Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫
সাজিয়া জাহান সুবহা

কলিংবেলের শব্দে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় মেজাজ চটে গেলো সায়েরীর। বিছানা থেকে উঠবেনা উঠবেনা বললেও পরপর বেল বাজানোতে বিরক্ত হয়ে উঠতেই হলো। নিশ্চয় তার ছোট বোন মিনহাকে খেলার জন্য ডাকতে এসেছে তার সাঙ্গপাঙ্গরা। রোজ এই সময় তারাই আসে। ঘুমু ঘুমু চোখে দরজা খুললো সে। কে এসেছে না দেখেই পূণরায় নিজের রুমের দিকে যেতে লাগলো সে। যেতে যেতে ঘুম জড়ানো গলায় বললো, ‘ মিনহা রুমে আছে গিয়ে ডাক দাও রিনি।”

‘ এই মেয়ে!! ‘
কদম থেমে গেলো সায়েরীর। এই ডাকটা তার পরিচিত। খুব পরিচিত। কিন্তু ঘুমের ঘোরে সে বুঝতে পারলো না ডাকটা কোথা থেকে আসছে। মাথা উঁচু করে সিলিংয়ের দিকে বোকা বোকা নজরে তাকালো সে। আসমান থেকে ভেসে আসলো নাকি এই ডাক!
এরই মধ্যে আরও একটি বাচ্চা কন্ঠ ভেসে ওঠে,
‘ সায়েরী আপু, মিনহা কোথায়? ‘
সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই সায়েরী জানতে চাইলো—
‘ রিনি! আমার মনে হলো আমি ওই অ্যানাকন্ডা টার কন্ঠ শুনলাম। ‘
‘ আকানডা কি আপু? ‘

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ আকানডা হলো তোর আবরার ভাইয়ের জিগরী দোস্ত। দ্যা গ্রেট সাফওয়া আ আ… ‘
কথা বলতে বলতে রিনির পাশে দাঁড়ানো সাফওয়ানের অবয়ব দেখে ভিমরি খেলো সায়েরী। কথা থেমে গেলো তার। চোখ ডলে ভালোভাবে তাকানোর চেষ্টা করলো। হ্যাঁ, সাফওয়ানকেই তো দেখা যাচ্ছে। রিনি সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ আপু কি তোমাকে আকানডা বলেছে ভাইয়া? ‘
কথাটা শুনে আত্মা লাফিয়ে উঠলো সায়েরীর। ভীতি চোখে সাফওয়ানের দিকে তাকাতেই দেখলো ভ্রুঁ কুঁচকে সায়েরীকে আগাগোড়া স্ক্যান করছে সে। টনক নড়লো সায়েরীর। নিজের দিকে তাকাতেই তার ইচ্ছে হলো মাটি ফাঁক করে তার মধ্যে ঢুকে পড়তে। তার পরনে একটা হোয়াইট ট্রাউজার আর ঢিলাঢালা হাটু অবধি লম্বা পিংক টি-শার্ট। যার মধ্যে “হ্যালো কিট্টি” কার্টুন আঁকা। এলোমেলো বিনুনি করা চুলগুলো কাধের একপাশে ঝুলছে। তার উপর সদ্য ঘুম থেকে উঠা চেহারা। নিজের অবস্থা দেখে এক সেকেন্ডও বিলম্ব না করে উল্টো দৌড় লাগালো সায়েরী। কিন্তু বেশিদূর যাওয়ার আগেই সোফার হ্যান্ডেল এর সাথে বারি খেলো হাটুতে। তা দেখে ফুস করে নিঃশ্বাস ফেললো সাফওয়ান। মনে মনে বললো,

” কিছু ইডিয়ট সারাজীবন ইডিয়ট-ই থাকে। ”
হাটু চেপে সোফায় বসে পড়লো সায়েরী। খুব বেশি জোরে না লাগলেও ব্যথা লাগছে খুব। তখনই আবরার বেরিয়ে আসলো রুম থেকে। সাফওয়ানকে দেখে বললো,
‘ আরে! বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? ভেতরে আয়। ‘
‘ তুই এখনো রেডি হোসনি? ‘
‘ সো সরি দোস্ত। তুই বস আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসছি। এই বুড়ি যা তো কফি নিয়ে আয়। ‘
আবরারের কথাটা শুনার সাথে সাথেই নাচক করলো সাফওয়ান। বললো,
‘ আমার কফির প্রয়োজন নেই। স্পেশালি লবণ মিক্স কফি খাওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। ‘
সাফয়ানের কথাটা কানে যেতেই রেগে গেলো সায়েরী। আবরারের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘ ভাইয়া, তোমার বন্ধুকে বলে দাও যে তার জন্য কফি বানাতে কেউ বসে নেই এখানে। আর ভুল মানুষ এক না একসময় করেই ফেলে। এটাকে বারবার রিপিট করলে ভুলটা শুধরে যাবে না। ‘
‘ ওকে ওকে কুল। তুই যা বোন।তোকে কিচ্ছু করতে হবে না। ‘

ধুপধাপ পা ফেলে রুমে চলে গেলো সায়েরী। সাফওয়ানের অবশ্য সেদিকে পাত্তা না কখনো ছিলো না আজ আছে। সে আবরারের অপেক্ষায় বসে রইলো বিরক্তমুখে। মাঝখানে একবার আবরারের মা এসে কফি দিয়ে গেলো। সাথে অনেক্ষণ গল্পগুজব করলো।
রুমে এসে সায়েরী দেখলো বেডের উপর রাখা মোবাইলটা অনবরত বেজে যাচ্ছে। জয়েন গ্রুপ কল এসেছে। রিসিভ করার সাথে সাথে নাজরাত,তোহা ও নুহাশের মুখ ভেসে উঠলো স্ক্রিনে। সায়েরীকে দেখা মাত্র তোহা বলে উঠলো,
‘ ওই দেখ এবার সায়েরীও এসে গেছে। এখন বলে দে কি বলবি। আর কারো অপেক্ষা করিস না বইন। ‘
পরক্ষণেই নুহাশ বিরক্ত গলায় বলে উঠলো,

‘ তোরা মেয়েরা কি সহজভাবে কিছু করতে, বলতে পারিস না? বলবিই না যখন তাহলে দুই ঘন্টা আগে থেকে কল দিয়ে বসিয়ে রেখেছিস কেন? এই ডাইনি মার্কা মুখ গুলো দেখে আমার কি লাভ?
‘ উফফ্..আমি মরছি আমার টেনশনে আর তোরা!’ নাজরাতের বিরক্তিকর কন্ঠ।
সায়েরী ভ্রুঁ কুঁচকে জানতে চাইলো, ‘ কি হয়েছে?’
‘ এই সপ্তাহের শুক্রবারে আমার আকদ্। ‘
কথাটা শুনা মাত্র চিৎকার করে উঠলো তোহা এবং সায়েরী, ‘ কিইইইইইহ!!!!!! ‘
দুজনের চিৎকার শুনে কেঁপে উঠলো নাজরাত ও নুহাশ। শার্ট ফাঁক করে বুকে থু থু মারলো নুহাশ। বিরক্ত কন্ঠে বললো,

‘ আল্লাহ মালুম তোরা মাইয়া মানুষদের বানানোর সময় তোদের মাঝে কি মিশাইছে ফেরেশতা গণ। জানুয়ারের মতো ক্যা ম্যা না করে কথা বলতে পারিস না তোরা? ‘
সায়েরীঃ তুই মানুষ তো, তাতেই হবে। আমরা জানুয়ার হিসেবেই ভালো আছি। এই নাজরাত! তুই বলতো কি হয়েছে? আমি কেনো বাসায় শুনলাম না এমন কিছু?
নাজরাতঃ পড়ে পড়ে ঘুমালে শুনবি কিভাবে? মামা আর আব্বুরা মিলে ডিসিশন নিয়েছে। এই শুক্রবার জুমার নামাযের পর আকদ্।

ফায়াজঃ মাই গড!! তুই বিবাহিত হয়ে যাবি, নাজরাত?
আয়ানঃ না না, সে ঘর ঘর খেলা খেলবে সাদিফ ভাইয়ের সাথে।
নাজরাতঃ মনে হচ্ছে সেটাই করছি। সব কেমন হুট করে হয়ে গেলো!!
সায়েরীঃ ভাইয়ারা বাসায় আসবে না?
নাজরাতঃ রাতের খাবারের আয়োজন করবে।
নুহাশঃ কত্তো বেহায়া রে তুই! একটু দাওয়াতও দিতেছস না।
ফায়াজঃ হুমম..খাবারের নাম শুনা মাত্রই দাওয়াত নেওয়া শুরু তোর।
নাজরাতঃ আচ্ছা আচ্ছা ঝগড়া করিস না। আমি কি বলেছি নাকি যে দাওয়াত দিবো না! তোদের ছাড়া আমি বিয়ে করবো! ছেলেরা সবাই দুপুরে আকদ্ পড়ানোর আগেই চলে আসবি। সায়েরী, তোকে যাতে দ্বিতীয় বার বলতে না হয়। সকালের দিকেই চলে আসতে হবে কিন্তু তোকে।

সাফ্রিনঃ আজ বর পক্ষ বলে আমার কোনো কদর নেই।
আয়ানঃ তুই নিজেই দুদিন ধরে নেটওয়ার্ক এর বাইরে। তোকে কদর করার জন্য খুঁজতে যাবে কে?
তোহাঃ সে কথা রাখ। আগামী সোমবারে তো আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কি প্লানিং করলি তোরা?
সায়েরীঃ আচ্ছা সেটা নাহয় কাল সামনাসামনি আলোচনা করবো। এখন রাখ ফোন।
নাজরাতঃ হ্যাঁ হ্যাঁ বাকি কথা কাল হবে। এখন রাখছি আমি।

নিজের রুমে পায়চারি করতে করতে পা ব্যাথা হয়ে উঠলো নাজরাতের। একটু আগেই তার মা এসে বললো সাদিফের মা কল করে বলেছে আকদ্ উপলক্ষে কিছু কেনাকাটা বাকি আছে। যদিও অর্ধেকের বেশি কেনাকাটা করা শেষ। কিন্তু যা বাকি আছে তা নাজরাতের পছন্দের নিবে। তাই একটু পরেই শপিং মলে যেতে হবে নাজরাতকে। সেখানে সাদিফের সাথে পরিবারের কেউ থাকবে। কিন্তু এভাবে একা একা যেতে অস্বস্তি লাগছে নাজরাতের। কতজন থাকতে পারে সেখানে! তাদের মাঝে নাজরাত একা একা বসে থাকলে দম বন্ধ হয়ে মারাই যাবে। আর থাকতে না পেরে সায়েরীকে কল দিলো সে। বোন হওয়ার একটু ফায়দা তুলতে তো হবেই।

‘ হ্যালো? ‘
‘ আপাতত হেলতে পারছি না। কি বলবি বল। ‘
‘ হেলতে তোকে বলছি না। পাঁচমিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে বাসায় আয়। একটা জায়গায় যেতে হবে। আর্জেন্টলি যেতে হবে। ‘
‘ কেনো রে তোর জামাই কি বিয়ের আগেই লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে নাকি? আমার মতো সিঙ্গেল একটা মেয়েকে কেনো টানছিস তোর আর্জেন্টিনায়?? ‘
‘ উফফ্ এতো কথা বলিস কেনো তুই! যা বলেছি কর না… ‘
‘ আসছি বাবা আসছি। মিস থেকে মিসেস হতে যাচ্ছিস। তোর কথা না শুনে আর উপায় আছে! ‘
‘ হয়েছে আর বলতে হবে না। জলদি আয় তুই। ‘

প্রায় ৪০মিনিট পর দুজন গিয়ে পৌছালো শপিং মলে। সূর্যের উত্তাপে দুজনের অবস্থা শোচনীয়। মলের সামনেই দেখা মিললো সাদিফের নিশি ভাবির। সাথে ৪-৫ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে। নাজরাতদের সাথে কুশল বিনিময় করে ভেতরে ঢুকে এক জায়গায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলো বাকিদের। নিশির সাথে অন্যকাউকে না দেখে ইনিয়ে বিনিয়ে নাজরাত জানতে চাইলো—
‘ আপনি একাই এসেছেন? ভাইয়ারা কেউ আসেনি সাথে? ‘
নাজরাতের কথাটা শুনতেই নিশি দুষ্টু কন্ঠে বললো—
‘ তোমার ভাইয়ের কথা জানতে চাইছো না আমার ভাই সমান দেবরের কথা? ‘
নাজরাত লজ্জা পেলো। আসলেই সে সাদিফের কথাটাই জানতে চেয়েছে। কিন্তু সরাসরি জিজ্ঞেস করার সাহস ছিলো না। তাকে লজ্জা পেতে দেখে হেসে উঠলো নিশি।
‘ হয়েছে এতো লজ্জা পেতে হবেনা। তোমার বর অফিস থেকে সরাসরি এখানে আসবে। এতোক্ষণে চলে আসার কথা। ‘

‘ আপনি একাই এসেছেন? ‘
‘ আরে নাহ! তোমার ছোট দেবর রেখে গিয়েছে আমাকে এখানে। আসলে তোমার ভাইয়া অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেনি। আর পরিবারে কোনো ইয়াং মেয়ে নেই যে সাথে আসবে। আমিই আছি একমাত্র বউ। সম্পর্কে চাচাতো ভাই হলেও সাদিফ, সাহিল, ইভান, ইফাজ সবাই আপনের মতোই। তাই তো সবকিছুতে এই আমার এতো অবদান দেখছো। ‘

নিশির হাসিমুখে বলা কথাগুলো শুনে অদ্ভুত প্রশান্তি পেলো নাজরাত। এমন একটা হাসিখুশি পরিবারের স্বপ্ন ছিলো তার। আজ যেনো তা বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। সাদিফের ছোট ভাই সাহিল। এবং নিশির হাসবেন্ড হলো ইফাজ আর তার ছোট ভাই ইভান। সাহিল এবং ইভান অনেকটা সমবয়সী বললেই চলে। দু পরিবারের কারোরই মেয়ে নেই। তাই হয়তো নিশি বউ হিসেবে এতো আদরের। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সায়েরীর দিকে চোখ গেলো নাজরাতের। নিশির ছেলে নাহিয়ানকে কোলে নিয়ে ম্যানিকুইন গুলোর সাথে ছবি তুলছে সে। অদ্ভুত অদ্ভুত মুখভঙ্গি করছে আর সমান তালে হাসছে দুজনেই।
‘ সরি সরি…..অনেক্ষণ অপেক্ষা করিয়েছি তাইনা? ‘
সাদিফের গলা শুনতেই ফিরে তাকালো নিশি ও নাজরাত। সাদিফের ঘর্মাক্ত ক্লান্ত মুখশ্রীটা দেখে মায়া হলো নাজরাতের। সাদিফের সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিলো নাজরাত। দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসলো নিশি। চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললো,
‘ ঠিক বলেছেন। অনেএএক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে আছে নাজরাত। এবার অপেক্ষাটা একটু পুষিয়ে দিন। আমি আসছি।

হাসলো সাদিফ। নিশির ছেড়ে যাওয়া চেয়ারটাতে বসে শার্টের টপ বাটন দুটো খুলে দিলো। গরমে রীতিমতো শরীর জ্বালা করছে তার। সায়েরীর ব্যাগ থেকে ওয়াটার বোতলটা বের করে সাদিফের দিকে এগিয়ে দিলো নাজরাত। একটুর জন্য অবাক হলো সাদিফ। আবার খুশিও হলো তার প্রতি নাজরাতের এমন যত্নশীল আচরণে।
‘ খুব বেশি অপেক্ষা করিয়েছি? ‘
‘ না না। অল্প কিছুক্ষণ হলো আমরা এসেছি। ‘
‘ ওহ। ‘
‘ এমনিতেই গরম পড়ছে অনেক। আজ না আসলেও পারতেন। অফিস থেকে এখানে, আবার কতোক্ষন ঘুরাঘুরি করতে হবে নিশ্চয়তা নেই। এমন অবস্থায় কি দরকার ছিলো আসার!! ‘

‘ আগেই আসার কথা ছিলো কিন্তু কাজের চাপে সময় হয়নি। দুদিন পরেই প্রোগ্রাম। আর কতো বসে থাকবো! আজ একটু চাপ কম ছিলো কাজের। তাই আসলাম। এনিওয়ে, ভাবীর কাছে লিস্ট আছে কেনাকাটার। নিজে পছন্দ করে রাখবেন সব। লিস্টের বাইরেও যদি কিছু পছন্দ হয় তাহলে নির্দ্বিধায় আমাকে বলবেন, কেমন? ‘
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো নাজরাত। সাদিফ আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো এমন সময় দুজনের মাঝখানে হাড্ডি হয়ে জুড়ে বসলো সায়েরী। একগাল হেসে লম্বা করে সালাম জানালো সাদিফকে।
‘ আসসালা….মু আলাইকুম দুলা……ভাই!! ‘
‘ ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছেন শালী সাহেবা? ‘
‘ ভালো আর থাকলাম কিভাবে! এইযে আপনি এখানে আসলেন, ঠিক কতোক্ষণ হলো বলুন তো? মিনিমাম পাঁচ মিনিটের ঊর্ধ্বে ,তাইতো? এই পাঁচ মিনিটে আপনার একটাবারের জন্যও ইচ্ছে হয়নি আপনার এই টু ইন ওয়ান শালীটার একটু খোঁজ নেয়ার! আপনি কি করে পারলেন আমার মতো সুইট, কিউট একটা মেয়েকে এভাবে ইগনোর করতে!! ‘

‘ আরে আমি তো…… ‘
‘ হ্যাঁ হ্যাঁ আপনার কথায় তো বলছি। ইনফেক্ট আপনাদের দুজনের কথায় বলছি। মানুষ বিয়ের পর বউ পাগল হতে দেখেছি। কবুল বলার সাথে সাথেই যেনো বউ ছাড়া সারা পৃথিবী তার জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। আর আপনি!! এখনো বিয়ের ডেট পরলো না, আকদ্ হতে এখনো অলমোস্ট ৭২ঘন্টা বাকি। আর আপনি কিনা এখন থেকেই বউ ছাড়া বাকি সব ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট দেখতে শুরু করেছেন!! ভেরী ডিসাপয়েন্টিং দুলাভাই! ‘
সায়েরীর লাগামছাড়া কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো সাদিফ। আর সাদিফের সামনে সায়েরীর কথায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেলো নাজরাত। গলা খাঁকারি দিয়ে সায়েরীর দিকে মনোনিবেশ করলো সাদিফ। হাসিমুখে জানতে চাইলো,

‘ আপনার ভাষ্যমতে আমার টু ইন ওয়ান শালিকাকে এটেনশন না দিয়ে আমি মহৎ পাপ করে ফেলেছি। তো এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে আমাকে কি করতে হবে বলুন। ‘
‘ উহুম!! লেট মি ভাবিং……আচ্ছা আপাতত কিছু করতে হবে না। তবে হ্যাঁ….আকদ্ হোক কিংবা বিয়ে, আমাদের পাওনা কিন্তু আমরা উসুল করেই নিবো। এই ব্যাপারে কোনো ছাড় কিন্তু পাবেন না আপনি। তাই পকেট একটু গরম রাখবেন ঠিক আছে?? ‘
‘ জো হুকুম শালী সাহেবা। এবার কি আমরা শপিংয়ে মনযোগ দিবো? ‘

‘ সিউর। আপনারা যান। আমি নাহিয়ানকে দেখছি। এমনিতেও এসব ব্যাপারে আমার আই কিউ খুব বাজে। ‘
নাজরাত বেশ কয়েকবার যেতে বললেও তার সাথে গেলো না সায়েরী। নাহিয়ানকে নিয়ে খেলতে লাগলো সেই জায়গায়। নিশি,সাদিফ ও নাজরাত মিলে ভেতরে ঢুকলো। নাহিয়ানকে নিজের মুখোমুখি টেবিলে বসিয়ে ফানি টাইপ ইফেক্ট দিয়ে ভিডিয়ো করতে লাগলো সায়েরী। দুজনের মুখে খিলখিল হাসি। একটু পরেই “চাচ্চু” বলে ডাক দিয়ে টেবিল থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করলো নাহিয়ান। সাথে সাথেই ধরে ফেললো সায়েরী। তার হাতের উপর এগিয়ে আসলো আরো একজোড়া পুরুষালি হাত। চোখাচোখি হলো দুজনের। কিন্তু কেউই চিনতে পারলো না কাউকে। সায়েরীর কাছ থেকে নাহিয়ানকে একপ্রকার ছিনিয়ে নিলো ছেলেটা। শক্ত কন্ঠে বললো,
‘ কে আপনি? এভাবে অন্যের বাচ্চা নিয়ে বসে আছেন!! কোথায় পেয়েছেন ওকে? ‘
ছেলেটার হঠাৎ প্রতিক্রিয়ায় থ হয়ে গেলো সায়েরী। তার তরফ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে নাহিয়ানকে প্রশ্ন করলো ছেলেটা।

‘ চাচ্চু, তোমার আম্মু কোথায়? এই মেয়েটার কাছে কিভাবে এলে তুমি? যদি তোমাকে বস্তায় ঢুকিয়ে নিয়ে চলে যেত তখন কি হতো বলো? ‘
সায়েরী ভড়কে গেলো এমন অপবাদ পেয়ে। তৎক্ষনাৎ চটে গিয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে প্রতিবাদ করে উঠলো,
‘ এই কি বললেন আপনি? আমাকে দেখে বাচ্চা চোর মনে হচ্ছে আপনার? ‘
‘ মনে না হওয়ার কি আছে। অন্যের বাচ্চা দখলে নিয়ে বসে আছেন। আপনাকে বাচ্চা চোর না ভেবে আর কি ভাবা যায় বলুন তো? ‘
সায়েরী আঙ্গুল তুলে শাসায়,
‘ আপনার সাহস তো কম না। এক্ষুনি আমি সাদি… ‘
‘ হোয়াট’স রং উইথ ইউ সাহিল! পাবলিক প্লেসে এতো চেঁচামেচি করছিস কেনো? ‘

পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে ফিরে তাকালো দুজন। সাফওয়ানকে দেখে খানিক অবাক হলো সায়েরী। আবরারের সাথে কোনো একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলো সে। বেশ দূরের পথ ছিলো সেটা। দিনে গিয়ে দিনে আসায় প্রচন্ড টায়ার্ড আবরার। সায়েরী যখন এখানে আসছিলো তখনো ঘুমাচ্ছিলো আবরার। আর সাফওয়ান কিনা ড্যাংড্যাং করতে করতে শপিংয়ে এসে হাজির!সায়েরীর ভাবনার মাঝে ছেলেটা সাফওয়ানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ ভাইয়া, এই মেয়ে নাহিয়ানকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিলো। ‘
সায়েরী পুণরায় খেকিয়ে উঠে,
‘ আজব লোক তো আপনি! চুরি করার থাকলে কি এখানে বসে থাকতাম নাকি আশ্চর্য! ‘
‘ আপনি সুযোগ খুজছিলেন নিশ্চ… ‘
দুজনের তর্কে বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠলো সাফওয়ান,
‘ স্টপ ইট গাইজ। বাচ্চাদের মতো ঝগড়া শুরু করেছো কেনো দুজন? সাহিল, এই মেয়ে নাহিয়ানকে চুরি করছিলো না। ও তোমার ভাবির বোন। অ্যান্ড ইউ (সায়েরী), তোমার একমাত্র দুলাভাইয়ের এরকমাত্র ভাই হয় সে। এবার ঝগড়াটা বন্ধ করো। ‘

সাফওয়ানের কথা শুনে সাহিল ও সায়েরী দুজনেই চোখ ছোট ছোট করে তাকালো একে অপরের দিকে। সাহিলের দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে উল্টো হেটে চলে গেলো সায়েরী। তার এমন চাহনিতে অবাক হলো সাহিল। এই পুচকি মেয়েটা তার সাথে পাঙ্গা নিচ্ছে!
‘ ভাইয়া, তুমি দেখেছো এই মেয়ের আচরণ! সামান্য পুচকি একটা মেয়ে আর আমাকে চোখ রাঙিয়ে গেছে! ‘
সাফওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,
‘এতোকাল ধরে দেখে আসছি। নতুন করে দেখার কিছু নেই।’
‘ তুমি চিনো তাকে? ‘
‘ হুহ। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আবরারের ছোট বোন সে। আচ্ছা তুই থাক আমি দেখছি সাদিফ ভাই কেনো আসতে বলেছিলো। ‘
সাফওয়ানের গমন পথের দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো সাহিল। সায়েরীর ধানিলঙ্কা রূপ এখনো চোখে ভাসছে তার।

‘ চাচ্চু, ওই আন্টি টা তোমাকে বকা দেইনি তো? ‘
ডানে বামে মাথা নেড়ে না বললো নাহিয়ান। স্পষ্ট কন্ঠে জানালো,
‘ আন্টি আমাকে অনেক আদর দিয়েছে। আমি এত্তোওও গুলো (হাত দিয়ে ইশারা করে) ছবি তুলেছি। ডলের সাথেও ছবি তুলেছি। আন্টি চকলেটের চেয়েও সুইট। ‘

নাহিয়ানের কথায় হাসলো সাহিল। জুয়েলারি সেকশনে এককোনায় গাল ফুলিয়ে বসে থাকা মেয়েটাকে হুট করেই নাহিয়ানের কথানুযায়ী খুব কিউট লাগলো তার কাছে। পিংক আর হোয়াইট কম্বিনেশনের টপ, গলায় পেছিয়ে রাখা পিংক উড়না, চুলগুলো সব একত্র করে ক্লিপ দিয়ে আটকানো। মুখের দুপাশে এসে পড়ছে ছোট ছোট কিছু চুল। সব মিলিয়ে এই শ্যামবর্ণের মেয়েটাকে ভীষণ মায়াবতী লাগছে তার কাছে। আচ্ছা, মেয়েটার নামটাই তো জানা হলো না। একটাবার সরি বলা উচিত ছিলো হয়তো। যেই ভাবা সেই কাজ। নাহিয়ানকে সাথে নিয়ে সায়েরীর পাশের সিটে বসতে গেলো সাহিল। কিন্তু তার আগেই সাহিলকে একপ্রকার উপেক্ষা করে উঠে নাজরাতের কাছে চলে গেলো সায়েরী।অবাক চিত্তে সেদিকে তাকিয়ে রইলো সাহিল।
এই মেয়ে না দেখেই বুঝে গেলো কিভাবে!আস্ত একটা ধানিলঙ্কা!

‘ ভাই, এসব মেয়েদের কেনাকাটাতে আমাকে ডেকেছো কেনো? ‘
সাফওয়ানের কথার জবাবে সাদিফ বললো,
‘ আরে বিয়ে শুধু মেয়ে করবে নাকি? আমার জন্যও কিছু কিনতে হবে তো। ‘
‘ আচ্ছা বলো কি লাগবে? দেখছি আমি। ‘
‘ চল আমিও আসছি। ‘

নাজরাতদের রেখে সাফওয়ানের সাথে অন্যপাশে গেলো সাদিফ। নিশি ও নাজরাত ঘুরে ঘুরে এতো কিছু দেখছে তা দেখে মাথা ঘুরিয়ে আসতে লাগলো সায়েরীর। নিশি নিজেই এটা ওটা বের করে দেখাচ্ছে। নাজরাত শুধু হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলাচ্ছে। অবশেষে সবার কেনাকাটার পর্ব হলো। সবাই একসাথে হালকা কিছু স্ন্যাকস খেলো। সায়েরী নাহিয়ানকে কোলে নিয়ে ফিসফিস করে কিসব বলছে আর চুপিচুপি হাসছে দুজন। সাহিল একধ্যানে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। যেটা নিশি ও সাফওয়ান দুজনের চোখেই পড়লো। নিশির মুখে হাসি ফুটলেও সাফওয়ান বরাবরের মতোই গম্ভীর।
সাদিফ সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ তুই সায়েরীকে একটু বাড়িতে ড্রপ করে দিস তো। ‘
সাহিল হঠাৎ বলে উঠলো,

‘ আ…ব বলছিলাম কি, আমিও বের হবো এখন। আমি ড্রপ করে দিতে পারবো। ‘
সাহিলের কথা শেষ হতে না হতেই সিট থেকে উঠে দাড়ালো সাফওয়ান। চাবি হাতে নিয়ে সায়েরীর উদ্দেশ্যে বললো “কাম ফাস্ট”। এতোগুলা মানুষের সামনে না করতে পারলো না সায়েরী। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরুনোর সময় তার দিকে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিলো সাদিফ। সায়েরী নিতে না চাইলেও সাদিফের জোড়াজুড়ি তে নিতেই হলো। সায়েরীর গমন পথে তাকিয়ে হতাশার শ্বাস ফেললো সাহিল। মেয়েটাকে একটাবার সরি বলারও সুযোগ হয়নি তার।

গাড়িতেই বসা ছিলো সাফওয়ান। সায়েরী আসতেই গাড়ি স্টার্ট করলো সে। দুজনেই চুপচাপ। অবশ্য সাফওয়ানের সাথে থাকা মানেই চুপচাপ থাকা। খোলা জানালায় মাথা টেকিয়ে চোখ বুজলো সায়েরী।
নাহিয়ান ও নিশিকে নিয়ে সাহিল বাড়ি চলে গেলো। সবার শেষে বের হলো সাদিফ ও নাজরাত। বেরুনোর সময় পাশের একটা শপে সোনালি পাড়ের নীল শাড়ি জড়ানো একটা ম্যানিকুইন দেখে চোখ আটকে গেলো সাদিফের। পাশেই ছিলো সেম ডিজাইনের একটা পাঞ্জাবি। নাজরাতকে জিজ্ঞেস করলো,
‘ শাড়িটা সুন্দর না? ‘
‘ হ্যা ভালোই। ‘

ব্যাস, নাজরাতের সম্মতি পেয়েই শপে ঢুকে গেলো সাদিফ। নাজরাত বারণ করা স্বত্তেও কিনে নিলো শাড়ি ও পাঞ্জাবি দুটো। শাড়ির প্যাকেটটা নাজরাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
‘ চারদিন পরেই না আপনার কলেজে অনুষ্ঠান? তখন পরবেন এটা। ভালো লাগবে আপনাকে। ‘
‘এসব অনুষ্ঠানে এতো হ্যাভি শাড়ি কে পড়বে? ‘
‘ হ্যাভি কই? দেখুন কতো সফট। ‘
‘ আচ্ছা ঠিক আছে পড়বো। এবার গাড়ি নিয়ে আসুন। সন্ধ্যা হয়েও গিয়েছে। ‘
‘ আপনি এখানেই দাঁড়ান। আমি আসছি। ‘

সপ্তম বারের মতো গাড়ির ধাক্কা খেয়ে বিরক্তিতে মুখ বিকৃতি করে ফেললো সায়েরী। আজ এতো কেয়ারলেস হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে কেনো সাফওয়ান ভাই! রাস্তার মাঝে ভাঙ্গা জায়গাগুলো যেনো তার চোখেই পড়ছে না। সরাসরি সাফওয়ানের দিকে তাকালো সায়েরী। চোখ ঝাপটা মারছে সে বারবার। যেনো বিনা অনুমতিতে বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে চোখজোড়া। হাতজোড়াও কিছুক্ষণ পর পর টান টান করছে সে। থেমে থেমে ঘাড় ঢলছে। সাফওয়ানের এমন আচরণ দেখে অনেকটাই অবাক হলো সায়েরী। হলো কি এই ছেলের! হঠাৎ তীব্র আওয়াজে ব্রেক কষলো সাফওয়ান। মাথায় বারি লাগতে লাগতে বেঁচে গেলো সায়েরী। গাড়ি চালু হচ্ছে না দেখে বের হলো সাফওয়ান। সায়েরীর উদ্দেশ্যে বললো,

‘ গাড়িতেই থাকো। আমি দেখছি কি হয়েছে। ‘
গাড়ির সামনের ডিকি খুলে সাফওয়ান কি সব দেখছে। সন্ধ্যার আকাশে কালো মেঘ জমে ছিলো অনেক আগে থেকেই। সাফওয়ান গাড়ি থেকে নামার কিছু সেকেন্ড পরেই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো। অমনি সাফওয়ানের সব আদেশকে টাটা বাই বাই বলে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো সায়েরী। বৃষ্টির পানি শরীরে পড়তেই সারা শরীর শিন শিন করে উঠলো তার। মিনিটের মধ্যেই ভিজে চুপসে গেলো গোটা শরীর। আকাশের দিকে মুখ করে দুহাত মেলে বৃষ্টিকে অলিঙ্গন করতে লাগলো সে। ভুলেই গেলো যেনো আশেপাশে কারো উপস্থিতি।
‘ এই মেয়ে! ‘

সাফওয়ানের ভরাট কন্ঠ শুনে কেঁপে উঠলো সায়েরী। ঠিক তার পেছনেই ভেজা শরীরে সাফওয়ান দাঁড়ানো। সায়েরী স্পষ্ট দেখলো রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে সাফওয়ানের চোখজোড়া। কপালের ভেজা চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে গলার স্বর যথাসম্ভব শক্ত করে সে বললো,
‘ তোমাকে বলেছিলাম না গাড়িতেই থাকতে? একটা কথাও কেনো শুনোনা তুমি? ‘
সায়েরী মন হুট করেই ঘাবড়ে গেলো অজানা কারণে। আজও সাফওয়ান বকেছে। কিন্তু আজ তার কন্ঠে তেজ নেই। চোখে ক্রোধ নেই। কি হয়েছে তার! সবসময় পরিপাটি থাকা মানুষটার এই রূপ যেনো হজম করতে পারছে না সায়েরী।

‘ গ..গাড়িতে ববসো। ‘
‘ আপনার কি জ্বর এসেছে? ‘
সায়েরীর এমন প্রশ্নে হয়তো অবাক হয়েছে সাফওয়ান। কিন্তু প্রতিবারের মতোই নিশ্চুপ রইলো সে। তবে আজ চোখজোড়া গেঁথে রাখলো বৃষ্টিতে সিক্ত হয়ে থাকা সায়েরীর মুখশ্রীতে। সাফওয়ানের উত্তর না পেয়ে অনেকটা কাছাকাছি এগিয়ে আসলো সায়েরী। নির্দ্বিধায় হাত রাখলো সাফওয়ানের কপালে। সায়েরীর শীতল হাতের স্পর্শে কম্পন উঠলো সাফওয়ানের দেহে। কিন্তু বুঝতে দিলো না সে। সাফওয়ানের উত্তপ্ত কপালে হাত রেখেই আৎকে উঠলো সায়েরী। এতো গরম!
‘ পাগল আপনি! এতো জ্বর নিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছেন? বৃষ্টি…. উফফ্! এই জ্বর নিয়ে আবার বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছেন! আপনার কি আক্কেল জ্ঞান বলতে কিছু নেই? ‘

নিজ মনে সাফওয়ানকে বকতে বকতে গাড়ির দরজা খুললো সায়েরী। সাফওয়ান তখনো একনজরে তার দিকে তাকিয়ে। তাকে বসতে না দেখে একপ্রকার ঠেলে গাড়িতে ঢুকালো সায়েরী। নিজেও বসে পড়লো। কিন্তু এবার চিন্তা হলো এই শরীর নিয়ে সাফওয়ান গাড়ি চালাতে পারবে কিনা সেটা ভেবে।
‘ দেখুন, এই মুহূর্তে আপনি ছাড়া আর কেউ নেই যে গাড়ি চালাবে। ঠিকঠাক চালাতে পারবেন তো? এখনো বিয়ে শাদি করিনি। আপনিও তো করেন নি। এতো তাড়াতাড়ি মরার শখ নেই আমার। আচ্ছা আমার কথা বাদ। নিজের জন্য হলেও একটু ঠিকভাবে গাড়ি চালিয়ে যান কেম.. ‘

‘ শাট আপ! জাস্ট কিপ ইউর মাউট শাট। এতো কথা কিভাবে বলতে পারো তুমি? জ্বরের জন্য মাথা না ঘুরালেও তোমার ননস্টপ বকবক শুনে আমি নিশ্চিত মাথা ঘুরিয়ে গাড়ি এক্সিডেন্ট করবো। ‘
‘ আসতাগফিরুল্লাহ!! এমন অশুভ কথা কেনো বলছেন? আল্লাহ নাম নিয়ে গাড়ি চালু করুন। আমি বেঁচে গেলে ট্রিট দিবো, প্রমিস। ‘
চোখ বুজে দোয়া পড়তে লাগলো সায়েরী। সে দেখলোই না তার ছটফটানি দেখে জ্বরের ঘুরে মৃদু হাসছে তার অপছন্দের অ্যানাকন্ডাটা।

‘ সাদিফ বৃষ্টি হচ্ছে। এই অবস্থায় কোথায় যাচ্ছেন? ‘
‘ একা যাচ্ছি না তো আপনিও যাচ্ছেন। ‘
‘ মানে কি আম…… ‘
নাজরাতের কথাকে উপেক্ষা করে তার হাত টেনে বৃষ্টির মধ্যে রোড ক্রস করলো সাদিফ। মোটামুটি ভালো কোয়ালিটির একটা টং দোকানের নিচে এসে দাড়ালো দুজন। সামান্য রাস্তা পার করতে করতেই ভিজে গিয়েছে তারা। দুকাপ চা অর্ডার করে বেঞ্চে বসলো দুজন। গরম গরম পেয়াজু ভাজা হচ্ছে পাশেই। তার ঘ্রাণে মো মো করছে চারিপাশে। বৃষ্টির দিনে এমন অর্ধভেজা হয়ে গরম গরম চা খাওয়ার স্বাদটাই আলাদা। বেশ সময় নিয়ে চা শেষ করলো তারা।

বিল মিটিয়ে নাজরাতকে কিছু না বলে হঠাৎ কোথায় যেনো চলে গেলো সাদিফ। তার হঠাৎ হঠাৎ কাজগুলো দেখে ভরকে উঠে নাজরাত।
কাক ভেজা শরীরে নাজরাতের সামনে এসে হাজির হলো সাদিফ। এক হাত বাড়িয়ে আহব্বান জানালো কাছে আসার। হাত এগিয়ে দিয়ে নিজেও বৃষ্টির মাঝে এসে দাড়ালো নাজরাত। তার এক হাত ধরে রেখেই অন্য হাতে পিছনে লুকিয়ে রাখা কদম ফুলগুলো সামনে আনলো সাদিফ। নাজরাতের অনেকটা কাছাকাছি এসে মাদকতায় ভরা কন্ঠে বললো,
‘ একগুচ্ছ কদম হাতে, ভিজতে চাই তোমার সাথে। ‘
ভালোলাগাময় অনুভূতিতে ছেয়ে গেলো নাজরাতের মন। মুচকি হেসে গ্রহণ করলো কদম ফুলগুলো। সাদিফের নজর তখনো নাজরাতে নিবদ্ধ। ঝুমঝুম বৃষ্টির মাঝে দুই কপোত-কপোতী চোখে চোখে ব্যক্ত করতে লাগলো হাজারো অনুভূতি। আলো আঁধারের মাঝে কেউ কেউ তাদের দেখছে আবার কেউ দেখেও উপেক্ষা করছে। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে দুজন ভিজতে লাগলো নিজেদের মতো। নাজরাতের একহাত তখনো সাদিফের হাতের মুঠোয়। এই হাতজোড়া যে সারাজীবনের সঙ্গী।

সায়েরীদের ঘরের সামনে গাড়ি থামতেই স্বস্তির নিশ্বাস নিলো সায়েরী। কিন্তু সাফওয়ানের অবস্থা ধীরে ধীরে আরো অবনতির দিকে যাচ্ছে। যেটা স্পষ্ট বুঝতে পারলো সায়েরী। এই অবস্থায় ২০মিনিটের পথ পাড়ি দেওয়া কোনোভাবে সম্ভব নয় সাফওয়ানের জন্য।

‘ আপনি এই অবস্থায় গাড়ি চালাতে পারবেন না। এই ভেজা শরীরে আর বেশিক্ষণ থাকলে আপনার শরীর আরো খারাপ হবে। আপনি আমার সাথে বাসায় চলুন প্লিজ। ‘
‘ আমি কি বলেছি আমার খারাপ লাগছে? বের হও গাড়ি থেকে। আমি বাসায় যাবো। ‘
‘ এতো অ্যাটিটিউড আসে কোথা থেকে হ্যা? রশি জ্বলে গেছে তবুও বল যাচ্ছে না। ‘
সাফওয়ান রাগী চোখে তাকাতেই সব সাহস হাওয়া হয়ে গেলো সায়েরীর। কথা জড়িয়ে আসছে সাফওয়ানের। চোখজোড়া রক্তবর্ণের মতো লাল হয়ে আছে। সময় ব্যয় না করেই আবরারকে কল করলো সায়েরী।
‘ ভাইয়া! তাড়াতাড়ি গেইটের কাছে এসো। সাফওয়ান ভাইয়ের জ্বর এসেছে।মারাত্মক জ্বর। আর একটু হলেই সেন্সলেস হয়ে যাবে। আসো আসো তাড়াতাড়িইই.. ‘

এক নিঃশ্বাসে সব কথা বলে ফোন কেটে দিলো সায়েরী। সাফওয়ান ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়েছে সিটে। সায়েরীর কথাগুলো তার কানে যেতেই সে মৃদু কন্ঠে বললো “ড্রামাকুইন। একটু ও বদলাও নি তুমি। একদম ছোটবেলার মতোই আছো। হাড়ে হাড়ে বজ্জাত।”
সাফওয়ানের বলা একটা কথাও কানে গেলো না সায়েরীর। আবরার এসেই একপ্রকার জোর করে ঘরে নিয়ে গেলো সাফওয়ানকে। তার ভেজা পোশাক চেঞ্জ করে নিজের একজোড়া জামা পরিয়ে দিলো তাকে। এরই মধ্যে ডক্তরকে ফোন করে কি কি মেডিসিন খাওয়াবে জেনে নিলো আবরার। নিজে খাবার খাইয়ে দিয়ে মেডিসিন আনতে চলে গেলো সে। সায়েরীকে কড়া গলায় বলে গেলো সাফওয়ানের খেয়াল রাখতে। অগত্য খেয়ে দেয়ে আবরারের রুমে ছোট্ট সোফাটায় বসে রইলো সায়েরী। সাফওয়ান উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। সায়েরী লক্ষ করলো কিছুক্ষণ পর পর চুল টানছে সে। কাছাকাছি গিয়ে মৃদু স্বরে বারকয়েক ডাকলো সাফওয়ানকে।

কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। চোখ মুখ কুঁচকে চুল টেনে ধরছে বারবার সাফওয়ান। সাফওয়ানের মাথা ব্যথা করছে ভেবে পাশে বসে আলতো হাতে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো সায়েরী। মাঝে মাঝে কপাল আর মাথা টিপে দিতে লাগলো। সায়েরীর নরম হাতের ছোয়ায় একদম শান্ত বাচ্চার মতো শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লো সাফওয়ান। তার সিল্কি চুলগুলোতে হাত বুলাতে বুলাতে এক নজরে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ানের ঘুমন্ত মুখের দিকে। কে বলবে এই ছেলেটা এতো রাগী,গম্ভীর। কতোটা নিষ্পাপ মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে তাকে। সাফওয়ানের খোচাখোচা দাড়িতে হাত ঘসে হঠাৎ দুষ্টু বুদ্ধি আসলো মাথায়। নিজের ফোন বের করে ফানি ইফেক্ট দ্বারা বেশ কিছু ছবি তুলে নিলো সে। পূণরায় ছবিগুলো দেখতেই পেট ফেটে হাসি আসলো তার। নিজেকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করে আবারো মাথা টিপে দিতে লাগলো সে। একহাতে সাফওয়ানের গাল চেপে ধরে অভিনয় করে বললো,

‘ আমার মতো অসহায় অবলা নারীকে খুব জ্বালিয়েছো তুমি খান সাহেব। এবার তোমাকে বুঝাবো সায়েরী কি জিনিস! আবার লাগতে এসো আমার সাথে। যদি তোমার এই অ্যাটিটিউট কে পায়ের তলে না পিষি, তবে আমার নামও সায়েরী না। হা হা হা ‘
হুট করেই চোখ মেলে তাকালো সাফওয়ান। ধক করে উঠলো সায়েরীর বুক। আজ তার আর রক্ষে নেই। ভাগ মিলকা ধ্যাৎ ভাগ সায়ু ভাগ। জান পিয়ারি হে তো ভাগ!!!!

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪

নিজের মনে সাহস জুগিয়ে যেই না পালাতে যাবে অমনি সাফওয়ান তার মাথার উপর থাকা সায়েরীর হাতটা নিজের গালের নিচে চেপে ধরে পূণরায় চোখ বুজলো। বড় বড় শ্বাস ফেললো সায়েরী। এক সেকেন্ডের জন্য ভুলেই গিয়েছিলো যে সাফওয়ান এখন জ্বরের ঘোরে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু এই হাত! আল্লাহ!! হাতটা আসছে না কেনো? এই ছেলেটাকে অ্যানাকন্ডা নাম দিয়ে ভুল করেনি সে। জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে কিন্তু বল দেখো, এখনো একশো তে একশো। গাল ফুলিয়ে সাফওয়ানের মাথার কাছে হেটবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে রইলো সায়েরী। অপেক্ষা করতে লাগলো কখন আবরার আসবে। বসে থাকতে থাকতে চোখ লেগে আসতে লাগলো তার। মাথার নিচে একহাত রেখে চোখ বুজলো সায়েরী। আর তার হাত জড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে সাফওয়ান।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬