অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৬
সাজিয়া জাহান সুবহা
স্যাঁতসেঁতে পরিত্যক্ত জায়গা। বড় বড় গাছপালায় ঢাকা পড়েছে সর্বত্র। দেখতে মনে হচ্ছে গভীর জঙ্গল। কিন্তু মাঝে রয়েছে যাতায়াতের জন্য সরু পথ। পথের দুই ধারে সারি সারি নাম না জানা হরেক রকমের গাছ-গাছালি, ঝোপঝাড়। এমনই এক ঝোপের ভেতর আটকে পড়েছে ছোট্ট একটি বিড়ালছানা। চিকন সুরে মিয়াও! মিয়াও চিৎকার দ্বারা সে বুঝিয়ে চলছে বিপদ সংকেত। সরু পথ দিয়ে নেটওয়ার্ক সিগনাল খুঁজতে থাকা ষোড়শী মেয়েটা হঠাৎ এমন করুন আওয়াজ শুনে চমকে উঠলো। এতোক্ষণে হুশ হলো সে নেটওয়ার্ক খুঁজতে খুঁজতে জঙ্গলের ভেতর চলে এসেছে। ভয় উঁকি দিলো মনে।
কিন্তু আবারো বিড়ালছানার করুন ডাক শুনে হাতের নো সিগনাল সংকেত দেওয়া মোবাইলটা সসন্তর্পণে নিজের জিন্সের পকেটে ঢুকিয়ে এগিয়ে গেলো আওয়াজের উৎস খুঁজতে। ঝোপের ভেতর আটকা পড়ে সাদা তুলতুলে ছোট্ট দেহটা দেখে তার মায়া লাগলো ভীষণ। সাবধানতা অবলম্বন করে ঝোপের ভিতর হতে ছাড়িয়ে আনলো বিড়ালছানা-টাকে। আদুরে হাতে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। তুলতুলে সাদা দেহটায় আদুরে হাত বুলিয়ে সে যখন আপনমনে কথা বলতে ব্যস্ত, তখনই হঠাৎ একখানা পুরুষালি শক্ত হাত পেছন থেকে তার কনুই ধরে হ্যাঁচকা টান মারলো। সাথে সাথে হাত ফসকে বেড়িয়ে গেলো বিড়ালছানা-টি। মেয়েটি ধাতস্থ হওয়ার আগেই হঠাৎ গগন কাঁপানো শব্দ হলো, ঠাশশশশশশশস!!!!
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ধরফরিয়ে ঘুম ছেড়ে উঠে বসলো সায়েরী। আপনা আপনি হাত চলে গেলো নিজের বাম গালে। মনে হচ্ছে যেনো এখনো জ্বলছে সেটা। কান ভুঁ ভুঁ করছে। ধরফর করছে বুক! আশেপাশে নজর বুলিয়ে বুঝতে পারলো সে নিজের কামরায় রয়েছে। এবং একটু আগের ঘটনাটা ছিলো দুঃস্বপ্ন। অনেকগুলো দিন পর আজ সেই স্বপ্নটা দেখলো। গেলো বছর কলেজ থেকে ট্যুরে গিয়ে সায়েরী যখন নেটওয়ার্ক খুঁজতে খুঁজতে জঙ্গলে চলে গিয়েছিলো। অন্যদিকে তখন তার খুঁজে অস্থির হয়ে উঠলো বাকিরা। টিচার থেকে শুরু করে প্রতিটা স্টুডেন্ট এর মধ্যে উত্তেজনা এসে ভর করলো।
হুট করে প্রাপ্ত বয়স্ক একটা মেয়ে কি করে চোখের সামনে থেকে গায়েব হয়ে গেলো সেটা ভেবে পেলো না কেউ৷ সায়েরীর বন্ধুমহল ভয়,উত্তেজনায় কাতর৷ সেই সাথে সাফওয়ান অস্থির হয়ে উঠলো বন্ধুর আমানত রক্ষা করতে না পারার দুঃখে। ভেতরটা অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে উঠছিলো তার। আশেপাশের সব জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজ নিয়েও লাভ হলো না কোনো। দৌঁড় ঝাপে শরীর ঘেমে উঠেছিলো তার। শেষে ভাবলো একটাবার জঙ্গলের দিকটাও তল্লাশি দেওয়ার কথা। যদিও তাদের অবস্থান করা জায়গা থেকে জঙ্গলটা দূরে পরে৷ তবুও মনে মনে শেষ আশাটুকু নিয়ে খুঁজ করছিলো সায়েরীর। অতঃপর গভীর জঙ্গলের মধ্যভাগে এসে সুস্থ শরীরে বিড়ালছানা নিয়ে খেলতে থাকা সায়েরীকে দেখে রাগে শরীর জ্বলে উঠেছিলো সাফওয়ানের।
দাঁত কিড়মিড়িয়ে নিজের রাগটুকু নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে শক্ত থাপ্পড় বসালো সায়েরীর নরম গালে। পিনপতন নীরবতায় সাফওয়ানের শক্ত হাতে জোরালো থাপ্পড়টা চারপাশ কাঁপিয়ে তুলেছিলো। সেই সাথে কেঁপে উঠেছিলো ষোড়শী মেয়েটার সর্বাঙ্গ। বিষ্ময়, হতবাক নয়নে সে তাকালো সাফওয়ানের রাগে লাল হয়ে উঠা মুখটার দিকে। যে ক্ষুব্ধ নয়নে খেয়ে ফেলবো দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলো সায়েরীর দিকে। মুহুর্তেই চোখ টলমল করে ফোলা ফোলা গাল বেয়ে নিরব অশ্রু নামলো সায়েরীর। সে নিজেও বুঝলো না অশ্রুগুলো ব্যাথার ছিলো, না অপমানের! তবে সাফওয়ানের পেছন পেছন যখন নিজের বন্ধুমহলের সাথে সাফওয়ানের বন্ধুবান্ধবদের উপস্থিতি ঠের পেলো, তখন দু’হাতে নাজরাতকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠেছিলো সে। তার ছোট্ট মস্তিষ্কে তখনো ধরা দিলো না কেনো এই থাপ্পড়টা খেলো সে। সাফওয়ানের হঠাৎ এমন প্রতিক্রিয়া দেখে নীতি বেশ বকাঝকা করেছিলো সাফওয়ান-কে। বিপরীতে গমগমে গলায় সাফওয়ান বলেছিলো,
‘ এই মেয়েকে বল ওর পিছে গাধার মতো পাহারা দেওয়ার জন্য কেউ বসে নেই এখানে। নিজের টেক কেয়ার করতে না পারলে এসেছে কেনো ট্যুরে? আমাদের কি ঠ্যাকা পড়েছে? সে ইচ্ছেমতো যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবে, আর আমরা সব ছেড়ে ম্যাডামের তল্লাশি-তে দিন পার করবো!রিডিকিউলাস! ‘
সেদিন সবার সামনে থাপ্পড় খাওয়ার পর সাফওয়ান ওমন বক্তব্য শুনে অপমানে টানা তিনঘণ্টা কান্না করেছিলো সায়েরী।সাফওয়ানের বকাঝকা শুনে একঘন্টা কান্না করার পর যখন আয়ান নিজেও সায়েরীর বোকামির জন্য বকে দিলো, তখন আবারো নতুন উদ্যমে কান্না জুড়ে দিয়েছিলো সায়েরী। একপর্যায়ে কান্না থামলেও মন খারাপ সারাতে পারলো না বন্ধুরা কেউ। সেদিনের কথা মনে পড়লে একদিকে নিজের বোকামির জন্য হাসি পাই। অন্যদিকে সাফওয়ানের উপর রাগ বাড়ে তরতর করে। কতো জুরে মেরেছিলো ওর নরম গালে! আজও মনে পড়তেই যেনো গাল জ্বলে উঠে।
বহুদিন পর আবারো সেদিনের স্বপ্নটার দেখার কারণ হলো আজ তারা কলেজ ট্যুরে বান্দরবান যাচ্ছে। গতবারের সেই ঘটনার পর আবরারের কাছ থেকে বেশ বকা শুনেছিলো সায়েরী। আবরার স্পষ্ট কন্ঠে জানিয়ে দিয়েছিলো আর কোনো ট্যুরে যাওয়া চলবে না তার। বিগত পাঁচদিন ধরে একমাত্র এই ট্যুরের জন্য আকুতি মিনতি করে চলছে সে। শুধু পায়ে পরাটাই বাকি ছিলো। শেষে গতকাল রাতে সায়েরীর কান্নাকাটি দেখে মন গলে গেলো আবরারের বাবার৷ তিনি নিজে ছোট ভাইকে বোঝালেন এক ভুল দ্বিতীয় বার হবে না। তাছাড়া সাফওয়ান তো আছেই সেখানে। ছেলেটার উপর চোখ বন্ধ করে করে ভরসা করে সবাই। অবশেষে রাজি হলো সায়েরীর বাবা। নিজে ফোন করে সাফওয়ানকে অনুরোধ করলেন যাতে উনার বাচ্চা মেয়েটাকে একটু চোখে চোখে রাখে৷ উপাশে সাফওয়ানের কেমন মন্তব্য ছিলো জানা নেই সায়েরীর। তবে বাবার কথা শুনে মনে মনে ভেংচি কাটলো সে। নিজের মেয়ে ছেড়ে ছেলের বন্ধুকে ভরসা করছে, ভাবা যায় এটা! এই দিনও কি দেখার ছিলো তার!!
বিছানার উপর অবহেলায় পড়ে থাকা মোবাইলটার অনবরত রিংটোন শুনে দ্রুত ওয়াশরুম থেকে বের হলো আবরার। সকালেই চট্টগ্রামে ফিরেছে সে রাতের ট্রেনে। মোবাইল স্ক্রিনে সাফওয়ানের নাম দেখে রিসিভ করে কানে চাপতেই উপাশ থেকে সাফওয়ান গমগমে গলায় বললো,
‘ কোথায় তুই? ‘
‘ আজ ভোরে এসে পৌঁছিয়েছি। তোকে টেক্সট করেছিলাম রাতে। ‘
জ্বলে উঠলো সাফওয়ান। কর্কশ কণ্ঠে বললো,
‘ সামান্য একটা আবদার করেছিলাম তোর কাছে আবরার! সেটাও রাখতে পারলি না তুই! কি হতো আর চারদিন পর চট্টগ্রামে ফিরলে? নাহয় চট্টগ্রাম থেকে হলেও আমাদের সাথে যোগ হতি! মাত্র তিনটা দিন তুই বন্ধুদের জন্য ব্যয় করতে পারলি না! অন্যদের কথা বাদ দিলাম। আমার এবং মিহাদের কথা রাখার জন্য হলেও ট্যুরে আসতে পারতি। আমাদের ভার্সিটি লাইফের শেষ ট্যুর এইটা। ‘
আবরার নিশ্চুপ৷ ট্যুরে যাওয়ার ডেট ফিক্স হওয়ার পর থেকেই মিহাদ এবং সাফওয়ান মিলে পাকড়াও করছে তাকে। কিন্তু কোনো ভাবেই রাজি হলো না আবরার। শেষে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ফিরে গিয়েছে চট্টগ্রামে। আবরারের নিরবতা দেখে ফুস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো সাফওয়ান। ধীর গলায় বললো,
‘ তিন বছর পার হয়ে গিয়েছে দোস্ত। এবার তো মুভ অন কর। ‘
মৃদু হাসলো আবরার। বারান্দার গ্রীলের ফাঁকে উঁকি দেওয়া নীলাভ আকাশে শূন্য দৃষ্টি ফেলে বললো,
‘ মুভ অন করবো? আমি কোনো রিলেশনশিপে ছিলাম না যে মুভ অন করার প্রয়োজন আছে। তাছাড়া তিন বছর কেনো, তিনশ যুগ পার হয়ে গেলেও “ওর” জন্য জমানো ভালোবাসা ফিকে হবে না। আর তোকে আমি এসব বলে কি লাভ? তুই কখনো বুঝবি না আমার অবস্থাটা। ওকে অন্যকারো সাথে দেখলেই আমার দম আটকে আসে। কেমন বুক ব্যাথা হয় তা ততদিন বুঝবি না, যতদিন না আমার মতো কাউকে সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসবি। ‘
‘ হ্যালো হ্যালো! থাম এবার৷ এসব প্রেম ভালোবাসা নিয়ে কোনো দেবদাস-এর কাছ থেকে ফিলোসোফি শোনার ইচ্ছে আমার নেই। ট্যুরে না গেলে না যা। রাখলাম ফোন। ‘
টুট টুট শব্দে কল ডিসকানেকটেড হয়ে গেলো। একনজরে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে একটি বিশেষ ফাইলে ঢুকলো আবরার৷ চোখের সামনে স্ক্রিনটাই ভেসে উঠলো সারি সারি ছবি। নির্দিষ্ট একটা ছবিতে ক্লিক করে তা গভীর চোখে দেখতে লাগলো সে। ছবিটা ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষের সময়কালের। আজ থেকে তিন বছর আগের। ছবিতে বেঞ্চের উপর বসে আছে আবরার। পাশে নীতি। যে আবরারের কাঁধে মাথা রেখে গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ক্যামেরার দিকে। অন্যদিকে আবরারের মুগ্ধ দৃষ্টি তখন নীতির উপর আবদ্ধ। থাকবে নাই বা কেনো! কলেজের প্রথম দিন যখন মেয়েটার দর্শন পেয়েছিলো তখনই আটকা পড়েছিলো সে নীতির মায়াজালে৷ ইরার সাথে স্কুল লাইফ থেকেই বেশ সখ্যতা ছিলো তার। ইরার সুবাদে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিলো নীতির সাথে। ধীরে ধীরে আবরার,মিহাদ,রায়ান,জিমন, ইরা এবং নীতি ছয় জনের বন্ধুত্ব বেশ পাকাপোক্ত হয়ে উঠেছিল। সেই সাথে বাড়ছিলো আবরারের অব্যক্ত অনুভূতি। কাউকে কিচ্ছু বলার সাহস হয়নি তার।
পাছে যদি নীতি জানতে পেরে বন্ধুত্ব ভেঙে দেয়! কিন্তু পরবর্তীতে তার এই চুপ থাকাটাই যেনো কাল হয়ে দাঁড়ালো। সেদিন ছিলো রায়ানের জন্মদিনের আগের রাত। হুট করে নীতি রায়ান ব্যাতিত বাকি পাঁচজনকে নিয়ে গ্রুপ কল করে বললো সে রায়ানকে ভালোবাসে, আগামীকাল প্রপোজ করতে চাই! আকস্মিক এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কথাটা শুনে হৃদস্পন্দন যেনো থমকে গিয়েছিলো আবরারের। মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরোতে চাইলো না। চোখ জ্বলে উঠলো মারাত্মকভাবে। নিঃশব্দে কল কেটে এক বুক কষ্ট নিয়ে পার করলো নির্ঘুম রাত৷ পরেরদিন প্ল্যান অনুযায়ী নিজ বাসায় বন্ধুদের নিয়ে ছোট খাটো একটা পার্টির আয়োজন করেছিলো রায়ান। অনিচ্ছা স্বত্তেও রায়ানের আবদারে চৌদ্দ বছর বয়সী সায়েরীকেও নিয়ে গিয়েছিলো আবরার সেদিন।
রায়ান কেক কেটে সবাইকে খাওয়ানোর পর হুট করেই তার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ে নীতি। হকচকিয়ে গিয়েছিলো রায়ান। তার চেয়েও বেশি চমকেছিলো আবরার। অবিশ্বাস্য, হতভম্ব নজরে দেখছিলো নিজ প্রেয়সীকে অন্য একজনকে প্রেম নিবেদন করতে। বুকের ভেতরটা চুরাঘাতের মতো ব্যাথায় জর্জরিত হয়ে উঠছিলো। অন্যদিকে বাকিরা অবগত ছিলো বলে এপ্রিসিয়েট করছিলো নীতিকে। সর্বদা স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড থাকা নীতি খুব সহজেই ব্যক্ত করে দিয়েছিলো নিজের অনুভূতি। অন্যদিকে লাজুক স্বভাবের রায়ান বেশ অস্বস্তিতে পড়েছিলো। কিন্তু না করেনি৷ বহু দিনের পছন্দের বন্ধবীকে প্রেমিকা সুরূপ গ্রহণ করেছিলো অনাসয়ে। আনন্দে নেচে উঠেছিলো সকলে। ১৪ বছরের সায়েরী গভীর কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও সবার খুশি দেখে সেও জোরে জোরে হাত হাতি দিয়ে লাফিয়ে উঠেছিলো।।
কিন্তু হঠাৎ করে তার নরম হাতে শক্ত হাতের থাবা মেরে সেই স্থান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল আবরার। পেছনে তখন রায়ান ও নীতিকে গিরে উল্লাসে মেতে ছিলো বাকিরা। অন্যদিকে খেয়াল ছিলো না কারোরই। যখন খেয়াল হলো তখন প্রায় অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে গিয়েছিল আবরার এবং সায়েরী। রায়ানের ফোন পেতেই গম্ভীরমুখে আবরারের মুখ থেকে বের হয়েছিলো মাত্র চারটি শব্দ। ” আর্জেন্ট ছিলো তাই। (একটু থেমে) কংগ্রেচুলেশনস্!!” বিপরীতে রায়ানকে কিছু বলতে না দিয়েই কল কেটে দিয়েছিলো সে। ছোট্ট সায়েরী বুঝে উঠতে পারেনি কি হয়েছিলো আবরারের। যে মানুষটা ঘরে কম, বন্ধুদের সাথে বাইরে সময় কাটাতো বেশি, সেই মানুষটা হুট করে বন্ধুদের এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা দিনে এভাবে চলে আসলো!
সেদিন সায়েরীকে বাসায় পৌঁছিয়ে জীবনে প্রথম বারের নেশা করেছিলো সে। উদ্ভট কারণে রাস্তার কিছু বখাটে ছেলেকে পিটিয়ে জেলে আটকা পড়েছিলো। সেদিন বাবার সম্মানে কতটুকু আঘাত বসিয়েছিলো জানা নেই তার। বাসায় ফিরার পর ভাংচুর করেছিলো বেশ৷ শেষ রাতের দিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু সাফওয়ানকে কাছে পেয়ে নিজের গম্ভীর সত্তা ভেঙ্গে গুড়িয়ে গিয়েছিলো আবরারের৷ মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠেছিলো সাফওয়ানের সম্মুখে। অবাক, বিষ্ময়ে থমকে গিয়েছিলো সেদিন সাফওয়ান। তবুও নিজের তুখোড় ব্যাক্তিত্ত্বের দ্বারা সামনে নিয়েছিলো আবরারকে।
সবটুকু দিয়ে বুঝিয়েছিলো। সেদিন সাফওয়ান না থাকলে হয়তো আবেগের বশে বিরাট কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলতো সে৷ সেই রাতের জন্য সাফওয়ানের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে সে৷ একমাত্র সাফওয়ানের বক্তব্য মেনে বাকি ফাইনাল এক্সাম অবধি দিনগুলো অন্ধের মতো কাটিয়ে দিয়েছিলো৷ পরবর্তীতে চান্স পেয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই থেকে সব কিছু ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে চট্টগ্রামে। খুব দরকার ছাড়া নীতি কিংবা রায়ানের মুখোমুখি হয়নি। রায়ানের প্রতি মনে হিংসা জমলেও বন্ধুত্বে ফাটল ধরেনি একবিন্দু। সাফওয়ানের কথা ভেবে মোবাইলটা পকেটে গুজে মৃদু হাসলো আবরার। বুঝ হওয়ার পর থেকে মিহাদ, সাফওয়ান এবং আবরার তিন আত্মায় এক শরীর। সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে আজও তাদের বন্ধুত্ব সেই শুরুর দিকের মতোই স্বচ্ছ!
কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সারি সারি বাস৷ বরাবরের মতোই ট্যুরের দ্বায়িত্ব পড়েছে সিনিয়র ব্যাচের উপর। বাসের সামনে দাঁড়িয়ে হাতের লিস্ট দেখে সবাই এসেছে কিনা যাচাই করছে জিমন৷ তার সাথে নীতি, রায়ান এবং মিহাদ তদারকি করছে অন্যান্য দিকগুলো। সাথে আরো কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব রয়েছে তাদের।প্রত্যেক ব্যাচের জন্য আলাদা আলাদা বাস। সেই অনুযায়ী ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষের গুটিকয়েক ছাত্র ছাত্রী নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত বাসে আসন পেতেছে৷ নুহাশ বেশ অনেক্ষন যাবত নিজের ব্যাচের কয়েকজন ছেলে মেয়ের সাথে তুমুলঝগড়া বাধিয়েছে সিট নিয়ে। সে আগে থেকেই বাকি বন্ধুদের জন্য ছয় খানা সিট দখল করে রেখেছে। বাসটা এখন প্রায় ভর্তি কেবল সেই সাতটা সিট বাদে। কয়েকজন স্টুডেন্ট সিটগুলো দখল করতে চাইলে চেঁচিয়ে উঠলো নুহাশ। আয়ান এবং তোহা মিলে কোনো মতে পারলো না তাকে থামাতে। উপায় না পেয়ে সিনিয়র ব্যাচ থেকে মিহাদ-কে ডেকে আনলো তোহা৷ পরিশেষে নুহাশের জেদটাই পূরণ হলো। অন্য স্টুডেন্টগুলো যখন মুখ কুঁচকে ফিরে যাচ্ছিলো সেটা দেখে নুহাশ কলার উঁচিয়ে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বললো,
‘ আসছে নুহাশ সিকদারের বা*ল বাঁকা করতে। আমি যে জেল ইউস করি এ কথা এই বলদগুলারে একটু বুঝিয়ে বলিস তো। আমার চুল বাঁকা এত্তো সোজা না হুহ!! ‘
নুহাশের বলতে দেরি। কিন্তু তোহার হাত চালাতে দেরী না। ধুম করে সে কিল বসালো নুহাশের পিঠে৷ চোখ মুখ কুঁচকে বললো,
‘ কথার কি ছিরি! জীবনেও শোধরাবি না তুই! এখানে যে আমার মতো ভদ্র একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে খেয়াল নেই না তোর! যত্তসব অশ্লীল কথাবার্তা!! ‘
‘ তা আপনি এই অভদ্র’র অশ্লীল কথাবার্তা শুনছেন কেন ভদ্র আম্মা! চারআনা যেমন চোখে লাগিয়ে রেখেছেন তেমন কানেও লাগিয়ে রাখেন। আপনার ভদ্র কান হেফাজতে থাকবে। ‘
তোহা আবারো কিছু বলার আগে আয়ান ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলো দুজনকে। তিনজনই নেমে আসলো বাস থেকে৷ ইতিমধ্যে নাজরাত এবং ফায়াজ এসে হাজির হয়েছে। বাকি শুধু সাফ্রিন এবং সায়েরী। আরো মিনিট খানিক কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ ফায়াজের নজর কাড়লো সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে রিক্সা থেকে ছটফট ভঙ্গিতে নেমে দাড়ানো হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী-টা৷ যার গায়ে ল্যাভেন্ডার কালারের হাটু সমান গোল টপ, ব্লাক জিন্স। গলায় গোল করে পেছানো ল্যাভেন্ডার এবং ব্ল্যাক কম্বিনেশনের উড়না৷ পায়ে একজোড়া সাদা স্ন্যাকার’স। কালো দীঘল চুলগুলো বরাবরের মতোই খোঁপায় আটকানো। মুখের দুপাশে বিরক্ত করছে ছোট ছোট চুলগুলো। বার বার সরানোর পরেও যখন সেগুলো মুখের উপরেই ঠাই হলো তখন বিরক্তিতে গাল ফুলালো সে। তা দেখে মাথা ঝাঁকিয়ে হাসলো ফায়াজ। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে। নিজ দ্বায়িত্বে বাড়িয়ে নিলো রঙ বেরঙের স্টিকার দিয়ে সাজানো ছোট্ট ট্রলি ব্যাগটা। লক্ষ্য করলো এই ছোট্ট ট্রলি ব্যাগটা ছাড়াও মানুষটার পিঠে ঝুলছে “হ্যালো কিট্টি” ডিজাইনের একটা ব্যাগ, এবং কাধে আরো একটা লম্বাকার ছোট্ট ব্যাগ। ফায়াজ অবাক কন্ঠে বললো,
‘ সায়ু! আমরা তো মাত্র তিনদিনের জন্য যাচ্ছি। এতোগুলা ব্যাগ কেনো সাথে? ‘
সায়েরী ছটফট ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
‘ আরে.. এই ট্রলিতে আমার জামা কাপড় আছে। আমি কম করেই নিয়েছিলাম, কিন্তু আম্মু বলেছে আমি নাকি আস্ত একটা দুর্ঘটনার গোডাউন। যেখানেই যায় কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে জামা কাপড় নষ্ট করে ফেলি৷ আসলে আমিও ভেবে দেখলাম, আম্মু কথাটা ভুল বলেনি। তাই সে অনুযায়ী একটু বাড়িয়ে নিয়েছি কাপড়। আর এইযে পিঠের ব্যাগটা? এটাতে আমার টুকিটাকি প্রয়োজনীয় মেকাপ,চার্জার,পাওয়ার ব্যাংক এসব। ওহ হ্যাঁ! ফার্স্ট এইড বক্সও আছে। এটাও আম্মু দিয়েছে। আর এই যে কাঁধের ব্যাগটা? এটাতে কিছু স্ন্যাকস নিয়েছি সবার জন্য। শুধু অনেকগুলো চিপস আমার জন্য। ‘
কয়েক সেকেন্ড সায়েরীর মুখের দিকে বোবার মতো তাকিয়ে হেসে উঠলো ফায়াজ। সায়েরীর মুখের সামনের চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বললো,
‘ তুই আর বড় হবি না তাইনা? ‘
ফায়াজের হাত সরিয়ে নিজেই কানের পিঠে চুল গুজে দিয়ে সায়েরী জবাব দিলো, “জীবনেও না”। তারপর কাঁধের ব্যাগটাও ফায়াজের কাঁধে ঝুলিয়ে দৌঁড় লাগালো বাকিদের কাছে। কিন্তু চার কদম এগোনোর পর হুট করেই বাম দিক থেকে তীব্র বেগে আসা একটা সাদা গাড়ি আচমকা ব্রেক কষলো সায়েরীর কাছাকাছি। ভয়ে অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো সায়েরীর। গাড়ি এবং তার মাঝখানে মাত্র তিন ইঞ্চি দুরত্ব। আরেকটু হলেই বোধহয় গাড়ির ধাক্কায় উড়ে যেতো সে। আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনায় ফায়াজও চমকে গেলো। দ্রুত এগিয়ে এসে হাত টেনে সায়েরীকে সরিয়ে দিলো মাঝ রাস্তা থেকে। ততোক্ষণে গাড়ির ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে সাফওয়ান। এবং ব্যাক সিট থেকে বেরিয়ে আসলো সাফ্রিন। বেরিয়েই দ্রুত এগিয়ে গেলো সায়েরীর কাছে৷ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,
‘ ঠিক আছিস তো? লেগেছে কোথাও? ‘
নাবোধক মাথা নাড়লো সায়েরী। ক্ষীণ স্বরে বললো, ‘ ঠিক আছি! ‘
সাফ্রিন মৃদু চাপড় মারলো সায়েরীর মাথায়। শাসানো গলায় বললো,
‘ এভাবে মাঝ রাস্তায় কোনো কিছু না দেখে কেউ দৌঁড়ায়? এক্ষুনি কোনো অঘটন ঘটলে কি হতো? ‘
সায়েরী চোখ মুখ কুঁচকে নিচু গলায় বললো,
‘ চুপ কর না। তোর এই রাক্ষস মার্কা ভাই এসব শুনলে লাই পেয়ে একশো’র জায়গায় সাড়ে একশো বকা শুনিয়ে দিবে। সে তো ওত পেতে থাকে কিভাবে আমার ইজ্জতের ফালুদা বানাবে সবার সামনে। ‘
‘ ওটা সাড়ে একশো না দেড়শো হবে৷ আর আমার ভাই মোটেও ফালতু জিনিস নিয়ে তোকে বকেনা। তোর কাজগুলোই এমন বকা শোনার মতো। ‘
প্রতিউত্তর করলো না সায়েরী। এতোক্ষণে লক্ষ্য করলো সাফওয়ান এবং সাফ্রিন দু’জনই একই আউটফিট নিয়ে এসেছে। হোয়াইট টি-শার্ট, ব্ল্যাক জিন্স, হোয়াইট স্ন্যাকারস। দুই ভাই বোনকে নজর কাড়া সুন্দর লাগছে একত্রে।হঠাৎ সাফওয়ানের গাড়ির পেছন সিট থেকে হেলেদুলে ইপ্সিতা-কে নামতে দেখে চমকে উঠলো সকলে।
সায়েরী অবিশ্বাস্য নয়নে তাকালো সাফ্রিনের দিকে। অর্থাৎ কীভাবে কি!! সাফ্রিন মুখ বাকিয়ে জবাব দিলো,
‘ আর বলিস না। সকাল সকাল বাবাইকে কল করে এই ন্যাকামির দোকানের বাবা বলেছে মেয়েকে একা দিতে ভয় লাগছে,দেশের এই অবস্থা সেই অবস্থা। বাধ্য হয়ে বাবাই বললো সকালে আমাদের সাথে কলেজে আসবে৷ আর ট্যুরেও আমরা তার ন্যাকা রাজকন্যার খেয়াল রাখবো। মানে হয় এসবের! ‘
সাফ্রিনের কথা শুনে সায়েরীর মনে পড়লো তার বাবা নিজেও সাফওয়ানকে ফোন করেছিলো সায়েরীর খেয়াল রাখার জন্য৷ তাহলে নিশ্চয়ই সাফওয়ানও তাকে নিয়ে বিরক্ত। হওয়ারই কথা। কে চাইবে আনন্দের মুহূর্ত বাদ দিয়ে অন্য একজনকে নজরে নজরে রাখতে!
জিমনের সাথে লিস্ট চেক করছিলো নীতি। সাফওয়ান এগিয়ে গেলো সেদিকে। তাকে দেখতে পেয়ে নীতি টুকটাক প্রয়োজনীয় কথা সেরে বললো,
‘ মিহাদের কাছে শুনলাম আবরার বলেছে সায়েরীকে আমাদের বাসে নিতে। তাছাড়া সাফাকেও তোর সাথে রাখবি যখন সায়েরী কেও… ‘
নীতির কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই সাফওয়ান বিরক্ত গলায় বললো,
‘ সাফা বলে দিয়েছে সে গেলে বন্ধুদের সাথে নিজেদের বাসেই যাবে। আর ওই মেয়েটা আস্ত একটা ঝামেলা। ওকে নিজেদের সাথে নিয়ে এক্সট্রা ঝামেলা কাঁধে নেওয়ার কোনো মানেই হয়না। ওরা থাকুক ওদের মতো। বাস থেকে ওই মেয়েকে কেউ তুলে নিচ্ছে না। আবরার একটু বেশিই পজেসিভ। ‘
‘ আচ্ছা মানলাম সবই। কিন্তু সায়েরীকে যেভাবে ঝামেলা বলছিস ও কিন্তু মোটেও এমন না। কি মিষ্টি মিশুক একটা মেয়ে। আমি বুঝি না কেনো তোদের বনিবনা হয়না। মেয়েটা কতো শান্ত.. ‘
নীতির কথা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ পেছন থেকে সায়েরীর আর্তনাদ শুনে ফিরে তাকালো তারা৷ বাসে উঠতে গিয়ে পা স্লিপ করে ধপ করে নিচে পড়ে গিয়েছে সায়েরী। পায়ে ব্যথা পেয়েছে অল্পখানি। ফায়াজ এবং আয়ান মিলে দ্রুত টেনে তুললো ওকে। সায়েরী গাল ফুলিয়ে বাস আবিষ্কারককে বকতে বকতে উঠে গেলো বাসে৷ সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে নীতির দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ নাচালো সাফওয়ান। চোখ দিয়েই যেনো বুঝিয়ে দিচ্ছে৷ “বলেছিলাম না এই মেয়ে ঝামেলার বস্তা! মিললো তো এবার?”
জবাব দিলো না নীতি। আবারো ব্যস্ত হলো নিজের কাজে। সব কিছু চেক করে বাস সব স্টার্ট হওয়ার জন্য রেডি হয়ে আছে৷ কিন্তু সাফওয়ান তখন ব্যাস্ত ভঙ্গিতে ঘড়ি দেখে বারবার তাকাচ্ছে খোলা রাস্তার দিকে। মিহাদ এসে বললো,
‘ সবতো রেডি। চল এবার। ‘
‘ উঁহু! আরেকজন আসা বাকি এখনো। ‘
‘ এই শেষ সময়ে কে আসবে! অবাক কন্ঠ মিহাদের। ‘
সাফওয়ানের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন পড়লো না। একটা সাদা গাড়ি এসে থামলো তাদের সম্মুখে। ব্যাক সিট থেকে তাড়াহুড়ায় নেমে আসলো লাইট পিংক কুর্তি পড়া শ্যামবর্ণা এক যুবতী। যাকে দেখে বুক ধরফর করে উঠলো মিহাদের৷ হৃদস্পন্দনের গতি বাড়লো থরথর করে। সাফওয়ান আড়চোখে একবার তাকালো মিহাদের হতবাক মুখটার দিকে। তারপর দু’কদম এগিয়ে দু’হাতে জড়িয়ে নিলো যুবতী মেয়েটাকে। মেয়েটাও মুচকি হাসলো। সাফওয়ান মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
‘ ঠিক আছিস তো? ‘
মেয়েটা হাসিমুখে জবাব দিলো,
‘ একদম ফাটাফাটি আছি!! ‘
সাফওয়ান মৃদু হাসলো। ইতিমধ্যে নীতি সহ রায়ান এবং জিমনও এসে হাজির হয়েছে৷ মিহাদের মতো তাদের চোখেও বিষ্ময়। মেয়েটা মিহাদের দিকে একনজর তাকাতেই দ্রুত নজর লুকাল মিহাদ৷ মিহাদকে উপেক্ষা করে নীতির দিকে এগিয়ে গেলো মেয়েটি। নীতির চোখ ছলছল করছিলো৷ মেয়েটাকে এগিয়ে আসতে দেখে দুই কদম পিছিয়ে গেলো সে। কান্নারত অভিমানী কন্ঠে বললো,
‘ একদম কাছে আসবি না আমার৷ আমি তোর কেউ না৷ আমার কোনো বেস্ট ফ্রেন্ড নেই। ছিলোও না। ‘
মেয়েটার চোখে জল ঠোঁটে হাসি। নীতির কথাকে উপেক্ষা করে ঝাপটে ধরলো সে। সহসা ফুঁপিয়ে উঠলো দুই রমনী। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো একে অপরকে। ছেলেরা যখন দেখলো তাদের কান্না থামার নাম নেই, তখন রায়ান এবং জিমন মিলে জোর করে ছাড়িয়ে নিলো দুজনকে। ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ মেয়েটার বাম গালে ঠাশ করে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো নীতি। চমকে উঠলো সকলে। মিহাদ এবং সাফওয়ান একসাথে চিৎকার করে উঠলো, নীতি!!!!
নীতি চমকালো না। মিহাদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ তোর এতো জ্বলছে কেনো শয়তান ছেলে? তুই জানতি এই ইরার বাচ্চা কোথায় ছিলো এতোদিন! সব জেনেও আমাকে কিচ্ছু বললি না তুই? আজ তোদের দু’জনকে খুন করবো আমি। ‘
সত্যি সত্যিই সাফওয়ানের দিকে তেঁড়ে যাচ্ছিলো নীতি। সাথে সাথে পেছন থেকে রায়ান ঝাপটে ধরলো নীতিকে। নীতি চিৎকার করে উঠলো,
‘ রায়ান ছাড় বলছি। নাহলে এই দুজনের সাথে তুইও মারা পরবি আজকে। ‘
‘ শান্ত হও জান। এতো হাইপার হলে তোমার শরীর খারাপ করবে তো! ‘
‘ ওই তোকে বলেছি এমন লুতুপুতু ডায়লগ ঝারতে? ছাড়তে বলেছি ছাড়। ‘
‘ জান!! প্লিজ কাম ডাউন। দেখো আমাদের ইরা কতো মাস পর ফিরে এসেছে। আর সাফওয়ান না থাকলে ও ফিরে আসতো বলো। অন্তত আজকে ছাড় দাও। ভালোই ভালোই ট্যুর-টা শেষ হয়ে যাক। পরে এদের খুন করতে আমি তোমাকে হেল্প করবো। প্রমিস। ‘
শান্ত হলো নীতি। তার দিকে তাকিয়ে ইরা গাল ডলতে ডলতে ঠোঁট উলটে বললো, সরিই!!!
‘ দূরে গিয়ে মর। ‘
রাগী গলায় কথাটা বলেই বাসে উঠে গেলো নীতি। তার পিছু পিছু বাধ্য প্রেমিকের মতো চলে গেলো রায়ান। ইরাকে আলতো জড়িয়ে ধরে অল্পস্বল্প কথা বলে জিমনও চলে গেলো। মিহাদ করুণ চোখে তাকিয়ে ছিলো ইরা’র দিকে। ইরা আড়চোখে লক্ষ্য করলো সেটা। তবুও না দেখার ভান করে স্থান ত্যাগ করলো। সাফওয়ানের নজর অনেক্ষণ থেকেই মিহাদের উপর ছিলো। যেতে যেতে সে মিহাদকে বললো,
‘ খবরদার যদি ওর পাশ ঘেঁষতেও দেখেছি তো! ‘
নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে মিহাদ ফিচেল হেসে বললো,
‘ আমার কোনো ইচ্ছেও নেই ওর পাশ ঘেঁষার। ‘
রয়াল ব্লু কালারের টাইট জিন্সের সাথে অফ-হোয়াইট একটা টপ পড়েছে ইপ্সিতা। টপের নিচের দিক প্যান্টের ভেতর গুজে দিয়ে মাঝে আটকে দিয়েছে আকর্ষণীয় বেল্ট। পিঠ ছুঁই ছুঁই লালছে চুলগুলো বরাবরের মতোই উন্মুক্ত। বুকের কাছে টপের উঁচু বোতামটা খোলা। সাদা গলা স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে আছে। হাইলেটার লাগানো গাল চিকচিক করছে আলোর প্রতিফলনে। নিত্যদিনের মতো আজও তার সৌন্দর্য আকর্ষণ করছে উপস্থিত পুরুষ জাতিকে৷ হেলেদুলে বাসে উঠে সম্পূর্ণ বাসে চোখ বুলালো সে৷ বাসের মাঝামাঝি স্থানে তিনটা সিট ফাঁকা। সাফওয়ান এবং মিহাদ বাদে বাকি সবাই বসে পড়েছে। ইপ্সিতা একনজর তাকালো নিজের প্রিয় দুই বান্ধবীর দিকে।
তার কুকীর্তি-তে যারা সর্বদা সঙ্গ দেয়৷ একজন হিনা, অন্যজন জুঁই৷ হিনা চোখ টিপ দিয়ে ইশারায় বললো যে জায়গায় একসাথে দুটো সিট ফাঁকা, সেখানে গিয়ে বসতে। ইপ্সিতা অপেক্ষা করলো কয়েক সেকেন্ড। হিসাব মতো সাফওয়ান উঠলো আগে। এসেই কোনো কিছু না ভেবে বসে পড়লো ফাঁকা দুই সিটের একটা-তে। খুশিতে মন নেচে উঠলো ইপ্সিতার৷ ঝটপট বসে পড়লো সে সাফওয়ানের গা ঘেঁষে। টনক নড়লো সাফওয়ানের। কপালে ভাঁজ ফেলে দাঁড়িয়ে গেলো চট করে। ইপ্সিতা যেনো জানতো এমন কিছু হবে৷ সাথে সাথে সাফওয়ানের হাত টেনে ধরলো সে। আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
‘ উঠছো কেনো? তোমার তো উইন্ডো সিট পছন্দ৷ আর সব সিট বুকিং হয়ে গিয়েছে। তাই এখানেই বসো৷ ‘
ইপ্সিতার হাতের মুঠো থেকে নিজের হাতটা টান মেরে সরিয়ে নিলো সাফওয়ান। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ সামনে যে সিটটা ফাঁকা আছে আমি সেখানে বসবো। এখানে থাকতে বিরক্ত লাগছে৷ সরো সামনে থেকে। ‘
সাফওয়ানের বলার ধরন দেখে আপনা আপনি দাঁড়িয়ে পড়লো ইপ্সিতা। তবে সামনে থেকে সরলো না। ইতিমধ্যে মিহাদও নিজেকে ধাতস্থ করে হাজির হয়েছে বাসে৷ সিট খুঁজতে গিয়ে সে লক্ষ্য করলো একটা মাত্র সিট ফাঁকা। এবং আশ্চর্য ব্যাপার হলো ওই সিটটার পাশের সিটেই ইরা বসা। যে জানলার বাইরে মাথা বের করে প্রকৃতি দেখতে ব্যাস্ত। শুকনো ঢোক গিললো মিহাদ। ইরা থেকে চোখ সরাতেই দৃষ্টি আটকালো সাফওয়ানের উপর। যে ইপ্সিতার শরীর স্পর্শ করে পাশ কাটাতে চাচ্ছে না বলে বারবার ইপ্সিতা-কে বলছে সামনে থেকে সরে দাঁড়াতে। কিন্তু ইপ্সিতা নাছোড়বান্দা। এতোক্ষণ যাবত সাফওয়ানের নরম ব্যাবহার দেখে তার সাহস বাড়লো। দুজনের মাঝের দুরত্ব কমিয়ে সাফওয়ানের বুকে হাত দিয়ে পেছন ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বললো,
‘ কামন সাফওয়ান, সামান্য কয়েকঘন্টা নাহয় একসাথে কাটা.. ‘
ইপ্সিতার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই হঠাৎ সাফওয়ান বাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে ডাকলো, নীতি!!!!!!!
রায়ানের কাঁধে মাথা রেখে বসে থাকা নীতি হঠাৎ চিৎকারে ধরফরিয়ে উঠলো। চমকে উঠলো উপস্থিত সকলে। ভয়ে দু’কদম পিছিয়ে গেলো ইপ্সিতা। নীতি দ্রুত এগিয়ে এসে সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলো,
‘ কি হয়েছে? ‘
সকাল সকাল মেজাজ গরম করার কোনো ইচ্ছে হলো না সাফওয়ানের। তবুও ইপ্সিতার গায়ে পড়া স্বভাবে তার কপালের রগ ফুলে টন টন করছে। নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত দেখানোর চেষ্টা করে সে জবাব দিলো,
‘ ওকে বলে দে নিজের সীমা অতিক্রম না করতে। নাহলে আমি যদি ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে ফেলি তবে তার সহ্য ক্ষমতা গুড়িয়ে যাবে। ‘
কথাটা বলে এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না সেই স্থানে। ধুপধাপ পা ফেলে বসে পড়লো ইরার পাশের সিট-টাতে। বাসে উপস্থিত সকলের চোখ এখন ইপ্সিতার দিকে স্থির৷ চোখে চোখেই যেনো বিদ্রুপ করছে তাকে নিয়ে৷ অপমানে ভিতরটা দগ্ধ হয়ে উঠলো ইপ্সিতার৷ নেহাৎ ছেলেটাকে সে অতিরিক্ত পছন্দ করে বলে ছাড় দিচ্ছে। নাহয় এমন অপমানের শিক্ষা শরীরের রক্ত ঝরিয়ে-ই দিতো৷ চুপচাপ নিজের সিটে বসে পড়লো সে৷ পরপরই পাশে এসে বসলো মিহাদ। অন্য সময় হলে হয়তো ইপ্সিতার সাথে একটু আধটু ফ্লার্ট করতো৷ কিন্তু আজ মন, মস্তিষ্ক বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে বলে চুপচাপ চোখ বুঝে বসে রইলো।
একে একে রওনা দিলো সবকয়টি বাস। সাথে সাথে গান, বাজনায় ভুলিয়ে দিলো কিছুক্ষণ আগের নিস্তব্ধতা। ইরা সাফওয়ানের বাহুতে কনুই দ্বারা ধাক্কা মেরে বলে,
‘ এতো সুন্দর একটা মেয়ে সামনে থেকে তোকে গ্রীন সিগনাল দিচ্ছে। আর তুই কিনা চোখ তুলেও তাকাচ্ছিস না। আসলেও মানুষ তুই! ‘
মোবাইল স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখে শান্ত কন্ঠে সাফওয়ান জবাব দিলো,
‘ ওটা গ্রীণ না, রেড এরিয়ার কল গার্লদের মতো জঘন্য সিগনাল মনে হয় আমার। আর যাই হোক, যে শরীরটা হাজারো পুরুষ চোখ দিয়ে গিলে নিচ্ছে সেই শরীরের দিকে বাঁকা নজরে তাকানোর মতো রুচিও হয়না সাফওয়ান খান’র! ‘
পাশাপাশি সিটে সায়েরী, নাজরাত। তাদের পেছনে সাফ্রিন, তোহা। সামনের সিটে নুহাশ এবং ফায়াজ। আয়ান আলাদা বসেছে সাফ্রিনদের সিটের সোজাসুজি। বাস চলছে শা শা গতিতে। গান বাজছে উচ্চস্বরে। সেই তালে তালে নাচছে অনেকেই৷ সায়েরী নিজেও পারছে না নিজের শরীরকে কাবু করতে। মৃদু শরীর দুলিয়ে সেও উপভোগ করছে জার্নিটা। সবারই মোটামুটি এমন অবস্থা চলছে। ব্যাতিক্রম শুধু নাজরাত। সে আসার পর থেকেই মোবাইলে ঢু মেরে আছে। একের পর একে ম্যাসেজ আসছে আর সে রিপ্লাই করছে। এক পর্যায়ে বিরক্ত হলো সায়েরী। ছুঁ মেরে মোবাইল কেড়ে নিয়ে বললো,
‘ ফুপি তো বলেছে শুনলাম তোর শ্বশুড়বাড়ি থেকে পারমিশন না দিলে তুই ট্যুরে আসতেই পারবি না। তাহলে তোকে অনুমতি দিয়েছে কে? ‘
হঠাৎ এভাবে মোবাইল কেড়ে নেওয়ায় চমকে উঠলো নাজরাত। তবুও সায়েরীর প্রশ্নের জবাবে বললো,
‘ সাদিফ দিয়েছে পারমিশন। হয়েছে জানা, এবার দে ফোনটা। ‘
‘ এই চ্যাটিং ফ্ল্যাটিং করতেই যদি এসেছিস, তাহলে না এসে বাসায় পড়ে থাকলেও পারতি। সাদিফ ভাইয়া নিশ্চয় আপত্তি করতো না। ‘
‘ আরে সাদিফ ম্যাসেজ দিচ্ছে। দে না বইন। ‘
সায়েরী কিছু বলার আগেই সামনের সিট থেকে নুহাশ সিটে হাটু গেড়ে পেছন ফিরে বললো,
‘ তোর জামাইরে ভদ্র ভেবে বিরাট ভুল করে ফেলছি দিনরাত। এই ব্যাটা দেখি সারাক্ষণ মোবাইলে মোবাইলে বউয়ের সাথে চিপকে থাকে। এখনই এই অবস্থা। তোর ভবিষ্যৎ তো ফুটবল টিম গড়ে তুলবে দেখছি। ‘
নুহাশের এক কথায় ফায়াজ,সায়েরী-সহ পেছন থেকে হেসে উঠলো অনেকেই। লজ্জায় জুবুথুবু হয়ে গেলো নাজরাত। আচমকা ভাইব্রেশন মোডে থাকা মোবাইলটা কেঁপে উঠলো নাজরাতের৷ সায়েরী দেখলো সাদিফের কল। আশ্চর্য কন্ঠে সে বলে ফেললো,
‘ আয়ঃহায়! সাদিফ ভাইয়া ভিডিও কল দিচ্ছে! ‘
চমকে উঠলো নাজরাত। হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নেওয়ার আগেই তা লুফে নিলো নুহাশ। ঝটপট কলটা রিসিভ করে কপালে হাত ছুঁইয়ে বললো, ‘ সালাম দুলাভাই! ‘
আচমকা নুহাশকে দেখে হকচকিয়ে গেলো সাদিফ৷ হতভম্ব মুখে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। সেটা দেখে নুহাশ বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বললো,
‘ ভাইয়া মনে হয় আমাকে দেখে সারপ্রাইজড হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু মুখ দেখে শকড খেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে৷ ভয় পাবেন না। আপনার বউকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলিনি৷ সে আমাদের সাথেই আছে। শুধু আপনার সাথে কথা বলার অনুমতি নেই। যাই হোক, গানের বাজছে তাই আপনার কথা বুঝতে পারবো না৷ রাখছি হ্যাঁ? আল্লাহ হফেজ। ‘
নিজেই সব কথা বলে কট করে লাইন কেটে দিলো। উপাশে সাদিফ তখনো হতভম্ব মুখে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে৷ কি হলো না হলো মাথার উপর দিয়ে গেলো সব৷ এমন মাথার তার ছিড়া একটা ছেলেকে নাজরাতের মতো শান্ত স্বভাবের মেয়ে কিভাবে বন্ধু বানালো সেটাই ভেবে কুল পেলো না সে৷
অন্যদিকে নুহাশের ব্যাবহারে রাগে জ্বলে উঠলো নাজরাত। না জানে সাদিফ কি ভাবছে। নুহাশের কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে সে ঝটপট সাদিফকে মেসেজ পাঠালো,
‘ দুঃখিত! নুহাশ হুট করে ফোন কেড়ে নিবে ভাবিনি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। ওরা শুধু মজা করছিলো। ‘
সেকেন্ড পেরুতেই রিপ্লাই আসলো সাদিফের,
‘ ইট’স অলরাইট। আমি কিছুই মনে করিনি। পৌঁছানোর পর কল করো। অ্যান্ড হ্যাভ অ্যা সেফ জার্নি। বাই! ‘
স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো নাজরাত। এই বিচ্চু গুলোর জন্য কোনো কিছুতেই যেনো শান্তি নেই। আবার ওরা না থাকলেও অশান্তি লাগে। কি এক মহা জ্বালা!
দুপুর দুইটা নাগাদ বান্দরবান গিয়ে পৌঁছালো তারা। আগে থেকেই হোটেল বুকিং করা ছিলো। এক রুমে চারজন করে থাকবে। রিসেপশন থেকে চাবি নিয়ে সকলে ক্লান্ত শরীর টেনে নিলো রুমের উদ্দেশ্যে। সায়েরী, নাজরাত, তোহা এবং সাফ্রিন চার বান্ধবী একই রুম দখল করলো৷ একে একে ফ্রেস হয়ে সকলে লাঞ্চ করে নিলো। এরপর দেড় ঘন্টা মতো রেস্ট নিয়ে বিকাল ৪টা নাগাদ বের হলো বান্দরবান’র উল্লেখযোগ্য স্থান স্বর্ণমন্দির দর্শন করার উদ্দেশ্যে।
স্বর্ণমন্দির নাম হলেও এখানে স্বর্ণের কোনো স্থাপনা নেই। মূলত মন্দিরটির সোনালী রঙের জন্যই এটি স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত। বিকেলের রৌদ্রজ্জ্বল আলোয় সোনালী রঙের স্তম্ভগুলো চিকচিক করে স্বর্ণের মতোই লাগছে। মন্দিরের চারপাশে ছোটো বড় সবুজ পাহাড়গুলো উঁকি দিয়ে আছে। মাথার উপরে নীল আকাশ। অসম্ভব সুন্দর রঙের মেলা। দেখলে শুধু বিমোহিত হতে হয়। একদৃষ্টিতে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। সোনালী আলোর প্রতিফলনে চোখ ধাঁধিয়ে আসে। চারপাশে মানুষ গিজগিজ করছে।
ঘুরতে এসেছে আরো অনেকে। সবাই একের পর এক ছবি তোলায় ব্যস্ত। মন্দিরটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি অন্যতম উপসনালয় হওয়ায় অনেক বৌদ্ধ ধর্মের মানুষদেরও দেখতে পাওয়া গেলো। জায়গা ঘুরে দেখতে দেখতে প্রায় সন্ধ্যা হতে চললো। বন্ধুদের সাথে ছবি তোলার মাঝে হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো সায়েরীর। মা ফোন করছে। পৌঁছানোর পর একটাবার কল করার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো সায়েরী। এখন নিশ্চয়ই চিন্তায় চিন্তায় একশো একটা ঝাড়ি শুনাবে আম্মু!! এতো মানুষের ভীড়ে কথা বলতে অসুবিধা হবে তাই মন্দিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসলো সে। বাহিরেও মানুষের কমতি নেই।
এদিকে ফোনের উপাশে তার মা একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে মন্দিরের পেছন বিশাল বিশাল গাছ-গাছালিতে ভরা নিরিবিলি জায়গাটার দিকে এগোলো সে৷ যেহেতু বান্দরবান শহর, তাই অবশ্যই সবদিক পাহাড় এবং জঙ্গলে ঘেরা৷ ফোন কানে চেপে মায়ের একের পর এক বকুনি এবং সতর্কবার্তা শুনতে শুনতে সায়েরী এক কদম দুই কদম করে এগিয়ে যেতে লাগলো জঙ্গলের গভীরে। তার নির্বোধ মস্তিষ্ক বুঝতেই পারলো না আবারো গত বারের মতো বোকামি করছে সে৷ কিন্তু এবার জঙ্গলের মাঝে কোনো সরু পথ নেই। না আছে দিক চেনার কোনো উপার৷ একবার জঙ্গলের গভীরে চলে গেলে ফিরে আসাটা কেমন কষ্ট সাধ্য হবে তা সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞানটুকু নেই সায়েরীর।
প্রকৃতির ডাক পড়াই অনিচ্ছা স্বত্তেও স্বর্ণ মন্দির থেকে কাউকে কিছু না জানিয়ে বেরিয়ে পড়েছে সাফওয়ান।
একটুখানি প্রাইভেসি পাওয়ার আশায় সে এগোলো মন্দিরের পেছন দিকের জঙ্গলে৷ সবে মাত্র স্থান নির্বাচন করে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় চোখ পড়লো জঙ্গলের অনেকটা গভীরে হলুদ জামা গায়ে মেয়েলি শরীরটার উপর৷ ভ্রুঁ কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো একটা মেয়ে শেষ বিকালে ঘন জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কেনো! তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা তার মাথায় বাড়ি খেলো সায়েরীর নামটা। লাঞ্চ করার সময় সায়েরীর গায়ে এমন জামা-ই দেখেছিলো সে। হাইট-টাও একই লাগছে। অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের ভয়ে সব ভুলে সেদিকে পা বাড়ালো সাফওয়ান। সায়েরী তখন প্রায় মিলিয়ে গেছে দৃষ্টি সীমা থেকে। দ্রুত পা বাড়ালো সাফওয়ান। এই মেয়ে যে হারে বিপদ ঘটায়, একা ছাড়ার কোনো মানেই হয়না।
অন্যদিকে তখন নেটওয়ার্কের অভাবে কল ডিসকানেকটেড হয়ে গিয়েছে সায়েরীর৷ হঠাৎ এমন হওয়ায় অবাক হয়ে ফোন হাতে নিয়ে থমকে দাঁড়ালো সে। অবশেষে লক্ষ্য করলো ঘন জঙ্গলের গভীরে একাকী দাঁড়িয়ে আছে সে৷ মাথায় উপর লম্বা লম্বা গাছ৷ যাদের বিশাল বিশাল ডাল, পাতার জন্য দিনের আলোর কমতি পরছে জঙ্গলে। তাছাড়া সূর্য প্রায় ডুবে গিয়েছে৷ এক্ষুনি সন্ধ্যা নামবে৷ একা এই ঘন জঙ্গল থেকে ফিরতে হবে ভেবেই ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো সায়েরীর৷ দ্রুত পা চালিয়ে উল্টো দিকে ফিরে যাবে এমন সময় লক্ষ্য করলো তার বাম দিকে চার পাঁচটা ন্যাড়া কুকুর জ্বিব বের করে শিকারি নজরে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ভয়ে চিৎকার করে উঠলো সে। কদম পিছিয়ে নিতে নিতে দিকবিদিকশুন্য হয়ে দৌঁড় লাগালো অজানা গন্তব্যে। অন্যদিকে সায়েরীর চিৎকার শুনা মাত্রই দৌঁড়ে আসছিলো সাফওয়ান। অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছেও গিয়েছিলো। কিন্তু আচমকা সায়েরীর পেছনে এতোগুলা কুকুরকে দৌঁড়াতে দেখে রক্তশূণ্য হয়ে গেলো তার মুখ। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো,
‘ শিট! শিট! শিট! ‘
তারপর দৌঁড়ানোর গতি বাড়লো চারগুণ। সায়েরী ভয়ে উত্তেজনায় এলোমেলোভাবে দৌঁড়াচ্ছে৷ তার কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে পেছন পেছন ছুটে চলছে ন্যাড়া কুকুরগুলো৷ দৌঁড়ানোর মাঝেই মাটি থেকে মাঝারি আকৃতির কয়েকটা পাথর তুলে নিলো সাফওয়ান। নিখুঁত নিশানা নিয়ে পরপর তিনটা পাথর ছুঁড়ে মারলো তিনটা কুকুরের পায়ের দিকে। সাথে সাথে ধুপধাপ পা ফসকে মুখ থুবড়ে পড়লো তারা৷ সেটা লক্ষ্য করে থেমে গেলো বাকি কুকুরগুলো। পেছন ফিরে চাইলো সাফওয়ানের দিকে। সাফওয়ান আবারো পাথর ছুঁড়ে মারার জন্য হাত উঁচু করতেই লেচ গুটিয়ে অন্যদিকে পালালো সকলে৷ স্বস্তির শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। কিন্তু সায়েরী তখনো পালাতে ব্যাস্ত। তার পিছু নিতে নিতে সাফওয়ান চিৎকার করে ডাকলো,
‘ এই মেয়ে!!!! হেই!! স্টপ রাইট দেয়ার। ‘
ফাঁকা জঙ্গলে সাফওয়ানের কন্ঠটা প্রতিধ্বনি হয়ে বাজতে লাগলো। সহটা কন্ঠটা শুনে পা ফসকে ধপ করে মাটিতে আঁচড়ে পড়লো সায়েরী। এক মুঠো আশার আলো হয়ে যেনো উপস্থিত হয়েছে সাফওয়ান। পড়ে গিয়ে হাঁপাতে লাগলো সে৷ নিজেকে ধাতস্থ করে পেছন ঘুরে দেখলো। ততক্ষনে সাফওয়ান তার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। এসেই হাটুতে ভর দিয়ে বড় বড় শ্বাস ফেললো সে৷ একটু রিল্যাক্স ফিল করতেই চোখ তুলে সায়েরীর দিকে তাকালো৷ রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখ৷ জল চিকচিক করছে চোখে৷ দেখেই বুঝা যাচ্ছে কতোটা ভয় পেয়েছিলো। সাফওয়ানের ইচ্ছে করলো না ওই ভয়ার্ত মুখশ্রীটার দিকে তাকিয়ে বকাঝকা করতে৷
সয়েরী কান্না চেপে কৃতজ্ঞতার নজরে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। সাদা টি-শার্টের উপর স্কাই ব্লু কালারের শার্ট পড়েছিলো সাফওয়ান। হাতা গুটিয়ে দিয়ে সবগুলো বোতাম খোলা রেখেছে। এতোক্ষণের দৌঁড়ঝাপের কারণে কপাল,মুখ, বুক ঘেমে একাকার অবস্থা তার। বুকের কাছে আঁটসাঁট হয়ে লেপ্টে আছে সাদা টি-শার্টটা। চোখ নামিয়ে নিলো সায়েরী। মৃদু কন্ঠে বললো, ‘ ধন্যবাদ। ‘
শব্দটা যেনো ক্ষত জায়গায় মরিচ ছিটানোর মত মনে হলো সাফওয়ানের। দাঁতে দাঁত চেপে সে বললো,
‘ একা একা জঙ্গলে কি পিকনিক করতে এসেছো? এসেছোই যখন ওই কুকুরগুলো দেখে পালিয়েছ কেনো? তোমার মতো মাথামোটা কে কোম্পানি দিতে চেয়েছিলো তারা৷ ‘
সাফওয়ানের খোঁচা মারা কথাটা হজম করে মিনমিন কন্ঠে সায়েরী জবাব দিলো,
‘ আমি ইচ্ছে করে এখানে আসিনি। জানিনা কীভাবে… ‘
‘ তা জানবে কেনো? মাথা কাজ করলেই তো জানতে পারতে৷ মনে তো হয়না মাথার ভিতর মস্তিষ্ক নামক কিছু আছে। (একটু থেমে) ব্লাডি মাথা মোটা!! ‘
সায়েরী চুপ। ইতিমধ্যে সূর্য ডুবে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে৷ আশেপাশে খেয়াল করে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো সে৷ পায়ে একটু ব্যাথা অনুভব করলো। তবে সেটা উপেক্ষা করে একটুখানি দুরত্ব রেখে দাঁড়ালো সাফওয়ানের পাশে। তার উপস্থিতি অনুভব করে চোখ পাকিয়ে চোখে চোখ মেলালো সাফওয়ান। চোখ দিয়েই যেনো প্রশ্ন করছে কি চাই??
ভীতু কন্ঠে সায়েরী জবাব দিলো,
‘ অন্ধকার হয়ে গিয়েছে তো। আমরা কিভাবে যাবো। ‘
নিজের পকেটে মোবাইল হাতড়ে দেখতে দেখতে সাফওয়ান বললো,
‘ সেটা এখানে আসার আগে ভাবা উচিৎ ছিলো না? ‘
সায়েরী নিচু কন্ঠে বললো, ‘ সরি তো!! ‘
সেদিকে কান দিলো না সাফওয়ান। যখন বুঝতে পারলো তার মোবাইল মিহাদের কাছেই রেখে এসেছে তখন মনে মনে নিজেকেই কয়েকশো গালাগাল করলো। আবছা আলোয় সায়েরীর হাতের মোবাইলটা লক্ষ্য করে চট করে কেড়ে নিলো সেটা। চমকে উঠলো সায়েরী। মোবাইলে নো সিগনাল দেখে অবাক হলো না সাফওয়ান। জানতো এমনই হবে। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করে আশে পাশে নজর দিলো সে। বুঝে উঠতে পারলো না কোন পথ দিয়ে এগুলে হাইওয়ে ধরতে পারবে। মিনিট খানিক চিন্তা করার পর ডান দিকে পা বাড়ালো সে। আচমকা তাকে এভাবে চলে যেতে দেখে চমকে উঠলো সায়েরী।
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৫
দ্রুত গিয়ে একহাতে আঁকড়ে ধরলো সাফওয়ানের খোলা শার্টের একাংশ। সহসা থেমে গেলো সাফওয়ান। এক পলক নিজের শার্টের দিকে তাকিয়ে চোখ মিলালো সায়েরীর চোখের সাথে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিলো সায়েরী। চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলো সাফওয়ানের পাশে। সাফওয়ান কিছু বললো না। কোনো রকম বারণও করলো না শার্ট ধরার জন্য। ধীর পায়ে এগোতে লাগলো সামনের দিকে। এবং তার সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছে সায়েরীর। দুজনের কারোরই জানা নেই কোন গন্তব্যে এগোচ্ছে তারা। আদো গন্তব্যটা তাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে কিনা!!
