Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৩
তোনিমা খান

বেলা তখন বেশ গড়িয়েছে। ইমরোজ তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তন্মধ্যেই কারোর তীব্র কাঁপুনি অনুভব হতেই তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম জড়ানো চোখে পাশ ফিরে তাকালে মৌনতার অস্বাভাবিক কাঁপুনি নজরে আসে। বদ্ধ নেত্রে গুটিয়ে শুয়ে কাঁপছে আর বেহুঁশের মতো কিছু বিড়বিড় করছে। সে কপাল কুঁচকে উঠে বসে ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকা মৌনতার গালে হাত রাখলে অসহনীয় তাপমাত্রায় মৃদু চমকালো। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে গালে আলতো হাতে চাপড় দিয়ে ডাকে,

–“মৌন? মৌন? শুনতে পাচ্ছো? আশ্চর্য এত জ্বর উঠল কি করে?”
মৌনতার কোনো সাড়াশব্দ আসল না। সুদৈর্ঘ্য ভেজা চুলগুলো গড়িয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। তা থেকেও পানি ঝড়ছে। ইমরোজ বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে নামে। কাবার্ড থেকে আরো একটা কম্ফোর্টার নামিয়ে সেটি দ্রুত মৌনতার গায়ে জড়িয়ে দেয়। নিজেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপুনি থামানোর চেষ্টা করলো। এবং পনেরো মিনিট বাদ সফল ও হলো।‌ ইমরোজ হাঁফ ছেড়ে উঠে বসে। এহেন শীতের সকালে সে ঘেমে উঠেছে এতটাই তাপ!
পুনরায় মৌনতাকে ডাকতে লাগল। লাগাতার ডাকতে থাকায় মৌনতা একটাসময় চোখ খুলে তাকায়। শরীর নুইয়ে পড়েছে তার চোখ খুলতেও কষ্ট হচ্ছে। ইমরোজ তার গাল চাপড়ে শুধায়,

–“সকালে কিছু খেয়েছো?”
মৌনতা ডানে বামে মাথা নেড়ে দূর্বল কণ্ঠে শুধায়,
–“নায়েল এসেছিল?”
–“নিজে মরে যাচ্ছো, নায়েলের কথা বাদ দাও। তোমার এই দুদিন পর পর সংক্রমণ কেন লেগেই থাকে? নিজের দিকে একবার তাকিয়েছো? দেখাচ্ছে কেমন? শকুনের মতো! আর এত চুলের কি প্রয়োজন? এগুলো কোনো কাজে লাগে? কেটে ফেলো সব। সারাদিন বাসায় থাকো মৌন। তোমার তো আর বাইরে চাকরি করতে হয় না‌। তাহলে নিজের খেয়ালটা তো রাখতেই পারো, তাই না? দুদিন পরপর এমন জ্বর, ঠান্ডা, অসুখ। অসহ্য!”
বিরক্তিকর নিঃশ্বাস ফেলে ইমরোজ বিছানা থেকে নেমে হেয়ার ড্রায়ার নিয়ে আসে। মেঝেতে বসে মৌনতার চুল শুকাতে লাগলো। রাগ ঝেড়ে বলল,

–“এগুলো কেটে আসবে আজকেই গিয়ে। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।”
জ্বরে কাতর মৌনতার কানে তখনো বাজছে ইমরোজের বলা এক একটা কথা। স্বামীর কাছ থেকে সৌন্দর্যের বর্ণনা হিসেবে শকুনের সাথে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া, এটা বোধহয় একজন বিবাহিত নারীর জন্য চাবুকের আঘাতের থেকেও বেশি কষ্টদায়ক। কি অদ্ভুত তাই না? একজন মানুষ অথচ দু’জনের মনে তাকে নিয়ে অনুভূতির আকাশ পাতাল তফাৎ। কারো কাছে হিরে তো কারোর কাছে কয়লা। কিন্তু দিনশেষে মানুষ তো একজনই।
সে মাথা ঘুরিয়ে ইমরোজের দিকে তাকায়। মলিন, দূর্বল কণ্ঠে বলল,
–“এত অসুস্থতা দেখেও কখনো তো বললেন না যে ডাক্তারের কাছে চলো।”
ইমরোজ শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়। শাত স্বরে বলে,
–“অসুস্থ তুমি অথচ ডাক্তার দেখানোর কথা আমায় বলতে হবে? টিপিক্যাল গ্রাম্য বউদের মতো আচরণ করা বন্ধ করো, মৌন।”
বলেই ইমরোজ মানিব্যাগ থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে তার সামনে রেখে বলল,
–“এটা নিয়ে আজকেই ডাক্তারের কাছে যাবে।”
মৌনতা শ্রান্ত দৃষ্টি ফেলল টাকাগুলোর পানে। ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে বেড সাইড ছোট্ট ওয়ার্ড্রবের ড্রয়ার থেকে দশ হাজার টাকা বের করে ইমরোজের সামনে রাখে। ইমরোজ ভ্রু কুঁচকে তাকায় টাকাগুলোর দিকে। মৌনতা চোখে চোখ রেখে বলে,

–“আমার কাছে টাকার কমতি নেই, ইমরোজ। যদি কমতি থাকে সেটা হলো আপনার। ভাইজান বহুবার বলছিল ডাক্তারের কাছে যেতে তার সাথে কিন্তু আমি যাই নি। কেন যাবো বলুন তো? তার তো কোনো দ্বায়ভার নেই আমায় ডাক্তার দেখানোর। আমার তো স্বামী রয়েছে, আমি তো বিধবা নই। আর পাঁচটা মানুষের মতো আমার স্বামী ও আমায় নিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে, এই চাওয়াটা কি অপরাধ বলুন?”
ইমরোজ তখনো শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে টলমলে শুকনো ঐ মুখটির দিকে। অভিযোগ, ক্লেশে পরিপূর্ণ ঐ দৃষ্টিতে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না। উঠে দাঁড়িয়ে গলায় তোয়ালে ঝুলিয়ে থমথমে মুখে বললো,
–“জবাকে খাবার আনতে বলছি। খেয়ে তৈরি হবে। তোমায় ডাক্তার দেখিয়ে আমায় অফিসে যেতে হবে। ডাক্তারের কাছে গেলে তো আর সহজে বের হওয়া যায় না।”
ইমরোজ দরজা খুলে হাঁক ছেড়ে জবাকে ডাকলো।
মৌনতা নিষ্প্রাণ, নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে জানালার পানে। হিসেব কষতে থাকে ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে ছিঁড়ে যাবে তাদের সম্পর্কের এই গাঁট। নাকি তার ভাবনার থেকেও বিদঘুটে সমাপ্তি পরিকল্পনা করে রেখেছে সৃষ্টিকর্তা?
মেয়েদের স্বামীর একনিষ্ঠ হয়ে বাঁচতে হয় তবেই নাকি সংসার সুখের হয়, মায়ের মুখে এই কথাটি শুনে শুনে বড় হয়েছে। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে পালন ও করেছে, ভালোবেসেছে স্বামী নামক মানুষটাকে। কিন্তু তার প্রতিফল সৃষ্টিকর্তা তাকে এভাবে দিচ্ছে কেন?

সকাল আটটার দিকে পরিবারের সকলে নাস্তার জন্য টেবিলে জড়ো হয়। রূপকথা নাস্তা বানাচ্ছে এবং রোজ আর জবা টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখছে একে একে।
নির্জনা বেগম অলস কদমে হাঁটতে হাঁটতে রান্নাঘরে ঢুকলো। রূপকথাকে একা হাতে নাস্তা বানাতে দেখে খানিক প্রসন্ন হয়। ঠিক এই রূপেই তো সে সর্বদা দেখতে চায়। কিন্তু পড়াশুনা নামক এই অপসংস্কৃতি যতদিন থাকবে সে কখনোই একটা দায়িত্ববান পুত্রবধূ পাবে না।
–“এইসব অপসংস্কৃতি কবে থেকে বন্ধ হবে?”
আচমকা শাশুড়ির প্রশ্নে রূপকথা চমকে পিছু ফিরে তাকায়। নির্জনা বেগমের তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে অপ্রস্তুত শুধায়,
–“জি আম্মা?”
–“তোমার এইসব অপসংস্কৃতি কবে বন্ধ হবে?”
–“কিসের অপসংস্কৃতি?”
–“বুঝতে পারছো না? আমি তোমার পড়াশুনার কথা বলছি? এই একটা কারণই তো আমার সংসারটাকে এলোমেলো করার জন্য যথেষ্ট।”, নির্জনা বেগমের শানিত কণ্ঠে রূপকথা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
ইদানিং তার ভয় লাগে না এই মানুষটাকে বরং অবাক হয় একজন শিক্ষিত মানুষ এতটা বিদঘুটে চিন্তধারা লালন করে কিভাবে? এটার পেছনে এমন কি কারণ আছে?”
সে বিনা ইতস্ততার সাথে বলল,

–“আপনার ছেলে যতদূর পড়াবে আমি ততদূর-ই পড়াশুনা করব।”
–“আমার ছেলে তোমায় আজীবন পড়াশুনা করাবে, তাই বলে কি তুমি আজীবন পড়াশুনা করবে?”
–“নাহ, আমি ডাক্তার হতে চাই। সেই পর্যন্ত পড়াশুনা করালেই হবে।”
রূপকথার সাহসী স্পষ্ট কণ্ঠে নির্জনা বেগমের ভ্রু টানটান হয়ে এলো। চোখেমুখে ঘোর বিরোধ!
–“ডাক্তার হওয়া কি সহজ মনে হয় তোমার কাছে? অর্ধেক জীবন কাটিয়ে দিতে হয় কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। নাওয়া খাওয়া ঘুম বাদ দিয়ে পড়াশুনা করে তারপর গিয়ে একজন ডাক্তার হতে পারে। আর তা করতে গেলে তুমি সংসার করবে কবে?”
–“সংসার করেও ডাক্তার হওয়া যায়, আম্মা।”, রূপকথার দৃঢ় কণ্ঠে নির্জনা বেগম সূচালো কণ্ঠে বললেন,
–“তারমানে তোমার একমাত্র লক্ষ্য কোনোমতে সংসার করে ডাক্তার হওয়া তাই তো?”
–“দু’টো একসাথে যথাযথভাবে করব।”
–“তোমার তো ধ্যানজ্ঞান পড়াশুনা আর কোনোমতে সংসার করা। কিন্তু তপোবনের যে বয়স হচ্ছে, তানশানের বয়স হয়েছে। সে খেয়াল আছে? তপোবনের তো বাবা হওয়ার অধিকার রয়েছে তাই না? নাকি তুমি এই অধ্যায় ভুলেই গিয়েছো?”
রূপকথার শির নত হয়ে আসে। মিহি স্বরে বলে,

–“ভুলিনি।”
–“কিন্তু তোমার কর্মকাণ্ডে এটাই প্রকাশ পাচ্ছে।তপোবন শান্তশিষ্ট বলে তুমি ওকে ম্যানিপুলেট করে যেভাবে সেভাবে সংসার করে যাবে, তারপর উদ্দেশ্য হাসিল হলে ঘর সংসার ছেড়ে দেবে তাই তো?
রূপকথা স্তব্ধ হয়ে গেল বিদঘুটে সেই কটুক্তিতে। অবাকপানে তাকায় সম্মুখের বিজ্ঞ মানুষটার দিকে। বিয়ের প্রথম দিন থেকে সে তো কখনো সম্পর্ক, দায়িত্ব থেকে পালায়নি বরং সবটা কাঁধে তুলে নিয়ে আগাতে চেয়েছে। তবে কেন কথায় কথায় সংসার থেকে পালানোর অভিযোগ ওঠে তার উপর? নাকি ব্যথাতুর অতীত এখন তার অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাবা চলে যাওয়ায় যেখানে মানুষের সহমর্মিতা পাবে সেখানে বরাবরই তারা ঘৃণা পেয়েছে। চরিত্রহীন হওয়ার সেই ভ্রান্ত ঘৃণা বোধহয় এখন সংসারজীবনেও বয়ে চলতে হবে। সকলে কেন ভাবে, তার বাবার মতো সেও মাঝপথে সংসার ছেড়ে চলে যাবে?
কেন মানুষগুলো অতীত টেনে আঘাত দেয়? সে তো এগুলো কখনো কল্পনাও করতে পারে না তবে কেন মুখ বুজে মেনে নেবে?
রূপকথা মোটেই মুখ বুজে সহ্য করে না।

–“দয়াকরে আমায় নিয়ে এত ঘৃণ্য মন্তব্য করবেন না, আম্মা‌। ভাগ্য যখন আমায় এই পর্যায়ে এনেছে, তখন সেটা আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পালন করে যাবো।”
–“তবে সম্পর্ক আগাও না কেন? নাকি পড়াশুনা শেষ করে মা হয়ে, তানশানকে হাসির পাত্র বানাতে চাও?”
নির্জনা বেগমের রুক্ষ কণ্ঠে রূপকথা থমথমে মুখে বলল,
–“সম্পর্ক আগাতে গেলে আপনার ছেলে স্কেল তোলে। আমার কোনো আপত্তি নেই সম্পর্ক আর দায়িত্ব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার। বরং প্রথম দিন থেকে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি ভাগ্যকে হাসিমুখে মেনে নেয়ার।”
নির্জনা বেগম কপাল কুঁচকে নিলেন স্পষ্ট কণ্ঠে। অবাক কণ্ঠে শুধায়,
–“তপোবন তোমার গায়ে হাত তোলে?”
রূপকথা জবাব দিলো না চোখে চোখ রেখে বলল,
–“সম্পর্ক নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা না থাকলেও, আপনার ছেলের রয়েছে। তাই এই কথাগুলো তাকে বললে ভালো হবে, আম্মা। আসছি, তানশানের টিফিন গোছাতে হবে।”
রূপকথা গটগট করে বেরিয়ে যায় রান্নাঘর থেকে। চোখ তার টলমলে, সংসারের মাঝে নিজেকে এতটা বিলিয়ে দেয়ার পরেও কি এত ঘৃণ্য মন্তব্য তার প্রাপ্য?
কেউ তো একবার বোঝার চেষ্টা করে না তার ও মন রয়েছে, ক্লান্তি রয়েছে, কত কত অপূর্ণ স্বপ্ন রয়েছে। তার ও ইচ্ছে হয় মুক্ত আকাশে স্বাধীনভাবে উড়তে! কিন্তু তা যে এ জীবনে আর সম্ভব নয় তাও সে জানে। তাই তো যা আছে তাই আঁকড়েই হাসিমুখে বাঁচতে চায়।
ইমরোজ নিচে নেমে আসলে রোজ চঞ্চল কণ্ঠে শুধায়,

–“ভাইজান মৌন বউ কোথায়? আজ সে নিচে নামেনি কেন?”
ইমরোজ চেয়ার টেনে বসে বলে,
–“মৌনতার জ্বর, রেস্ট নিচ্ছে। ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাব, তুই নায়েলকে রাখবি।”
নির্জনা বেগম চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
–“সে কি জ্বর আসল কখন? মেয়েটার শরীর দিনদিন কেমন ভেঙে যাচ্ছে ইমরোজ। ইমরোজ তোমার তো উচিৎ ছিল আরো আগে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া।”
–“ডাক্তারের কাছে আমাকেই কেন নিয়ে যেতে হবে আম্মা?”
ইমরোজের বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে নির্জনা বেগম থমথমে মুখে বললেন,
–“কারণ তুমি ওর স্বামী। তোমার স্ত্রীর দেখভাল তুমি ছাড়া কে করবে? নায়েলের চিন্তা করোনা। ওকে আমরা রাখতে পারব। তুমি মেজো বউমাকে নিয়ে গিয়ে ভালোকরে ডাক্তার দেখিয়ে আনো। মেয়েটার শরীর কেমন ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে।”
–“নায়েল কোথায় রোজ?”

ইমরোজ খাবার নিতে নিতে বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে শুধায়। এমনি সময় তাকে আগ বাড়িয়ে কিছু করতে হয় না। মৌনতা খাবারটুকু পর্যন্ত পাতে সাজিয়ে রাখে। মেজাজ আরো বিগড়ে গেল। একে তো ভাইজানের কারণে সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল উপরন্তু মৌনতার অসুস্থতা। মৌনতা অসুস্থ থাকলে মনে হয় ঘরটা পঙ্গু হয়ে গিয়েছে। ইচ্ছে হয়না ঘরে আসতে!
“ছোট ভাইজানের কাছে।”
ইমরোজের হাত থেমে গেল। আশ্চর্যের সাথে শুধায়,
–“এরোজের কাছে?”
–“হুম, তারকাছেই ঘুমিয়েছিল।”
রোজ নিরুদ্বেগ কণ্ঠে ইমরোজের চোখেমুখে চিন্তা ছেয়ে গেল। নায়েল যে এরোজকে এড়িয়ে চলে, ভয় পায়। সে খানিক রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“এরোজের কাছে রেখেছিস কেন ওকে? তুই জানিস না ওকে ভয় পায় নায়েল? আস্ত এক মাতালের হাতে তুই আমার মেয়েটাকে একা ছেড়ে এখানে বসে আছিস?”
দোতালা থেকে ব্যস্ত কদমে নামতে থাকা তপোবন তৎক্ষণাৎ ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,

–“এরোজ মাতাল হোক আর যাই হোক কিন্তু নায়েল আর তানশানের ব্যপারে সে অন্য এক মানুষ, ইমরোজ। ওর দ্বারা নায়েল কিংবা তানশানের কোনো ক্ষতি হবে এটা অবিশ্বাস্য। খাওয়া শেষ কর। নায়েল ঠিক আছে এতো চিন্তার কিছু নেই।”
ইমরোজ ফিরে তাকায় ভাইয়ের দিকে। গমগমে স্বরে বলে,
–“সেটা তোমার মনে হতে পারে, ভাইজান। কিন্তু আমি এরোজকে ভালো করে চিনি। ও যখন উগ্র আচরণ করে তখন বাচ্চা বড় ভুলে যায়। আমি নায়েলকে আনতে যাচ্ছি।”
বলেই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তবে সিঁড়ি পর্যন্ত এগোতেই দেখতে পেলো নায়েল আর এরোজ নামছে। এরোজের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে আছে নায়েল। নির্জনা বেগম সহ তকদির সিকদার বেশ অবাক হলো এরোজকে এতো সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেখে তাও আবার এত সতেজতার সাথে।
ইমরোজ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে এরোজের দিকে। ভাইয়ের প্রতি ক্রোধের রেশ এখনো তার চোখেমুখে। সে রুক্ষ স্বরে বলল,
–“নায়েলকে আমার কাছে দে।”
নায়েলকে আঁকড়ে ধরা এরোজের হাত দু’টো শিথিল হয়ে হয়ে গেলো ইমরোজের কথায়। বুকে জড়িয়ে রাখার মতো সামর্থ্য না থাকায় নীরবে নায়েলকে বাড়িয়ে দেয় ইমরোজের দিকে। ইমরোজ হাত বাড়ালেই তাকে অবাক করে দিয়ে নায়েল নাকোচ করে উঠল এবং আরও দৃঢ়ভাবে এরোজের গলা জড়িয়ে ধরে। ইমরোজের কপালে ভাঁজ দৃঢ় হয়। সে থমথমে মুখে বলে,
–“নায়েল, পাপার কাছে আসো।”
নায়েল এরোজকে আরো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলো। মনে পড়ে গতকাল রাতে বাবার ধমক, উচ্চস্বরে কথা। সে মিনমিন করে বলল,

–“না, আমি যাবো না তোমাল কাছে। আমি ছোট পাপাল কাছে থাকব।”
জীবনে প্রথম কেউ নিঃসঙ্গ এরোজের হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য জেদ করলো। ভীষণ দৃঢ় কণ্ঠে এই প্রথম এরোজের মনে হলো সে একদম নিঃস্ব নয়।
ইমরোজ কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“নায়েল জেদ করবে না, পাপার কোলে এসো।”,
এরোজ কপাল কুঁচকে শানিত দৃষ্টিতে তাকায় ইমরোজের দিকে। গম্ভীর গলায় বলে,
–“ধমকাচ্ছিস কেন ওকে? ঠিকভাবে বলা যায় না?”
–“আমার মেয়ে আমি বুঝে নেবো কিভাবে কথা বলতে হবে।”, ইমরোজ খেকিয়ে উঠল। কণ্ঠে তার পিতৃসুলভ অধিকারবোধ। ঠিক ঐ জায়গা থেকেই এরোজ ফের মুখ থুবড়ে পড়ল। আগলে রাখার মতো কোনো অধিকার নেই তার।
সে ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলে নায়েলের পিঠে হাত বুলায়। নম্র সুরে বলে
–“পাপার কোলে যাও। ছোট পাপা বাইরে যাবো।”
কিন্তু এবারেও নায়েল যেতে নারাজ। মিনমিনে স্বরে বলল,
–“না, যাবো না। পাপা বকা দেয়।”
–“তুমি জেদ করলে পাপা তোমায় বকা দেই। পাপার কথা শুনলে তো আর তোমায় বকা দেইনা।”, বলেই ইমরোজ কিছুটা জোরপূর্বক নায়েলকে নিজের কোলে নিয়ে নেয়। বাবার কোলে গিয়ে নায়েল একদম চুপসে গেল। শক্ত হয়ে বসে রইল। বাচ্চারা সাধারন ভালো আচরণ এবং যেখানে ভালোবাসা প্রিয় সেদিকে আকৃষ্ট হয়। ইমরোজ পিতৃসুলভ জায়গা থেকে তাকে বকলেও ইদানিং তার কণ্ঠে রুক্ষতা বেশি থাকে। মূলত এর জন্যই নায়েল তাকে ভয় পাচ্ছে। এরোজ এক পলক নায়েলকে দেখে খেতে বসে।

নৈমি আর নূর কপাল কুঁচকে তাকালো তৃশানের দিকে। বরাবরের ন্যায় একই জবাব দিয়ে ফের বলল,
–“আমাদের কাছে রূপকথার নাম্বার নেই।”
তৃশান সরু নেত্রে অবলোকন করে দু’জনকে। চেহারায় স্পষ্ট দু’জন মিথ্যা বলছে। সে থমথমে মুখে বলল,
–“তোমরা জানো আমি কে? তোমাদের প্রিন্সিপালের ছেলে। নাম্বার দেবে নয়তো আজকের পর থেকে শান্তিতে পড়াশুনা করা তো দূরের কথা, পরীক্ষায় পাশ করা দুস্কর হয়ে যাবে। এখন তোমরা ভাবো কি করবে?”
নৈমি আর নূর ফাঁকা ঢোক গিলে একে অপরের দিকে তাকায়।
যশোর খুব নিকটে খুলনা থেকে। তপোবন দুপুরের পর বের হবে তার আগে অফিসে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করতে হবে।
রূপকথার আজকেও সিটি রয়েছে। সারারাত ভর পড়ে পরীক্ষা না দেয়ার কোনো মানে হয় না। তাই আজও তপোবন— রূপকথা আর তানশানকে স্কুল কলেজ বন্ধ দিতে দেয়নি।
ভরা ক্লাসের সকলে তাকিয়ে আছে রাগান্বিত সুনেহরার দিকে। দুই ক্লাস ফিলোর পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে তারা আনন্দ নিচ্ছে। অদূরে বইয়ে মুখ গুঁজে আছে তানশান নামক মেইন কালপ্রিট। কেননা সংঘর্ষ তাকে ঘিরেই। তবে এতে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। তাকে দেখে মনে হবে সে বর্তমানে পৃথিবীতে নয় মঙ্গলগ্রহে রয়েছে।
লাবিবা ক্রুব্ধ চোখে তাকায় সুনেহরার দিকে। রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“তানশান শুধু তোর একার ক্লাস ফিলো না, আমাদের ও ক্লাস ফিলো। আমরা ও তার সাথে পড়াশুনার জন্য আলাপ আলোচনা করতে পারব। তুই আমায় বাঁধা দেয়ার কে?”
সুনেহরা পাল্টা রাগান্বিত স্বরে চেঁচিয়ে উঠে বলল,

–“আমিই তো সব। টমাটু মানেই আমি, আমি মানে টমাটু। তুই ওর কাছে পড়া নিয়ে ডিসকাস করবি কেন? তোর যে এত এত কোচিং, টিউশন টিচার সব কি ঘাস খায়? নাকি আমার ভোলাভালা টমাটুকে দেখে জিভে জল চলে এসেছে পেত্নি কোথাকার! এই লিপস্টিক, সাজগোজ ওর জন্যই না? তোকে দেখাচ্ছে কেমন জানিস? স্টার জলসার কিরণ মালা সিরিয়ালের কটকটির মতো!
আমার টমাটুর চোখে সুনেহরা নামক পর্দা টানা। তোর এইসব কাল জাদুতে ওর মন গলবে না। আর একবার ওর দিকে তাকালে চোখে সরষে ফুল দেখিয়ে ছাড়ব আমি। আমার টমাটুর থেকে দূরে থাকবি। ওর কাছে কোনো পড়া জিজ্ঞাসা করতে পারবি না।”
বলেই সুনেহরা গটগট করে হেঁটে চলে যায়। লাবিবা রাগে হাতের খাতাটা ছুঁড়ে মেরে তানশানের দিকে তাকায়। যে কি-না নিরবে বই পড়ে যাচ্ছে। তার কাছে তানশানের এই নীরবতাকে নীরব সমর্থন মনে হলো!
নিজের রাগ সামলে সুনেহরা কিছুক্ষণ বাদ ফিরে আসে। তানশানের সামনে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়ায়। তিরিক্ষি মেজাজে বলে,

–“এসব করতে ভালো লাগে তাই না? মেয়ে মানুষকে পড়া দেখিয়ে দিতে আনন্দ লাগে? খুব দয়া ঐ লাবিবার উপর? একদম ধরে ধরে পড়া বুঝিয়ে দিতে হবে? টিচার হওয়া হচ্ছে? কই আমায় তো কখনো কিছু শেখানো তো দূর, চোখ তুলেও তাকানো হয় না! আমি কত কষ্ট করে রোজ সকালে এক ঘন্টা করে সময় নষ্ট করে সেজেগুজে আসি। লাল লাল বিশ্রী লিপস্টিক দেই শুধু তোর জন্য! নিজেকে মঞ্জুলিকা লাগে তবুও দেই। তা তো কখনো দেখিস না। আর যদি কখনো দেখেছি কাউকে পড়া দেখাতে, তো খবর আছে টমাটু বলে দিলাম।”
রাগ ঝেড়ে সুনেহরা ফুঁসতে ফুঁসতে চলে যায়। সে চলে যেতেই বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা গম্ভীর মুখের ছেলেটির গাম্ভীর্যতা ভেদ করে আলতো হাসির রেখা ফুটে ওঠে‌।
হাত বাড়িয়ে ছুঁড়ে মারা চিরকুটটি দ্রুত বইয়ের ভাঁজে ঢুকিয়ে রাখলো। সুনেহরা নামক রাগান্বিত চঞ্চল রমনীটি দেখলো না সেই লুকোচুরি আর হাসি।
বিবাহের প্রায় দেড় মাস। রূপকথার জীবনে পরিবর্তনের নামে বিপর্যয় হয়ে আসে কিছু ঘটনা। তন্মধ্যে একটি ঘটনা আজ ক্লাসরুমে ঘটে। অচেনা এক ক্লাস ফিলো এসে রূপকথার পাশে বসে। বসেই কিছুক্ষণ বাদ মেয়েটি পরিচয় ছাড়া অদ্ভুত এক প্রশ্ন করে।

–“তোমার কাছে ভালোবাসা মানে কি?”
রূপকথা কিয়ৎকাল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল অপরিচিত মেয়েটির পানে। অতঃপর ভাবনাচিন্তা ছাড়া বলে,
–“আমার স্বামী আর সন্তান।”
মেয়েটির চোখেমুখে বিস্ময় ছুঁয়ে যায়। মৃদু বিস্ময় নিয়ে শুধায়,
–“তুমি বিবাহিত?”
–“হুঁ।”
–“বাচ্চা আছে?”
রূপকথা হেসে বলল,
–“আমার ছেলে আমার সমান লম্বা।”
মেয়েটি তখন অদ্ভুত হতভম্ব ভাব নিয়ে একটি চিরকুট এগিয়ে দেয়। বলে,
–“এটা খোলো।”
রূপকথা কৌতুহলী হয়ে খুললো চিরকুটটি। গোটা গোটা অক্ষরে কিছু পরিচিত শব্দের বুনন হলেও তার মাথায় ঠিক আট’লো না সেই কথার মানে। তার মাথায় ইদানিং সংসার, স্বামী সন্তান ব্যতীত কিছুই চলে না। তাই সংসারের চাপে পুরোনো কিছু অভিজ্ঞতা সে ভুলেই গিয়েছে।
–”অ’স’ভ্য এই ছেলেটা ফেইরিটেইল থেকে নাহয় সভ্যতা শিখে নেবে। ফেইরি কি আজীবন এই অ’স’ভ্য ছেলেটাকে সভ্যতা শেখাবে?”
রূপকথা সেটি পড়ে মেয়েটির দিকে তাকায়। শুধায়,

–“এটা কি?”
মেয়েটি কৃত্রিম হেসে বলল,
–“এটা আমার জন্য আসা এক চিরকুট। আমি কি জবাব লিখব বুঝতে পারছি না। তুমি কি আমায় একটু সাহায্য করবে? চিরকুটটির জবাব না দিলে বিপদ হয়ে যাবে আমার!
রূপকথাকে মেয়েটি জোরাজুরি করতে লাগলো। মেয়েটির জোরাজুরিতে রূপকথা একটা জবাব লিখে দিলো। মেয়েটি তা নিয়ে একপ্রকার দৌড় দিলো। তার গতিরোধ হয় ঠিক তৃশানের মজলিসে!
থমথমে মুখে চিরকুটটি এগিয়ে দিতেই তৃশান সেটি নিয়ে তেরছা চোখে তাকায়। সন্দিগ্ধ গলায় শুধায়,
–“এত তাড়াতাড়ি মেনে গেলো কি করে? আমি তো আশা করেছিলাম কটা গালি লিখে পাঠাবে। আর আমি সেই গালিকে আই লাভ ইউতে পরিণত করব। কিন্তু একি! কোনো চালাকি করিসনি তো? তাহলে তোর ঐ ভিডিওর রফাদফা করে দেবো আমি!”
নাফিসা ডানে বামে মাথা নাড়লো। রাগান্বিত স্বরে বলে,
–“আমার কাজ ছিল চিরকুটের জবাব আনা, আমি এনেছি। এখন আপনার কাজ আপনি করুন। ভিডিও ডিলিট করুন।”
তৃশান ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,

–“তারমানে আসলেই ভিডিও আছে? তুই কি দেখলি ঐ ফাঁকা কুমড়োর মাঝে? কোনো ভিডিও নেই আমার কাছে, ডিলিট কি করব? আমার এত খারাপ দিন আসেনি যে কারোর ভিডিও নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হবে। যা ভাগ! একটুখানি মেয়ের আবার ভিডিও! কলেজে আসিস কি করতে?”
তৃশানের কথায় মেয়েটি রাগে দুঃখে ফেটে পড়লো। তাকে হুমকি দিয়ে চিরকুট নিয়ে পাঠিয়েছিল। চিরকুটের জবাব না আনলে ভিডিও লিক করে দেবে।
তৃশান থমকানো দৃষ্টিতে দেখতে লাগল চিরকুটটি! সে মেয়েটিকে জ্বালাতে আর তার রাগান্বিত মুখটি দেখার জন্য এই প্রাঙ্ক করেছিল, কিন্তু এই জবাব?
–”যদি ফুরসৎ মিলে তো সভ্যতা কেন, এক আকাশ পরিমাণ ভালোবাসার গীত শিখিয়ে দেবো। শুধু অজশ্র অবহেলিত সময় বরাদ্দ করতে হবে আমার নামে।”
ঠোঁটের কোনা কিঞ্চিৎ বেঁকে যায় তৃশানের। চিরকুটটি পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে বিড়বিড় করে বলে,
–“ভালোবাসার গীত শিখতে হলেও রূপকথার রাজ্যে যেতে হবে! সাথে করে নিয়ে যাবো অজশ্র অবহেলিত সময়!”
কান পেতে বসে থাকা মৃদুল আর মৃদুলা সহসা হৈ হৈ করে উঠল,
–“বন্ধু আমগো‌ ফাইসা গেছে!”

তৃশান তেরছা হাসলো! ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে লম্বা লম্বা পা ফেলে মজলিস ত্যাগ করে! মেয়েটিকে ভীষণ ভালোলাগে তার, তারচেয়েও ভালোলাগে তার বোকাসোকা রাগান্বিত মুখ।
পিচের রাস্তা দাপিয়ে বেড়ানো অডি কার’টি আজ যেন তার চালকের উদাসীনতায় নিজেও উদাসীন হয়ে পড়েছে। নিম্ন গতিতে চলমান গাড়িটির ফ্রন্ট সিটে থাকা মানব মানবী একদম নিশ্চুপ, নীরব।
ইমরোজের কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে আছে মৌনতা। দৈহিক যন্ত্রণা, অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণার কাছে হার মেনে নুইয়ে পড়েছে তার দেহ। আর ইমরোজ! তার চেহারায় ঘোরাফেরা করছে মনমরা ভাব। কোনকিছু নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন সে।
–“ডাক্তার রিপোর্ট কবে দেবে?”, মৌনতার প্রশ্নে ইমরোজ হতচকিত স্টিয়ারিংয়ের হাতটি আরো জোরদার করলো। মৌনতার দিকে এক পলক ব্যস্ত দৃষ্টি ফেলে শুধায়,

–“কি বলেছো?”
–“ডাক্তার রিপোর্ট কবে দেবে?”, মৌনতা পুনরায় বলল। ইমরোজ গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
–“জানিনা, ডাক্তার তো বলল সময় লাগবে।”
স্বামীর নম্র ভাবে মৌনতার বড্ডো সুখ অনুভব হলো। সে বদ্ধ নেত্র খুলে তাকায় ইমরোজের মুখপানে। মানুষটা সুদর্শন! প্রথম যেদিন দেখেছিল সেদিন কোনো অনুভূতি না হলেও বিয়ের পর মুহুর্ত থেকে এই মুখশ্রীতে সে সুখ খুঁজে পায়।
আজ বহুদিন বাদ মৌনতা একটু আবদার করে ইমরোজের কাছে। মিহি স্বরে বলে,
–“ছোট ভাইজানের কাছে একটা চকলেট থাকে সেটা অনেক মজা। ভেতরে স্ট্রবেরি আর অনেক বেরি থাকে। নায়েল আর আমার ওটা খুব পছন্দ। আপনি একটু ছোট ভাইজানকে বলে ওগুলো বেশি করে আনিয়ে দেবেন?”
–“এরোজ?”, ইমরোজ কপাল কুঁচকে ঘাড় কাত করে তাকায় মৌনতার দিকে। মৌনতা তার কাঁধ থেকে মাথা তুলে, হাসিমুখে মাথা নাড়ে। ইমরোজ সামনের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল,
–“ওকে টাকা দিলেই তো ও এনে দেয়। আমার বলার কি প্রয়োজন?”
মৌনতা সরব চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“তার আশেপাশে যেতেই তো ঘরের সবাই ভয় পায়। আমি অনেকবার রোজকে দিয়ে টাকা পাঠিয়েছিলাম। সে টাকা তো নেয় না, আর চকলেট কোত্থেকে আনে সেটাও বলেনা। তাহলে তো খালামনিকে বলতাম পাঠিয়ে দিতে। রোজ রোজ তার কাছে গিয়ে হাত পাততে বিরক্ত লাগে না?”

–“ঐ চকলেট খেতেই বা হবে কেন? নায়েল হলে বুঝতাম! কিন্তু তুমি? বুড়ি একটা মহিলা! চকলেটের জন্য এমন হা- হুতাশ করছো কেন?”, ইমরোজ কপাল কুঁচকে বললো। চেহারায় তার বিরক্তি ভাব।
–“আমি বুড়ি?”, মৌনতা চোখমুখ কুঁচকে শুধায়। ইমরোজ তাকায় ভঙ্গুর, অনুজ্জ্বল বিতৃষ্ণা ভরা মুখটির দিকে। মৃদু হেসে শান্ত স্বরে বলল,
–“ইউ আর নাউ থার্টি! বুড়ি হয়ে গিয়েছো তুমি।”
–“এর জন্যই এখন আর আমাকে ভালো লাগে না, তাই না?”, মৌনতা ম্লান হেসে শুধায়।
ইমরোজ মৃদু থমকালো। দৃষ্টি অস্থির! মৌনতা ইদানিং প্রায়শই এমন কথা বলে, তবে কি ও কিছু সন্দেহ করছে? কেমন ঘেমে উঠলো ইমরোজ। মৌনতা যদি সৃজার ব্যপারে কিছু জেনে যায়—তবে সেটা তার জন্য বিপদ। পুরো পরিবার সহ প্রপার্টি তার হাতের বাইরে হয়ে যাবে। এমনটা হতে দেয়া যাবে না। সবকিছু স্মুথলি হ্যান্ডেল করতে হবে। সে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“ভালো লাগা বা না লাগায় কিছু কি যায় আসে? তুমি আমার স্ত্রী এটাই তো একমাত্র সত্য, তাই না?”
–“তারমানে ভালো লাগে না তাই তো? স্ত্রী বলে বাধ্য হয়ে বয়ে চলছেন?”
–“কথা প্যাঁচানো কেউ তোমার থেকে শিখুক। সবসময় এমন টপিকে কেন কথা বলো? একটু সুন্দর কিছু বলা যায় না?”
–“আমার জীবনে সুন্দর বলে কিছুই নেই। তাই মুখেও সুন্দর কিছু আসে না।”, মৌনতা ম্লান কণ্ঠে বলল।
ইমরোজ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলে,
–“চকলেটে ছিলে, সেখানেই থাকো। এরোজকে বলবো। দেখি তোমার মাতাল , বখাটে দেবর শোনে কি-না!”
মৌনতা সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে উদাসীন কণ্ঠে বলে,
–“একটা মানুষ এতটা বিগড়ে যায় কিভাবে? কাউকে মান্য করা তো দূরের কথা, আঘাত করতেও দ্বিধাবোধ করে না। আপনারা তার বড় ভাই, শুরু থেকেই যদি বিষয়টাকে গুরুত্বসহকারে নিতেন, তবে লোকটা এতোটা উচ্ছ্বন্নে যেতে পারত না।”
–“ওটা ছোট থেকেই রগত্যাড়া, রাগি। কারোর কথা শোনেনা ভাইজান ছাড়া। কিন্তু ভাইজানই শুরু থেকে ওকে সিমপ্যাথি দেখিয়ে আসছে। যার ফল আজ তারা ভুগছে, সাথে আমরাও।”, ইমরোজ রাগ ঝেড়ে বললো। বাকি পথটুকু মৌনতা নীরব রইলো। কেননা মুখ খুললেই তো বেরিয়ে আসে অভিযোগ, প্রশ্নরা যেগুলো লোকটা কত সুন্দর করে এড়িয়ে যায়।
কিন্তু ইমরোজের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে অন্য এক বিষয়। সে তেরছাচোখে দেখে একবার মৌনতাকে। তার দেখা মৌনতা আর এই মৌনতার মাঝে বিস্তর ফারাক। মানুষ হিসেবে নয় চেহারা দিয়ে। আগের মৌনতা ছিলো উজ্জ্বল বর্ণের, চেহারার লাবণ্য সবকিছু মিলিয়ে আকর্ষণীয় এক নারী ছিল চেহারায় মলিনতার ছাপ ছিল না। কিন্তু এই মৌনতা? এটা যেন ঠিক চর্মের প্রলেপনে ঢাকা এক কঙ্কাল। নেই কোনো সৌন্দর্য!
মৌনতাকে বাড়িতে ড্রপ করে ইমরোজ অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
মৌনতাও বাড়িতে এসে একটা থমথমে পরিবেশ পায়। জবা আর মাজেদা চাচি ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকায় তার পানে। শাশুড়িকে দেখে দেখে অভিজ্ঞ মৌনতার বুঝতে সময় লাগেনি, শাশুড়ির অমর্ষতার স্বীকার হতে হয়েছে সকলকে। তাকেও উপেক্ষা করতে হয় শারীরিক অসুস্থতা। শাশুড়িকে রাগে ফুঁসতে দেখে শুধায়,

–“কিছু হয়েছে আম্মা?”
নির্জনা বেগম কঠিন দৃষ্টি তুলে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তোমার বড় জা এর কান্ডকারখানা দেখছি মেজো বউ মা। আজ তার স্বামী যশোরে যাবে, তুমি অসুস্থ ডাক্তারের কাছে যাবে আর সে এই ভরা এলোমেলো সংসার ফেলে নাচতে নাচতে কলেজে গিয়েছে। কেন আজ একদিন কলেজে না গেলে কি হতো? সাড়ে বারোটা বাজে অথচ ঘরে রান্নাবান্না কিছু হয়নি। কতবড় দায়িত্বজ্ঞানহীন মেয়ে ভাবো! স্বামী বলেছে বলেই তাকে কলেজে যেতে হবে? তার নিজের কোনো বোধবুদ্ধি নেই— যে আজ ঘরের কি পরিস্থিতি?”
নির্জনা বেগম চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন। মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছু না বলে সোজা উপরে যায়। নিজের ঘর থেকে পোশাক বদলে বের হতেই নায়েল সহ রোজের দেখা পায় সে। নায়েল মাকে দেখতেই ঠোঁট উল্টাতে লাগল রাগে, অভিমানে।
মৌনতা ম্লান হেসে মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। নায়েল নাকোচ করে জেদি কণ্ঠে বলল,
–”না, আমি যাবো না তোমাল কাছে। তুমি আল পাপা পঁচা। আমায় লেখে ঘুমাও, আমায় লেখে বেড়ু করতে যাও। তোমলা ভালো না, ছোট পাপা ভালো। সে আমায় আদল কলে, ঘুম পালায়, বাহিলেও ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল।”
রোজ আদুরে স্পর্শে নায়েলের গাল টিপে, মৌনতাকে বলল,

–”মৌন বউ, নায়েল দুদিনেই ছোট ভাইজানের ফ্যান হয়ে গিয়েছে। সে কি আর বোঝে, মায়ের বাধ্যবাধকতা! তার তো শুধু সবার থেকে আদর আর ভালবাসা চাই।”
মৌনতা উদাসীন দৃষ্টিতে তাকায় রোজের দিকে। আর কেউ জানুক বা না জানুক, রোজ জানে বিয়ের পর দিন থেকে তাকে কিভাবে এই ঘর, সংসার সহ ইমরোজকে মেইনটেইন করে চলতে হয়। রোজ তাকে চোখে আশ্বস্ত করে। সেও জানে মৌনতা ভালো নেই। এর জন্য কম খোঁচায়নি সে মৌনতাকে। কিন্তু সে কখনোই কিছু বলেনা। রোজ ভাবলো বড়ো ভাইজানের সাথে কথা বলবে। তার দ্বারা মৌন বউয়ের কষ্ট সহ্য হয় না।
রোজের কাঁধ জড়িয়ে শুয়ে থাকা নায়েলের পিঠে আলতোভাবে মাথা রাখে মৌনতা। মিহি স্বরে বলে,
–”মাম্মা অসুস্থ মা! ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলাম। তুমি তো জানো সেখানে সবাইকে কত বড় বড় সুঁই দিয়ে গুঁতো দেয়। তুমি তো সুঁই কে ভয় পাও, তাই তোমায় নিয়ে যাই নি। মাম্মা স্যরি, মা! মায়ের কাছে এসো।”
নায়েল জানে ডাক্তারের কাছে বড় বড় সুঁই রয়েছে। তাকে একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল মা-বাবা তখন এমনি গুঁতো দিয়েছিল। নিমিষেই তার রাগ উবে গেল।
সে ঝাঁপ দিয়ে মায়ের কোলে চলে যায়। রোজ মলিন হেসে বললো,

–”সেই সকাল থেকে ছোট ভাইজানের কাছে ছিল। ভাইজান ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল। ডিম ও খাইয়েছে। ভাবতে পারছো?”
রোজের শেষের কথায় বিস্ময়। একই বিস্ময় মৌনতার চোখেমুখেও দেখা গেল। কেননা নায়েলকে তারা ধরে বেঁধেও ডিম খাওয়াতে পারে না। সে বিস্ময় নিয়ে শুধায়,
–”কি বলো রোজ? ও ডিম খেয়েছে?”
–”আমার চোখের সামনে খেয়েছে, মৌন বউ। আর একটুও ঝামেলা করেনি। ভাইজান দিয়েছে আর সে খেয়েছে।”
মৌনতা শানিত দৃষ্টিতে তাকায় মেয়ের দিকে। থমথমে মুখে বলে,
–”মা আহ্লাদ দেই দেখে কি মায়ের সাথে দুষ্টুমি বেশি করো?”
নায়েল জবাব দেয় না সে ছোট ছোট চোখে তাকায় মায়ের দিকে। মৌনতা মেয়েকে নিয়ে নিচে নামে। রোজ ও তাদের সাথে পা মিলিয়ে শুধায়,
–”ডাক্তার কি বলেছে, মৌন বউ?”
–”রিপোর্ট দেয়নি, রোজ। কত গুলো টেস্ট করালো! বলেছে রিপোর্ট দিতে দেরি হবে।”, মৌনতা পা টেনে টেনে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলল।
–”দেখেছো? অসুখ জমতে জমতে কত রোগ জমা হয়েছে? এরপরেও শরীরের প্রতি তোমার এত উদাসীনতা!”
মৌনতা তার কথার প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞাসা করে,
–”ঘরে কিছু হয়েছে? রূপকথা মেয়েটা কি করবে বলো? পড়াশুনা কি কম কঠিন? অতটুকু মেয়েটাকে সংসারে এই গন্ডিতে আঁটকে রাখা যায়? পড়াশুনার প্রতি কত আগ্রহ। যার এত আগ্রহ সে নিশ্চয়ই ভালোকিছু করবে!”
রোজের চোখেমুখে বিতৃষ্ণা মায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই। মায়ের সাথে তার বনিবনা কখনোই সুন্দর ছিল না, আর না আছে। সে বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,

–”এগুলো কাকে বোঝাবে, মৌন বউ? তোমার শাশুড়িকে? পড়াশুনার নাম শুনলে তো তার অঙ্গ ঝলসে যায়।”
মৌনতা তার দিকে তাকিয়ে বলে,
–”কারণ ছাড়া তো আর এমন করে না! মানুষ ভাগ্যের দুয়ারে লাথি খায় একবার, বারবার তো আর খেতে চায় না।”
–”সব মানুষ একরকম হয় না, মৌন বউ। তোমার কি মনে হয় আমায় পড়াশুনা করালে আমি উচ্ছন্নে চলে যাব? কোনো ছেলের হাত ধরে পালিয়ে যাব?”, রোজ রেগে বলে। মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার কনুই টেনে নিয়ে যায় রান্নাঘরের দিকে। রান্না করতে হবে এখন, অথচ শরীর চলছে না।
–“রান্নাঘরের দিকে কেন যাচ্ছো?”
রোজের প্রশ্নে মৌনতা দূর্বল নেত্রে ফিরে তাকায়।
–“রান্না করতে হবে না?”
মৌনতার কথায় রোজ মৃদু হাসল। তন্মধ্যেই দেখলো রূপকথা ছুটতে ছুটতে সদর দোতালায় উঠেছে। রোজ চঞ্চল কণ্ঠে শুধায়,
–“কলেজ শেষ বড় ভাবি?”
রূপকথা গতিরোধ করে ফিরে তাকায়। ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“জি আপু, একটা সি.টি ছিল দিয়েই চলে এসেছি। তানশান এখনো আসেনি।”
–“ড্রাইভার চাচার সাথে এসেছো?”
–“হ্যাঁ।”
মৌনতা শুধালো,
–“এমন হাফাচ্ছো কেন কথা?”
রূপকথা পান্তুর মুখে বলল,
–“রান্না করতে হবে না? আমার আজকের পরীক্ষাটা দেয়া জরুরী ছিল ভাবি। নয়তো আমি কলেজে যেতাম না। আপনি ডাক্তার দেখিয়েছেন? শরীর ভালো লাগছে?”
মৌনতা ম্লান হেসে বলল

–“একটু ভালো লাগছে। এত চিন্তার কিছু নেই, আস্তেধীরে আসো। একসাথে দ্রুত রান্না করে ফেলব।”
তাদের কথোপকথনের মাঝেই রোজ ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–“হয়েছে হয়েছে থামো। তোমরা এমনভাব করছো যেন আমরা তোমাদের কাজের চাপে মেরে ফেলছি।”
রোজের কথায় মৌনতা কপাল কুঁচকে তাকায়।
রোজ দু’জনের চাহনি দেখে দাম্ভিকতার সুরে বলল,
–“এই রোজ যতদিন আছে ততদিন তোমাদের নো চিন্তা ডু ফুর্তি। যাও মৌন বউ, বড় ভাবিজান জি লো আপনি জিন্দেগী। রান্নাবান্না সব শেষ!”
রূপকথা কৌতুহলী নয়নে তাকায়।
শুধায়,

–“কে করেছে আপু?”
–“আমি করেছি। খেতে পারলে খাবে নয়তো যে যার স্বামীকে বলবে বাইরে থেকে খাবার এনে দিতে।”
রোজের নির্ঝঞ্ঝাট কথায় রূপকথা আর মৌনতা মৃদু হাসল। রূপকথা ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এখন শাশুড়ি কোনো ঝামেলা না করলেই হলো!
মৌনতা হাত বাড়িয়ে রোজকে জড়িয়ে ধরলো। কৃতজ্ঞতার সুরে বলল,
–“ধন্যবাদ রোজ।”
রোজ গা ছাড়া কণ্ঠে বলল,
–“এত ধন্যবাদ না দিয়ে, একটু তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো। আমি তোমার সাথে ঝগড়া করতে না পেরে শুকিয়ে যাচ্ছি মৌন বউ।”
সহসা মৌনতা ফিক করে হেসে উঠল। চোখদুটো অজশ্রবারের মতো আবার সিক্ত হলো। সৃষ্টিকর্তা তাকে সব দিয়েছে। অথচ সবচেয়ে মূল্যবান যেই বন্ধনটা, সেটা বড্ডো নড়বড়ে।

তপোবন বাড়ি ফিরলো তিনটা নাগাদ। এসেই কোনোরকম খেয়ে তৈরি হতে যায়। তপোবনের ব্যাগপত্র গুছিয়ে রূপকথা তখন ঘরে বসে কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিচ্ছিলো।
তপোবন ঘরে ঢুকেই সোজা দৃষ্টি তাক করে নিজ কর্মে মগ্ন মেয়েটির পানে। সোজাসাপ্টা শুধায়,
–আমি তোমাকে মারি? গায়ে হাত তুলেছি?
রূপকথা সরব ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় গম্ভীর মুখপানে। কপাল কুঁচকে বলে,
–“নাহ!”
–“তাহলে আম্মাকে মিথ্যা কথা বললে কেন?”, তপোবন সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে‌। ললাটে অজশ্র ভাঁজ! মাত্রই আম্মা তাকে বেশ কথা শুনিয়েছেন যেগুলো শোনার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।
রূপকথা থমথমে মুখে বলল,
–“মিথ্যা কথা কোথায় বলেছি? সে জিজ্ঞেস করেছে আমি সম্পর্ক কেন আগাইনা। তাই আমি বলে দিয়েছি যে, সম্পর্ক আগাতে গেলে আপনার ছেলে স্কেল তোলে!”
তপোবন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

–“আমি স্কেল তুলেছিলাম খারাপ সঙ্গদের সাথে চলার জন্য, সম্পর্ক আগানোর জন্য নয়।
এখন মিথ্যা কথা বলার জন্য আবার স্কেল তুলব, আর এবার সত্যি সত্যি মাইর দেব।”
বলেই তপোবন এদিক ওদিক তাকিয়ে স্কেল খুঁজতে লাগল। রূপাকথা ফোঁস ফোঁস করে উঠল। গাল ফুলিয়ে দেখে স্বামীর বেশে থাকা কঠোর টিচারকে। অতঃপর মারের ভয়ে হাতের কাপড় ছুঁড়ে ফেলে দৌড়ে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে। তপোবন হতচকিত পিছু ডেকে বলল,
–“রূপকথা চুপচাপ এদিকে এসো। নয়তো ধরতে পারলে কিন্তু খবর আছে।”
তাতেও রূপকথার গতিরোধ হলো না। তপোবন ডাকতে ডাকতে দরজা থেকে বের হতেই দেখলো কড়িডরে মেয়েটির টিকিটিও নেই! কিয়ৎকাল পূর্বেও যতটা মেজাজ খারাপ ছিল তা এক মুহুর্তেই কেউ ভীষণ যত্নের সাথে হাসিতে বদলে দিলো।
সে ডানে বামে মাথা নেড়ে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। ইদানিং এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রসিকতা, খুনসুটি তার ভীষণ প্রয়োজনের খাতায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে! মেয়েটিকে ভয় দেখাতে, জ্বালাতে, পেটের কথা বের করতে যে নিদারুণ উল্লাস অনুভব করে অন্তঃস্থল!
তপোবনের ভয়ে রূপকথা তানশানের বিছানায় পা গুটিয়ে বসে ছিল। তন্মধ্যেই ভেসে আসল তপোবনের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ।

–“রূপকথা আমায় বের হতে হবে, কিন্তু আমি কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। আমার হাতে সময় নেই।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে বেরিয়ে আসে। পাশের ঘর থেকে। নিজের ঘরের দরজা খুলে উঁকি দিতেই ঘরের মাঝবরাবর সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির সাথে দৃষ্টি মিলে যায়‌।
কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“কি খুঁজে পাচ্ছেন না? আমি তো আপনার বলা সবকিছু গুছিয়ে রেখেছি।”
সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পড়া তপোবন শান্ত স্বরে বলল,
–“আমার সাদা পাঞ্জাবি খুঁজে পাচ্ছি না।”
–“আপনার সব পাঞ্জাবি-ই সাদা। আপনি কোনটা খুঁজছেন?”
–“যেটার কলারে দুটো কালো বোতাম আছে।”
তপোবনের কথায় রূপকথা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“ওটা তো চেইঞ্জিং রুমে ভাঁজ করে রেখেছিলাম। খুঁজে দেখুন।”
তপোবন একই ভাবে পেছনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে বলল,
–“তুমি এসে খুঁজে দিয়ে যাও।”
রূপকথা নাকোচ করে বলল,
–“নাহ, আপনি মারবেন।”
–“মারব না, এসো।”
–“নাহ।”

–“আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে রূপকথা। মানিব্যাগ, পাঞ্জাবি, ফোন কিছু পাচ্ছি না।”
–“কি অদ্ভুত কথা! আমি সব তো ওখানেই গুছিয়ে রেখেছি।”, বলেই রূপকথা কিছুটা এগিয়ে গেলেই তপোবন খপ করে ধরে নিলো মেয়েটিকে।
সহসা রূপকথা চেঁচিয়ে উঠল।
–“মারবেন না, আমি ইচ্ছে করে ওসব বলিনি আম্মাকে। সে আমায় নিয়ে বাজে মন্তব্য করছিল তাই বলেছিলাম।”
তপোবন মৃদু হেসে দেখে বাহুডোরে ছটফট করতে থাকা নারীটিকে। অদ্ভুত সুন্দর এক বিষয় হলো! তার এই সুবিশাল আদলের কাছে অতি ক্ষুদ্র, রোগা পাতলা, নরম মেয়েটিকে সর্বদা এই বক্ষমাঝে আগলে রাখতে তার ভালোলাগে। ছোট্ট পাখির ন্যায় এঁটে যায় তার মাঝে। সে মৃদু হেসে ললাট ঢেকে থাকা চুলগুলো বা হাতে সরিয়ে দিলো। ক্ষীণ স্বরে শুধায়,
–“আম্মা কি বলেছে?”
রূপকথা চোখ তুলে তাকায় শান্ত মুখপানে। মারবে না ভেবে আশ্বস্ত সুরে বলল,
–“যাই বলুক না কেন, সব অবান্তর কথা ছিল।”
–“সেটাই, কি বলেছে?”, তপোবনের একই প্রশ্নে রূপকথা ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“বললাম না, যাই বলেছে তা অবান্তর।”
–“কি সেই অবান্তর কথা?”

তপোবনের জেদি কণ্ঠে রূপকথা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আমার নাকি স্বামী সংসার নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। মাঝপথে ছেঁড়ে চলে যাবো।”
তপোবনের রাগ হয় মায়ের উপর। বারংবার এই অভিশপ্ত বিষয়গুলো কি টানা খুব প্রয়োজন? কেন সম্পর্কগুলোকে এভাবে কলুষিত করে পুরোনো জিনিস টেনে?
সে অভিব্যক্তি লুকিয়ে নেয়। জবাবটুকু জানার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
–“তুমি কি বলেছো?”
–“কিছু বলিনি, প্রথম দিন থেকে কাজেকর্মে দেখিয়ে আসছি। এই স্বামী সংসার ছেঁড়ে যাওয়ার হলে সেদিন কবুল ই বলতাম না। ওখান থেকেই পালিয়ে যেতাম। কিন্তু তা যখন করিনি তখন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছেড়ে যাব না।”
রূপকথার দৃঢ় কণ্ঠ। তপোবন মুগ্ধ হয়ে দেখলো অতি নিকটে থাকা শক্ত মুখটিকে। সদ্য মনে বীজ বোনা কিছু অসংলগ্ন চিন্তারা নিমিষেই মিলিয়ে যায়। আগলে ধরা আরেকটু জোড়ালো হলো, আরেকটু আদুরে হলো।
এবং প্রথমবারের মতো মেয়েটির উঠতি বয়সের আবেগ গুলোকে প্রশ্রয় দিয়ে তপোবন মুগ্ধ চিত্তে রূপকথার ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।
পুরুষালী ওষ্ঠদ্বয় ললাটের ঠিক মাঝবরাবর ছুঁয়ে যেতেই, মেয়েটি খামচে ধরে লোকটির পাঞ্জাবির আস্তিন। বদ্ধ নেত্র, ঘন পল্লবদ্বয় কেঁপে উঠল থেমে থেমে। অন্তরাত্মা জমে যায়, বাহুডোরে থাকা দেহটি শিথিল হয়ে আসে।
ক্ষণকাল বাদেই আতরের সেই মিষ্টি তীক্ষ্ণ সুগন্ধ সহ দাঁড়ি যুক্ত মুখের স্পর্শ বিলীন হয়ে যায়। মিইয়ে যাওয়া মেয়েটি বদ্ধ নেত্র খুলতে পারলো না। লোকটার সাথে চোখে চোখ রাখার সাহস এ জীবনে বুঝি আর হবে না!
সামান্য একটা স্পর্শে লাজে নুইয়ে পড়া মেয়েটিকে তপোবন চোখ ভরে দেখলো। সাময়িক উপেক্ষা করে লাজে রাঙা ভালোবাসার এই ভিন্ন রূপকে। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“নিজের খেয়াল রাখবে। আর এই এক সপ্তাহ রোজের কাছে ঘুমাবে। আমি রোজকে বলে রেখেছি। আসছি।”
বাহুডোর হালকা হয়ে গেল। রূপকথা চকিতে চোখ খোলে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“আপনার পাঞ্জাবি, মানিব্যাগ আর ফোন নেবেন না?”
দরজা পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া তপোবন ফিরে তাকায়। চোখেমুখে উপচেপড়া হাসির উজ্জ্বলতা। চোখে হেসে বলে,
–“পাঞ্জাবি গায়ে, ফোন আর মানিব্যাগ পকেটে। আপনার খেয়াল কোথায় থাকে ফেইরিটেইল? আপনি কিন্তু বিগড়ে যাচ্ছেন।”

বলেই সে বেরিয়ে গেল। রূপকথা ‘থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটা কতটা চতুরতার সাথে তাকে বোকা বানালো। তপোবন হাসতে হাসতে সিঁড়ি বেয়ে নামে।
পথিমধ্যেই তপোবন গাড়ি থামায় তানশানের কোচিং এর সামনে। সারাদিনে যে ছেলের সাথে একবার দেখা হলো না। সে টিচারের অনুমতি নিয়ে দ্রুত কদমে ক্লাসে ঢুকে ছেলের দু’গাল আঁকড়ে ধরে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“পাপা আসছি, তানশান। কোচিং শেষে বাসায় চলে যাবে ঠিক আছে।”
তানশান মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। বাবা নামক মানুষটির হুটহাট এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজগুলো তাকে বিশেষ অনুভব করায়। জীবন নিদারুণ ভাবে তার গতিবিধি পরিবর্তন করে নিলেও বাবার ভালোবাসার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
তপোবন যেতেই তানশানের কোলে একটা চিরকুট পড়লো। কে দিয়েছে এই ভাবনায় পড়তে হয় না তানশানকে। সে বোর্ডের দিকে একবার তাকিয়ে চিরকুটটা খুলল। গোটা গোটা অক্ষরে কিছু অশ্লীল বার্তা দেখে সে চোখমুখ কুঁচকে ছিঃ বলে উঠল।

–“এখনো বাবার চুমু খাচ্ছিস, বউয়ের চুমু কবে খাবি টমাটু?”
সে কপাল কুঁচকে তাকায় নিজের পেছনের বেঞ্চে মাথা নুইয়ে ঝিমুতে থাকা মেয়েটির দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“তোমার লজ্জা করে না?”
সুনেহরা নিরুদ্বেগ না বোধক মাথা নেড়ে উদাসীন কণ্ঠে বলল,
–“জন্মগতভাবেই আল্লাহ ওটা আমায় একটু কম দিয়েছে।”
–“ভুল বলেছো। কম না, আল্লাহ তোমাকে কোনো লজ্জাসরম-ই দেইনি।”, তানশান চাপা আক্রোশে বলল। সুনেহরা বিস্ময় নিয়ে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩২

–“এই তো ঠিক বলেছিস। তুই সব বিষয়ে এত
বিজ্ঞ কি করে?”
তানশান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে সামনে তাকায়। সুনেহরা আবার টেবিলে মাথা রেখে ঝিমুতে লাগল। এই পড়াশুনা কার ভালো লাগে?

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৪