথায় চিৎকার করে উঠল মেয়েটা।
বিহান ছেলেটা মেধার প্রতি একটু বেশিই উইক। এতোটাই উইক যে মেধার লেবার পেইন ওঠার দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে, তবুও ছেলেটার কান্না থামার নাম নেই। একদিকে কেবিনে শুয়ে শুয়ে মেধা কাঁদছে, আর অপরদিকে বাইরে বসে বসে বিহান কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে ছেলেটা। এদিকে দ্বীপের দেখা নেই। সকালে প্রেসক্রিপশন হাতে বেরিয়েছে, এখনও আসার নাম নেই। কী হয়েছে কে জানে? গার্ড দিয়ে ওষুধ পাঠিয়ে দিয়েছে, তবুও নিজে আসার প্রয়োজন মনে করেনি। অর্পনার মন খারাপ থাকার কথা থাকলেও করল না। আপাতত সে মেধাকে নিয়ে চিন্তিত। মেয়েটা দুই ঘণ্টা যাবৎ কষ্ট করে যাচ্ছে, তবুও কোনো ফলাফল পাচ্ছে না। বিহান কয়েকবার সিজারিয়ানের মাধ্যমে ডেলিভারি করতে চাইলেও মেধা রাজি হয়নি। সে নরমাল ডেলিভারি চায়। এদিকে বিহানের মন মানছে না। সে কিছুক্ষণ পায়চারি করছে, আবার রেস্ট চেয়ারে বসছে। আবার পায়চারি করছে, আবার বসছে। ক্ষণে ক্ষণে শার্টের হাতায় চোখ মুছে লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছে। বাবাদের হয়েছে যত জ্বালা! শাহিন মির্জা পারছেন না ছেলেকে আবার ছোট বানিয়ে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে রাখতে। সেই কখন থেকে ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। কার বিহান কে? কারও কথা কানে তুলছে না সে। বারবার মেধার কাছে যেতে চাইছে। হাসপাতালে এখন অর্পনা, অর্পনার শ্বশুর, ছোট চাচি-শাশুড়ি, বড় চাচা-শ্বশুর আর শাশুড়ি রয়েছেন। বাকিদের আপাতত আসতে নিষেধ করে দিয়েছেন মাহিদ মির্জা। এখনই হাসপাতালে এসে ভিড় জমানোর প্রয়োজন নেই। আগে বাচ্চাটা হোক, তারপর না হয় সবাই এসে দেখে যাবে। অর্পনা আপাতত দ্বীপের প্রতি ভীষণ বিরক্ত। তার কথা না হয় বাদই দিল, যে ভাই উনার সব কাজ, বিপদ-আপদে পাশে থাকে, একেবারে দোসর বলা চলে, সেই ভাইয়ের এহেন অবস্থায় কোথায় উনি? এই উনার দায়িত্ববোধ? স্বামীর দায়িত্বহীনতায় বিরক্ত অর্পনা এবার, স্বামীর দায়িত্ব পালন করতে উঠে দাঁড়াল। বিহানের কাছে যেতে নিতেই হাত টেনে ধরলেন মাহিদ মির্জা। বিচলিত কণ্ঠে আওড়ালেন—
— তুমি কোথায় যাচ্ছো, আম্মু? বসো এখানে।
অর্পনা ওদের থেকে কিছুটা দূরে বসে থাকা বিহান আর শাহিন মির্জাকে দেখিয়ে বলল—
— একটু বিহান ভাইয়ের কাছে যেতে চাচ্ছিলাম, আব্বু। আপনি বসুন, আমি আসছি।
মাহিদ মির্জা মানা করলেন না। উল্টো ছেলের বউয়ের হাত ধরে এগিয়ে এলেন বিহানের কাছে। বিহানকে শান্ত থাকতে বলে অর্পনাকে রেখে শাহিন মির্জাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। কিছু কিছু সময়ে ছেলে-মেয়েদের আলাদা স্পেস দেওয়া উচিত। এমনিতে অর্পনা আর বিহান সারাক্ষণ ঝগড়া করলেও ভাইবোন হিসেবে তারা বড্ড পারফেক্ট। দুজন আলোচনা করলে হয়তো বিহান একটু শান্ত হতে পারে। মাহিদ মির্জা আর শাহিন মির্জা বেরিয়ে যেতেই অর্পনা বিহানের পাশের চেয়ারটায় বসল। বিহানের তাতে ভাবাবেগ নেই। সে কেবিনের দরজার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
অর্পনা বুঝতে পারছে বিহানের মনের অবস্থা। তবুও স্বামীর হয়ে দায়িত্ব রক্ষার্থে চোখ ছোট ছোট করে বললো
— আপনাকে তো কোনো দিক থেকেই মেয়ে মনে হয় না। তাহলে মেয়েদের মতো কাঁদছেন কেন?
অর্পনার কথায় রাগ হলো বিহানের। দাঁতে দাঁত পিষে অত্যন্ত তিক্ত স্বরে আওড়াল— তোমার খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই, না? যাও, নিজের কেবিনে গিয়ে বসে থাকো। বিরক্ত করো না।
বলেই আবারও শার্টের হাতায় চোখ মুছল। বিহানের তিক্ত কথায় অর্পনার কিছু এলো-গেলো না। বিহানকে তো সে কোনো কালেই গোনায় ধরেনি, এখন কী ধরবে?সে মুখ বাঁকিয়ে বলল— এত বউ-পাগল হোস না রে ভাই, লোকে মন্দ বলবে।
বিহান এবার ফিরে তাকাল। কেঁদে কেটে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে ছেলেটা। বারবার চোখ ডলার কারণে চোখের পাতা অসম্ভব লাল হয়ে আছে। বিহান এবার নরম স্বরে আওড়াল— দেখো, এখন ঝগড়া করার মুডে নেই আমি। আমার মেধার জন্য একটু দোয়া করো। বেবিটা যেন দ্রুত চলে আসে।
বলেই আবারও শার্টের হাতায় চোখ মুছল। অর্পনার মনটা এমনিতেই ভার। তার ওপর ভেতর থেকে মেধার একটার পর একটা চিৎকার ভেসে আসছে। বিহানও বারবার চোখের পানি মুছছে।অর্পনা আজ একটা জিনিস খুব গভীরভাবে বুঝতে পারল। সে শুধু দ্বীপ মির্জার না, পুরো মির্জা বাড়ির মায়ায় পড়েছে। নাহলে এদের জন্য তার এত কষ্ট হবে কেন? মেধার কান্নায় তার বুক মুচড়াবে কেন? চোখে পানি জমবেই বা কেন?অর্পনা নাক ডলে কান্না আটকাল। বিহানের উদ্দেশে শুধাল— মেধা আপুর কাছে যাবেন?
বিহান চট করেই অর্পনার দিকে তাকাল। দুজনার চোখাচোখি হতেই বিহান চোখের ইশারায় শুধাল’আমাকে যেতে দেবে?’অর্পনা সমানভাবে চোখের ইশারায় বুঝাল‘দেখছি।’ বিহান এক বুক আশা নিয়ে অর্পনার দিকে তাকিয়ে রইল।এই পর্যায়ে এসে অর্পনার কাছে বিহানকে বড্ড বোকা মনে হচ্ছে। কে বলবে এই ছেলেটা ঠান্ডা মাথায় মানুষ কাটে? এরা দুই ভাই-ই একরকম। বউয়ের বেলায় একদম নরম আর কোমল। তবে বিহানটা একটু বেশি। মেধাকে অপারেশন থিয়েটারে রাখা হলেও নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা চলার দরুন মহিলাদের এলাউ করা হচ্ছে। অর্পনা উঁকি দিয়ে ভেতরে তাকাল। মেধা সমানে কেঁদে যাচ্ছে। সাথী বেগম হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন মেয়ের মাথায়। রোমানা বেগম বারবার পুশ করতে বলছেন। ডাক্তার চেষ্টা করে যাচ্ছেন নিজের মতো। সঙ্গে দুজন নার্সও আছে।অর্পনা আর দেখার প্রয়াস চালাল না। পরিচিত হওয়ার দরুন অনেকটা সময় নিয়ে বোঝানোর পর বিহানকে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দিলেন ডাক্তার। অর্পনা ফিরে এসে বিহানের উদ্দেশে বলল—
আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা খারাপ। বাট এটা মেধা আপুকে বুঝতে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মেধা আপুর সামনে শক্ত থাকবেন, আর আপুকে শক্ত হওয়ার জন্য সাপোর্ট দেবেন।
বিহান চোখের ইশারায় সায় জানিয়ে আবারও শার্টের হাতায় ভালোভাবে চোখ মুছে ভেতরে চলে গেল।অর্পনা এবার ধপ করে বসে পড়ল চেয়ারটায়। গা হেলিয়ে দিল নিমিষেই। এখানে আপাতত কেউ নেই। মন ভরে নিশ্বাস নিল সে।আর দশ মাস পর সেও এখানে থাকবে। দ্বীপ মির্জা তখন কী করবে? বিহানের মতো এতটা অস্থির হবে কি? কাঁদবে? নাকি আজকের মতো দূরে দূরে থাকবে? অর্পনার ভীষণ অভিমান করতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু পারছে না। আচ্ছা, তার কি অভিমান-অভিযোগ করা বারণ? কেন করতে পারে না? স্বামীর সঙ্গে অভিমান করাটা কি ইম্যাচিউরিটি? অর্পনার বয়সের সঙ্গে কি অবুঝ, অভিমানী শব্দটা যায় না? কেন যায় না? মেধা আপু তো সাতাশ বছর বয়সেও বিহান ভাইয়ের সঙ্গে অভিমান করে। সে কেন পারে না?
,,,,দুই ঘণ্টা যাবৎ চেষ্টা করার পর বাচ্চাটা একটু নিচে নেমে এসেছে। এই পুরো সময়টাতে তীব্র ব্যথায় ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গেছে মেধা। কান্নার তোড়ে মুখটা টকটকে লাল রং ধারণ করেছে। কেবিনের ভেতর বিহানকে দেখে এবার ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিল মেয়েটা। চোখে-মুখে কত অভিযোগ! বিহান আবারও দুহাতে মুখ ডলে নিজেকে শান্ত করে মেধার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সাথী বেগম মেয়ের জামাইকে জায়গা দিয়ে ঘুরে অপর পাশে চলে গেলেন। বিহান এগিয়ে এসে মেধার গাল ছুঁতেই মেধা অভিমানী স্বরে আওড়াল—
আপনার বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনতে গিয়ে মরে যাচ্ছি আমি। ওকে আসতে বলুন না। আমার যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
বলতে বলতে লম্বা লম্বা শ্বাস টানল মেয়েটা। চোখ বেয়ে একের পর এক পানির ধারা নেমে আসছে। বিহান এবার দুহাতে মেধার চোখ-মুখ মুছে দিল। চুমু খেল কপালটাতে। মেধাকে কিছুটা শক্ত করতে বললো— ও কি শুধুই আমার বাচ্চা? তোমার না? আমাদের বাচ্চার জন্য আরেকটু চেষ্টা করো।
,,,বিহানের এত মিষ্টি কথায়ও যেন আগুন ধরে গেল মেধার মাথায়। সে এদিকে মরে যাচ্ছে, আর এই লোক সবার মতো খালি বলে যাচ্ছে ‘চেষ্টা করো, চেষ্টা করো’!তাহলে এই দুই ঘণ্টা যাবৎ কী করেছে সে? ঘোড়ার ঘাস কেটেছে?ফালতু লোক! মেধা রাগ সামলাতে না পেরে ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে বলল—
— আরেকটু চেষ্টা করো! আসুন, নিজে করে দেখুন। জান বেরিয়ে যাচ্ছে আমার। মুখেই খালি বড় বড় কথা।
মেধার রাগ দেখে ভড়কে গেল বিহান। সে তো খারাপ কিছু বলেনি। মেধার কথা ফুরানোর সঙ্গে সঙ্গেই ধমকে উঠলেন সাথী বেগম— স্বামীর সঙ্গে এসব কী আচরণ? ও কেন তোমার জায়গায় থাকবে? ও মা নাকি তুমি মা?
মেধার আরও রাগ হলো। দাঁতে দাঁত চেপে মায়ের দিকে তাকাল। মেধা কিছু বলার আগেই বিহান শাশুড়ির উদ্দেশে বলল—
— ছোট আম্মু! তুমি ওকে কিছু বলো না। মেধা রাগারাগি করে যদি শান্তি পায়, তাহলে করুক। আমার প্রবলেম নেই।
রোমানা বেগমও শাসালেন ছোট জাকে। মেয়েটার এমন অবস্থাতেও বকা-ঝকা করতে হবে কেন?মেধার রাগারাগির ফলে কিছুটা লাভ হলো বোধহয়। ডাক্তার শান্ত অথচ বিচলিত কণ্ঠে আওড়ালেন— রিল্যাক্স! একটু ধৈর্য ধরুন। বেবির মাথাটা বেরিয়ে এসেছে। আরেকটু পুশ করুন। আর একটু।
এই পর্যায়ে বিহান মেধার মাথাটা শক্ত করে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। মেধা প্রথমে বিরক্ত হলেও যখন আপন পুরুষের শরীরের ঘ্রাণ আর পরিচিত হৃদয়ের অনিয়ন্ত্রিত আন্দোলন টের পেল, কেমন মিইয়ে গেল মেয়েটা। শক্ত করে চেপে ধরল বিহানের বুকের কাছের শার্টের অংশ।বিহান আরও শক্ত করে চেপে ধরল মেধাকে। মুহূর্তেই থিয়েটার রুম মুখরিত হলো ছোট্ট একটা বাচ্চার কান্নার শব্দে।মেধার মনে হলো, হাজার মণ ভার যেন তার মধ্য থেকে সরে গেল। মেয়েটা এবার নিজেকে বিহানের বুকে একেবারে ছেড়ে দিল।রোমানা বেগম, সাথী বেগম, ডাক্তার, নার্স, সবাই একসঙ্গে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।ডাক্তার বাচ্চাকে পরীক্ষা করে বললেন—
— আলহামদুলিল্লাহ! আপনাদের ছেলে হয়েছে।
বাচ্চা বেরিয়ে আসতেই ডাক্তার বাচ্চার নাড়ি কেটে রক্তাক্ত দেহটা মুছে বিহান আর মেধার দিকে এগিয়ে দিলেন।মেধার বুকের ওপর রাখতেই মেধা ক্লান্ত চোখজোড়া মেলে তাকাল। বাচ্চাটা হাত-পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে কাঁদছে। ফর্সা মুখটা কান্নার তোড়ে টকটকে লাল হয়ে আছে। মেধা আড়চোখে বিহানের দিকে তাকাল, পরপর বাচ্চার দিকে। চেহারা বোঝার জো না থাকলেও নাকটা কেমন বাবার মতো হয়েছে দেখো। একেবারে বাবা-চাচাদের মতো হলেও অবাক হবে না মেধা। ছেলেরা বরাবরই বংশের রূপ-গুণ পায়।বিহান কাঁপা কাঁপা হাতে বাচ্চাটাকে ছুঁতে চেয়েও ছুঁতে পারল না। কেমন যেন অনুভূতি হচ্ছে, যা এতদিন হয়নি। সে অনেকক্ষণ দোনোমনা করে ছেলের গালে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে শব্দ করে আজান দিল।শ্রবণনালীতে আজানের ধ্বনি পৌঁছাতেই ছোট্ট ছেলেটার কান্না থেমে গেল। বৃদ্ধাঙ্গুলি মুখে দিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বোঝার প্রয়াস চালাল বোধহয় সে কোথায় ছিল আর এখন কোথায় আছে।
আজান শেষ হতেই আবারও কেঁদে উঠল ছেলেটা। মুখে থাকা আঙুলে চপচপ শব্দ করছে।রোমানা বেগম মুচকি হেসে বললেন—
— ছেলেকে ফিডিং করাও। খিদে পেয়েছে বোধহয়।
মেধা কী মনে করে যেন ফুঁপিয়ে উঠল।বিহান বিচলিত হয়ে কারণ জানতে চাইলে মেধা কাঁদতে কাঁদতে বল
— আমার বাচ্চা আমাকে ভয় পাবে না তো, বিহান? মাকে কুৎসিত মনে করবে কি? আমাকে তোমার মতো ভালোবাসবে তো?
বিহান আবারও মেধার চোখ মুছে দিল। ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া গালটাতে আলতো করে হাত বুলিয়ে বললো— চাঁদ দেখে কেউ ভয় পায়? চাঁদ হচ্ছে ভালোবাসার উৎস। যেখানে হাজারো প্রেমিক তার প্রেমিকার সৌন্দর্যকে চাঁদের সঙ্গে তুলনা করে, সেখানে তুমি আমার আস্ত এক খানা চাঁদ। আমি যেমন তোমার কলঙ্ককে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, আমাদের ছেলেও তোমার কলঙ্ককে সবচেয়ে বেশি সম্মান করবে।
,,সময়টা দুপুরের পরপর। মির্জা বাড়ির কোনায় কোনায় আজ আনন্দের জোয়ার। একদিকে লিটল মির্জার আগমন, অপরদিকে আরও একটা লিটল মির্জার আসার সংবাদ। বাড়ির মানুষজন কী রেখে কী করবে ভেবে পায় না। পরশি, আরিব আর আরাফাতের তো আজ ঈদ লেগেছে। কতক্ষণ অর্পনার সাথে ঘ্যানঘ্যান করে এখন খেয়ে-দেয়ে গিয়েছে মেধার কাছে। আরাফাতকে নিয়ে অর্পনা কিছুটা চিন্তিত ছিল। যদি সবার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারে? ছেলেটা অর্পনার ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ভালোই আছে এখানে। আরশাদ জামান কয়েকবার চেয়েছিলেন ওকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে। ভাই হয়ে বোনের শ্বশুরবাড়িতে থাকবে, বিষয়টা খারাপ দেখায়। কিন্তু অর্পনা দেয়নি। এখানে তার ভাগ রয়েছে। দ্বীপ মির্জা তার সকল সম্পত্তির ৫০% ওকে দিয়েছে। অর্পনা নিজের অধিকার কখনো ছাড়েনি, আর না ছাড়তে শিখেছে। যা তার, সেটাও তার; আর যা তার নয়, সেটাকেও সে নিজের করার ক্ষমতা রাখে। ওসব ন্যায়-নীতি, ভাবভঙ্গির মানে সে বুঝে না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আরাফাত তার বোনের বাড়িতেই থাকছে। সবচেয়ে বড় কথা, মির্জা বাড়ির সকলেই আরাফাতকে আদর করে। তাই অর্পনার অত শঙ্কোচ নেই।
,,মির্জা বাড়িতে সকাল থেকে নানান পদের রান্নাবান্না হয়েছে। কাছের অনেক আত্মীয়-স্বজনরাই নিমন্ত্রিত ছিল আজ। সালামি দিয়ে আজ অর্পনার হাত পুরো ভরপুর। শ্বশুর, তিন শাশুড়ি, চাচা-শ্বশুরসহ কাছের আত্মীয়-স্বজন সবাই অর্পনার সাথে দেখা করে সালামি দিয়েছে। অর্পনা অবশ্য নিতে মানা করেছে। কিন্তু রোমানা বেগম যখন নরম স্বরে বললেন, “এগুলো নিতে হয়”, তখন আর মানা করল না। অর্পনা বর্তমানে দ্বীপের নানিবাড়ির লোকেদের সাথে ভিডিও কলে আছে। মামুরা, নানা, নানি, মামিরা, ভাই-বোন সবাই একে একে কথা বলছে ওর সাথে। ওনাদের সাথে কথা বলার বেলায় অর্পনা কিছুটা লজ্জাই পায়। নানির সাথে কথা বলতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি লজ্জা পেয়েছে। বৃদ্ধা কিসব বলে! আর অর্পনার সেই লজ্জা-লজ্জ মুখখানি আগ্রহ ভরে দেখছে চার মূর্তি। কত বিরল দৃশ্য! ভাবা যায়? কেউ ভাবতে পেরেছিল অর্পনা এভাবে মাথায় ঘোমটা দিয়ে লজ্জা পাবে? ওদেরকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অর্পনা চোখ রাঙালো। সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নিল চারজন। অর্পনা একে একে সবার সাথে কথা বলে কল কাটতেই হাফ ছেড়ে বাঁচল চারজন। এতক্ষণ কত কষ্ট করে মুখ বন্ধ রেখেছে! ইরা খুশির তোড়ে অর্পনাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। পল্লব অর্পনার বিছানায় গা হেলিয়ে দিয়ে আওড়ালো—
— ইসস! ফাইনালি মামু হতে যাচ্ছি।
সোফায় বসা রাত্রি উৎফুল্ল কণ্ঠে আওড়ালো— আর আমি খাম্মি হব।
সবার চোখেমুখেই খুশির রেশ। রাত্রিটা একটু বেশিই খুশি। মেয়েটা যেমন অল্পতেই অভিমান করে, তেমনি অল্পতেই খুশিতে ডগমগ হয়ে যায়। রাত্রির পাশাপাশি বসে আছে অরুণ। সে রাতের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল— একই বয়সী হয়েও তোর বোন মা হয়ে যাচ্ছে, তোর লজ্জা করছে না?
— লজ্জা করবে কেন? এতে লজ্জার কী হলো?
অরুণ আফসোসের স্বরে বলল— আমাদেরও এমন একটা বেবি হতে পারত।
রাত্রি চট করেই অরুণের পেটে গুঁতো মারল।
— বিয়েই তো হলো না, আবার বেবি! সর তো।
— আমি তো চাচ্ছিই বিয়েটা করে নিতে। তুই তো মানছিস না।
— আগে অনার্সটা শেষ করি। তারপর তুই তোদের ব্যবসায় যোগ দিবি। আমি চাই না কেউ বলুক তুই তোর বাপের টাকায় বউ পালিস। আমার যা হবে, সব তোর টাকায়।
অরুণ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালো। পরপর ফের ফিসফিস করে বলল— তাহলে একবার বল।
— কী বলব?
অরুণ ভ্রু উঁচিয়ে ইশারা করল। রাত্রির মুখটা কেমন লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। এই লজ্জাভরা মুখ দেখে মুগ্ধ হলো অরুণ।রাত্রি মাথা কাত করে বলল—
— ভালোবাসি!
— কতটা?
— তুই যতটা বাসিস, তার থেকেও একটু কম। কারণ আমার বেশি ভালোবাসা পেতে ভালো লাগে।
অরুণ হেসে ফেলল। রাতের সামনে আসা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল।
— অনেক ভালোবাসব তোকে। নিজের থেকেও বেশি।
বিনিময়ে মুচকি হাসল রাত্রি। অরুণের চোখে চোখ রেখে আবদারের কণ্ঠে আওড়ালো— একটু কেয়ারও করিস। মাঝে মাঝে নিজেকে বড্ড একা লাগে। তোর বইয়ের ফাঁকে আমাকে একটুখানি ঠাঁই দিস। এত অবহেলা ভালো লাগে না।
অরুণের চোখজুড়ে অনুতপ্ততা। কাতর কণ্ঠে বলল— সরি, জান। আমি আর এরকম করব না। আসলে স্ত্রী কিংবা প্রেমিকাকে কিভাবে ট্রিট করতে হয় জানি না তো। আমার মম-ড্যাডের কখনো ভালো মোমেন্ট ছিল না। হয়তো ছিল, আমি দেখিনি।
রাত্রি নিরবে অরুণের হাতখানা আঁকড়ে ধরল। এই ছেলেটা তার প্রেমিক, অথচ প্রেম বুঝে না। তবুও এই অবুঝ প্রেমিকটাকেই রাত্রি ভালোবাসে। নিজের থেকেও বেশি বললে ভুল হবে।সে একটু বেশিই ভালোবাসে। তাই তো এতটা অবুঝ হওয়া সত্ত্বেও রাত্রি অভিযোগ করতে পারে না। কিন্তু ইদানীং তার কেন যেন ইচ্ছে করে অরুণ ওর খেয়াল রাখুক। ওর বন্ধু-বান্ধবরা সবাই মিলে যতটা খেয়াল রাখে, অরুণ তার থেকেও বেশি খেয়াল রাখুক। যেন কাউকে অরুণের চেয়েও বেশি ইম্পর্ট্যান্ট মনে না হয়। বন্ধুরা খেয়াল না রাখলে যেন তার নিজেকে একা না মনে হয়। অরুণ বাদে আর কারোর উপর অভিমান না হয়।
রাত চায়, ওর অভিমান-অভিযোগ সবটা অরুণকে ঘিরেই হোক। অরুণ কেন সেটা বুঝে না? শুধু মাত্র কাছে আসা, আদর করা, এটাই ভালোবাসা না। ভালোবাসায় যত্ন থাকে। এটা কবে শিখবে রাতের প্রেমিক? অরুণ আর রাত্রিকে ফিসফিস করতে দেখে
ইরা চোখ ছোট ছোট করে শুধালো— এই তোরা কী নিয়ে ফিসফিস করছিস? বল আমাদের।
পল্লব এতক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে ছিল। সেভাবেই থেকে বলল— তুই বোধহয় ভুলে যাচ্ছিস, ওরা আফটার সিক্সথ মান্থ হাসব্যান্ড-ওয়াইফ হতে যাচ্ছে। ওরা ফিসফিস করবে না তো কী আমরা করবো, গাধা!
পল্লবের কথায় সায় জানালো সবাই। অরুণ যেন প্রশ্রয় পেল। আরেকটু গা ঘেঁষে বসল রাতের সাথে।
রাত্রি সোফার গায়ে গা হেলিয়ে শুধালো— আচ্ছা, আমাদের বিয়েতে তোরা কী গিফট দিবি? আমাদের কিন্তু ভালো ভালো গিফট চাই।
ইরা অনেক ভেবে-চিন্তে বলল— আমি একটা ১৫০ টাকার গ্লাসের সেট দিব। ওই যে ফুল ফুল কাজ করা যে থাকে, ওইটা।
পল্লব মাথাটা কাত করে অরুণ আর রাতের দিকে তাকালো। রাত্রি সুন্দর, অরুণ সুন্দর বাট শ্যামলা। কেউ একজন বলেছিল, শ্যামলা ছেলেদের ভাগ্যে নাকি সুন্দর বউ জোটে। পল্লব আগে বিশ্বাস করত না। ইদানীং কথাটা সত্যি মনে হয় তার। অরুণ আর রাতকে সত্যিই খুব মানায়। যেন ঘন কালো রাতের আকাশে এক ফালি চাঁদ। পল্লবের চোখে রাতের চোখ পড়তেই পল্লব বলল—
— আমি ওয়াশরুম পরিষ্কার করার একটা হাতল দিব। স্বামী-স্ত্রী মিলে মিলে ওয়াশরুম ক্লিন করবি।
অর্পনা সবার সাথে তাল মিলিয়ে বলল— আমি একটা ঘর মোছার যন্ত্র দিব।
রাত্রি কটমট করে ওদের দিকে তাকালো। পরপর অরুণের দিকে তাকিয়ে শুধালো— অরুণ! তুই ওদেরকে আমাদের বিয়েতে ইনভাইট করবি? করলে বিয়ে ক্যানসেল। তোকে আমি বিয়ে করব না।
বলেই গাল ফুলালো।অরুণ কিছু বলবে, তার পূর্বেই পল্লব বলল— আমরা তোদের বিয়েতে যাবও না। অর্পনা, তোর বোনের বিয়েতে আমাদের দাওয়াত দিস। সব গিফট তোকে দিব, ঠিক আছে?
অর্পনা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালো। রাত্রি মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকালো। এসব ফালতু বন্ধু-বান্ধব থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। কিসের গ্লাসের সেট, বাথরুমের হাতল আর ঘর মোছার যন্ত্র দিবে!এদেরকে মরে গেলেও দাওয়াত দিবে না সে। তখন দেখা যাবে, তার চল্লিশা খেতে আসার বেলায় এসব আলতু-ফালতু জিনিস গিফট হিসেবে নিয়ে এসেছে। রাত্রির চোখেমুখের অবস্থা দেখে হাসল সবাই। পল্লব উঠে বসে দুহাত টান দিয়ে বলল—
— তোদের বিয়েতে আমার তরফ থেকে গায়ে হলুদের শাড়ি আর পাঞ্জাবি দিলে পরবি? দাম কিন্তু বেশি হবে না। দেড়-দুই হাজারের মধ্যে দিতে পারব।
পল্লবের কথায় চট করেই ওর দিকে তাকালো অর্পনা আর ইরা। পল্লবের চোখেমুখে সংকোচ ব্যতীত কিছু নেই। মানুষ এত ভালো অভিনয় কিভাবে করে? আজব! রাত্রি বড্ড সাদাসিধে, বোকাসোকা মানুষ। মা, অরুণ আর বন্ধু-বান্ধব ছাড়া কিছু বুঝে না। দুনিয়ার মারপ্যাঁচগুলোও বড্ড কঠিন লাগে তার কাছে। সে শুধু আদর-স্নেহ পেতে শিখেছে, অন্য কেউ উজাড় করে কিছু দিলে খুশি মনে তা মানতে শিখেছে।
আর এমনও তো নয় যে রাতরা খুব বড়লোক। মা কলেজে চাকরি করে, আর এখন বাবা হিসেবে আরশাদ জামান যুক্ত হয়েছেন। অরুণের হয়তো অসুবিধা হলেও হতে পারে, কিন্তু রাত রাজি হলে নিশ্চয়ই অরুণ আপত্তি করবে না।ভেবেই রাত্রি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল— এটা কেমন কথা? পরব না কেন? তুই বা তোরা ভালোবেসে যা দিবি, তাতেই আমরা খুশি। কী হলো অরুণ, বল।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৪ (২)
অরুণ সায় জানালো। তার কাছেও ভালোবাসার চেয়ে মূল্যবান কিছুই হতে পারে না।পল্লবের ফোনে কল এসেছে বোধহয়। সে হুট করেই ফোনটা কানে চাপল। কথা বলার ব্যস্ততা দেখিয়ে অর্পনাদের বারান্দায় চলে গেল। ওর যাওয়ার দিকে অরুণ বা রাত্রির মন নেই। তারা নিজেদের মতো কথা বলতে ব্যস্ত। তবে ইরা আর অর্পনার মনটা ভার। সত্যিই কি কেউ কল দিয়েছে, নাকি অভিনয় করল ছেলেটা? কেন গেছে ওখানে? কাঁদবে কি? কাঁদাটা কি অস্বাভাবিক কিছু?মোটেও অস্বাভাবিক নয়। এই কান্নাটা প্রয়োজন। বুকে যন্ত্রণা নিয়ে কাঁদতে না পারাটা আরও যন্ত্রণাদায়ক। যেমনটা অর্পনার বর্তমানে হচ্ছে। শুনেছিল, পুরুষ মানুষ নাকি সবচেয়ে বেশি খুশি হয় বাবা হওয়ার সংবাদে। তাহলে কোথায় অর্পনার বাচ্চার বাবা? দিনের অর্ধেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তার ফেরার সময় হয়নি?
কেন ফিরছে না? অর্পনার যে অভিমান ছাপিয়ে এবার যন্ত্রণা হচ্ছে।
