বিকেল বেলা….
বিকেলের দিকে শুদ্ধ তার বাবা আর মাকে সাথে নিয়ে কিয়ারাদের বাড়িতে এলো। ড্রয়িংরুমের সোফায় তারা সবাই এসে বসলো। আবির মির্জা আর আদিল মির্জার মুখোমুখি বসে শুদ্ধ কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি কাজের কথায় চলে গেল। সে বললো,
“আঙ্কেল, আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছি। তাই আমি ঠিক করেছি এই সপ্তাহেই কিয়ারাকে বিয়ে করবো।”
শুদ্ধর মুখে এত তাড়াতাড়ি বিয়ের কথা শুনে আবির মির্জা একটু অবাক হলেন। তিনি শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এত তাড়াতাড়ি করার কী দরকার বাবা? সবেমাত্র তো একটা বড় দুর্ঘটনা থেকে সুস্থ হলে। শরীরটাকে আর একটু সময় দাও, আর কিছুদিন রেস্ট নাও।”
পাশ থেকে শুদ্ধর মা তখন হেসে উঠে বললেন, “আরে ভাই, ছেলে যখন সুস্থ হয়ে গেছে, তখন আর দেরি করে কী লাভ? আমরা এই সপ্তাহেই কিয়ারা মাকে আমাদের বাড়ির বউ করে নিয়ে যেতে চাই।”
আবির মির্জা আর কিছু না বলে রিমিকে ডেকে পাঠালেন। রিমি এই বাড়িতেই কাজ করে, তবে গত এক মাসের জন্য সে গ্রামে গিয়েছিল। আজই মাত্র গ্রামে ছুটি কাটিয়ে ফিরেছে। রিমি কাছে আসতেই আবির মির্জা বললেন, “রিমি, উপরে যাও। কিয়ারাকে নিচে পাঠিয়ে দাও। আর যাওয়ার আগে ওকে একটা সুন্দর দেখে শাড়ি পরিয়ে দিও।”
রিমি মাথা নাড়িয়ে ওপরের তলায় চলে গেল। সে কিয়ারার রুমে ঢুকে আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করে বললো, “ছোট আপু, আসো তোমাকে একটা শাড়ি পরিয়ে দিই।”
বিছানায় চুপচাপ বসে থাকা কিয়ারা রিমির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “হঠাৎ শাড়ি কেন?”
রিমি হাসিমুখে জবাব দিল, “তোমার শ্বশুরবাড়ির মানুষ এসেছে নিচে। ওই যে শুদ্ধ ভাইয়া আর উনার আব্বা-আম্মা।”
কথাটা শুনেই কিয়ারার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। সে মুখটা নামিয়ে নিচু গলায় বললো, “এসব শাড়ি-টাড়ি পরার কোনো দরকার নেই।”
রিমি তখন বললো, “কিন্তু ছোট চাচা যে নিজে তোমাকে শাড়ি পরতে বললেন।”
বাবা নিজে শাড়ি পরতে বলেছেন শুনে কিয়ারা আর না করতে পারলো না। সে চুপচাপ রিমির হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে পরে নিল। শাড়ি পরা শেষ করে সে ভারী পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো।
ড্রয়িংরুমে গিয়ে সে সবার সামনে একটা সোফায় বসলো। শুদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে হাসলেও কিয়ারার একটুও ভালো লাগছিল না। তার মনের ভেতর তখন এক অদ্ভুত ছটফটানি শুরু হয়েছে। চারপাশের এই পরিবেশ, সবার কথাবার্তা
সবকিছু কেমন যেন তার কাছে অসহ্য লাগছিল।
ড্রয়িংরুমের থমথমে ভাবটা কাটাতে আবির মির্জা কিয়ারার দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললেন, “কী রে মা, চুপ করে আছো কেন? উনাদের সাথে কথা বলো।”
বাবার কথায় কিয়ারা কোনোমতে মাথা নিচু করে শুদ্ধর বাবা-মাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “আসসালামু আলাইকুম।”
সোফায় একটু তফাতে বসে ছিলেন ইয়াশের বাবা আদিল মির্জা। উনার চোখ-মুখে শুরু থেকেই একটা তীব্র অস্থিরতা কাজ করছিল। ছেলের স্বভাব উনার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না, তাই ভেতরে ভেতরে উনার বুক কাঁপছিল। আদিল মির্জাকে ওভাবে চুপচাপ থাকতে দেখে আবির মির্জা বললেন, “ভাই, তুমি একদম চুপ করে আছো কেন? তুমিও কিছু বলো?”
আদিল মির্জা একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, “আমি আর কী বলবো? তোরা যখন নিজেরাই সবকিছু ঠিকঠাক করে ফেলেছিস, তখন তোরাই বল।”
উনার এই কথার পেছনে যে একটা বড় ভয় লুকিয়ে আছে, তা বাকিরা বুঝতে পারলো না।
ঠিক তখনই শুদ্ধ পরিবেশটা নিজের অনুকূলে নিতে আবির মির্জার দিকে তাকিয়ে বললো, “আঙ্কেল, আমি কি কিয়ারার সাথে একটু আলাদাভাবে কথা বলতে পারি? মানে একটু একা কথা বলা দরকার ছিল।”
আবির মির্জা হেসে উঠে বললেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই। এতে আর অনুমতি নেওয়ার কী আছে! রিমি, ওদের দুজনকে পাশের লিভিংরুমে নিয়ে যাও।”
আলাদা কথা বলার নাম শুনেই কিয়ারার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ইয়াশ যদি জানতে পারে সে শুদ্ধর সাথে একা কথা বলছে, তাহলে যে কী অনর্থ ঘটবে তা সে ভালো করেই জানে। ভয় আর অস্বস্তিতে সে তৎক্ষণাৎ বাধা দিয়ে বললো, “নাহ, থাক। আলাদা কথা বলার দরকার নেই, যা বলার পরেই বলবো।”
মেয়ের এমন আচরণে আবির মির্জা কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, “কেন, এখন কী সমস্যা? যাও মা, একটু কথা বলে এসো।”
বাবার অবাধ্য হতে না পেরে কিয়ারা সোফা থেকে মাত্র উঠতে যাবে, ঠিক তখনই ওপরের সিঁড়ি থেকে একটা ভারী আর গম্ভীর গলার হুংকার ভেসে এলো “স্টপ!”
সেই চেনা গম্ভীর আওয়াজে কিয়ারার পা যেন মেঝেতেই জমে গেল। ড্রয়িংরুমের প্রত্যেকে চমকে উঠে সিঁড়ির দিকে তাকালো। কিয়ারার বুকের ভেতরটা তখন ধড়ফড় করতে শুরু করেছে। মনে মনে সে আতঙ্কে শিউরে উঠে ভাবলো ‘সর্বনাশ! শয়তানটা শেষ পর্যন্ত নিচে চলে এসেছে।’
ইয়াশ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। তার অবয়বে এক আদিম হিংস্রতা, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব। সোফায় বসা শুদ্ধ ও তার পরিবারের দিকে এক নজর তাকিয়ে সে চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এইখানে কী হচ্ছে?”
আবির মির্জা ইয়াশকে দেখে বেশ খুশি হয়ে বললেন, “এই তো ইয়াশ এসে গেছে! ইয়াশ, আসো, আমার পাশে এসে বসো। উনারা হলেন তোমার বোনের শ্বশুরবাড়ির লোক।”
‘বোন’ শব্দটা শোনামাত্র ইয়াশের চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য ছোট হয়ে গেল। সে অত্যন্ত ঠান্ডা এবং ধারালো গলায় প্রশ্ন করলো, “বোন কে?”
আবির মির্জা হুট করে ইয়াশের এমন অদ্ভুত প্রশ্নে একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসার চেষ্টা করে বললেন, “আরে, কিয়ারা ছাড়া আবার কে? উনারা কিয়ারার শশুর বাড়ির লোক”
পাশ থেকে আদিল মির্জা তখন চোখ বড় বড় করে ইশারায় ছেলেকে চুপচাপ চলে যেতে বলছেন, যেন সে কোনো ঝামেলা না পাকায়। কিন্তু ইয়াশ উনার ইশারা পুরোপুরি এড়িয়ে গেল।
এদিকে ইয়াশের এমন গম্ভীর আর অদ্ভুত আচরণ দেখে শুদ্ধ একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে আবির মির্জার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো, “আঙ্কেল, উনি কে? উনাকে তো আগে দেখিনি।”
আবির মির্জা শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “ও আমার বড় ভাই আদিল মির্জার একমাত্র ছেলে, ইয়াশ মির্জা। ও এত দিন পড়াশোনা আর ব্যবসার কাজে আমেরিকায় ছিল, তাই তোমরা ওকে চেনো না।”
পরিচয় দেওয়া শেষ করেই আবির মির্জা বেশ আনন্দের সাথে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে মূল খবরটা দিলেন, “বুঝলে ইয়াশ, এই সপ্তাহেই কিয়ারার বিয়ে ঠিক করা হয়েছে শুদ্ধর সাথে।”
কথাটা শোনার পর ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কিয়ারা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল, কারণ সে জানে এই খবরটার পর ইয়াশ এবার কী ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে।
ইয়াশ আবির মির্জার দিকে তাকিয়ে একটুও বিচলিত না হয়ে একদম ঠাণ্ডা গলায় বললো, “কিন্তু কিয়ারার বিয়ে তো অলরেডি হয়ে গেছে আমার সাথে।”
হঠাৎ শান্ত ড্রয়িংরুমে ইয়াশের এই একটা কথা যেন বোমা ফাটার মতো শোনালো। ঘরের প্রতিটা মানুষ যেখানে যেভাবে ছিল, ঠিক সেভাবেই থমকে গেল। পুরো ঘরে এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। আবির মির্জা সোফা থেকে প্রায় আধো-উঠে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে বললেন, “কিসব উল্টোপাল্টা বলছো, ইয়াশ? এখন কি এই ধরনের ফাজলামি করার সময়? গুরুজনরা বসে একটা সিরিয়াস কথা বলছে!”
ইয়াশ একটুও রাগলো না। সে পকেটে হাত দিয়ে সোফার এক কোণে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে হালকা হেসে বললো, “মজা কেন করবো কাকাই, আজব তো! কাল রাতেই তোমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আমার সাথে। আর তোমরা আজ আমার সামনেই আমার বউয়ের অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক করছো? হাউ ফানি!”
ইয়াশের মুখের উপর এমন স্পষ্ট আর জোরালো দাবি শুনে ড্রয়িংরুমের পরিস্থিতি পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গেল। শুদ্ধর বাবা আদিল মির্জা ও আবির মির্জার দিকে তাকিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ ও অপমানিত গলায় বললেন, “ভাই, এসব কী শুনছি আপনার ভাতিজার মুখে? এই ছেলে কীসব আজেবাজে কথা বলছে? আপনার মেয়ের বিয়ে নাকি কাল রাতে হয়ে গেছে? আমাদের ডেকে এনে এভাবে অপমান করার মানে কী?”
পুরো ড্রয়িংরুমে যখন এই ঝড় বইছে, কিয়ারা তখন নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়িয়ে একদম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীর কাঁপছে, চোখ দিয়ে জল পড়ার উপক্রম। ইয়াশ এবার সবার সামনে কিয়ারার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। তার চোখের ধারালো দৃষ্টি কিয়ারার মুখের ওপর নিবদ্ধ করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“কী হলো? এখন মুখে কোনো কথা নেই কেন তোর? কাল রাতে কোথায় ছিলি তুই? সবাইকে সত্যিটা বল।”
আবির মির্জা নিজের মেয়ের এই নীরবতা দেখে ভেতরে ভেতরে ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন। তিনি নিজের বড় ভাই আদিল মির্জার দিকে তাকিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “ভাই! তোমার ছেলে আমার মেয়েকে জড়িয়ে সবার সামনে এসব মিথ্যা কেন বলছে? আমি কিন্তু এসব ফাজলামি একদম সহ্য করবো না! ইয়াশকে থামতে বলো!”
ইয়াশ এবার বেশ জোরেই হেসে উঠলো। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক ধরণের ক্রূর জেদ। সে হাসি থামিয়ে কিয়ারার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু চড়া গলায় বললো, “মিথ্যা? আচ্ছা, আমি না হয় মিথ্যাই বলছি। কিয়ারা, তুই নিজে মুখে বল কালকে রাতে তুই কার সাথে একই বিছানায় ঘুমিয়েছিলি?”
লজ্জায় পড়ে গেলো সবাই, ইয়াশ এতো ঠোঁট কাটা? গুরুজনদের সামনে কেমন কথা বলছে।
সবাই তখন চাতক পাখির মতো কিয়ারার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শুদ্ধর চোখ-মুখ রাগে আর সন্দেহে লাল হয়ে উঠছে। আবির মির্জা আশা করছিলেন কিয়ারা এখনই ইয়াশকে একটা থাপ্পড় মেরে মিথ্যা প্রমাণ করবে। কিন্তু কিয়ারা আর সহ্য করতে পারলো না। সে এক বুক কান্না চেপে, মাথাটা আরও নিচু করে কাঁপানো গলায় শুধু দুটো শব্দ উচ্চারণ করলো “আপনার সাথে।”
কিয়ারার মুখ থেকে “আপনার সাথে” শব্দ দুটো বের হওয়া মাত্রই ড্রয়িংরুমের হইচই এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। গোটা বাড়িতে এমন এক নীরবতা নেমে এলো, যেন সবার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। আবির মির্জা নিজের মেয়ের মুখে এই স্বীকারোক্তি শুনে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তীব্র রাগ আর অপমানে উন্মাদের মতো এগিয়ে এসে তিনি ঠাস করে একটা শক্ত থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন কিয়ারার গালে। থাপ্পড়ের চোটে কিয়ারা মুখ থুবড়ে সোফার ওপর পড়ে গেল, তার ফর্সা গালটা মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। ইয়াশ গিয়ে কিয়ারাকে নিজের বুকে জড়িয়প নিলো। এরপর আবির মির্জা কে বললো
“আমার বউয়ের গায়ে হাত দিলে কিন্তু আমি বাপ চাচা কিচ্ছু মানবো না। আমাকে বেয়াদবি করতে বাধ্য করবেন না খবরদার”
আবির মির্জা বললেন “ও আমার মেয়ে, আমার মেয়েকে আমি একশো বার মারবো তুমি কে বলার?”
ইয়াশ গম্ভীর গলায় বললো “ও আমার বউ, আপনার অধিকার নেই আমার বউয়ের গায়ে হাত তোলার”
এই দৃশ্য দেখে শুদ্ধর মা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নাক সিঁটকে চিৎকার করে উঠলেন, “ছিহ ছিহ! কী জঘন্য চরিত্রহীন মেয়ে! বিয়ের আগে পরপুরুষের সাথে রাত কাটায়? তাও আবার নিজের আপন চাচাতো ভাইয়ের সাথে! কী শিক্ষা দিয়েছেন মেয়েকে ভাই?”
‘চরিত্রহীন’ শব্দটা কান ছুঁতেই ইয়াশের ভেতরের শয়তানটা যেন জেগে উঠল। তার চোখ দুটো রাগে একদম রক্তবর্ণ হয়ে গেল। সে পাশেই থাকা একটা ভারী কাঠের সোফায় সজোরে একটা লাথি মারলো। লাথির শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। ইয়াশ বাঘের মতো গর্জে উঠে শুদ্ধর মায়ের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললো, “ও কোনো দুশ্চরিত্রা না, ও আমার বিয়ে করা বউ। তিন কবুল বলে বিয়ে করেছি ওকে আমি। আমার বউকে নিয়ে একটাও বাজে বললে। গলার রগ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো আপনার!”
ইয়াশের এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে শুদ্ধর মা ভয়ে দুই পা পিছিয়ে নিজের স্বামীর পেছনে লুকালেন। পুরো পরিবেশ তখন থমথম করছে। শুদ্ধ এবার আর চুপ থাকতে পারলো না। সে কিয়ারার সামনে গিয়ে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলো, “এসব কী শুনছি কিয়ারা? কবে হলো এসব? তুমি তো আমাকে ভালোবাসতে, তাহলে ও কী বলছে এসব?”
মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকা আবির মির্জার চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল পড়ছিল। তিনি অত্যন্ত ভাঙা আর যন্ত্রণাকাতর গলায় কিয়ারাকে বললেন, “ছোটবেলা থেকে তোকে মায়ের অভাব বুঝতে দিইনি। বুকে আগলে বড় করেছি। শেষ পর্যন্ত এই ছিল তোর মনে? এত ভালোবাসার এই প্রতিদান দিলি তুই আমাকে?”
বাবার চোখের জল আর শুদ্ধর আকুতি দেখে কিয়ারা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। সে কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়িয়ে বাবার হাত দুটো জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে বললো, “পাপা, প্লিজ আমাকে ভুল বুঝো না। আমি সব সত্যি কথা তোমাকে খুলে বলছি। কাল রাতে আসলে কী হয়েছিল শোনো…”
কিন্তু আবির মির্জা ঝটকা দিয়ে মেয়ের হাত সরিয়ে নিলেন। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত শক্ত গলায় বললেন, “আমার কিচ্ছু শোনার দরকার নেই। তুই আমার বিশ্বাস ভেঙেছিস।”
ঠিক এই সময় ইয়াশের বাবা আদিল মির্জা, যিনি এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিলেন, তিনি এগিয়ে এলেন। তিনি আবির মির্জার কাঁধে হাত রেখে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বললেন, “আবির, রেগে না গিয়ে আগে শোন মেয়েটা কী বলতে চায়। ও তো নিজে থেকে কিছু করেনি, আগে ওর কথাটা শোন।”
বড় ভাইয়ের কথায় আবির মির্জা চুপ করে রইলেন। কিয়ারা তখন চোখ মুছতে মুছতে গতকাল রাতের পুরো ঘটনাটা একে একে বলতে শুরু করলো। কীভাবে সে বিপদে পড়েছিল, কীভাবে ইয়াশ তাকে উদ্ধার করে এক প্রকার জোর করেই কাজি ডেকে বিয়ে করেছে সবটা সে অকপটে স্বীকার করলো।
সবটা শোনার পর আবির মির্জা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের জল তখন রাগে রূপ নিয়েছে। তিনি ইয়াশের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললেন, “জোর করে বিপদে ফেলে চার দেয়ালের মাঝে সিন্ডিকেট করে বিয়ে করাকে বিয়ে বলে না। আমি এই বিয়ে মানি না, আর কোনোদিন মানবও না!”
পাশ থেকে শুদ্ধও আবির মির্জার কথায় সায় দিয়ে কিয়ারার দিকে তাকালো। তার চোখে তখন ইয়াশের প্রতি তীব্র ক্ষোভ। সে কিয়ারাকে উদ্দেশ্য করে বেশ জোর দিয়ে বললো, “আঙ্কেল ঠিকই বলেছেন কিয়ারা। জোর খাটানো এই নাটকটাকে কোনোভাবেই বিয়ে বলা যায় না। তুমি পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলে। আমি তোমাকে এখনো বিশ্বাস করি এবং আমি এই সপ্তাহেই তোমাকে বিয়ে করবো। দেখি কে আটকায়!”
