Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৯

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৯

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৯
সাজিয়া জাহান সুবহা

ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে রাত দশটা চল্লিশের দিকে। রাত্রি ভোজন শেষে সায়েরীর মা এবং আবরারের মা দুজনে মিলে থালাবাসন সব গুছিয়ে রাখছিলেন। বর্তমানে ঘরে উপস্থিত সদস্য সংখ্যা ছয় জন। আবরার বরাবরের মতোই অনুপস্থিত। এক্সাম শেষ হলেও সে চট্টগ্রাম থেকে এখনো ফিরেনি। বাড়ির কর্তা দুজন ইতোমধ্যে ঘুমের প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছেন। সকলে যখন নিজ নিজ কর্মে মশগুল, এমন সময় নিজ কক্ষ থেকে ছুটন্ত পায়ে বেরিয়ে এলো সায়েরী। এলোমেলো হাত খোপায় আটকানো চুলগুলো ঢিল ভাবে এসে থমকেছে তার বাম কাঁধে। মেয়েটা ছুটে বেরিয়েছে অনেকটা ঝড়ের গতিতে। এক মুহূর্তের জন্য বোধহয় ভুলে বসেছিলো তার পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি। মেহরিন বেগমের কন্ঠ শুনে আকস্মিক স্থির হলো তার পদচারণ,

‘ এতো রাতে এভাবে কোথায় ছুটছিস ? ‘
ক্ষণিকের জন্য সায়েরী বিমূঢ় হয়ে গেলো। ধরা পড়া চুরের মতোন ধ্ব্‌ক করে উঠলো অন্তস্থল। পরক্ষণে ব্যস্ত সুরে কৈফিয়ত দেওয়ার সুরে বলে উঠলো,
‘ ছাদে যাচ্ছি আম্মু। পিউ দি ডেকেছে। এক্ষুণি চলে আসবো। ‘
‘ এতো রা… ‘
‘ এইতো যাবো আর আসবো প্লিজ আম্মু। আজ তো নতুন বের হচ্ছিনা রাতবিরেতে। যাচ্ছি আমি.. ‘
‘ যাচ্ছি মানে? এই..সায়ু! সেদিনও অন্ধকারে ভয় পেয়ে রাতভর কাঁদছিলি। আবার তুই.. সায়েরী! ‘
মেহরিন বেগমের আপত্তি টুকু সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে গেলো সায়েরী। ছুটে গিয়েছে আবছা অন্ধকার সিড়িপথ বেয়ে। পেছনে মেহরিন বেগম তখনো অসন্তুষ্ট গলায় শাসালেন ওকে। আবরারের মা তখন বুঝানোর সুরে আওড়ালেন,
‘ এত বকাবকি করছিস কেন? এখনো বেশি রাত হয়নি। ছোট থেকে দুজনে এমন রাত বিরেতে ছুটাছুটি করে দেখিস না? আর এসব তো আমাদের কাছে দেখে এখন বাজে অভ্যাস করে ফেলেছে ওরা। পিয়াসের মায়ের সঙ্গে সন্ধ্যা অবধি যে আমরা দুজনে ছাদে বসে আড্ডা দিতাম সেই থেকে মেয়ে দুটোর এমন সাহস বেড়ে গিয়েছে। এখন বকে আর কি করবি? বাদ দে। চলে আসবে একটু পর। ‘
বুঝ পেয়ে মেহরিন বেগম আর কথা বাড়ালেন না। দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে পুণরায় কাজে মগ্ন হলেন।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আজও বিদ্যুৎ নেই। বলা চলে, গোটা এলাকার বিদ্যুৎ নাই করে দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট এক উন্মাদ প্রেমিক পুরুষের আদেশানুসারে। আবছা অন্ধকার সিড়ি পথ বেয়ে ছাদে প্রবেশ করলো সায়েরী। অন্ধকারে যেই মেয়ের দম বন্ধ হয়ে আসে। সে আজ বড় অবলীলায় অন্ধকারের মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়ালো ছাদের দরজার কাছটাতে। ভয়ডর নামক কোন অনুভূতি নেই অন্তঃকরণে। কিছুটা অভিমান, বেশ কিছু অভিযোগ, এবং সীমাহীন প্রেমানুভূতিতে উতালপাতাল হয়ে আছে বক্ষপট। মেয়েটা দম নিলো। নগ্ন পায়ে এগোল সম্মুখে। হিমেল হাওয়ার সঙ্গে নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করলো চিরপরিচিত পুরুষালি সুঘ্রাণ। ইশ!! কত কত দিন পর সায়েরীর ভেতরটা মাতোয়ারা হলো এই সুবাসে! আবেশে চোখ বুজে এলো তার। সম্মুখে এগোনোর, চোখ তুলে তাকানোর সাহস হলো না যেন। মনে হচ্ছে, তাকালেই সব হাওয়া হয়ে যাবে।

এই ঘোর ভেঙ্গে যাবে, সাফওয়ান ভাই মিলিয়ে যাবে পুণরায়। কিন্তু তবুও সে মাথা তুলতে বাধ্য হলো। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো দক্ষিণ পাশে ছাদের কিনারায়। ওইতো, ওখানে স্পষ্ট দৃশ্যমান ধূসর টি-শার্ট গায়ে বলিষ্ঠ পুরুষালি অবয়বটি। দমকা হাওয়ায় মানুষটার বাদামি চুল এলোমেলো-ভাবে উড়ছে। ঝাপসা দৃষ্টি মেলে সেদিকে তাকাতেই চার চোখের দৃষ্টি মিলল। তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে উঠলো রেলিংয়ের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাফওয়ানের সুঠাম দেহটি। প্রসারিত হলো দুই বাহু। বাহুদ্বয় দুইদিকে ছড়িয়ে শূন্যে ভাসমান হাতের আঙুল নাড়লো ইশারায়। নিঃশব্দে আবেদন জানালো এক শক্ত আলিঙ্গনের। যেনো আকুল গলায় বলছে, ‘ একটু বুকে আসো.. ‘

ফোনালাপের সেই আকুতিভরা কন্ঠের আবদার শোনার পর, এই মুহুর্তে এটুকু ইশারা পেয়ে সায়েরীর ভেতরটা কেমন দুমড়েমুচড়ে গেলো। দৃষ্টি নত করে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে দিলো সে। পরমুহূর্তেই নগ্ন পায়ে ছুট লাগালো। নুপুরের রিনিঝিনি ছন্দ তুলে, হাওয়ার তালে খোলা চুল উড়িয়ে মিশে গেলো সাফওয়ানের উষ্ণ বুকে। ক্রন্দনরত মুখশ্রীটি ডুবে গেলো সাফওয়ানের প্রসস্থ কাঁধে। খামচে ধরেছে পিঠের দিকের টি-শার্ট। তার পা জোড়া শূন্যে ভাসছে। মেয়েলি দেহটির সবটুকু ভার বড় অবলীলায় তুলে নিয়েছে সাফওয়ান। কটিদেশ এবং পৃষ্ঠদেশ জড়িয়ে সায়েরীকে আবদ্ধ করেছে এক গভীর আলিঙ্গনে। মুখ ডুবিয়েছে ঘাড়ের কাছে, এলোমেলো চুলের ভাঁজে। বুক ভরে শ্বাস টানলো সে। ভাবলো, কতদিন হলো এই ছোট্ট, কোমল দেহটি বুকে জড়ায়নি সে? সাফওয়ান হিসেব করতে পারলো না। সে চাইলো ও না সেসব ভাবতে। সায়েরীর অর্ধ উন্মুক্ত গ্রীবাদেশে গভীরভাবে একবার ঠোঁট ছুঁয়ে পুণরায় রেলিংয়ে হেলান দিলো পূর্বের মতো। মেয়েটা যে কাঁদছে, তাতেও বাঁধা দিলো না। কোন কথা বললো না। যেনো দেখতে চাইছে, কতক্ষণ কাঁদতে পারে কাঁদুক। তার নিরবতার মাঝে বেশ কসরতে নিজের অশ্রু থামাল সায়েরী। বাহুডোর হতে মুক্ত হতে চাইলে যখন ব্যর্থ হলো, তখন সেই অবস্থাতেই মুখ ডুবিয়ে রাখলো সাফওয়ানের কাঁধে। ভাঙ্গা গলায় অভিমানী সুরে আওড়াল,

‘ আপনি না ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন? তাহলে এখানে এসে অযথা সময় নষ্ট করছেন কেনো? ‘
সাফওয়ান শান্ত স্বরেই পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল–
‘ তুমি না ছাদে আসবে না বলেছিলে? তাহলে এখন বুকে মিশে আছো কেনো? ‘
‘ আমি মিশে নেই। আপনি ধরে রেখেছেন কেনো? কাছে আসাতে সমস্যা যখন তাহলে ওভাবে ডেকেছিলেন কেনো? ‘
‘ জোর তো করিনি। ডাকলেই আসতে হবে কেনো? ‘
সায়েরীর মন ক্ষুন্ন হলো এবারে। আসতে হবে কেনো মানে? অমন আকুল কন্ঠে ডেকে এখন তাকেই কথা শোনাচ্ছে! গাল ফুলিয়ে আলিঙ্গন ছুটাতে চাইলো সে। শূন্যে ভাসমান দুই পা দাপাদাপি করছে জমিন স্পর্শ করার তাগিদে। তীব্র অভিমানী কন্ঠে সে জোর গলায় বলল,

‘ ভুল করেছি এসে। আর কক্ষনো আসবো না৷ উফফ! ছাড়ছেন না কেনো? ‘
কোমর জড়িয়ে রাখা সাফওয়ানের শক্তপোক্ত হাতজোড়া নড়েচড়ে উঠলো। সায়েরী আশ্চর্য হয়ে ভাবলো, এই বুঝি সত্যি সত্যি তাকে ছেড়ে দিলো নিচে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে সাফওয়ান হুট করেই দুজনের অবস্থান পাল্টে ফেললো। চোখের পলকে সায়েরী দেহশ্রী অবস্থান গাড়ল রেলিংয়ের উপর। ঠিক তার সম্মুখে সাফওয়ান। অনেকটাই কাছাকাছি, ঝুঁকে রয়েছে মুখোমুখি। হঠাৎ এমন কান্ডে মেয়েটা ভয় পেলো কিঞ্চিৎ। সেই যে শেষবার দুজনের ছাদে সাক্ষাৎ হয়েছিলো। সেদিন এভাবেই তাকে রেলিংয়ের উপর বসিয়ে সাফওয়ান হঠাৎ তার দুই গাল চেপে আক্রমণ করে উঠেছিলো। ওই মুহূর্তের আতংকিত ভাব পুণরায় ঝেঁকে বসলো মনে। ভয় পেলো ভীষণ। পেছনে তাকিয়ে ছাদ হতে জমিনের উচ্চতা অবলোকন করে সাফওয়ানের বাহু খামচে ধরলো সে। আতংকিত সুরে ডাকতে উদ্যত হলো,

‘ সাফওয়ান ভা.. ‘
অবিলম্বে সেদিনের মতো সাফওয়ানের হাতজোড়া কাজ করে বসলো। সেদিন ছিলো আক্রমণাত্মক। আজ হলো আদর মেশানো। পোক্ত ডান হাতটা বেশ গভীর স্পর্শে সায়েরীর উদর ছুঁয়ে কোমর জড়িয়ে ধরলো। টেনে নিলো নিজের দিকে। একই সঙ্গে নিজেও ঝুঁকলো অনেকখানি। বিনা বাঁধাতে পুরু ওষ্ঠদ্বয় ডুবিয়ে দিলো সায়েরীর কণ্ঠনালিতে৷ মেয়েটা যে চমকে উঠে সরে যেতে উতলা হয়েছে, সেই প্রতিক্রিয়াকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিলো না সাফওয়ান। বরং এবারে দুই হাতেই টেনে নিয়েছে নিজের কাছে৷ ডান হাত দ্বারা সরিয়ে দিয়েছে সায়েরীর বাম ঘাড়ের এলোকেশ সব। পরপরই লাল, কালো তিলক দুটোর উপর ঠোঁট ছোঁয়াল নিগূঢ়ভাবে। সায়েরীর শিরদাঁড়া বেয়ে হীম শীতল স্রোত বয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হলো এবারেও। মৃদুমন্দ কাঁপছে তার ছোটখাটো দেহটি। আবেশে দৃষ্টিজোড়া বুজে এলো আপনাআপনি। দুই হাতের শক্ত মুষ্টিতে আবদ্ধ হয়ে আছে সাফওয়ানের বাহু এবং কাঁধের দিকের টি-শার্টের অংশ। এক দীর্ঘ, প্রগাঢ় চুম্বন শেষে উক্ত স্থানে নাক ঘষে বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানলো সাফওয়ান। রাত্রি প্রহরের এই আবছা অন্ধকারের মতো তার ভারিক্কি কন্ঠটিও শোনা গেলো ভীষণ আবছা, শীতল এবং তেজহীন–

‘ সবকিছু নিয়ে ভীষণ হাঁপিয়ে উঠেছি, সুবহা। আই রিয়েলি ডোন্ট নো হাউ টু স্টার্ট মাই লাইফ ওভার এগেইন। আই ফিল ড্রেইন্ড। এজন্যেই সব কিছু থেকে, সবার কাছ থেকে দুরত্বে থেকেছি এই কটাদিন। একটু সময় চাচ্ছিলাম নিজের জন্য, কিছু সীদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাবার জন্য। কিন্তু তোমাকে ভুলে গিয়েছি একথা কি করে ভাবলে? ভোলার সাধ্য নেই বলেই তো এই তিনদিন কোনো যোগাযোগ করিনি। তোমার কন্ঠটা শুনলেই নিজেকে ধৈর্যহীন মনে হয়। সব কিছু ছেড়ে ছুটে আসতে ইচ্ছে করে। একটুখানি ছুঁয়ে দেখার জন্য বুকের ভেতরটা ছটফট করে। শুধু নিজের দিকটা বুঝলে? তোমার কাছ থেকে দূরে থেকে আমি কতটা অশান্তিতে ছিলাম বুঝো না কেনো? ‘

কন্ঠটিতে কি কিছু মিশানো ছিলো? সায়েরীর ছোট্ট হৃদয়ে জমে থাকা অভিমানের পাহাড় সব কেনো ধসে পড়লো একে একে? তার বন্ধ চোখের কোন ঘেঁষে এক ফোঁটা অশ্রু গড়াল, আনন্দাশ্রু। বোধহয় আপনমনে সে অপেক্ষা করছিলো এমন কিছু বাক্যের, এই জবাবদিহিতার। যা শুনে স্বস্তিতে বক্ষ পিঞ্জর শীতল হয়ে এলো তার। দেহের সবটুকু ভর ছেড়ে দিলো সাফওয়ানের দুই হাতের মাঝে। আপন দুই হাত উঁচিয়ে সাফওয়ানের প্রসস্থ পিঠ, ঘাড় জড়িয়ে চুপটি করে পড়ে রইলো বক্ষপটে। মিনিট খানিক সময় ও অতিক্রম হলো না। নিচ থেকে মেহরিন বেগমের কন্ঠ কানে আসতেই ভয়ে লাফিয়ে উঠলো সায়েরী। আনমনে সাফওয়ানের ডান হাতের কনুই চেপে ধরতেই অস্পষ্ট শব্দ তুলে দ্রুত হাত সরিয়ে নিলো সাফওয়ান। নাক, মুখ কুঁচকে ইঞ্চি দুয়েক দুরত্ব বাড়ালো। তার এহেন প্রতিক্রিয়ায় বেজায় চমকালো সায়েরী। ‘ কি হলো? ‘ বলতে না বলতে নিজেই পুণরায় সাফওয়ানের হাতটি টেনে নিলো নিজের দিকে। ধূসর রাঙা টি-শার্টের কনুই এর দিকটি ভিজে রয়েছে। সায়েরীর দু’হাত ভিজে উঠলো তাজা রক্তে। আতংকে সে লাফিয়ে নামলো রেলিংয়ের উপর হতে। আবারও সাফওয়ানের হাতটি নিজের দিক টেনে নিয়ে আতংকিত কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ রক্ত পড়ছে কেনো? কোথায় ব্যথা পেয়েছেন? এতো রক্ত! আপ..আপনি বললেন না কেনো সাফওয়ান ভাই? ‘
সায়েরীর কন্ঠস্বর কাঁপছে উত্তেজনায়। সাফওয়ানের হাতটি দাম্ভিক ভাবে নিজের কাছে টেনে নিলেও কিচ্ছুটি করতে পারলো না সে। সাফওয়ান অনুভব করলো, তার কনুই জড়িয়ে রাখা সায়েরীর হাতজোড়া কাঁপছে। মেয়েটা এতো সেন্সিটিভ! আবছা আলোয় সাফওয়ানের কপালের বাম দিকে আড়াআড়ি ভাবে লাগানো ব্যান্ডেজ দুটো লক্ষ্য করে দ্বিগুণ উদ্বিগ্ন হলো সায়েরী। রূপমের কথা অনুযায়ী এই ব্যান্ডেজ নিশ্চয় গত কালের এক্সিডেন্টেরর জন্য? কিন্তু হাতের এই ক্ষত? এটা কিসের?

‘ আপনি একটুও শান্তিতে থাকতে দিবেন না আমাকে? এতো এতো আঘাত কীভাবে পেয়েছেন? হাত থেকে রক্ত পড়ছে কেনো? আর কোথায় কোথায় লেগেছে দেখি?’
সায়েরীর ব্যস্ত সুর। সাফওয়ানের হাতটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে চাইলে তার হাতজোড়া নিজ হাতের মাঝে নিয়ে নিলো সাফওয়ান। অন্য হাতে পকেট থেকে রুমাল বের করে সায়েরীর হাতের তালু মুছে দিলো। খানিকটা বিরক্ত সুরে বললো,
‘ আমি এবং আমার বন্ধুর প্রেমে বাগড়া দিবে বলেই হয়তো তোমাদের দুজনের বাপ ভাই মিলে বাউন্ডারিকে এমন ভাঙ্গা কাঁচের কারখানা বানিয়ে রেখেছে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সেখানেই কেটে ফেলেছি। গুরুতর কিছু হয়নি। রিল্যাক্স থাকো। ‘

কথাটার মর্মার্থ বুঝতে সায়েরীর একটু সময় লাগলো। মিনিট এক পরে বুঝলো, পিউদের বাউন্ডারির উপরে যে ছোট ছোট ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো চিপকানো আছে। সেখানেই হাত কেটে এসেছেন জনাব। যেমনটা প্রথমবারে সায়েরীর বারান্দায় উপস্থিত হওয়ার সময় কেটেছিলো, অনেকটা সেরকমই। সায়েরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। গাল ফুলিয়ে বলে,
‘ আপনার মাথায় এমন চোর ডাকাতির টেকনিক কে ঢুকালো? এভাবে রাত বিরেতে দেয়াল টপকে ছাদে আসতে ভয় করেনা? কোনদিন ভাইয়া কিংবা আব্বুদের কাছে ধরা পড়লে কি হবে ভেবে দেখেছেন? আমাকে আস্ত রাখবে তারা? ‘
সাফওয়ানের কপালের মধ্যিখানে ভাঁজ পড়ে দুটো। সায়েরী রক্তমাখা হাতজোড়া পুরোপুরি মুছে ফেলার কাজ অব্যহতি রেখে সে বিড়বিড় করে,
‘ আমার আমানত আমাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলে কি আর এমন রাত-বিরেতে চোরের মতোন দেয়াল টপকা টপকি করা লাগতো? ‘

‘ বিড়বিড় করে কি বললেন? ‘ চোখ পাকিয়ে তাকালো সায়েরী। সাফওয়ান অগ্রাহ্য করে গেলো সেকথা। দুহাতের বেড়াজালে সায়েরীকে আবদ্ধ করলো পুণরায়। খানিকটা গম্ভীর সুরে আওড়াল,
‘ সকাল সাড়ে আটটা, নো কলেজ ইউনিফর্ম। ওখানে শপিং ব্যাগ রাখা আছে। কাল ওটা পরে আসবে। আমি অপেক্ষা করবো। আগের মতোই, রেইনট্রি গাছের নিচটাতে। ‘
সাফওয়ানের বুকে মিশে থাকা অবস্থাতেই সায়েরী ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। দেখে, রেলিংয়ের উপর সত্যিই একটি শপিং ব্যাগ রয়েছে। সে কিছু বলতে উদ্যত হলে তৎক্ষনাৎ তার দুই গাল চেপে ধরলো সাফওয়ান। মুখখানা উঁচু করে ধরে রাশভারী কন্ঠে শুধাল,
‘ আজও গিফট না নেওয়ার জন্য তাল বাহানা জুড়ে দিলে সোজা মাথায় তুলে আছাড় মারবো। চুপচাপ প্যাকেট নিয়ে নিচে গিয়ে ঘুমাবে, যাও। ‘
শক্তপোক্ত আঙুল গুলোর চাপে ফুলে থাকা সায়েরী দুই গাল আরও খানিকটা ফুলে উঠলো হাসির তালে। আজ বহু মাস পরে সাফওয়ানের এমন ধমক শোনার সৌভাগ্য হয়েছে তার। ধমক শুনেও শান্তি লাগছে তার। ফলস্বরূপ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হেসে ফেললো সে। সেই অবস্থাতেই অস্পষ্ট স্বরে জানতে চাইলো,

‘ কিন্তু যাবোটা কোথায়? ‘
‘ আমাদের সুখ নীড়ে। ‘
সায়েরীর গাল চেপে কপালে চুমু খেলো সাফওয়ান। প্রত্যুত্তর করলো কোমল সুরে। জবাব শুনে সায়েরী পুলকিত হলো বেশ। প্রায় মাস দেড়েক কেটে গিয়েছে, সুখ নীড়ে তাদের পদধূলি পড়েনি। এতগুলো দিন পর সুখ নীড়ে দুজন মিলে একান্ত কিছু মুহুর্ত কাটাবে ভেবেই সায়েরীর মুখশ্রী উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সাফওয়ান গাঢ় দৃষ্টিতে অবলোকন করলো প্রেয়সীর উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া। তার চিকন ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হলো মৃদু হাসির ছন্দে। অবিলম্বে সায়েরীর কানের নিচে হাত গলিয়ে ফুলো গালজোড়ায় নিগূঢ়ভাবে চুমু খেলো সে। আলো আঁধারের মাঝে নিজ অধরের সন্নিকটে থাকা মেয়েলি অধর জোড়ার পানে দৃষ্টি পড়লে গলা শুকিয়ে কেমন চৌচির হয়ে উঠলো। চট করে দুরত্ব বাড়ালো সে। ক্ষণিক পূর্বে বলা কথাগুলো ফের একবার আওড়িয়ে রেলিং টপকে পার হলো পিউদের বাসার ছাদে। অতঃপর, যেমন ভাবে এসেছিলো, সেভাবেই গেইট বেয়ে নেমে গেলো রাস্তায়।

বেলা সাড়ে ন’টা। গ্রীন ভ্যালির সফেদ ভিলার অভ্যন্তরে আজও গুমোট নিস্তব্ধতা বিরাজমান। বহুদিন হলো বাড়িতে কারো আনাগোনা হয়নি। আজ আনাগোনা হয়েও স্থির হয়নি দীর্ঘক্ষণ। গ্রীন ভ্যালি, তথা সুখ নীড় নামক ভিলাটি জুড়ে যেই দুজন ব্যক্তির অদৃশ্য অধিকারবোধ রয়েছে সেই দুজন ব্যতীত তৃতীয় কোন ব্যক্তির উপস্থিতি নেই আজকে। বাড়ির সম্মুখের বিশালাকার বাগানটির ফুল গাছগুলোর মধ্যিখানে ফুলের সঙ্গে মিশে দাঁড়িয়ে আছে সায়েরী। সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে অবলোকন করছে চতুর্দিক। তার পরনে শুভ্র রাঙা ফ্লোরাল লং ফ্রক। ঢেউ খেলানো খোলা চুল গুলোর কিছুটা একত্রিত করে, মাথার পেছন দিকে একটি শুভ্র বো-ক্লিপ লাগানো। হরেক রকমের ফুল গুলোর মাঝে সেও যেনো একটি জ্যন্ত ফুল হয়ে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে বাগান জুড়ে। বাগানের এক কোণায় পাতানো বেঞ্চে বসে রয়েছে সাফওয়ান। মনযোগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মোবাইল স্ক্রিনে। যেনো খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন আলাপ চলছে। তার মনযোগে সপ্তম বারের মতো ব্যাঘাত ঘটলো। দূর থেকে ভেসে এলো সায়েরীর চিকন কন্ঠস্বর —

‘ সাফওয়ান ভাই! এগুলো এত সুন্দর করে কে দেখভাল করেছে এতদিন? এইযে দেখুন কত সুন্দর লাগছে! এটা দেখুন.. সূর্যমুখীর চারা গুলো কত বড় হয়ে গিয়েছে! এগুলো কোথা থেকে এনেছিলাম আপনার মনে
আছে? ‘
সাফওয়ান শূন্য চোখে তাকায়। কথাগুলো কর্ণধার হয়েছে ঠিক। কিন্তু তার মনযোগ তখনো মোবাইলের মাঝেই। তবুও সায়েরীর উল্লেখিত ফুল গাছগুলোর পানে তাকালো সে। ছোট্ট করে জবাব দিলো, ‘ হু, সিলেট থেকে এনেছিলাম। ‘

জবাবটুকু দিয়ে সে আবারও মোবাইলে ডুবে গেলো। সায়েরী কি যেনো বলেছিলো আবার! শুনলো না কিছু। দূর থেকে তাকে এমন মোবাইলে মগ্ন হয়ে থাকতে দেখে সায়েরী বড্ড বিরক্ত হলো। আসার পর থেকেই মোবাইলে কি এমন দেখছে সাফওয়ান? এতোক্ষণ ধরে চ্যাট করছেই বা কার সঙ্গে? এতোই যদি জরুরি আলাপ করার ছিলো তবে সায়েরীকে আজ আনলো কেনো এখানে? বিরক্তিতে মেয়েটার কপাল কুঁচকে এলো। এবারে আর কথা বললো না কোন। মিনিট দুয়েক নিরব থেকে কেমন হাঁসফাঁস লাগলো তার। এতোটা বোরিং লাগছে সব! হঠাৎ কি যেন ভেবে ঘাস হতে দুহাত ভর্তি ডেইজি ফুল সংগ্রহ করে সে হেলেদুলে গিয়ে দাঁড়ালো সাফওয়ানের সম্মুখে। সাফওয়ান বসে থাকা স্বত্তেও উচ্চতায় সে সায়েরীর বুক বরাবর। দাঁড়ানো অবস্থাতে সাফওয়ানের কিঞ্চিৎ বাদামি রাঙা চুলে ভর্তি মাথাটা বেশ ভালোভাবে দেখতে পারছে সায়েরী।

সে বড় আবলীলায় আঙুল ডুবালো সিল্কি চুলগুলোর ভাঁজে। সাফওয়ানের কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে হাতে করে আনা ছোট ছোট সাদা ডেইজি ফুলগুলো একে একে গুঁজে দিলো। একই সঙ্গে পটর পটর করে মুখটাও চলছে। এই যেমন বলছে, আগামী মাস থেকে ফাইনাল এক্সাম বলে সে কতটা টেনশনে আছে। এক্সামের টেনশনের মাঝে সাফওয়ান তাকে বাড়তি টেনশন দিয়েছে। টেনশনে টেনশনে সে একাউন্টটিং এর ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট চ্যাপ্টারের সূত্র এবং নিয়ম সব গুলে গিলে খেয়ে ফেলেছে। এখন পরীক্ষায় এই অধ্যায়ের কোন কুয়েশ্চন যদি সে স্কিপ করে আসে, তবে সাফওয়ান তাকে বকতে পারবে না৷ কারণ সূত্র গুলিয়ে ফেলাতে সায়েরীর কোন দোষ নেই। দোষ সব সাফওয়ানের। সে টেনশনে রেখেছিলো বলেছিলো এমন একটি অঘটন ঘটেছে। আর..আরও কি কি যেনো বলার ছিলো! ইশশ! খিদের জ্বালায় ভুলে গেলো সব। বকবক থামলো তার। সাফওয়ানকে তখনো ফোনে মগ্ন দেখে এবারে পাশ ঘেঁষে, বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বসলো সে। আহ্লাদী কন্ঠে ডাকলো একটাবার। তৎক্ষনাৎ তার সরু কোমরে জড়িয়ে গেলো সাফওয়ানের পোক্ত হাত। সাফওয়ান ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই ঝরঝর করে চুল হতে ছোট ছোট ফুল সব ঝরে পড়লো সায়েরীর চোখে মুখে। দৃষ্টি মিললো দুজনার। সায়েরী ঠোঁট উল্টে বললো,

‘ আপনি আমার কথা শুনছেন না কেনো? ‘
‘ শুনবো। আগে গেইটে গিয়ে দেখুন কি এসেছে আপনার জন্য। ‘
সায়েরীর গালে লেপ্টানো বেবি হেয়ার গুলো গুছিয়ে দিয়ে প্রতিউত্তর করলো সাফওয়ান।
এহেন প্রতিউত্তর শুনে সায়েরী চমকে উঠলো এক পলকের জন্য। কিন্তু দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন করলো না সে। কৌতুহলী চিত্তে প্রায় ছুটে গেলো গেইটের দিকে৷ ছোট্ট গেইটের ফাঁকে উঁকি দিয়ে চাইতেই দেখলো একজন ডেলিভারি বয় দাঁড়িয়ে। সায়েরীর দেখা পাওয়া মাত্র পার্সেল হাতে ধরিয়ে দিলো সে। পিৎজা বক্স সহ কাগজে মুড়ানো পার্সেল গুলো দেখে সায়েরী আনন্দে লাফিয়ে উঠলো প্রায়। গেইট লাগিয়ে একগাল হেসে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। সাফওয়ান পূর্ব হতে তাকিয়ে ছিলো। দেখতে লাগলো বরাবরের মতো অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো পেয়ে মেয়েটা কেমন আকাশে উড়ার মতো আনন্দিত হয়ে আছে।

‘ এগুলো কখন অর্ডার করেছেন? আপনি কীভাবে বুঝলেন আমার খিদে পেয়েছিলো? কি সুন্দর ঘ্রাণ বেরুচ্ছে! এখানেই বসে খাবো। আমি প্লেট নিয়ে আসি, হু? ‘
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে উত্তরের অপেক্ষা আর করলো না সায়েরী। ছুটে গেলো বাড়ির ভেতরে। সাফওয়ান নিজেও গেলো পেছন পেছন। নয়তো দেখা যাবে সায়েরী একটা কিছু নামাতে গিয়ে দশটা জিনিস ভেঙ্গে, হাত-পা কেঁটে বসে আছে। এই সময়ে অন্তত এমন কোন রিস্ক সে নিতে চাইলো না।
ঘাসের উপর শুভ্র রাঙা একটি চাদর বিছিয়ে তাতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব সাজিয়ে নিয়ে আরাম করে বসলো সায়েরী। একটি মিডিয়াম সাইজের পিৎজা, সাফওয়ানের পছন্দের রেস্টুরেন্ট হতে সায়েরীর ফেভারিট হোয়াইট সস্‌ পাস্তা এবং মিটবক্স সহ কোল্ড ড্রিংকস সব একে একে প্যাকেট হতে বের বের করে রাখলো সে। সাফওয়ান তখনো বাড়ির মধ্যে। কি যে করছে কে জানে। সায়েরীর পাশেই সাফওয়ানের মোবাইল দুটো পড়ে রয়েছে। চমৎকার আবহাওয়ায় এই সুন্দর দিনটি একটু ক্যামেরা বন্দি করার তাগিদে আই ফোনটি হাতে নিলো সায়েরী। এমন সময় নোটিফিকেশনের শব্দ হলো। স্ক্রিনে ভাসলো রূপমের টেক্সট। অনিচ্ছা স্বত্তেও নিজের নাম উল্লেখিত দেখে সায়েরীর চোখে বিঁধল মেসেজটি –

‘ Sayeri ke ekbar bole tho dekho, vai. Tumi bujhiye bolle o obossoi bujbe. Ektabar kotha bole dekho age. ‘
এই মেসেজের পেছনের ঘটনা কি সায়েরী কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। সাফওয়ান ভাই কি কিছু বলতে চাচ্ছে তাকে? আজ কি এখানে ডেকে এনেছে কিছু বলার জন্য? ভাবনার মাঝে হঠাৎ তার হাত থেকে মোবাইলটা ছিনিয়ে গেলো। ছিনিয়ে নিলো স্বয়ং সাফওয়ান। সায়েরী চমকে উঠলো হঠাৎ এমন হওয়ায়। মোবাইলে এক পলক চোখ বুলিয়ে সাফওয়ান সেটা পকেটে পুরে নিলো। যেনো কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বললো,
‘ না খেয়ে বসে আছো কেনো? খিদে পেয়েছে না? ‘

তৎক্ষনাৎ কোন জবাব দিতে পারলো না সায়েরী। সাফওয়ান যেভাবে হুট করে মোবাইলটা ছিনিয়ে নিলো, ব্যাপারটা খুব সামান্য হলেও সায়েরী সহজে মানতে পারলো না। কীভাবে মেনে নিবে? আগ বাড়িয়ে নিজের সব কিছুর উপর সাফওয়ান নিজেই তো সায়েরীকে অধিকার খাটানোর সবটুকু আশকারা দিয়েছিলো। মোবাইলের ফেইস আইডি সেন্সরে সায়েরীর ফেইস সেন্সর সেট করে রেখেছিলো সেই কবে। এতসব করে এতগুলো মাস পর হঠাৎ এমন লুকোচুরি কান্ডে সায়েরী অবাক হবেনা? রূপমের মেসেজটাও কেমন রহস্যময়। যদি কিছু বলার থাকে তবে সরাসরি বলুক। কেনো এমন লুকোচুরি খেলছে সাফওয়ান ভাই? এসব করে কাছে থেকেও দুরত্ব বাড়াচ্ছে কেনো?

সায়েরী যখন আপন খেয়ালে মশগুল, ঠিক তখনই পিঠ ঠেকল সাফওয়ানের বুকের সঙ্গে। চাদরের উপর পা ছড়িয়ে বসে সাফওয়ান নিজেই পেছন হতে বুকে টেনে নিয়েছে তাকে। ” খাচ্ছো না কেনো? ” বলতে না বলতে পিৎজার স্লাইস তুলে ধরলো সায়েরীর মুখের কাছে। ক্ষণিক পূর্বে যেমন খিদেতে পেটের ভেতর চুরমার লাগছিলো। এখন কিচ্ছুটি অবশিষ্ট রইলো না। সায়েরী হাতে ঠেলে দিলো স্লাইসটুকু। ঘুরে বসলো সাফওয়ানের মুখোমুখি। গত রাতে লক্ষ্য করতে না পারলেও এই মুহুর্তে সাফওয়ানের মুখাবয়বে গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে অবলোকন করলো, বিগত মাস দুয়েকের অনিয়মে সাফওয়ানের চোখ, মুখ কেমন শুকিয়ে এসেছে। চোখের নিচে কিঞ্চিৎ কালসিটে প্রলেপ পড়েছে। যা দূর থেকে বুঝা না গেলেও কাছাকাছি রয়েছে বলে সায়েরী স্পষ্ট লক্ষ্য করতে পারলো। শুভ্র রঙের ফুলস্লিভ টি-শার্ট টিও আজ আঁটসাঁট হয়ে দেহের সঙ্গে মিশে নেই। অনেকটাই ঢিলেঢালা হয়ে আছে। সব কিছু লক্ষ্য করে সায়েরীর বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরুলো। সে অনিমেষ চেয়ে থেকে অনুভূতিহীন কন্ঠে আওড়াল,

‘ আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চাইছেন, সাফওয়ান ভাই? ‘
সাফওয়ানকে নির্বিকার দেখাল। সায়েরীর শূন্য দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে সে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ এমনটা কেনো মনে হলো? ‘
‘ আজ এখানে কেনো এনেছেন আমাকে? ‘
‘ নতুন করে তো নিয়ে আসিনি। আগেও এসেছিলে। ‘
‘ তবে আগের আসা আর এখনের আসার মাঝে এতো তফাৎ কেনো? আপনার মনে হচ্ছে আমাদের সব আগের মতো রয়েছে? ‘
‘ পাল্টেছে কিছু? ‘
‘ পাল্টাইনি বুঝি? আমার পুরনো সাফওয়ান ভাই-ই সম্পূর্ণ রূপে পাল্টে গিয়েছে। সেখানে অন্য কিছু পাল্টে গেলেও আর কি বা যায় আসে? ‘

সায়েরীর কন্ঠ ভেঙ্গে এলো। টলমলে অশ্রু জমলো দুই চোখে। সাফওয়ানের কেনো যেনো ক্ষমতা রইলো না এই অশ্রুপূর্ণ দৃষ্টি জোড়ায় দৃষ্টি মিলিয়ে রাখার। সহসা চোখ নামিয়ে নিলো সে। একই সঙ্গে বা হাতে সায়েরীর মাথাটা টেনে নিলো বুকে। খোলা চুলে হাত বুলিয়ে নরম সুরে বললো,
‘ তুমি বেশি বেশি ভাবছো, সুবহা। আমি মোটেও পাল্টে যাইনি। মাঝে কিছুটা দিন কিছু ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। না চাইতেও দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম। এখন তো ফিরে এসেছি। ওসব ভুলে যাও। ‘
দুহাতে সাফওয়ানের কোমর জড়িয়ে শক্ত করে বুকে মুখ গুঁজল সায়েরী। তার নীরব কান্নায় সাফওয়ানের টি-শার্ট ভিজে একাকার হলো। ক্রন্দনরত সুরে সে পুণরায় বললো,
‘ আমি ভুলতে পারছি না। আপনার এই ফিরে আসা, থাকা না থাকার উপর বিন্দুমাত্র ভরসা করতে পারছি না। এতটা কাছাকাছি থেকেও আপনাকে আমি অনুভব করতে পারছি না সাফওয়ান ভাই। থাকার হলে আমার হয়েই থাকুন। নয়তো একেবারে চলে যান। আমি সত্যিই ভুলে যাবো। আশায় আশায় দিন গুনে রোজ রোজ মরার চেয়ে ভালো একেবারে নিজের মনকে মেরে ফেলি। ‘

‘ সুবহা!!! ‘
সাফওয়ানের কন্ঠে স্পষ্ট ধমকের আভাস। সায়েরী মোটেও ভয় পেলো না। বরং পূর্বের চেয়েও নিবিড়ভাবে মিলিয়ে যেতে চাইলো সাফওয়ানের সুডৌল বক্ষপটে। সাফওয়ান স্থির হয়ে রইলো প্রায় মিনিট দুয়েক। অতঃপর, দুহাতের বেড়াজালে আটকে সায়েরীর ছোট্ট দেহটি তুলে নিলো কোলের মাঝে। সায়েরী মুখ তুলে চাইলো তখনই। লালছে চোখ মেলে তাকাতেই দৃষ্টি মিললো সাফওয়ানের দৃষ্টিতে। ফুলো গালজোড়ায় লেপ্টে থাকা বেবি হেয়ারগুলো সরিয়ে সাফওয়ান ছোট্ট করে জবাব দিলো,
‘ আর কিছুটা দিন সময় দাও। সব ঠিক করে নিবো। হয়তো সবটা আগের মতো হবে৷ নয়তোবা কিছুটা অন্যরকম। ‘
‘ অন্যরকম? ‘ সায়েরী প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকায়। সাফওয়ানের চেহারা জুড়ে তখনো চিন্তিত ভাব ফুটে রয়েছে। সায়েরী নিজের অনুভূতি সব চেপে গিয়ে এবারে সাফওয়ানের মুখখানা তুলে নিলো দু’হাতের ভাঁজে। কোমল গলায় শুধাল,
‘ আপনি কিছু নিয়ে চিন্তিত? ‘

ছোট্ট একটি প্রশ্ন। অথচ জবাবটা অসম্ভব ভারী বলে মনে হলো সাফওয়ানের নিকট। হঠাৎ এই প্রশ্নটি শুনে তার ভেতরটা কেমন কাঁপল। গলার কাছটাতে এসে জমে গেলো কতশত কথা। কিন্তু একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না কণ্ঠনালী দিয়ে। ভেতরটা ভার হয়ে এলো তার। অবিলম্বে গ্রীবা নুয়ে ফেললো সে। মুখ গুঁজল সায়েরীর ঘাড়ের মাঝে। পোক্ত দুই হাত গভীর আবেশে জড়িয়ে নিলো সায়েরীর কোমল দেহটি। এক শক্ত আলিঙ্গন। এটুকুতেই সায়েরী কি বুঝলো কে জানে। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠলো। অজানা কোন কারণে উদ্বিগ্ন হলো বেশ। কোমল হাতে সাফওয়ানের ঘাড়ে, চুলে হাত বুলিয়ে চুপটি করে চোখ বুজল সে। অনুভব করলো, ঘাড়ের মাঝে আঁচড়ে পড়া সাফওয়ানের এক একটি ভারী দীর্ঘশ্বাস। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেনো সাফওয়ানের হয়ে জবাব দিয়ে যাচ্ছে,
‘ আমি ভালো নেই, সুবহা। ‘

মাঝে অতিক্রম হওয়া পঁচিশটি দিন কেটেছে বেশ স্বাভাবিকভাবে। সাফওয়ান ঢাকাতেই ছিলো। পূর্বের মতোন পুরোদমে মনযোগী হয়ে ছিলো সায়েরীর পরীক্ষার প্রস্তুতি যেনো ভালো হয় সেই মিশনে। দিন দুনিয়া ভুলে সায়েরীও নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলো বইয়ের পাতায়। প্রথম পরীক্ষার দিন আবরার তার সঙ্গে গেলো সেন্টারে। সায়েরীর সে কি অস্থিরতা সেদিন। চিন্তায় চিন্তায় পরীক্ষার হলে পৌঁছানোর পূর্বেই নাজেহাল অবস্থা হলো তার। এক্ষুনি জ্ঞান হারাবে হারাবে ভাব। কিন্তু আবরারকে এই অস্থিরতা বুঝতে দিলো না সে। শিক্ষার্থী এবং গার্ডিয়ানদের ভীড়ে এক স্থানে স্থির হওয়া মুশকিল। আবরার শক্ত করে সায়েরীর হাত চেপে ভীড় থেকে কোন রকমে বের করে এনেছে তাকে। আয়ান, নুহাশ, তোহা এবং নাজরাত যেই স্থানে উপস্থিত সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো তারা। আবরার যখন সাদিফ এবং তোহার বড় ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করতে ব্যস্ত। ঠিক ঐ মুহুর্তে সাফ্রিনের দেখা মিললো। দুই ভাই বোন নেমে এসেছে একই গাড়ি হতে। দূর হতেই মাস্কে ঢাকা সাফওয়ানের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সায়েরীর অস্থির চিত্ত উতলা হলো বেশ। সন্তর্পণে আবরারের পেছন হতে চার কদম পিছিয়ে গেলো সে। ঠিকঠিক তার পেছনেই এসে দাঁড়িয়েছে সাফওয়ান। সায়েরী ঘর্মাক্ত মুখশ্রী অবলোকন করে সে নিজের রুমাল এগিয়ে দিলো৷ নিম্ন গলায় বলল —

‘ ভয় লাগছে? ‘
সায়েরী যেনো এই প্রশ্নের অপেক্ষাতে ছিলো। সাফওয়ানের প্রশ্ন করামাত্র সে হড়বড়িয়ে বলে উঠলো,
‘ ভীষণ ভীষণ ভয় লাগছে, সাফওয়ান ভাই। এতদিন যা যা পড়েছি এখন সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। যদি একটা কিছু কমন না আসে? যদি কমন এসেও লিখতে না পারি? আচ্ছা, ফেইল টেইল করলে আপনি খুব আপসেট হবেন তাইনা? বকবেন? নাকি একেবারে সিলেট চলে যাবেন আমাকে রেখে? যাবেন না প্লিজ। পরীক্ষা তো আগামী বছর আবারও দেওয়া যাবে। কিন্তু আমাকে হারালে এমন সুইটেস্ট সায়েরী সুবহা আপনি দ্বিতীয় কোথাও পাবেন না। এবারে ফেইল করলেও পরের বার সত্যি সত্যি পাশ এনে দিবো৷ একদম সত্যি করে বলছি। ‘

সাফওয়ান এক মুহূর্তের জন্য তাজ্জব বনে গেল অযৌক্তিক কথাগুলো শুনে। পরমুহূর্তে মাস্কের আড়ালে ভাসমান চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে গেলো হাসির তালে। এক আশ্চর্য রকমের পাগল জুটেছে তার কপালে। ফেইল করলে রেপুটেশন কোথায় যাবে সেই চিন্তা না করে মেয়েটা চিন্তা করতে সাফওয়ান তাকে ছেড়ে দিবে কিনা। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আধ ঘন্টা পূর্বে এমন বেহুদা কথাবার্তা আদৌও মানা যায়? আবরারের দিকে সম্পূর্ণ মনযোগ রেখে সে একটুখানি হাত বুলিয়ে দিলো সায়েরীর মাথায়। সঙ্গে করে নিয়ে আসা ঠান্ডা পানির বোতলটা বাড়িয়ে দিয়ে আশ্বাস্ত গলায় বললো–

‘ এতদূর ভাবতে হবে না। ঠান্ডা মাথায় লিখবে যা লিখার। তুমি নিজের প্রিপারেশনে ভরসা করতে না পারলেও আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে, আমার এতগুলো মাসের পরিশ্রম তুমি জলে মিশিয়ে দিবে না। ‘
সায়েরী মাথা উঁচিয়ে তাকালো এবারে। কিন্তু সাফওয়ান তাকালো না। আবরার যে এখনো কথার তালে ভীড়ের মধ্যে তাকে লক্ষ্য করেনি এই ভেবেই স্বস্তি পেলো বেশ। লক্ষ্য করার সুযোগ ও সে দিতে চাইলো না। যেভাবে নিঃশব্দে এসেছিলো, সেভাবেই প্রস্থান করলো।

সেদিন প্রথম পরীক্ষা দিয়ে সায়েরীর মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা, অস্থিরতা সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। প্রত্যাশার চেয়েও বেশ ভালো এক্সাম দিয়েছে। পরবর্তী পরীক্ষা গুলোও কাটলো বেশ আরামে। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজকের এক্সাম বেশ দ্রুত শেষ হয়েছে। বন্ধুরা সকলে পূর্ব হতেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলো আজ কোথাও ঘুরতে বের হবে তারা। যেহেতু নাজরাত পরীক্ষার জন্য বর্তমানে তার বাবার বাড়িতে রয়েছে, তাই কারো পক্ষ হতে কোন বাঁধা রইলো না। নির্দিষ্ট সময় শেষে যার যার হল থেকে বেরিয়ে একত্রিত হলো সকলে। নুহাশের মুখশ্রী আজও বেজার হয়ে আছে। এই প্রতিক্রিয়া আজ নতুন নয়। প্রতি এক্সাম শেষে পড়ালেখা এবং প্রতিটি হল গার্ডের চৌদ্দ গোষ্ঠীর নাম বদনাম করে ছাড়ে সে। বন্ধুরা আজ সেদিকে বিশেষ পাত্তা দিলো না। সায়েরী এবং আয়ানের ধ্যান কাড়লো নাজরাত। সেই সকাল থেকে এখনো অবধি মেয়েটার চোখ মুখ শুকিয়ে আছে। মুখশ্রী জুড়ে ক্লান্তি ভাব। সায়েরী কপালে হাত রাখলো তার। চিন্তিত গলায় শুধাল,

‘ কি হয়েছে? শরীর খারাপ নাকি এক্সাম খারাপ হয়েছে? ‘
‘ শরীর ঠিক থাকলে তবেই না এক্সাম ঠিকভাবে হবে। ভালো লাগছে না কিছু। আজ কোথাও যাবো না। বাসায় ফিরবো এক্ষুনি। ‘
তাকে দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে অসুস্থতাটুকু। বিনা কোন কথায় প্ল্যান ক্যান্সেল হলো তখনই। তবে নাজরাতকে মোটামুটি স্থির দেখে কেউ বিশেষ চিন্তা বাড়ালো না। এক্সাম নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে করতে পার হতে লাগলো কলেজের করিডর। সাফ্রিনকে আপসেট দেখালো কিছুটা। সে প্রশ্ন হাতে নিয়ে আয়ানের সঙ্গে উত্তর বুঝে নিতে ব্যস্ত। পেছনে তখন অন্য চারজন এগুচ্ছে তাদের দেখে দেখে। নুহাশ শুরু থেকেই বেশ বিরক্ত হয়ে ছিলো। যখন দেখলো সাফ্রিন এবং আয়ান নিজেদের আলাপ থামানোর নাম নিচ্ছে না। তখন তার বিরক্তি আকাশ ছুঁল। হাতের প্রশ্নপত্র টা মুষ্টিবদ্ধ করে দুমড়েমুচড়ে বারান্দা হতে মাঠে ছুড়ে ফেলে বলে উঠলো,

‘ তথ্য প্রযুক্তির মাইরে বাপ! এই বালের পড়া ভবিষ্যতে কোন কাজে আসবে আমারে বুঝা কেউ। জীবনে প্রেম নাই, প্রেমিকা নাই, বউ পাওয়ার চান্স নাই তাইলে কার বিয়ের গেইট আঁকব আমি? NAND গেইট আবার কি জিনিস? আমি তো মেয়ে না যে ননদের গেইট আঁকব। আবাল মার্কা প্রশ্ন সব! ‘
নুহাশের ঝাঁজালো কন্ঠের অযৌক্তিক কথায় হেসে উঠলো সায়েরী এবং আয়ান। সাফ্রিন গম্ভীরমুখে পুণরায় চোখ বুলালো প্রশ্নপত্রে।
“NAND gate কেন ‘Universal Gate’ নামে পরিচিত? উপযুক্ত সত্যক সারণি (truth table) দ্বারা ব্যাখ্যা করো।”
প্রশ্নটা সাফ্রিনের কাছে অনেকটা পেটে আছে মুখে আসছে না টাইপ। শিখেছিলো, কিন্তু এক্সাম হলে কীভাবে যে ভুলে বসলো কে জানে!

‘ ওটা তোর বউয়ের ননদের গেইট না রে সিঙ্গেল নুহাশানন্দ দাশ। ওটা NAND গেইট। এদিকে আয়, আমি বুঝাচ্ছি। এই যে.. NAND gate হলো একটি মৌলিক লজিক গেট যা NOT এবং AND… ‘
কোলাহলপূর্ণ কলেজের বারান্দায় সায়েরীর চিকন সুর বেজে উঠলো অভিজ্ঞ কোন শিক্ষিকার মতোন। হাত নেড়ে বড় দাম্ভিক সুরে সে গড়গড়িয়ে সম্পূর্ণ প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করলো নিমেষে। উপস্থিত আয়ান,নুহাশ,তোহা, নাজরাত এবং সাফ্রিন আশ্চর্য চিত্তে দাঁড়িয়ে। সায়েরীর বিশ্লেষণের সুরে সুরে সাফ্রিনের মনে পড়ে গেলো, সাফওয়ান কোন একদিন তাকে ঠিক এমন করেই প্রশ্নটা বুঝিয়ে দিয়েছিলো। হুবহু সেই একই অঙ্গভঙ্গি! সেই একই কথার ধরণ, একই রকম উদাহরণ। সাফ্রিনের আশ্চর্য সীমা ছাড়িয়ে গেলো। প্রশ্ন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বন্ধুদের দিকে চাইতেই বোকা বনে গেলো সায়েরী। সকলে কেমন ঢ্যাবঢ্যাব চোখে তাকিয়ে আছে। সায়েরী তাকাতেই সাফ্রিন বিবশ গলায় শুধাল,

‘ আমি নিজে এতবার পড়া স্বত্তেও এই কুয়েশ্চন স্কিপ করে এলাম। তুই কীভাবে আন্সার করে এলি সায়ু? ‘
এই পর্যায়ে সায়েরী নিজেও হতবাক হলো সাফ্রিনের কথা শুনে। এত সহজ একটি প্রশ্ন কিনা ক্লাস টপার সাফ্রিন স্কিপ করে এসেছে! এটাও মানা যায়? সায়েরী আমতাআমতা করে। কীভাবে বলবে যে এই একটি অধ্যায় মাথায় সেট করতে সাফওয়ান ভাই কত নাকানিচুাবানী খাইয়েছে তাকে । ধমকে কাজ হয়নি যখন ঘুষ অবধি দিয়েছে। যেহেতু সায়েরী সত্যিই বহু পূর্ব হতে ঘুষখোর উপাধি পেয়েছে সাফওয়ানের কাছে। সেই মোতাবেক ঘুষের লোভেই টানা কয়েক মাসব্যাপী অধ্যায়টি সে পড়েছে বেশ মনযোগে। ফলস্বরূপ, আজ এক্সাম হলে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে খুশিতে, স্বস্তিতে তার লাফাতে মন চাচ্ছিলো। শুধু লাফাতে নয়, অতি আনন্দে সাফওয়ান ভাইকে জম্পেশ একটি চুমু দেওয়ার মনোবাসনা-ও জেগেছিলো মনে।

‘ সাফা আন্সার করতে পারলো না অথচ তুই লিখে এলি সায়ু? কীভাবে? ‘
তোহার কন্ঠে আকাশসম বিষ্ময়। বাকিরাও গোলগাল চোখে তাকিয়ে। বিপরীতে অস্বস্তিতে বুঁদ হয়ে রইলো সায়েরী। আমতাআমতা করে জবাব দিলো,
‘ ওই আরকি..মানে সাফওয়ান ভাই পড়িয়েছিলো। ‘
কিয়ৎ ক্ষণ নিরবতায় কাটলো। বন্ধুরা সব প্রতিক্রিয়া হীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কেবল। অতঃপর, হঠাৎ নাজরাত এবং সাফ্রিন ব্যতীত অন্যরা একই সুরে আওয়াজ করে উঠলো,
‘ সাফওয়ান ভাই জিন্দাবাদ! ‘

সায়েরী লজ্জা পেয়ে ওদের সঙ্গে নিজেও হেসে ফেললো। হাতের ফাইল উঁচিয়ে এক ঘা বসালো নুহাশের পিঠে। তাদের হাসিঠাট্টা স্থায়ী হলো না বেশিক্ষণ। সকলের পিলে চমকে দিয়ে নাজরাতের লম্বাটে দেহটি হঠাৎ ঢলে পড়তে লাগলো জমিনে। তার পাশে দন্ডায়মান সাফ্রিন এবং আয়ান হাতের ফাইলপত্র ফেলে দিকবিদিকশুন্য হয়ে দ্রুত ঝাপটে ধরলো তাকে। নাজরাত নিজ দেহের সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিয়েছে। দৃষ্টি জোড়া নিভু নিভু। আকস্মিক তাকে এমন অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখে উপস্থিত সকলে ভয় পেয়ে গেলো। কি হলো হঠাৎ! মেয়েটা এতোটা অসুস্থ ফিল করছে অথচ তারা কেউ বুঝলো না?

এক্সাম শুরু হওয়ার দুই দিন পূর্বে নাজরাত নিজ বাড়িতে এসেছিলো। কথা ছিলো পরীক্ষা চলাকালীন সময় এই মাস দুটো সে বাপের বাড়িতে কাটাবে। প্রথম দুটি এক্সামে সাদিফ নিজে তাকে সেন্টারে পৌঁছে দিয়ে আবার নিজেই বাড়ি নিয়ে আসতো। আজ সায়েরী, নাজরাত দুজন আবরারের সঙ্গে ফিরার কথা ছিলো বলে সাদিফ যায়নি সেন্টারে। এই মুহুর্তে নাজরাতের অসুস্থতার ব্যাপারে শোনার পর সাদিফের মনে হলো না যাওয়াটা যেনো মস্ত বড় ভুল ছিলো তার। সেন্টারের নিকটস্থ হাসপাতাল চত্বরে পৌঁছালে সে অনুভব করলো তার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। দূর থেকে আবরার সহ নাজরাতের বন্ধুদের দেখে সে লম্বা কদমে এগোল। নাজরাতের খোঁজ নেওয়ার পূর্ব তার কপালে তিন চারেক ভাঁজ পড়লো সায়েরীদের হাস্যজ্বল মুখশ্রী দেখে। আশ্চর্য লাগলো ভীষণ। কিছুটা রাগও হলো সকলের নির্লিপ্ততা দেখে। তাকে দেখেও যেনো মুখ থেকে হাসি সরছেই না। আবরার জানালো ডিহাইড্রেশনের কারণে নাজরাতকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। সাদিফ আর কিছু শোনার অপেক্ষা করলো না। কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করার মুহূর্তে হুট করে কানে এলো নুহাশের কন্ঠস্বর –

‘ ধুর ব্যাটা! এই সিঙ্গেল বয়সে মামা হয়ে যাওয়াটা কত বড় লজ্জাজনক ব্যাপার তুই বুঝবি না। তোর মালপত্র নিয়ে এখান থেকে আউট হ যা। ‘
আয়ানের উদ্দেশ্যে বলা কথাটা সাদিফের কানে বিঁধল খুব। হঠাৎ করেই তার দেহ উষ্ণ হয়ে গেলো অজ্ঞাত কোন কারণে। সায়েরীদের এমন প্রফুল্ল চিত্ত দেখে যে ক্ষণিক পূর্বে অসন্তুষ্ট হয়েছিলো সে। এখন সেসব নিয়েও কৌতুহল জাগলো মনে। সে আর দাঁড়ালো না। কেবিনে ঢুকে দরজা লাগালো শব্দ করে। নাজরাত জেগে ছিলো। শব্দ শুনে চোখ মেলে তাকালো সে। সাদিফ লক্ষ্য করলো তার বউয়ের অশ্রুসিক্ত দুই চোখ। বাম হাতে ক্যানোলা লাগানো। ডান হাতটা ঠিকঠিক উদরের উপর লেপ্টে রয়েছে। সাদিফ কেন যেন কদম বাড়াতে পারলো না। অনেক কথা, অনেক প্রতিশ্রুতি মনে পড়ে গেলো হুট করে। এবং অদ্ভুত এক অনুভূতি ঝেঁকে বসলো তার মন মস্তিষ্কে। দুহাতে বার কয়েক মুখ ঘষে বেশ কয়েকটি শ্বাস ফেললো সে। নাজরাত অশ্রু চোখে, ঠোঁটে হাসি নিয়ে চুপটি করে দেখতে লাগলো বরের এই অস্থিরতা। সাদিফ কাছে এসে বসতেই নাজরাতের হাসিটি দীর্ঘ হলো। ডান হাত উঁচিয়ে সাদিফের কলার টেনে আরও কাছাকাছি নিয়ে এলো সে। ফিসফিস ছন্দে আওড়াল,

‘ পরপর দুটো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার জন্য আপনাকে কেমন শাস্তি দেওয়া যায় বলুন তো মি. শাহরিয়ার? ‘
সাদিফের এক হাত নিজ উদরে টেনে নিয়ে ফের বললো—
‘ শাস্তিটা বউয়ের তরফ থেকে মাথা পেতে নিবেন? নাকি.. এইযে আরেকজন শাহরিয়ার আসতে চলেছে তার তরফ থেকে গ্রহণ করবেন, হুহ? ‘
সাদিফ বিবশ হয়ে রইলো। না কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না কোন কথা বেরুলো কন্ঠ দিয়ে। তবে তার চোখজোড়া জ্বালা করে উঠলো। ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো সে৷ কী বলবে, কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে ভেবে পেলো না যেনো। তাকে এমন নিশ্চুপ দেখে গালে হাত ছোঁয়াল নাজরাত। বললো,

‘ কথা বলছো না কেনো? তুমি খুশি হওনি? ‘
সাদিফের একহাত তখনো নাজরাতের উদরের উপর।
এই পর্যায়ে সে নিজেও ঝুঁকে এলো নাজরাতের নিকট।
মুখ গুঁজলো গ্রীবাদেশে। প্রায় সেকেন্ড দশেক কোন জবাব সে দিতে পারলো না। অতঃপর, ধরা গলায় প্রতিউত্তর করলো,

‘ আমার কেমন অনুভূতি হচ্ছে আমি নিজেও বুঝে উঠতে পারছি না, নাজরাত। অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। ভয় লাগছে ভীষণ। আমি এখনই এমন কিছু আশা করিনি। কিন্তু তবুও খুশি লাগছে। উমম…ঠিক খুশি না৷ অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হচ্ছে। বুকের ভেতরটা অসম্ভব কাঁপছে। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৮

সাদিফের কন্ঠে কম্পন। সুর এলোমেলো। সে সত্যিই ঠাহর করে উঠতে পারছে না বুকে জমা সুখ, ভয়, উচ্ছ্বাসের সম্মিলিত অনুভূতি সব কীভাবে ব্যক্ত করবে। তার এলোমেলো কথাগুলো শুনে নাজরাত মৃদু ছন্দে হেসে উঠলো। সাদিফ মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলো নাজরাতের অশ্রুসিক্ত মুখের প্রাণবন্ত হাসিটা। মেয়েটা কিছু বলার পূর্বে তার হাসিমাখা ঠোঁট জোড়ায় গাঢ় চুমু আঁকল সাদিফ। নাজরাতের কপালে কপাল ঠেকিয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠলো–
‘ সাদমান শাহরিয়ার তার প্রতিশ্রুতি ভাঙার দায়ে সব রকমের শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি আছে, মিসেস শাহরিয়ার। আপনাকে ধন্যবাদ আমাকে এই সুখময় শাস্তিটুকু গ্রহণ করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮০