Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২১+২২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২১+২২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২১+২২
সাজিয়া জাহান সুবহা

সকাল ৯টা’র দিকে হোটেল ছেড়ে সকল স্টুডেন্ট বেরিয়েছে মেঘনা পর্যটন ঘুরতে। এখন বাজে বেলা বারোটা। সায়েরীর ঘুম ভেঙেছিলো এগারোটা নাগাদ। এখন ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে সে শুয়ে আছে তিন বান্ধবীর মাঝে। আয়ান,নুহাশ এবং ফায়াজের আর দেখা পেলো না এর মধ্যে। নীতি এবং ইরা একবার এসে দেখা করে গিয়েছে৷ মেয়ে দুজন ভীষণ আদর করে সায়েরী এবং সাফ্রিন’কে। সেই ছোট্ট থেকে চোখের সামনে বড় হতে দেখেছে তাদের৷ তাই নিজের ছোট বোনের মতোই আগলে রাখে সবসময়। মূলত সায়েরী এবং সাফ্রিনের সূত্র ধরেই তোহা,নাজরাতের সাথেও সখ্যতা গড়ে উঠেছে তাদের।

অল্প কিছুক্ষণ হলো মায়ের সাথে কথা বলে ফোন রেখেছে সায়েরী। মায়ের মন অস্থির হয়ে আছে গতকাল সন্ধ্যার পর থেকেই। সারা রাত অস্থিরতায় ঘুম হয়নি উনার। না ঘুমুতে দিয়েছে স্বামীকে। শত হোক, মায়ের মন। সন্তানের বিপদের আভাস দূর থেকেই মনে মনে জানা হয়ে যায়। অবশেষে মেয়ের কল পেয়ে এবং কন্ঠটা শুনে স্বাভাবিক হলেন তিনি। সায়েরীও খুব সুন্দর করে চেপে গেলো নিজের এতো বড় বিপদের কথাটা৷ বলেছে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে কল যাচ্ছিলো না। মায়ের সাথে কথা বলে আবারো শান্ত দৃষ্টিতে সিলিংফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। তার এবং সাফওয়ানের জন্য বন্ধুরা কেউ ঘুরতে বের হয়নি।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

একমাত্র তারা ছাড়া বাকি সকলে ঘুরছে। হোটেল বলতে গেলে এখন প্রায় খালি। গার্ডেন এরিয়ার নিরিবিলি জায়গাটাতে ঘাসের উপর উদাস ভঙ্গিতে বসে আছে ফায়াজ। তার শূন্য দৃষ্টি নীল আকাশে স্থীর। চোখে ভাসছে সায়েরীর সেই করুণ আর্তনাদ, শরীরের ক্ষত চিহ্ন। কষ্টে বুক ফাটছে তার। যতোটা না সায়েরীর কষ্ট দেখে তার খারাপ লেগেছে, তার চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছে সাফওয়ানের উপর সায়েরী এতো দৃঢ় বিশ্বাস দেখে। এতোগুলো বছরের বন্ধুত্ব তাদের। অথচ আজ কিনা নিজের সবচেয়ে অপছন্দ মানুষটার বুকে নিজের ঠাই খুঁজে নিয়েছে সায়েরী! এই এতো বছরেও ফায়াজ একটুও পারলো না সায়েরীর বিশ্বাসের জায়গাটা দখল করতে! যে জায়গাটা সে নিজের জন্য চেয়েছিলো, আজ অন্য এক পুরুষ না চাইতেই কিনা পেয়ে গেলো সেই মূল্যবান জায়গাটা। দমবন্ধ করা এক তিক্ত অনুভূতি গ্রাস করে নিচ্ছে ফায়াজের সর্বত্র।

মন বলছে, সে বিরাট ভুল করেছে সায়েরীকে নিজের অনুভূতি সম্পর্কে অবগত না করে। তার উচিৎ ছিলো একটাবার ঝুঁকি নিয়ে নিজেকে ব্যক্ত করা। যা হয় দেখা যেতো। সে সময় চেয়ে নিতো সায়েরীর কাছ থেকে। কখনো ফোর্স করতো না সায়েরীকে। শুধু পাশে থেকে আগলে রাখতো, মাঝে মধ্যে একটু আধটু আচরণে বা কথায় বুঝিয়ে দিতো ঠিক কতোটা জুড়ে সায়েরীর অবস্থান তার মনে। তখন হয়তো একটুর জন্য হলেও মন গলতো নরম মনের মেয়েটার। একটা না একটা সময় হয়তো ঠিকই গ্রহণ করে নিতো ফায়াজের ভালোবাসা। কিন্তু আজ! আজ এই পর্যায়ে এসে ভীষণ রকম আফসোস হচ্ছে তার। কেনো করেছে এতো ভালোমানুষি! মেয়েটা অবুঝ বলে? তবে আজ যে এই অবুঝ মনটা অন্য কেউতে আটকা পড়ছে! কি করে সহ্য করবে ফায়াজ এই বিরহ!!
হঠাৎ উপস্থিতি-তে পাশ ফিরলো ফায়াজ। আয়ান এসে বসেছে তার পাশে। ফায়াজের উদাসীন চেহারা দেখে সে ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,

‘ এমন দেবদাস হয়ে আছিস কেনো? ‘
তপ্ত শ্বাস ফেলে ফায়াজ বললো,
‘ তুই ঠিক বলেছিলি৷ আমার উচিত ছিলো সায়ুকে একটু হিন্টস দেওয়ার যে আমি ওকে পছন্দ করি, ভালোবাসি। শুধু বন্ধুত্ব হারানোর ভয়ে আমি নিজের ভেতর গুমড়ে ছিলাম৷ তবে শান্তি পাচ্ছিলাম সারাক্ষণ ওর আশেপাশে থাকতে পেরেছি বলে। এখন বুঝতে পারছি, কতো বড় ভুল ধারণা পুষে রেখেছিলাম আমি নিজের মধ্যে। ওকে অন্যকারো সাথে দেখে আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিলো দোস্ত। আমি পারব না সায়ুকে হারাতে। এই প্রথম আমার ভয় করছে, ভীষণ ভয় করছে। ওকে ছাড়া আমি কিচ্ছু কল্পনা করতে পারিনা। সায়ুকে অন্য কারো সাথে দেখার চেয়ে ভালো আমি নিশ্বাস আটকে মরে যায়। ‘

‘ পাগল টাগল হয়ে গেলি নাকি? কি সব আজগুবি কথা বলছিস! সায়ু না তো হারিয়ে গিয়েছে না অন্য কারো সাথে জড়িয়ে গিয়েছে৷ আর কার জন্য এমন ইনসিকিউর ফিল করছিস তুই? সাফওয়ান ভাই! ভেবে দেখেছিস সায়ু ঠিক কতোটা অপছন্দ করে উনাকে? আর সাফওয়ান ভাই যে সায়ুকে চোখে হারায় এমনটাও না৷ দুজন সম্পূর্ণ দুই মেরুর মানুষ। এদের মাঝে কিছু হওয়া তো দূর, দুজনের কেউ এমন কিছু কল্পনা’তেও আনবে না৷ হুদাই তিল কে তাল ভেবে এভাবে চলে এলি। একবার লজিক্যালি ভেবে দেখ৷ এই দুই বান্দার মাঝে কিছু হওয়ার চান্স নেই। চিল মার! ‘
‘ তোর চেয়ে ভালো সায়ু’কে আর কেউ বুঝেনা৷ আজ তুই এসব কথা বলছিস! মানলাম ওরা একে অপরকে পছন্দ করে না৷ তাই বলে পছন্দ করতে কতোক্ষন? সাফওয়ান ভাইকে যেকোনো মেয়ে নিজের জন্য প্রত্যাশা করে৷ উনি মানুষটাই এমন। আর সায়ু তো অনেক আগে থেকেই উনার উপর ক্রাশ’ড। ‘

‘ সেটা আগে ছিলো। সায়ু নিজে বলেছে৷ ভুলে গেলি? ‘
‘ উঁহু! বেশ ভালো করে মনে আছে৷ মনে আছে বলেই বলছি৷ সাফওয়ান ভাই যেমন পারসোনালিটির মানুষ, কোনো মেয়ে কাছ থেকে উনার সাথে মিশলে নিজেকে উনার মায়া থেকে বের করতেই পারবে না৷ ছেলে হিসেবে তুই আর আমি এইটা বেশ ভালো করে বুঝি৷ আর ঠিক এজন্যই আমার ভয়টা হচ্ছে৷ সায়ু আজ উনার উপর বিশ্বাস করে আমাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। সাফওয়ান ভাই নাহয় মানবতার খাতিরে বা আবরার ভাইয়ার বন্ধুত্বের খাতিরে সায়ু’কে সামলে নিলো। সময় দিলো ওকে৷ মনে কর এই সময়টাতে আটকে গেলো সায়ু। ওর যে আবেগি বয়স, এখান থেকে বেরুতে পারবে না সহজে! আর আমি চাচ্ছি না এসব হোক৷ আমি চাই না সায়ু সাফওয়ান ভাইয়ের সাথে মিশুক৷ আমি ওকে আমার জন্য চাই। ওর সব অনুভূতি যেনো আমাকে ঘিরে বেড়ে উঠে এইটা চাই! ‘
ফায়াজের সব কথায় সত্য। এবং এই নির্মম সত্যটুকু মেনে নিতে পারছে না দুই বন্ধু৷ আয়ান শুরু থেকে অবগত ফায়াজের ভালোবাসা সম্পর্কে। তাই বন্ধুর এই উদাসীনতা সহ্য হচ্ছে না তার। আয়ানের দিকে তাকিয়ে ফায়াজ হঠাৎ বললো,

‘ একতরফা ভালোবাসার কষ্ট তুই কখনো অনুভব করতে পারবি না দোস্ত। যে সহে, সে বুঝে৷ এইযে সায়ুকে হারানোর ভয়টা আমাকে খুড়ে খুড়ে খাচ্ছে। অথচ মুখ ফুটে মেয়েটাকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছি না। আবার যদি বলার পর সে আমার অনুভূতিকে ছেলেমানুষী ভেবে মুখ ফিরিয়ে নেই? এর চেয়ে অপমানজনক আর কিছু নেই। সব কিছু সহ্য করা গেলেও ওর জন্য জমানো ভালোবাসাকে অপমান করলে আমি সহ্য করতে পারবো না! ‘
ফায়াজের কথা শুনে হুট করে তোহার কথা মনে পড়লো আয়ানের৷ তোহাও যে তাকে একতরফা ভালোবেসে গুমড়ে মরছে! সেও তো অপমান করেছিলো তোহার অনুভূতি’কে। বলেছিলো ” জেনেশুনে এমন ভুল কি করে করলি তোহা?” ভুল! তোহার ভালোবাসাটাকে সে নিছক ভুল ভেবে নিয়েছে। আচ্ছা! মেয়েটাও নিশ্চয় ফায়াজের মতো এমন কষ্ট পেয়েছে! পাচ্ছে! অথচ প্রতিবাদ করেনি কিছু নিয়ে। চোখ বুজে শ্বাস ফেললো আয়ান। এ কোন গোলকধাঁধায় আটকে পড়লো দুই বন্ধু! শেষ অবধি কার চাওয়াটুকু পূরণ হবে? সত্যি হয়ে যাবে কি ফায়াজের সায়েরীকে হারানোর ভয়? আয়ানের শক্ত মন কি গলে যাবে তোহার নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়??

চার বন্ধুর জন্য বরাদ্দকৃত রুমে বর্তমানে মিহাদ একা৷ নিজের ব্যাগ, রুমের ছোট্ট টেবিলের ড্রয়ার এবং দেয়ালের সাথে এটাচড ছিমছাম লম্বাকার কাবার্ডে তন্নতন্ন করে কিছু খুঁজে চলেছে সে। উষ্কখুষ্ক চুল, এলোমেলো টি-শার্ট, চোখ মুখ অস্বাভাবিক লাল হয়ে আছে। কাঙ্ক্ষিত বস্তু না পেয়ে স্ব – শব্দে কাবার্ডের দরজাটা ধাক্কা মেরে বন্ধ করে দিলো সে৷ রাগে মাথা ধপ ধপ করছে তার। বেড সাইড টেবিলে রাখা লাল রঙের ওয়াটার বোতলটা নিয়ে না দেখেই সেটা ছুড়ে মারলো দরজার দিকে।

‘ আহহ্!!! ‘
পরিচিত কন্ঠের মেয়েলি আর্তনাদ শুনে দ্রুত ফিরে তাকালো মিহাদ৷ দরজার মুখে কপালে হাত চেপে দাঁড়িয়ে আছে ইরা। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বোতলটা তার কপালে এসে লেগেছে। ব্যাথায় চোখ মুখ খিচে ফেললো সে। মিহাদ চমকে উঠলো ওকে এই অবস্থায় দেখে৷ স্থান কাল ভুলে দ্রুত এগিয়ে ইরার হাত টেনে নিয়ে আসলো নিজের কাছাকাছি। একহাত ইরার গালে রেখে কপালে চেপে রাখা ইরার হাত সরিয়ে নিজেই অন্য হাতে আলতো করে ছুঁয়ে দিলো ফুলে উঠা জায়গাটা। অস্থির কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আ’ম সো সরি ইরাবতী। আমি একদম খেয়াল করিনি তুমি এসেছো। জানলে এমনটা হতো না। ইশশ্! কতোখানি ফুলে উঠেছে! বেশি ব্যাথা লাগছে? দাঁড়াও আমি…. ‘
‘ ম..মিহাদ!! ‘

ইরা’র ভাঙ্গা কন্ঠের ডাকটা শুনে হঠাৎই যেনো টনক নড়লো মিহাদের৷ কপাল থেকে চোখ নামিয়ে দৃষ্টি মিলালো ইরার টলমল চোখজোড়ার সাথে। মুহূর্তেই বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো তার। নিজের বাহুডোর থেকে ছিটকে সরিয়ে দিলো ইরাকে। ইরা চমকালো না৷ যেনো জানতো এমনটাই হবে৷ বরং চমকেছে একটু আগে মিহাদের বিচলিত ভাব দেখে। তার একটুখানি ব্যাথায় আগের মতোই অস্থির হতে দেখে। মিহাদ আশেপাশে তাকিয়ে নজর লুকাল। ইরাকে উপেক্ষা করে রুম থেকে বের হতে গেলে সহসা তার হাত টেনে ধরলো ইরা। এবং মিহাদকে চমকে দিয়ে আচমকা দু’হাতে ঝাপটে ধরলো মিহাদের শক্তপোক্ত শরীর। বুকে মাথা রেখে কান্না চেপে রাখা কন্ঠে বললো,

‘ কেনো নিজের সাথে আমাকেও এতো কষ্ট দিচ্ছিস মিহাদ? আমি আর পারছিনা এই দূরত্ব সহ্য করতে! প্লিজ আমাকে আরেকটা সুযোগ দে৷ নয়তো একটাবার বল কোন ভুলের জন্য আমাকে মাঝপথে ছেড়ে এসেছিস তুই? আমি সবটা শুধরে নেবো৷ আই প্রমিজ, আমি সব ঠিক করে দিবো। প্লিজ আরেকবার কাছে টেনে নে! প্লিজ মিহাদ..আমি পারছি না তোকে ছাড়া থাকতে। ‘
ইরার কান্নারত কন্ঠের এক একটা বাণী মিহাদের বুকে কাঁটার মতো করে বাধল। নিজের চোখজোড়াও ঝাপসা হয়ে আসলো তার। শুকনো ঢোক গিলে সে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ ইরা, ছাড় আমাকে। ‘
বিপরীতে দ্বিগুণ শক্ত করে মিহাদের পিঠ খামছে ধরলো ইরা। ভাঙ্গা গলায় বললো,

‘ আরেকবার ইরাবতী বলে ডাকনা আমায়! ‘
হাতের মুষ্টি শক্ত হলো মিহাদের। নিজেকে দৃঢ় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সে। লম্বা শ্বাস ফেলে ইরার দুই বাহু ধরে জোর করে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিলো সে। ইরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মিহাদের দিকে। ওই সর্বনাশী চোখজোড়ার দিকে তাকানোর মতো সাহস নেই মিহাদের। নিজের জেদ বজায় রেখে সে শক্ত কন্ঠে বললো,
‘ ইরা, প্লিজ বেরিয়ে যা এখান থেকে। আমার যা বলার ছিলো আমি চারমাস আগেই বলে দিয়েছি। আমাদের মধ্যে যা ছিলো সব মোহ ছিলো আর কিছুই না৷ এটলিস্ট আমার জন্য তো ওটা ভালোবাসা ছিলো না। তাই আবারো বলছি, ছেলেমানুষী বাদ দিয়ে মোভ অন কর৷ ডক্টর জাদিদ শেখ ভীষণ ভালো মানুষ। তুই ভালো থাকবি উনার সাথে। ‘
মিহাদের শেষের কথাটা শুনে চমকালো ইরা। এরপর তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
‘ তারমানে তুই খুঁজ নিয়েছিস আমার? ওয়াও! এমন মোহ মায়া সব ছেলের হওয়া উচিত। মোহে পড়ে পিছে পিছে ঘুরবে, মেয়ের মনে অনুভূতি জাগিয়ে চারবছর চুটিয়ে প্রেম করবে। এরপর হঠাৎ মাঝপথে ব্রেকাপ। রিজনটা কি! ব্লাডি ইনফেচুয়েশন তাইনা? ‘

‘ ইরা আমি…. ‘
ক্ষিপ্ত গতিতে এগিয়ে এসে মিহাদের কলার চেপে ধরলো ইরা। রাগী কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠে বললো,
‘ তুই কি হ্যাঁ? আর কি বলার বাকি আছে তোর? আমি বলেছিলাম আমাকে ভালোবাসার জন্য? আমি বলেছিলাম টানা একবছর পিছে পিছে ঘুরে প্রেম নিবেদন করতে? আরে ভালোবাসা যখন ছিলোই না তখন কেনো এসেছিলি আমার জীবনে? আজ বলছিস মোভ অন করে নিতে। কিভাবে মোভ অন করবো আমি? তোর অস্তিত্ব থেকে বেরুতেই পারছি না এখনো। এই চারমাসে একটা রাতও আমি ঠিকঠাক ঘুমুতে পারিনি। কারো সাথে মন খুলে দু দন্ড কথা বলিনি। হাসতে ভুলে গিয়েছি, খেতে ভুলে গিয়েছি। আমার অবস্থা দেখে সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে নিয়ে গিয়েছিল বাবা আমাকে। এখন উনারই ছেলে বিয়ের প্রপোজাল দিয়ে বসে আছে। আর সবটা জেনেও তুই চুপ করে আছিস। কেনো মিহাদ? কেনো এতোটা নরক যন্ত্রণা দিচ্ছিস আমাকে? কোন ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে আমাকে বল? ‘

মিহাদ নিশ্চুপ। তার এই নিরবতা বুকে ঝড় তুলছে ইরার৷ কলার ছেড়ে ধাক্কা দিয়ে মিহাদকে নিজের থেকে সরিয়ে দিলো সে। দুইহাতে চোখ, মুখ মুছে অস্বাভাবিকভাবে শ্বাস ফেললো বার কয়েক। এরপর শান্ত কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ ব্রেকাপ করার সময় কি যেনো বলেছিলি তুই! অন্য একটা মেয়েকে ভালো লেগেছে। ইউ গাইস হ্যাভ ফিলিং ফর ইচ আদার অ্যান্ড অল দ্যাট! তা কোথায় সেই মেয়েটা? বলনা, কতদিন ধরে চলছে এসব? ‘
‘ সেটা তোকে বলতে বাধ্য নয়। প্লিজ যা এখান থেকে। ‘

মিহাদের দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো ইরা। মিহাদ ভাবলো হয়তো সে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে শব্দ করে দরজা লাগিয়ে পুণরায় ফিরে তাকালো ইরা। মিহাদ প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে তার দিকে। ইরা আগের মতোই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসলো। কাছাকাছি এসে মিহাদের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে হঠাৎ টান মেরে সরিয়ে ফেললো গলায় পেছানো ওড়নাটা। চমকে উঠলো মিহাদ। এবং তাকে দ্বিগুণ চমকে দিয়ে নিজের দুই হাত প্রসারিত করে ইরা বলে উঠলো,
‘ তাকিয়ে দেখতো আমার দিকে। মেয়েটা কি আমার চেয়েও বেশি অ্যাক্ট্রাকটিভ? ইজ সি উইল সেটিস্ফাইড ইউ মোর দ্যান ম….. ‘
‘ ইরা!!!!! ‘

ইরার কথাটুকু শেষ করাদ আগেই রাগে ইরার বাহু খামচে মুখ চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো মিহাদ। রাগে থরথর করে শরীর কাঁপছে তার। সে ভাবতেও পারছে না এমন পাগলামি তার ইরাবতীর পক্ষেও সম্ভব। মিহাদের রাগ দেখেও অনড় রইলো ইরা। শরীরের সব শক্তি দিয়ে ইরার বাহু খামচে নিজের মুখোমুখি এনে হিসহিসিয়ে উঠলো মিহাদ,

‘ আমাকে তোর এমন নিকৃষ্ট ছেলে মনে হয়? জাস্ট ফর ফিজিক্যাল অ্যাক্ট্রাকশন আমি তোকে ছেড়ে অন্য মেয়ের সাথে জড়িয়ে গিয়েছি, এটাই মনে হচ্ছে তোর? চার বছরে এই বুঝলি তুই আমাকে? ‘
ব্যাথায় ছটফটিয়ে উঠলো ইরা। মিহাদের হাত সরানোর বৃথা চেষ্টা করে বললো,
‘ মিহাদ,ছাড় আমাকে। লাগছে আমার! ‘
বিপরীতে আরো জোরে চেপে ধরলো তাকে মিহাদ। আগের মতো রাগী কন্ঠে বললো,
‘ লাগুক। আমারো লেগেছে যখন তুই আমার ভালোবাসাকে কামনা ভেবে নিয়েছিলি৷ আমি ঠোঁট কাটা, নির্লজ্জ, অসভ্য যা-ই ছিলাম না কেনো কখনো তোর অসম্মান করিনি ইরা। তুই আমার কাছে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিস, তবুও নিজের সীমা অতিক্রম করিনি কখনো। আর আজ এই পর্যায়ে এসে আমাকে তুই ইন্ডাইরেক্টলি…. ‘

আচমকা দরজা খোলার আওয়াজ শুনে চমকে উঠলো দুজন। থেমে গেলো মিহাদের কন্ঠ। ঘাড় ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকালো সে। যেখানে সাফওয়ান দাঁড়িয়ে। উপস্থিত দুজনকে এই অবস্থায় দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো সাফওয়ান। মিহাদ দ্রুত সামলে নিলো নিজেকে৷ দূরে সরে গেলো ইরার কাছ থেকে। ইরার অশ্রুসিক্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে ফ্লোর থেকে ওড়নাটা তুলে ছুড়ে মারলো ইরার গায়ে৷ তারপর হনহনিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে ঠাশ করে লাগিয়ে দিলো দরজাটা। আওয়াজ শুনেই কেঁপে উঠলো ইরা। কোনো রকমে ওড়নাটা জড়িয়ে নিলো গায়ে। তারপর আকস্মিক ধপ করে বসে পড়ে দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। সাফওয়ান এগিয়ে আসলো দ্রুত। হাটু গেড়ে বসে হাত রাখলো ইরার মাথায়। অধৈর্য কন্ঠে বললো,

‘ এতোবার অপমানিত হয়েও কেনো এই ইডিয়টের কাছে ফিরে আসিস তুই! এই অবধি হাজারবার বুঝিয়েছি তোকে। দয়া করে এভার ভুলে যা সব৷ মিহাদ চাইনা তোকে ওর লাইফে। নিজেকে আর নিচে নামাস না ইরা!! ‘
ঠোঁট চেপে কান্না আটকালো ইরা। হেচকি তুলে বললো,
‘ ও মিথ্যা বলছে সাফওয়ান। আর যায় হোক, আমি বিশ্বাস করিনা যে, মিহাদ আমাকে ভালোবাসে না। ও আগেও পারেনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে বলতে, আজও পারেনি। ও বলেছিলো না অন্য কোনো মেয়ের সাথে ওর সম্পর্ক আছে? কোথায় সেই মেয়েটা? দেখেছিস কেউ? শুনেছিস ওর ব্যাপারে কিছু? বল, জানিস কেউ ওই মেয়ের ব্যাপারে? ‘
মাথা নেড়ে না বোঝায় সাফওয়ান। সেটা দেখেই কান্না চোখে হাসলো ইরা। দৃঢ় কন্ঠে বললো,

‘ না থাকলে কিভাবে দেখবি! মিহাদের লাইফে ওর ইরাবতী ছাড়া কেউ নেই, কেউ থাকবেও না৷ আমি জানি ও ভালোবাসে আমাকে৷ সেই আগের মতোই ভালোবাসে৷ কিন্তু…. কিন্তু আমি এমন কি করেছি যার কারণে মিহাদ আমাকে ছেড়ে দিলো? ‘
প্রশ্নটা করেই সাফওয়ানের দিকে উৎসুক নজরে তাকালো ইরা। সাফওয়ান নিজেও গভীর ভাবনায় ডুবে গেলো। মিহাদের সব চেয়ে কাছের বন্ধু হয়েও এই প্রশ্নের উত্তরটা তার অজানা৷ এই চারমাসে সে চার হাজার বার জানতে চেয়েছে মিহাদের কাছে কথাটা। কিন্তু প্রতিবার এড়িয়ে গিয়েছে মিহাদ। সেই সাথে হাবভাব বদলে গেছে অনেকখানি। এখন সারাটাদিন হাসিমুখে ঘুরে বেড়ায়। অকারণে হাসে। যেনো সুখের কমতি নেই জীবনে। অথচ তার চোখে একবুক শূণ্যতা। সাফওয়ান অনুভব করে সবই। কিন্তু উত্তর পায়না কিছুর। হাতে ইরার ছোঁয়া পেতেই ঘোর ভাঙ্গলো তার৷ সাফওয়ান একহাত নিজের দু’হাতের মধ্যে নিয়ে ইরা আকুতিভরা কন্ঠে বললো,

‘ সাফওয়ান! আমার কেনো জেনো মনে হচ্ছে আমাদের মিহাদ ঠিক নেই৷ ও কেমন যেনো হয়ে গিয়েছে। তুই তো ওর বেস্ট ফ্রেন্ড তাইনা! তোর সাথে ও সবটা শেয়ার করে৷ না করলেও তুই হুমকি-ধমকি দিয়ে হলেও বের করে নিস। এবারেও এমন কিছু করনা! আমি শেষ হয়ে যাবো ওকে ছাড়া দোস্ত। আমি জানি মিহাদ নিজেও আমাকে ছাড়া ভালো নেই। প্লিজ কিছু একটা কর…এসব আমি আর নিতে পারছি না! ‘

ইরার আকুতিভরা কন্ঠটা শুনে বুক ভাড় হলো সাফওয়ানের। এই মেয়েটা তার ভীষণ আদুরে৷ সাফ্রিনের মতোই ভালোবাসে সে ইরাকে। মিহাদের সাথে ব্রেকাপ হওয়ার পর ইরা যখন সাফওয়ানের কাছে এসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিলো, সেদিন সাফওয়ানের ইচ্ছে করেছিলো মিহাদকে খুন করতে৷ কিন্তু পারেনি সেটা। তবে জীবনে প্রথম বারের মতো গায়ের জোরে ঘুসি মেরেছিলো মিহাদের নাক বরাবর। কিন্তু অদ্ভুতভাবে কোনো প্রতিউত্তর করেনি সেদিন মিহাদ। সাফওয়ান রাগ সামলাতে না পেরে দুদিন কথা বলেনি মিহাদের সাথে। ইরাকেও সম্পূর্ণ দূরে রেখেছিলো মিহাদের দৃষ্টিসীমা থেকে। ভেবেছিলো ইরার শূন্যতা অনুভব করে হয়তো গলে যাবে মিহাদ। কিন্তু এমন কিছুই হলো না।

মিহাদ ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেলো, তবুও মুখ ফুটে স্বীকার করলো না কিছু। তিন দিন পর সাফওয়ান নিজে গিয়ে কথা বলেছিলো, কিন্তু মিহাদ ছিলো নির্লিপ্ত। অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ করছিলো। হাসছিলো প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। আর ভাবখানা এমন ছিলো যেনো ইরা নামক কোনো অস্তিত্ব নেই তার জীবনে। সাফওয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করেছিলো সবটা। বুঝতে পেরেছিলো তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুটা স্বাভাবিক নেই। যতোটা স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা সে করছে, ঠিক ততোটা অস্বাভাবিক কিছু চলছে তার মন, মস্তিষ্কে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও কোনো কূল কিনারা বের করতে পারলো না কেউ! তপ্ত শ্বাস ফেলে ইরার মাথায় হাত রাখলো সে। শান্ত কন্ঠে বললো,
‘ রুমে যা। মিহাদের সাথে আমি কথা বলছি। ‘
চোখ মুছে বেরিয়ে গেলো ইরা। তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে সাফওয়ান দৃষ্টি রাখলো ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার পানে। ভিতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো আপনা আপনি। না জানে কোন নিয়তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইরা-মিহাদ। মিলন কি আদো আছে তাদের ভাগ্যে??

শাওয়ারের ঝিরিঝিরি পানির নিচে চোখ বুজে বসে আছে মিহাদ। দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন সে। ডান হাতের উল্টো পিঠের চামড়া ছিড়ে জমে গিয়েছে ছোপ ছোপ রক্ত। দেয়ালে পরপর কয়েকবার শক্ত হাতে আঘাত করার ফলস্বরূপ এই অবস্থা হয়েছে হাতের। পানির ছোঁয়া লাগতেই জায়গাটা জ্বলে উঠলো। কিন্তু ভ্রুক্ষেপ করলো না মিহাদ। এর চেয়েও হাজারগুন বেশি জ্বলছে তার বুকে। প্রতিনিয়ত জ্বলছে। কিন্তু কাউকে বলার সাধ্য নেই তার। নেই এই দহন থেকে বের হওয়ার কোনো পথ৷ নিজের হাতের ছিলে যাওয়া জায়গাটার দিকে তাকিয়ে চোখ ভিজে উঠেলো তার। বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ আ’ম সরি ইরাবতী! সো সরি। তোমার গল্পের সূচনা আমাকে নিয়ে হলেও গল্পের উপসংহারটা আর আমাকে নিয়ে লিখা হবেনা। ‘

দুপুরের সময় হোটেলে ফিরে এসেছে সকলে। একসাথে খাওয়া দাওয়া করে যার যার রুমে ফিরে গিয়েছে বিশ্রামের জন্য৷ নিস্তব্ধ করিডোরে ধীর পায়ে হাঁটছে ইপ্সিতা। আজ সকালে ঘুরতে বের হওয়ার সময় দেখা পায়নি সাফওয়ান এবং তার বন্ধু বান্ধবদের৷ সেই সাথে সাফ্রিন এবং তার বন্ধুদের কারো দেখাও পেলো না। ব্যাপারটা বেশ ভাবাচ্ছে তাকে৷ হোটেলে ফিরে সাফওয়ানের খোঁজ করেছিলো সে। কিন্তু দেখা পায়নি এখনো৷ ক্ষুন্ন মনে নিজেদের রুমে ফিরে গভীর ভাবনায় মত্ত হলো সে। কাল রাতে দেখা দৃশ্যটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না৷ কেনো সাফওয়ানের বাহুডোরে আবদ্ধ ছিলো সায়েরী? কি সম্পর্ক তাদের মধ্যে?
আবার পরক্ষনে ভাবলো, সাফওয়ানের মতো একটা ছেলে কিনা এমন মধ্যবিত্ত, আনস্মার্ট একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়াবে? তাও আবার শ্যামলা দেখতে একটা মেয়ে! অসম্ভব! আর যায় হোক না কেনো, এমন লো-ক্লাস মেয়েকে সাফওয়ান কখনো জড়াবে না নিজের সাথে। নেভার!
কথাগুলো ভেবে বাঁকা হাসলো সে। প্রবল আত্মবিশ্বাসী মন বলছে, সাফওয়ানের জীবনে সে ব্যাতিত অন্য কোনো মেয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না৷ সে করতেই দিবে না৷ সাফওয়ান না চাইলেও ইপ্সিতা তাকে নিজের করেই ছাড়বে!

সাড়ে তিনটা নাগাদ সকলে আবারো বেরিয়ে পড়লো ঘুরতে। যেহেতু মাত্র তিনদিনের সময় নিয়ে এসেছে, তাই শুয়ে বসে সময়গুলো নষ্ট করার মানেই হয়না। অল্প কিছুক্ষণ আগেই আয়ান,ফায়াজ এবং নুহাশ এসে ঘুরে গিয়েছে সায়েরীর রুম থেকে। কথা বলতে এসে নিজেরাই বিভ্রান্তি’তে পড়ে গেলো সায়েরীর চুপসে যাওয়া মুখ দেখে৷ সায়েরী চেষ্টা করেও স্বাভাবিক ব্যাবহার করতে পারলো না। মনের ভিতরে অদ্ভুত একটা ভয় কড়া নাড়ছিলো। অথচ সবচেয়ে ভরসার স্থানে এই বন্ধুরাই আছে তার৷ যাদের সামনে আজ নিজেকে দুর্বল মনে হচ্ছে। তবুও চেষ্টা থামালো না সে। না ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো। সাফওয়ানের বলা কথাগুলো ভেবে যথাসম্ভব স্বাভাবিক আচরণ চালিয়ে গিয়েছে৷ আয়ান, ফায়াজ এবং নুহাশ বুঝতে পারলো সায়েরীর অবস্থা। তাই অল্প কিছু কথা বলেই বেরিয়ে গেলো। পরপরই সেখানে এসে হাজির হলো সাফ্রিন। সায়েরীর ট্রলি ব্যাগ থেকে কাপড় বের করতে করতে তাড়া লাগিয়ে বললো,

‘ সায়ু, অমন পেঁচার মতো মুখ করে আর বসে থাকিস না। এই নে ড্রেস, চেঞ্জ করে আয় ফাস্ট! ‘
সায়েরী ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
‘ এখন আবার চেঞ্জ করবো কেনো? ঘুরতে যাবি তোরা? ‘
‘ জ্বী, না। আমরা যাচ্ছি না কোথাও৷ তুই যাচ্ছিস কপালের ব্যান্ডেজটা চেঞ্জ করতে, ভাইয়ার সাথে। ‘
সায়েরী অবাক কন্ঠে বললো,
‘ ভাই! কোন ভাই! কার ভাই? ‘
বিরক্ত মুখে সাফ্রিন জবাব দিলো,
‘ এতো কথা বলিস কেনো রে? অভিয়েসলি আমার গুণধর ভাই যে তোর দ্বায়িত্ব নিয়েছে তার সাথেই তো যাবি নাকি! এবার নে ড্রেসটা। চেঞ্জ করে আয় মেরি মা! ‘
সায়েরী আর প্রতিউত্তর করলো না৷ ড্রেস নিয়ে ঢুকে গেলো ওয়াশরুমে। এতোক্ষণ যাবত তার দিকে তাকিয়ে থাকা নাজরাত এবং তোহা এবার একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিলো। সাফ্রিন তাদের দিকে তকাতেই তোহা চোখ টিপ দিয়ে বললো,
‘ সাফওয়ান সিজন চলছে বুঝলি! এবার শুধু বিনোদন দেখবো। ‘

বান্দরবানে সাধারণত যানবাহন হিসেবে চলে জিপ কিংবা টমটম। হোটেলের সামনের রোডে ভাড়া করা টমটম গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। পরণে ডার্ক মেরুন শার্ট এবং ব্ল্যাক জিন্স। বরাবরের মতোই হাতা গুটিয়ে রাখা। মাথা নিচু করে ফেসবুক স্ক্রল করছে সে। তার পাশেই সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে মিহাদ। আকাশের দিকে মুখ করে নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াতে ব্যস্ত সে। এই নিয়ে তিনটা সিগারেট শেষ করলো সে। তিন নাম্বারটা শেষ হওয়া মাত্র আবারো জ্বালাতে গেলে সাফওয়ান বিরক্ত মুখে তাকালো মিহাদের দিকে। হাত থেকে সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে বললো,

‘ মরার শখ জেগেছে নাকি? কি শুরু করেছিস তুই! আগে তো এসবের ধারে কাছেও যেতিস না। হয়েছে কি তোর? ‘
টান টান করে দুই হাত মেলে আলসেমি ঝেরে মিহাদ জবাব দিলো,
‘ কদিন আর বাঁচবো বল? এই জীবনে সবরকম এক্সপেরিমেন্ট করা উচিৎ। তাছাড়া আগে অন্য কারো জন্য নিজেকে দমিয়ে রাখতাম। এখন সেও নেই আমিও ফুল ফ্রিডমে আছি! আহা! শান্তি!! ‘
সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে মিহাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান। যতোটা সাবলীলভাবে মিহাদ কথাগুলো বলছে, ঠিক ততোটা উদাসীন তার চেহারা। লালছে চোখজোড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে মনের বিষন্নতা। ঠোঁটে জোরপূর্বক হাসি। সাফওয়ান বেশ বিরক্ত গলায় বললো,

‘ ইরা তোর কাছেই আছে মিহাদ। কোথাও যায়নি। না যেতে চায়৷ কেনো নিজের সাথে সাথে মেয়েটাকেও এতো কষ্ট দিচ্ছিস বলতো? কিসের এতো লুকোচুরি তোর? একটাবার ভালো করে তাকিয়ে দেখেছিস মেয়েটার দিকে? তোর এসব পাগলামির জন্য ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে সে। ‘

আবারো ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো মিহাদ৷ জবাব দিলো না কোনো। সাফওয়ান নিজেও আর কথা বাড়ালো না। অধৈর্য হয়ে তাকালো হোটেলের প্রবেশপথের দিকে। মেয়ে মানুষের এই এক ঝামেলা। কোথাও যাওয়ার নাম নিলে ঘন্টাখানিক সময় না নিয়ে বেরই হতে পারে না। পুণরায় মোবাইলের দিকে দৃষ্টিপাত করলো সে। তখনই বেরিয়ে আসলো সাফ্রিন এবং সায়েরী। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাফওয়ানকে দেখে হঠাৎই একটুখানি থমকে গেলো সায়েরী। ফর্সা গায়ে ডার্ক মেরুন শার্টে চোখ ধাধানো সুদর্শন লাগছে সাফওয়ান’কে। হালকা ব্রাউন সিল্কি চুলগুলো বরাবরের মতোই কপালে লেপ্টে। এই চুলগুলো দেখে বরাবরই অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় সায়েরী’র। কেনো হয় তা আজ অবধি বের করতে পারলো না সে। মনে মনে সে বেশ বিরক্ত হলো ।

এই বিরক্তটা নতুন নয়। বিগত পাঁচ বছর ধরেই সে বিরক্ত সাফওয়ানের অতি মাত্রায় সুদর্শন রূপে। এইযে এমন কাতিলানা লুকে ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা, সে তো জানেই না এই রূপ দেখে সায়েরী নামক কিশোরী মেয়েটার বুক ধরফর করে উঠছে। অদ্ভুত এক নাম না জানা অনুভূতি গ্রাস করে নিচ্ছে তার ছোট্ট দেহ, মন। অথচ যার কারণে হুটহাট এমন অবস্থা হয়, সে কিচ্ছুটি জানে না। আর জানে না বলেই সায়েরী বিরক্ত। মহা বিরক্ত!
পাশ থেকে সাফ্রিনের ডাকে ঘোর ভাঙ্গলো তার। তাকে এমন হঠাৎ থেমে যেতে দেখে সাফ্রিন বললো,

‘ কি হয়েছে? থেমে গেলি কেনো? ‘
মাথা নেড়ে কিছু না বুঝিয়ে আবারো এগিয়ে চললো সায়েরী। সাফওয়ানের দিকে একপলক তাকিয়ে সাফ্রিন অবাক কন্ঠে বললো,
‘ আরে বাহ! আজ কি মেরুন ডে চলছে নাকি! ভাইয়াও তোর সাথে মিলে গেলো দেখ! ‘
সায়েরী নিজেও অবাক হলো। তার গায়ে ডার্ক মেরুন কালারের ফুল স্লিভ সিম্পল লং গাউন। লম্বা ওড়নাটা কাধের দুইপাশে আটকানো। কব্জি পর্যন্ত ঢেকে আছে হাতজোড়া। গাউনের নিচের দিকে, হাতায় এবং ওড়নাতে চিকন একখানা গোল্ডেন পাড় ছাড়া অন্য কোনো ডিজাইন নেই। সায়েরীর উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ শরীরে রঙটা বেশ মানিয়েছে। কোমড় ছড়ানো চুলগুলো আজ উন্মুক্ত রেখেছে গলা এবং ঘাড়ের ক্ষত চিহ্ন ঢাকতে। কপালের একপাশে রয়েছে রক্ত জমা ব্যান্ডেজটা। অতি সাধারণের মধ্যেও অসাধারণভাবে ফুটে আছে তার মায়াবি চেহারার সৌন্দর্য। কথা বলতে বলতে গাড়ির কাছে পৌঁছে গেলো দুজন। তাদেরকে দেখে মিহাদ একগাল হেসে বলে উঠলো,

‘ হ্যালো বিউটিফুল লেইডি’স! ‘
বিনিময়ে মুচকি হাসলো সাফ্রিন। সায়েরী চুপচাপ। মিহাদের কন্ঠ শুনে চোখ তুলে তাকালো সাফওয়ান। এবং এই তাকানোটা হঠাৎ স্থির হয়ে গেলো মিনিট খানিকের জন্য। আবার কেউ খেয়াল করার আগে গাড়ির হর্নের আওয়াজ শুনে নিজেই সামলে নিলো নিজেকে। নড়েচড়ে গিয়ে দাঁড়ালো গাড়ির দিকে। সায়েরী সেদিকে তাকাতেই সাফওয়ান ইশারা করলো উঠে বসার জন্য। চুপচাপ ভঙ্গিতে উঠে বসলো সায়েরী। সাফওয়ান এবার তাকালো মিহাদের দিকে। তার তাকানো দেখে মিহাদ আবারো আলসেমি ঝেরে বললো,

‘ মোড চলে গেছে ভাই! তুই যা। ‘
সাফওয়ান বিরক্ত মুখে বললো,
‘ কিছুক্ষণ আগ অবধি তো কানের কাছে প্যানপ্যান করছিলি৷ এখন আবার ভাব নিচ্ছিস কেনো! চুপচাপ চল৷ ‘
মিহাদ দুষ্টু হেসে চাপা স্বরে জবাব দিলো,
‘ তুই কি এই বাচ্চা মেয়েটার সাথে একা যেতে ভয় পাচ্ছিস নাকি রে! এতো ভয় পেতে হবে না। আমি ওকে বলে দিচ্ছি আমার সো হ্যান্ডসাম, সো হট বন্ধুটাকে একটু মেয়েদের কুনজর থেকে বাঁচিয়ে রাখতে দাড়া… ‘

মিহাদ সত্যি সত্যি এগিয়ে যাচ্ছিলো সায়েরীর দিকে৷ এমন সময় সাফওয়ান তাকে আটকে ফেললো। বিরক্তমুখে চুপচাপ বসে পড়লো গাড়িতে। পরপরই স্টার্ট হলো গাড়ি। মিহাদ তখনো মিটিমিটি হাসছে তাদের দিকে তাকিয়ে।
মুখোমুখি সিটে দুজন বসা৷ সাফওয়ানের বাদামি চোখজোড়া স্থীর মোবাইল স্ক্রিনে। ঠিক তার সামনেই গাড়ির খোলা অংশে একটুখানি মাথা বের করে বান্দরবানের সবুজ প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত সায়েরী। বাতাসের দমকা হাওয়ায় তার খোলা চুল এলোমেলো হয়ে উড়ছে। লম্বা চুলের ছোঁয়া এসে লাগলো সাফওয়ানের চোখে মুখে। চোখ কুঁচকে ফেললো সে।

একটা রাম ধমক দিবে সেই আশায় চোখ তুলে তাকালো সায়েরীর দিকে৷ কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্ত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে সে তাকিয়েই রইলো কয়েক মুহূর্ত। বাতাসের সাথে ভেসে আসা মিষ্টি ঘ্রাণ নিতে চোখ বুজে মুহূর্তটা উপভোগ করছে সায়েরী। এলোমেলো চুল খেলা করছে মুখজুড়ে। অজান্তেই গোলাপি ঠোঁটে ফুটে উঠেছে হাসির রেখা। সেই সাথে দৃশ্যমান হলো বাম গালের গভীর টোল৷ নাকের ডগায় কুচকুচে ছোট্ট কালো তিলটা এই প্রথম নজর কাড়লো সাফওয়ানের। আচমকা চোখ মেলে তাকালো সায়েরী। সরাসরি চোখ রাখলো সাফওয়ান মুগ্ধ দুই চোখে৷ হকচকিয়ে উঠলো সাফওয়ান। কিন্তু সায়েরী অত্যন্ত স্বাভাবিক, উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,

‘ আমরা কোন জায়গায় যাচ্ছি? ‘
রিনরিনে কন্ঠটা কর্ণগোচর হতেই সাফওয়ান শ্বাস আটকে নিলো। আশ্চর্য! হচ্ছেটা কি তার সাথে! গলার উঁচু হাড়-টা উপর নিচ করে ফাঁকা ঢোক গিললো সে। কিছু বলবে সেই আশায় মুখ খুললেও কথা বের হলো না কন্ঠনালী দিয়ে৷ সায়েরী তখনো প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে৷ ঠিক সেই সময় ব্রেক কষলো গাড়ির। গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে তারা। স্বস্তির শ্বাস ফেলে সাফওয়ান দ্রুত নেমে আসলো। পরপর নেমে আসলো সায়েরী। সাফওয়ান ভাড়া মিটিয়ে কেউ একজনকে ফোন করে মোবাইল কানে চাপলো। সায়েরী আশপাশ দেখতে ব্যস্ত। মনে হচ্ছে বান্দরবানের কোনো গ্রাম এটি। বিশাল অংশ জুড়ে তাবু গেড়ে রেখেছে প্রায় ১০-১৫টা। চার, পাঁচটা সারীতে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক। এবং ঠিক তাদের সামনে চেয়ার,টেবিল রেখে চিকিৎসা করে যাচ্ছে কয়েকজন ডক্টর। মূলত সাদা এপ্রোন, গলায় ঝুলানো স্টেথোস্কোপ দেখে সহজেই বুঝা যাচ্ছে তারা সকলে চিকিৎসক। গ্রামের সাধারণ, দরিদ্র মানুষগুলোকে ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার দৃশ্যটা অদ্ভুত ভালো লাগলো সায়েরীর। আবার হুট করে মনে প্রশ্ন জাগলো যে, সাফওয়ান তাকে এখানে কেনো নিয়ে এসেছে? এই ছেলের কি টাকা পয়সার অভাব পড়েছে নাকি? অবশ্যই না। তাছাড়া সায়েরী নিজেও সাথে করে টাকা নিয়েই এসেছে। তাহলে এখানে কেনো এলো তারা?

ভাবনার মাঝে হঠাৎ তার নরম এক হাত নিজের বলিষ্ঠ হাতের মধ্যে চেপে ধরলো সাফওয়ান। চমকে উঠলো সায়েরী। আকস্মিক শীতল হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠলো কিঞ্চিৎ। ড্যাবড্যাব চোখ করে সে তাকিয়ে রইলো দুজনের হাতের দিকে। অথচ সাফওয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে মোবাইলে কথা বলতে বলতে এগিয়ে যেতে লাগলো সামনের দিকে৷ অপরদিকে মোবাইল কানে নিয়েই তাবু’র পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসলো মেহুল। দূর থেকে সাফওয়ান এবং সায়েরীকে দেখে মুচকি হেসে হাত নাড়লো সে। ঠিক তার পেছন থেকে ছুটে আসলো নীরা। দুজনের গায়ে সাদা এপ্রোন। মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে তাদের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ সায়েরীকে জড়িয়ে ধরলো মেহুল। ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো সায়েরী। ব্রেনের হার্ড ডিক্সে চার্স করে দেখলো এই মেয়েগুলোকে আগে কোথাও দেখেছে কিনা৷ উঁহু, ফলাফল শূন্য। একই ভঙ্গিতে নীরাও জড়িয়ে ধরলো আলতো করে। মেহুল মুচকি হেসে বললো,

‘ এখন শরীর কেমন তোমার? মাথায় কি যন্ত্রণা হচ্ছে? ‘
জড়তা নিয়ে সায়েরী ছোট্ট করে জবাব দিলো, ভালো!
সাফওয়ানের সাথেও অল্প কথাবার্তা বললো দুজন৷ ব্যস্ত ভঙ্গিতে সেখানে এসে হাজির হলো আকাশ। হাতের কাগজ দেখতে দেখতে নীরাকে কিছু বলতে এসেছে। এমন সময় সাফওয়ান এবং সায়েরীকে দেখে হেসে এগিয়ে আসলো সে। অন্যদিকে আকাশকে দেখেই চট করে সাফওয়ানের বাহু ঘেঁষে দাড়ালো সায়েরী। ছোট ছোট আঙ্গুল দিয়ে আকড়ে ধরলো সাফওয়ানের হাত। তার হাতের উষ্ণ স্পর্শে মাথা নিচু করে তাকালো সাফওয়ান। সায়েরীর ভীতু, ফ্যাকাসে মুখখানা দেখে নিজের শক্ত হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে ভাঁজে মিশিয়ে নিলো সায়েরীর নরম হাতখানা।
কাছাকাছি এসে হ্যান্ডশেক করার জন্য ডান হাত বাড়ালো আকাশ।

অন্যদিকে সাফওয়ানের হাত তখন সায়েরীর আয়ত্তে। উপায় না পেয়ে বাম হাত বাড়িয়ে দিলো সে। এমন কান্ডে আকাশ-সহ বাকি দুজনের নজর গেলো সাফওয়ান, সায়েরীর একত্রিত হাতজোড়ার দিকে। সেটা দেখাই মিটিমিটি হাসলো তারা। আকাশ নিজেও মুচকি হেসে বাম হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলো৷ এরপর দুজনকে নিয়ে গেলো একটা তাবুর কাছাকাছি। এখানে সায়েরীর চিকিৎসা করবে মেহুল এবং নীরা মিলে। সাফওয়ান যাবে আকাশের সাথে অন্য তাবু’তে। কিন্তু সায়েরী একা যেতে রাজি নয়। শক্ত করে ধরে আছে সাফওয়ানের হাত। সে যাবে না মানে যাবে না। নীরা,মেহুল এবং আকাশ মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। নীরা এবং মেহুল মিলে আশ্বস্ত করলেও সায়েরীর আতংকিত মন কিছুতেই সায় দিচ্ছে না তাদের সাথে যাওয়ার জন্য৷ সাফওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলে বাকিদের উদ্দেশ্যে বললো,

‘ আপনারা ভেতরে যান। আমি ওকে পাঠাচ্ছি। ‘
মাথা নেড়ে চলে গেলো তিনজন। সাফওয়ান এবার কিছু বলবে সেই আশায় মুখ খোলার আগে সায়েরী হুট করে বললো,
‘ আপনি সেদিনও আমাকে একা ফেলে চলে গিয়েছিলেন। ‘

আকস্মিক বাক্যটা কর্ণগোচর হতেই কথা হারালো সাফওয়ান। সায়েরীর টলমল চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে দমে গেলো সে৷ বারে বারে নাকের পাটা ফুলে উঠেছে সায়েরীর। কান্না আটকানোর চেষ্টা চলছে তাতে। লম্বা শ্বাস ফেলে মনে মনে কিছু কথা গুছিয়ে নিয়ে সায়েরীর মুখোমুখি ঝুকে আসলো সাফওয়ান। শান্ত কন্ঠে বললো,
‘ শুনো! আমি সেদিন যা করেছি, তোমার ভালো ভেবেই করেছি। আফসোস এই ভালো ভাবা’টাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দয়া করে এটা নিয়ে আর্গুমেন্ট করো না যে কীভাবে অপরিচিত জায়গায় ফেলে এসে তোমার ভালো করতে চেয়েছিলাম। কারণ তোমার মোটা মাথায় মনে হয়না কথাগুলো সেট হবে। ‘
শেষের কথাটা শুনে নাক ফুলিয়ে তাকালো সায়েরী। ক্ষিপ্ত স্বরে বললো,

‘ আপনি আবারো আমাকে অপমান করছেন কিন্তু! ‘
সাফওয়ান কৌতুক গলায় বললো,
‘ হ্যাঁ করছি। তো? কি করবে? এই পুঁটিমাছের মতো শরীর নিয়ে এখন ফাইট করবে আমার সাথে? ‘
কোনো প্রতিউত্তর করতে না পেরে ফোসফাস করে নিশ্বাস নিলো সায়েরী। সাফওয়ান নিজেও দমিয়ে ফেললো নিজেকে। এরপর সায়েরীর বাহু টেনে কাছাকাছি এনে বললো,

‘ দেখো, এক ভুল বারবার করার মানুষ আমি নই৷ অন্য কোনো হাসপাতালে না নিয়ে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি কারণ ছেলে-মেয়েগুলোর উপর আমার বিশ্বাস আছে। সেই রাতে যদি ওরা না থাকতো, তবে এখন হয়তো জঙ্গলের কোনো প্রান্তে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতাম আমরা। এই যে মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে ঘুরছো, এটাও ওরা করেছে। পরে আমাকে নিজ থেকে বলেছে এখানে এসে যাতে আরেকবার দেখা করে যায়৷ এই অপরিচিত জায়গায় ওদের চেয়ে বেস্ট কোনো অপশন ছিলো না বলেই এখানে এসেছি তোমাকে নিয়ে। এবার দয়া করে নিজের ট্রিটমেন্ট করিয়ে উদ্ধার করো আমাকে। ওরাও ব্রেক নিয়েছে শুধুমাত্র আমাদের জন্য৷ ওদের অন্য কাজও আছে। ‘
সব কথা মন দিয়ে শুনলো সায়েরী। সাফওয়ান ভাবলো এবার হয়তো সু – বুদ্ধি হলো মেয়েটার। কিন্তু তাকে অবাক করে সায়েরী আগের মতো করে বললো,

‘ সামান্য ট্রিটমেন্ট- ই তো করবে। আপনি সাথে গেলে সমস্যা কোথায়? ‘
দাঁতে দাঁত চাপলো সাফওয়ান। ইচ্ছে করছে দেয়ালে বারি মেরে নিজের মাথা ফাটাতে। সায়েরী তখনো উত্তরের আশায় ডাগরডাগর চোখ মেলে তাকিয়ে। সাফওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলে ফট করে জবাব দিলো,
‘ হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো চলো। ওরা তোমার কাধের, পিঠের ক্ষত জায়গাগুলো উন্মুক্ত করে মেডিসিন লাগাবে৷ আর আমি বসে বসে তোমার আগাগোড়া দেখবো। দাঁড়িয়ে কেনো! চলো..আসো আসো!! ‘

ছিটকে সরে গেলো সায়েরী। চোখ বড় বড় করে তাকালো সাফওয়ানের দিকে৷ ছিঃ ছিঃ! কি শুনলো এসব! লজ্জায় কান ঝাঁ ঝাঁ উঠলো তার। সাফওয়ান এগিয়ে আসতে গেলেই সে হতদন্ত হয়ে বলে উঠলো,
‘ না,নাহ! কোথাও যেতে হবে না আপনাকে৷ আ..আমি আমি যাচ্ছি। ‘
সাফওয়ান হাত বাড়িয়ে ইশারা করলো তাবু’টার দিকে৷ সায়েরী মুখ ফুলিয়ে ঢুকে গেলো ভিতরে। তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থেকে আচমকা হেসে ফেললো সাফওয়ান। মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো, পাগলী!!

যত্ন সহকারে সায়েরীর কপালের ব্যান্ডেজটা খুলে জায়গাটা ভালোভাবে পরিষ্কার করে দিলো মেহুল৷ সায়েরী চোখ মুখ খিচে বসে আছে। মেডিসিনের প্রভাবে জ্বলছে জায়গাটা। পুণরায় ছোট্ট ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিয়ে এবার সায়েরীর মুখোমুখি বসলো মেহুল৷ নম্র কন্ঠে বললো,
‘ তোমার ড্রেস ডানদিকে একটু নিচে নামাও। পিঠে যে আগুনের তাপ লেগে চামড়া জ্বলে গিয়েছিলো ওটা একটু দেখি। ‘

নড়েচড়ে বসলো সায়েরী। একটু অস্বস্তি ভাব দেখা দিলো মুখে৷ তবে না দেখিয়ে উপায়ও নেই। জায়গা সকাল থেকে অসম্ভব যন্ত্রণা দিচ্ছে। নীরা পিঠের দিকে গাউনের চেইন খুলে ক্ষত স্থান উন্মুক্ত করতে সাহায্য করলো। অতিরিক্ত না হলেও তাপ বেশ ভালোভাবে লেগেছে৷ চামড়া ছিলে গিয়ে লাল হয়ে আছে জায়গাটা। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে এবার গলা,ঘাড়ের আঁচড়ের দাগগুলোতে মেডিসিন লাগাতে লাগলো নীরা। সেই সাথে সায়েরীকে একে একে খুলে বলতে লাগলো কীভাবে কাল রাতে তারা দেখা পেয়েছিলো সাফওয়ান, সায়েরীর। সাফওয়ান কি কি করেছে সব। সায়েরী চুপচাপ শুনে গেলো শুধু। নিজের কথা শেষ করে নীরা হুট করে বললো,

‘ তুমি তো বেশ ছোট দেখতে৷ কতদিনের সম্পর্ক তোমাদের? ‘
আচমকা প্রশ্নটা শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো সায়েরী। হতভম্ব মুখে বললো,
‘ কিসের সম্পর্ক! উনার সাথে আমার মোটেও কোনো সম্পর্ক নেই। ‘
সায়েরীর কথাটা শুনে একে অপরের দিকে এক পলক তাকিয়ে হঠাৎ হু হা করে হেসে উঠলো নীরা এবং মেহুল। সায়েরীর অবাক মুখশ্রী দেখে মেহুল ওর গাল টেনে দিয়ে বললো,
‘ বেশ ভালো মিথ্যে বলতে জানো দেখছি। তবে আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না, সরি৷ ‘
নীরাও তাল মিলিয়ে বললো,

‘ সেটাই তো। আর বিশ্বাস করবোই বা কি করে হুহ! দুজন কলেজ ট্যুরে এসে একসাথে হারিয়ে গিয়েছে। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যজন বুকে ক্ষত নিয়ে ফিরেছে। রাত বিরাতে নিজের দিকটা বাদ দিয়ে ম্যাডামের জন্য হেল্প চাইছে৷ আজ এসেছে তাও ম্যাচিং আউট-ফিট নিয়ে। একেবারে হাতে হাত, ও মাই গড!! ‘
মেহুল হেসে উঠলো নীরার কথা শুনে৷ নিজেও তাল মিলিয়ে বলে উঠলো,
‘ একটু আগে তো বয়ফ্রেন্ডকে রেখে আসতেই চাচ্ছিলে না৷ এমনভাবে ধরে রেখেছিলে যেনো আমরা কেড়ে নিবো৷ আর সেও কি সুন্দর আমাদের পাঠিয়ে দিয়ে তোমাকে বুঝানোর দ্বায়িত্ব নিলো। পরে তো ঠিকই তার কথা শুনে এসেছো৷ নিশ্চয়ই কোনো স্পেশাল ডোজ দিয়েছে! ‘

শেষের কথাটা বলে চোখ টিপ দিলো মেহুল৷ সায়েরী কি বলবে ভেবে পেলো না৷ কথাগুলো শুনে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে তার। জামা,চুল ঠিক করে চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো সে৷ অস্থির কন্ঠে বললো,
‘ সাফওয়ান ভাই কোথায়? আমাকে উনার কাছে নিয়ে চলুন প্লিজ। ‘
মিটিমিটি হাসতে হাসতে সায়েরীকে নিয়ে অন্য একটা তাবু’র দিকে এগিয়ে গেলো তারা। সায়েরী বাকি দুজনকে ফেলে নিজে দ্রুত পায়ে ঢুকে গেলো ভিতরে। পরপরই সামনের দৃশ্যটুকু দেখে মৃদু চিৎকার দিয়ে দু’হাতে নিজের মুখ চেপে ধরলো সে। কদম পিছিয়ে গেলো আপনা আপনি।

অন্যদিকে সাফওয়ানের বুকের কাটা স্থানে দুটো সেলাই বসিয়েছে আকাশ সাথে অন্য একজন ডক্টর। সেলাই শেষ হওয়ার পর সবে মাত্র লম্বাকার বেড থেকে উঠে বসেছে সাফওয়ান, এমন সময় মেয়েলি কন্ঠের চিৎকার শুনে চমকে উঠলো উপস্থিত তিনজনই। সাফওয়ান মাথা তুলে তাকাতেই নজর আটকে গেলো সায়েরীর আতংকিত মুখখানায়৷ ছলছল, অবিশ্বাস্য চোখে সে সাফওয়ানের উন্মুক্ত বুকের দিকে তাকিয়ে আছে। পেছন থেকে নীরা এবং মেহুল দ্রুত এগিয়ে এসে সামলে নিলো সায়েরীকে। আকাশ ব্যস্ত হাতে পরিষ্কার করছে সাফওয়ানের বুক বেয়ে গাড়িয়ে পড়া রক্তবিন্দু। দগদগে লাল রক্ত, হা মতো ফাঁক হওয়া কাঁটা জায়গাটার সেলাই এবং সেলাইয়ের কারণে বেরিয়ে আসা রক্ত দেখেই মূলত ভয় পেয়ে গিয়েছে সায়েরী। দুরুদুরু বুকে সে আড়চোখে আবারো তাকালো সাফওয়ানের দিকে। এবং সাথে সাথে আবারো খিচে ফেললো চোখ, মুখ। কি বিধ্বস্ত দৃশ্য! শরীরের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গিয়েছে তার। অথচ এই ক্ষত নিয়ে কিনা এতো ঘন্টা যাবত দিব্যি ঘুরছিলো সাফওয়ান! মাথা ঘুরে আসলো সায়েরীর। বিড়বিড় করে আওড়ালো, এই ছেলে আসলেই মানুষ তো! এর মধ্যে কি অনুভূতি বলতে কিছু নেই!!

আকাশের কাজ শেষ হতেই দ্রুত হাতে শার্টের বোতাম লাগিয়ে চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো সাফওয়ান। দেখে মনে হচ্ছে একদম স্বাভাবিক সে। নীরা বোতল এগিয়ে দিলো সায়েরীকে। ঢকঢক করে একসাথে অনেকগুলো পানি খেয়ে নিজেকে শান্ত করলো সায়েরী। অন্যদিকে আকাশের সাথে থাকা অন্য সিনিয়র ডক্টর কাগজে খসখস শব্দ তুলে কিছু লিখে বাড়িয়ে দিলো সাফওয়ানের দিকে। নম্র কন্ঠে বললো,
‘ আমি মেডিসিন লিখে তো দিয়েছি। তবে মনে হয়না এই জায়গায় সব পাওয়া যাবে। এখন মেডিসিনের প্রভাবে সেলাই করা স্থানে পেইন হবে না। তবে মেডিসিনের প্রভাব কেটে যেতেই কিন্তু মারাত্মক পেইন লাগবে৷ প্রেসক্রিপশনে যা দিয়েছি সব টাইমলি নিয়ে নিবে। অ্যান্ড মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট, যতদিন না ক্ষত স্থান শুকিয়ে আসছে, পানি লাগানো যাবে না৷ ‘

মাথা নেড়ে সায় জানালো সাফওয়ান। হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলো কাগজটা৷ ইতিমধ্যে সাফওয়ানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সায়েরী। মেহুল ডক্টর’টার কাছে সায়েরীর হেলথের ব্যাপারে উল্লেখ করলে তিনি আবারো কলম তুলে নিলেন হাতে৷ প্রেসক্রিপশনে নাম লিখার পর জানতে চাইলো, বয়স কতো?
মেহুল তাকালো সায়েরীর দিকে। সে স্পষ্ট কন্ঠে জবাব দিলো, সতেরো!
উত্তরটা শুনা মাত্র অবাক চোখে তাকালো সাফওয়ান। বিষ্ময় কন্ঠে বললো,
‘ তোমার এখনো আঠারো হয়নি?? ‘
সায়েরী মিনমিন কন্ঠে বললো, ‘ মাসখানিক পরেই হবে। ‘

ডাক্তারের কথায় সায়েরীর ওজনটাও মেপে দেখলো মেহুল৷ এবং তার ওজনের মাত্রা শুনে চরম মাত্রায় অবাক সাফওয়ান। ঊনচল্লিশ! সদ্য ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষের, প্রায় সাবালিকা হয়ে উঠা একজন মেয়ের ওজন কিনা মাত্র ঊনচল্লিশ! ফ্যালফ্যাল করে কয়েক সেকেন্ডে তাকিয়ে রইলো সায়েরীর গোলগাল মুখটার দিকে৷ মনে মনে ভাবলো, এই মেয়ে তুলো খেয়ে বেঁচে আছে নাকি??

অবশেষে সায়েরীর প্রেসক্রিপশনটা নেওয়ার পর সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুজন বেরিয়ে পড়লো হোটেলের উদ্দেশ্যে। সাফওয়ান আগে আগে হাঁটছে। আশেপাশে দেখছে গাড়ি পাওয়া যায় কিনা। তার পেছনে রীতিমতো দৌড়াচ্ছে সায়েরী। তবুও সাফওয়ানের লম্বা লম্বা পায়ের সাথে পা মেলাতে পারছে না সে৷ অবশেষে একটা গাড়ির কাছাকাছি এসে পা থামালো সাফওয়ান। ড্রাইভারের সাথে কথা বলে সায়েরীকে ইশারা করলো গাড়িতে বসার জন্য। বড় বড় শ্বাস ফেলে উঠে বসলো সায়েরী। পরপরই উঠে আসলো সাফওয়ান। সাথে সাথে গাড়ি চলতে শুরু করলো। পরন্ত বিকেলের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে সায়েরী আবারো মাথা বের করলো গাড়ির ফাঁকা অংশ দিয়ে।

সূর্য প্রায় ডুবে যায় যায় অবস্থা। কমলা রঙের রোদ এসে হাতছানি দিচ্ছে সায়েরীর শ্যামবর্ণ মুখে। সেও মুচকি হেসে চোখ বুজে উপভোগ করছে সময়টা। বাতাসের ধাপটে এলোমেলো চুল খেলা করছে চোখে মুখে৷ কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তার। টোল পড়া হাসিটা বুঝিয়ে দিচ্ছে মনের প্রশান্তি। সে আপনমনে চোখ বুজে উপভোগ করছে স্নিগ্ধ প্রকৃতি। চোখ মেলে তাকালেই হয়তো বুঝতে পারতো, এক যুবক কতোটা গভীর নজরে অবলোকন করছে তাকে। যার মুগ্ধ দুই চোখ নিজ অজান্তেই আটকে যাচ্ছে সায়েরীর মায়াবী চেহারার মায়ায়৷ যে নিজেই অসহ্য হয়ে উঠছে নিজের কর্মকাণ্ডে। কিন্তু তবুও ঘুরেফিরে তার চোখ আটকা পড়ছে মুখোমুখি সিটে বসা মেয়েটার স্নিগ্ধ মুখশ্রীতে। সে নিজেও এলোমেলো হয়ে পড়ছে মেয়েটার এলোমেলো লম্বা চুলের ঝাপটায়!

হোটেলে এসে পৌঁছাতেই চট করে নেমে পড়লো সাফওয়ান। সে ভাড়া মিটিয়ে নিতে নিতে সায়েরী ভেতরে ঢুকে গেলো। লিফটের কাছে এসে দুই সেকেন্ড মতো অপেক্ষা করার পর লিফট খুললো৷ এবং সে ঢুকে গেলো ঝটপট। সেকেন্ডের মধ্যেই হাজির হলো সাফওয়ান। ভিতরে ঢুকে বাটন চেপে লিফটের দরজা আটকে দিলো সে। দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে সে ঘুরে দাঁড়ালো সায়েরীর দিকে। কদম এগিয়ে ঘনিষ্ঠ হলো অনেকটা। আচমকা তার এমন ব্যাবহারে হকচকিয়ে গেলো সায়েরী। ধ্ক করে উঠলো বুক। ডাগর ডাগর চোখ তুলে তাকালো সাফওয়ানে গভীর বাদামি চোখজোড়ার দিকে। সাফওয়ান আবারো এক কদম এগিয়ে নিতেই সায়েরী পিছিয়ে গেলো দুই তিন কদম। একেবারে সেঁটে গেলো লিফটের দেওয়ালে৷ সাফওয়ান কাছাকাছি এসে তার দুইপাশে দেয়ালে দুইহাত রেখে মাঝে বন্ধি করে ফেললো তাকে৷ কিছুটা ঝুকে মুখোমুখি হলো সায়েরীর। তার উষ্ণ নিশ্বাস আঁচড়ে পড়লো সায়েরীর মুখশ্রীতে। এরপর সায়েরীর চোখে চোখ রেখে সে গাঢ় স্বরে ফিসফিস করে বললো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২০

‘ শুনো মেয়ে! আর কখনো এমন ডার্ক কালার পড়ে, খোলা চুলে বাইরে আসবে না। রোদে মুখ বের করে কখনো টোল পড়া হাসি হাসবে না। ‘
আওয়াজ করে খোলে গেলো লিফটের দরজা। সাথে সাথে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো সাফওয়ান। কিন্তু সায়েরী তখনো স্তব্ধ মুখে দাঁড়িয়ে। কি হলো! কেনো হলো! কিচ্ছুটি বুঝে উঠতে পারলো না সে৷ শুধু অনুভব করলো তার ছোট্ট বুকের ভিতর হৃদপিণ্ড নামক যন্ত্রটা কাঁপছে, শরীর কাঁপছে। পায়ের নিচের ফ্লোর’টাও বোধহয় কেঁপে কেঁপে উঠছে। আশ্চর্য! আজ সব এমন কেঁপে কেঁপে উঠছে কেনো?

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৩+২৪