অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৬
সাজিয়া জাহান সুবহা
রাত্রিবেলার টানা বৃষ্টির পর আজকের আকাশটা বেশ ঝলমলে। ঝকঝকে পরিবেশ। জানলা গলিয়ে মিঠা রোদ এসে হাতছানি দিচ্ছে ইরা’র এলোমেলো বিছানার হেডবোর্ডের অংশে। সেদিকটায় ছন্নছাড়া অবস্থায় ছড়িয়ে আছে রমনীর ভেজা এলোকেশের গুচ্ছ। দেহে জড়ানো লম্বাটে শাড়ির আঁচল বিছানা গলিয়ে ফ্লোরে লুটিপুটি খাচ্ছে। ইরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ভোরের দিকে স্নান সেরে এই দ্বিতীয় বারের মতো তার চোখে ঘুম নেমেছে। গভীর ঘুম। বেলা এখন ন’টা প্রায়। কিন্তু ইরা’র ঘুমের রেশ কাটার নাম নেই। দীর্ঘক্ষণ পর তার পাশ ঘেঁষে নড়েচড়ে উঠলো একটি অস্তিত্ব। বার কয়েক আলতোভাবে ছুঁয়ে দিলো ইরার ঘুমন্ত মুখ, নাক, গ্রীবা। অতঃপর, আচমকা আঁচড় কাটলো গ্রীবা হতে খানিক নিচে বুকের দিকটায়। অকস্মাৎ চিনচিনে ব্যথায় ইরা’র ঘুম ছুটে গেলো। ঝাপসা চোখ মেলে চাইতেই নজরে এলো মাহবীরের ছটফটে অবয়বটি। শুয়ে শুয়ে হাত-পা নাড়ছে বাচ্চাটা। ইরা’র দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই আশ্চর্যজনক ভাবে হেসে উঠলো সে। অস্পষ্ট শব্দ তুললো
‘ বাআ..আ.. ‘
ইরা না চাইতেও হেসে ফেলে। মাহবীরের পেটে সুড়সুড়ি দিয়ে বলে,
‘ বাআ আ? ন’মাস আমি পেটে রেখে এখন প্রথম কথা বাবা বলতে চাচ্ছেন? বাবার আদর পেয়ে আমাকে ভুলে গিয়েছেন হুহ? আমি কি বাবার চেয়ে কম আদর দিই? ‘
মায়ের এটুকু স্পর্শে মাহবীর দ্বিগুণ গতিতে হাত-পা নেড়ে হেসে উঠে। সেই তালে হাসছে ইরাও। ছেলেকে দেখে অন্য কোন দিকে খেয়াল ছিলো না তার। আচমকা তার দেহের উপর দিয়ে কারো পেশিবহুল বাহু নজরে আসতেই চমকে উঠলো সে। চট করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। দেখলো, তার পাশেই বিছানায় বসে রয়েছে জাদিদ। এই পর্যায়ে সে ঝুঁকে এসে ইরার শরীরের উপর দিয়েই হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো মাহবীরকে। আদুরে গাল দুটোই শব্দ করে চুমু খেয়ে ইরা’র কথার প্রতিউত্তর স্বরূপ বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘ আগেই বলেছিলাম, আমার ছেলে পারফেক্ট বাবার নেওটা হবে। কথা মিলে গেলো তো? ‘
ইরা জবাব দেওয়ার ফুরসত পেলো না। দুই বাবা-ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলো, এমন মুহুর্তে হঠাৎই জাদিদ পুণরায় ঝুঁকে এলো তার দিকে। ইরাকে চরম আশ্চর্য করে দিয়ে নিঃশব্দে ছোট্ট চুমু বসালো তার কোমল অধরে। ফিসফিস ছন্দে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ বীরের বাবা তার মা’কেও কম আদর দেইনি। সেই হিসেবে তারও স্বামী ভক্ত হয়ে উঠা উচিত। তাইনা? ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত এই স্পর্শে, এমন দুষ্টুমি মাখানো প্রশ্নে ইরা জমে গেলো কেমন। পরমুহূর্তেই জাদিদের কথার ইঙ্গিত বুঝে বিগত রাতের কথা স্মরণ হতেই লজ্জায় রক্তজবার ন্যায় টকটকে হয়ে উঠলো মুখশ্রী। কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হলো যেনো। লজ্জায় শ্বাস আটকে এলো প্রায়। চট করে নজর ঘুরালো সে। উঠে বসল ধীর গতিতে। অপ্রস্তুত গলায় জানতে চাইলো,
‘ আপ..আপনি এখনো হাসপাতালে যাননি? ‘
‘ না। ছুটি নিয়েছি। ‘
‘ কেনো? ‘
‘ মনে হলো আজ বীর এবং তার আম্মুর আমাকে প্রয়োজন খুব, তাই। ‘
মাহবীরকে নিয়ে খেলার মাঝেই হেয়ালি করে জবাব দিলো জাদিদ। ইরা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারলো না কথাটার অর্থ। তার প্রশ্নবিদ্ধ মুখশ্রী দেখেও জাদিদ খোলাসা করলো না কিছু। মাহবীরকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ইরা’র উদ্দেশ্য বললো,
‘ ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি ডাইনিংয়ে অপেক্ষা করছি। ‘
ইরা মাথা নেড়ে সায় জানায়। জাদিদ বের হয়ে দরজা লাগিয়ে দেওয়া মাত্র মুখ ঢাকে দুইহাতে। সে কিঞ্চিৎ ধারণ করতে পেরেছে যে তার শরীরের দিক বিবেচনা করেই আজ জাদিদ ছুটি নিয়েছে। যেনো মাহবীরকে সামলে নিয়ে ইরাকে আরাম করার সুযোগ দিতে পারে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ইরা’র বুক পিঞ্জিরায় সুখ সুখ হাওয়া বয়ে গেলো। লজ্জাও লাগলো নিত্যকার মতোন। বয়সের সঙ্গে নিজের এই উদ্ভব প্রতিক্রিয়া, অনুভূতি গুলোর তাল মিল খুঁজে পেলো না ইরা। এক বাচ্চার মা হয়ে কিশোরী মেয়েদের মতোন এমন লাল,নীল হয়ে থাকা সাজে?
ফ্রেশ হয়ে ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে পরণের শাড়িটি ঠিকঠাক করে নিলো ইরা। চুলগুলো সুন্দর করে খোপায় আটকিয়ে ফিরে যেতে উদ্যত হতেই চোখে বিধল টেবিলের উপর রাখা ছোট্ট একটি জুয়েলারি বক্স। নীল রাঙা বক্সটির উপর আটকানো একটি হলুদ রঙের চিরকুট। কৌতুহলী চিত্তে বক্সটি তুলে নিলো ইরা। এবড়োখেবড়ো হাতের লেখাগুলো পড়তে বেশ বেগ পেতে হলো তাকে। বহু কসরতে পড়লো বাক্য গুলো।
‘ মিসেস জাদিদ এহমাদ, যেদিন আপনি প্রকৃত রূপে এই নামের মালকিন হয়ে উঠবেন। ঠিক সেদিনই এই ছোট্ট অলংকারটুকু আপনাকে উপহার দিবো ভেবে কিনেছিলাম। অবশেষে আপনি আমার নামের প্রকৃত মালকিন হয়ে উঠলেন। আমাদের সম্পর্কের নিশানি হিসেবে, মিসেস ইরা জাদিদ এহমাদ হিসেবে এবং বিয়ের রাতের উপহার হিসেবে এই উপহারটুকু আপনার জন্য। ‘
চিরকুট পড়ে ইরার কৌতূহল দ্বিগুণ হলো। হাস্যজ্বল চিত্তে বক্স খুললো সে। দেখলো, মাঝারি আকৃতির একটি ডায়মন্ড নোসপিন রয়েছে ভেতরে। ইরা’র খেয়াল হলো বিয়ের প্রায় দশ এগারো মাস অতিক্রম হওয়ার পরেও তার নাকে এই অলংকার টুকু স্থান পায়নি। বাঙালি পূর্ব মহিলাদের ভাষ্যমতে, নাকফুল হলো বিবাহিত নারীদের স্বামীর নিশানা। ইরা কখনো বিয়েটাকেই মেনে নেয়নি। সেই হিসেবে স্বামীর কথা ভেবে নোসপিন-ও পরা হয়নি কখনো। জাদিদ এই বিষয়টি খেয়াল করেছে? তার কি ইচ্ছে ছিলো ইরাকে এভাবে শাড়ি, চুড়ি, নাকফুল সহ সম্পূর্ণ বউ রূপে দেখার? ভাবুক ইরা বেশ রয়েসয়ে নাকের ফুটোয় নোসপিনটি পরলো। খুঁটিয়ে দেখলো নিজেকে। সত্যিই এবারে পরিপূর্ণ লাগছে তাকে। নিজের রূপ-লাবণ্য, অবস্থান, পরিপূর্ণ জীবন সবটা চোখের দৃশ্যপটে ভেসে উঠতেই বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো ইরা। তার জীবনটা এখন রংধনুর সাত রঙে রাঙানো। কোথাও বিন্দুমাত্র খাঁদ নেই।
ডাইনিং স্পেসে পৌঁছে স্বামী, সন্তানের হাস্যজ্বল মুখশ্রী দেখে ইরা’র হাসিমুখ চওড়া হয়। এইতো জীবন। একটি কালো অধ্যায়ের পর এই পরবর্তী সময়টুকু কেবল সুখে,আনন্দে মুড়ানো। গতকালের পর হতে ক্ষণে ক্ষণে ইরা’র মন বলছে, জীবনে সমাপ্তি বলতে কিছুই নেই। শেষ নিঃশ্বাসের আগ অবধি জীবনের মোড় বদলায়। কখনো তা কালবৈশাখী ঝড় হয়ে তোলপাড়ের রূপ নেয়। কখনো বা এই মিষ্টি সকালের মতো বসন্তী হাওয়ার ন্যায় শীতলতা বয়ে আনে। তবুও জীবন থেমে থাকে না। না কারো জন্য, না কিছুর জন্য।
তিমিরাচ্ছন্ন কক্ষটি ভোর থেকেই নৈঃশব্দ্যে ঘিরে ছিলো। সারাটাদিনের নিরবতার পর বর্তমানে নির্দিষ্ট অবয়বটি ঘুরে বেড়াচ্ছে রুমের আনাচে কানাচে। চিত্ত জুড়ে তার ছটফটে, অস্থির ভাব। অথচ মুখশ্রীতে স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য। একটুখানি হিমেল হাওয়া উপভোগের আশায় লম্বা কদমে বারান্দায় গেলেও ঠিকলো না মিনিট খানিকও। পুণরায় নিরব পদচারণে ফিরে এলো কক্ষে। উত্তর দিকের বড়সড় জানলার পাশে অবস্থিত ইজি চেয়ারে এসে বসলো নিজের ল্যাপটপ নিয়ে। সাটার খোলার সঙ্গে সঙ্গে নীলচে আলোয় আলোকিত হলো কক্ষটি। স্পষ্ট হলো একটি গুরুগম্ভীর মুখাবয়ব। অনুভূতিহীন, নির্ঘুম চোখজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ল্যাপটপ স্ক্রিনে। মুখস্থ বিদ্যার ন্যায় ঝটপট আঙ্গুল চালিয়ে নির্দিষ্ট ফোল্ডারের যেকোন একটি ভিডিও চালু করলো৷ তৎক্ষনাৎ ভঙ্গ হলো কক্ষের গুমোট ভাব। রিনরিনে এক মেয়েলি কন্ঠের কিচিরমিচির কথার আওয়াজে মুহুর্তেই মুখরিত হলো চতুর্দিক। সেই আওয়াজে প্রেমিক পুরুষের বক্ষ শীতল হলো। আদুরে প্রেয়সীর ছটফটে অবয়বটি দেখে দৃষ্টি নমনীয় হয়ে এলো। অনবরত কথা বলতে বলতে সাদা গোলাপের বাগানজুড়ে ঘুরে বেড়ানো মেয়েটা যখনই পেছন ফিরে কোমরে হাত ঠেকিয়ে, গাল ফুলিয়ে বলে উঠলো,
‘ সাফওয়ান ভাই! আপনি অতো দূরে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না কেনো? কথা শুনছেন কেনোওওও? ‘
এই দৃশ্য দেখে তৎক্ষনাৎ গোমড়ামুখো মানবটার অধর কোণ প্রসারিত হলো। চেয়ারে পিঠ এলিয়ে পুণরায় শুনলো প্রেয়সীর তেজস্বী কন্ঠের অভিযোগ গুলো। মেয়েটার ডান হাতে ছোট ছোট গাছের একাধিক ডাল। কপালের একপাশে কাঁদা মাটি লেগে। বাম হাত কোমরে ঠেকিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে। বেবি হেয়ার গুলো উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলোফুলো গাল জোড়ার দুই প্রান্তে। রমনীর ভাবখানা এমন, যেনো বিপরীত পক্ষ তার কথার প্রতিউত্তর না করে মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছে।
‘ এতো মিস করছো যখন, গিয়ে দেখা দিলেই পারো। এখানে থেকে কাজের কাজ কিছু তো হচ্ছেই না। বাচ্চা মেয়েটাকে অন্তত শান্তি দাও। আর কতো কাঁদাবে? ‘
অকস্মাৎ ভেসে আসা অন্য এক পুরুষালি কন্ঠে সাফওয়ানের ধ্যান ভাঙ্গে। চট করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখে, দরজার সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রূপম। সে কখন আসলো সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল ছিলো না সাফওয়ানের। ফলস্বরূপ কিঞ্চিৎ চমকে উঠেছে সে। রূপমের কথা শুনে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে জানতে চাইলো,
‘ কখন এসেছিস? ‘
রূপম এগিয়ে আসে। সুইচ হাতড়ে লাইট জ্বালায়। সেই আলোতে চোখ কুঁচকে ফেলে সাফওয়ান। বিরক্ত গলায় বলে,
‘ প্রয়োজনীয় কথা না থাকলে বের হ। আমি কিছুক্ষণ রেস্ট নিতে চাই। ‘
‘ রেস্ট নেওয়ার প্রয়োজন অবশ্য আছে। কিন্তু তোমার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে না রেস্ট করছো।
টেবিলের উপর থাকা চারটি খালি কফি মগকে ইশারা করে পুণরায় বললো,
‘ এগুলো কি? দুপুরেও লাঞ্চ করোনি। এখন খালি পেটে কফি গিলে যাচ্ছো। না নিজেকে শান্তি দিচ্ছ না অন্যকে। বড়ো মা একটু আগেও আমাকে ফোন করেছে। তুমি এক্সাম দিতে গেলেও বাড়ি যাওনি কেনো? বড়ো মা চিন্তা… ‘
‘ তোর কাছে জ্ঞান শুনতে চেয়েছি আমি? নিচে রূপসা আর রাহাত আছে। ওদের গিয়ে শোনা। ‘
সাফওয়ানের তিরিক্ষি আওয়াজ শুনে রূপম হতাশ শ্বাস ফেললো। কিন্তু দমে গেলো না। পকেট হতে নিজের মোবাইল বের করে স্ক্রিন তাক করলো সাফওয়ানের সম্মুখে। সাফওয়ান মনযোগী দৃষ্টিতে তাকালো। রূপম পুণরায় বলে উঠলো,
‘ জ্ঞান না দিয়ে উপায় পাচ্ছি না। দেখো তোমার ইনভেসমেন্টের কি হাল। বাবা বলেছিলো তাড়াহুড়ো করে এতো বড় ডিসিশন না নিতে। কথা শোনোনি তুমি। এই কোম্পানির শেয়ার লস আগেও হয়েছে। এখনও বিশেষ কোন ইম্প্রুভমেন্ট আমি দেখছি না। আ’ম স্যিউর এবারেও বাজেভাবে ডুববে। তার উপর তুমি যা জেদ ধরে বসে আছো! এমনই থাকলে এতো বিগ এমাউন্টের লোন তুমি চোকাবে কি করে? ‘
রূপমের দৃঢ় কন্ঠের বিপরীতে সাফওয়ানকে দেখালো পূর্বের মতোই নির্বিকার। মুখশ্রী জুড়ে চিরচেনা থমথমে অভিব্যক্তি। রূপম শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মুখোমুখি ডিভানে বসে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ নিজের ইগো বজায় রাখতে গিয়ে, নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে যার জন্য এসব করছো তাকে অন্তত হারিয়ে ফেলো না, ভাই। তুমি এমন রাগ ধরে রাখলে একূল-ওকূল সব হারাবে। রাগের মাথায় কোন কাজই ঠিকঠাক হয়না। দেখো,এটাতেও স্পেশাল কোন ইম্প্রুভমেন্ট পাচ্ছো না। আর এসবের মাঝে সায়েরীর দোষটা কোথায়? বাচ্চা মেয়েটাকে শুধু শুধু কষ্ট দিচ্ছো কেনো? অন্যের রাগের শোধ ওকে দিয়ে তোলার কি মানে? তোমার কাছ থেকে এমন ইমম্যাচিউরিটি আশা করিনি আমি। ‘
সাফওয়ানের নির্লিপ্ত মুখাবয়বে পরিবর্তন ঘটলো এবারে। ভাঁজ পড়লো কপালে। অবিলম্বে দৃষ্টি জোড়া তাক করলো রূপমের দিকে। কৌতুহলী গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ তোকে এসব কে বলেছে? ‘
‘ সাফা কল করেছিলো আজ। আগেও করেছে। তোমার কথা জানতে চাচ্ছিলো। সায়েরীর সাথে তোমার কি ঝামেলা হয়েছে তা তো জানি না। কিন্তু সাফার কথার আন্দাজে মনে হলো তুমি সায়েরীর সঙ্গে রাগারাগি করে এখানে চলে এসেছো৷ ‘
সাফওয়ান চোখ বুজে। চেয়ারের হাতলে কনুই ঠেকিয়ে আঙুল ঘষে কপালে। আজ কতগুলো দিন হলো সে সিলেটে। আসার আগে সায়েরীর সঙ্গে যা রূঢ আচরণ করেছে সবকিছুতে যে নিজের ভুল ছিলো তা বুঝতে পেরেছে সিলেটে আসার পরে। কারণ এখানে এসেই তার তিরিক্ষি মেজাজ শান্ত হয়েছে। নিভৃতে বসে ভেবেছে সব। কিন্তু ভুলটুকু বুঝেও আগ বাড়িয়ে মেয়েটাকে কল করা হয়নি। অবশ্য এরও কারণ রয়েছে। কখনোই তাদের মধ্যকার কোন গুরুত্বপূর্ণ আলাপ ফোনকলে হয়না। কিংবা বলা যায়, মোবাইলে কোন আলাপই হয়না। দমটুকু ফেলতে না পারার মতো ব্যস্ততা নিয়ে সাফওয়ানের-ও সুযোগ হয়নি এতো কাজ ফেলে ঢাকা ছুটে যাওয়ার। কিন্তু বিগত দুই একদিন যাবত সহ্য ক্ষমতা বাঁধ ভাঙ্গতে চাইছে। রোজ সকালে যার ঘুমু ঘুমু আহ্লাদী কন্ঠ শুনে তার দিন শুরু হয়, যে মুখ দেখে প্রত্যেকটি দিন স্বস্তিতে কাটে। আজ কতগুলো দিন হলো সেই মায়াময়ী মুখশ্রীর দেখা পায়নি, আদুরে কন্ঠটা শুনেনি। বুকের ভেতরটা শুকিয়ে খা খা করছে তার। বাম পাশটায় অদ্ভুত রকমের চিনচিনে ব্যথা হয় ক্ষণে ক্ষণে। স্ব-ইচ্ছায় বাড়ানো এই দুরত্ব এখন তার নিজেরই সহ্য হচ্ছে না। পারছে না দূরে থাকতে।
‘ প্লিজ একবার গিয়ে দেখা দিয়ে আসো, ভাই। তোমার সুবহা একটুও ভালো নেই। ‘
রূপমের শান্ত, শীতল কন্ঠ। অথচ এই ঠান্ডা স্বরের দুটিমাত্র বাক্য যেমন তীরের ফলা হয়ে বিধল সাফওয়ানের বুকের মধ্যিখানে। খানখান হলো সেথায়। কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হলো একটিমাত্র বাক্য, “সুবহা ভালো নেই”৷ সাফওয়ানের বরফ শীতল দেহটি নড়েচড়ে উঠলো। শুকনো ঢোক গিললো পরপর দুটো। অতঃপর, হঠাৎই সটান দাঁড়িয়ে গেলো। গায়ে জড়িয়ে থাকা ম্যাগি হাতা টি-শার্ট টি একটানে ছুড়ে ফেললো অদূরে। কাবার্ড হতে অন্য একটি ফুলহাতা টি-শার্ট বের করে জড়িয়ে নিলো গায়ে। অবুঝের ন্যায় তাকিয়ে থাকা রূপমকে চরম আশ্চর্য করে দিয়ে হঠাৎই বলে উঠলো,
‘ চাচ্চুর গাড়িটা গ্যারেজে আছে? প্রয়োজন হলে ছোট টা ইউজ করতে বলিস। আমি কাল রাতের মধ্যে ফিরে আসবো। ‘
রূপম তড়াক করে লাফিয়ে উঠে। বলে কি এই ছেলে? এই অসময়ে কোথায় যাবে? ঢাকা?
দেয়াল ঘড়িতে নজর বুলিয়ে রূপম দ্রুত গলায় বিরোধ জানালো,
‘ এই ভর সন্ধ্যায় কোথায় যাবে? আমি তো বুঝানোর জন্যেই বলেছিলাম। কাল সকালে যেও, ভাই। এখন গিয়ে করবে টা কি? পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে তো। ‘
কথাগুলো বোধহয় সাফওয়ানের কানে পৌঁছাল না। সে প্রচন্ড তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে ওয়ালেট, মোবাইল তুলে নিলো। সেসব পকেটে গুঁজে রূপমকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে লম্বা কদমে ত্যাগ করলো কামরা। বার কয়েক ডাকলো রূপম। পেছন পেছন এগোলো দরজা অবধি। কিন্তু সাফওয়ানের ব্যস্ত পদচারণের সঙ্গে তাল মিলাতে না পেরে চৌকাঠে-ই দাঁড়িয়ে গেলো সে। পেছন থেকে দেখলো লম্বা-চওড়া যুবকটির ব্যাকুল চিত্ত। ছোট্ট বেলা হতে দেখে আসা গুরুগম্ভীর, ধৈর্যশীল, তুখোড় বুদ্ধিসম্পন্ন ভাইটার এমন অধৈর্য, ব্যাকুল, টালমাটাল হাল দেখে বুক ফুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।
ঘড়ির কাঁটায় রাত এগারোটা। এসময়ে খান বাড়ির সকল সদস্যদের রাতের আহার সেরে নিজ কামরায় অবস্থান করার কথা থাকলেও, সকলকে দেখা গেলো বাড়ির লিভিং এবং ডাইনিং স্পেসে। অসময়ে উপস্থিত হওয়া সাফওয়ানকে দেখে সকলের চমকে যাওয়ার কথা থাকলেও, স্বয়ং সাফওয়ান আশ্চর্য হলো তার মামা-মামীকে নিজ বাড়িতে উপস্থিত দেখে। আশ্চর্যের চেয়েও কুঞ্চিত হলো ভ্রুঁদ্বয়। বাড়ির কর্ত্রীদের ছুটাছুটি দেখে বুঝলো রাতের খাবার পরিবেশনের আয়োজন চলছে। সাফ্রিন কিংবা অন্য কোনো ছেলে মেয়ে উপস্থিত নেই উক্ত স্থানে। উপস্থিত কেবল বাড়ির গুরুজনেরা। সাফওয়ানের দিকে সর্বপ্রথম নজর গাঁথলো তার মামার। পরবর্তীতে অন্যদের দৃষ্টিতে এলে সাফওয়ান এগিয়ে আসে। তাহুরা খান একদিকে যেমন চমকেছেন, অন্যদিকে খুশিতে, কিছুটা অভিমানে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। মায়ের দিকে মনযোগ দিতে চেয়েও সাফওয়ানের সম্পূর্ণ মনযোগ কেড়ে নিলো তার মামা। ভদ্রলোক খুশিতে গদগদ হয়ে বলে উঠলেন,
‘ একদম ঠিক সময়ে এসেছো। আমি নিজেই তোমাকে কল করেছিলাম আসার জন্য৷ তুমি তো কলই রিসিভ করলে না। ‘
আরও এক কাটি উপরে গিয়ে তাহুরা খানের চেয়েও দ্বিগুণ আহ্লাদী কন্ঠে সাফওয়ানের মামী বলে উঠলেন,
‘ ছেলেটা মাত্র এসেছে ওকে তোমরা ফ্রেশ হয়ে আসতে দাওনা। খিদেও পেয়েছে বোধহয়। যাও তো বাবা, দ্রুত ফ্রেশ হয়ে খেতে আসো। ‘
সাফওয়ানের কপালে তিন চারটে ভাঁজ পড়ে। বহু বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা পর হঠাৎ করে মামা-মামী নামক দম্পতির পক্ষ হতে এতোটা আহ্লাদ সে নিতে পারছে না। কই! মাস কয়েক আগেও তো সাফওয়ানের গুরুগম্ভীর মুখাবয়ব দেখে কথা বাড়াতে চাইতেন না তারা। তবে হঠাৎ কি হলো? সাফওয়ান ঘাড় ফিরিয়ে সরু চোখে তাকায় মায়ের দিকে। তাহুরা খানের মুখশ্রী মিইয়ে যায় ছেলের সেই জহুরি দৃষ্টি দেখে। উপস্থিত মামা-মামী নামক দুই সত্ত্বাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে সাফওয়ান নিজ পথে এগোলো। কেটে গেলো মিনিট দশেক। পরমুহূর্তেই দোতলার সাফওয়ানের কক্ষ কন্ঠে কেমন এক গর্জন ভেসে এলো তাহুরা খানের উদ্দেশ্যে। পূর্ব হতেই দুরুদুরু বুকে কর্মরত তাহুরা খান এই গর্জন শুনে কেমন কেঁপে উঠলেন। হাত ফসকে ফ্লোরে পড়ে গেলো ডালের বাটি। উপস্থিত সদস্যদেরও আশ্চর্যের শেষ নেই। হলো কি হঠাৎ? তারা উঠতে চাইলেও তাহুরা খান আটকে দিলেন। “আমি দেখছি” বলে নিজেই ছুটে গেলেন ছেলের কামরার দিকে। না দেখেও মনে মনে আন্দাজ করলো কিছু। আধ খোলা দরজা ঠেলে কামরায় প্রবেশ করামাত্র দেখা মিললো রিদিতার। মেয়েটা কেমন জুবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শরীরজুড়ে দৃশ্যমান কম্পন। ঠিক তার চেয়ে কয়েক হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে সাফওয়ান। যে সবে মাত্র তাড়াহুড়ো করে ভেজা শরীরে টি-শার্ট জড়িয়েছে। মায়ের উপস্থিতি দেখামাত্র সাফওয়ান গমগমে গলায় বলে উঠলো,
‘ আম্মু! তুমি জানো না আমার রুমে বাহিরের লোকের উপস্থিতি আমি পছন্দ করি না? তাহলে? তোমার ভাইয়ের মেয়ে এখানে কি করছে? কার কাছ পারমিশন পেয়ে আমার ঘরে গিন্নিপনা করতে এসেছে? ‘
অপমানে রিদিতার মুখশ্রী কেমন ছোট হয়ে আসে। ভাবে, মায়ের বলা কথার কিচ্ছুটি বাস্তব হলো না। সাফওয়ান এসেছে শুনেই সে ছুটে এসেছিলো এই কামরায়। ওয়াশরুম হতে উদাম গায়ে বের হওয়া সাফওয়ান প্রথম থেকেই চটে ছিলো। তার উত্তপ্ত মেজাজে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো করে রিদিতা বড় অধিকার নিয়ে বলেছিলো,
‘ নিচে সবাই তোমার অপেক্ষায় বসে আছে। তাড়াতাড়ি আসো না। আমি শার্ট বের করে দেই? ‘
প্রশ্ন করলেও উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে লাজুক চিত্তে এক কদম বাড়িয়েছিলো মেয়েটা। তৎক্ষনাৎ সাফওয়ানের অমন ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো গর্জন শুনে অন্তর আত্মা লাফিয়ে উঠেছে তার। পরবর্তী কথাগুলো শুনে মুখখানা চুপসে গিয়েছে। তাহুরা গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গম্ভীরমুখে ভাতিজিকে বললেন,
‘ তোমাকে এখানে আসতে নিষেধ করিনি আমি? ‘
ভয়ে,জড়তায় রিদিতা ক্ষমাও চাইতে পারলো না। নিরব কদমে ত্যাগ করলো কামরা।
তাহুরা খান বড্ড ক্লান্ত নজরে তাকালেন ছেলের দিকে। যেনো তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন এই পরিবেশে। সাফওয়ান কিচ্ছুটি বললো না। এই তিরিক্ষি মেজাজে মায়ের সম্মুখে পুণরায় মুখ খুলতে চাইলো না।
বাচ্চারা সকলে পূর্বেই খেয়ে নিজ নিজ কক্ষে চলে গিয়েছে। বড়রা একত্রে খেতে বসলো সাফওয়ান ফিরার পর। সাফওয়ানের মা,চাচি দুজনে এদিক সেদিক ছুটে পরিবেশন করছে। দুপুর হতে যে খালি পেটে ছিলো তা এই মুহুর্তে মনে পড়লো সাফওয়ানের। খাবারের ঘ্রাণে খিদেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। প্রথম লোকমা মুখে তুলেছিলো কেবল। এমন মুহুর্তে ভেসে এলো তার মামা নামক ভদ্রলোকের কন্ঠস্বর। নওশাদ খান’কে উদ্দেশ্য করে বলছেন,
‘ ফেব্রুয়ারিতেই দুজনের বাগদান টা সেরে ফেললে ভালো হয়না দুলাভাই? সাফওয়ান ও নাকি ব্যবসায় হাত বাড়াতে চাইছে। বাগদান টা হয়ে গেলে আমার ফ্যাক্টরির দায়িত্বটা নাহয় ও-ই নিলো। ব্যাপারটা তখন আরও সহজ হয়ে যাবে তাইনা? ‘
সাফওয়ানের গলায় খাবার আটকে কেশে উঠলো সে। প্রথম কয়েক সেকেন্ড অবুঝ বনে থাকলেও পরিস্থিতি বুঝতে বিশেষ বেগ পেতে হলো না। তার মামাদের ব্যবসায়িক অবস্থানও বেশ ভালো বলা চলে। দুই পরিবারের মাঝে আত্মীয়ের বন্ধন আরও গাঢ় হলে উভয় পক্ষেরই লাভ। বিশেষত নওশাদ খানের পছন্দ অনুযায়ী একমাত্র ছেলের বউ হিসেবে রিদিতার ফ্যামিলি স্ট্যাটাস, তার নিজ কোয়ালিফিকেশন সবই পারফেক্ট। সঙ্গে একমাত্র মেয়ে হিসেবে পরবর্তীতে ব্যবসার মালিকানাধীন তো মেয়ের জামাই-ই হবে। একই রকমের ভাবনা, চিন্তা বিপরীত পক্ষেরও। নওশাদ খানের এই বিস্তৃত সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী হিসেবে একমাত্র ছেলে সাফওয়ানের খাতাতেই উঠবে অধিকাংশ সম্পত্তি। এমন ছেলের কাছে কে না নিজ মেয়ে বিয়ে দিতে চাইবে! দুই পক্ষের পরিকল্পনা সব আপনমনে হিসাব খসে হাত গুটিয়ে নিলো সাফওয়ান। খাবারের রুচি উঠে গিয়েছে তার।
‘ সাফওয়ানের বাকি দুটো এক্সাম শেষ হোক। এর পরের সপ্তাহে শুভ কাজটা সেরে ফেলবো ভেবেছি। ছেলে, মেয়ে দুজনেই তো কাছের৷ নতুন করে জানার,বুঝার কিছু নেই। তাহলে আর দেরি করে লাভটা কি? ‘
বেশ হাসি হাসি মুখে নিজ বক্তব্য পেষ করলেন নওশাদ খান। উনার স্পষ্ট সম্মতি পেয়ে সাফওয়ানের মামা-মামী দুজনের উৎফুল্ল সীমা ছাড়ালো। সাফওয়ান ভেবেছিলো বাবার সঙ্গে একান্তে, নিভৃতে এই বিষয়ে কথা বলবে। কিন্তু তার মতামতের কোনরূপ তোয়াক্কা করে হঠাৎ এমন একটি স্বীদ্ধান্ত নিয়েছে দেখে তার চোয়াল শক্ত হলো। দাঁত কিড়মিড়িয়ে হঠাৎই বলে উঠলো,
‘ তোমাদের বিজনেসে ইনভেস্টমেন্টের কি জন্য বাজেটের কমতি পড়ে গিয়েছে? যে এখন ছেলে, মেয়ে নিয়ে ডিল করা শুরু করেছ? ‘
বড়দের মাঝে অকস্মাৎ এমন কথাটা বলতেই সকলে এক মুহুর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলো। কথার ইঙ্গিত বুঝে তাহুরা খানের ভাই-ভাবী দুজনে অপমান বোধ করলেন। নওশাদ খান তৎক্ষনাৎ ধমকে উঠলেন ছেলেকে, ‘ সাফওয়ান!!! ‘
‘ তুমি আমাকে ধমকালেই সত্যটা মিথ্যে হয়ে যাবেনা, বাবা। আমার লাইফের এতো বড় একটা ডিসিশন নেওয়ার আগে একটাবার আমার মতামত জানতে চেয়েছো তুমি? তোমার প্রয়োজন হতে পারে আরও অধিক ব্যাংক,ব্যালেন্স। কিন্তু তোমার যা আছে তা-ও আমার চাইনা। ‘
নওশাদ খানের মতোই সমান তালে চেঁচিয়ে উঠলো সাফওয়ান। তীব্র রাগে কপালের শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে তার। ধপধপ করছে নীলছে রগ। আধখাওয়া খাবারের প্লেট ঠেলে উঠে দাঁড়ালো সে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো নিজের মামা-মামীর দিকে। ভরাট কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ কতোটা কোটিপতি ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়ে চান আমাকে বলুন,মামা। আমি ছেলে খুঁজে দেওয়ার দায়িত্ব নিবো। তবুও আমার কাছ থেকে কোন এক্সপেকটেশন রাখবেন না। মেয়েকে বুঝিয়ে দিবেন, এসব ব্যবসায়িক লেনদেনের চুক্তি নিয়ে বিয়ে করার মতোন ছেলে আমি নই। আপনার মেয়ে যেনো আমার কাছ থেকে কোন আশা না রাখে। ‘
পরিবেশটা থমথমে, গুমোট। প্লেট নিয়ে বসে থাকলেও কারো আর গলা দিয়ে খাবার নামলো না। তাহুরা খানকে দেখা গেলো নির্জীব মুর্তির মতোন দাঁড়িয়ে থাকতে। অনুভূতিহীন, নির্লিপ্ত মুখাবয়ব তার। যেনো জানতো, এমনই কিছু দেখতে হবে আজ। সাফওয়ান হাত ধুয়ে সোজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পর, প্রচন্ড খিদে পেটে মায়ের হাতের রান্না খেতে বসলেও খাবারটুকু আর কপালে জুটলো না। বিগড়ানো মেজাজ,শুকনো মুখেই ত্যাগ করলো খান ভিলা।
‘ ওর কথায় কিছু মনে করো না। এখনো আমাদের মতো করে জগৎ সম্পর্কে কিছু বুঝছে না। ওর মা বুঝিয়ে বললেই বুঝবে। তোমরা নিশ্চিন্তে থাকো। ‘
নওশাদ খানের শীতল কন্ঠ। ঠোঁটের কোণে ঈষৎ বক্র হাসি। শেষের কথাটুকু বলতে গিয়ে তাহুরা খানের দিকে চাইলেন চোখ তুলে। তাহুরা খানের বিষ্মিত নজরে নজর মিললো তৎক্ষনাৎ। স্বামীর কথার টোনে,দৃষ্টিতে স্পষ্ট আদেশের আভাস। যেনো বুঝিয়ে দিলো, ‘ছেলেকে রাজি করাতেই হবে।’ তাহুরা খান এবারে সত্যিই চিন্তিত হলেন। শীতের মাঝেও কপালে জমা ঘামের রেখা মুছলেন কাঁপা হাতে। স্বামী-সন্তানের জেদের মাঝে নিরীহের মতোন ফেঁসে গিয়েছেন তিনি। কাকে বুঝাবেন? ছেলেকে? যে কিনা বহু পূর্বেই নিজ জগৎ গড়ে তোলায় যুদ্ধে নেমে গিয়েছে। না স্বামীকে? যার জেদের কাছে বারবার, প্রতিবার সকলকে নত স্বীকার করতে হয়েছে। বহুবার মায়ের দুর্বলতা দেখে নত হতে বাধ্য হয়েছে স্বয়ং সাফওয়ান-ও। কিন্তু এবার? এবার যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাহুরা খান কীভাবে ছেলেকে বুঝাবেন?
বিগত দুটি সপ্তাহ ছলেবলে কোচিং-এ না যাওয়ার নানান বাহানা বের করেছে সায়েরী। সকাল ৮টা হতে ১০টার আগ মুহুর্ত অবধি সময়টুকু তার কোচিং টাইম বলেই জানে সকলে। কিন্তু দুই সপ্তাহ যাবত মেয়েটা কেবল কলেজে যাচ্ছে, কোচিং-এ না। এই নিয়ে মেহরিন বেগম বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। প্রতিবার নানান বাহানা দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেছে সায়েরী। কিন্তু গত রাতে মায়ের বেশ বকুনি শুনেছে পড়াশোনা নিয়ে। কোচিং-এর ব্যাপারটা উঠে এলেও সায়েরীর করার কিছু নেই। কোচিং-এর নাম নিয়ে যার সঙ্গে বের হতো, সেই ব্যক্তি টা-ই তো উপস্থিত নেই। তবে ভোর সকালে বেরিয়ে সে যাবেটা কোথায়? গত রাতে মায়ের ঝারি শুনে অগত্যা অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ একটু আগেই বাসা থেকে বের হলো সায়েরী। উদ্দেশ্য গ্রীণ ভ্যালি। সেখানে তার কিছু নোটস রয়ে গিয়েছে যা জরুরি ভীষণ। মনের বিষাদ সব একপাশে চেপে একা একাই গ্রীণ ভ্যালির উদ্দেশ্যে বের হলো সে। বলা চলে, বেশ কিছুদিনের এই একাকিত্বে এখন কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে সে। সয়ে যাচ্ছে সকল অবহেলা। অনুভূতি বলতে অবশিষ্ট আছে কেবল অপেক্ষা,আকাঙ্ক্ষা।
গ্রীণ ভ্যালির বিশাল গেইট-টা আধখোলা। বাগানের ফুলগাছে পানি দিচ্ছিলেন রহিম চাচা। বহুদিন পর সায়েরীকে দেখে গাল ভরে হাসলেন তিনি। বিনিময়ে সায়েরীও হাসিমুখে টুকটাক কথা বললো। তাড়া আছে বলে দ্রুত প্রবেশ করলো ঘরে। যতদূর মনে পড়ে, তার ব্যবহৃত টেবিলের ডেক্সেই নোটস সব থাকার কথা। সেদিকে গিয়ে ডেক্স খুলে খুঁজতে লাগলো সে। লম্বাটে ডেক্সটা প্রায় সম্পূর্ণ টেনে বের করে এলোমেলো কাগজ সব ঘেটে দেখতেই ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলো প্রয়োজনীয় নোটস সব। সেসব হাতের মুঠোয় নেওয়ার মুহূর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে অপরিচিত এক মেয়েলি কন্ঠ কর্ণগোচর হতেই চট করে বাম দিকের খোলা বারান্দায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সে। উড়তে থাকা পর্দার আড়ালে দৃশ্যমান হলো দুজন নারী-পুরুষের অবয়ব। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার মতো সাফওয়ানের অবয়ব দেখে সায়েরী কেমন বিষ্মিত হলো। মনে হলো যেনো ভুল দেখছে। সাফওয়ান ভাই তো সিলেটে। এখানে আসবে কোথা থেকে? শহরে ফিরে আসলে সে অন্তত জানতো।
‘ কাল আমাদেরকে তোমার বাবা-ই তো ইনভাইট করেছিলো। তোমার আর আমার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলবে বলে। রাতে শুনেছ নিশ্চয়? ‘
রিদিতা! সাফ্রিন-সাফওয়ানের মামাতো বোন। এই মেয়েটাকে চিনতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হলো না সায়েরীর। এই অসভ্য মেয়েটাকে সে ভুলেইনি কখনো। কিন্তু এই মেয়েটা এখানে কেনো? সাত সকালে, সুখ নীড়ে, একাকী সাফওয়ানের সঙ্গে তার কি কাজ? কিসের বিয়ে? কিসব বকছে মেয়েটা? সায়েরীর বিবশ দৃষ্টি জুড়ে ভর করে ভয়,দুশ্চিন্তা, অবিশ্বাস। মনে হচ্ছে যেনো ভীষণ বাজে কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে সে। ভুলভাল দেখছে, ভুলভাল শুনছে। কিন্তু না। তাকে আরেক দফা আশ্চর্য করে রিদিতার কথার প্রতিউত্তর সরূপ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সাফওয়ান। বেশ স্বাভাবিক গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আমিই কথা বলতাম তোমার সাথে। গতকালের কিছু বোধহয় শুনো নি তুমি। ‘
‘ উঁহ। আম্মু তো ঠিকঠাক কিছুই জা… ‘
রিদিতার কথাটুকু পূর্ণতা পেলোনা। পূর্বেই ফ্লোরে কিছু একটা আঁচড়ে পড়ার বিকট শব্দ হলো। ভঙ্গ হলো ঘরের গুমোট নিস্তব্ধতা। রিদিতা ভয়ে লাফিয়ে উঠলো প্রায়। চমকালো সাফওয়ান নিজেও। অবিলম্বে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই পর্দার আড়ালে দেখা মিললো সায়েরীর স্তব্ধ অস্তিত্বের। দৃষ্টি মিললো দুজনার। সায়েরীর দৃষ্টি টলমল, রক্তিম। সাফওয়ানের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই মেয়েটার গাল বেয়ে অশ্রু গড়ালো। দৃষ্টির সেই অবিশ্বাস, অভিমান,অভিযোগ গুলো বুঝতে পেরে সাফওয়ানের বুকের ভেতরটা ধ্ব্ক করে উঠল। সে এক কদম বাড়ানো মাত্র চট করে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বড়সড় এক নিঃশ্বাস ছাড়লো সায়েরী। দেখে মনে হলো যেনো এটুকু নিঃশ্বাস ফেললেও বুকটা ভারী হয়ে এসেছে তার। হাত ফসকে ফ্লোরে পড়ে যাওয়া ডেক্সটার উপর দিয়ে কদম ফেলে সে দ্রুত পালাতে চাইলো। কিন্তু পারলো কই! সাফওয়ান লম্বা কদমে এগিয়ে এসে মুহুর্তেই হাত টেনে আটকে ফেললো তাকে। মুখ ফুটে কেবল ডেকেছিলো, তক্ষুনি ক্রন্দনরত মেয়েটা তেজস্বী রূপে এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে সর্ব শক্তিতে দুই হাতে ধাক্কা দিলো সাফওয়ানের বুকে। দেওয়াল জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো তার ভাঙ্গা গলার তীক্ষ্ণ সুর,
‘ ছুবেন না আমাকে.. ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত ধাক্কায় আশ্চর্য হয়ে সাফওয়ান সত্যিই পিছিয়ে গেলো। বিমূঢ় দৃষ্টি মেলে তাকালো সায়েরীর দিকে। মেয়েটার থুতনি কাঁপছে প্রচন্ডভাবে। নাকের ডগা রক্তজবার ন্যায় রক্তিম। গাল বেয়ে ঝরছে অবিরাম অশ্রুকণা। সাফওয়ানের দিকেই তাকিয়ে ছিলো সে। চোখ ঘুরিয়ে আবার পেছনে থাকা রিদিতার দিকেও তাকালো একপলক। পুণরায় চলে যেতে উদ্যত হলে তৎক্ষনাৎ তার হাত টেনে ধরলো সাফওয়ান। অন্য হাত গাল রেখে অস্থির, উত্তেজিত কন্ঠে আওড়াল,
‘ সুবহা! সুবহা, আমার কথা শুনো.. ‘
সায়েরী কিচ্ছুটি শোনার জন্য রাজি নেই। কান্না চেপে রেখেই মোচড়ামুচড়ি করতে লাগলো সাফওয়ানের বলিষ্ঠ হাতের মধ্য হতে নিজের হাত ছুটানোর প্রয়াসে। সাফওয়ান নিজেও হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সায়েরীকে একটুখানি শান্ত করার প্রয়াসে সে বুঝানোর সুরে একাধিকবার আওড়াল,
‘ সুবহা! কথা শোনো.. আমাকে বলতে তো দাও.. ‘
তীব্র জেদি সায়েরীর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গলো এবারে। ক্রন্দনরত কন্ঠেই চেঁচিয়ে উঠলো সে,
‘ কি শুনবো আমি? আর কি শোনার বাকি আছে? এই মেয়েটা এখানে আমার জায়গায় কি করছে? আপনি এখানে আছেন সেটা আমি জানি না কেনো? আর ব..বিয়ে! কাদের বিয়ের কথা চলছিলো হ্যাঁ? ‘
সায়েরীর কন্ঠস্বর ভেঙ্গে এসেছে। তীব্র রাগ,অভিমান, উত্তেজনায় থরথর কাঁপছে ছোট্ট দেহটি। তাকে এমন হাইপার হতে দেখে সাফওয়ান মনের দিক থেকে দিশেহারা প্রায়। তবে উপর দিয়ে স্বাভাবিক বেশ। তাদের দিকে অবুঝের ন্যায় তাকিয়ে থাকা রিদিতার দিকে ফিরে সে গম্ভীরমুখে বলে উঠলো,
‘ উই নিড সাম প্রাইভেসি, রিদি। ‘
রিদিতা স্পষ্ট বুঝলো, তাকে চলে যেতে বলেছে। সে-ও আর দাঁড়িয়ে থেকে লজ্জিত হতে চাইলো না। এটুকুতেই অনেক কিছু বুঝে নিলো। সাফওয়ানের সামনে গলা চড়িয়ে রাগ দেখানোর সাহস পাচ্ছে যেই মেয়ে, সে নিশ্চয় যেনতেন কোন মেয়ে নয়। এই মুহুর্তে এদের মাঝে না থাকাটায় বরং বুদ্ধিমানের কাজ।
রিদিতা দৃষ্টির আড়াল হতেই সায়েরীর পিঠ জড়িয়ে তাকে কাছে টেনে নিলো সাফওয়ান। অস্বাভাবিকভাবে মৃদুমন্দ কাঁপতে থাকা সায়েরীর গালে,পিঠে হাত বুলিয়ে ফের বলে উঠলো,
‘ হুশশ! শান্ত হও, সুবহা। শ্বাস নাও৷ আমাকে বলতে তো দাও আগে.. ‘
দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ, বুকে জমা হাজারটা অভিযোগ সহ আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের সম্মুখীন হয়ে সায়েরী মোটেও স্বাভাবিক নেই। একদিকে যেমন সাফওয়ানের প্রতি প্রচন্ড রাগ,অভিমান জমেছে। অন্যদিকে আবার হারানোর ভয় ঝেঁকে বসেছে। দোটানায় ডুবে মেয়েটা মস্তিষ্কের খেই হারালো সম্পূর্ণ। অকস্মাৎ খামচে ধরলো সাফওয়ানের বুকের দিকের টি-শার্ট। হড়বড়িয়ে বলে উঠলো,
‘ আ..আপনি.. আপনি আমাকে ছেড়ে দিবেন তাইনা? এজন্যে..এজন্যেই এতদিনে যোগাযোগ রাখেননি! একারণেই মিথ্যে বলেছেন যে আপনি সিলেটে গিয়েছেন? অথচ আপনি এখানেই ছিলেন? আমাকে ছাড়া, আমার যায়গায় ও..ওই বাহিরের মেয়েটা! ও এখানে কেনো ছিলো সাফওয়ান ভাই? আপনি..আপনি বিয়ে করবেন ওকে? ‘
সায়েরীর কম্পিত কন্ঠ। কিন্তু মেয়েটা কাঁদছে না। কেবল ঝাপসা, ফ্যালফ্যাল নজরে উত্তরের আশায় চেয়ে আছে সাফওয়ানের দিকে। সাফওয়ান অতি বিষ্ময়ে বোবা বনে গেছে যেনো। মেয়েটা তাকে এভাবে অবিশ্বাস করবে তা কখনো কল্পনা করেনি সে। ভীষণ রাগ লাগলো তার। দুহাতে সায়েরীর বাহুদ্বয় চেপে ধরে রীতিমতো ধমকে উঠলো সে,
‘ স্টপ দিস ননসেন্স, সুবহা। মাথা ঠিক আছে তোমার? আমি কেনো অন্য কাউকে বিয়ে করতে যাবো? ‘
‘ তাহলে বলুন ও এখানে কেনো এসেছিলো? আপনি বলেছিলেন আপনার কাছের মানুষেরা ছাড়া এখানে আর কারো আসার অনুমতি নেই। তবে এই সাত সকালে সে এখানে কেনো এসেছিলো সাফওয়ান ভাই? আপনার সঙ্গে কি করছিলো? কেনো বিয়ের কথা বলছিলো? আপ… আপনিও তার কথায় সায় দিয়েছিলেন। এসবের মানে আমি আর কি বুঝবো তবে? ‘
‘ আ..আমি বোকাটা জানিই না আপনি সিলেট নয় বরং এই শহরেই আছেন। আমি শুধু ভেবে গিয়েছি আপনি হয়তো কিছু নিয়ে চিন্তিত, এক্সামের জন্য ব্যস্ত আরও কত কি। অথচ আপনি এখানে আরেক মেয়ের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে আলাপ করছেন? এখানে! আমাদের সুখ নীড়ে! ‘
‘ সুবহা, তুমি.. ‘
‘ আপনি একারণেই আমার সঙ্গে রাগারাগি করে চলে গিয়েছিলেন তাইনা? কোন কারণ ছাড়া আমাকে সেদিন আম..আমাকে ওভাবে.. ‘
কান্নার দমকে কথা আটকে গেলো সায়েরীর। সাফওয়ান লাল লাল চোখে ফুঁসতে থাকা সাপের মতো চেয়ে রইলো। যেনো অপেক্ষায় রয়েছে, মেয়েটা অবিশ্বাসের মাত্রাটা কতদূর নিয়ে যেতে পারে তা দেখার জন্য। ক্ষণিক পূর্বে নিজেকে প্রমাণ করতে চাওয়ার ইচ্ছেটুকু মরে গিয়েছে। তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে বুকের ভেতরটায়। সায়েরী এলোমেলো সুরে কাঁদছে। দুই হাতে নিজের চুল নিজেই খামচে ধরলো সে,
‘ আহ!! আল্লাহ্! আমি..আমি কতোটা বোকা! গাধার মতো অপেক্ষা করে ছিলাম আপনার ব্যস্ততা কমবে বলে। এক্সাম শেষে আবার আমার কাছে ফিরে আসবেন বলে। অথচ আপনি স্বার্থপরের মতো এখানে আমার রিপ্লেসমেন্টে আরেকজনের সঙ্গে বিয়ের পরিকল্পনা করছি.. ‘
ঝনঝন শব্দে ফ্লোর সহ গোটা সুখ নীড়ের সবকটা দেয়াল কেঁপে উঠলো। কানে হাত চেপে ভয়ে অস্পষ্ট চিৎকার করে উঠলো সায়েরী। কথা থেমে গেলো তার। চোখের সামনে কাঁচের ডাইনিং টেবিলটির চুরমার হাল দেখে হৃদপিণ্ড ধরাস করে লাফিয়ে উঠলো। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে অবলোকন করলো সাফওয়ানের রক্তাক্ত হাত। কতটা জোর খাটিয়ে ঘুসি মেরেছে টেবিলে!
সাফওয়ানের চোখ জোড়ায় রক্ত টলমল করছে যেনো। স্পষ্ট ভেসে উঠেছে চোখের লাল শিরা৷ কপালের দুইপাশ এবং ঘাড়ের নীল রগ ফুলে ধপধপ করছে। সায়েরীর বলা অন্যসব বাক্যের সঙ্গে “স্বার্থপর” শব্দে ভীষণ আঘাত পেয়েছে সে। বিগত দিনগুলোর কড়া পরিশ্রম স্মরণে এলে দ্বিগুণ রাগ বাড়লো তার। রক্ত মাখা হাতে আকস্মিক সায়েরীর থুতনি চেপে ধরলো। গর্জে উঠলো চাপা স্বরে,
‘ স্বার্থপর! হুহ? এই বিশ্বাসঘাতক আর স্বার্থপরের সামনে দাঁড়িয়ে ন্যাকা কান্না করছো কেনো তবে? আউট! জাস্ট গেট দ্যা হেল আউট অব মাই ফেইস, সুবহা। ‘
শেষের কথাটা এতো জোরে বললো যে সায়েরী সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কেঁপে উঠে। বুকের মাঝে কিছু একটা এফোঁড়ওফোঁড় হওয়ার মতো যন্ত্রণা হয়। সাফওয়ান তার থুতনি ছেড়েছে অনেকটা ছুড়ে ফেলার মতো তাচ্ছিল্য ভঙ্গিতে। এহেন আচরণে মেয়েটা না চাইতেও ডুকরে উঠে। এক বুক অভিমান নিয়ে ভাঙ্গা গলায় জানায়,
‘ আপনি আর কখনো আমার কাছে ফিরে আসবেন না। আমি যদি আপনার বিরহে মরেও যাই, তবুও দেখতে আসবেন না। ‘
সাফওয়ানের জবাব নেই। না দেখেই আন্দাজ করলো, সায়েরী বেরিয়ে গিয়েছে বাড়ি থেকে।
বিক্ষিপ্ত মনে সে আশেপাশে যা পেলো তা-ই আছড়ে ফেললো ফ্লোরে। লণ্ডভণ্ড করলো সাজানো গুছানো বাড়িটা৷ বুকের উঠানামা গভীর। কিছুতেই মেজাজ শান্ত হচ্ছে না। এই রাগে সায়েরীকে ভস্ম করে দিতে পারলে শান্তি পেতো বোধহয় সে।
এমন তিরিক্ষি মেজাজ নিয়েও কি যেনো ভেবে সে ছুটে গেলো বাহিরে। কলেজ রোডের দিকে হুড তোলা রিকশায় আবছায়া দেখলো সায়েরীর ব্যাগের, ইউনিফর্মের। মেয়েটা এভাবেই ভীষণ অগোছালো স্বভাবের। আজকের এমন বিক্ষিপ্ত মানসিকতা নিয়ে একা একা চললে নিশ্চিত কোন অঘটন ঘটিয়ে ছাড়বে। সাফওয়ান রিস্ক নিতে চাইলো না। ছুটে এলো ঘরে। নিজ কামরা হতে গাড়ির চাবি নিয়ে পুণরায় বেরিয়ে গেলো। সে যতক্ষণে গাড়ি বের করে রওনা দিয়েছে, ততক্ষণে সায়েরীর রিকশাটা অনেক দূর পৌঁছে গিয়েছে।
সময় বরাবর দশটা। কলেজ গেইটের সম্মুখে মিলিত হয়েছে নুহাশ এবং আয়ান-তোহা। তারা ভেতরে ঢুকতে গিয়েও খানিক দূর হতে রিকশায় বসা সায়েরীকে লক্ষ্য করে থেমে যায়। দলে দলে স্টুডেন্ট ঢুকছে, রাস্তায় অসংখ্য গাড়ির আনাগোনা। মোটামুটি ভালোই কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ। অন্যদিক হতে সাফ্রিনের গাড়িও এসে থেমেছে। সে বেরিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে।
সায়েরীর মাথা টনটনে ব্যথায় অসহ্যরকম পীড়া দিচ্ছে। চোখ,মুখ ফুলে ভয়াবহ অবস্থা। রিকশা থামতেই সে আশপাশ না দেখে নেমে গেলো রাস্তায়। বিপরীত দিক থেকে তীব্র গতিতে ছুটে আসা একটি বাইক হঠাৎই সায়েরীকে দেখে তড়িৎ গতি কমাতে চাইলো,গাড়ি ঘুরাতে চাইলো। কিন্তু ঘটনা এতোটাই দ্রুত ঘটে গিয়েছে যে বাইক চালক বিন্দুমাত্র গতি কমাতে সক্ষম হলো না। কাছাকাছি বাইকের আওয়াজ শুনে শূন্য চোখে সেদিক ঘুরে দাঁড়ানো মাত্র আকস্মিক বাইকের তীব্র ধাক্কায় সায়েরী ছিটকে পড়লো ৪ ফুট দূর রাস্তার কিনারে। বড়সড় পাথরের সঙ্গে প্রবল জোরে আঘাত পেলো উদরে। পিছঢালা রাস্তায় থেতলে গেলো মুখশ্রীর, হাতে,পায়ের মসৃণ ত্বক।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় চারপাশ এক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে পড়লো। ভেসে এসেছিলো কেবল সায়েরীর দম ফাটা আর্তনাদ। পরক্ষণেই হইচইপূর্ণ হয়ে উঠলো পরিবেশ। গেইটের কাছে দন্ডায়মান তিন বন্ধু বান্ধবের দুনিয়া থমকে গেলো বোধহয়। সর্বপ্রথম নিজ হুশজ্ঞান হারিয়ে,কাঁধের ব্যাগ ছুড়ে ফেলে সায়েরীর নামে চিৎকার করে উঠে ছুটে গেলো আয়ান। পরপরই নুহাশ,তোহা,সাফ্রিন তিনজনে দিকবিদিকশুন্য হয়ে দৌঁড়ে গেলো সেদিকে৷ সাদিফের সঙ্গে তারই গাড়িতে করে আসা নাজরাত ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলো বলে প্রথমে লক্ষ্য করেনি কিছু। কিন্তু সাদিফ হতবিহ্বল হয়ে, হাহাকার করে উঠতেই অজানা ভয়ে কেমন কেঁপে উঠলো মেয়েটা। যখনই ঘটনা সম্পর্কে অবগত হলো, বাধভাঙ্গা কান্না নিয়ে ব্যাগপত্র ফেলেই ছুটে গেলো সায়েরীর কাছে।
কোলাহল বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। ক্ষনিক পূর্বে নিজ গাড়িটি কোন রকমে পার্ক করে মাত্র চার কদম এগিয়ে আসা সাফওয়ানের পদচারণ সেখানেই স্থির হয়ে গেলো। চোখের সামনে তার ছোট্ট, নাজুক প্রেয়সীর দেহটি অমন বাজেভাবে ছিটকে পড়তে দেখে তার জগৎ ঘুরে গেলো। আর্তনাদ টুকু শুনে সে প্রাণ হারালো যেনো। অনুভূতিহীন চোখে দেখলো, রাস্তায় কিনারায় বড়সড় পাথরের উপর পেটে চাপ পড়ার দুয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সায়েরীর সফেদ ইউনিফর্মের কোমরের নিচের দিকে অংশ রক্তে ভিজে রক্তিম হয়ে উঠেছে। ছোট্ট দেহটি ছটফট করছে তীব্র যন্ত্রণায়। সাফওয়ান এগোতে পারলো না। এই রক্তে মাখানো দেহটি বুকে জড়ানোর নূন্যতম সাহসও নেই তার। তার বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় খিচে যাচ্ছে। অসহ্যরকম ব্যথায় বুক চেপে ধরে সে। রক্তিম চোখে দেখে আদুরে প্রেয়সীর বিধ্বস্ত দেহ। কানে বাজে ক্ষণিক পূর্বে বলা সায়েরীর অভিমানী কন্ঠ,
‘ আমি যদি আপনার বিরহে মরেও যাই, তবুও দেখতে আসবেন না। ‘
ধরিত্রীর বুকে গুটি কয়েক সৌভাগ্যবান/ সৌভাগ্যবতী ব্যক্তি থাকে, যাদের প্রতি দুঃখ-সুখে গভীর ভাবে প্রভাবিত হয় দূরের কিছু আপনজনেরা। রক্তের সম্পর্কের না হয়েও যারা একে অপরের খাতিরে প্রাণ বাজি রাখার মতো ক্ষমতা রাখে। এই সৌভাগ্যবতী মানুষগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে সায়েরী নামক অষ্টাদশী একজন। সৃষ্টিকর্তা বোধহয় তার ভাগ্যে একের পর এক বিরহ যন্ত্রণা লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে মায়ায় পড়েছিলেন। তাই তো, তার প্রতি আঘাতের উপশম হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন বন্ধু নামক এক দল নিঃস্বার্থ কিশোর-কিশোরীকে। পরিবারের বাহিরে যাদের ছায়াতলে রয়েছে সায়েরীর স্বস্তি, শান্তি,সুখ। বিপরীত পক্ষের অনুভূতি বুঝি সায়েরীর চেয়েও গাঢ়। তাইতো, প্রতিবার মেয়েটাকে এমন আঘাতপ্রাপ্ত, ভঙ্গুর অবস্থায় দেখে বন্ধুরা সব দিশেহারা হয়ে উঠে। মন-মস্তিষ্ক খেই হারায়। দিকবিদিকশুন্য হয়ে পড়ে৷ ব্যতিক্রম হলো না আজও। নাজুক মেয়েটাকে ওমন রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করতে দেখে সকলের কলিজা মোচর দিয়ে উঠেছিলো। কীভাবে যে ত্রিশটি মিনিট সায়েরীর আর্তনাদ গুলো সহ্য করে হাসপাতালে নিয়ে পৌঁছেছে তারা-ই জানে। কাকতালীয় ভাবে জাদিদের কর্মরত হাসপাতালেই এসেছে তারা। বর্তমানে ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট এর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে সায়েরীকে। কোলাহল পূর্ণ করিডরে ছন্নছাড়া ভাবে দাঁড়িয়ে আছে বন্ধুরা সকলে। মেয়ে তিনজনের চোখে জল। নুহাশ দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ফ্যাকাসে মুখে দাঁড়িয়ে। তার ঠিক পাশেই কঠোর চিত্তে দাঁড়িয়ে ছিলো আয়ান। আপনমনে অনেক কিছু কল্পনা ঝল্পনা করে সে ফোঁসফোঁস নিশ্বাস ছাড়ে। ভরাট গলায় হঠাৎই বলে উঠে,
‘ সায়ু কাঁদছিলো কেনো? ‘
অবিলম্বে উপস্থিত পাঁচ বন্ধু-বান্ধব এবং সাদিফের নজর স্থির হয় আয়ানের দিকে৷ কথাটির মানে বুঝে উঠতে পারে না তারা। তাকিয়ে রয় প্রশ্নবিদ্ধ চোখে। তোহা এবং নুহাশের দিক তাকিয়ে আয়ান পুণরায় বলে উঠলো,
‘ তোরা দেখিসনি সায়ু রিকশাতে বসা অবস্থাতেই কাঁদছিলো? ‘
সহসা মনে পড়ার মাথা দোলাল দুজনে। সাফ্রিন,নাজরাত এবং সাদিফ চমকে উঠলো তা দেখে। সায়েরী এক্সিডেন্ট এর পূর্ব হতেই কাঁদছিলো? কিন্তু কেনো? সাফ্রিন মনের উদ্বেগ মুখে প্রকাশ করামাত্র আয়ান পূর্বের চেয়েও অধিক মেজাজ হারালো যেনো। কড়া চোখে সাফ্রিনের দিকে তাকিয়ে সে কিড়মিড়িয়ে বলে উঠলো,
‘ কেনো’র উত্তর তোর ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নে। এতগুলো দিন ধরে মেয়েটা ডিসটার্ব হয়ে আছে। আজ না বলাতেই কলেজে এসেছে, তাও কিনা রিকশায় বসে কাঁদছিলো। ওমন চোখ মুখ ফুলিয়ে ওকে আর কে কাঁদাতে পারে জানিস না তোরা? ‘
আয়ানের এমন ক্ষিপ্ত সুরে উপস্থিত সকলে বেজায় চমকে উঠলো। অবিলম্বে দৃষ্টি গেলো অদুরে। বদ্ধ কেবিনের সম্মুখে দেয়াল ঘেঁষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা মানবটার দিকে স্থির হলো তাদের অসন্তুষ্ট দৃষ্টি। যার গায়ের আকাশী নীল টি-শার্টে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ লেগে। উষ্কখুষ্ক চুল এবং রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখখানা দেখে সাফ্রিনের মায়া হলো ভীষণ। সে একটুখানি সাফাই গাইতে চাইলো,
‘ তোর হয়তো ভুল হচ্ছে,আয়ান। ভাইয়া কখনো চাইবে না এভাবে সায়ু’র এক্সি… ‘
‘ তোর ভাই কখন কি চায় সেটা সে নিজে বুঝে? তার চাওয়া না চাওয়ার দ্বায়ভার সবসময় অন্যরা কেনো নিবে সাফা? তুই দেখিসনি তোর ভাই ও উপস্থিত ছিলো সেখানে? সব ঠিক থাকলে ওরা আগের মতো একসঙ্গে এলো না কেনো? সায়ুর গাড়ির পেছন পেছন তোর ভাইয়ের ছুটে আসার কি প্রয়োজন, হ্যাঁ? সে চিনে না মেয়েটাকে? জানে না ও কতোটা কেয়ারলেস? এতগুলো মাসেও বুঝেনি সায়ু তোর ভাইয়ের উপর কতোটা দুর্বল? তবুও মেয়েটাকে এমন কষ্ট দেওয়ার মানে টা কি? বল আমাকে? ‘
সাফ্রিনের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই চেঁচিয়ে উঠলো আয়ান। করিডরে প্রতিধ্বনিত হলো তার ভরাট কন্ঠস্বর। একজন স্টাফ এসে সতর্ক করে গেলো যেনো চেঁচামেচি না করে। আয়ান তখনও ফুঁসছে। তার এতগুলো কথায়-ও সাফওয়ানের প্রতিক্রিয়া না দেখে সে আরও বেশি রাগান্বিত হলো। তেড়েমেড়ে যেতে নিয়ে বলে উঠলো,
‘ সায়ু ওভাবে কেনো কাঁদছিলো জানতে চাইছি আমি.. ‘
হঠাৎ প্রতিক্রিয়ায় বন্ধুরা চমকে উঠে৷ আয়ান দুই কদম বাড়াতেই পেছন থেকে তাকে ঝাপটে ধরে তোহা,সাফ্রিন। নুহাশ সম্মুখে দাঁড়ায় বাধা হয়ে৷ এমন বিগড়ানো পরিস্থিতিতে সাফ্রিনের মতো শক্ত মনোবলের মেয়েটা নিজেকে আর শক্ত রাখতে পারলো না। আয়ানের হাত টেনে ফুঁপিয়ে উঠলো,
‘ প্লিজ ভাইয়ার সাথে ঝামেলা করিস না, দোস্ত। আমি রিকুয়েস্ট করছি, প্লিজ। ‘
আয়ান মহা অতিষ্ঠ হয়ে তিনজনের মধ্যে থেকে ঝাটকি মেরে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে। চড়া গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমি কিছু না বললেই সত্যটা মিথ্যে হয়ে যাবেনা, সাফা। আমাদের সায়ু মোটেও এমন ছিলো না। তোর ভাই ওর অনুভূতি নিয়ে পুতুলের মতো খেলছে। যখন তখন মেয়েটাকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিচ্ছে। আর আজ কি হলো দেখছিস না তোরা? এক্সিডেন্ট টা যেভাবেই হোক না কেনো। এটার দায়ভার ও তোর ভাইয়ের। হি ইজ সাচ অ্যা কার্স ইন সায়ু’স লাইফ!! ‘
শেষের বাক্যটুকুর জোর এতো বেশি যে বেশ কয়েক হাত দূরে শূন্য মস্তিষ্কে দন্ডায়মান মানবটার বলিষ্ঠ অবয়ব, বক্ষস্থল সব কেমন কেঁপে উঠলো। ভীষণ বাজেভাবে কানে বিঁধল আয়ানের উচ্চারিত এক একটি বাক্য। রক্তিম চোখের পাতা কাঁপলো অবচেতনে। মাথা উঁচালো সে। মাত্রাতিরিক্ত রক্তিম,ঝাপসা নয়নে দেখলো উল্টো দিকে করিডরের পথ ধরে হেঁটে চলে যাওয়া আয়ানকে। তার ঠিক পেছনেই ছুটে চলে তোহা। সাফওয়ান পুণরায় নজর ফিরিয়ে দৃষ্টি স্থাপন করে বদ্ধ কেবিনের দিকে। কতক্ষণ হয়ে গেলো। এখনো ভেতর থেকে কেউ বেরিয়ে আসছে না কেনো! সব ঠিক আছে, তার সুবহা সুস্থ আছে বলে মনটা একটু শান্ত করছে না কেনো?
ভাবনার মাঝে হঠাৎই দরজা খুলে গেলো। তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে উঠলো সাফওয়ান। জাদিদ সহ অন্য দুজন মেইল এবং ফিমেল ডক্টর বেরিয়ে এসেছে দেখে পেছন হতে নাজরাত,সাদিফ,নুহাশ এবং সাফ্রিনও এগিয়ে আসলো উৎসুক হয়ে। সাফওয়ান কতক্ষণ ধরে অপেক্ষায় ছিলো ডাক্তারদের। কিন্তু এই মুহুর্তে মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলতে পারলো না। তার কন্ঠ ভারি কোন পাথরের নিচে চাপা পড়েছে যেনো। শত চেয়েও একটি মাত্র শব্দ বেরোলো না মুখ দিয়ে। তার বিপরীতে সায়েরীর বন্ধুরা-ই উদ্বেগ প্রকাশ করলো। একের পর এক প্রশ্ন করলো সমন্বয়ে। ফিমেইল ডাক্তারটি আশ্বত গলায় প্রতিউত্তর করলেন,
‘ শি ইজ আউট অব ডেঞ্জার নাও। ‘
একটিমাত্র বাক্যে বক্ষ জুড়ে শীতলতা বয়ে চললো সকলের। দীর্ঘক্ষণ যাবত বুকে বিধে থাকা ভারী শ্বাসটি ফেললো শব্দ করে।
‘ পেশেন্টের ফ্যামিলির কে আছেন? উই নিড টু টক। ‘
পুণরায় ভেসে এলো পুরুষ ডাক্তারটির কন্ঠ। এতক্ষণে গিয়ে সকলের টনক নড়লো যেনো। সায়েরীর এক্সিডেন্ট, হাসপাতালে আনার পরমুহূর্তেই এত হাঙ্গামা সব মিলিয়ে কারো জ্ঞান কাজ করলো না পরিবারকে জানানোর। সকলে নাজরাতের দিকে চাইতেই সে দ্রুত হাতে মোবাইল বের করলো।
‘ ফ্যামিলি মেম্বারদের কেউ আসেনি? ‘
‘ আমি আছি। ‘
ডাক্তারের প্রশ্নের পিঠে তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো সাফওয়ান। সকলে কৌতুহলী চিত্তে মাথা উঁচিয়ে তাকালো তার দিকে। এমন দাম্ভিক কন্ঠে এই প্রতিউত্তর কেউ বোধহয় আশা করেনি। জাদিদ সহ অন্য দুজন ডক্টর বিশেষ কোন প্রশ্নে গেলেন না। “আমাদের সঙ্গে আসুন” বলেই তারা রওনা হলো সম্মুখে৷ তাদের ওমন গম্ভীর মুখ দেখে সাফওয়ানের বুকের মাঝে ঢিপঢিপ করে উঠে। পুণরায় ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় কেবিনের দিকে। অতঃপর, রওনা হয় ডাক্তারদের পিছু পিছু। নাজরাত তখন আবরারকে ফোন করছিলো। মেহরিন বেগমকে সরাসরি এই খবর দেওয়ার সাহস হচ্ছে না তার। কিন্তু আবরারের মোবাইলের সংযোগ না পেয়ে সে বাধ্য হয়ে নিজ মা’কে ফোন দেয়। কথা শেষে নিজেকে আর দমাতে পারে না। ছুটে যায় সাফওয়ান এবং ডাক্তারদের গমন পথের দিকে।
নাজরাতের মা,বাবার সঙ্গে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন সায়েরীর বাবা-মা। লক্ষ্য করে দেখা গেলো মেহরিন কপালের ডান পাশে তাজা ক্ষত। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত জমেছে তাতে। অত্যন্ত দুর্বল হৃদয়ের নারীটি মেয়ের এক্সিডেন্টের খবর শুনেই মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। সিড়ির কোণায় কপাল কেটে গিয়ে সেই রক্তাক্ত অবস্থায় ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। আবরার সহ তার বাবা,মা আজ ভোরে তার নানা বাড়ির উদ্দেশ্যে গ্রামে রওনা দিয়েছে। নেটওয়ার্ক জনিত সমস্যার কারণে তাদের আর কিচ্ছুটি জানানো হলো না। ঘরের দায়িত্বশীল ছেলেটা না থাকায় সায়েরীর বাবাকে দেখালো প্রচন্ড রকমের অসহায়। নরমাল কেবিনে শিফট করার পর তারা যখন সায়েরীর সঙ্গে দেখা করতে গেলো। আদরের মেয়েটার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে পূর্বের চেয়েও বেহাল দশা হলো মেহরিন বেগম এবং সোলাইমান সাহেবের। মেয়ের হাত জড়িয়ে সোলাইমান সাহেব বাচ্চাদের মতোন কেঁদে ফেললেন। মেহরিন বেগমের অবস্থা তখন আরও করুণ। নাজরাত, তার মা এবং তোহা-সাফ্রিন চারজনে মিলেও উনাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। কেবিনজুড়ে হুড় উঠলো কান্নার। উপস্থিত প্রতিটি সদস্যদের অশ্রুসিক্ত নয়ন বুঝিয়ে দিচ্ছে, চেতনাহীন রমনীটি সকলের হৃদয়ের কতোটা কাছের।
হাসপাতালের তৃতীয় তলায় দক্ষিণ দিকে ছোট্ট একটি বারান্দা রয়েছে। আধভাঙ্গা টুল এবং অপ্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী পড়ে আছে অবহেলায়। অপরিষ্কার টুলের উপর নিশ্চুপ হয়ে বসে রয়েছে সাফওয়ান। দীর্ঘক্ষণ যাবত শূন্য চোখে তাকিয়ে রয়েছে ধুলো জমা টাইলসের দিকে। তার চোখজোড়া মাত্রাতিরিক্ত রক্তিম। অসম্ভব রকমের ফুলো। নাকের ডগাটি টকটকে লাল। মাথা নিচু করে বসে থাকা অবস্থাতেই সে নিজ দু-হাত মেলে ধরে চোখের সামনে। তালু জুড়ে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের সুক্ষ দাগ। কালসিটে হয়ে আছে ফর্সা হাতের তালু। পুণরায় রক্তমাখা হাত জোড়া দেখে সাফওয়ানের দেহ ঝংকার দিয়ে উঠে। অদ্ভুত ভাবে কাঁপে ভেতরটা। এই রক্ত তার সুবহার! চোখে ভাসে রক্তে মাখা অবয়বটি। কত রক্ত ঝরেছিলো ইয়ত্তা নেই কোন। এই চব্বিশ বছরের জীবনে সাফওয়ান বহু ছেলেপেলের রক্ত ঝরিয়েছে। অনেক গুরুতর আঘাত নিজেও সহ্য করেছে। কিন্তু আজকের মতোন এমনভাবে বুক কাঁপেনি। রক্ত দেখে এমন দেহ হীম হয়ে আসেনি। আজকের পূর্বে কারো আর্তনাদে মরণ যন্ত্রণার মতো বুক ব্যথা হয়নি। ঐ মুহূর্তটি তাকে নরক যন্ত্রণার সাধ দিয়েছে আজ। রাস্তার কিনারে তীব্র আঘাতে ছটফট করতে থাকা নাজুক দেহটির যদি তখন শ্বাস থেমে যেতো, তবে তৎক্ষনাৎ বুকের এই তীব্র যন্ত্রণা দ্বিগুণ সাফওয়ান ও বোধহয় নিঃশেষ হতো পৃথিবীর বুক থেকে। এই অনুভূতি যে অসহ্যকর ভীষণ। এই যন্ত্রণা সহ্য সীমাহীন।
কাঁধে কারো স্পর্শ পেতেই সাফওয়ানের ঘোর কাটে। গলার জমাট বাঁধা ব্যথাগুলো নিয়ে ঢোক গিলে সে। না দেখেও আন্দাজ করে, সাদিফ এসেছে। ধুলো জমা টুলের উপর রুমাল বিছিয়ে সেথায় বসলো সাদিফ। পরখ করলো সাফওয়ানকে৷ এতোটা মর্মান্তিক একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও ছেলেটাকে কাঁদতে দেখেনি কেউ। অন্যদের মতোন দিশেহারা, ছটফট করতে দেখা যায়নি তাকে। কিন্তু এই মুখ,এই চোখ দেখে যে কেউ বুঝে ফেলতে পারবে কতোটা উদ্বেগ জমে আছে বুকের ভেতরটায়। সাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেললো সাফওয়ানের অবস্থা অবলোকন করে। সায়েরীর পরিবারের লোকজন আসার পরপরই সাফওয়ান এখানটাই এসে বসেছে, এখনও উঠার নাম নেই। এমন মূর্তি হয়ে কতক্ষণ বসে থাকবে? অন্তত কথা বলুক, কারো সঙ্গে শেয়ার করুক মনের কথাগুলো।
‘ সায়েরীকে দেখতে যাবি না? ‘
……..……..
‘ দেখতে না চাইলে বাড়ি যা। এই অবস্থায় এখানে
এইভাবে এখানে কতক্ষণ বসে থাকবি? ‘
…………….
‘ সাফওয়ান?? ‘
……………..
সাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে চুপ রইলো কিয়ৎক্ষণ। অতঃপর হঠাৎই বলে উঠলো,
‘ আয়ান তখন কথাগুলো কেনো বলেছিলো? তোর আর সায়েরীর মাঝে কোন ঝামেলা হয়েছে কি? ‘
………….
‘ তুই অনেক দিন ধরে সিলেটে আছিস। কোন একটা কোম্পানিতে ইনভেস্ট করেছিস, এমন কিছুর ব্যাপারে শুনেছিলাম আমি। জানার জন্য কল দিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাক করিসনি কেনো? ‘
‘ তখন শুনে মনে হয়েছিলো গ্রেজুয়েশন শেষের পথে তাই বিজনেসে হাত বাড়াতে চাচ্ছিস। কিন্তু এখন সাফা আর নাজরাতের কথা শুনে মোটেও তা বলে মনে হচ্ছে না। কি হয়েছে? তোর কীসের অভাব যে এভাবে একটা লস খাওয়া কোম্পানিতে ইনভেস্ট করে দিনরাত খেটে মরতে হচ্ছে? তার চেয়েও বড়ো কথা, ক্যারিয়ার লাইফ গড়তে গিয়ে তোর লাভ লাইভ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে কেনো, হ্যাঁ? এসবের মধ্যে সায়েরীর ফল্ট কোথায়? হোয়াই ডাজ শি হ্যাভ টু সাফার লাইক দিস, সাফওয়ান? ডাজ শি রিয়েলি ডিজার্ভ অল দিস? ‘
এতোক্ষণ যাবত নির্লিপ্তে সাদিফের সব কথা শুনে গেলো এই পর্যায়ে চোখ খিচল সাফওয়ান। মুষ্টিবদ্ধ হলো রক্তাক্ত হাত দুটো। চামড়ায় টান পড়তেই ডান হাতের ক্ষতটুকু তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা দিলো। রক্ত জমতে লাগলো পুণরায়। বুকের যন্ত্রণার কাছে শারিরীক যন্ত্রণা টুকু বড্ড ফিকে পড়ে গেলো তার কাছে। লাল লাল চোখ দুটো টলমল করে উঠলো। প্রথমত সকালে সায়েরীর বলা কথাগুলো, পরবর্তীতে আয়ানের দেওয়া অপবাদ। এবং এখন সাদিফের মুখ থেকেও একই বিষয়টি শুনতে পেয়ে সাফওয়ান নিজ বিবেক হারিয়ে বসলো যেনো। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা পর সে মুখ খুললো। ভঙ্গুর কিন্তু গভীর- ভরাট কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,
‘ শি ডাজন’ট ডিজার্ভ অল দিস, ভাই। সুবহা ডাজন’ট ইভেন ডিজার্ভ মি। মনে হচ্ছে আমি ওর জীবনের জঘন্যতম কালো ছায়া। আমি না থাকলেই বরং সে ভালো থাকবে। ‘
এক একটি শব্দের ভার যেনো কয়েক মণ। বাক্যগুলো উচ্চারণ করতেও সাফওয়ানের বুকের ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত হলো। কন্ঠের কম্পনটুকু স্পষ্ট প্রকাশ পেলো। সাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাফওয়ানের পিঠে হাত রাখলো। গম্ভীর সুরে তৎক্ষনাৎ বিরোধ জানালো,
‘ পাগল নাকি তুই? অন্যের কথার রেশ ধরে ইমম্যাচিউর আচরণ করবি না, সাফওয়ান। তোর কাছ থেকে এই ধরনের কথা আশা করিনি আমি। ‘
‘ তুই ডিসটার্ব হয়ে আছিস। সময় নে, রাগটা একটু কমা। এমন তাড়াহুড়ো করে কোন ডিসিশন নিলে সব তো এভাবে বিগড়ে যাবেই। আর সায়েরীকে আমাদের চেয়েও ভালো তোর জানার কথা। বাচ্চা মেয়েটার সঙ্গে রাগ না দেখিয়ে একটু ভালোভাবে বুঝালেই তো হচ্ছে। তোর রাগ,জেদের জন্যেই সিচুয়েশনটা এতো বেশি কমপ্লিকেটেড হয়ে গিয়েছে আজ। নিজেদের সম্পর্কে একটু সময় দে, ভাই। হুট করে সব শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলে আজীবন আফসোস করতে হবে। একটু শান্ত হয়ে ভাব। ‘
একটু থেমে ফের শীতল গলায় বললো,
‘ আর কারো কথায় মনযোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র সায়েরীর কথাটা ভেবে বল, সায়েরী কি সত্যিই মনে করে যে সাফওয়ান ভাই ওর জীবনের অভিশপ্ত কালো ছায়া? নাকি সেও জানে যে সাফওয়ান হলো সায়েরীর জীবনের সেই রংধনু, যার সাত রঙে ওকে সবসময় রাঙা হয়ে থাকতে দেখেছি আমরা? ‘
ভাবনা,চিন্তা,সিদ্ধান্ত এই তিনটির মাঝেই তো বিগত কয়েক সপ্তাহ যাবত ফেঁসে রয়েছে সাফওয়ান। তার পরিকল্পিত জীবনচক্র অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে। যা হতে পারে বলে কিঞ্চিৎ ধারণা তার ছিলো। কিন্তু তাকে এতো বাজেভাবে দুর্বল করে দিবে, এই ধারণা ছিলোনা। নিজেকে গড়ে সুবহাকে হাসিল করা যুদ্ধে নেমেছিলো সে। কিন্তু আপন জেদে ডুবে থেকে সে ভুলে গিয়েছিলো, তার প্রিয়সী যে কেবল তার সান্নিধ্যেই আজীবন থেকে যেতে প্রস্তুত। মেয়েটাকে বুঝেও যেনো বুঝেনি সে।
মনে পড়লো সকালে ঘটা সুখ নীড়ের ঘটনা সব। নিজের এই রাগ্বত স্বভাবের উপরেরই রাগ জমলো ভীষণ। এতোটা ব্যাকুল হয়ে ছুটে এসেছিলো কি পুণরায় এমন বাজেভাবে মেয়েটাকে আঘাত করার জন্য!
গলাটা ভারি হলো পুণরায়। শক্ত করে ব্যথাযুক্ত ঢোক গিলে অনুভূতি সব গিলে ফেললো সে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মাথা উঁচু করলো। জ্বালা করে চোখ তুলে তাকালো সিলিংয়ের দিকে। বুক ফুলিয়ে দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ত্যাগ করে কেমন আকুল কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ সুবহাকে একটাবার দেখার সুযোগ করে দাওনা, ভাইয়া। ‘
সাদিফ চকিতে ফিরে তাকালো। জীবনে প্রথম বারের মতো সাফওয়ানের আকুতি শুনেছে সে। এমন ভারিক্কি,ভঙ্গুর, আকুতিভরা কন্ঠটা শুনে সাদিফের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো। ভালো সেও বাসে একজনকে। সায়েরীর স্থানে আজ নাজরাত থাকলে সাদিফের অবস্থা কেমন হতো তা ভেবে নিজেই অস্থির হয়ে উঠলো সে। বুঝলো, সাফওয়ানের ব্যাকুলতা কতখানি গভীর। সে আশ্বস্ত ভঙ্গিতে পুণরায় সাফওয়ানের কাঁধে হাত রাখলো। বললো,
‘ রাত হওয়ার আগে সায়েরীর কেবিনে যাওয়া সম্ভব না। ওর ফ্যামিলির সবাই আছে এখন। আমি নাজরাতকে বলে ম্যানেজ করবো সব। কিন্তু এই কয়েক ঘন্টা একটু অপেক্ষা কর। ‘
সাফওয়ান জবাব দিলোনা কোন। সে নিজেও বুঝতে পারছে, এই মুহুর্তে সায়েরীকে একাকী দেখতে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। কয়েক ঘন্টা! হাহ! এক একটা মিনিট-ই তো যুগ বলে মনে হচ্ছে তার কাছে।
‘ তুই আমার সঙ্গে আয়। বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হ। আর এসব কি? হাতের এই অবস্থা করেছিস কীভাবে? এটাতে ব্যান্ডেজ করিয়ে বাড়ি চল আমার সঙ্গে। সন্ধ্যায় আসবি আবার। আমি বললাম তো সুযোগ করে দিবো। উঠ.. ‘
সাদিফের জোরাজুরিতে সাফওয়ান বাধ্য হলো বাহিরে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু হাতের কোন চিকিৎসা করলো না। সাদিফ শত বলেও পারলো না ক্ষত জায়গাটা ব্যান্ডেজ করতে। অগত্যা সাফওয়ান কে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেলো সে। সাদিফ খান ভিলার উদ্দেশ্যে গাড়ি চালু করলেও সাফওয়ানের কথানুসারে গাড়ি চললো গ্রীণ ভ্যালির পথ ধরে।
মেহরিন বেগম শারীরিক এবং মানসিক উভয় ভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কপালে ক্ষত, দীর্ঘক্ষণ কান্নাকাটি এবং মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তার ফলে যন্ত্রণায় মাথা ছিড়ে যাচ্ছে। সারাটা দিন নাওয়া খাওয়াও হলো না বিধায় শরীর জুড়ে ভর করেছে দুর্বলতা। এই অবস্থায় হাসপাতালে রাত কাটানো মানে স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হওয়া। সকলে অনেক বলে কয়ে উনাকে বাড়ি পাঠানোর স্বীদ্ধান্ত নিলো। বাড়িতে দেখভালের জন্যেও নেই কেউ। আবরারদের কাছে খবর পৌঁছেছে বেলা পেরিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ। এই ভর সন্ধ্যায় অতো দূর থেকে ছুটে আসাও সম্ভব নয়। পৌঁছাতে ভোর তো হবেই। তাছাড়া আবরারের নানা ভাইয়ের অসুস্থতার খবর শুনেই দেখা করতে গিয়েছিলো তারা। এখন সব ছেড়ে ছুড়ে চলে আসাটাও সম্ভব হচ্ছে না।
বৃদ্ধার কখন কি হয়, কোন ইয়ত্তা নেই। সোলাইমান সাহেব রাতটুকু হাসপাতালে থাকবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু সায়েরীর সঙ্গে একজন মেয়ের প্রয়োজন। মেহরিন বেগমের সঙ্গে নিজ মা’কে বাড়ি পাঠিয়ে নাজরাত জানালো সে রাতটুকু এখানেই কাটিয়ে দিবে। সঙ্গ দিবে সাদিফ। নতুন জামাইকে এমন বিড়ম্বনায় ফেলতে কেউ-ই রাজি হলেন না। কিন্তু সাদিফ-নাজরাতের পিড়াপিড়িতে রাজি হতেই হলো। তারা দুজন থাকছে দেখে অন্য কেউ আর থাকার কথা বললো না। সন্ধ্যা নাগাদ মেয়েরা চলে যাওয়ার পর, রাত ৮টার দিকে সায়েরীর বন্ধুরা সহ বাবা,মামা রাও বিদায় নিলো। পরদিন ভোরে আসতে হবে বলে সকলেই বাড়ির পথ ধরলো দ্রুত। তারা প্রস্থান করার পরেই নাজরাত গেলো সায়েরীর কেবিনে। সাদিফও গেলো সঙ্গে। মেডিসিনের প্রভাবে সায়েরী ঘুমাচ্ছে তখন।
নাজরাত তাকিয়ে থাকে মুখটার দিকে। যতবার দেখছে, ততবার কান্না পেয়ে যাচ্ছে তার। সাদিফ পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে তা টের পেতেই নাজরাত ঘুরে দাঁড়ায়। তার কান্না চোখের থমথমে মুখাবয়ব দেখেই কাছ ঘেষল সাদিফ। গালে হাত রেখে বললো,
‘ আমি জানি সাফওয়ানের উপর তোমার ভীষণ রাগ জমেছে। তোমার জায়গায় আমি থাকলে, কারো কারণে আমার বোনের এমন অবস্থা হলে আমিও চাইতাম না দুজন আর কখনো এক হোক৷ কিন্তু তোমার মতো আমাকে আমার ভাইয়ের দিকটাও তো ভাবতে হচ্ছে। আমি ভালো করেই বুঝি সাফওয়ানকে। ও কারো সামনে প্রকাশ করতে অক্ষম হলেও সত্য এটাই যে, সায়েরীকে সাফওয়ান ভীষণ ভালোবাসে৷ একটা শেষ সুযোগ তো সাফওয়ান অবশ্যই ডিজার্ভ করে তাইনা? তাছাড়া, সায়েরী কি চায় না চায় তা তো জানি না কেউ। ও যদি পুণরায় সাফওয়ানকে মেনে নিতে রাজি হয়, তাহলে আমি তুমি আটকানোর কে? ‘
নাজরাত সবটা শুনলো,বুঝলো। কিন্তু বোন বলেই হয়তো, সাফওয়ানের সঙ্গে সায়েরীকে আর মেনে নিতে পারছে না সে। অদ্ভুত রকমের রাগ লাগছে, সায়েরীর জন্য মায়া হচ্ছে। ভেবেই আবেগে টইটম্বুর হলো দুই চোখ। একবিন্দু জলকণা গড়িয়ে পড়লো মুহুর্তে। সায়েরীর দিকে তাকিয়ে সে ধরা গলায় বললো,
‘ সাফওয়ান ভাইয়ের উপর আমার অনেক বেশি বিশ্বাস ছিলো। মনে হয়েছিলো উনার চেয়ে বেটার কোন জীবনসঙ্গী সায়েরীর জন্য তৈরি-ই হয়নি। কিন্তু এখন সায়ুর এই অবস্থা আমি একটুও মেনে নিতে পারছি না, সাদিফ। তুমি জানো না সায়ু গত দশ পনেরো দিন আগে থেকেই কেমন চুপসে গিয়েছিলো। তোমরা কেউ দেখোনি ও ভেতরে ভেতরে কতোটা ভেঙ্গে পড়েছে। আর আজকে তো.. ‘
নাজরাতের কন্ঠ ভেঙ্গে আসে। কথাগুলো শেষ করতে পারলো না সে। সহসা সাদিফ বুকে টেনে নিলো তাকে। হতাশ চোখে চাইলো সায়েরীর দিকে। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ সায়েরীর উপর নির্ভর করে আছে। অন্যদের শত আপত্তি থাকলেও সাধ্য নেই সায়েরীর কাছ থেকে সাফওয়ানকে দূরে রাখার।
রাত ন’টা তখন। নিস্তব্ধ কেবিনে অর্ধচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে সায়েরী। সে জেগেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। প্রতিটি ইন্দ্রিয় সজাগ হতেই অনুভব হলো সম্পূর্ণ দেহজুড়ে অসহনীয় যন্ত্রণা। উদরে অসম্ভব রকমের পীড়া। পাথরের সঙ্গে আঘাত লেগেছে কোমরের ডান পাশের হাড়ে। ফলে সেখানটা ব্যথায় টনটন করছে। জ্বালাপোড়া করছে হাতে,পায়ের ছিলে যাওয়া অংশে। মুখের বাম পাশটা মাত্রাতিরিক্ত জ্বলছে। সায়েরী বা হাত উঁচিয়ে ছুঁয়ে দিলো সেথায়। ক্ষত অংশে স্পর্শ লাগলে তৎক্ষনাৎ তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা দিলো। চোখ খিচে মুখ দিয়ে অস্পষ্ট আর্তনাদ বেরুতে চাইলো। কিন্তু ঠোঁট জোড়া নাড়তেই টান পড়লো গালে। দুই ঠোঁট সংলগ্ন অংশ এবং নিচের ঠোঁট কেঁটে গিয়েছে। রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে সেথায়। সায়েরী সহ্য করতে পারলো না একসঙ্গে এতো এতো যন্ত্রণা। শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকু সঞ্চয় করে অস্পষ্ট আর্তনাদে ডেকে উঠলো, ‘ আম্মুওওও! ‘
সহসা কেবিনের দরজা খোলার শব্দ হলো। বেশ হম্বিতম্বি ভঙ্গিমায় কেউ দরজা খুলেছে। চঞ্চল পদচারণ থামিয়েছে দরজায় কাছটায়। মেহরিন বেগম এসেছে নিশ্চয়ই? সায়েরী দুর্বল ঘাড় ফিরালো দরজার দিকে। ঝাপসা চোখে চিরপরিচিত পুরুষালি অবয়বটি নজরে আসলেই এক পলকের জন্য থমকালো সায়েরী। কিয়ৎ ক্ষণ তাকিয়ে রইলো অনুভূতি শূন্য দৃষ্টিতে। অতঃপর হঠাৎই হৃদস্পন্দনের গতি বাড়লো। মনিটরে তা স্পষ্ট দেখতে পেলো সাফওয়ান। টুপ টুপ অশ্রু জলে সায়েরী বালিশ ভিজালো। দৃষ্টি ঘুরালো দ্রুত। তীব্র ব্যথা নিয়েও পুণরায় ঠোঁট নেড়ে উচ্চ কন্ঠে ডাকতে উদ্যত হলো,
‘ আ..আম্মুওও! ভাইয়া? ‘
তৎক্ষনাৎ দরজা লাগালো সাফওয়ান। সেই শব্দে সায়েরীর ভেতরের ধুকপুকানি বাড়লো যেনো। উত্তেজিত হলো ভীষণ। সাফওয়ানকে লম্বা কদমে তার কাছে এগিয়ে আসতে দেখেই তীব্র জেদি স্বত্তাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো তার। ক্যানোলা লাগানো হাতখানা উঁচিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় শাসিয়ে উঠলো,
‘ একটুও কাছে আসার চেষ্টা করবেন না। নয়তো এটা খুলে ফেলবো এক্ষুনি। ‘
অবিলম্বে সাফওয়ান থমকে গেলো বেডের কাছটায়। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো সায়েরীর জেদ। বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিতে চাইলো না সে। মেয়েটার জেদ সম্পর্কে বেশ ভালো জ্ঞান আছে বলেই দাঁড়িয়ে পড়লো তৎক্ষনাৎ। শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আঁধারের মতো নিভু নিভু গলায় ডাকলো,
‘ বোকাপাখি! কথা শুনো.. ‘
এই কন্ঠে পুরনো ক্ষততে মরিচ লাগার মতো অনুভূত হলো সায়েরীর। বুকের ভেতরটা খানখান হলো যেনো। ফিরে তাকানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে শক্তি রইলো না। তার পরিবারের কেউ কি নেই নাকি? কেউ আসছে না কেনো? অভিমানে,জেদে জর্জরিত হয়ে মেয়েটা সত্যিই ক্যানোলা টান মারতে উদ্যত হলো। যেনো এটা খুলে সে নিজেই চলে যাবে এখান থেকে। হঠাৎ প্রতিক্রিয়ায় সাফওয়ান চমকালো ভীষণ। চোখের পলকে এক থাবা মেরে সায়েরীর হাতটা ছাড়িয়ে নিলো অন্য হাত থেকে। কব্জিতে কিঞ্চিৎ জোর প্রকাশ করে চেপে রাখলো বেডের উপর। নিজেও বসলো বেডের অন্যপাশটায়৷ ঝুঁকলো সায়েরীর মুখোমুখি। না চাইতেও চাপা স্বরে শাসাল একটু,
‘ পাগলামি করছো কেনো, সুবহা? কিছু করছি আমি? ‘
সায়েরীর নাজুক দেহটি কাঁপছে নিজের ভেতরের অস্থিরতা টুকু প্রকাশ করতে না পারায়। থুতনি কাঁপছে কান্না চেপে রাখার প্রয়াসে। সাফওয়ানের কাছে বাঁধা পড়তেই ছটফটিয়ে উঠলো সে। নড়তে গিয়ে শরীরের ব্যথায় কুকড়ে উঠলো। একহাত সাফওয়ানের কাছে বন্ধি থাকায় অন্য হাতেই সে সাফওয়ানের বাহু ঠেলে সরাতে চাইলো। ক্রন্দনরত কন্ঠে অভিযোগ করলো,
‘ আপনি কেনো এসেছেন এখানে? ‘
‘ তোমার জন্য। ‘
কথার পিঠে তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো সাফওয়ান। শান্ত,শীতল কন্ঠ তার। দৃষ্টি জুড়ে কেমন এক আকুতি, অসহায়ত্ব। সায়েরী নিজেকে দূরে সরাতে ব্যর্থ হলে রাগে, দুঃখে ফুঁপিয়ে উঠলো। সাফওয়ানকে ঠেলতে থাকা হাতটি দিয়েই মুঠ করে ধরলো টি-শার্টের কলার। ঠোঁট নাড়তে ভীষণ রকমের যন্ত্রণা হওয়া স্বত্তেও সে এলোমেলো সুরে কেঁদে বলে উঠলো,
‘ যখন সুস্থ ছিলাম তখন তো একটুও দেখতে মন চায়নি। এখন কেনো দেখতে এসেছেন? আমার চেহারা কতোটা বাজে দেখতে লাগছে সেটা দেখার জন্য? ‘
‘ এই দেখুন কেমন ছিলে গিয়েছে পুরো মুখ। খুবই বিচ্ছিরি হয়ে গিয়েছি। এখন খুশি হয়েছেন আপনি তাইনা? ছেড়ে যাওয়ার জন্য আর কোন বাড়তি অযুহাত লাগবে না। ভালো হতো যদি এক্সিডেন্টের পরেই আমি মর.. ‘
ক্রন্দনরত কন্ঠটা হঠাৎই হারিয়ে গেলো। কোমলমতির ব্যস্ত অধরযুগল চাপা পড়লো সাফওয়ানের পুরু ওষ্ঠের ভাঁজে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনায় সায়েরী বাকহারা হলো, বিমূঢ় হলো, বিদ্যুৎ স্পর্শের ন্যায় কেঁপে উঠলো সর্বাঙ্গ। তার জখমিত ঠোঁটে সাফওয়ানের শীতল অধর যুগল অধিপত্য জমাতেই তীব্র জ্বলন অনুভব হলো। বিবশ চিত্তে মেয়েটা ঝাপসা চোখে সাফওয়ানের মুখের দিক চাইতেই স্তম্ভিত হলো পুণরায়। সাফওয়ানের চোখজোড়া বুজে আছে। ফুলে ছোট ছোট হয়ে আসা বন্ধ চোখের কোণ হতে একফোঁটা তপ্তাশ্রু নাকের ডগা ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়লো সায়েরীর গালে। এই দৃশ্যে সায়েরী খুন হলো যেনো। গালে উষ্ণ তরলটুকুর স্পর্শ পেতেই অবচেতনে চোখ বুজে ফেললো সে। নিরব অশ্রুতে বালিশ ভেজাল। বিন্দুমাত্র প্রতিবাদের ইচ্ছেশক্তি পেলো না যেনো। শূন্য মস্তিষ্ক বারেবারে আওয়াজ তুললো এই বলে যে, সাফওয়ান ভাই কীভাবে এই রক্তমাখা ঠোঁটে নিজ ঠোঁট ছোঁয়ালো? তার একটুও অস্বস্তি লাগলো না? বিন্দুমাত্র ঘেন্না লাগলো না?
সাফওয়ান গ্রীবা উঠালো ধীর গতিতে। ছাড় পেতেই বুক ভরে শ্বাস টানলো সায়েরী। সাফওয়ান তখনো ঝুঁকে রয়েছে। মাঝে দুরত্ব কেবল ইঞ্চি দুয়েক। দুজনের দীর্ঘ নিঃশ্বাস গুলো মিলেমিশে একাকার হলো। সায়েরী চোখ বুজে ছিলো তখনো। ক্ষতযুক্ত গালে সাফওয়ানের হাতের নরম স্পর্শ পেতেই চোখ মেলে তাকালো সে। বাদামি চোখের টলমটলে দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললেই ভেতরটা কেমন মুচড়ে উঠলো তার। সাফওয়ান তাকিয়েই রইলো সেকেন্ড কয়েক। তার প্রিয় মুখখানার প্রতিটা আঘাত বুকে পুষে নিলো যেনো। পুণরায় গ্রীবা নামিয়ে আনলো সে। কপালে কপালে মিলিয়ে সায়েরীর একহাত টেনে নিলো বুকের বা’পাশে। গলায় জমে থাকা তীক্ষ্ণ ব্যথাগুলো গিলে নিয়ে ভীষণ রকমের ভঙ্গুর কন্ঠে আওড়াল,
‘ আর কক্ষনো মরার কথা মুখে আনবে না, সুবহা। এই দেখো, আমার এখানটা ছিড়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা হচ্ছে। মরে যাচ্ছিলাম আমি.. ‘
সাফওয়ানের সুডৌল বুকের বাম পাশটায় চেপে রয়েছে সায়েরীর নাজুক হাত। বক্ষস্পন্দনের অস্বাভাবিক ধুকপুকানি স্পষ্ট টের পেলো সায়েরী। এতো জোরে লাফাচ্ছে যেনো এক্ষুনি ব্লাস্ট হবে সেটি। একই সঙ্গে অনুভব করলো, সাফওয়ানের দেহটি ভয়াবহ রকমের উষ্ণ। টি-শার্টের উপর দিয়েই উত্তাপ টের পাওয়া যাচ্ছে। সায়েরীর ভেতরটা কেমন বিচলিত হলো। সাফওয়ানের এই কন্ঠ, নিরব অশ্রু, শরীরের এই মাত্রাতিরিক্ত জ্বর দেখে মেয়েটা নিজ রাগ, অভিমান ভুলে যেতে বাধ্য হলো। কিন্তু উদ্বেগটুকু প্রকাশ করতে পারলো না। ফলে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। সাফওয়ানের টি-শার্ট টেনে অবশিষ্ট দুরত্ব টুকু মিলিয়ে ফেলার আর্জি জানালো বিনা শব্দে। সাফওয়ান যেনো বিগলিত হলো এতে। মুহুর্তেই দু’হাতের কোমল স্পর্শে সায়েরীর ছোট্ট দেহটা জড়িয়ে নিলো নিজের সঙ্গে। পিঠের নিচে হাত গলিয়ে যতটুকু সম্ভব বুকের সঙ্গে লেপ্টে নিলো দেহটি। গালে গাল ছুঁয়ে নিভু নিভু গলায় বললো,
‘ আমি ভীষণ স্যরি,বোকাপাখি। তোমাকে এভাবে দূরে সরিয়ে দিতে চাইনি আমি। দূরে যাওয়ার কোন ইনটেনশন ছিলো না আমার। ‘
সায়েরী মুখ ডুবিয়ে রেখেছিলো সাফওয়ানের গ্রীবায়। বলিষ্ঠ দেহটি ঝাপটে ধরতেও হিমশিম খাচ্ছে মেয়েটা। উত্তপ্ত গ্রীবায় মুখ ডুবিয়ে রাখা অবস্থাতেই সে কান্নারত গলায় অভিযোগ করে,
‘ তাহলে কেনো না বলে সিলেট চলে গিয়েছিলেন? এতগুলো দিনে একটাবারও কেনো খোঁজ নেননি? যাওয়ার আগে কেনো যেদিন আমার সাথে ও.. ওভাবে…এতগুলো কথা কেনো শুনিয়েছিলেন? ‘
সাফওয়ানের কাছে একথার জবাব থেকেও যেনো নেই। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একটুখানি মাথা উঁচিয়ে তাকায়। পুণরায় বলে,
‘ অন্যের রাগ তোমার উপর ঝেরেছিলাম,স্যরি আমি। ‘
‘ এজন্যেই না বলে চলে গিয়েছেন?’
‘ হু। ‘
‘ আমাকে একটু দেখতে মন চায়নি? একবারও মনে পড়েনি? ‘
‘ দেখতে মন চেয়েছে বলেই কাল রাতে ছুটে এসেছিলাম। ‘
‘ তাহলে জানাননি কেনো? ‘
‘ সরাসরি দেখা দিতে চেয়েছিলাম।তুমি সুযোগ দাওনি।’
‘ সুযোগ কখন হতো? মামাতো বোনের সঙ্গে বিয়ের আলাপ,আয়োজন করে ফেলার পর? ‘
সাফওয়ান শব্দ করে শ্বাস ফেলে। হতাশ চোখে তাকিয়ে রয়। সায়েরীর জখমিত ঠোঁটে আঙুল ছুঁয়ে বলে,
‘ কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তোমার। তাও এতো কথা বলছো কেনো? ‘
‘ আপনি কথা এড়িয়ে যাচ্ছেন কেনো? ‘
ক্ষণিক পূর্বের ভঙ্গুর কন্ঠটা হঠাৎই কেমন তেজি হয়ে উঠলো। রূপ দেখে সাফওয়ান অসহায় ভাবে মাথা নাড়ে। ইহজীবনে কাউকে কৈফিয়ত না দেওয়া ছেলেটা আজ বাধ্য প্রেমিকের মতো হড়বড় করে বলে যে, তার এবং রিদিতার পরিবার তাদের মতের বিরুদ্ধেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিথ্যে হিসেবে জানালো, রিদিতা নিজেও রাজি নেই। এই নিয়েই সে সাফওয়ানের সঙ্গে কথা বলতে সুখ নীড়ে এসেছিলো। মিথ্যে বলতে বাধ্য হলো সে। তার বাবার পছন্দের ব্যাপারটা জানিয়ে সায়েরীকে চিন্তিত করতে মন সায় দিলোনা। সায়েরী সবটা শুনলো সরু চোখে চেয়ে। সাফওয়ান ভাইয়ের সেই চিপকা চিপকি মামাতো বোন যে বিয়েতে রাজি নেই একথায় বিন্দুমাত্র বিশ্বাস জাগলোনা তার। কিন্তু মুখ ফুটে বললো না কিছু। ঠোঁটের কাটা অংশে বারেবারে টান পড়ায় অসম্ভব জ্বালাতন হচ্ছে। দুর্বল লাগছে শরীর। মেডিসিনের প্রভাবে ঘুম নামছে চোখে। কিন্তু মেয়েটা চোখ বুজতে চাইলো না। সাফওয়ানের শার্ট টেনে চোখ মেলে তাকালো। মলিন গলায় জানতে চাইলো,
‘ আপনি আবারো সিলেটে চলে যাবেন? ‘
কন্ঠটা শুনে সাফওয়ানের ভীষণ রাগ হলো নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তে। কি দরকার ছিলো সিলেটে গিয়েই বিজনেস গড়ার যুদ্ধে নামার? আড়ালে দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেললো সে। শব্দ করে চুমু খেলো সায়েরীর কপালের মধ্যিখানে। বললো,
‘ আমি প্রতি সপ্তাহে একবার করে আসবো। যেতে হবে,বোকাপাখি। আবদার করো না। ‘
সায়েরী মেনে নিলো। থেকে যাওয়ার আবদার সে করলো না। কিন্তু পরক্ষণে চঞ্চল কন্ঠে আদেশ দিলো,
‘ আমাকে রোজ ফোন করতে হবে। ‘
‘ করবো। ‘
‘ তাও দুইবার করে। ‘
‘ আচ্ছা। ‘
‘ রাতে অনেক্ষণ কথা বলতে হবে। যেমনটা বাকিরা বলে, ওভাবেই। ‘
‘ তুমি রাত জাগতে পারবে? ‘
‘ হাহ! ‘ সায়েরী সরু চোখে তাকায়।
‘ আচ্ছা,বলবো। ‘ দ্রুত মাথা দুলাল সাফওয়ান।
‘ যখনই সিলেট থেকে আসবেন, তার পরের একটা দিন শুধু আমার নামের হবে। কোন ব্যস্ততা, কোন বাহানা দেওয়া চলবে না। ‘
‘ মেনে নিলাম,তারপর? ‘
সায়েরী থামে। গভীর কিছু ভাবছে, এমন করেই ডাগরডোগর চোখদুটো মেলে তাকিয়ে রয় সেকেন্ড দুয়েক। অতঃপর, ঠোঁট ফুলিয়ে বলে উঠে,
‘ আমাদের সুখ নীড়ে আর কক্ষনো বাহিরের কোন মেয়ে আসা চলবে না। আসলে আমি একটুও মেনে নিবো না।’
সাফওয়ানের চিকন ঠোঁটের কোন কিঞ্চিৎ প্রসারিত হলো একথা শুনে। চোখের পলকে সে পুণরায় ঝুঁকে এসে শব্দ করে চুমু খেলো সায়েরীর ঠোঁট জোড়ায়। ফিসফিস ছন্দে প্রতিশ্রুতি দিলো যেনো,
‘ সুখ নীড়ে একমাত্র তোমারই আধিপত্য বোকাপাখি। তোমার অনুমতি ছাড়া আর কোন কাকপক্ষীও সেখানে পা মাড়াতে পারবে না। ‘
সায়েরী দুর্বল দেহে স্বস্তি নিয়ে হাসে। হাসতে নিয়ে ঠোঁটে ব্যথা লাগে পুণরায়। সে চোখ খিচলো। ঘুমের তাড়নায় চোখদুটো-ও জ্বালা করছে ভীষণ। শত চেয়েও চোখ জোড়া মেলে রাখতে পারলো না সে। কিন্তু সাফওয়ানের একহাত জড়িয়ে রাখলো ঠিকই। নিভু নিভু কন্ঠেই বললো, ‘ যাবেন না.. ‘
ধরে রাখা হাতটা টেনে চুমু খেলো সাফওয়ান। প্রতুত্তরে জানালো,
‘ তোমার কাছেই আছি। কোথাও যাচ্ছি না। ‘
সায়েরী নিশ্চিন্তে ঘুমালো। তার ভারী নিশ্বাস টের পেতেই সাফওয়ানের মুখের ক্ষীণ হাসিটুকু মিলিয়ে গেলো। আঁধারে নিমজ্জিত হলো গম্ভীর মুখখানা। রক্তাব চোখজোড়ায় কেমন এক গুপ্ত উপসনার আভাস। বুকজুড়ে অস্থিরতা। সায়েরীর হাতটা ধরে রেখেই বেড ছেড়ে টুলের উপর বসলো সে। বেডে কনুই টেকিয়ে কোমল হাতটি চেপে রাখলো গালে। অনিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো প্রেয়সীর ঘুমন্ত মুখপানে। অতঃপর, কি যেনো ভাবে পকেট হাতড়ে নিজের মোবাইলটা বের করলো সে। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো সন্ধ্যা হতে এই অবধি রূপমের বাহাত্তরটি কল। ফোনটি সাইলেল্ট ছিলো বলে সে খেয়াল করেনি কিছু। সে কলব্যাক করলো। রূপম যেনো মোবাইল হাতে নিয়েই বসে ছিলো। রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে সে চেঁচিয়ে উঠলো প্রায়,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৫
‘ ভাই! কোথায় তুমি? আর ইউ ওকে? কতগুলো কল দিলাম, মেসেজেজ দিলাম। তুমি রেসপন্স করলে না কেনো? কোথায় আছো এখন? ফিরোনি কেনো? ‘
‘ কাল ফিরবো। আমি যে কাজ দিয়েছিলাম সেটা হয়েছে? ‘
সাফওয়ানের এমন ঠান্ডা আওয়াজে রূপম যেনো মিইয়ে গেলো। কথাটা শুনতেই যে বলে উঠলো,
‘ হটাৎ করে আজ এই ডিসিশন নেওয়ার রিজন কি ভাই? মানে এভাবে হঠাৎ.. বাসায় কেউ জানে? বড়ো মা জানে? আর সায়েরী! তুমি পাগলামি করছো, ভাই। জানাজানি হলে কেলেঙ্কারি বেজে যাবে। একটু সময় নাও, প্লিজ। ‘
