Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩১

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩১

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩১
তোনিমা খান

জীবন কি নিদারুণ ছলনা করতে জানে‌। যার কাছে পৃথিবীর সব সুখ রয়েছে সেই মানুষটাই সবচেয়ে বেশি দুঃখ দেয়।
তখন রাত সাড়ে তিনটা বেজে দশ মিনিট। রান্নাঘরের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা সুঠামদেহী পুরুষটি বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি ফেলল। কোথায় কি কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। কোলে থাকা ছোট্ট মেয়েটির অশ্রুভেজা নয়ন পানে চেয়ে সকল বিভ্রান্তি ভুলে বসলো এরোজ। ব্যস্ত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি খাবে আমার মা?”
কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে থাকা নায়েল ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
–“ডাই ফুট আল চকোস।”
–“ড্রাই ফ্রুটস আর চকোস?” এরোজ বিড়বিড় করে আওড়ায়।
সে তৎক্ষণাৎ পুরো রান্নাঘরের সাজানো গোছানো দশা বিগড়ে এক প্রকার ধ্বংসযজ্ঞ চালালো ড্রাই ফ্রুটস আর চকোস খুঁজতে।
এবং দীর্ঘ দশ মিনিট পর ড্রাই ফ্রুটস আর চকোস খুঁজে পেতেই চমৎকার এক হাসি দেখা মিললো পুরুষালী ওষ্ঠকোনে। এরোজ বুঝে উঠতে পারল না এখন এই ড্রাই ফ্রুটস আর চকোস কিভাবে প্রসেস করে খাওয়াতে হবে।
ভীষণ অদক্ষতা আর অসহায়ত্ব নিয়ে এরোজ তাকায় নায়েলের মুখপানে। শুধায়,

–“এখন এগুলো খাওয়াবো কি করে? আমি তো জানি না।”
নায়েল পিটপিট করে চেয়ে বলল,
–“চকোস এন্ড মিল্ক।”
এরোজ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“চকোস মিল্কে ভিজিয়ে খেতে হয়?”
চকোস আর মিল্ক নায়েলের রোজকার সঙ্গী হওয়ায় সে মাথা সায় জানালো।
নায়েলকে কোলে নিয়েই এরোজ দুধ গরম করে তাতে চকোস ভিজিয়ে নায়েলের সামনে নিলো।
টেবিলে বসাতে গেলে নায়েল অলসতা ভাঙতে নারাজ। চোখমুখ কুঁচকে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে,
–“নো, খাইয়ে দাও।”
সেই ছোট্ট বেলায় তানশানের দেখাশোনা করা ব্যতীত এ জীবনে নিজ হাতে খুব কমই কাজ করেছে এরোজ। কানাডাতেও হেল্পিং হ্যান্ড রয়েছে। আজ এত বছর পর এই কাজে তাকে বেগ পেতে হলো। ভীষণ অদক্ষ হাতে সে ক্ষুধার্ত নায়েলকে চকোস আর দুধ খাওয়াতে সক্ষম হলো। তখন নিশ্চিন্তের এক নিঃশ্বাস ফেলে তাকায় অলসেমাখা মুখপানে। শুধায়,

–“পেট ভরেছে? আর কিছু খাবে?”
নায়েল মাথা নেড়ে অতি প্রিয় খাবারটি চাইতে ভুললো না।
–“ডাই ফুট দাও।”
এরোজ বাটিতে করে ড্রাই ফ্রুটস নিয়ে উপরে চলে যায়। কম্ফোর্টারের আড়ালে বসে তখন ছোট্ট একটা খরগোশের ন্যায় নায়েল টুকটুক করে ড্রাই ফ্রুটস খেয়ে চলেছে।
বিছানায় বসে থাকা আস্ত এক টুকরো সুখকে বিমুগ্ধচিত্তে দেখতে থাকা এরোজের মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল নায়েল একটা শুকনো এপ্রিকট তার মুখের কাছে এগিয়ে দিতেই। সে নীরবে মুখে তুলে নেয়। নায়েল গাল ভরে হেসে বলল,
–“এইতো গুড বয়।”
অতটুকু বাচ্চার ঠুনকো ঐ প্রশংসাটুকুতেও এরোজের বুকটা ভরে উঠল প্রসন্নতায়। অথচ দৃষ্টি ছলছলে! মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মনে হলো, সৃষ্টিকর্তা যে জাগতিক সব সুখ ইমরোজকে দিয়েছে। তার ঝুলিতে শূন্যতা ব্যতীত কিছু নেই! নিশ্চয়ই সে কোনো অভাগা নয়তো রাতটুকুও এত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে কেন? সুখ গুলো এত দ্রুত হাত ছাড়া হয়ে যায় কেন?
এরোজ বিধুর নয়নে তাকায় বারান্দার থাই গ্লাস ভেদ করে ঘুঁটঘুঁটে আঁধারে পরপরই তাকায় ঘড়ির পানে। চারটা বেজে গিয়েছে। রাত ফুরিয়ে এসেছে, সুখ ফুরিয়ে এসেছে, সৃষ্টিকর্তার রহমত হারিয়ে যাওয়ার লহমা এসে গিয়েছে।
ভঙ্গুর পুরুষটির আফসোসে জর্জরিত বক্ষস্থল আজ আরেকদফা আফসোসে জর্জরিত হলো, খাওয়া শেষ হতেই কেউ গুটি গুটি কদমে বক্ষস্থলে সেঁটে যেতেই। নায়েল ভীষণ অলসতার সাথে প্রশস্ত বুকে মুখ ঘষে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,

–“চলো ঘুমি ঘুমি কলি।”
এরোজ শুকনো ঢোক গিলে মৃদু হাসল। ছোট্ট দেহটিকে একহাতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
–“চলো ঘুমি ঘুমি করি।”
এরোজ মোটেই মায়া বাড়াতে চায় না অথচ বুক জুড়ে আস্ত এক মায়াময় সত্ত্বার আধিপত্য। ঠিক এই জায়গা থেকেই নিজেকে অসহায় মনে হলো এরোজের।
মায়ের পর জীবনে আর কাউকে সে ভালোবাসতে চায়নি অথচ ভালোবাসার অজস্র কারণ সমেত হাজির হলো কেউ। এবং বরাবরের মতোই তা ছিনিয়ে নিলো সৃষ্টিকর্তা। আজ আবার কেউ তাকে জোরপূর্বক বাধ্য করছে ভালোবাসতে। সে ছলছল দৃষ্টি তাক করে সিলিং বরাবর। ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
–“আমি কিন্তু ওকে ভালোবাসছি না, একটুও ভালোবাসছি না। শুধু আগলে রাখছি আজকের রাতটুকু। তুমি যদি ভেবেথাকো ওকেও ছিনিয়ে নেবে আর আমায় কষ্ট দেবে তবে তুমি ভুল। যে আমার নয় তাকে ছিনিয়ে নিলে আমি কেন কষ্ট পাবো?”
অনবরত মাথায় হাত বুলাতে থাকা হাতটি থেমে যেতেই বক্ষজুড়ে চার হাত পায়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা নায়েল বুক থেকে মুখ তোলে। জড়ানো কণ্ঠৈ শুধায়,

–“কাল সাথে কথা বলছো?”
এরোজ ঘন ঘন মাথা নেড়ে থমথমে মুখে বলল,
–“কেউ না।”
নায়েল আড়মোড়া ভেঙে উদাসীন কণ্ঠে বলল,
–“ঘুমি আসে না, গল্প বলো।”
এরোজ নীরবে নিভৃতে আবদারটুকু শুনলো। নায়েল ফের বুক চাপড়ে বলল,
–“গল্প বলো।”
এরোজ গল্প বলতে লাগল তবে এবার আর কারোর বলা গল্প নয় বরং নিজ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এক গল্প। যেই গল্পটুকু আঁকড়ে সে গোটা জীবন অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারবে।
–“একদা এক ব্যস্ত শহরে ছোট্ট একটা রাজপ্রাসাদ ছিল। যেই রাজপ্রাসাদে তোমার মতো এমনি ছোট্ট একটা ছেলে ছিল। যার অনেক সুন্দর এক মা ছিল, যাকে সেই ছেলেটি খুব ভালোবাসতো। তার বুকে থাকতে, তার হাতে খেতে সে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু সেই মা একদিন হারিয়ে গেল। মায়ের হারিয়ে যাওয়ায় বাচ্চা ছেলেটি সবসময় ছটফট করতো আর কান্না করতো। সবার কাছে তার মাকে চাইতো কিন্তু তার মা আর কখনো আসে না। তারপর ছেলেটি একসময় বড় হলো, বড় হতে হতে দুঃখগুলো কমতে লাগলো। এরপর একদিন ছেলেটা পুরোপুরি তার মাকে ভুলে গেল। হাসতে শিখলো, দুষ্টুমি করতে শিখলো, জীবনকে উপভোগ করতে শিখলো।
এরপর একদিন ভাগ্য তাকে এক অপার্থিব সৌন্দর্যে মোড়া দুঃখের সাথে দেখা করালো।”
এরোজের কণ্ঠ ক্রমশই ভারী হতে লাগলো। তার ভারী কণ্ঠে নিদারুণ ব্যগ্র ঘটিয়ে নায়েল উৎসুক কণ্ঠে শুধায়,

–“সুন্দল দুক্ক?”
এরোজ টলটলে নেত্রে মাথা নাড়লো। নায়েল ভাবুক কণ্ঠে বলল,
–“দুক্ক মানে তো বুবু। বুবু আবাল সুন্দল হয়? বুবু তো ব্যতা দেয়।”
এরোজ ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
–“দুঃখ যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুখের ছদ্মবেশে আসে। এর জন্য ব্যথাটা খুব তীব্র হয়। আর সেই ছেলেটার দুঃখ ও এসেছিল জীবন্ত এক রূপাঞ্জেলের রূপে।”
–“লুপাঞ্জেল? পিনসেস? আমি টিভিতে দেখেচি লুপাঞ্জেল।” নায়েল চঞ্চল কণ্ঠে বলল। এরোজ স্মিত হেসে বলল,
–“হ্যাঁ, কিন্তু সে তোমার টিভির রূপাঞ্জেলের থেকেও বেশি সুন্দর।”
–“ছত্যি?”, নায়েল বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধায়।
–“হুম সত্যি।”
অতি উৎকণ্ঠা ধরে রাখতে না পেরে নায়েল রুক্ষ দাড়িযুক্ত গালে নিজের গলা রেখে তাড়া দিয়ে বলল,
–“তারপলে কি হয়েচে? বলো বলো।”
নায়েলের উৎকণ্ঠা ভরা চিকন কণ্ঠে এরোজের কর্নকুহরে বারি খেলো এমনি এক চিকন নারী কণ্ঠ।

–“ঐ শুয়োর, প্রত্যেকের চোখ গেলে দেবো একদম।”
স্মৃতি মন্থন করতে করতেই এরোজের ঠোঁট বেঁকে যায় অলস গতিতে।
মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটিতে পড়া দূরন্ত ছেলেটি যখনই সুযোগ পেতো ঢাকা থেকে ছুটে আসতো বাড়িতে। বাবা ভাইদের বিরক্ত করা, মায়ের অবাধ্য হয়ে বাল্যকালের বন্ধুদের সাথে শহর চড়িয়ে বড়ানো আর ক্রিকেট খেলাই ধ্যানজ্ঞান ছিল। তবে সেই ধ্যানজ্ঞানে কেউ একজন ধীরস্থির নিদারুণ বিরক্তি সৃষ্টি করল।
গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে একটা হাঁটু সমান শর্টস আর ট্যাংক টপ পড়ে এরোজ ছুটতো পাশের এলাকায় থাকা খোলা মাঠটিতে। ধুপধাপ ব্যাটিং এর আওয়াজ আর দলের ছেলেপুলেদের হৈ হুল্লোড় বিরক্ত না করলেও, মাঝেমধ্যেই পাশের সুউচ্চ দালানগুলোতে ঢুকে যাওয়া বলের কারণে প্রচুর কথা শুনতে হতো! তবুও কে শোনে কার কথা।
সেদিন ও ব্যাটিং করতে থাকা এরোজ ছক্কা মেরে দিলো ঠিক মাঠের পাশে থাকা পাঁচ তলা দালানটির দ্বিতীয় তলার দক্ষিণ বারান্দা বরাবর। মাঠের সকলের মাথায় হাত, চোখেমুখে আতঙ্ক।
বন্ধুদের আতঙ্ক দেখে এরোজ কপাল কুঁচকে তাকায় বারান্দা পানে। আতঙ্কের কারণ বুঝতে সময় লাগলো না সরব কেউ তেড়েফুঁড়ে বারান্দায় আসতে।

–“এই শুয়োরের দল চোখ কোথায় থাকে তোদের?”
একঝাঁক ঘন কালো কুচকুচে চুলসমেত ছিমছাম এক নারীর ক্রুব্ধ কণ্ঠে এরোজ চোয়াল শক্ত করে নিলো। নারীটিকে এক পলক দেখে এরোজ গমগমে স্বরে বন্ধুদের বলল,
–“বল চা।”
এরোজের বন্ধু চেঁচিয়ে বলল,
–“আরে বন্ধু, ঐ ঘরে বল ঢুকলে আর ফেরত দেয় না।”
এরোজ তবুও দু’টো ছেলেকে পাঠালো কিন্তু সত্যি সত্যি বল ফেরত দিলো না। রাগে গজগজ করতে করতে নতুন বল কিনতে হলো। পরপর দু’দিন এমন তিনটা বল হারিয়ে এরোজ ক্ষিপ্ত ঐ নারীটির উপর। পরে জায়গা বদলে তার ঠিক অদূরে এক মাঠে ক্রিকেট খেলতো।
তার পরের সপ্তাহেই ঘটে গেল এক অনিচ্ছাকৃত বিপত্তি।
এরোজ ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আজ এক কলেজ পড়ুয়া মেয়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।
এরোজ ব্যাট রেখে রক্তমাখা অচেতন দেহটিকে আগলে ধরলো। ওড়নায় আবৃত ফর্সা মুখশ্রী, ডান গাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তেই এরোজ হতবাক হয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ মেয়েটিকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে হাসপাতালে ছুটে আসে সে। নিজের টাকায় চিকিৎসা করায়। ভাইজানের কানে গেলে তার রক্ষা নেই। ডাক্তার জানালো মেয়েটির মাথায় তিনটা সেলাই লাগবে। অনুশোচনায় দগ্ধ অন্তঃস্থল নিয়ে এরোজ হাসপাতালের করিডরে বসেছিল। একজন নার্স এসে বিক্ষিপ্ত মেজাজে তাকে এক গোছা কালো রেশমের সুতো ধরিয়ে দিয়ে বলল,

–“এই নিন।”
এরোজ কপাল কুঁচকে এক গোছা রেশমের সুতো জেখে চলেছে। কৌতুহলী গলায় শুধায়
–“এগুলো কি?”
–“এগুলো কি মানে? এগুলো আপনার গার্লফ্রেন্ডের মাথার চুল। সেলাই করতে গিয়ে এই এক গোছা চুল কাটতে হয়েছে।”
–“আপনার কমনসেন্স খুবই বাজে, মিস। ঐ মেয়েটা আমার গার্লফ্রেন্ড হলে আমি নিশ্চয়ই তার মাথা ফাটিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসতাম না?”, এরোজ বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল।
–“আমার কমনসেন্স মোটেই বাজে না মিঞা। গতকাল ও একজন ছেলে গার্লফ্রেন্ডের পা ভেঙে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে, অন্য ছেলের সাথে ঘুরতেই যাওয়ায়। সেখানে মাথা ফাটিয়ে নিয়ে আসা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়।”
এরোজ দমে গেল। কিন্তু তার মাথায় ঢুকলো না নার্সটির বলা আরেকটি কথা। সে নিজের হাতের দিকে তাকায় বিশাল লম্বা রেশমের ন্যায় কিছু দেখে কৌতূহলী গলায় শুধায়,
–“আপনি মাত্র কি বললেন? এটা চুল?”
–“হুঁ। ঐ মেয়েটার চুল, এত লম্বা চুল কাটতে কষ্ট হচ্ছিলো কিন্তু না কেটে উপায় ছিল না।”
আকাশ থেকে পড়ে এরোজ। বিস্মিত নয়নে তাকায় বিশাল দৈর্ঘ্যের চুলের গোছার দিকে। চুলটির দৈর্ঘ্য মাপতে উদ্বত হলো সে। নিজের বসা লম্বা স্টিলের বেঞ্চিটির দৈর্ঘ্যের প্রায় সমান। সে হা করে তাকিয়ে রইল। বিস্ময় নিয়ে শুধায়,
–“এগুলো চুল? এত লম্বা? এ তো ছোটবেলায় রোজের দেখা সেই রূপাঞ্জেলের মতো।”
তন্মধ্যেই ছেলেটার ফোন বেজে উঠলো। রিসিভ করতেই ভেসে আসলো বড় ভাইজানের চিন্তির কণ্ঠ,
–“এরোজ তুই আবার কি ঝামেলা পাকিয়েছিস?”
এরোজ ভাইয়ের কথার জবাব দেয় না। সে নিজের বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারেনি তখনো। সে বিস্ময়ের সাথে ভাইকে জিজ্ঞাসা করে,

–“ভাইজান, বাস্তবেও রূপকথার সেই রূপাঞ্জেল রয়েছে?”
–“এরোজ কি উল্টাপাল্টা বকছিস? তুই নাকি কার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিস?”
–“হ্যাঁ ভাইজান, এক রূপাঞ্জেলের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি। আর তার এক গোছা কাটা চুল নিয়ে এখন বসে আছি।”
অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসলো রাগান্বিত স্বরে বলা কিছু কথা। এরোজ নিরবে ভাইজানের শাসন মাথা পেতে নিলো। কোনোমতে ফোন কেটে ছুটলো নার্সের কাছে। অনুনয় করে বলল,
–“আমি কি একটু রোগীকে দেখতে পারি?”
নার্স সায় জানালো। বন্ধুদের রেখে এরোজ ছুটে গেল নিজের কৌতুহল দমাতে না পেরে। কেবিনে ঢুকতেই তার দৃষ্টিতে বিস্ময় ছুঁয়ে গেল বেড থেকে মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়া এক গুচ্ছ ঘন কালো চুল দেখে। অনুতাপ যতটুকু না ছুঁতে পারলো তার থেকেও বেশি মুগ্ধতা ছুঁয়ে গেল।
এহেন কান্ড ঘটিয়েও তাকে হাসতে হাসতে কেবিন থেকে বের হতে দেখে তার বন্ধুরা শুধায়,
–“তপোবন ভাইয়ের ভয়ে কি পাগল হয়ে গিয়েছিস? একজনের মাথা ফাটিয়ে দিয়ে হাসছিস?”
এরোজ হাসতে হাসতে বলল,

–“ভাগ্যিস মাথাটা ফাটিয়েছিলাম। তাই বলেই তো সাক্ষাৎ রূপাঞ্জেলের দেখা পেলাম।”
–“পাগল হয়েছিস?”
এরোজ বিমুগ্ধ চিত্তে হেসে বলল,
–“উঁহু, কিন্তু হতে চাই। ঐ চুলগুলোর মালিক হতে পারলে নিশ্চিত পাগল হয়ে যাব খুশিতে। এত সুন্দর চুল!”
কণ্ঠনালী আঁটকে গেল। এরোজ দম ফেলতেই গল্প শুনতে নিমগ্ন নায়েল ছটফটিয়ে উঠে বলল।
–“তারপল বলো তালাতালি। ছেলেটা লূপাঞ্জেলকে দুক্ক কেন দিয়েচে?”
সুখময় মুহুর্তেগুলো স্মৃতিচারণ করাও যেন দুঃসহনীয়! গলায় দলা পাকানো অনুভূতি গিলে এরোজ ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“এরপর আর কখনো দুঃখ দেয়নি বরং প্রতিটি মুহুর্ত তার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছে।”
–“তালপলে?”
এরোজের মুখশ্রীতে বিষন্নতা ছুঁয়ে গেল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“তারপরে ছেলেটার মায়ের মতো একদিন সৃষ্টিকর্তা তাকেও ছিনিয়ে নিয়ে গেল ছেলেটার থেকে।”
–“কেন, কেন?”, নায়েল হতবাক হয়ে শুধায়।
এরোজ ছলছল চোখে চেয়ে বলল,
–“ঐ যে, সুখের ছদ্মবেশে দুঃখ নিয়ে এসেছিল। তাই দুঃখ দিয়ে হারিয়ে গিয়েছে।”
–“আহ্, ভেলি ভেলি স্যাড।”
নায়েলের সব উৎকণ্ঠা ফিকে পড়ল। সে নেতিয়ে পড়ে আবার শুয়ে পড়ল এরোজের বুকে।
–“আলো একটা গল্প বলো এখন।”
–“তোমার ঘুম নেই নায়েল?”
নায়েল উদাসীন কণ্ঠে বলল,
–“ঘুমি চলে গিয়েচে।”
এরোজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“তুমি চোখ বন্ধ করো, আমি তোমায় নিয়ে হাঁটি।”
নায়েল ভদ্র মেয়ের মতো চোখ বন্ধ করে বুকে শুয়ে রইলো আর এরোজ তাকে নিয়ে পুরো ঘরময় পায়চারী করলো। ঠিক পনেরো মিনিটের মাথায় নায়েল আবার ঘুমিয়ে পড়ল। আর এরোজ? সে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে পেয়ে যাওয়া সাময়িক সুখটুকু আগলে ধরে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিলো। একটু সুখের জন্য তরপাতে থাকা চোখেমুখে উচ্ছাস!

প্রভাতের কিরন তখনো অস্ফুট কুহেলীর আড়ালে। চারিদিকে আবছা অন্ধকারাচ্ছন্ন আর নিস্তব্ধতার আধিপত্য। ফজরের নামাজ আদায় করে মৌনতা সোয়েটারের উপর চাদর জড়িয়ে নিঃশব্দে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে আসে। দ্রুতপায়ে এগিয়ে যায় রোজের ঘরের দিকে। হাঁটু সমান ভেজা চুলগুলো গায়ের শাল ছাপিয়ে দোদুল্যমান।
শীতের প্রকোপে কেমন গুটিয়ে গিয়েছে মেয়েটি। হাঁটু সমান চুল সকলের কামনীয়, প্রিয় হলেও মৌনতার ভীষণ অপ্রিয় এই চুলগুলো। যত্ন করা কষ্টকর, আর না যত্ন করার সময় হয়ে ওঠে। এত অবহেলা সত্ত্বেও চুলগুলো নিজেদের স্বকীয়তা হারায়না। তার মায়ের বংশের সকলের চুল এমন লম্বা। সেই জিনগত বৈশিষ্ট্য তার এবং নায়েলের মাঝেও রয়েছে। মা মেয়েকে বিপাকে পড়তে হয় এই চুল নিয়ে। একবার ভেজালে হেয়ার ড্রায়ার ছাড়া শুকানো যায় না।
মৌনতা চিন্তিত লোচনে রোজের চাপিয়ে রাখা দরজা খুলে ঢুকতেই, রুমে শুধুমাত্র রোজের উপস্থিতি দেখতে পেল। তা দেখে মৌনতা আশ্চর্য হলো বেশ। সে রোজকে ডাকলো। রোজ ঘুম জড়ানো চোখে আবছা আলোয় মৌনতাকে দেখে ভড়কায়। জড়ানো কণ্ঠে শুধায়,

–“মৌন বউ, স্বপ্নের মাঝেও আমার পেছনে লাগতে এসেছো? আমার ঘুম তোমার সহ্য হয় না তাই না?”
–“বাজে কথা বন্ধ করো, রোজ। নায়েল কোথায়?”, মৌনতার কণ্ঠে উদ্বিগ্নতা।
–“ম*দ ছোট ভাইজান খায় অথচ মাতলামি তুমি করছো মৌন বউ। নায়েলকে তুমি নিয়ে গিয়েছিলে না, তাহলে আমার কাছে এসে খুঁজছো কেন?”, রোজের গা ছাড়া কথায় মৌনতা রেগে জোরে এক চাপড় মারলো তার বাহুতে। রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“ফাজলামো করবে না রোজ, নায়েল কোথায় বলো। ও তোমার কাছে এসেছিল ঘুমাতে।”
রোজের গা ছাড়া ভাব উবে গেল। সে চকিতে লাফ দিয়ে উঠে বসে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“কি বলছো? নায়েল আমার কাছে এসেছিল মানে? ও তো আমার ঘরে আসেনি। তবে গেল কোথায়?”
রোজের কথায় মৌনতা উদ্বিগ্ন বদনে দ্রুত বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে। রোজ ও মৌনতার পিছু পিছু বের হয়। মৌনতা হাঁটতে হাঁটতে রোজকে জিজ্ঞাসা করে,
–“ও কোথায় যেতে পারে রোজ? আম্মার কাছে নাকি বড় ভাইজানের কাছে?”
–“দাঁড়াও খুঁজছি, মৌন বউ। থাকলে ঘরেই কারো কাছে থাকবে। কেমন মা তুমি? মেয়ে কোথায় ঘুমাচ্ছে সেটাও জানো না?”, রোজ কপাল কুঁচকে বলল।
মৌনতা পা থামিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় রোজের দিকে। কি করে বলবে? কি পরিস্থিতির ভেতর থেকে তার এক একটা মুহুর্ত যায়। মৌনতার অসহায় দৃষ্টিতে রোজ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। বাড়তি প্রশ্ন করে না। আশ্বস্ত করে বলল,

–“চিন্তা করো না এখানেই কোথাও আছে।”
মৌনতা এগিয়ে গেল তপোবনের ঘরের দিকে। মাঝেমধ্যে ভাইজানের কাছেও ঘুমাতো নায়েল। নামাজের পর ভাইজানের ঘর খোলাই থাকে। কিন্তু সেখানে পেলো না, তানশানের ঘরেও পেলো না‌
রোজ খুঁজতে খুঁজতে কিছুটা কৌতুহল বশত এরোজের ঘরের চাপিয়ে রাখা দরজা খুললো। কম্ফোর্টার মুড়ি দিয়ে ভাইজান ঘুমাচ্ছে। সে নায়েলের অস্তিত্ব খুঁজতে এদিক ওদিক তাকালে বিছানার পাশে এরোজের জুতার পাশে নায়েলের জুতো দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। পরপরই বেশ অবাক হলো নায়েলকে ভাইজানের সাথে দেখে। ছোট ভাইজান উগ্র আচরন দেখে নায়েল বেশ ভয় পেয়ে তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলত যে!
রোজ ঘর থেকে বেরিয়ে মৌনতাকে ডাকলো। মৌনতা ছুটে এসে শুধায়,

–“পেয়েছো?”
–“ছোট ভাইজানের কাছে আছে। তুমি চিন্তা করোনা, এখন ঘুমাতে যাও। আমি যাই নামাজ পড়ি।”, রোজ পা চালায় ঘরের দিকে।
এদিকে মৌনতা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে রোজের দিকে, নায়েল ছোট ভাইজানের ঘরে? কিভাবে? এ যে অসম্ভব!
সে অসহায় দৃষ্টিতে চাপিয়ে রাখা দরজাটি দেখে। সেখানেই পায়চারি করতে লাগলো ঢুকবে কি ঢুকবে না এই ভেবে। সে তো না পারতে সই অভদ্র লোকটির ঘরে ঢোকে না। তবুও চিন্তা জেঁকে বসলো নায়েলের নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে রাতে। সে রাগ, ইতস্ততা ঝেড়ে মন্থর গতিতে দরজা খুলে মাথা ঢুকালো। আপাদমস্তক কম্ফোর্টের মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে কেউ এখানে নায়েল কোথায়? সে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে বিছানা থেকে কিছু দূরত্ব দাঁড়ায়।
গলা খাঁকারি দিয়ে এরোজকে ডাকলো। একডাকে উঠল না দেখে, সে গলা উঁচিয়ে আবারো ডাকলো,
–“ছোট ভাইজান?”
একবার দু’বার ঠিক পাঁচ বারের বার এরোজের নড়চড় দেখাগেল। মৌনতা আবারো ডাকলো।
সরব এরোজ মুখের ওপর থেকে কম্ফোর্টারটি সরিয়ে ঘুম জড়ানো দৃষ্টি ফেললো। মৌনতা হড়বড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো,

–“ভাইজান, নায়েল কি আপনার কাছে? আসলে ওকে নিতে এসেছি।”
এরোজ পিটপিট করে কিয়ৎকাল তাকিয়ে থাকলো। অতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলে তার মাথা সর্বদাই একটু ধীরগতিতে সচল হয়। কিয়ৎকাল বাদ প্রসঙ্গ বুঝতেই, প্রসঙ্গটিকে স্বশরীরে দৃশ্যমান করে দিলো।
সে নির্বাক গলার কাছ থেকে কম্ফোর্টারটি সরিয়ে বুক পর্যন্ত নামিয়ে দেয়। এবং সাথে সাথেই দৃশ্যমান হয় চার হাত পায়ে চাচাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমন্ত নায়েলের। মৌনতার মুখে হাসি ফুটে উঠলো ঘুমন্ত মেয়েকে দেখে। মেয়ে যে আরামেই ঘুমাচ্ছে তা ঘুমের ধরণ দেখেই বুঝতে পারলো। কিয়ৎকাল ভুলে বসলো মানুষটার ঔদ্ধত্যতা। সে এরোজের দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–“ধন্যবাদ ভাইজান আর দুঃখিত বিরক্ত করার জন্য। আমি ওকে নিয়ে যাই? আসলে রাতে ওর খিদে পায়। উঠিয়ে কিছু খাইয়ে দেই।”
মৌনতা এক পা এগিয়ে এসে বলল। তবে এরোজ নির্লিপ্ত চিত্তে পুনরায় কম্ফোর্টারটি গলা পর্যন্ত টেনে নিয়ে নায়েলকে ঢেকে নিলো। ভারী কন্ঠে বলল,

–“খাইয়েছি আমি, চিন্তা করবেন না। ঘুমিয়েছে এক দেড় ঘন্টা হয়েছে। এখন জাগানোর প্রয়োজন নেই, ঘুমাক।”
হুট করেই এহেন কথার মর্মার্থ বুঝতে পারলো না মৌনতা। বুঝতে সময় নিলো। অতঃপর কৌতুহলী কণ্ঠে শুধায়,
–“আপনি খাইয়েছেন?”
পুনরায় ঘুমানোর প্রয়াসে এরোজ নেত্রদ্বয় সদ্যই বন্ধ করেছিল। কিন্তু মৌনতার কথায় সে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। মৌনতা থতমত খেয়ে তীক্ষ্ম দৃষ্টি দেখে। ইতস্তত কণ্ঠে বলল,
–“না মানে ভাইজান কি খাইয়েছেন? এমনিই..”
মৌনতার ইতস্তত কণ্ঠরোধ করে এরোজ ব্যগ্র কন্ঠে বলল,
–“দুধে ভিজিয়ে চকোস আর ড্রাই ফ্রুটস খাইয়েছি।”
মৌনতা বুকভরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো এরোজের জবাবে। নায়েল প্রতি রাতে উঠে এগুলোই খায়। সে আর বিরক্তি না বাড়িয়ে বলল,

–“ধন্যবাদ ভাইজান, আমি আসছি। ও জেগে গেলে আমি এসে নিয়ে যাব। আর আবার দুঃখিত আপনাকে বিরক্ত করার জন্য। নায়েল ও নিশ্চয়ই আপনাকে বিরক্ত করেছে।”
এরোজ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না সে পুনরায় কম্ফোর্টার টেনে ঘুমানোর চেষ্টা করে। মৌনতা আর এক পলক চেয়ে নিঃশব্দে দরজা আঁটকে বেরিয়ে যায়।
দরজা বন্ধের আওয়াজ কর্নকুহরে প্রবেশ করতেই এরোজের বদ্ধ নেত্রদ্বয় খুলে যায়। অসাড় দেহে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে বদ্ধ দরজার দিকে। চোখের পর্দায় ভাসছে কালো কুচকুচে হাঁটু সমান দোদুল্যমান ভেজা চুলের স্নিগ্ধ এক দৃশ্য। ঠোঁটের কোনা স্মিত বেঁকে যায়। ধূসর রঙা চোখ ঝাঁপসা হতে লাগলো সমানতালে। একটা সময় চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা নোনাজল। লোকে বলে পুরুষ মানুষ নাকি কাঁদে না। কিন্তু কেউ কি জানে, যখন এই চোখ থেকে অশ্রু গড়ায় তখন ভেতরটা ঠিক কতটা যন্ত্রণায় ছটফট করে?
ছোট্ট দেহটিকে জড়িয়ে ধরা হাত দু’টো আরো দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে লাগল। দুই চোখের কার্নিশ তখন অঝোরে সিক্ত হচ্ছে। এরোজ নায়েলের মাথা আঁকড়ে ধরে ঠোঁট ছোঁয়ায় তার কপালে। এই প্রথম নায়েল তার এতো কাছাকাছি থেকেছে। না আসলে তো জানতেই পারতো না, এই বাচ্চা মেয়েটিও যে তার ক্ষততে মলম লাগানোর ক্ষমতা রাখে। চোখ বেয়ে অনর্গল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে এরোজের। অথচ সে এই অশ্রুর কারণ ও উচ্চারণ করতে পারবে না তাহলে জিহ্বা ঝলসে যাবে যে। গুনাহ হবে!
অশ্রুসিক্ত নয়নে এরোজ হাসিমুখে তাকায় ঘুমন্ত নায়েলের মুখপানে। পিঠ ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলে,

–“এই দূর্ভাগাকে এতটুকু সুখ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ ছো…”
কিছু উচ্চারণ করতে গেলেও এরোজ থামে। লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে সাহস জোগায়। অতঃপর বড্ডো ক্ষীণ স্বরে আওড়ায়,
–“আমার ছোট্ট রূপাঞ্জেল।”

হিজাব বাঁধতে বাঁধতে রূপকথা আড়চোখে তাকায় তপোবনের দিকে। যে কি-না ললাটে কয়েকটা ভাঁজ নিয়ে তার দিকে চিন্তিত লোচনে তাকিয়ে আছে। রূপকথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিন্তিত লোকটাকে আস্বস্ত করে বলল,
–“এমন করছেন কেন? এটা গুরুত্বর কিছু না! সব মেয়েদেরই এমন ব্যথা হয়।”
তপোবন নির্বিকার তাকিয়ে রইল। কোনটা স্বাভাবিক, কোনটা অস্বাভাবিক সে বোঝে। আর বোঝে বলেই তো এত চিন্তা হুট করে জেঁকে বসেছে। সে গম্ভীর গলায় বলল,
–“কিন্তু তোমার অতিরিক্ত ব্যথা হয়। কলেজ শেষে ডাক্তারের কাছে যাব। আমি আগামীকাল যশোরে যাব তার আগে ডাক্তার দেখাতে হবে।”
–“কি দরকার?”, রূপকথা মিনমিনে গলায় বলল।
তপোবন বিমর্ষ কণ্ঠে বলে,
–“চেকাপ করাতে তো কোনো সমস্যা নেই।”
রূপকথা কথা বাড়ায় না। মাথা নেড়ে সায় জানায়।
রূপকথা আর তানশানকে কলেজে দিয়ে তপোবন অফিসে যায়। ইদানিং প্রতি সপ্তাহেই রূপকথার দু’টো করে সি.টি থাকে।

আইসিটি টেস্ট শেষ করে, রূপকথা আর তার ক্লাস ফিলোরা ক্লাস পরিবর্তন করার জন্য এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে একদল সিনিয়রদের মজলিস বাঁধলে কেউ কেউ নিজেকে আরেকটু পরিপাটি করতে লাগলো, তো কেউ কেউ ভয়ে পাশ কাটাতে লাগলো। কিন্তু রূপকথা, নৈমি, নূর এর মধ্যে কোনটাই করছে না।
তারা নিরুদ্বেগ হাঁটছে তো হাঁটছে। তৃশান তেরছা চোখে দেখে মেয়েটিকে। ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি মেয়েটির উপেক্ষা দেখে।
হাঁটতে হাঁটতেই রূপকথার অনুভব হয় পুরুষালী তীব্র নৈকট্য। পুরুষালী গন্ধ অতি সন্নিকটে অনুভব হতেই সে চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। সহসা কারোর বুকে নাক ঠেকে যেতে নিলে সে দ্রুত নিজেকে সামলে দূরে সরে যায়। তৃশান কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রূপকথা রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তৃশান আবার তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। অদূরে তার দলবল সবাই চাপা স্বরে হাসছে।
নৈমি, নূর সহ ক্লাস ফিলোরা সবাই গতিশ্লথ করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।
রূপকথা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

–“কোন ধরণের বেয়াদবি এগুলো? সিনিয়ররা এমন করে জুনিয়রদের সাথে? আমার পেছন থেকে সরুন।”
বলেই রূপকথা ঘুরতে যায় কিন্তু তৃশান আবার তার পেছনে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আশেপাশের ছেলে মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা রাম ধমক দিয়ে বলে,
–“নাটক চলছে এখানে? হা করে তাকিয়ে আছো কেন? নিজেদের কাজে যাও।”
সকলে দ্রুত পা চালায়। রূপকথা রাগান্বিত বদনে আবার নিজের পথ ধরলে তৃশান ও সাথে সাথে পেছনে হাঁটতে লাগল। রূপকথা হাঁটতে হাঁটতেই এবার চেঁচিয়ে উঠল ,
–“অসোভ্যের মতো আচরণ করছেন কেন?”
–“কারণ আমি অসোভ্য। কথায় বলে রাগী মেয়েদের মন নরম। কিন্তু এখন তো দেখছি সব উল্টো। কোথায় আমি সাহায্য করছি বলে ধন্যবাদ দিবে তা না করে বকছো?”
–“আপনি আমায় জনসম্মুখে হাসির পাত্রী বানিয়ে উপকার করছেন?”, রূপকথা পা থামিয়ে তৃশানের দিকে তাকিয়ে বলল। তৃশান স্মিত হেসে মেয়েটির মুখোমুখি দাঁড়ায়। বদনে থাকা পাতলা কার্ডিগানটা খুলতে খুলতে বলে,
–“উহুঁ, হাসির পাত্রী হওয়া থেকে রক্ষা করছি।”
বলেই তৃশান নিজের কার্ডিগানটা রূপকথার কোমড়ে বাঁধতে লাগলো। রূপকথা হতভম্ব হয়ে দূরে সরে যেতে নিলে তৃশান গম্ভীর গলায় বলে,

–“নড়াচড়া করো না। আর ইউ ইন পিরিয়ড? নাকি আজকেই হয়েছে? জানতে না? তোমার ইউনিফর্মে দাগ লেগে আছে, এটা পড়ে থাকো।”
রূপকথা চমকে উঠল তৃশানের কথায়। নত মস্তকে লাজে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তৃশান স্মিত হাসলো মেয়েটির মিইয়ে যাওয়া দেখে। মুহুর্তেই কেমন ঘেমে উঠেছে। সে অভয় জানিয়ে বলল,
–“ভয় নেই, কেউ দেখেনি। লিক করেছে?”
রূপকথা উপর নিচ মাথা নাড়লো।
–“এক্সট্রা সাথে রাখোনি?”
এবারেও রূপকথা না বোধক মাথা নাড়লে, তৃশান চারিদিক অবলোকন করে বলল,
–“এখানে পাঁচ মিনিট বসো, আমি আসছি। এখানেই থাকবে কিন্তু।”
বলেই তৃশান একপ্রকার ছুটে বেরিয়ে গেল ভবন থেকে। ফিরে এলো ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে। হাতে একটা প্যাকেট। সেটা রূপথার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
–“এই নাও, এরপর থেকে এক্সট্রা সাথে রাখবে। আর শুধু রাগ দেখিয়ে বেড়ালেই হয় না চারিদিকে একটু খেয়াল ও দিতে হয়।”

বলেই সে গটগট করে চলে যায়। মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত ওয়াশরুমে গেল। প্যাকেটটি খুলতেই কাঙ্খিত জিনিসের সাথে দু’টো ডার্ক চকলেট আর একটা কলা পেল। রূপকথা হতবিহ্বল হয়ে গেল।
নির্দিষ্ট সময়ে তপোবন কলেজ গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়। তানশানকে ড্রাইভারের সাথে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে।
রূপকথা দ্রুত পায়ে এসে গাড়ির কাছে আসলে তপোবন বলল,
–“সামনের সিটে বসো।”
রূপকথা মাথা নুইয়ে শুধায়,
–“তানশান কোথায়?”
–“ড্রাইভার চাচর সাথে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। ওর বিকালে কোচিং আছে, দেরি হয়ে যাবে।”
–“ওহ।”
বলেই রূপকথা ফ্রন্ট সিটে বসে পড়ে। সে বসলে তপোবনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রূপকথার কোলের উপর অগোছালোভাবে রাখা একটা পাতলা সোয়েটার। সে ভ্রু কুঁচকে শুধায়,
–“এটা কার?”

রূপকথা অপ্রস্তুত হলো তপোবনের কণ্ঠে। ভাবনায় পড়তে হলো তপোবনকে কি বলবে আজকের ঘটনা? একটা ছেলে তাকে সাহায্য করেছে এটা বললে যদি কিছু মনে করে? সে এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। ইতস্তত কণ্ঠে বলল,
–“তেমনকিছু নয়। আমায় বিপাকে পড়তে হয়েছিল আজ তখন একটা ফ্রেন্ড তার সোয়েটার দিয়ে সাহায্য করেছিল। দেয়ার সুযোগ পাইনি। আগামীকাল দিয়ে দেব।”
–“কি বিপাকে পড়তে হয়েছিল? তুমি আমায় ফোন করতে!”, তপোবন চিন্তিত কণ্ঠে বলল।
–“খুব ছোট বিষয়। আমার ক্লাস ফ্রেন্ডরাই সাহায্য করার জন্য যথেষ্ট ছিল। চিন্তা করবেন না।”
তপোবন মাথা নেড়ে সায় জানায়। বিশ মিনিট বাদ গাড়ি থামে সিটি মেডিক্যালের সামনে। ডাক্তার দেখিয়ে কিছু টেস্ট করার জন্য রূপকথাকে নার্স নিয়ে যায়। তপোবন রূপকথার ব্যাগ আর সেই সোয়েটারটা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছিল। তখন আনমনে সে সোয়েটারটা হাতে নেয়। এটা কোনো মেয়ের সোয়েটার তো নয়।
সে মেলে ধরে কার্ডিগানটা। পুরুষালী বৃহৎ আকৃতির ঐ সাইজটা তপোবনের ললাটে ভাঁজ সৃষ্টি করে। সে অলসতার সাথে পকেট থেকে ফোন বের করে তৃশানের আইডিতে ঢুকলো।
সকালে, তৃশানের বন্ধুদের সাথে ছাড়া এই ছবিটা অদেখা করলেও এখন এটি তার পূর্ণ মনোযোগ কেড়ে নেয়। সেইম কার্ডিগানটা হাস্যোজ্জ্বল মুখের তৃশানের বদনে। এটা তৃশানের কার্ডিগান। তপোবন ফোন বন্ধ করে ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেললো। মনে মনে এতটুকু আওড়ায়,

–“রূপকথা কোনো জরুরী কথা হলে সবার আগে তাকেই বলে।”
এতটুকু তপোবনের ললাট থেকে ভাঁজ দূর করে দেয়। টেস্ট করানো হয়ে গেলে আধা ঘন্টার মাঝে রিপোর্ট আসে। তপোবন আর্জেন্ট বলেছিল আর অতিরিক্ত পে করেছিল। ডাক্তার তাকে ডাকলে তপোবন একাই তার সাথে দেখা করে।
ডঃ সুস্মিতা মৃদু হাসলো তপোবনকে দেখে। তারা পূর্বপরিচিত। সে পূর্বার ডাক্তার ছিল। ডঃ সুস্মিতা শুধায়,
–“কিভাবে কি তপোবন?”
তপোবন জানে প্রশ্নের অর্থ। কৃত্রিম হেসে বলল,
–“ভাগ্য। রিপোর্টে কি আসলো, সব নরমাল?”
ডঃ সুস্মিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মাথা নেড়ে বলল,
–“না, একদম নরমাল নয়। তোমার ধারণা ঠিক, রূপকথার পেট ব্যথা কিছুটা অস্বাভাবিক। যদি স্পষ্টভাবে বলি, তবে পূর্বার মতো তার ও এমনি সমস্যা রয়েছে। তবে পূর্বার থেকে তার সমস্যাটা একটু কম গুরুতর। জরায়ুর মুখে খুবই ক্ষুদ্র সিস্ট রয়েছে। তবে চিন্তার কিছু নেই, এটা দীর্ঘদিনের কিন্তু আকৃতি বদলায়নি এখন পর্যন্ত। এর জন্যই মূলত ওর পেট ব্যথা একটু বেশি হয়। নিয়মিত ওষুধের সান্নিধ্যে থাকলে ঠিক হয়ে যাবে।”

তপোবনের মুখশ্রী বিবর্ণ হয়ে গেল। সেই পুরোনো স্মৃতি গুলো কেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? পূর্বাকেও যখন সে প্রথম সন্দেহের বশে ডাক্তার দেখায় তখন ডাক্তার এমনি ক্ষুদ্র এক সিস্টের কথা বলেছিল। যেই ক্ষুদ্র সিস্ট’টাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। কোনভাবেই এই ক্ষুদ্র মাংসল পিন্ডকে তপোবন স্বাভাবিকভাবে নিতে পারলো না। চিন্তায় ভারী দেহ মলিন হয়ে পড়লো। সুস্মিতা তাকে আস্বস্ত করে বলল,
–“চিন্তার কিছু নেই তপোবন। আমি আশা করছি এটা নিয়মিত ওষুধের ওপর থাকলে ঠিক হয়ে যাবে। তবে বাচ্চা নেয়ার পরিকল্পনা থাকলে সাময়িক সেটা বাতিল করো। তুমি তো জানো গর্ভকালীন অবস্থায় হরমোনের কারণে সিস্ট অতিদ্রুত বড় হয়ে যায়। তাই রূপকথার ওভারি পুরোপুরি সুস্থ হোক তারপর ট্রাই করো। ”
তপোবন ধিমি কণ্ঠে বলল,

–“আমার বাচ্চা নিয়ে কোনো তাগিদ নেই। এতে যদি রূপকথার ক্ষতি থাকে তবে কোনদিন-ই আমার বাচ্চার প্রয়োজন নেই।”
–“আমি ক্ষতি বলিনি ভাইজান। ও এখনো কনসিভ করতে পারবে। জটিল কোনো বিষয় নয়। তবে বয়স আর সুস্থ একটা দেহ বিবেচনা করলে একটু দেরিতে প্লান করো। তোমার বাবা হওয়ার তাগিদ না থাকলেও রূপকথার নিশ্চয়ই মা হওয়ার তাগিদ আছে?”
তপোবন নীরব রইল। হ্যাঁ, সে কখনোই কারোর মাতৃত্ব নামক অনুভূতিকে তুচ্ছ করতে পারে না। কিন্তু এই যে সদ্যই কেউ তাদের বাবা ছেলের অভ্যাস হয়ে উঠেছে? তাকে হারাতে তারা পারবে না।
আরো কিছু আলাপ আলোচনা করে তপোবন বেরিয়ে আসে। বাইরে অপেক্ষা করতে থাকা রূপকথা উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধায়,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩০

–“কি হয়েছে?”
তপোবন ম্লান মুখে তাকায় তার দিকে। মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রেখে বলল,
–“কোনো সমস্যা নেই।”
–“দেখেছেন আমি বলেছিলাম।”, রূপকথা চঞ্চল কণ্ঠে বলে। তপোবন ম্লান হাসলো।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩২