অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৮
সাজিয়া জাহান সুবহা
জীবনের উত্থান-পতনের কোন নির্দিষ্টতা নেই। কখন, কোথায়, কীভাবে, কার জীবনে ধ্বংসাত্মক শনি নেমে আসে তা সম্পর্কে কেউ পূর্বে থেকে জ্ঞাত হতে পারে না। এই যেমন, দীর্ঘ আড়াই মাসের কড়া পরিশ্রমের পরেও একদম আচানক সাফওয়ানের সব পরিশ্রম, সকল ইনভেস্টমেন্ট ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। যেটুকু আশা নিয়ে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে একটি কোম্পানিতে ইনভেস্ট করেছিলো সে। সেই কোম্পানির শেয়ার পুণরায় বাজেভাবে ডুবে গেলো। একই সঙ্গে ডুবল সাফওয়ানের এক বুক আশা, হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম। পঁচিশ বছরের জীবনে এমন বাজে রকমের ডাউনফল কক্ষনো হয়নি তার৷ অবশ্য আজকের পূর্বে এমন পরিশ্রমের প্রয়োজন ও হয়নি কিনা। তাইতো, প্রথমবারের এই মাত্রাতিরিক্ত ডাউনফল মানতে পারছে না সে। গত দুই দিন ধরেই শেয়ারের অবস্থা বেশ নিচে নামতে দেখা যাচ্ছিলো।
তখন থেকেই দুশ্চিন্তায় সাফওয়ান একপ্রকার নাওয়া, খাওয়া, ঘুম ভুলে গিয়েছে। এবং আজ শেয়ার সব বাজেভাবে ধসে পড়েছে। সেই থেকে গুম হয়ে আছে ছেলেটা। বড় হতে বড় দুঃখের সময়েও কেউ সাফওয়ানকে ভাঙ্গতে দেখেনি৷ সদা নির্বিকার প্রতিক্রিয়ায় থাকা ছেলেটার ভেতর এবারও যে কোন ঝড় বয়ে যাচ্ছে কেউ তা আন্দাজ করতে পারলো না। সাফওয়ানের এই অত্যাধিক গুমসুম আচরণে রূপম বেচারার তখন পাগল পাগল অবস্থা। যদিও সাফওয়ান ব্যাক্তিগত সমস্যা গুলোতে রূপমকে জড়ায় না, কাউকেই জডায়নি। কিন্তু সমস্যা সব আগাগোড়া জানে বলে, ভাইকে আগাগোড়া বুঝে বলে রূপম এটুকুতেই অস্থির হয়ে উঠেছে। সে শুরুতেই বলেছিলো, অভিজ্ঞ কোন বিজনেস ম্যানের পরামর্শ ব্যতীত যেনতেন কোম্পানিতে ইনভেস্ট না করতে। কিন্তু সাফওয়ান তখন কারো কথার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেনি। অসম্ভব রকমের রাগে, জেদে যা ইচ্ছে পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছিলো।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
হয়তোবা ভাগ্যেও এই দুর্দশা লিখিত ছিলো বলে আজ সকল পরিশ্রম জলে মিশে গিয়েছে। সবই মানা গেলো৷ কিন্তু সাফওয়ানের এই শীতল আচরণ মানতে পারছে না রূপম। রাগ দেখাক, গালিগালাজ করুক, ভেতরের ফ্রাসটেশন সব উগলে দিক। যা ইচ্ছে করুক কিন্তু এভাবে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকার কি মানে? রূপমের মনে পড়ে না কখনো তার প্রেমিকা তাকে এভাবে নাকানিচুবানি খাইয়েছে কিনা যতটা তার বড় ভাই তাকে চিন্তায় চিন্তায় পাগল করে তুলেছে। আজব এক মুসিবত!
রাতভর সাফওয়ান বাড়ি ফিরেনি৷ কয়েক শত কল করেও রূপম তার নাগাল পেলো না৷ পরদিন পড়ন্ত বিকেলে আচমকা কল করলো সাফওয়ান। রূপম রাগে জেদে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কোন চিন্তা সে দেখাবে না। কিন্তু উপাশ হতে সাফওয়ানের দুর্বল কন্ঠ কানে বাজতেই কেমন বিচলিত হয়ে উঠলো সে। সাফওয়ানের উল্লেখিত লোকেশনে বাইক নিয়ে পৌঁছাল আধ ঘন্টার মধ্যে৷ দেখলো, রূপমের বাবার গাড়ি নিয়ে ছোট খাটো এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে বসেছে সাফওয়ান। গুরুতর কিছু না হলেও কপালে চোট পেয়ে রক্ত ঝরছে৷ রূপম, রাহাত দুজনে হাসপাতালে যাওয়ার তাড়া দিলো একপ্রকার উত্তেজিত হয়ে৷ দুজনার এমন মেয়েলি হাউকাউ শুনে তৎকালীন এক ধমক ছুড়ল সাফওয়ান,
‘ মরে গেছি আমি? কল দিয়েছিলাম এসে গাড়ি গ্যারেজে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এটুকু রক্ত ঝরিয়ে কাউকে মরতে দেখেছিস বেকুবের দল? বাইকের চাবি দে৷ বাসায় যাবো। ‘
দুই ভাই ভারী বিরক্ত চোখে চেয়ে চেয়ে দেখল তাদের বড় ভাইকে। এখন যদি সাফওয়ানের যায়গায় রূপম কিংবা রাহাত থাকতো, তবে সাফওয়ান কানের নিচে দুটো চটকানা মেরে হলেও হাসপাতালে নিয়ে যেতো তাদের। কিন্তু এই মহৎ কাজটি তারা করতে পারছে না বলে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো দুজনে। তবে বাইকের চাবি দিল না। চটকানা দিতে পারছে না তাতে কি? দুই ভাইয়ের হাউকাউ থামলো না মোটেও। সাফওয়ানের কানের মাথা খেয়ে ঠিকই হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ক্ষান্ত হলো দুজন। কপালের ক্ষত পরিষ্কার করে তাতে ছোট্ট দুটো ব্যান্ডেজ আটকে পরবর্তীতে স্যালাইন দেওয়া হলো সাফওয়ান কে। তিন দিন ধরে পরিপূর্ণভাবে খাওয়া-দাওয়া করেনি বলে আজ দুর্বলতা এবং দুশ্চিন্তায় গাড়ি চলন্ত অবস্থাতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠেছিলো সাফওয়ানের৷ যার ফলস্বরূপ অঘটন যা ঘটার তা ঘটে গেলো। রূপম একপ্রকার মীরজাফরের মতো এই দুর্ঘটনা, স্বাস্থ্যের অবনতির কথা সব আলগোছে তুলে দিলো তাহুরা খানের কানে৷ ভদ্রমহিলা এবার যা কান্নাকাটি জুড়ে দিবেন, যত বয়ান ঝাড়বেন তা হবে সাফওয়ানের জন্য বড় শাস্তি। একথা ভেবেই আপনমনে ভিলেনের মতো হেসে উঠলো সে৷
এক ঘন্টা হাসপাতালে ব্যয় করে স্যালাইন লাগানোর কোন ইচ্ছে সাফওয়ানের ছিলো না৷ কিন্তু এখন অনিচ্ছা স্বত্তেও সে হাসপাতালের বেডে আধশোয়া হয়ে বসে আছে। বাম হাতে ক্যানোলা লাগানো। ডান হাতে একটি আপেল। দুই চার কামড়ে সেটি সাবাড় করে অবশিষ্ট অংশটা সে ছুড়ে ফেললো কেবিনের কোণায় ডাস্টবিনের দিকে। ঠিক ঠিক মধ্যিখানে গিয়েই পড়লো সেটা। সেই মুহুর্তে সাফওয়ানের মোবাইল বেজে উঠলো। কে কল করেছে তা দেখার আগ্রহবোধ করলো না সে। কিন্তু অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি যেনো থামবার নয়। পরপর আরও দু’বার কল দিতেই বাধ্য হয়ে কল রিসিভ করলো সাফওয়ান। তার মা কল দিয়েছে। সাফওয়ানের হ্যালো বলতে দেরি। কিন্তু তাহুরা খানের বিলাপ শুরু হতে দেরি নেই। এক্সিডেন্ট যে কতখানি হালকা তা জানার আগ্রহবোধ ও করছেন না ভদ্রমহিলা। কেবল ছেলে এক্সিডেন্ট করেছে তা শুনেই বিলাপ শুরু করেছেন। সাফওয়ান মহা বিরক্ত চোখে তাকালো রূপমের দিকে৷ দৃষ্টির রাগত্ব ভাব বুঝতে পেরে রূপম জোর পূর্বক হাসে৷ কিন্তু মনে মনে সে সত্যিই আনন্দিত। বুঝুক সবাইকে চিন্তায় রাখার ঠ্যালা।
সাফওয়ানের উত্তপ্ত মেজাজে কেরোসিন ডালতে বোধহয় ক্ষণিক পূর্বে স্যালাইন লাগিয়ে যাওয়া নার্সটি পুণরায় হাজির হয়েছে কেবিনে। অথচ এখানে তার কোন কাজ নেই। সাফওয়ানের কোন আঘাত কিংবা শারীরিক দুর্বলতা এতোটাও বেশি নয় যে দুইবার এসে দেখে যেতে হবে। তেইশ কি চব্বিশ বছর বয়সী সুন্দরীদের কাতারে পড়া যুবতী নার্সটি এসে কারণ ছাড়াই স্যালাইন কতটুকু শেষ হয়েছে তা চেক করলো। বেশ রয়েসয়ে জানতে চাইলো, এখন কেমন বোধ করছে? কিছুর প্রয়োজন কি-না?
সাফওয়ানের পরিবর্তে জবাব সব রাহাত দিচ্ছে। নার্সটি যেন এতে ভারী অসন্তুষ্ট। সে পুণরায় সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে মিহি স্বরে বললো,
‘ কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে ডাকতে পারেন। আমি ডান পাশের কেবিন ওয়ান জিরো টু-তে আছি। আমার নাম আ.. ‘
নার্সের কথার মাঝে একদম আচমকা হাতের ক্যানোলা-টা একটানে খুলে ছুড়ে ফেললো সাফওয়ান। সটানভাবে দাঁড়িয়ে পড়লো। তীব্র রাগে, বিরক্তিতে তার শিরা উপশিরা অবধি টগবগিয়ে উঠছে। সে এমনভাবে ক্যানোলা ছুড়ে ফেলে লম্বা কদমে বেরিয়ে গেলো, যেনো মুখ না খুলেও বলে গেছে,
‘ নে বসে বসে দেখ কীভাবে স্যালাইন শেষ হয়। কষ্ট করে আর কোন প্রয়োজনে এখানে ছুটে আসা লাগবে না। বরং কেবিনেই থেকে যা, অসহ্য মেয়েমানুষ!’
সাফওয়ানের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রূপম-রাহার দুই ভাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। পরমুহূর্তে তীব্র বিরক্তি নিয়ে তাকায় নার্স মেয়েটির দিকে। মেয়েটা পূর্ব থেকেই তাজ্জব হয়ে আছে। তন্মধ্যে দুজনের এহেন চাহনিতে আরও ভড়কে গেলো। আশ্চর্য! সে এমন কি বলে ফেললো যার কারণে সুদর্শন ছেলেটা এভাবে রেগে গিয়েছে!
সেদিন সারাদিনেও সাফওয়ান বাংলো বাড়িতে ফিরেনি৷ ফিরেছে সন্ধ্যা নাগাদ। যখন চারপাশ নিস্তব্ধতায় ঘেরা। বাড়ির সকলে যার যার কক্ষে৷ কাজের লোকদের-ও দেখা নেই৷ সাফওয়ান নিরবে নিজ রুমে ফিরে গেলো। তিন দিনের ক্লান্তি সব শরীরে একত্রে জেঁকে বসেছে। সে আর ভাবতে চাইলো না এই ব্যাপারে। এলোমেলো ভাবে উপুড় হয়ে শুয়ে তলিয়ে গেলো গভীর ঘুমে। ঠিক কতক্ষণ যাবত ঘুমিয়েছে জানা নেই। কক্ষের ঝলমলে আলোক রশ্মি চোখে লাগতেই ঘুম ছুটে গেলো তার। সময়ে অসময়ে এভাবে তাকে বিরক্ত করার স্পর্ধা একমাত্র রূপমেরই আছে। তাইতো সাফওয়ান অতিষ্ঠ হলো এবারে। দরজার দিকে ফিরে আধ ঘুমু, ভারিক্কি গলায় শাসাতে উদ্যত হলো–
‘ রূপ!! তোর সমস্যা ক… ‘
সম্মুখে রূপমের পরিবর্তে রূপমের বাবা রওশান খানকে দেখে অবিলম্বে কথাগুলো গিলে নিলো সাফওয়ান। এমন অসময়ে চাচা স্বয়ং তার রুমে এসে হাজির হয়েছে মানে নিশ্চয় কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবেন। সাফওয়ানের কপাল কুঁচকে আসে ভাবতে গিয়ে। চাচ্চুর হঠাৎ এভাবে তার রুমে আসার কি প্রয়োজন? কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা যে তাকে না ডেকে রওশন খান নিজেই এসে হাজির হয়েছেন!
‘ ঘুম ছুটে গেলে মুখে পানি দিয়ে আসো। কথা আছে। ‘
রওশন খান বললেন বেশ সাবলীলভাবে। সাফওয়ানকে ফ্রেশ হয়ে আসতে বলে তিনি রুমের মাঝামাঝি থাকা সোফায় গিয়ে বসলেন আরাম করে। পেছন পেছন রূপম-ও হাজির হয়েছে। দুজনের দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তিত ভঙ্গিতে বেশ দ্রুত চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে এলো সাফওয়ান। টাওয়েল দিয়ে হাত-মুখ মুছে নির্বিকার চিত্তে গিয়ে বসলো রওশন খানের সম্মুখের সোফায়। উপর দিয়ে তাকে বেশ নির্বিকার মনে হলেও আপনমনে ভাবুক হয়ে আছে সে। চাচ্চু কি বলবেন? ইনভেস্টমেন্টে লস হওয়ার ব্যাপারটা এতক্ষণে শুনেছেন নিশ্চয়! সেই ব্যাপারেই হয়তোবা কৈফিয়ত চাইতে পারে। কারণ সাফওয়ান লোন সব রওশন খানের কাছ থেকেই তো নিয়েছিলো। তার আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝে রওশন খান হুট করে প্রশ্ন করলেন,
‘ মেয়েটা কে? ‘
সাফওয়ানের কপালে ভাঁজ পড়লো। কথাটার মানে বুঝলো না যেন। সন্দিহান কন্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করলো,
‘ কোন মেয়ে? ‘
‘ যার জন্য রাতারাতি বিজনেস বিল্ড আপ করার যুদ্ধে নেমেছ সেই মেয়েটি কে? ‘
সাফওয়ানের নির্বিকার মুখাবয়বে এবার কিঞ্চিৎ চমকিত ভাব পরিলক্ষিত হলো। সে ভ্রু তুলে তাইলো রূপমের দিকে। তৎক্ষনাৎ রূপম দ্রুত মাথা নেড়ে বুঝালো সে কিচ্ছুটি জানে না, কিছু বলেনি কাউকে৷ দুই ভাইয়ের নিরব ইশারা ইঙ্গিত বুঝে রওশন খান পুণরায় বললেন,
‘ ওকে দেখে লাভ নেই। কেউ আমাকে কিছু বলেনি। আমার চুল-দাঁড়ি রোদে পাকেনি যে সব দেখেও কিছু টের পাবোনা। তোমার এমন বেসামাল আচরণ দেখেই বুঝতে পেরেছি কাউকে পাওয়ার জন্যে এমন দিশেহারা হয়ে উঠেছ তুমি৷ বলো, মেয়েটা কে? কোথায় থাকে? ‘
সাফওয়ান কি একটুখানি লজ্জা পেল? বোধহয় অস্বস্তি বোধ করলো কিঞ্চিৎ। ফলে কান লাল হয়ে উঠলো তার। কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি তখনো স্বাভাবিক। এই পর্যায়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসলো সে। বলবে বলবে না ভেবেও ছোট্ট করে জবাব দিলো,
‘ আমার বন্ধু আবরারের ছোট বোন। তোমরা অনেকবার দেখেছ। ‘
রওশান খানের কপাল কুঁচকে গেলো এই জবাবে৷ কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত করে তিনি চেনার চেষ্টা করলেন মেয়েটাকে। অতঃপর, সন্দিহান কন্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করলেন,
‘ আমাদের সাফার বান্ধবী হয় যে, ওই বেশি কথা বলা মেয়েটা? ‘
রূপম আচমকা হেসে ফেললো একথা শুনে। পরমুহূর্তে পরিস্থিতি বিবেচনা করে একহাতে মুখ চেপে হাসিটুকু গিলে নিলো। সাফওয়ান ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রয়েছে। তারও একটুখানি হাসি পেয়েছিল বুঝি! মুখ ফুটে জবাব না দিয়ে সে কেবল মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। তা দেখে ভারী আশ্চর্য হলেন রওশন খান। উনাকে বেশ ভাবুক দেখালো প্রায় মিনিট দুয়েক। সাফওয়ানের দিকে একধ্যানে তাকিয়ে কি যে ভেবেছেন কে জানে! ক্ষণিক পর গলা ঝেড়ে সিরিয়াস ভঙ্গিমায় নড়েচড়ে বসে শুধালেন,
‘ এখন কি করবে ভেবেছো কিছু? ‘
এবারেও মাথা নাড়লো সাফওয়ান। সে সত্যিই ভেবে দেখেনি পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে। জগৎ এলোমেলো লাগছে ভীষণ। কোথা থেকে নতুন ভাবে শুরু করা যায় তা সে বুঝে উঠতে পারছে না। রওশন খান যেন বুঝে ফেললেন ছেলের মনোভাব। নরম গলায় বললেন,
‘ এইযে তোমরা সব ভাই বোনেরা আমরা বাবা-চাচাদের টাকায় আরামে জীবন কাটাচ্ছ। এই অর্থবিত্ত সব কিন্তু তোমাদের দাদার দেওয়া নয়। কিছুটা তাদের জুড়ানো হলেও আজকের সম্পূর্ণ Ocean Group Of Industries
আমাদের তিন ভাইয়ের কঠোর পরিশ্রমের ফসল। আমাদের ইচ্ছে ছিলো আমাদের পরিবর্তে এই কোম্পানি তোমরা এগিয়ে নিয়ে যাবে। সেইভাবেই আমরা শেয়ার ভাগ করবো ভেবেছিলাম। ‘
‘ তুমি এ বাড়ির বড়ো ছেলে। স্বাভাবিকভাবে পরবর্তী এম.ডি পজিশনে তোমার আসার কথা। কিন্তু তুমি আমাদের কোম্পানির শেয়ারে ভাগ না নিয়ে নিজে কিছু করতে চাইছো সেকথা খোলামেলা ভাবে বলা যেতো না? অন্তত একবার আবদার করে দেখতে। আমি, তোমার বাবা কিংবা তোমার ছোট চাচ্চু কি সেভাবে সাহায্য করতাম না তোমাকে? ‘
‘ ব্যাপারটা তেমন না চাচ্চু.. ‘
‘ যেমনই হোক। তোমার উচিত ছিলো আমাদের কারো সঙ্গে একবার শেয়ার করা। তুমি যে হঠাৎ করে এত লাখ টাকা ধার চেয়েছ। আমি কারণ জানতে চেয়েছি? আমাদের বড় ছেলে বলে তোমার উপর পূর্ণ আস্তা ছিলো দেখে, তুমি নিজ থেকে কারণ জানাবে সেই আশায় আমি কিচ্ছুটি জানতে চাইনি। কিন্তু তুমি আমাকে কিছুই জানাওনি। না জেনে বুঝে টাকা সব শেয়ার বাজারে ডুবিয়েছ। ‘
সাফওয়ান চুপটি করে কেবল শুনে গেলো৷ রওশন খানের বলা একটা কথাও যে মিথ্যে নয়। বিজনেস সম্পর্কে সাফওয়ানের এখনো ততোটা জ্ঞান হয়নি যে কারো কোনরূপ সাহায্য, মতামত ছাড়ায় নিজ অভিজ্ঞতায় বিজনেস করবে। চেষ্টা তো করেছিলো। কিন্তু ফলাফল সেটাই মিললো, যা হবে বলে আন্দাজ সে নিজেও করেছিলো।
‘ খান বংশের ছেলে তুমি। আমাদের রক্ত দমে যাওয়ার মতো নয় সে আমি জানি। বলো, কিছু ভেবেছো? কোথা থেকে আবার শুরু করবে? ‘
‘ আমি কিছু ভেবে দেখিনি চাচ্চু। প্রথমবারে জেদের বশে ডিসিশন নেওয়াটা আমার ভুল ছিলো সেটা আমিও মানছি। আপাতত আর কোন পরিকল্পনা নেই। তুমি কি বলতে এসেছে সেটাই বলো। ‘
রওশন খান যেন একথার অপেক্ষাতেই ছিলেন। রূপমকে ইশারা করামাত্র সে একটি ম্যাগাজিন বাড়িয়ে দিলো সাফওয়ানের দিকে। একটি বিদেশি কোম্পানি Blue Wave Group Of Industries এর ম্যাগাজিন। সাফওয়ান উল্টে পাল্টে দেখলো সেটা। আহামরি বড় কোন কোম্পানি নয়। মোটামুটি প্রফিট নিয়ে বিজনেস টিকিয়ে রেখেছে বলেই ধারণা করা যায়। সাফওয়ান পড়ে দেখলো কোথাকার কোম্পানি এটি। ফ্রন্ট পৃষ্ঠাতেই বড বড়সড় অক্ষরে লিখিত রয়েছে SWEDEN। সাফওয়ানের ভ্রুঁ যুগল কুঁচকে আসলো এবারে। সন্দিহান কন্ঠে বললো,
‘ বিদেশি কোম্পানির ম্যাগাজিন দেখে আমি কি করবো? ‘
‘ কোম্পানিটা চিনতে পারছো না তুমি? সুইডেনের যেই কোম্পানিতে ফোর্টি পার্সেন্ট শেয়ার কিনেছিলাম চার বছর আগে। এটা সেই কোম্পানি। ‘
সাফওয়ান চুপ করে রইলো। অপেক্ষায় রয়েছে পরবর্তী কথাগুলো শোনার। রওশন খান এবারে সোজা হয়ে বসলেন। স্পষ্ট গলায় বললেন,
‘ আমি চাইছি এই কোম্পানিতে আমার জায়গাটা তুমি নিজের করে নাও। ‘
‘ তুমি আমাকে সুইডেন পাঠাতে চাইছো? ‘
‘ ব্যাপারটা তেমন নয়। আবার অনেকটা তেমনই। দেশ না ছাড়লে তুমি নিজে যেভাবে কাজ এগুতে চাইছো সেভাবে কিছুই করতে পারবে না। বাংলাদেশের কোন ওয়াল নোন কোম্পানির অধীনে তো তুমি কাজ করতে চাইছো না। নিজ থেকে নিজের বিজনেস শুধু করতে চাইছো যখন
দেশে থেকে এভাবে নিজের বিজনেস কখনোই বিল্ড আপ করতে পারবে না। ‘
‘ আমাদের ব্লু ওয়েব কোম্পানির অবস্থা বর্তমানে খুব একটা ভালো নয়। তেমন প্রফিট হয়না। দুবাইয়ের প্রভাবশালী একজন আমাদের কোম্পানি কিনে নিতে চাচ্ছে। কোম্পানির বাকি সিক্সটি পার্সেন্ট শেয়ার যার অধীনে আছে সেও চাচ্ছে বিক্রি করে দিতে। কিন্তু আমি আপাতত আমার শেয়ার বিক্রি করতে চাচ্ছি না। রূপমের পড়াশোনা শেষ করতে এখনো ঢের সময় বাকি। যোগ্য হিসেবে আমার জন্য তুমিই আছো। বিগত
আড়াই মাসে অন্য কোম্পানিতে তুমি যতটুকু পরিশ্রম করেছ, একই পরিশ্রম এই কোম্পানির জন্য করলে অবশ্যই প্রফিট আসবে। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে, তোমার জোশ, তোমার এফোর্ট এবং তোমার পাগলামি দেখে বলছি। এই জেদ ধরে রেখে একটা বছর অন্তত পরিশ্রম করে দেখো, কোম্পানির মান উন্নয়ন তো হবেই। তুমি চাইলে অবশিষ্ট শেয়ার থেকে আরও কিছু শেয়ার কিনে নিতে পারবে। সবটা তোমার পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে। আমি জানি তুমি পারবে। ‘
রওশন খান থামলেন। ভাবুক হয়ে থাকা সাফওয়ানের দিয়ে চেয়ে রইলেন উত্তরের আশায়। অবশ্য কোনরূপ তাড়াহুড়ো নেই। সে-ই হিসেবে ভেবে তিনি পুণরায় আওড়ালেন,
‘ সময় নিয়ে ভাবো। ভেবে আমাকে জানাও তুমি এই প্রস্তাবে রাজি কিনা। আমি সেভাবেই সব বন্দোবস্ত করবো। ‘
‘ আমাকে তোমার ভাগের শেয়ার দিয়ে দিলে এতে তোমার লাভটা কি, চাচ্চু? এভাবেই তো কোটি টাকার শেয়ার আমাকে দিয়ে দিবে না জানি। বলো, বিনিময়ে কি চাও? ‘
এই পর্যায়ে রওশন খান মৃদু শব্দে হেসে ফেললেন। ছেলেটা এতো বেশি বিচক্ষণ তা জানা সত্ত্বেও বিচক্ষণতা দেখে খুশি হলেন। তিনি যেন অপেক্ষায় ছিলেন এই প্রশ্নের। সাফওয়ানের বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি জোড়ায় দৃষ্টি মিলিয়ে জবাব দিলেন,
‘ বিনিময়ে যা চাইছি সেটা দেওয়ার সামর্থ্য এখনো হয়নি তোমার। যা চাই তা দেওয়ার জন্য হলেও আমার প্রস্তাবে রাজি হতে হবে তোমাকে। ‘
‘ কোন ধোঁয়াশা রাখতে চাচ্ছি না, চাচ্চু। আমাকে ক্লিয়ারলি জানাও। ‘
‘ বেশ! তবে শোন, আমাদের ওশেন গ্রুপে ভবিষ্যতে তুমি যেটুকু শেয়ারের ভাগিদার হবে ঐ শেয়ার আমার চাই। হোক তা টেন পার্সেন্ট, কিংবা এইটি পার্সেন্ট। তোমার শেয়ার আমি রূপমের জন্য চাই। ‘
এহেন প্রতিউত্তর শুনে রূপম ভীষণ চমকালো। স্পষ্ট রূপে দেখা দিলো তার আশ্চর্য প্রতিক্রিয়া। এ কেমন কথা! ভেতরে ভেতরে খচখচ লাগলেও দুজনের মাঝে কথা বললো না সে৷ সাফওয়ান নিজেই সন্দিহান কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আমার ভাগে যে শেয়ার আসবেই এটারই বা কি গ্যারান্টি? যদি বাবা আমাকে তার সম্পদের কোন ভাগ না দিতে চায় তখন? তুমি এতো কনফিডেন্স নিয়ে কীভাবে এমন ডিল করতে পারছো? ‘
‘ বড় ভাইজান কখনো বিনা লাভের আশায় নিজের টাকার এক পয়সাও বাইরের কারো জন্য খরচ করেন না। তার জীবন জুড়ে তোমরা দুজনে আছো। আমার যতটুকু ধারণা, ইতোমধ্যে সে নিজের সম্পদের অর্ধেক ভাগ তোমার নামে লিখে ফেলেছে। সেসব কিছু আমি চাইনা। অর্থবিত্তের অভাব আমার-ও নেই। আমি শুধু আমাদের কোম্পানির আরও কিছু শেয়ার একারণে চাইছি কারণ রূপম কিংবা কারো উপর আমার এতটা ভরসা নেই। যে ওরা বিদেশে গিয়ে আমার অন্যান্য ব্যাবসা চালাতে পারবে। আড়াই মাস আগ অবধি এই ভরসা তোমার উপরেও ছিলনা। কিন্তু এখন আমি মনে প্রাণে মানি, একটা সময় শখ করে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যে পার্টনারশিপ আমি করেছিলাম। সেটা আমার হয়ে তুমি টিকিয়ে রাখতে পারবে। আমি এই পার্টনারশিপ হারাতে চাইছি না।
কিন্তু একই সঙ্গে এখানের ব্যবসার পাশাপাশি দেশে বিদেশে দৌড়ঝাঁপ করে দুই দিক সামলানো টাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি শুধু চাইছি এই শেয়ার আমার হাতছাড়া না হোক, কোম্পানিটা না ডুবুক। আমি, আমার ছেলে কিংবা ভাইয়ের ছেলে যে-ই পারুক না কেন পার্টনারশিপ অন্তত টিকিয়ে রাখুক। আর বিজনেসের মামলা যেহেতু, বিনিময়ে কিছু তো দিতে হবেই। এই ফোর্টি পার্সেন্ট শেয়ার আগামীতে রূপমের নামের হওয়ার কথা ছিলো। এখন যেহেতু তোমার নামে হস্তান্তর হবে, তার বিনিময়ে তুমি আমাদের ওশেন গ্রুপে তোমার শেয়ারটুকু রূপমকে দিয়ে দিবে। এর বাইরে বিদেশে তুমি কোটি টাকার শেয়ার কিনে নিলেও আমাদের কোন দাবি থাকবে না সেটা তুমিও জানো। চাচ্চুর উপর এটুকু বিশ্বাস আছে তাইনা? ‘
সাফওয়ানের জবাব নেই। অনিমেষ দৃষ্টিতে ম্যাগাজিনের দিকে তাকিয়ে সে কেবল রওশন খানের সব কথা শুনে গেল। চাচা, ভাইদের উপর তার অগাধ বিশ্বাস রয়েছে। তার বাবা – চাচা তিনজনের কারো কাছে অর্থবিত্তের অভাব নেই। হয়তোবা রওশন খানের সঙ্গে বাকি দুজনের তুলনা দিতে গেলে উনার ভাগের সম্পদ বেশি বলে গণনা হবে। কারণ দেশে বিদেশের বেশিরভাগ ব্যবসা তিনি একা হাতে সামলে এসেছেন, বর্তমানেও সামলাচ্ছেন। সেই হিসেবে ভেবে দেখলে, সাফওয়ানের বাবার কোন কিছুতে লোভ করার মানুষ নন তিনি। প্রয়োজনও হবে না কখনো। সাফওয়ানের কাছে এমন প্রস্তাব রাখার উদ্দেশ্য সেটাই যা রওশন খান নিজ মুখে বলেছেন। কেবল নিজের শখটুকু ধরে রাখা। ভাইয়ের ছেলের অধীনে হোক না কেন, তিনি অন্তত দেখতে পারবেন যে একটা সময় শখের বশে কেনা শেয়ার যে ভবিষ্যতেও টিকে রয়েছে, হাতছাড়া হয়নি।
সাফওয়ান প্রায় মিনিট দুয়েক ধ্যানমগ্ন হয়ে রইলো। অতঃপর, বুক ছিড়ে দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে ভারিক্কি গলায় আওড়াল,
‘ বছরজুড়ে সবাইকে ছেড়ে থাকা সম্ভব নয়, চাচ্চু। তুমি বলো যে কোন সময় দেশে ফিরার সুযোগ করে দিবে কিনা? ‘
ছোট থেকেই গম্ভীর স্বভাবের দেখে আসা ছেলেটাকে বর্তমানে এমন পাগলাটে রূপে দেখে রওশন খান আশ্চর্য হওয়ার সঙ্গে মজাও পাচ্ছেন বোধহয়। এই মুহুর্তে সাফওয়ানের বলা কথাটা শুনে তিনি আবছা ভাবে হাসলেন। কেমন কিশোর ছেলের আবদারের মতো শোনাল কথাটা। হাসিমাখা গলায় তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন,
‘ একটা বছর ছেড়ে থাকতে পারবে না? কি করি তাহলে? সবাইটাকে উঠিয়ে নিয়ে আসার ব্যস্ততা করবো আগে? ‘
এই পর্যায়ে সাফওয়ান নিজেও ঠোঁটের কোণের লম্বা হাসির রেখাটুকু লুকাতে পারলো না৷ ভ্রঁ চুলকে, চোখ বুজে হেসে ফেললো সে নিজেও। সবার নাম দিয়ে সে সত্যিই সায়েরীকে বুঝিয়েছিলো। এভাবে এক বছর কাটানো তো সম্ভব নয়। একটা মাসও মেয়েটার সান্নিধ্য পাওয়া ছাড়া কাটাতে পারবে না সে। অসম্ভব ব্যাপার।
‘ আপাতত উঠিয়ে আনা সম্ভব নয় বলেই তো এসব করে বেড়াচ্ছি। তুমি বলো, যাওয়ার পর কবে আসতে পারবো? ছয়…উঁহু তিন মাসের মাথায় আসা যাবে? কিংবা আরও আগে?
‘ আমি বাঁধা দিলেই বা কি? তুমি মানবে? দেশে না এসে থাকতে পারবে? ‘
সাফওয়ান মাথা নাড়ে। সে সত্যিই এসব নিষেধাজ্ঞার ধার ধারবে না। দেখা গেল কবে সব ছেড়ে ছুড়ে ছুটে চলে এসেছে! দেশ ছাড়ার জন্য মনটা সায় দিচ্ছে না কোনভাবে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই তো সে সায়েরীকে কথা দিয়েছিলো, আর কখনো দুজনার মাঝে কোন দুরত্ব আনবে না। এখন তবে কীভাবে এতো বিশাল দেয়াল তৈরি করবে? সে মুখ ফুটে কেবল বলতে উদ্যত হচ্ছিলো, যে এই প্রস্তাবে সে রাজি নয়। কক্ষনো হতেও পারবে না। সম্মতি জানাতেও ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে তার। রওশন খান বোধহয় সাফওয়ানের মনের দ্বিধা সব পড়ে নিলেন৷ সাফওয়ান না বলার পূর্বেই তিনি বললেন,
‘ এখনই জবাব দিতে হবে না। সময় নাও। তুমি কেনো নিজেদের কোম্পানি ছাড়া আলাদা ভাবে সেটেল্ড হতে চাচ্ছো ভাবো। তোমার সুবিধা, তোমার চাওয়া পাওয়া সব নিয়ে ভালো ভাবে ভেবে তবেই জবাব দাও। তাড়াহুড়ো নেই, সময় নাও। ‘
সাফওয়ান চুপটি মেরে রইলো। যদিও ভাবাভাবির কিছু আছে বলে মনে হলো না তার। সে যাবে না কোথাও। তার পক্ষে কোনভাবে সম্ভব নয় মাসের পর মাস বিদেশের মাটিতে একাকী পড়ে থাকা৷ সায়েরীর কথা ভেবে দমবন্ধ হয়ে উঠলো। মেয়েটা মাত্র কয়েক কিলোমিটারের দুরত্ব সহ্য করতে হিমশিম খায়। দেশ ছাড়ার কথা শুনলে না জানি কেমন উন্মাদ হয়ে উঠে!
যেদিন শেয়ার লস হওয়ার কথা সাফওয়ানের কানে এলো, তার একদিন পূর্ব হতে সায়েরীর সঙ্গে সাফওয়ানের কোনরূপ যোগাযোগ হয়নি। মূলত ব্যস্ততা এবং পরবর্তীতে মানসিকভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিল বলে সাফওয়ান নিজেই কোন যোগাযোগ করেনি। সায়েরী কতশত কল,মেসেজ দিল৷ সে কিচ্ছুটি দেখলো না, রেসপন্স করলো না৷ পরবর্তী দিনে রওশন খানের দেওয়া প্রস্তাবে সাফওয়ানের মন মস্তিষ্ক আর ও ঘেটে গেল। কারোর সঙ্গেই কোনরূপ কথাবার্তা বললো না সে। সারাটাদিনে নিজ ঘর থেকেও বের হলো না। অন্যদিকে সায়েরীর তখন দিশেহারা অবস্থা। অভিমান এবং দুশ্চিন্তায় মেয়েটা কেমন মুড়ছে পড়েছে। তৃতীয় দিনে সাফ্রিনের কাছ থেকে রূপমের নাম্বার চেয়ে নিলো সে। লাজ লজ্জা ভুলে ভর দুপুরের সময়েই কল দিলো রূপমকে। প্রথম বারেই রিসিভ করলো রূপম। ওপাশ হতে সায়েরী যখন নিজের পরিচয় জানালো, বেচারা তখন ভীমড়ি খেলো প্রায়। একদিকে খুশিও হলো।
সে নিজেই সুযোগ খুঁজছিলো সায়েরীর সঙ্গে কথা বলার জন্য। কিন্তু একমাত্র সাফওয়ানের কাছে ধরা পড়ার ভয়ে চুপ মেরে ছিলো। কিন্তু এখন সুযোগটা যেহেতু সায়েরী নিজেই করে দিয়েছে। তখন আর কোন লাগাম মানলো না সে। সায়েরী যখন সাফওয়ানের ব্যাপারে জানতে চাইলো, তখন সে হড়বড়িয়ে জানিয়ে দিলো গত দিনে সাফওয়ানের এক্সিডেন্টের ব্যাপারে, খাবারে অনিয়ম করায় প্রেশার ফল হয়ে যে হাসপাতালে গিয়ে স্যালাইন লাগাতে হয়েছে। সেকথাও বলতে ভুলল না। কেবলমাত্র শেয়ার লস হওয়ার ঘটনা ব্যতীত, এতগুলো মাস ধরে সাফওয়ান কেমন উন্মাদের মতো দিন দুনিয়া ভুলে কাজে ডুবে ছিলো সেসব ঘটনা সায়েরীকে জানিয়ে তবেই ক্ষান্ত হলো রূপম। সব কথা শুনে সায়েরী যেন মূর্তি বনে গেল। কোন প্রতিউত্তর না করেই কল কেটে দিল সে। তীব্র অভিমানে বুকটা ভারী হয়ে উঠলো তার। সাফওয়ান ভাই কেনো হঠাৎ এভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে তা সে বুঝ উঠতে পারছে না। খান বংশের নিজেদেরই এতো বিশাল কোম্পানি রয়েছে। তবে অন্য কোম্পানিতে নিজ মালিকানা পাওয়ার জন্য এতো উন্মাদ হওয়ার কি প্রয়োজন?
সায়েরী অনেকটা তেজ নিয়ে ফের করলো সাফওয়ানকে। জানে রিসিভ হবে না। তবুও একের পর এক অগণিত বার কল করলো। রিসিভ হবে এই আশা তার ছিলো না। কিন্তু সপ্তম বারে হঠাৎ অপর ব্যক্তি কল রিসিভ করেছে দেখে চমকে উঠলো সে। আশ্চর্য হয়ে কোন কথা বলতে পারলো না প্রথমে। নিরবতা ভেঙ্গে সাফওয়ান নিজেই বলে উঠলো,
‘ কথা বলছো না কেনো? ইম্পর্ট্যান্ট কিছু বলার না থাকলে রাখি? আমি বাসায় গিয়ে ক… ‘
‘ ইম্পর্ট্যান্ট কথা ছাড়া আমি আপনাকে ফোন করতে পারি না? দুই দিন আগেও যখন তখন ফোন করার অধিকার সপে দিয়ে এখন আপনি আমাকে ব্যস্ততার দোহায় দিচ্ছেন কেনো সাফওয়ান ভাই? আপনার আদৌ কোন খেয়াল আছে আমার দিকে? আমি কেমন আছি, কোথায় আছি, আপনার সঙ্গে তিনটা দিন যোগাযোগ না করেও কীভাবে থাকছি সেসব আপনার একবারও জানতে ইচ্ছে করলো না? বাসায় গিয়ে কল করতে হবে না। বরং আর কক্ষনো আমাকে ফোন করার কোন প্রয়োজন নেই। আপনার এতো বেশি ব্যস্ত জীবনে আমাকে নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করারও দরকার নেই। আপনি সিলেটেই থেকে যান আজীবন। আমার কাছে ফিরে আসার প্রয়োজন নেই। ‘
রাগে, অভিমানে সাফওয়ানের কথার মাঝেই একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠেছে সায়েরী। কান্না চেপে রাখার ফলে তার কন্ঠে স্পষ্ট কম্পন ধরা দিয়েছে। এই মুহূর্তেও জ্বলছে চোখজোড়া। সে রাগের বশে এতগুলো কথা শোনালেও কল কাটলো না। মোবাইলটা কানেই ধরে রাখলো। বেহায়া মনটা যে তখনও আশায় রয়েছে কোন প্রতিউত্তর শোনার। কিন্তু অপরদিক হতে কোন শব্দ এলো না। প্রায় মিনিট খানিক দুই পক্ষের নিরবতার পর সাফওয়ান নিজেই কল কেটে দিলো। সায়েরী থমকে গেলো তা দেখে। ঝাপসা চোখে মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেটা আচমকা ছুড়ে ফেললো বিছানায়। দুহাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে উঠলো। তার সাজানো গোছানো সম্পর্কটা হঠাৎ এমন এলোমেলো হয়ে যাবে তা সে কক্ষনো আন্দাজ করেনি। তাকে চোখে হারানো সাফওয়ান ভাই যে দিব্যি তাকে ছাড়া দিন কাটাতে পারবে এমন কিছু সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। কেনো এমন ছন্নছাড়া হয়ে গেলো সব? বারে বারে ঠিক হতে চেয়েও কেনো সব পুণরায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়?
দুপুর তিনটে নাগাদ সাফওয়ানের সঙ্গে কথা বলার পর কান্না করার একপর্যায়ে ঘুমিয়ে গেল সায়েরী। সন্ধ্যায় মেহরিন বেগম অনেক বকাঝকা করে উঠালেন, জোর করে খাইয়ে দিলেন। সায়েরীর ফুলোফুলো চোখমুখ দেখে প্রশ্ন করলে মাথা ব্যথা বলে এড়িয়ে গেল মেয়েটা। মেহরিন বেগম প্রশ্ন করলেন না। মেডিসিন খেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে বললেন। সায়েরী করলো ও তাই। মাথাটা ভার হয়ে আছে বলে সে পুণরায় ঘুমিয়ে পড়লো। রাত দশটার পর কাঁচা ঘুম ভাঙ্গলো মোবাইলের রিংটোন শুনে। কোনভাবে হাতড়ে নাম না দেখেই কল রিসিভ করে মোবাইলটা কানে ধরলো। সে কিছুর বলার পূর্বে ওপাশ হতে শোনা গেল এক ক্লান্তিমাখা, গম্ভীর কন্ঠস্বর—
‘ ছাদে আসো, আমি অপেক্ষা করছি। ‘
অবিলম্বে ঘুম ছুটে গেলো সায়েরীর। এক লাফে শোয়া থেকে উঠে বসলো সে। চোখের সামনে মোবাইল এনে চোখ কচলে দেখলো। হ্যাঁ, সাফওয়ানের নামটাই ভেসে রয়েছে স্ক্রিনে। কিন্তু, কিন্তু হঠাৎ এসব কেমন কথাবার্তা! সাফওয়ান ভাই না সিলেটে ছিলো! তবে ছাদে…মানে কীভাবে?
একাধিক প্রশ্নে সায়েরীর মাথায় জট পাকিয়ে গেল। অবশ্য খুব বেশি আশ্চর্য হলো না সে। সাফওয়ানের এমন পাগলামির নমুনা পূর্বেও দেখেছে বলে আজ বিশেষ চমকালো না সে। কেবল অভিমান গাঢ় হলো, কান্না পেলো। ধরা গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ আসবো না কোথাও। আপনি কেনো এসেছেন? আপনার এতো ব্যস্ততা ফেলে আমার কাছে এসে সময় নষ্ট করছেন কেনো? ফিরে যান, আমি কোত্থাও যাবো না। ‘
সাফওয়ানের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। দুই সেকেন্ড নিরবতার পর সে বললো,
‘ একটানা আট ঘন্টা ড্রাইভ করে এসেছি, সুবহা। কাম ফাস্ট। আমার টায়ার্ড লাগছে ভীষণ। ‘
আট ঘন্টা! মানে দুপুর তিনটার সেই ফোনকলের পর পর রওনা দিয়েছিলো! কেমন পাগলামি কান্ড! সায়েরীর অভিমান বোধহয় গলে যেতে চাইলো। কিন্তু জেদ অব্যহতি রেখে সে তেজি সুরে ফের বললো,
‘ বললাম তো আসবো না। আমি বলেছি টানা আট ঘন্টা ড্রাইভ করে আসার জন্য? যেভাবে এসেছেন সেভাবে ফিরে যান। আমি আসছি না। ‘
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৭
পুণরায় নিরবতা। অন্যান্য সময়ের মতো আজ সাফওয়ান গম্ভীর কন্ঠে ধমক দিয়ে ছাদে আসতে বাধ্য করলো না। প্রায় মিনিট খানিক নিরবতার পর সায়েরী যখন সাড়া না পেয়ে কল কাটতে উদ্যত হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে নিরবতা ভঙ্গ করে অত্যাধিক গভীর, কোমল, আদর মেশানো কন্ঠে সাফওয়ান শুধাল,
‘ এভাবেই ফিরে যাবো? একটু বুকে আসবে না? ‘
