Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৭

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৭

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৭
তোনিমা খান

শশুর বাড়িতে একটা মেয়েকে তার বাবা মায়ের কৃতকর্মের খোঁটা দেয়া হয়। এমনি এক ধারণা মনে গেঁথে নিয়েছে রূপকথা। অন্তরালে বাবার প্রতি আকাশসম অভিমান দৃঢ়তর হতে লাগলো। অশ্রুসিক্ত নয়নে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা বইগুলোর দিকে। সে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে বইগুলো। আজ একবারের জন্য ও বইয়ের ধারেকাছে আসতে পারেনি।
মন ভালো করার আর কোনো উপায় খুঁজে না পাওয়ায় সে ছুটে যায় বিছানা সংলগ্ন ছোট কাবার্ডের উপর রাখা স্মার্টফোনটির কাছে। এটা আজ কিনে দিয়েছে তপোবন। সে ফোন ঘেঁটে মাকে ফোন দেয়। তপোবন ফোনের সকল সেটিংস করে রেখেছে। ফোনটি সাথে সাথে রিসিভ হয়, ভেসে আসে আনন্দমুখর এক কণ্ঠ,
–”বুবু! আজ আমি ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছি। কি যে মজা! তাতে বড় বড় ডিম ছিল।”
রূপকথা হকচকালো শুকতারার আনন্দমুখর কণ্ঠে। ইলিশ মাছের কথা শুনে অবাক হলো বেশ। ইলিশ মাছ যে তাদের জন্য স্বপ্ন! সে অবাকের সুরে শুধায়,

–”ইলিশ মাছ? মা এনেছে?”
শুকতারা ছটফটিয়ে বলে,
–”না, মা আনেনি। দুলাভাই এনেছে বুবু। শুধু কি ইলিশ মাছ! আরো কতকিছু।”
শুকতারা একে একে সব বলল। আর যত সময় গড়ায় রূপকথা অবাক হয়, বিমুগ্ধ হয় তপোবন নামক ব্যক্তির প্রতি। এই মুহূর্তে তার নিজের জন্য আর কোনো ক্লেশ নেই। জীবন যেদিকে তাকে নেবে, সে সেদিকে গা ভাসাবে। তবে তার মধ্যে যদি কোনো ক্লেশ থাকে সেটা একমাত্র মা বোনের জন্য‌ ছিল। আজ যেন সেটিও দূর হয়ে গেল।
তার যে খুব ইচ্ছে হয় মা বোনকেও এমন ভালো ভালো খাবার খাওয়াবে। মুহুর্তেই ঐ মানুষটা তার সকল চিন্তা, দুঃখ, মন খারাপ দূর করে দিলো। রূপকথা অশ্রুসিক্ত নয়ন মুছতে লাগলো। হাসিমুখে শুনতে লাগলো বোনের উল্লাস, আনন্দে জর্জরিত কথা।
সন্ধ্যা থেকে রূপকথা ঘর থেকে বের হয়নি। মৌনতা, নায়েল আর রোজ ধীরপায়ে রূপকথার ঘরে ঢুকলো। বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথার ভাবনাচ্ছেদ ঘটে। সে পিছু ফিরে প্রগাঢ় হাসে সকলকে দেখে। নায়েল গুটি গুটি পায়ে গিয়ে রূপকথার পা জড়িয়ে ধরে। আদুরে গলায় শুধায়,

–”তোমাল মন খালাপ বলো মাম্মা?”
রূপকথা হাসিমুখে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
–”না তো! আমার মন খারাপ নয়।”
নায়েল খুশি হয়ে গেল। উচ্ছ্বাস নিয়ে শুধায়,
–”তাই? তাহলে কি তুমি আমায় পলাবে?”
রূপকথা ভ্রু কুঁচকে তাকায় মৌনতা আর রোজের দিকে। অতঃপর নায়েলকে জিজ্ঞাসা করে,
–”তুমি পড়বে আমার কাছে?”
–”হুঁ, হুঁ পলবো। মাম্মা বলেছে তুমি অনেক ভালো কলে পলাতে পালো। মাম্মা অসুত্ত! আমায় পলাতে পালে না।”, শেষের কথাটা নায়েল চোখ মুখ কুঁচকে বলল। চোখেমুখে তার বিরক্তি। মা তাকে সবসময় বই পড়ায় কিন্তু এখন ঠিকমতো পড়ায় না। মৌনতা ম্লান হেসে রূপকথাকে জিজ্ঞাসা করে,
–”পড়াবে কথা? আমি ওকে ঠিকঠাক ভাবে সময় দিতে পারি না।”
রূপকথা বেশ খুশি হয়। সে হাসিমুখে বলল,

–”পড়াবো ভাবি। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি নিজের শরীরের দিকে নজর দিন। নায়েল সোনার পড়াশুনা আমি দেখে নেবো।”
–”তুমি কিন্তু আমায় বকবে না মাম্মাল মতো। মাম্মা শুধু বকা দেয়। তুমি আমায় আদল করবে। আর অল্প অল্প পলাবে ঠিক আছে? তুমি না আমার ভালো মাম্মা?”, নায়েল আহ্লাদি গলায় বলল। রূপকথা হেসে উঠল। মৌনতা নাকের পাটা ফুলায়। রোজ বলে,
–”দেখো মৌন বউ, তোমার মেয়ে তোমার থেকেও একধাপ এগিয়ে। বুড়ি, আগেই তার টিচারকে পটিয়ে নিচ্ছে।”
মৌনতা রূপকথার হাত আঁকড়ে ধরে, মিহি স্বরে বলে,
–”আম্মা, অন্য চিন্তাধারার মানুষ, কথা! তার কাছে স্বামী, সংসার সন্তান ব্যতীত সবকিছু অহেতুক লাগে। এই যে রোজও তার এই চিন্তাধারার ভুক্তভোগী। তার কথায় কষ্ট পেয়ো না। সে যাই বলুক না কেন, ভাইজান তো তোমার সাথে রয়েছে। তোমার পড়াশুনা কখনো বন্ধ হবে না।”
রূপকথা ম্লান হেসে বলল,

–”আমি কষ্ট পাই নি ভাবি। আমার ভাগ্যে যা আছে তা হবে। এটা নিয়ে চিন্তা নেই আমার।”
–”ভাগ্যের উপর ভরসা করলে হবে? নিজের কোনো ইচ্ছা নেই?”
রোজের প্রশ্নে রূপকথা মলিন হেসে বলল,
–”নিজের ইচ্ছে তো কতকিছু ছিল! কিন্তু দেখো আমি ভাগ্যের জোরে কোথায় আছি? তবে কি দরকার মনে বাড়তি আকাঙ্ক্ষা লালন করার।”
–”এই বিয়ে নিয়ে তোমার মনে অনেক অভিযোগ তাই না?”
রোজ ম্লান কণ্ঠে রূপকথা নির্বিকার বলল,
–”থাকার কথা ছিল, কিন্তু কেন যেন নেই। তোমরা বসো, দাঁড়িয়ে আছো কেন!”
রূপকথা ব্যস্ত কণ্ঠে বলল। চারজনে মিলে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিলো।
পড়াশুনার মধ্যে তানশানের সবচেয়ে প্রিয় কিছু হলো ম্যাথ করা। কঠিন থেকে কঠিন ম্যাথ সলভ করা তার কাছে চ্যালেঞ্জের মতো মনে হয়। প্রতিবার ম্যাথ অলেম্পিয়ারে সে পুরষ্কার জিতে। ক্লাসে কেউ তার সাথে ম্যাথে পেরে ওঠে না। একবার ম্যাথ করতে বসলে তাকে সহজে কোনকিছু ধ্যানচ্যূত করতে পারে না। তবে আজ ম্যাথ ও তানশানকে ধ্যানমগ্ন করতে পারছে না। মস্তিষ্কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সকালের সেই দৃশ্য। মায়ের জায়গা অন্য কাউকে দিয়ে দিলেও, মায়ের ব্যবহৃত জিনিসগুলো অন্য কাউকে পড়তে দেখার দৃশ্য তার কাছে যন্ত্রণাদ্বায়ক লাগছে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নেয়ার। কিন্তু পারছে না। আজ পুরোটা দিন মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করেছে এই একটা বিষয়। আর নিতে পারল না তানশান। চেয়ার ছেড়ে উঠে দ্রুত বাবাকে ফোন করে।

নতুন প্রজেক্ট বাস্তবায়নে তপোবন ব্যস্ত সময় পার করছে। রাত তখন আটটা। অফিসের সহকর্মীসহ ভাইয়ের সাথে মিটিং এ ছিল তপোবন। প্রজেক্টরে তখন দন্ডায়মান সুউচ্চ এক দালানের কাঠামো। সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছিল। টেবিলে রাখা ফোনটি ভাইব্রেট করতেই স্ক্রিনে চার বছরের বাচ্চা তানশানের ছবিটি ভেসে উঠল। একগাল হেসে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ছেলের এই ছবিটি তার খুব প্রিয়। লালচে নাক,গাল, লালচে ঠোঁট সব আদুরে। অনাদরে কাজকে পাশে রেখে, সে সকলকে দুঃখিত বলে কামড়া থেকে বেরিয়ে আসে। ফোনটি কানে ঠেকাতেই ভেসে আসে ছেলের জড়তা মিশ্রিত চঞ্চল কণ্ঠ।
–”পাপা, আমি মাম্মার কাপড়গুলো আমার ঘরে এনে রাখি?”
ছেলের কণ্ঠ তখনি এমন থাকে যখন সে বাবার সাথে কথা বলতে ইতস্ততা বোধ করে। তপোবন মিহি স্বরে শুধায়,
–”কেন?”
অপ্রস্তুত নিরবতায় আচ্ছন্ন হলো তানশান। তার কাছে তো এই প্রশ্নের জবাব নেই। এর জন্যই তার কণ্ঠ এতোটা চঞ্চল ছিল, যেন বাবার এই প্রশ্নের সম্মুখীন তাকে না হতে হয়।
জবাবহীনতায় ভোগা তানশান হেরে যাওয়া পথিকের মতো মিইয়ে গেল। সে বিছানায় পা গুটিয়ে বসে। মিনমিন করে বলল,

–”আ’ম মিসিং মাম্মা! আই ওয়ান্ট টু টাচ হার।”
তপোবনের কর্মব্যস্ততা ম্লান হয়ে আসে ছেলের কথায়। বিনা দ্বিরুক্তিতে বলল,
–”নিয়ে যাও।”
তানশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। পাঞ্জাবির পকেটে ফোনটি ঢুকিয়ে রেখে তপোবন উদাসীন দৃষ্টি ফেললো অদূরে। জীবনটা আজ এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে একদা যার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে যেত, আজ তার নাম নিতেও কেমন ইতস্ততা বোধ হয়।
ক্রমশই মেয়েটার অস্তিত্ব তার জীবন থেকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে কি? ইদানিং হুটহাট সেই চঞ্চল মেয়েটার নাম উচ্চারণ করতে পারে না, ঘরে ঢুকলেও সাবধানে চলাচল করে যেন মেয়েটির কোনকিছু নতুন মানুষটার চোখে না পড়ে আর মন খারাপ না হয়ে যায়।
মাঝেমধ্যে মনে হয় কেন সে এরোজের মতো জেদি, রাগচটা হতে পারে না? ছেলেটা অন্তত নিজের জেদ, রাগের দ্বারা নিজের জীবনের স্বকীয়তা তো ধরে রেখেছে। কিন্তু সে? সে তো তা পারে না। তাকে স্রোতের তালে গা ভাসাতে হয়। ঘরের বড় ছেলেটাকে সবার কথা চিন্তা করতে হয়, দায়িত্ব পালন করতে হয়। যেই দায়িত্বের আড়ালে চাপা পড়ে যায় নিজস্ব চাওয়া পাওয়া। কখনো জেদ দেখিয়ে বলতে পারে না, সে জীবনের ঐ থমকে যাওয়া সময়টাতে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কারোর স্মৃতি আঁকড়ে বাঁচা অনেক সহজ। কিন্তু কারোর স্মৃতি মুছে ফেলে অন্য কাউকে গ্রহন করা খানিক কঠিন। উষ্ণ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে নাসারন্ধ্র থেকে। পা চালিয়ে পুনরায় মিটিং রুমে ঢোকে।
রূপকথা আজ আর ঘর থেকে বের হয়নি। মৌনতরা চলে যাওয়ার পরে সে বই নিয়ে বসেছে। দরজায় কেউ নক করায়, সে গলা উঁচিয়ে বলল,

–”দরজা খোলা, ভেতরে চলে আসুন।”
তানশান লম্বা শ্বাস ফেলে দরজা আঁকড়ে ধরে হালকা মাথা ঢুকিয়ে তাকায় পুরো ঘরটিতে চোখ বুলায়। সোফায় বসা মানবীর সাথে দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে যেতেই সে বলল,
–”কিছু দরকার ছিল। আমি কি আপনার ঘরটা দশ মিনিটের জন্য ব্যবহার করতে পারি?”
খাতা কলম হাতে রূপকথা আচমকা আঁকড়ে ধরা সংকোচ উপেক্ষা করে। ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–”তোমার বাবার ঘর, যতক্ষণ ইচ্ছা তুমি ব্যবহার করতে পারো। আমি কি বের হয়ে যাব?”
তানশান দরজা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দরজা চাপিয়ে ভেতরে ঢুকে গম্ভীর গলায় বলল,
–”দরকার নেই। আমি শুধু কাবার্ড থেকে কিছু জিনিস নেবো।”
–”ওহ্ আচ্ছা।”
রূপকথা নিভন্ত স্বরে বলে পুনরায় মগ্ন হলো নিজের কাজে। তানশান হাতে করে নিয়ে আসা লন্ড্রি বাস্কেটটি কাবার্ডের সামনে রাখে। কাবার্ডের উপর থেকে চাবি নামিয়ে মায়ের কাবার্ডের দরজাটি খুলতেই তানশানের বুক জুড়ে প্রশান্তি ছেয়ে গেল। মনে হলো কতোদিন বাদ মায়ের সান্নিধ্যে আসল! সে স্মিত হেসে মায়ের কাপড় সহ জুয়েলারি গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। সে সব কাপড় গুলো নামিয়ে ধীরে ধীরে বাস্কেটে রাখল। রূপকথা কলম মুখে নিয়ে আড়চোখে দেখে তানাশানের কাজ। মুখে তার মৃদু হাসি ফুটে উঠল তানশানের কাজের ধরণে। এতটা যত্ন করে প্রতিটা জিনিস স্পর্শ করছে যেন এটা কোনো সাধারন কাপড় নয় বরং স্বয়ং তার মা। কাপড় গুলো এমনভাবে ধরছে যেন এলোমেলো না হয়ে যায়।

সে পুনরায় নিজের খাতায় দৃষ্টিপাত করতেই তার মেজাজ বিগড়ে যায়। আজ ম্যাথ করতে বসেছে। অথচ একটা ম্যাথ ও এখন পর্যন্ত সলভ করতে পারেনি। শুধু প্রশ্ন তুলে বসে আছে। সে সেটাকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগলো।
কাবার্ডের পাশে লাগোয়া সোফায় বসে টি টেবিলের উপর খাতা রেখে ম্যাথ করছে রূপকথা। তানশান কাজ করতে করতে কোনাচোখে তাকায় সেদিকে। কিন্তু সহসা তার কপাল কুঁচকে গেল, রূপকথাকে ভুল সূত্র প্রয়োগ করতে দেখে। তবে কিছু বললো না। নিজের কাজে মগ্ন হয়। কিন্তু বক্ষস্থল উশখুশ করছে। তার দৃষ্টি বারংবার রূপকথার খাতায় গিয়েই আঁটকে যাচ্ছে। লাগাতার ভুলভাল ম্যাথ করতে দেখে তানশানের মধ্যে অন্যরকম এক উত্তেজনা ভর করে। জটিল থেকে জটিল ম্যাথ সলভ করা মানুষটা যদি লাগাতার ভুল ম্যাথ করতে দেখে তবে তারকাছে কেমন লাগে? সে চেপে রাখতে পারল না নিজের উত্তেজনাকে। কপাল কুঁচকে বলল,
–”আপনি বারবার ভুল সূত্র প্রয়োগ করছেন কেন?”
অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নে রূপকথা হকচকিয়ে তাকায় তানশানের দিকে। অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,

–”হ্যাঁ?”
তানশান গম্ভীর মুখে বলল,
–”আপনি ভুল সূত্র দিয়ে ম্যাথ করছেন। এতে করে তো সারাদিনেও আপনার ম্যাথ মিলবে না।”
তানশানের কথায় রূপকথা নিজের খাতার দিকে তাকায়। পরপরই কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল,
–”ওহ্, আসলে আমি ম্যাথে খুব খারাপ। এটা অনেকক্ষণ যাবৎ চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পারছি না।”
তানশান হাতের কাপড় ভাঁজ করতে করতে বলল,
–“ম্যাথে খারাপ তাহলে সায়েন্স নিয়েছেন কেন? এখানে তো সবই ম্যাথ।”
রূপকথা নিভু স্বরে বলল,
–“আমি ডাক্তার হতে চাই। তার জন্য তো সায়েন্স প্রয়োজন, তাই না?”
–”হুঁ।”, তানশান ছোট্ট করে জবাব দেয়। পুনরায় বলল,
–”ওখানে কিউবের সূত্র বসবে। ওখানে মান দেয়া আছে ছয়, সেটা দেখলেই তো বোঝা যায় কিউবের সূত্র বসবে। কিন্তু আপনি স্কোয়ারের সূত্র প্রয়োগ করছেন বারবার।”
–”ওহ্ আচ্ছা। ধন্যবাদ।”, রূপকথা প্রফুল্ল হেসে বলল।
তানশানের কথামতো রূপকথা কিউবের সূত্র বসায়। কিন্তু সেটাও ভুল বসিয়েছে। তানশান অতিষ্ট হয়ে ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,

–”আপনি তো সূত্রই পারেন না। তাহলে ম্যাথ পারবেন কি করে?”
রূপকথা অবুঝপানে তাকিয়ে বলল,
–”এটাই তো কিউবের সূত্র তাই না?”
–”কিউবের সূত্র দুইটা। আপনি অন্যটা বসিয়েছেন আর সেটাও ভুল বসিয়েছেন।”
রূপকথা না পেরে ঝিমিয়ে বসে রইল খাতার দিকে তাকিয়ে। তানশান আড়চোখে তাকে দেখে, হাতের কাপড়টা রেখে বলল,
–”দিন আমি সূত্র বসিয়ে দিচ্ছি।”
রূপকথার চোখ চকচক করে উঠল। সে খাতাটি বাড়িয়ে দিলো তানশানের দিকে। তানশান টি টেবিলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মিনিটের মাঝেই সূত্র বসিয়ে মান বসিয়ে দিয়ে উত্তর নামিয়ে দিলো। সেটা দেখে রূপকথার চোখেমুখে উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। সে আগ্রহী কণ্ঠে শুধায়,
–”তুমি কি ম্যাথ খুব ভালো পারো? এটা তো সলভ করে দিলে। তারমানে আর ম্যাথ গুলোও পারো তাই না? আমায় একটু করিয়ে দেবে? আমি অংক মোটেই পারি না। সূত্র ও কখনো মুখস্থ থাকে না।”
তানশান তার দিকে তাকিয়ে শুধায়,

–”কেন আপনার টিচাররা আপনাকে শেখায় নি?”
–”কলেজের টিচাররা শিখিয়েছে কিন্তু খুব অল্পকিছু। একটা দু’টো সূত্র শেখায় অংক করার সময়। তারা তো প্রাইভেটে বিস্তারিত শেখায়। আর আমি তো প্রাইভেটে পড়িনি, তাই ভালো পারি না।”, রূপকথা স্মিত হেসে বলল।
সরব তানশানের কানে ভাসে বাবার বলা একটি কথা, ‘তার জন্য কারোর জীবন সুন্দর হয়ে যাবে।’ হুট করেই তার মাঝে অজানা নম্রতা এসে হানা দেয়। সে খাতার দিকে তাকিয়ে নম্র কণ্ঠে বলল,
“আমি আপনার স্ট্যান্ডার্ডের ম্যাথ পারি না। আমি এইগুলো এখন পর্যন্ত করিনি।”
–”কিন্তু তুমি যে এটা করে দিলে!”
রূপকথার প্রশ্নে তানশানের কপাল কুঁচকে যায়। বলল,
–”আপনি তো প্রশ্ন ও ঠিক করে পড়েন না। এটা তো এতোটুকু না। একা বিশাল একটা প্রমাণ। এটা তো শুরুর ছোট্ট একটা অংশ যেটা আমার বেসিকের মধ্যে পড়েছে, তাই পেরেছি। কিন্তু ম্যাথটা এখানেই শেষ নয় আরো আছে। এই যে এখানে দেখুন, এই সমীকরনটা প্রমাণ করতে হবে আপনাকে।”
রূপকথার উজ্জ্বলতা মিলিয়ে গেল‌। ভেবেছিল তানশান ম্যাথে ভালো হলে তাকে একটু সাহায্য করতে পারবে। প্রত্যেকবার এই ম্যাথের কারণেই সে খারাপ রেজাল্ট করে। এতে করে সে মেডিক্যালে চান্স পাবে কি করে? সে নিভু স্বরে বলল,

–”ওহ্।”
তানশান পুনরায় কাপড় ভাঁজ করে লন্ড্রি বাস্কেটে রাখতে লাগলো। রূপকথা সোফা ছেড়ে উঠে বারান্দায় চলে যায়। ফিরে আসে সকালের সেই স্কার্ফ হাতে। তানশানের কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“এটাও নাও, গুছিয়ে রাখো।”
রূপকথার কথায় তানশান পিছু ফিরে তাকায়। রূপকথা স্কার্ফটি এগিয়ে দেয়। তানশান এক পলক তাকে দেখে বলে,
–”দরকার নেই।”
রূপকথা ভাবনায় পড়ল, সে পড়েছে বলে কি তানশান এটা নিতে চাইছে না? এই ভাবনা থেকেই সে কৈফিয়তের সুরে বলল,
–”সকালে কিছুটা বাধ্য হয়েই এটা পড়েছিলাম। আমার কাছে পড়ার মতো কোনো হিজাব ছিল না। এটাতে কোন ময়লা নেই, আমি সুন্দর করে ধুয়ে রেখেছি।”
তানশান ফিরে তাকায় সংকোচে জর্জরিত মানবীটির দিকে। নম্র কণ্ঠে বলল,
–”আমি তো জানতে চাইনি। এছাড়াও এগুলো কেউ পড়বে না। ওটা আপনি রাখুন।”
–”আমি কেন রাখব? এটা তোমার মায়ের। নিশ্চয়ই তোমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ!” ,
রূপকথা অনেকটা সাহস নিয়ে উচ্চারন করলো বাক্যটি। তানশান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–”এতোটাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি রাখুন! ওটা আপনার জন্য উপহার।”
রূপকথা কিয়ৎকাল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। অতঃপর মৃদু হেসে বলল,

–”ধন্যবাদ।”
তানশান মাথা নেড়ে নিজের কাজ করতে থাকে। আর রূপকথা অংক করতে বসে। নিজের কাজ শেষ হয়ে গেলে তানশান বাস্কেট গুছিয়ে নেয়। আরেকবার প্রচেষ্টারত রূপকথার দিকে তাকিয়ে শুধায়,
–”আপনি কি ম্যাথটা করতে পেরেছেন?”
রূপকথা ঠোঁট উল্টে না বোধক মাথা নাড়লো। তানশান বলল,
–”আমার কাছে নোটগাইড আছে, আপনি চাইলে সেখানে দেখতে পারেন। এগুলোর সমাধান রয়েছে সেখানে।”
–”সত্যি?”, রূপকথার উৎসুক কণ্ঠ। তানশান মাথা নেড়ে সায় জানায়। রূপকথা বলল,
–”ঠিক আছে দাও।”
–”আমার বই সব আমার রুমে। আমি কি বই এখানে দিয়ে যাবো?”
–“সমস্যা নেই। আমি আসছি তোমার সাথে। চলো, এমনিতেও বাস্কেটটা অনেক ভারী। তুমি একা নিতে পারবে না। , বলেই রূপকথা এগিয়ে এসে বাস্কেটের একপাশ আঁকড়ে ধরে। তানশান দেখলো অত্যাধিক পরিমাণে সহজ এক সত্ত্বাকে। সে বিনা দ্বিরুক্তিতে হাঁটতে শুরু করে। আসলেই বাস্কেটটা বেশ ভারী।
নিজের ঘরে এসে তানশান শেল্ফ থেকে হায়ার ম্যাথ নোটগাইড বের করে আনে। সেটি রূপকথাকে দিয়ে বলল,

–”এই নিন।”
রূপকথা সেটি নেড়েচেড়ে দেখে জিজ্ঞেস করে,
–”তুমি তো দশম শ্রেণীতে পড়ো। এটা তো দ্বাদশ শ্রেণীর, তোমার কাছে এগুলো কেন?”
–”আমি এগুলো ও পড়ি। দশম শ্রেণীর ম্যাথ করা শেষ, তাই পাপা এখন একাদশ শ্রেণীর ম্যাথ করায়। এর জন্য এই বইগুলো কিনে রেখেছে পাপা। দরকার পড়লে এখান থেকে সমাধান দেখি।”
তানশানের কথায় রূপকথার চোয়াল জুড়ে হা হয়ে গেল। সে হা করে তাকিয়ে রইল। বিদ্যাসাগরের নাতিপুতি তো এখানে। সে তো এক বছরে পুরো একটা বই-ই কখনো শেষ করতে পারেনি। সেখানে এই ছেলে কি-না ক্লাসে ওঠার আগেই সেই ক্লাসের বই পড়া শেষ?
–”ওহ্। আমি কি এখানে বসে ম্যাথটা খাতায় তুলে নেবো?”, রূপকথার কথায় তানশান বলল,
–”আপনার ইচ্ছা।”

তানশান আনন্দিত চিত্তে নিজের কাবার্ডের কাছে যায়। কাবার্ডের একপাশ পুরো খালি করে। আজ থেকে মা তার সাথে, তার পাশে থাকবে। এই কটা দিন মাকে ছুঁতে না পেরে দম বন্ধ লাগছিল। অন্যদিকে রূপকথা স্বভাবসুলভ আচরণ দ্বারা ম্যাথটি মুখস্থ করতে লাগলো। তানশান চোখ মুখ কুঁচকে ফিরে তাকালো। বাংলা রচনার মতো শব্দ করে ম্যাথ পড়তে দেখে। হতবাক হয়ে শুধায়,
–”আপনি ম্যাথ মুখস্থ করছেন কেন?”
রূপকথা হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
“তোমায় বলেছিলাম না! আমি ম্যাথে প্রচুর খারাপ। অংক আমার মাথাতেই ঢোকে না। আর বুঝিয়ে দেয়ার মতো মানুষ ও নেই। তাই এভাবে মুখস্থ করি। নয়তো মনে থাকে না।”
তানশান আর সহ্য করতে পারলো না পছন্দের বিষয়টির এত বেহাল দশা। সে সব কাজ ছেড়ে রূপকথার কাছে এসে চেয়ার টেনে বসে। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে নোটগাইডটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল,
–“ম্যাথ মুখস্থ করলে আপনি এটা ব্যতীত আর কোনো ম্যাথ করতে পারবেন না। আমি আপনাকে বুঝিয়ে দেবো তবুও আর কখনো ম্যাথ মুখস্থ করবেন না। মেডিকেলে চান্স পেতে হলেও বেসিক জানতে হয়। সেটাও খুব ভালোভাবে।”
–“তুমি আমায় বুঝিয়ে দেবে?”, রূপকথা সাগ্রহে শুধায়। তানশান বলল,

–“চেষ্টা করব। আগে আমি বুঝে নেই তারপর আপনাকে বুঝিয়ে দেবো। জানিনা কতটুকু পারবো। তবে পাপাকে বলবেন সে আরো সুন্দর করে বুঝিয়ে দেবে। পাপা ম্যাথে খুব ভালো!”
রূপকথা মৃদু হাসলো তানশানের প্রফুল্ল কণ্ঠে। দু’জনেই খেয়াল করেনি কখন তারা একে অপরের সহপাঠী হয়ে গিয়েছে। সম্পর্ক যতোটা তীক্ত হোক না কেন! আমরা সেগুলো ছাপিয়ে এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তুচ্ছ কিছু সম্পর্ককে জোরদার করি। হয়তো একদিন ঐ তীক্ত সম্পর্কের ভিত্তি গুলো ফিকে পড়বে এই ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ সহপাঠী সম্পর্কের কাছে।
তানশান দশ মিনিট বসে নিজে বুঝলো ম্যাথটি পরে রূপকথাকে বোঝাতে নিলো। সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত মেয়েটি আজ একটু পথপ্রদর্শক পেতেই যেন তার মেধা উজ্জ্বীবিত হতে লাগলো। পড়াশুনা নিয়ে অত্যাধিক পরিমাণে আগ্রহী মেয়েটি খুব সহজেই বুঝে গেল ম্যাথটি। তানশান গাইড বন্ধ করে নিশ্চিত হতে জিজ্ঞাসা করে,
–“আপনি কি বুঝেছেন? নাকি আমি আবার বুঝিয়ে দেবো।”

–“বুঝেছি। খুব ভালো করেই বুঝেছি। দু একবার চর্চা করলেই হয়ে যাবে। অসংখ্য ধন্যবাদ।”
রূপকথা হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল। জীবনে প্রথম কেউ এতোটা সুন্দর করে তাকে ম্যাথ বুঝিয়ে দিয়েছে। আর সে বুঝেছেও। অংক বুঝতে পারলে এতো শান্তি লাগে সে জানতো না! আগে তো সবসময় অংক মুখস্থ করেই পাশ করেছে। এর জন্যই ম্যাথে অনীহা কাজ করে তার। আজ ম্যাথ নিয়ে তার আগ্রহ, ইচ্ছা আরো বেড়ে যায়। এখন একটু হলেও আশা জাগ্রত হচ্ছে মনে যে, সে যদি ম্যাথ না পারে তবে তানশান দেখিয়ে দেবে। সে জিজ্ঞেস করে,
–“আমার বেসিক অনেক খারাপ। তুমি কি আমায় একটু বেসিক শেখাবে?”
তানশান বই গোছাতে গোছাতে বলল,
–“আমার থেকে পাপা বেশি ভালো পারে। আমাকে সে শিখিয়েছে। তাকে বলবেন সে শিখিয়ে দেবে।”
–“সে তো ব্যস্ত থাকে।”
–“উঁহু, পাপা পড়াশুনার ব্যপারে কখনো ব্যস্ততা দেখায় না।”, তানশান নাকোচ করে বলল।
–“ ওহ্।”
বই গোছাতে গিয়ে তানশানের হাতে বাঁধে অপরিচিত একটি খাতা। এটা তার নয়। সে খাতার উপর নাম দেখে। গোটা গোটা অক্ষরে রূপকথা লেখা সেথায়। সে কপাল কুঁচকে নেয়। নামটা খুব অদ্ভুত! সে আগে কখনো শোনেনি। কৌতুহলী ধূসর বর্নের দৃষ্টি স্থির রেখেই, সে জিজ্ঞাসা করে,

–”নাম কি আপনার?”
–”রূপকথা।”
–”ফেইরি টেইল? সুন্দর নাম!”, তানশান অদ্ভুত কণ্ঠে বললো। মুখে তার স্মিত হাসি। রূপকথা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তানশানের দিকে। এতদিন ভাবতো বাবা ছেলের চেহারা আর বাহ্যিক কাঠামো-ই এক। কিন্তু এখন তো দেখছে মস্তিষ্কটাও এক।
তপোবন লম্বা লম্বা পা ফেলে উপরে ওঠে। মিটিং শেষ করেই চলে এসেছে। তানশানকে পড়াতে বসতে হবে, নামাজ পড়তে হবে। সে হাঁটতে হাঁটতেই স্বভাবসুলভ আচরণ দ্বারা প্রথমে ছেলের ঘরে ঢোকে। চাপিয়ে রাখা দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দিতেই তার দৃষ্টিতে বিস্ময় ছুঁয়ে যায় তানশান আর রূপকথাকে হাসিমুখে কথা বলতে দেখে। কিয়ৎকাল অবাক চোখে তাকিয়ে শুধায়,

–“তোমরা কি করছো?”
রূপকথা আর তানশান চকিতে দরজা পানে তাকায়। তানশান বাবাকে দেখে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“সে ম্যাথ একদমই পারে না, পাপা। তাকে ম্যাথ শিখিয়ে দাও।”
তপোবন ততক্ষণে ঘরে ঢুকে গিয়েছে। দরজা চাপিয়ে চাদর হাতে এগিয়ে আসে তাদের কাছে। রূপকথার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে শুধায়,
–“তুমি ম্যাথ পারোনা? ম্যাথ না পারলে সায়েন্স নিয়েছ কেন? এখানে তো সবই ম্যাথ।”
রূপকথা এবার আর অবাক হলো না বাবা ছেলের একই মন্তব্যে। বরং সে রাগে, অপমানে নাকের পাটা ফুলালো। এমনিতেই শাশুড়ির ঐসব তীক্ত কথা মাথায় ঘুরছে। তার উপর এই বাবা- ছেলের এমন কথায় তার মুখটি থমথমে হয়ে গেল। সে তপোবনের দিকে চোখ মুখ কুঁচকে এক পলক তাকিয়ে খাতা হাতে গটগট করে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে।
তপোবন ভড়কে গেলো রূপকথার রেগে যাওয়া দেখে। সে তানশানের দিকে তাকিয়ে অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,

–“কি হলো, রেগে গেল কেন?”
তানশান কাঁচুমাচু করে উঠলো বাবার প্রশ্নে। কাঁচুমাচু করেই বলল,
–“কারণ আমিও তাকে এই একই কথা বলেছিলাম, তাই।”
তপোবন সরব গম্ভীর গলায় বলল,
–“তুমি কেন এই কথা বলেছ তাকে? সে তোমার থেকে বড়, এই কথা শুনলে লজ্জা পাবে না? এটা ঠিক করোনি তানশান।”
–“স্যরি পাপা।”, তানশান অনুতাপের কণ্ঠে বলল। তপোবন তার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
–“সমস্যা নেই, এরপর থেকে এমন কথা আর কখনো বলবে না। আমি তো বড়, বললে কিছু মনে করবে না কিন্তু তুমি তো ছোট। তোমার থেকে এমন কথা শুনলে লজ্জা পাবে, বুঝেছ?”
“জি পাপা।”, তানশান মাথা নেড়ে বললো। তপোবন পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–“কাপড় চোপড় এনেছো? এগুলো এভাবেই রেখে দাও। পাপা নামাজ পড়ে এসে গুছিয়ে রাখবো। তুমি পড়তে বসো।”
তানশান পড়তে বসে। তপোবন ছেলের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে যায়। ওষ্ঠকোনে ভর করে অপ্রকাশিত এক হাসির উজ্জ্বলতা। ইদানিং হুটহাট কেউ একজন তার সাথে অভিমান করে। আজ সকালেও এমনি এক অভিমানী দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল যখন শপিং করার সময় হঠাৎ ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গিয়েছিল মেয়েটি। যখন খুঁজে পেলো তখন সংকোচহীন শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল তার হাত। আর অভিমানী দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। কিন্তু মুখে একটি শব্দও বলেনি। তবে আশ্চর্য হলেও সে বুঝতে পেরেছিল ঐ অভিমানী দৃষ্টির মানে। তাকে একা ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলো সে! তখন আপনাআপনি তার জিহ্বা থেকে বেরিয়ে আসে,
“তোমায় ছেড়ে কোথায় যাব!”

তপোবন ধীরপায়ে চাপিয়ে রাখা দরজাটি খুলে ঘরে ঢুকতেই দৃষ্টি আকর্ষণ থমথমে মুখে লন্ড্রি বাস্কেটের পাশে দাঁড়ানো কাপড় ভাঁজ করতে থাকা মেয়েটি। সে গলা খাঁকারি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। বিফল হওয়ায়, জিজ্ঞাসা করে,
–”রাগ করলে?”
স্বল্প পরিচয়ের মেয়েটির থেকে আশ্চর্য রকমের উপেক্ষা পেয়ে তপোবন ও আশ্চর্য হলো বেশ। বহুবছর পর নারী অভিমনের স্বীকার তপোবন কিয়ৎকাল সময় নিলো। হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে অবলোকন করে রাগান্বিত মেয়েটিকে। মাস্টার্ড কালারের কটন শাড়ি সাথে মেরুন রঙা ব্লাউজে ছোট্ট হ্যাংলা পাতলা দেহের আদল সুদৃশ্যমান। হাড়ে মাংসে মিলিয়ে চল্লিশ কেজি ওজন হবে হয়তো, এমনটাই তার ধারণা। তবুও এই ছোট্ট আদলে যেন পরিস্ফুটিত নববধূরূপ নির্দেশ করে মেয়েটি তার নামের সৌন্দর্যে সেজে আছে। এই বধূরূপ কেন আজই তার নজরে আসল? আগে কখনো কেন আসেনি, নাকি দেখার চেষ্টা করেনি? আজ প্রবল অধিকারবোধ নিয়ে যখন তার সাথে রাগ দেখালো, তখন মনে হলো নারীটির পুরো অধিকার আছে তার উপর রাগ দেখানোর। কেননা নারীটি তার স্ত্রী। সহসা অলস গতিতে বেঁকে যাওয়া ওষ্ঠকোনা তপোবনকে অপ্রস্তুত করে। দ্রুত আকাশ পাতাল ভাবনা বাদ দিয়ে পুনরায় শুধায়,

–”রাগ করেছো?”
রূপকথা থমথমে গলায় বলল,
–”নাহ্, রাগ করব কেন?”
তপোবন ধীরপায়ে রূপকথার সামনে এসে দাঁড়ায়। মৃদু হেসে শুধায়,
–”রাগ করোনি?”
কাপড় ভাঁজ করতে থাকা মেয়েটি সম্মুখের লোকটির সরু দৃষ্টি এড়িয়ে একই স্বরে বলল,
–”নাহ।”
“তবে এটা খুলতে সাহায্য করো।”, পিছু ঘুরে আধখোলা পাঞ্জাবিটা নির্দেশ করে বলল তপোবন। প্রাত্যাহিক ঝামেলার একটি অংশ এই পাঞ্জাবি খোলা। খুলতে গেলে আঁটকে যায়। ভাবলো আজ সাহায্যকারী যখন রয়েছে তবে কি দরকার ঝামেলা পোহানোর। রূপকথা কিয়ৎকাল তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করলো তপোবনের কথা। তপোবন আধখোলা পাঞ্জাবি ধরে রেখে তাড়া দিয়ে বলল,

–”কি হলো সাহায্য করবে না?”
–”হু।”, অস্ফুট স্বরে বলে রূপকথা দ্রুত সাহায্য করল তপোবনকে পাঞ্জাবি খুলতে। খুব সহজেই পাঞ্জাবি খুলে যেতে তপোবন শান্তির নিঃশ্বাস ফেললো। রূপকথার দিকে ফিরে বলল,
–”ধন্যবাদ আর দুঃখিত! আমি ওভাবে বলতে চাইনি। আমি বুঝাতে চেয়েছি তুমি যেই বিষয়ে পারদর্শী সেই বিষয় নিয়ে আগালে সফলতা তাড়াতাড়ি তোমার দ্বারপ্রান্ত হবে। কিন্তু যেই বিষয়ে তুমি পারদর্শী নও সেটা নিয়ে আগালে সফলতা অর্জন করা কিছুটা কষ্টকর। এর মানে এই নয় যে একদমই অসম্ভব। চেষ্টা আর আগ্রহ থাকলে সব সম্ভব। তুমিও যদি ম্যাথ নিয়ে প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি করো, চেষ্টা করো, চর্চা করো তবে দেখবে একদিন তুমিও ম্যাথে পটু হয়ে গিয়েছ।”
রূপকথার থমথমে মুখটি নরম হয়ে আসে। দৃষ্টি নামিয়ে নম্র স্বরে বলে,
–”আমি বায়োলজিতে খুব ভালো। আর আমার মুখস্থ বিদ্যা ও অনেক ভালো। তাই আমি ডাক্তার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
–”তবে সেদিকেই আগাও। আর ম্যাথের সাথে বোঝাপড়া করার জন্য আমি আর তানশান তোমার সাথে আছি। তোমায় শুধু একটু নিয়মিত চর্চা আর মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে।”
রূপকথা উজ্জ্বল দৃষ্টি ফেলে শুধায়,

–”আপনি কি কলেজের শিক্ষকদের মতো ম্যাথে পারদর্শী?”
তপোবন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–”তা তো জানি না, তাদের মতো পারদর্শী কি-না। কিন্তু তোমার ম্যাথে অনীহা এবং দুর্বলতা দূর করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।”
রূপকথার চোখেমুখে উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। ওষ্ঠদ্বয় বিস্তৃত হয়ে গেল। সে মাথা নেড়ে শুধায়,
–”তাহলে আপনি আমাকে পড়াবেন? আমি খুব ভালোকরে মনোযোগ সহকারে পড়াশুনা করব। আপনি শুধু এই ম্যাথের দুর্বলতা দূর করে দিন।”

তপোবন খেয়াল করে মেয়েটির আকাঙ্ক্ষা মিশ্রিত উজ্জ্বল মুখশ্রী। একেই বলে নিয়তি! কেউ পড়াশুনা করার জন্য তৃষ্ণার্ত কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় তার জীবন থমকে যায়। আর কেউ দেখা যায় সকল সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও পড়াশুনায় আগ্রহ খুঁজে পায় না। সে বলল,
–”তুমি কোচিং এ ভর্তি হতে চাইলে হতে পারো। সেখানে আরো ভালোকরে শিখতে পারবে।”
–”কোচিং?”, রূপকথা ধিমি কণ্ঠে শুধায়। তার মুখশ্রী মলিন হয়। সে যে অনিশ্চিত কিছু নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহী! কিন্তু তার শাশুড়ি? সে কি তাকে পড়াশুনা করতে দেবে? তবুও তপোবনকে কিচ্ছুটি বললো না সে। সাময়িক ভোলার চেষ্টা করলো শাশুড়ির বিকৃত চিন্তাধারা। সে নাকোচ করে বলল,
–”আমি কোচিং করব না।”
–”কেনো করবে না? কোচিং তো করতেই হবে। এখন করতে হবে, এডমিশনের জন্য ও করতে হবে। কোচিং না করলে তো পারবে না।”
রূপকথা নাবোধক মাথা নাড়ে। কলেজে ভর্তি হতে পেরেছে এতোটুকুই তার জন্য যথেষ্ট। কোচিং করলে ঘরের কাজ করবে কে? মৌনতার শরীর ভালো না। শাশুড়ি সহ ঘরের সকলের কষ্ট হয়ে যাবে। সে বলল,

–”আপনি আছেন না! আমি আপনার কাছেই পড়ব।”
তপোবন কাবার্ডের সাথে হেলান দিয়ে বলে,
–”আমি পড়ালে বুঝবে তুমি?”
–”বুঝবো না কেন! তানশান বুঝলে আমিও বুঝব।”, রূপকথা বিলম্বহীন দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
তপোবন মৃদু হেসে বলে,
–”তানশান তো ছোটবেলা থেকে আমার কাছে পড়ে। সেই অভ্যস্থতা থেকেই ও আমার কাছে খুব সহজে বুঝে যায়। কিন্তু তুমি তো আগে কখনো পড়োনি। নতুন কারোর পড়ার ধরণ আত্মস্থ করতে সময় লাগে।”
–”সময় লাগবে না। আমার কাছে নতুন পুরাতন বলে কিছু নেই। আমার একজন পথপ্রদর্শক হলেই হবে। আমি ঠিক বুঝে নেবো।”, রূপকথা দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
তপোবন সায় জানিয়ে বলল,
–”আচ্ছা, তানশানের কাছে কোন ম্যাথের সমস্যা নিয়ে গিয়েছিলে? দেখাও আমায়, আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।”
–”দরকার নেই, তানশান আমায় বুঝিয়ে দিয়েছে।”
তপোবন আশ্চর্য হলো,
–”ও পেরেছে তোমার ম্যাথ সলভ করতে? ওকে তো আমি এখনো এইসব ম্যাথ করাইনি।”
–”ও অনেক মেধাবী! নোটগাইড থেকে বুঝিয়ে দিয়েছে। আর আমি খুব ভালোকরে বুঝেছি।”,রূপকথা হাসিমুখে বলল।

–”হুঁ, তার সারাদিন কাটেই বইয়ের সাথে। কোনো বাজে অভ্যাস নেই। এই দিক থেকে আমি বেশ নিশ্চিন্তে থাকি।”, তপোবন হাসিমুখে বলল। ছেলে জড়িত প্রত্যেকটা কথা তাকে আনন্দ দেয়। রূপকথা কাপড় ভাঁজ করতে করতে বলল,
–”তানশান, অনেক ভালো।”
–”কেনো”, তপোবন কাবার্ড থেকে ফতুয়া বের করতে করতে শুধায়।
রূপকথা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–”এই যে আমার সাথে কি সুন্দর ব্যাবহার করল। নিজে থেকে ম্যাথ বুঝিয়ে দিলো।”
তপোবন ব্যস্ত হাতে ফতুয়া পড়ে। কৌতুহলী দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে শুধায়,
–”তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবে কেন?”
সরব চোখাচোখি হলো দু’জনের। রূপকথার মাঝে হঠাৎ করে হানা দেওয়া জড়তা অবলোকন করে তপোবনের মাথায় আসে নিজেদের সম্পর্কের ভিত্তি। রূপকথা চোখ নামিয়ে ধিমি কণ্ঠে বলল,
–”স্বভাবত কেউ এমন মানুষের সাথে কেউ ভালো ব্যবহার করে না।”
–”কেমন মানুষ?”, তপোবনের কণ্ঠে ভরপুর কৌতুহল। সাথেই তার চোখেমুখে অযৌক্তিক কথার অসন্তোষের রেশ। মানুষ তো মানুষ হয়। এমন মানুষ আর কেমন মানুষ বলে কিছু হয় না-কি? রূপকথা তেমনি ধিমি কণ্ঠে বলল,
–”সৎ মা।”

তপোবন এমন জবাবের অপেক্ষাতেই ছিল। সে মেয়েটির নত মুখটির দিকে তাকিয়ে বলে,
–”সৎ মা কোন অপরাধ কিংবা পাপ নয়। তবে এই শব্দের মর্মার্থ কিছুটা তীক্ততা বহন করে। তাই এই শব্দটি যত উচ্চারন করবে সম্পর্কে তীক্ততা তত বাড়বে। চেষ্টা করবে এগুলো এড়িয়ে চলার। এগুলো ব্যতীত অনেক সম্পর্ক মেইন্টেইন করা যায়। যেমন, বন্ধুসুলভ!”
এতো টুকু বলে তপোবন থামে। পুনরায় বলতে শুরু করে,

–তানশানকে বাস্তবতা অনেক বুঝদার একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। ছোটবেলায় একবার একজন ক্লাস ফিলো তার বই ছিঁড়ে ফেলেছিল। তাই তানশান রেগে তাকে কলম দিয়ে আঁচড় দিয়েছিল। সেটাই প্রথম এবং শেষ ছিল। এরপর থেকে আর কখনো সে এমনকাজ করেনি। কারন কি জানো? সে যাকে আঁচড় দিয়েছিল তার মা ওকে বলেছিলো, ওর মা নাকি একজন খারাপ মহিলা, যে তার সন্তানকে ভালো শিক্ষা দিতে পারেনি। সেদিনের পর থেকে সে একটা শিক্ষা গ্রহন করে— সে যদি কখনো কোন খারাপ কাজ করে তবে তার শাস্তি তার মৃত মাকে পেতে হবে। তারপর থেকে তানশান কখনো কারোর সাথে খারাপ ব্যবহার করে না। তাতে সামনের মানুষটা তার সাথে যতো খারাপ আচরন ই করুক না কেনো! ওর প্রত্যেকটা পদক্ষেপ এমন থাকে যেনো ওর কারণে কেউ কষ্ট না পায়, আর তার মৃত মাকে কটু কথা শুনতে না হয়। সেখানে তুমি তো ওর সাথে কোন খারাপ আচরন করোনি। তানশান তোমায় খারাপ চোখে দেখে না। তাই নিজেকে কখনো কোনকিছু নিয়ে ছোট মনে করবে না, জড়তা রাখবে না। মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখো।”
রূপকথা বিমুগ্ধ পানে তাকিয়ে রইল তপোবনের দিকে। এই বাবা ছেলে দু’জনেরই অত্যধিক পরিমাণে শান্ত, সহজ ব্যক্তিত্বে তাকে বারংবার মুগ্ধ করে। তপোবন ওজু করে আসে। রূপকথা তখনো বাস্কেট থেকে কাপড় গুছিয়ে কাবার্ডে রাখছে। এটা রোজকার কাজ। এতদিন তপোবন নিজে করতো, এখন বহুকাজই আর তাকে করতে হয় না। সে রূপকথাকে বলল,

–”দ্রুত হাতের কাজ শেষ করে পড়তে আসো। আমিও নামাজ পড়ে আসছি।”
রূপকথা মাথা নেড়ে সায় জানায়। তপোবন নামাজ পড়ে স্ত্রী সন্তান সমেত একসাথে পরিবারের সাথে রাতের খাবার খায়। তবে নির্জনা বেগমের গাম্ভীর্যতা ক্রমশ বাড়তে লাগলো রূপকথার প্রতি। কিন্তু সেই গাম্ভীর্যতা ছুঁতে পারে না রূপকথাকে, তপোবন নামক দুর্ভেদ্য দেয়াল টপকে।
বাবার চলে যাওয়ার পর থেকে কখনো প্রাইভেট পড়া কিংবা কঠিন পড়াগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না রূপকথার। কঠিন হোক, সহজ হোক সব নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছে। নিজ প্রচেষ্টায় এই পর্যন্ত আসা মেয়েটিকে আজ প্রথমবার কেউ পড়া বুঝিয়ে দেবে। রূপকথা খুব খুশি আজ। এখন পড়াশুনা তার জন্য হয়ত আরো সহজ হয়ে যাবে আর সে মেডিকেলে চান্স পাবে। প্রফুল্ল চিত্তে রূপকথা হাতের কাজ সম্পন্ন করতে লাগলো।
খাবার টেবিলের এক পাশে বসে শারীরিক অস্থিতিশীলতায় ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে থাকা মৌনতা মৃদু হাসল রূপকথার আনন্দ দেখে। রোজ আর জবা হাতে হাতে কাজ করছে। রোজ বলল,

–”বড় ভাবি, তুমি যাও পড়তে যাও। আমি আর জবা আপা মিলে এগুলো করে নেবো। মৌন বউকে কাজ করতে দেবো না।”
রূপকথা ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–”সমস্যা নেই আপু। আর একটু কাজ আছে, এইটুকু করেই যাই।”
পরপরই মৌনতার দিকে তাকায়। চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
–“ভাবি আপনি এখনো এখানে বসে আছেন কেন? উপরে গিয়ে বিশ্রাম করুন। আপনার শরীরের দিকে তো তাকানো যাচ্ছে না।”
মৌনতা ম্লান হাসল। মিহি স্বরে বলল,
–“তোমার ভাইজানের আসতে রাত হবে, রূপকথা। তাকে খাবার দিতে হবে। তুমি চিন্তা করো না আমি ঠিক আছি।”
রূপকথা মলিন চোখে তাকায়। চোখে কালসিটে দাগ, অত্যধিক ফ্যাকাসে বরণ। বদনে রাজ্যের ক্লান্তি, মানুষকার প্রতি কি তার স্বামীর একটুও চোখ পড়ে না?
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

–“ডাক্তার দেখাবেন না, ভাবি?”
–“আমার এমন অসুস্থতা লেগেই থাকে। এত চিন্তা করো না পিচ্চি মেয়ে! তোমার ভাইজানকে বলব। সে তো ব্যস্ত থাকে!”
রূপকথা কিছু বলল না। সবসময়ই এমন কথা বলে মৌনতা। সে কাজ শেষ করে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে দ্রুত কদমে উপরে যায়। তবে ঘরে ঢুকে তপোবনকে পেলো না। সে জানে তপোবন কোথায় আছে। কিছুটা জড়তা নিয়ে তানশানের ঘরে যায়। দরজায় টোকা দিতেই ভেসে আসে তপোবনের উঁচু কণ্ঠ,
“ভেতরে চলে এসো, রূপকথা!”
রূপকথা দরজা খুলে উঁকি দিতেই তপোবন বলল,
–”বই খাতা নিয়ে এখানে চলে এসো। দু’জনকে দুই জায়গায় বসে পড়ানো সম্ভব নয়।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৬

রূপকথা এক পলক তাকায় তানশানের দিকে, তার প্রতিক্রিয়া দেখার নিমিত্তে। তবে তানশান একদম প্রতিক্রিয়াহীন। সে মনোযোগ সহকারে খাতার দিকে দৃষ্টিপাত করে লিখছে। রূপকথা বই খাতা নিয়ে আসে।
স্টাডি টেবিলের দুই পাশে দু’জন বসে আছে আর তাদের মধ্যমনি তপোবন। তপোবন একটু ঘাটলো রূপকথার ম্যাথের বেসিক কতটুকু সমৃদ্ধ। তবে তানশানের মতো তাকেও হতাশা হতে হয়। রূপকথার বেসিক খুবই দুর্বল। তপোবন গুরুত্ব বাড়ায়। কেননা রূপকথার কাছে এক বছর রয়েছে। এর মধ্যে গোটা ম্যাথের সমস্যা সমাধান না করতে পারলেও কিছু তো ওভারকাম করা যাবে!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৮