Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৭

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৭

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৭
সাজিয়া জাহান সুবহা

ভোর তখন ৭:৩০। সায়েরীর যখন ঘুম ভাঙলো, তখন তার শিয়রে বসে থাকতে দেখা গেলো মেহরিন বেগমকে। অর্ধ জাগ্রত অবস্থায় সায়েরী চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে সাফওয়ানকে খুঁজল। কিন্তু কেবিনে তৃতীয় কোন ব্যক্তির উপস্থিতি দেখলো না সে। ফলস্বরূপ, সায়েরী কেমন বিড়ম্বনায় ডুবে গেলো। মনে হলো, সে বোধহয় গত রাতে সাফওয়ানকে নিয়ে মিছি মিছি স্বপ্ন দেখেছে। সাফওয়ান ভাই হয়তো আসেইনি এখানে৷ একথা ভাবতেই তার ফ্যাকাসে মুখশ্রী আরও বেশি ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। বড্ড মন খারাপ হলো।

পুণরায় চোখ বুজে থাকতে থাকতে একটা সময় ঘুম নামলো চোখে। পরবর্তীতে ঘুম ভাঙলো ঘন্টা খানেক পর। মেহরিন বেগম ডেকে তুলেছে তাকে। যতটুকু সম্ভব ক্ষতস্থান শুকনো রেখে হাত,মুখ ধুইয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা খাবার খাওয়ালো নিজ হাতে। ডাক্তার এসে দেখে গেলো। জানালো, আজকেই বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে। আবরার ভোরের দিকেই ঢাকার পথে রওনা দিয়েছিলো। বেলা আটটা বাজাতেই উপস্থিত হয়েছিলো হাসপাতালে। তার মা বাবা আসবে বিকেলে। এমন একটি বিপদের দিনে ঘরের একমাত্র ছেলে হওয়ার দরুন সে নিজেকে দূরে রাখতে পারলো না। এসেই সায়েরীর সাথে দেখা করে, রিপোর্ট কালেক্ট করে বিল পরিশোধ কার্যে লেগে গেলো সে। সায়েরী হাঁসফাঁস করছে এই রোগী আস্তানায়। যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফিরার বায়না জুড়েছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ন’টা বাজার আগমুহূর্তে হঠাৎ করে আবরারের বন্ধুদের দেখা গেলো হাসপাতালে। বাদ গেলো না নীতি এবং ইরাও। আবরার তখন সায়েরীর ডাক্তারের সঙ্গে চেম্বারে ছিলো বলে বন্ধুদের আগমনের ব্যাপারে অজ্ঞাত ছিলো সে৷ রায়ান,জিমন,নীতি,ইরা সকলে সায়েরীর সঙ্গে দেখা করে ভীষণ মন খারাপ করে ফেললো। তাদের চেনা আদুরে ছোট্ট মেয়েটার হঠাৎ এমন দুর্ঘটনা মেনে নিতে কষ্ট হলো খুব। সকলের মাঝে বসে থেকে সায়েরী ভেতরে ভেতরে হাঁসফাঁস করছিলো সাফওয়ানকে স্মরণ করে। সবাই এলো, কিন্তু সাফওয়ান ভাই আসলো না কেনো? সত্যিই কি তবে ভ্রম ছিলো সবটা? গত রাতে সাফওয়ান ভাই ছিলো না তার সঙ্গে? এতোটা গুরুতর আঘাত পাওয়ার পরেও সাফওয়ান ভাইয়ের ইচ্ছে হলো না তাকে দেখার?

সায়েরীকে অন্যমনস্ক দেখে তার বন্ধুরা সহ আবরারের বন্ধুরা চুপ মেরে গেলো। হয়তোবা আন্দাজ করলো কিছু। তাইতো, একে একে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সকলে। আধ ঘন্টার মাঝেই রিলিজ নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হবে বলে আবরার হাসপাতালের সকল ফর্মালিটিস পূরণে ব্যস্ত। সোলাইমান সাহেব গিয়েছেন মেহরিন বেগমের কপালের পট্টি বদলাতে। আবরারের বন্ধুরা সকলে নিজেরা তো কেবিন ছাড়লো, সঙ্গে একপ্রকার জোর জবরদস্তি করে সায়েরীর বন্ধুদের-কেও টেনে বের করলো। একাকী কেবিনে মাথা নিচু করে বসে রইলো সায়েরী। ডান হাতের আলতো স্পর্শে বাম গাল ছুঁয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করলো, কতোটা বাজে দেখতে লাগছে তাকে।

দেহের একাধিক অংশের জ্বালাপোড়া অনুভব করে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো তার৷ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসে রইলো সে৷ এমন সময় হঠাৎই দরজা খোলার শব্দ এলো কানে। আওয়াজ শুনে তাড়াহুড়ো করে অশ্রু মুছতে গিয়ে ছিলে যাওয়া চামড়ায় টান পড়তেই ব্যথায় অস্পষ্ট আর্তনাদ করে উঠলো সায়েরী৷ সে দেখলো না কে এসেছে। কিন্তু দরজা খোলার পরমুহূর্তেই চিরপরিচিত পুরুষালি সুঘ্রাণে কেবিন ম ম করে উঠলো। সায়েরী থম মেরে গেলো এক পলকের জন্যে। ঝাপসা চোখে তীব্র অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কালো টি-শার্ট, কালো মাস্ক এবং সফেদ ক্যাপের আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখা মানবটার দিকে। এই রূপে সহস্রবার দেখেছে বলে ব্যক্তিটিকে চিনতে বিন্দুমাত্র সময় লাগলো না তার। সে পলক ঝাপটালো৷ অসুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা করলো, আবারও কোন ভ্রম নয়তো?

সাফওয়ান বেশ হম্বিতম্বি ভঙ্গিমায় কেবিনে প্রবেশ করেই দরজা লাগিয়ে দিয়েছে৷ লাগানোর পূর্বে কেবিনের বাহিরে কেউ একজনকে কিছু একটা ইশারাও করেছে। পরক্ষণেই একটানে মাস্ক খুলে গুঁজে নিয়েছে পকেটে। হাঁপিয়ে উঠা বেশ কয়েকটি শ্বাস ফেলে লম্বা কদমে পলকের মাঝেই এসে থেমেছে সায়েরীর বেডের কাছটায়। মেয়েটাকে এমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাফওয়ানের কপালে ভাঁজ পড়লো। অশ্রুসিক্ত চোখজোড়া অবলোকন করে উদ্বিগ্ন হলো সে। দাঁড়ানো অবস্থান হতে ঝুঁকে এলো মুহুর্তেই। সায়েরীর ভেজা গালে হাত রেখে চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,
‘ কাঁদছ কেনো? খারাপ লাগছে? ব্যথা পেয়েছো কোথাও? ডক্টর কে ডাকবো? ‘

এমন স্বাভাবিক ব্যবহারে সায়েরী ভড়কালো যেনো। গালে স্পর্শ করা উষ্ণ হাতটা নিজ একহাতে ছুঁয়ে সে ড্যাবড্যাব চোখে তাকালো সাফওয়ানের মুখপানে। তার এমন নিরবতায় সাফওয়ানের চিন্তা বাড়লো। সায়েরীর গালে রাখা হাতটা কানের নিচ গলিয়ে ঘাড় ছুঁয়ে আরও কাছে টেনে নিলো সায়েরীকে। শীতল সুরে আওড়াল,
‘ কথা বলছো না কেনো, সুবহা? ডক্টরকে ডাকবো? খারাপ লাগছে কোথাও? ‘
‘ আপ..আপনি সত্যিই কাল রাতে এখানে ছিলেন? মানে ওটা..ওসব স্বপ্ন ছিলো না? ‘

কথার পিছে এহেন পাল্টা প্রশ্নে সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকায়। প্রশ্ন দুটো বুঝে নিতে সময় নেয় একটু। সায়েরীর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে বেডে এসে বসে। খুব কাছাকাছি, মুখোমুখি। দীর্ঘ কয়েকটি দিন যোগাযোগ ছিন্ন থাকার পর অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কবলে পড়ে রাতের দিকে যেই একটুখানি হুঁশ ছিলো সায়েরীর। সেটুকু সময়ে পাওয়া সাফওয়ানের সান্নিধ্য টুকু বর্তমানে তার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। হওয়াটা বরং স্বাভাবিক। মেয়েটা যে মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছিলো সেটা তাকে দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে। সাফওয়ানের ভেতরটা ভেঙ্গে আসে প্রেয়সীকে এমন হালে দেখে৷ মনের অনুতাপ সব চেপে গেলো সে। সায়েরীর ধ্যান ঘুরানোর উদ্দেশ্যে দুই পাশের বেডে হাত রেখে ঝুঁকল সায়েরীর মুখোমুখি। কিঞ্চিৎ ঘাড় বেঁকিয়ে চোখে চোখ রেখে দুষ্টুমি মাখা গলায় আওড়াল,

‘ তোমার কল্পনা ঝল্পনায় আমার আনাগোনা এখনো বন্ধ হয়নি? কাল রাত্রেও স্বপ্নে এসেছিলাম? কি কি করেছি বলো তো? ‘
হঠাৎ এমন প্রত্যুত্তরে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো সায়েরী। মনে পড়লো বেশ কয়েক মাস পূর্বে কলেজের একটি দিনের কথা। যখন সে এভাবেই সাফওয়ানকে নিয়ে মন-মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে বিভোর ছিলো,অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো। অবুঝ পনায় সাফওয়ানের বাস্তব অবয়বকে ভ্রম ভেবে মনের কথা সব হড়বড় করে জানিয়ে দিয়েছিলো। এবং বিনিময়ে এই পাজি ছেলেটা করেছিলো কি? সবার সামনে ইঙ্গিত পূর্ণ কথা শুনিয়ে লজ্জা দিয়েছিলো তাকে। আজকের কথাটার মতো করেই মিটিমিটি হেসে বলেছিলো,

‘ আছি হয়তো কারো কল্পনা ঝল্পনায়। ‘
ইশশ! পুণরায় সেকথা মনে পড়তেই সায়েরীর দুই গাল উষ্ণ হয়ে উঠেছে। তাকে এমন হাঁসফাঁস করেতে দেখে সাফওয়ানের চিকন ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসিটুকু দীর্ঘ হলো। প্রায় নাকে নাক ছুঁই ছুঁই মতোন কাছাকাছি এসে ফিসফিস ছন্দে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ স্পিক আপ,সুবহা। ডিড আই ডু এনিথিং ন্যটি? হুম? ‘

কন্ঠটা শুনেই সায়েরী শক্ত করে চোখ খিচল। এতোটা আহ্লাদী কন্ঠের কেমন বেলাজ কথাবার্তা! গত রাত্রির মুহুর্ত সব স্পষ্ট মনে আছে সায়েরীর। মনে আছে কীভাবে বিনা বাধায় তার জখমি ঠোঁটে নিজ ঠোঁট ছুঁয়ে তার রাগ,অভিমান সব নিজের মাঝে চুষে নিয়েছিলো সাফওয়ান ভাই। প্রথমবারের মতো স্বর্গীয় কোন অনুভূতি ছিলো না সেই চুম্বনে৷ সাফওয়ানের চোখের জল দেখেই তো সায়েরীর ভেতরটা গুড়িয়ে গিয়েছিলো। পুণরায় সেই দৃশ্য কল্পনা করে সায়েরীর ভেতরটা ভার হয়ে গেলো৷ চোখ মেলে তাকাতেই দৃষ্টি মিললো বাদামী বর্ণের সুগভীর দৃষ্টি জোড়ার সঙ্গে। সাফওয়ানের চোখের সাদা অংশে এখনো অনেকটা রক্তিম ভাব। ফুলেও রয়েছে কিঞ্চিৎ। রাতভর কি ঘুমায়নি নাকি? সায়েরী হাত বাড়ায়। সরু আঙুলের আলতো স্পর্শে ছুঁয়ে দেয় চোখজোড়া। অবিলম্বে দৃষ্টি বুজে ফেললো সাফওয়ান। অনুভব করলো, তার খরশান চোয়ালে তুলতুলে হাতজোড়ার কোমল স্পর্শ। পরপরই একজোড়া উষ্ণ ঠোঁট ছুঁয়ে গেলো তার অক্ষিপল্লব। কপালে কপাল,নাকে নাক ছুঁয়ে শোনা গেলো সায়েরীর কম্পিত-কোমল কণ্ঠস্বর,

‘ আপনি আর কক্ষনো ওভাবে কাঁদবেন না, সাফওয়ান ভাই। যেই চোখের দৃষ্টিতে আমি ভরসা খুঁজে পাই, সেই চোখে বিষাদের অশ্রু আমি সহ্য করতে পারি না। এতো এতো আঘাত পেয়েও আমার ততোটা কষ্ট হয়নি, যতটা কষ্ট আপনাকে ভেঙ্গে পড়তে দেখে হয়েছে। ‘
একটু থেমে ফের বললো—
‘ আপনি জানেন আমার মাঝে আপনার অস্তিত্বের বিচরণ কতটুকু! আপনার রাগ, অভিযোগ, দুরত্ব সব মেনে নিয়েছি। সব সহ্য করেছি। ক..কিন্তু– কিন্তু আপনার পাশে আমি ছাড়া অন্য কোন মেয়ের ছায়া-ও আমি মানতে পারবো না। আপনার ভাগ আমি কাউকে দিতে চাইনা। সাফওয়ানের চারধারে সুবহা ব্যতীত অন্য কোন নারীর অস্তিত্ব আমি গ্রাহ্য করবো না ।

সরল কন্ঠের গভীরতম অনুভূতি কথন, শীতল হুমকিবার্তা-ও বলা চলে। সাফওয়ান অনুভব করতে পারে এই কথাগুলোর গভীরতা, দৃঢ়তা। তার বক্ষজুড়ে ধুকপুক ধুকপুক শব্দ হয়। সায়েরীর দুই পাশে বেডের উপর ভর দেওয়া হাতজোড়া মুষ্টিবদ্ধ হয়। বলিষ্ঠ হাতের ভাঁজে কুঁচকে যায় সফেদ চাদরটি। ঠোঁটের ডগায় ফুটতে চাওয়া কিছু কথা আচমকা গিলে নিলো সে। কণ্ঠনালীর উঁচু হাড়টি দৃশ্যমান রূপে নাড়িয়ে ঢোক গিললো পরপর। যেনো গভীর কোন অনুভূতি গিলে নিয়েছে নিভৃতে। অতঃপর, চট করে আঁখি যুগল মেলে তাকালো সে। সায়েরীর দুহাতের কোমল আলিঙ্গন ছেড়ে হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়লো। আচমকা প্রতিক্রিয়ায় চমকে উঠলো সায়েরী। অবুঝ নয়নে তাকালো মাথা উঁচিয়ে। কি হলো এটা? হুট করে এভাবে দূরে সরে যাওয়ার কারণ কি?
সাফওয়ানকে কেমন অধৈর্য, বেপরোয়া দেখতে লাগছে। আচরণে অস্থির ভাব৷ বড় বড় শ্বাস নিয়ে অন্তঃকরণের এলোমেলো অনুভূতি সব চেপে গেলো সে। হাত উঁচিয়ে অ্যাপল ওয়াচটিতে সময় দেখে নিলো। গম্ভীর, তবে নরম কণ্ঠে শুধাল,

‘ সময় কম। একটু পর আমাকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। তুমি ডিসচার্জ নিয়ে বাসায় গিয়ে প্রপার রেস্ট নিবে। আমি পৌঁছে ফোন করবো। ‘
কথাটুকু বলেই জ্যাকেটের ভেতর হতে একটি ফাইল বের করলো সে। পাতা উল্টে কলমের ক্যাপ খুলে মেলে ধরলো সায়েরীর সম্মুখে বিছানার উপর। তাড়া দিয়ে বললো,
‘ সাইন করো। আমি ডিসচার্জের ব্যবস্থা করছি। ‘
ডিসচার্জ পেপার! সায়েরী ভ্রু কুঁচকে তাকায়। পেপারের উপর সাফওয়ানের বড়সড় হাতটা চেপে রয়েছে বলে কিসের পেপার তা বুঝা মুশকিল। কলম হাতে নিয়ে সায়েরী হঠাৎ বললো,
‘ ডিসচার্জ পেপারে আমি কেনো সাইন করবো? ওটা তো ভাইয়া.. ‘

‘ বেশি বুঝতে বলেছি তোমাকে? সাইন করো সুবহা। তোমার মা-বাবা এসে দেখলে অসুবিধা তোমারই হবে। ‘
একথা শোনার পর সায়েরী আর দ্বিতীয় বার মাথা ঘামাল না। হাতের ব্যথা নিয়ে এবড়োখেবড়ো অক্ষরে সাফওয়ানের দেখিয়ে দেওয়া অংশে সাইন করলো নিশ্চিন্তে। সঙ্গে সঙ্গে একটানে ফাইলটা পুণরায় টেনে নিলো সাফওয়ান। সেটি রুল করে জ্যাকেটের মধ্যে গুঁজে নিতে নিতে কেমন কঠিন স্বরে বলে উঠল,

‘ স্টিল আ’ম ট্রাইং মাই বেস্ট, সুবহা। আমার আমানত বুঝে নেওয়ার সব রকম বন্দোবস্ত আমি করে ফেলেছি। তবুও কেউ আমার চাওয়ার পথে বাঁধা হলে আমি কাউকে একবিন্দু ছাড় দিব না, তোমাকেও না। ‘
আকস্মিক এমন কঠিন কথার মর্মার্থ ধরতে পারলো না সায়েরী। মেয়েটা বোকা বোকা নজরে কেবল তাকিয়েই রইলো। মূলত সাফওয়ান পুণরায় সিলেটে চলে যাবে কথাটার দিকেই তার ধ্যান রয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সে বিষন্ন গলায় জানতে চাইলো,

‘ আবার কবে আসবেন? ‘
কন্ঠের উদাসীনতার মাঝেই যেনো সাফওয়ানকে আটকে ফেলার সবকটি মন্ত্র লুকিয়ে আছে। কঠোর পুরুষটার পাথর বুক কাঁপিয়ে তুলেছে। অসভ্য হৃদযন্ত্রটা দাপাদাপি করে লাফাচ্ছে। যেনো থেকে যাওয়ার আর্জি জানাচ্ছে সে নিজেও। কিন্তু মন-মস্তিষ্কের নিরব যুদ্ধে এবারেও মনের পরাজয় হলো। বুকের বাম পাশের চিনচিনে ব্যথাটা বুকে চেপেই এগিয়ে এলো সাফওয়ান। ঝুঁকে এসে দুহাতের আদলে তুলে নিলো সায়েরীর মুখশ্রীটি। অত্যন্ত নমনীয়, তুলো স্পর্শের মতো মেয়েটার কপাল, চোখ, নাক, গালে আদুরে ছাপ বসিয়ে দিলো। বিক্ষত ঠোঁটের কোণটার দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো সে। “কবে আসবেন” কথাটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বলে উঠলো,
‘ কান্নাকাটি করবে না। আমি রোজ ফোন করবো। যখন-তখন মন খারাপ হলে আমাকে ফোন করবে। তা-ও কোন অনিয়ম করো না হু? মনে থাকবে? ‘
সায়েরী হ্যাঁ-না কিছুই বললো না। এতক্ষণ চোখ বুঝে কোমল আদর সব বুঝে নিচ্ছিলো। এই পর্যায়ে আগ বাড়িয়ে সাফওয়ানের কোমর জড়িয়ে ধরলো সে। পেটে মুখ গুঁজে তার প্রিয় পুরুষালি ঘ্রাণটা টেনে নিলো বুকভরে। নিভু নিভু গলায় প্রতিউত্তর করলো,
” আমি অপেক্ষা করবো। ”

কেবিন থেকে বেরিয়ে কারো সঙ্গেই কোন আলাপ করেনি সাফওয়ান। করিডরে পরিচিত কেউ ছিল না দেখে সে আর খোঁজ ও করলো না। সিড়ি বেয়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে থামতেই দূর হতে নজরে আসলো আবরারকে। জাদিদ সহ দুজন মেইল, ফিমেল ডক্টরের সঙ্গে কথা বলছে সে। চেহারায় খানিকটা চিন্তিত ভাব। সাফওয়ানের যেতে হলে ঠিক তার সম্মুখেই পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। কিন্তু অজ্ঞাত কোন কারণ বশত সে তা করতে চাইলো না। ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো সিড়ির কাছটায়। দূর হতে হঠাৎই জাদিদের নজর গাঁথল তার দিকে। ক্যাপ,মাস্ক পরে থাকা স্বত্তেও সাফওয়ানকে চিনতে তার বেগ পেতে হলো না । এবং বিচক্ষণ পুরুষটা সাফওয়ানের স্তম্ভিত অবয়ব লক্ষ্য করে আপনমনে কিছু একটা আঁচ করলো যেন। সে বেশ কৌশলে আবরারের কাঁধে হাত রেখে কথার তালে ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে। ইঙ্গিত বুঝে সাফওয়ান লম্বা কদমে বেরিয়ে গেলো। যেতে যেতে জাদিদের বিচক্ষণতা দেখে অধর প্রসারিত হলো তার।

মাঝে কেটেছে গুটি কয়েক দিন। বাসায় ফেরার পর হতে সায়েরীর দিন গুলো পার হচ্ছে ভীষণ অন্যরকম ভাবে। ছটফটে, দুরন্তর মেয়েটা সকল প্রকারের দৌঁড়ঝাপের অনুমতি হারিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের গন্ডিতে বেঁধেছে তার খাবার ও ঘুমের নিয়ম। সায়েরীর প্রয়োজন হতে পারে ভেবে প্রথম দুটো দিন মেহরিন বেগম রাত্রি বেলা মেয়ের সঙ্গেই ঘুমিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী দিনে সায়েরী নিজ ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে মা’কে বললো,
‘ শুধু শুধু গাদাগাদি করে আমাদের দুজনের মাঝে তোমার থাকতে হবে না আম্মু। কষ্ট হচ্ছে তোমার। আমি ঘুমালে সকালের আগে তো উঠিইনা। তুমি প্লিজ তোমার রুমেই থাকো। আমার প্রয়োজন হলে আমি নাহয় ডেকে নিবো। কষ্ট করে এখানে থাকার কি প্রয়োজন? ‘

এমন আরও কিছু বেহুদা কথায় মেহরিন বেগমকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজ রুম হতে একপ্রকার তাড়িয়ে দিলো সে। এই কান্ড করে মেয়েটা নিজেই হতবুদ্ধি। আর পাঁচটা সাধারণ প্রেমিক যুগলের মতো পরিবারের সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রেমিকের সঙ্গে রাতভর ফোনালাপ করার লোভে কিনা সে মা’কে রুম ছাড়া করলো!
দীর্ঘ প্রায় এক বছরেরও অধিক সময় ধরে সাফওয়ান-সায়েরীর সম্পর্কটি চলছে ভিন্ন রকম ভাবে। ফোনে ফোনে প্রেমালাপ ধরনের কোন বিশেষ স্মৃতি তাদের মাঝে নেই বললেই চলে। কিন্তু এই দুর্ঘটনা এবং দুরত্বে সেই কমতি টুকু ও পূরণ হয়ে গেলো। সাফওয়ান বলেছিলো সে রোজ নিয়ম করে সায়েরীকে ফোন করবে। কথাটা সে যথাযথ পালন করেছে ঠিকই। কিন্তু ভুল পন্থায়। পূর্বের মতো বিরক্তিকর সময়ে, অসহ্যকর বাণীতে শুধু করে দিনের প্রথম ফোনালাপ। না চাইতেও সাফওয়ান গম্ভীর সুরে রোজ একই কথা আওড়ায়,

‘ এখনো ঘুমাচ্ছো? উঠে পড়তে বসো, সুবহা। কলেজ, কোচিং নেই বলে কি পড়াশোনাও গাঙ্গে ভাসিয়ে দিতে চাইছো তুমি? ‘
সদ্য ঘুম ভাঙ্গার পর এহেন অপছন্দের বাণী শুনে সায়েরীর তখন ইচ্ছে করে সাফওয়ান ভাইয়ের ওই সুন্দর, সিল্কি ব্রাউন চুলগুলো একটা একটা ছিড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে দিতে। প্রেমিকা এক্সিডেন্ট করে বিছানার সঙ্গে লেগে গিয়েছে। কিন্তু তাতেও জনাবের শিক্ষক সত্তা থমকে যায়নি। বরং ফোনে ফোনে দিনের অর্ধেকের বেশি সময় সে জ্ঞানই দিতে থাকে। সায়েরীর এখন আফসোস হয়। কেনো যে সেদিন আবেগে বেকুব হয়ে দিনে চৌদ্দ দফা ফোন করার আবদার করেছিলো সে? এখন হাড়ে হাড়ে পস্তাচ্ছে। এই রষকষহীন মানবটাকে নিয়ে অদুর ভবিষ্যত কল্পনা করতে নিয়ে বেচারি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। গোমড়ামুখো-টাকে নিয়ে সে বাকি জীবন কীভাবে পার করবে!

সময় তখন রাত সাড়ে দশটা। সায়েরী সবে মাত্র খাওয়ার পর বেডরুমে এসে পরবর্তীতে ফ্রেশ হয়েছে। মেডিসিন নেওয়ার পর এলোমেলো চুলগুলোতে বিনুনি পাকিয়েছে দু’দুটো। অতঃপর ঘুমন্ত মিনহাকে অবলোকন করে সে উঠে এলো বিছানায়। কোলের উপর কুশন রেখে মোবাইল হাতে নিয়ে বসলো হেড বোর্ডের সঙ্গে হেলান দিয়ে। হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে ভিডিও কল দিয়েছে সাফওয়ানের আইডিতে। রিং বাজতে বাজতে কেটে গেলো প্রথমবারে। সে দ্বিতীয় দফা কল করার জন্য উদ্যত হতেই মোবাইলটা কেঁপে উঠলো। “KHAN SAHEB” আইডি নামটা ভেসে উঠলো স্ক্রিনে। তৎক্ষনাৎ সায়েরীর চেহারা জ্বলে উঠলো উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায়৷ ছটফটে আঙ্গুলের স্পর্শে কলটি রিসিভ করতে এক সেকেন্ড ও ব্যয় করলো না সে। চাতকপাখির মতো দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো মোবাইল স্ক্রিনে। উপাশটা গাঢ় অন্ধকারে ঘেরা। মোবাইলের ক্ষীণ আলোয় সাফওয়ানের সফেদ টি-শার্ট আবছা ভাবে নজরে এসেছে কেবল। পরপর ধুপধাপ পদচারণের শব্দের সঙ্গে সুইচবোর্ড চাপার শব্দ হয়। ঝলমলে আলোয় স্পষ্ট দেখা দেয় সাফওয়ানের মুখাবয়ব। কেমন ক্লান্ত, এলোমেলো এবং গরমের তাপমাত্রায় রক্তিম হয়ে আছে চেহারাটা! সায়েরীর মায়া লাগলো ভীষণ। নরম সুরে জানতে চাইলো,

‘ এখন বাড়ি ফিরেছেন? ‘
‘ হু। ডিনার করেছো? ‘
‘ হ্যাঁ। ‘
‘ মেডিসিন? ‘
‘ নিয়েছি। আপনি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে আসুন। ‘
একথার কোন জবাব দিলো না সাফওয়ান। মোবাইলটা সে ড্রেসিং টেবিলে কোন রকমে তাক করে হাতের অ্যাপল ওয়াচটি টেনে খুললো। পকেট হতে ওয়ালেট এবং এন্ড্রয়েড মোবাইলটি বের করে রেখে কদম বাড়ালো ওয়াশরুমের দিকে। মিনিট দশেকের মধ্যেই ফিরে এলো সিক্ত রূপে। পরনে কালো রঙের ম্যাগি হাতা গেঞ্জি এবং থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। আধভেজা চুলগুলো মোছার প্রবণতাও দেখা দিল না তার মধ্যে। তোয়ালেটা ডিভানের দিকে ছুড়ে ফেলে তাকালো মোবাইলের দিকে। সায়েরী এক ধ্যানে তাকিয়ে ছিল। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললেই কেমন অপ্রস্তুত হলো মেয়েটা। সাফওয়ান পুণরায় মোবাইল তুলে নিলো হাতে। অসম্ভব রকমের ক্লান্ত সুরে, নরম গলায় বললো,

‘ ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। কাল কথা বলি? ‘
কখনো সাফওয়ানের এমন ক্লান্ত সুর শুনেনি বলেই হয়তো,আজ এই কন্ঠটা শুনে কেঁপে উঠলো সায়েরী। সে প্রত্যুত্তরে কেবল মাথা কাত করে সম্মতি জানায়। সাফওয়ান কল কাটতে উদ্যত হলে আবার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধা দিয়ে বলে উঠে,
‘ কল কাটবেন না। আম–আমি মানে আপনি ঘুমান। আমি বিরক্ত করবো না, সত্যি। ‘
সাফওয়ান ক্লান্ত দেহে অদৃশ্য ভঙ্গিমায় হাসে। কক্ষের নীলচে বাতি জ্বালিয়ে উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়। সম্মুখেই মোবাইলটা বালিশের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে সায়েরী। বিরক্ত করবো না বললেও এই যাত্রায় না চাইতেও মেয়েটা অসন্তুষ্ট গলায় বলে উঠলো,

‘ না খেয়ে ঘুমচ্ছেন কেনো? বাসায় কি খাবার দেওয়ার জন্য কেউ নেই? ‘
কথাটা শুনে লালচে চোখ মেলে তাকালো সাফওয়ান। সায়েরীর দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে ঘুমু ঘুমু, হাস্কি স্বরে হঠাৎ প্রতিউত্তর করলো,
‘ অন্য কাউকে কি দরকার? তুমি এসে খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যাও। আফটার অল, আ’ম অল ইউরস না সুবহাপাখি? ‘
অকস্মাৎ এহেন প্রতিউত্তর শুনে থতমত খেয়ে গেলো সায়েরী। লজ্জায় তার দু’গাল, কান উষ্ণ হয়ে উঠলো৷ উপচে পড়া লজ্জাটুকু প্রকাশ না করার তাগিদে সে নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠলো,
‘ খেতে হবে না। ঘুমান আপনি। ‘

সায়েরীর প্রতিক্রিয়া দেখে বন্ধ চোখেই মিটিমিটি হাসলো সাফওয়ান। দৃশ্যমান পেশিবহুল দুই বাহু দ্বারা বালিশ আকড়ে ধরলো। আঁধার কক্ষে তার ঘুমু ঘুমু কন্ঠটি আরও বেশি আঁধার শোনাল—
‘ গুড নাইট, বোকাপাখি! ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৬

আদো আদো ঘুমন্ত গলার, আদুরে, কোমল কন্ঠটি শুনে বরাবরের মতোই সায়েরীর পেটে প্রজাপতি ডানা ঝাপ্টানোর মতো অনুভূতি হলো। শিরশিরে এক শীতল অনুভূতিতে দুলে উঠলো দেহ মন। সে আলগোছে এক কাত হয়ে শুয়ে পড়লো। সাফওয়ানের ঘুমন্ত মুখাবয়বে অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চট করে চুমু খেলো স্ক্রিনে। সতর্ক চোখে আবার অবলোকন করলো, ধরা পড়ে গেলো কিনা৷ না, পড়েনি। সাফওয়ানকে গভীর ঘুমে দেখে স্বস্তি নিয়েই তাকিয়ে রইলো সে। আপনমনে স্বগতোক্তি করলো,
‘ শুভ রাত্রি, সাফওয়ান ভাই। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৮