অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬
সাজিয়া জাহান সুবহা
মোবাইল ফ্লাস চোখে পড়তেই ঘুম ছুটে গেল সায়েরীর। চোখ কুচকে সামনে তাকাতেই নীতির চেহারাটা ভেসে উঠলো। মিটিমিটি হাসছে সে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেলো সায়েরীর। বুঝতে পারলো না নীতিকে কেনো স্বপ্ন দেখছে সে। হঠাৎ হাতের উল্টো পিঠে কিছুর খোচা লাগায় ব্যাথা পেয়ে হাত সরানোর চেষ্টা করলো সে। কিন্তু নাড়াতে পারলো না একবিন্দু। চোখের দৃশ্যপটে সাফওয়ানের ঘুমন্ত মুখটা ভেসে উঠতেই টনক নড়লো সায়েরীর। তার হাত জড়িয়ে ধরে উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে সাফওয়ান। সায়েরী আধশোয়া অবস্থায় সাফওয়ানের মাথার কিনারে বসা। নীতির সামনে এই অবস্থায় ধরা খেয়ে ধরফরিয়ে উঠে বসলো সায়েরী। সাফওয়ানের শক্ত বাধন থেকে একটানে ছিনিয়ে আনলো নিজের হাত। ফলস্বরূপ ব্যথাও পেলো অনেক। সাফওয়ান খানিক নড়েচড়ে আবার ঘুমিয়ে গেলো।
‘ ততুমি এখানে ককি করছো আপু? ‘
হাসি হাসি মুখ করে সায়েরীর ছেড়ে উঠা জায়গাটাই এসে বসলো নীতি। সাফওয়ানের কপালে হাত রেখে বললো,
‘ আবরারের কাছে শুনলাম সাফওয়ান জ্বরে ভুগছে। আর তোমাদের বাসাতেই আছে। তাই দেখতে চলে এলাম। সাফওয়ানের শরীর খারাপ খুব কমই হয়। কিন্তু একবার অসুখ বাধালে দুই তিন দিনের আগে সেরেই উঠে না। জ্বর হলে খিঁচুনি উঠে যায় প্রায়। কিন্তু এই ছেলে তো কিছু প্রকাশ করতেই চাই না। তাই চিন্তা হচ্ছিলো। রায়ান আর মিহাদও এসেছে। গাড়ি পার্ক করেই আসছে ওরা। ‘
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘ ওহ! ঠিক আছে তোমরা থাকো আমি আসছি। ‘
‘আরে চলে যাবে কেনো!আমি ডিস্টার্ব করলাম নাকি?’
‘ কিসব বলছো আপু? আমি কেনো ডিস্টার্ব হতে যাবো! আম…আমি আসছি। ‘
একপ্রকার পালিয়ে যাওয়ার মতো করেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সায়েরী। আবরার,রায়ান ও মিহাদ তখন সবে ঢুকছিলো।মিহাদ একবার ডাকলো সায়েরীকে।কিন্তু সে না শুনার ভান করে চলে গেলো । নিজ রুমে এসে বড় বড় দম নিলো সে। কি একটা অস্বস্তিকর সিচুয়েশনে পড়ে গিয়েছিলো নীতির সামনে ছিঃ! সাফওয়ান এখন জ্বরের ঘোরে আছে কিন্তু সজ্ঞানে আসলে যদি নীতি সব বলে দেয়! উফফ্ আর ভাবতে পারছে না সায়েরী। একটু আগের কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় মাথা ভনভন করছে তার।
ঘড়িতে তখন মাত্র ন’টা বাজে। সায়েরী বাসায় এসেছিলো সাতটার দিকে। চুপিচুপি কিচেনে গিয়ে খাবার নিয়ে রুমে চলে আসলো সে। এই সময় সবাই নিজের রুমেই থাকে। ডিনার করে ১০টার দিকে। তাই ধরা পড়ার সম্ভাবনা নেই। খেয়েদেয়ে আবারো ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো সায়েরী।
সারাদিনের ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই রাজ্যের ঘুম এসে চোখে জড়ো হলো নাজরাতের। কিন্তু তার সুখ স্থায়ী হলো না বেশিক্ষণ। বালিশের তলায় রাখা মোবাইলটার তীব্র আওয়াজে ঘুম ছুটে গেল তার। একরাশ বিরক্তি নিয়ে কল রিসিভ করে “হ্যালো” বলতেই উপাশ থেকে ভেসে আসলো পরিচিত কন্ঠস্বর,
‘ আপনার কাছে থেকে আজকের এই রাতটা যদি আমার নামে বুকিং করতে চাই, আপনি আপত্তি করবেন নাজরাত?
ঘুমন্ত মস্তিষ্কে এমন কিছু শুনে ঘুম যেনো জানালা দিয়ে পালালো নাজরাতের। কান থেকে মোবাইল সরিয়ে হাতে নিতেই আননোন নাম্বার দেখে আরেকদফা চমকালো সে। এতোরাতে কে ফোন করলো তাকে? সাদিফ! হ্যাঁ এটাতো সাদিফের কন্ঠস্বর। কিন্তু তার কন্ঠ এমন শুনালো কেনো! এতো অস্থিরতা, কথার মাঝে মাঝে বড় বড় নিঃশ্বাস তুলছে সে। কি হয়েছে তার!!
‘ হ্যালো! স..সাদিফ, আপনি ঠিক আছেন? ‘
‘ নাহ! একদম ঠিক নেই। আপ..নি আমাকে এককটুও ঠিক থাকতে দিচ্ছেন না। এক..টুও না…. ‘
সাদিফের ঘুম জড়ানো কন্ঠের এমন বাণি শুনে বুকের ভিতরটা ধুকপুক করতে লাগলো নাজরাতের। আজ হঠাৎ কি হলো সাদিফের! হয়তো ঘুমের ঘোরে ফোন করে ফেলেছে। আর কিসব আবোলতাবোল বকছে!
‘ সাদিফ, আপনি ক্লান্ত অনেক। ঘুমান এখন। পরে কথা বলে নিবো আম….. ‘
‘ আমি ক্লান্ত! হ্যাঁ ক্লান্তই তো। খুব ক্লান্ত। এই অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে আমি ভীষণ ক্লান্ত। তুমি কবে আমার হবে? কবে হবে? ‘
ধক করে উঠলো নাজরাতের হৃদপিণ্ড। সাদিফের এই একটা বাণি যেনো নাড়িয়ে তুললো তার সর্বত্র। ঘুমের ঘোরে আরো কিসব বলছে সে। কিন্তু সেগুলো যেনো কানেই ঢুকছে না নাজরাতের। মস্তিষ্ক প্রশ্ন তুলছে “সাদিফ কেনো এমন বলেছে? এক সপ্তাহের পরিচয়ে কারো জন্য এতো গভীর অনুভূতি থাকার তো কথা নয়। সেও পছন্দ করে সাদিফকে। তবে সেটা শুধু পছন্দ অবধি সীমাবদ্ধ। তাহলে সদিফ কেনো এতোটা ডেস্পারেট হয়ে কথা বলছে!!”
‘ হ্যা…লো!! ‘
‘ সাদিফ, আপনার কি শরীর খারাপ? আপনার কথা জড়িয়ে আসছে কেন? ‘
‘ একদ..ম না। আম..মি ঠিক আছি। ‘
‘ কিন্তু আমি বলছি আপনি ঠিক নেই। আমার কথা শুনুন। আপনার পরিপূর্ণ একটা ঘুম দরকার। আপনি ঘুমান। ‘
‘ কিন্তু আমার ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না তো। ইচ্ছে করছে সারারাত গল্প করতে।অনেএএক গুলা কথা বলতে।বলবো? ‘
হাসলো নাজরাত। সাদিফের কন্ঠে স্পষ্ট বাচ্চামো ভাব। হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসলো সে। মনযোগ দিয়ে শুনতে লাগলো সাদিফের বকবক। কিছু বুঝছে আবার কিছু বুঝছে না। মাঝে মাঝে রেস্পন্স করতেও হচ্ছে। ঠিক কতোক্ষন অবধি ফোনালাপ চললো জানা নেই। বকবক করতে করতে একটা সময় ঘুমিয়ে গেলো সাদিফ। নাজরাতের চোখজোড়াও তখন খোলা থাকতে পারলো না আর। কান থেকে ফোন নামিয়ে কল কেটে ঘুমিয়ে পড়লো সে।
মিনহার ডাকাডাকি তে অতিষ্ঠ হয়ে ঘুম ছেড়ে উঠে বসলো সায়েরী। মর্নিং শিফট স্কুল হওয়ায় মিনহাকে রোজ সকাল সকাল উঠতে হয়। যেটা অতি জঘন্য একটা ব্যাপার সায়েরীর কাছে। স্কুল হবে ১১টা থেকে যতোটা পারে ততোটা অবধি। যাতে স্টুডেন্ট নিজেও ঘুমাতে পারে এবং বড়বোন কেও ঘুমাতে দেয়। তা না, বেঁচে থাকা হারাম করে রেখেছে এই স্কুল অথোরিটি রা।
‘ হয়েছে টা কি ষাঁড়ের মতো চেচাচ্ছিস কেনো? ‘
‘ কাকিমার শরীর খারাপ লাগছে। আম্মু তোমাকে উঠতে বলেছে চাচ্চুদের নাস্তা দিতে হবে,আমাকে টিফিন দিতে হবে,চুল বেধে দিতে হ… ‘
‘ হয়েছে হয়েছে থাম। শান্তিতে দিবি না তুই আমাকে। এজন্যেই এতো লেইটে লগিন হয়েছিস পৃথিবীতে। ‘
‘ লগিন কীভাবে হয় আপু? ‘
‘ তোর বরকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয়। ‘
গায়ে উড়না জড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সায়েরী। সেদিকে বোকাবোকা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো মিনহা। তার মাথায় আসলো না সে পৃথিবীতে কীভাবে লগিন করেছে। লগিন মানে কি?
কিচেন থেকে একে একে সব ব্রেকফাস্ট ডাইনিংয়ে সেট করার পর দুই বাবাকে ডেকে খাবার সার্ভ করে দিলো সায়েরী। মিনহাও খেতে বসলো। খাওয়ার পাশাপাশি তার চুল আঁচড়ে বেণি করে দিলো সায়েরী।
‘ নিজে যখন আঁচড়াতে পারিস না তাইলে এতো লম্বা চুল রেখেছিস কেনো? কেটে ফেল। ‘
‘ উঁহু! আমি তোমার মতো চুল লম্বা করবো। একদম সুন্দর সুন্দর বড় চুল। ‘
‘ সুন্দর? এই চুল কারো সামনে খোলা যায়? দেখিসনি কুকড়ে থাকে কেমন…বিশ্রী লাগে দেখতে। ‘
‘ তুমি দেখোনি আমি দেখেছি। তোমার চুলে ঢেউ ঢেউ শেপ আছে। ওটা সুন্দর। ‘
‘ সুন্দরের দিকে চোখ না দিয়ে একটু সুবিধা দেখ। চুল কেটে নিজেও শান্তিতে থাক আর আমাকেও শান্তিতে থাকতে দে।’
দুই বোনের কথায় বিরক্ত হয়ে সায়েরীর মা বলে উঠলো,
‘ হয়েছে থাম তোরা। মিনহা, স্কুলের জন্য দেরী হচ্ছে তোমার। যাও বাবার সাথে চলে যাও। সায়েরী, কফিটা একটু আবরারের রুমে দিয়ে আয় তো। এই ছেলেটা কখন বলেছিলো মাথা ধরেছে একটু কফি দিতে। কাজের চাপে ভুলেই গিয়েছিলাম। ‘
কফি নিয়ে আবরারের রুমের দিকে গেলো সায়েরী। পরপর দুবার নক করার পরেও কোনো সাড়া না পেয়ে রুমে ঢোকে গেলো সে। বেডের একপাশে চাদরমুড়ি দিয়ে কেউ ঘুমাচ্ছে। নিশ্চয়ই সাফওয়ান। বেড সাইড টেবিলে কফি কাপটা রাখতেই ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।
‘ ভাইয়া তোমার কফ….আআআআ…..উম্মমমম!!! ‘
উদম শরীরে সাফওয়ানকে দেখেই চিৎকার করে উঠলো সায়েরী। তৎক্ষণাত লম্বা কদমে এগিয়ে এসে তার মুখ চেপে ধরলো সাফওয়ান। সায়েরীর হঠাৎ রিয়েকশনে সাফওয়ান যেমন চমকে গিয়েছে তেমনি সাফওয়ান হঠাৎ এভাবে চেপে ধরায় জমে গেলো সায়েরী। চিৎকার শুনে আবরার খানিক নড়েচড়ে আবারো ঘুমিয়ে পড়লো। সেদিকে তাকিয়ে ফুস করে শ্বাস ছাড়লো সাফওয়ান। সায়েরীর সেসবে হুশ নেই। সাফওয়ানের শীতল শরীরের সাথে এভাবে মিশে যাওয়ায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ বসে চলছে তার। সাফওয়ানের একহাত সায়েরীর কোমরে অন্যটা মুখে। এই প্রথম কোনো ছেলের এতোটা কাছাকাছি এসেছে সে। শরীরে লোমকূপ দাড়িয়ে পড়লো তার। খিচে রাখা চোখজোড়া মেলে তাকালো সাফওয়ানের মুখপানে। সাফওয়ানও তাকালো তখন। সাফওয়ানের ফর্সা উন্মুক্ত ভেজা শরীর সচক্ষে দেখে আরো নুইয়ে গেলো সায়েরী। সায়েরীর বিব্রত মুখ, কম্পিত দেহ দেখে চট করে তাকে ছেড়ে দিলো সাফওয়ান। হাতে থাকা টি-শার্টটা গায়ে জড়ালো দ্রুত। সে নিজেও বিব্রত হলো নিজের কাজে। সায়েরী রুম ত্যাগ করলো ছাড়া পাওয়া মাত্রই। তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে সাফওয়ানের সামনে। সায়েরী যেতেই নিজের বুকে ও বাহুতে চোখ বোলালো সাফওয়ান। সায়েরীকে যখন চেপে ধরেছিলো ঠিক তখনি একহাতে সাফওয়ানের বুকে ও অন্যহাত দ্বারা বাহুতে খামছে ধরেছিলো সায়েরী। স্পষ্ট চার নকের দাগ পড়ে গেছে জায়গাগুলোতে। কত অবলীলায় সাফওয়ান খানের শরীরে আঘাত দিয়ে চলে গেল মেয়েটা!
মনটা যে এলোমেলো, প্রেম রোগ শুরু হলো
কেশ কালো আঁখি কালো, আঁধারে চান্দের আলো
অহন আমি মইরা যাবো, না পাইলে তাহারে!
আহারে…….আহারে!
আহারে….আহারেএএ!
নাজরাতের চারপাশে গোল হয়ে বসে টেবিলে তবলা ও তালিয়ে বাজিয়ে গান গাইতে লাগলো বন্ধুরা । ক্যানটিনে উপস্থিত বেশ অর্ধেক ছেলে মেয়ে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। নাজরাত দুহাতে মুখ ঢেকে বসে আছে লজ্জায়। বেশ অনেক বার রিকুয়েস্ট করেও এই বিচ্চুগুলোর মুখ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। অগত্য মুখ লুকিয়ে বসে আছে সে। তা দেখে নুহাশ বলে উঠলো,
‘ আরে নববধূ! মুখ ঢেকে রেখেছিস কেন? পর্দা করা শুরু করেছিস নাকি? না পণ করেছিস যে এই পেত্নির মতো মুখটা সাদিফ ভাইকে ছাড়া আর কাউকে দেখাবি না? ‘
নাজরাত দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘ তোরে আমি জুতা পিটা করবো শয়তান। ‘
ফায়াজ পিঞ্চ মেরে বললো,
‘ বাহ! বিয়ে এখনো হলোই না আর আমরা শয়তান হয়ে গেলাম! খুব ভালো। ‘
সায়েরীও তাল মিলিয়ে মুখ টিপে হাসি আটকে বললো,
‘ সারারাত প্রেমালাপ করলে তুমি আর খারাপ হয়ে গেলাম আমরা! এ কেমন বিচার? ‘
নাজরাত অবাক কন্ঠে বললো,
‘ ওই তোকে কে বলেছে রে আমার ফোন চেক করতে?,
সায়েরী কলার উঁচিয়ে জবাব দিলো,
‘ দুলাভাইয়ের টু ইন ওয়ান শালী হই আমি। একটু খোঁজ না নিলে কি হয় বল? ‘
সাফ্রিনও তাল মিলিয়ে বলে উঠলো,
‘ ভাবিইইই, শুনোনা। বলছি কি কি কথা হয়েছে একটু যদি বলতে….। মানে আমাদেরও একটু কাজ দিতো আরকি বুঝো না!! ‘
‘ এতোই যদি শখ থাকার জানার আর বিয়ে করার তবে তোমার ভাইয়ের কাছেই জানতে চাও না গিয়ে। সে নিজ দায়িত্বে সব জানিয়ে দিয়ে বিয়েটাও পড়িয়ে দিবে।,
নুহাশ বললো,
‘ ওইইইই! মুখ সামলে কথা বল।রাজনীতিবিদ নওশাদ কাক্কু (সাফ্রিন তাকাতেই) মানে হইলো নওশাদ খানের একমাত্র সু-কন্যার সাথে কথা বলছিস তুই। উলটা পালটা বলবি তো গুলি সোজা কপালের মাঝ বরাবর এসে পড়বো। তখন তোর সাদিফ এই কলেজ গেইটের কিনারে বইস্যা গান গাইতে থাকবে—
❝ চান্না মেরে আ…মেরে আআ…
চান্না মেরে আ মেরে আ…ও পিয়া…….❞
নুহাশের বলার ভঙ্গি দেখেই হেসে উঠলো সবাই। স্কেল হাতে নিয়ে নুহাশের দিকে তেড়ে আসলো নাজরাত। অমনি দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুট লাগালো নুহাশ। ক্যান্টিন থেকে বের হওয়ার পথে কারো সাথে বাড়ি লাগায় থেমে গেলো নুহাশ। তার দেখাদেখি নাজরাত নিজেও থমকে দাড়ালো। সাদিফকে দেখা মাত্রই তার পিছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়লো নুহাশ। আকুতি করে বললো,
‘ দুলাভা…ই! আপনার এই দজ্জাল বউয়ের হাত থেকে আমার মতো অবলা পুরুষটাকে বাচাঁন! ‘
সাদিফকে দেখা মাত্রই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো নাজরাত। ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নুইয়ে ফেললো। এখনো অতোটা সহজ হয়ে আসেনি সে সাদিফের সাথে।
‘ আপনি এমন কি করেছেন যার কারণে আমার শান্তশিষ্ট বউটা দজ্জাল রূপ নিয়েছে? ‘
‘ বেশি কিছু না। বলেছিলাম আপনি গেইটের পা.. ‘
নুহাশের কথা শেষ হওয়ার আগেই নাজরাত তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
‘ আ..ব আপনি…আপনি এই সময় এখানে কি করছেন? এখন তো আপনার অফিসে থাকার কথা। ‘
‘ আসলে আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো। যদি সময় হয় তো..’
‘ সারারাত কি দুজন ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি গেয়ে প্রতিযোগিতা দিছিলেন নাকি কে কার আগে ঘুমায়? ৪০ মিনিট কথা বলার পরেও কথা শেষ হয়না কেন? ‘
নুহাশের কথাটা শুনে কাশি উঠে গেলো সাদিফের। নাজরাত চোখ রাঙালো নুহাশকে। অবস্থা বেগতিক দেখে চুপিচুপি কেটে পড়লো নুহাশ।
‘ সরি, আসলে নুহাশ একটু এমনি। কিছু মনে করবেন না প্লিজ। ‘
‘ ইটস ওকে। আমি বুঝতে পেরেছি। ‘
‘ এখানে কথা বলা যাবে না। দিগির পাড়ে চলুন। ‘
নিরিবিলি দিঘির পাড়টাই দুজন এসে দাড়ালো। বেশ কিছুক্ষণ পার হওয়ার পরেও টু শব্দও বের হলো না সাদিফের মুখ থেকে। কাচুমাচু মুখ করে বারবার এদিকসেদিক তাকাচ্ছে সে। নাজরাত আন্দাজ করতে পারলো হয়তো রাতের ব্যাপারটা নিয়েই বিব্রতবোধ করছে সাদিফ। নিরবতা ভেঙ্গে নাজরাত বলে উঠলো,
‘ আপনি কিছু বলবেন বলেছিলেন… ‘
‘ হ্যাঁ হ্যাঁ। বলবো। আসলে কাল রাতে আমি…. ‘
‘ আপনি.. ‘
‘ আসলে অনেকদিন পর কাল হুট করে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম তো তাই একটু জ্বর এসেছিলো। জানিনা কখন আপনাকে ফোন দিয়েছি….আই হোপ উলটা পালটা কিছু বলিনি…. ‘
‘ উলটা পালটা না,তবে.. সোজসাপ্টা অনেক কথা বলে দিয়েছেন। ‘
‘ মানে!! ”
সাদিফের আতংকিত চেহারাটা দেখে মুখ চেপে হাসি আটকালো নাজরাত। তা দেখে সাদিফ বললো,
‘ মজা নিচ্ছেন আমার অবস্থার? আপনি জানেন সকালে কল লিস্টে আপনার নাম্বারটা দেখে কতোটা ভয় পেয়েছিলাম! ভেবেছি কি না কি বলেছি….. ‘
‘ বলেছেন তো। অনেক কথায় বলেছেন যেগুলো বুঝেও বুঝিনি। আপনার কথার ধরণ দেখে মনে হচ্ছিলো আপনি আমাকে অনেক যুগ ধরে চিনেন। সত্যিই কি জানতেন আমার ব্যাপারে আগে থেকে? ‘
সাদিফ চমকালো। এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো নাজরাতের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে। কয়েক সেকেন্ড এর জন্য বোবা বনে গেলো সে। বুঝে উঠতে পারলো না কি জবাব দিবে নাজরাতকে।
‘ কথা বলছেন না কেনো? ‘
‘ বলবো। আর একটা দিন অপেক্ষা করুন। আপনাকে পুরোপুরি আমার করে সব প্রশ্নের জবাব দিবো। যেখানে থাকব না কোনো হারিয়ে ফেলার সংশয়। থাকবে শুধু সার্থকতা, আমার নিঃস্বার্থ প্রত্যাশার। ‘
সাদিফের বলা কথাগুলো সব মাথার উপর দিয়ে গেলো নাজরাতের। ফ্যালফ্যাল করে সে তাকিয়ে রইলো সাদিফের দিকে। তার অবুঝ নজর দেখে হাসলো সাদিফ। কাছে এসে মুখের উপরের ছোট ছোট চুলগুলো আলতো হাতে কানের পিঠে গুজে দিয়ে বললো,
‘ মাথায় এতো প্রেসার দিতে হবে না। বুঝার সময় হলে এমনিতেই বুঝবেন। যদি না বুঝেন তবে আমি স্পেশাল ক্লাস নিয়ে বুঝিয়ে দিবো কেমন? ‘
এবারেও কিছু বুঝলো না নাজরাত। তবুও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। যেটা দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো সাদিফ।
সারা বাড়িতে রমরমা ভাব। হৈ-হুল্লোড়ে মাতিয়ে উঠেছে বাড়িটা। হবে নাই বা কেনো! বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা। হোক শুধু কাবিন। তবুও কোথাও কোনো কমতি যেনো না থাকে। কিন্তু যার জন্য এতো আয়োজন রুমের মাঝে চুপটি করে বসে রয়েছে সে। গায়ে লাল রাঙা কামিজ। কোনো প্রসাধনী নেই মুখে। রাতে যখন সাদিফের বাড়ি থেকে লোক আসবে তখনি সাজবে সে। শুনেছে কাবিননামায় আগে তার সাক্ষর নিয়ে পরে সাদিফের টা নিবে। বুকের ভিতরটা ঢিপঢিপ করছে তার। অদ্ভুত অনুভূতি দলা পাকিয়ে রয়েছে গলায়। চোখ ভিজে উঠছে বারেবারে। এই দিনটা যেনো চরম ভয়ংকর তার জন্য। চোখের দৃশ্যপটে ভেসে উঠছে এই ঘরের চার দেওয়ালে তার বেড়ে উঠা।
প্রতিটি আনাচেকানাচে তার শৈশব, কৈশোরের স্মৃতি। বড় হওয়ার পর বাড়ির বাইরে খুব কমই থাকা হয়েছে। তাহলে কি করে থেকে যাবে যুগ যুগ ধরে অন্য একজনের নামের সাথে নিজেকে জড়িয়ে!! কেনো এই অদ্ভুত নিয়ম গড়েছে মেয়েদের জন্য!! নাজরাত নিজেকে বুঝালো, আরো কয়েকটা মাস সে থাকবে এই বাড়ির মেয়ে হয়ে। তবুও যেনো মনটা মানতে চাইছে না। বারেবারে কেঁপে উঠছে অজানা কারণে। হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে চোখ মুছে ঠিকঠাক হয়ে বসলো সে। কাজিন আদনান রুমে প্রবেশ করতেই একটুখানি হাসার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু আদনানের চোখমুখ গম্ভীর। উস্কশুস্ক চুল, চোখজোড়া লালছে হয়ে আছে। নাজরাত অবাক হলো আদনানের এই হাল দেখে। দুজন অনেকটা সমবয়সী বললেই চলে। আদনান বর্তমানে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। দুজনের মাঝে বেশ বন্ধুসুলভ আচরণ। আদনানের এই অবস্থা দেখে নাজরাত মজার ছলে বললো,
‘ কি ব্যাপার! বিয়ে হচ্ছে আমার আর দেবদাস হয়ে ঘুরছো তুমি! ঘটনা কি হুহ!! ‘
‘ তুই বিয়েটা ভেঙে দে নাজরাত। ‘
চমকে উঠলো নাজরাত। কানে কি ভুল শুনলো নাকি সে! আদনান বলছে বিয়ে ভেঙে দিতে!! আবারো হাসিমুখে সে বললো,
‘ ঠিক আছে,চলো তোমার কথায় ভেঙে দিলাম বিয়ে। তারপর কি হবে!! এই মন ভাঙা,বিয়ে ভাঙা অসহায় মেয়েটাকে কে বিয়ে করবে বলোতো? ‘
‘ আমি করবো। আপত্তি আছে তোর? ‘
‘ তুমিও না মুখে কিছুই আটকাও না। আচ্ছা নিচে যাও। কতো কাজ পড়ে আছে সেখানে। আর তুমি, এখানে এসে ডায়লগবাজি করছো। যাও যাও। ‘
নাজরাত সরে আসছিলো এমন সময় হুট করেই তার হাত টেনে ধরলো আদনান। ব্যাকুল কন্ঠে বললো,
‘ আমি ডায়লগবাজি করছি না নাজ! যা এতোদিন যাবত নিজের ভেতরে চেপে রেখেছিলাম তা আজ ব্যক্ত করছি তোর কাছে। ‘
থমকে গেলো নাজরাত। অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে রইলো বহুবছরের চেনা মানুষটার দিকে। সে কি ঠিক শুনছে! অবাক কন্ঠে নাজরাত জানতে চাইলো,
‘ ককিসব ববলছো ততুমি… হাত, হাত ছাড়ো আদনান। পাগল হয়ে গিয়েছো নাকি তুমি? ‘
‘ হ্যাঁ হয়ে গেছি। তুই কেনো বুঝতে চাইছিস না আমার কথা!! সেই ছোট্ট বেলা থেকে তোকে ভালোবাসি। কখনো বলিনি ভেবেছি একটা সঠিক সময়ে এসে বলবো সব। মাকে আমি বলেছিলাম অনেক আগেই। সেটাই সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে আমার। তোর বিয়ের ব্যাপারটা ওরা আমাকে জানতেই দেয়নি। মাত্র গতকাল রাতে জেনেছি। আমি…..আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করবো! তুই..তুই প্লিজ ওই ছেলেকে বল তুই বিয়ে করবি না। প্লিজ কিছু করে এই বিয়ে ভেঙে দে। প্লিজ!! ‘
আদনানের বলা প্রতিটা বাক্যে যেনো আতংক ছিলো। আদনানের পাগলামি দেখে ভয়ে চুপসে গেলো নাজরাত। এই ছেলে যদি জেদের বসে এসে কিছু করে ফেলে তবে নাজরাতের পরিবারের মান সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
‘ ততুমি প্লিজ যাও এখান থেকে। আমি কোনো কথা বলতে চাই না তোমা….. ‘
‘ ঠিক আছে বলতে হবে না। ওই ছেলের নাম্বারটা দে আমাকে। আমি কথা বলবো। ‘
‘ পাগল হয়ে গিয়েছো তুমি! ভেবে দেখেছো কাকে কি বলছো? এই মুহূর্তে বিয়ে আটকে গেলে মান সম্মান কিছু থাকবে আমার? যদি আমার কারণ হিসেবে থাকে আমারই কাজিন? আমার ভাবতেও অবাক লাগছে যে তুমি আমার সাথে এমনটা করতে পারো!! ‘
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে চমকে উঠলো দুজন। নাজরাত নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো আদনানের হাতের বাঁধন থেকে। খাবারের প্লেট হাতে রুমে ঢুকলো সায়েরী। তাকে দেখে দমে গেলো আদনান। নাজরাতের দিকে কড়া চোখে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। নাজরাতের মনে হলো আদনান যেনো শাসিয়ে গেছে তাকে। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বিছানার এককোনায় বসে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। তার হঠাৎ প্রতিক্রিয়ায় চমকে উঠলো সায়েরী। দরজা বন্ধ করে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো নাজরাতকে।
‘ নাজ! কি হয়েছে? আদনান ভাইয়া কিছু বলেছে তোকে? কাঁদছিস কেনো? ‘
কোনো রকম কান্না থামিয়ে একে একে সব খোলে বললো নাজরাত। চরম বিষ্ময়ে হা হয়ে গেলো সায়েরীর মুখ। তারা ভাবতেই পারেনি আদনান এমন কিছুও বলতে পারে।
‘ আম…আমার ভীষণ ভয় লাগছে দোস্ত। ও যদি সত্যি সত্যি সাদিফের নাম্বার জোগাড় করে উলটা পালটা কিছু বলে দেয়? এটা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। জোড়া লাগতে মাস লেগেও ভাঙার জন্য একটা মিনিট যথেষ্ট। আমার খুব ভয় লাগছে! এমন কিছু হলে আব্বুদের মান সম্মান থাকবে না দোস্ত। আম…আমি কি করবো!!! ‘
‘ হুশশ!! কাম ডাউন। তুই শান্ত হ আগে। কিচ্ছু হবে না। যা হবে ভালোই হবে। তুই যা ফ্রেস হয়ে আয়। আমি খাবার এনেছি। একটু পর আর খাওয়ার সময় পাবিনা। ‘
নাজরাত ওয়াশরুমে ঢুকতেই সায়েরী দ্রুত জয়েন কল লাগালো নুহাশ, আয়ান ও ফায়াজকে। অতি সংক্ষেপে আদনানের কথা বলে সাবধান করলো আদনান যাতে সাদিফের সাথে দেখা বা কথা বলার সুযোগ না পায়।
দুরুদুরু বুক নিয়ে কাজির সামনে বসে রয়েছে নাজরাত। একহাত দিয়ে চেপে ধরে আছে সায়েরীর হাত। সবটা কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হচ্ছে তার। আর কিছু সময় পর থেকে সে অন্যের বউ হয়ে যাবে।ভাবতেই অবক লাগছে তার কাজী বিয়ে পড়িয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট একটা সময়ে এসে নাজরাতের কানে বাজলো কাজী সাহেবের কন্ঠ “বিয়েতে মন থাকলে কবুল বলো মা”। বলতে চেয়েও কন্ঠস্বর আরো রূঢ় হয়ে আসলো নাজরাতের। পর্দার আড়ালে দাড়িয়ে থাকা মায়ের অশ্রুসিক্ত মুখখানা দেখে ফুপিয়ে উঠলো সে। দুহাতে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সায়েরী। ফিসফিস করে শান্তনা দিয়ে চোখ মুছে দিলো। কাজী সাহেব পূণরায় একই প্রশ্ন করলে ভাঙা গলায় “কবুল” বলে দিলো নাজরাত। পরপর আরো দুবার কাজীর কথায় কবুল বলার পর পর আলহামদুলিল্লাহ বলে ছোট্ট মোনাজাত করলো সকলে। কাবিননামায় সই করে সায়েরীর সাথে রুমে চলে গেলো নাজরাত। রুমে এসে আরেকদফা কান্নাকাটি শুরু করলো সে। সায়েরী শান্তনা দিতে বসে নিজেই কেঁদে দিলো। শক্ত আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে নিরবে কাঁদতে লাগলো দুই বোন। বেশ কিছুক্ষণ পর নাক টেনে টেনে সায়েরী নাজরাতকে বললো,
‘ কান্না করলে একদম বিশ্রী দেখায় তোকে। বিদায়ের সময় কান্না করবি না একদম। তোর পেত্নী রূপ দেখে সাদিফ ভাই ভয়ে পালিয়ে যাবে তখন। ‘
নাক টেনে নাজরাত জবাব দিলো,
‘ তুই বললেই হলো নাকি! আমি তাকে পালাতে দিতে তবেই না পালাবে। যদি পালাতেই হয় তবে কাবিনের টাকা সব সুদে আসলে উসুল করে তবেই পালাতে দিবো। ‘
‘ কতো বড় ড্রামাকুইন রে তুই!! কাজী যখন বিয়ে পড়াচ্ছিলো তখন তো ফ্যাসফ্যাস করে কান্নার জন্য কিছুই শুনিস নি। অথচ কাবিনের কথা ঠিকই মনে রেখেছিস। ‘
‘ তো রাখবো না! আমারই তো হক এটা। ‘
‘ সাদিফ ভাইয়ের কপালে দুঃখ আছে। বিয়ের পর উনাকে জ্বালিয়ে মারবি দেখা যাচ্ছে। ‘
হঠাৎ আদনানের ব্যাপারটা মাথায় আসতেই মুখ চুপসে গেলো নাজরাতের। আদনান কি সত্যি সত্যি কথা বলেছে সাদিফের সাথে? কাজী তো গিয়েছে বিয়ে পড়াতে। আদনানও আছে সেখানে। কোনো ঝামেলা যেনো না হয় শুধু। নাজরাতের ভয়ের কারণ বুঝতে পারলো সায়েরী। তার নিজেরও ভয় করছে। সায়েরীর কাধে মাথা রেখে চুপটি করে বসে রইলো নাজরাত। প্রহর গুনতে লাগলো অপেক্ষার। কিন্তু আধ ঘন্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো খবর আসলো না। ভয়ের মাত্রা দ্বিগুণ হলো দুজনের। সায়েরী মোবাইল হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে নুহাশদের কল বা মেসেজের। হঠাৎ ফোনের নোটিফিকেশন টিউন বেজে উঠতেই চমকে উঠলো নাজরাত। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো সাদিফের আইডি থেকে কাবিননামায় সই করার ছবি। বুকের উপরে জমে থাকা পাথরের বোঝা টা নেমে গেল নাজরাতের। স্বস্তির শ্বাস ফেললো সে। পরপরই কল করলো সাদিফ। সায়েরী একটু পিঞ্চ মেরে চলে গেলো রুম থেকে। ফোন কানে দিয়ে সালাম দিতে না দিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সাদিফের ব্যাকুল কন্ঠ,
— কংগ্রেচুলেশস মিসেস শাহরিয়ার!
“মিসেস শাহরিয়ার” ডাকটা যেনো রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ বয়ে তুললো নাজরাতের। কিছু ভালোলাগাময় অনুভূতিতে সিক্ত করে তুললো তার মন। সাদিফ আবারো বললো,
‘ আমার জীবনে আসার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে নাজরাত! সেই দেখা হওয়ার প্রথম মুহুর্ত থেকে এতোকাল যাবত আমাকে নতুনভাবে আপনার সাথে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখানোর জন্য ধন্যবাদ। আমাকে নিজের জীবনের সাথে জড়ানোর জন্য ধন্যবাদ। আপনাকে ভাষায় বলে ব্যক্ত করার ক্ষমতা নেই আজ আমি ঠিক কতোটা পরিপূর্ণ, কতোটা আনন্দিত! আমার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাকে আজ বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ নাজরাত। ‘
সাদিফের প্রতিটা বাক্যে লজ্জায় কুঁকড়ে গেলো নাজরাত। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা সাদিফ বুঝতে পারলো তার বউ এই মুহূর্তে লজ্জায় লাল হয়ে আছে। বউয়ের রক্তিম মুখশ্রীটা কল্পনা করে ঠোঁট কামড়ে হাসলো সাদিফ। মোবাইলটা মুখের কাছে এনে ফিসফিস করে বললো,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫
— কিছু লজ্জা আমার জন্যও বাঁচিয়ে রাখো বউ। তাজা গোলাপের সুভাসে মিশিয়ে তোমাকে আমার সাথে জড়িয়ে নিবো কথা দিয়েছিলাম। আর কিছু মুহূর্ত অপেক্ষায় থেকো আমার সান্নিধ্য পাওয়ার। সব অতীত, বর্তমানের রহস্য আজ উপস্থাপন করবো তোমার সম্মুখে। জানিয়ে দিবো সাদমান সাদিফের ঠিক কতোটা ঘিরে তোমার অস্তিত্বেত উপস্থিতি।
