Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২০

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২০

দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কয়েকটি মাস। এই অল্প কটা মাসেই ইয়াশ আর কিয়ারার জীবনে ঘটে গেছে এক বিশাল ওলটপালট। বদলে গেছে চারপাশের চেনা সময়, ভেতরের সব পুরনো স্মৃতি আর সম্পর্কের সমীকরণ।কোটিপতি, অহংকারী আর জেদি ইয়াশ মির্জা এখন আর আগের মতো নেই। যে মানুষটার পায়ের নিচে একসময় আভিজাত্য লুটিয়ে পড়তো, সে এখন জীবনযুদ্ধের এক অতি সাধারণ সৈনিক
একটা রেস্টুরেন্টের সামান্য ওয়েটার! অথচ তার চেহারায় এখন কোনো আফসোস নেই, বরং এক অদ্ভুত শান্ত ভাব চলে এসেছে।
শহরের এক কোণে, ছোট একটা ভাড়া ঘরে গড়ে উঠেছে ওদের দুজনের এক চিলতে ছোট্ট সংসার। ঘরটা হয়তো ছোট, আসবাবপত্রও খুব সামান্য, কিন্তু সেখানে এখন কোনো অশান্তি নেই। কিয়ারা খুব সুন্দর করে নিজের হাতে ঘরটাকে গুছিয়ে রেখেছে। একটা সময় যে মেয়েটা রাজপ্রাসাদে থেকে শাড়ি সামলাতে পারতো না, সে এখন অল্প টাকাতেই সুনিপুণভাবে সংসারের হিসাব মেলায়, ইয়াশের জন্য রান্না করে।
ইয়াশ অবশ্য শুধু এই ওয়েটারের চাকরি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চায় না। সে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করছে কিয়ারাকে একটা ভালো জীবন দেওয়ার জন্য। ভালো একটা চাকরির আশায় সে প্রতিদিন নিয়ম করে বিভিন্ন নামী-দামী কোম্পানিতে অ্যাপ্লাই করছে, সিভি জমা দিয়ে আসছে। এখনও পর্যন্ত একটা জায়গা থেকেও কোনো ইতিবাচক সাড়া আসেনি, ভাগ্য যেন বারবার ওর সাথে লুকোচুরি খেলছে।কিন্তু ইয়াশ মির্জা তো সহজে হার মানার পাত্র নয়। সব বাধা আর ব্যর্থতার মাঝেও ও বিন্দুমাত্র হাল ছাড়েনি। প্রতিদিন সকালে কিয়ারার মায়াভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে ও নিজের ভেতরে নতুন করে লড়াই করার শক্তি খুঁজে পায়। ওর বিশ্বাস, এই কঠিন সময়টা একদিন ঠিকই কেটে যাবে এবং ও নিজের যোগ্যতায় আবার ঘুরে দাঁড়াবে। ইয়াশ এখন প্রতিদিন কিয়ারাকে ভার্সিটি নিয়ে যাওয়া আসা করে। সাথে রেস্টুরেন্ট ও সামলায়।
অতীত….
ওপরের ঘরে ইয়াশ অনেকক্ষণ ধরে কিয়ারার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিল।
ঘরের ভেতরের পরিবেশটা যখন মাত্র একটু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই দরজায় মৃদু করাঘাত হলো।
রিমি ওদের নিচে ডাকতে এসেছে। দরজার আওয়াজ পেয়ে কিয়ারা আলতো করে ইয়াশকে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। রিমি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে বেশ নিচু ও গম্ভীর গলায় বললো,
“আপু, ছোট আব্বু আপনাদের নিচে ডাকছেন।”
কিয়ারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমির পেছন পেছন ধীর পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ওদের ঠিক পেছন পেছন পকেটে হাত দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে হেঁটে চলল ইয়াশও। নিচে ড্রয়িংরুমে তখন এক থমথমে ভাব। আদিল মির্জা আর আবির মির্জা মুখোমুখি সোফায় অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বসে আছেন। কিয়ারা নিচে নেমে উনাদের সামনে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়াল, তার ফর্সা মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ।
কিন্তু ইয়াশ সোজা হয়ে কিয়ারার একটু পাশেই এসে দাঁড়াল। তার মুখাবয়ব দেখে বোঝার উপায় নেই যে মাত্র কিছুক্ষণ আগে এই মানুষটাই একটা ছেলেকে জানোয়ারের মতো পিটিয়ে হসপিটালে পাঠিয়েছে।
ইয়াশের চেহারা এখন এতটাই শান্ত আর স্বাভাবিক দেখাচ্ছে যে মনে হচ্ছে ড্রয়িংরুমে কিছুই ঘটেনি। আদিল মির্জা ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তাকে সোফায় বসতে বললেন, কিন্তু ইয়াশ সামান্য মাথা নাড়িয়ে স্রেফ না বলে দিল। সে কিয়ারার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল।
এবার আবির মির্জা তাঁর গম্ভীর ও ভারী দৃষ্টিটা কিয়ারার ওপর রাখলেন। তিনি অত্যন্ত শক্ত ও স্পষ্ট গলায় কিয়ারাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তোমার সামনে এখন দুটো পথ খোলা আছে, কিয়ারা। হয় আমি, নয়তো ইয়াশ। যদি তুমি আমাকে বেছে নাও, তবে এই মুহূর্তে ইয়াশের সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে আমার পছন্দ করা ছেলের সাথে তোমাকে বিয়ে বসতে হবে। আর যদি তুমি ইয়াশকে বেছে নাও, তবে আজই, এই মুহূর্তেই তোমাকে এই বাড়ি থেকে চিরতরে চলে যেতে হবে।”
আবির মির্জা একটু থামলেন, নিজের মনের ভেতরের কষ্টটা চেপে ধরে মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “বলো, তুমি কি আসলেই ইয়াশের সাথে সংসার করতে চাও?”
বাবার এমন কঠিন শর্ত আর প্রশ্নের মুখে পড়ে কিয়ারা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। পুরো ড্রয়িংরুমের সবার নজর তখন তার ওপর। সে কী বলবে, কীভাবে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে কিছুই বুঝতে পারছিল না। মনের ভেতরের তীব্র ঝড়টা সামাল দিতে সে এক নজর ইয়াশের দিকে তাকালো। দেখলো, ইয়াশও পলকহীন দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ইয়াশের সেই ধারালো চোখের ভাষা বলে দিচ্ছিল, সে-ও আজ জানতে চায় কিয়ারা নিজের মুখে সবার সামনে তাকে মেনে নেয় কি না।
কিয়ারা নিজের দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরল, তারপর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত দৃঢ় ও কাঁপাহীন গলায় উত্তর দিল,
“আমার বিয়ে হয়ে গেছে, পাপা। আমি একটা হালাল সম্পর্ক ত্যাগ করে অন্য কারো সাথে হারাম সম্পর্কে কেন জড়াবো? আমি উনার বিবাহিত বউ। মৃত্যুর আগ অব্দি আমি উনার সাথেই থাকবো।”
কিয়ারার মুখ থেকে বের হওয়া এই একটা মাত্র কথা যেন পুরো ড্রয়িংরুমের বাতাস হালকা করে দিল। এই চরম জবাব শোনার সাথে সাথেই ইয়াশ এবং তার বাবা আদিল মির্জার গম্ভীর মুখে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। ইয়াশের বুকের ভেতরটা তখন এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে গেছে, তার মনে হচ্ছিল সবার সামনে এখনই গিয়ে কিয়ারাকে জড়িয়ে ধরে একটা শক্ত চুমু এঁকে দেয়।
আবির মির্জা মেয়ের এই শেষ সিদ্ধান্ত শুনে আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। তবে তাঁর চোখ দুটো যন্ত্রণায় ভিজে উঠল। তিনি এবার কিয়ারার দিক থেকে চোখ সরিয়ে ইয়াশের দিকে তাকালেন এবং অত্যন্ত ভারী ও ভাঙা গলায় বললেন,
“আমার নিজের মেয়ে আজ আমাকে নয়, ইয়াশ… তোমাকে বেছে নিলো।”
আবির মির্জার ভাঙা গলার কথাগুলো শুনে ইয়াশের ঠোঁটের কোণে একটা হালকা, আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল।
সে কিয়ারার দিকে তাকিয়ে নরম কিন্তু স্পষ্ট গলায় শুধু একটা শব্দই বলল, “চলো।”
বাবার বাড়ি চিরতরে ছেড়ে যাওয়ার এই কঠিন মুহূর্তে কিয়ারা আর দ্বিধা করল না। সে বাড়িয়ে দিয়ে ইয়াশের হাতটা শক্ত করে ধরল। ওদের দুজনকে এভাবে এক হতে দেখে আদিল মির্জা আর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি এতক্ষণ বড় ভাই হিসেবে আবির মির্জার কষ্টটা বুঝলেও, বাবা হিসেবে কিয়ারার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
তিনি ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, “ইয়াশ, আমরা আমাদের মেয়ের গায়ে কখনো কোনো আঁচ আসতে দিইনি। বুকের ভেতর আগলে বড় করেছি। আশা করব, তুইও এমন কিছু করবি না যাতে আমাদের মেয়ে কোনো কষ্ট পায়।”
ইয়াশ এক মুহূর্তের জন্য বাবার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চেনা জেদ আর প্রতিজ্ঞা বলে দিচ্ছিল, সে কিয়ারাকে আগলে রাখবে। ঠিক তখনই আবির মির্জা নিজের ক্ষোভ আর ঘৃণা চেপে রাখতে না পেরে বড় ভাই আদিল মির্জার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ওকে পরিষ্কার বলে দিস ভাই, ওর কোনো পাপের বা অন্যায়ের টাকার ছোঁয়া যেন আমার মেয়ের গায়ে না লাগে! আমি চাই না আমার মেয়ে কোনো অসৎ উপার্জনে চলুক।”
নিজের সততা আর ক্ষমতার ওপর আঘাত আসায় ইয়াশ এবার সরাসরি আবির মির্জার দিকে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“লাগবে না। আমি লাগতেও দেব না।”
কথাটা বলেই ইয়াশ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রয়োজন মনে করল না। সবাইকে চমকে দিয়ে সে হুট করেই শাড়ি পরা কিয়ারাকে এক ঝটকায় পাঁজাকোলা করে নিজের কোলে তুলে নিল। কিয়ারা লজ্জায় আর ভয়ে ইয়াশের গলা জড়িয়ে ধরল। ইয়াশ ওকে কোলে নিয়েই ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে আবার ওপরের ঘরের দিকে চলে গেল। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় সে কিয়ারার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “তুই পারবি আমার সাথে একদম সাধারণ মানুষের মতো সংসার করতে? যেখানে কোনো বিলাসবহুল গাড়ি থাকবে না, বড় বড় ফ্ল্যাট থাকবে না?”
কিয়ারা ইয়াশের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল কেবল ওকে পাওয়ার এক তীব্র আকুতি। কিয়ারা আলতো করে মাথা নেড়ে বলল, “হুঁ, পারব।”
রুমে ঢুকেই ইয়াশ কিয়ারাকে আলতো করে মেঝেতে নামিয়ে দিল।
ইয়াশ একটা সাধারণ ট্রাভেল ব্যাগে নিজের কয়েকটা শার্ট আর আলমারি থেকে কিয়ারার সাধারণ ব্যবহারের কয়েকটা সুতির জামাকাপড় কুড়ে নিল। তার দামী আইফোনটা সুইচড অফ করে টেবিলের ওপর রেখে দিল, যাতে কেউ তাদের লোকেশন ট্র্যাক করতে না পারে।
সব গোছানো শেষ করে ইয়াশ ব্যাগটা কাঁধে ঝুলাল। তারপর কিয়ারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। নিচে আর কারো দিকে না তাকিয়ে, কিয়ারাকে সাথে নিয়ে তারা মির্জা বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল
নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here