অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৮
তোনিমা খান
ভাগ্য আর জীবন যতটা উদারতার সাথে দুঃখ দিতে জানে, ঠিক ততটাই কার্পণ্য করে সুখ দিতে। কিন্তু ক্ষণিকের ঐ সুখ হয় ভীষণ অপার্থিব সৌন্দর্যে মোড়া। যা আগলে গোটা এক জীবন পার করে দেয়া যায়।
বাগেরহাটের সিকদার বাড়িটা বিশাল এরিয়া নিয়ে তৈরি, যার চারিপাশ বেরিবাঁধ দিয়ে ঘিরে রাখা। মূল বসতবাড়ি থেকে কিছুটা দূরে, দিঘির ওপারে নির্জন জায়গায় এই কাছারি ঘরটি। জায়গাটা বেশ কিছুটা দূরে আর নির্জন।
জমকালো আলোয় আলোকিত সিকদার বাড়ি পেরিয়ে নির্জন অন্ধকারে এক টুকরো আলো দৃষ্টি আকর্ষণ করছে কাষ্ঠনির্মিত ঘরটি।
কাঠের ঘরময় কৃত্রিম আলোয় আলোকিত। সেই আলোয় দৃশ্যমান হয় ভেতরকার এক স্নিগ্ধ দৃশ্য। একে অপরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে শুয়ে আছে তিন মা-মেয়ে। বাইরে থেকে দৃশ্যটি মমতায় ঘেরা মনে হলেও, তাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে বয়ে চলেছে যন্ত্রণার এক নীল দরিয়া।
বাঁকহারা নীলিমা হতভম্ব কণ্ঠে শুধায়,
–“কথা মা, তোর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তোর বাবাকে চরিত্রহীন বলে কথা শোনায়?”
মায়ের বুকে নিস্তেজ লতানো দেহে পড়ে থাকা রূপকথা ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“তারা হয়তো ঠিক বলে, আম্মা।”
এহেন অবিশ্বাস্য অবান্তর কথায় হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসল নীলিমা। দৃঢ় কণ্ঠে নাকচ করে বলল,
–“তারা ঠিক বলে না, কথা। তোর বাবা চরিত্রহীন নয়। সে মরে যাবে কিন্তু এমন কাজ কোনোদিন করবে না। তারা চেনে না তোর বাবাকে, কিন্তু আমি চিনি। আমরা তার চোখের মনি ছিলাম। তারা ভুল বলে, আমি নিশ্চিত একদিন তাদের ভুল ধারণা ভাঙবে। তুই এই ভেবে কখনো মন খারাপ করবি না, মা।”
মায়ের এই অগাধ ভালোবাসা আর দৃঢ় বিশ্বাস সহ্য করতে পারল না রূপকথা। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। জীবন যদি আবারও সেই নিষ্ঠুর সত্যকে সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, মা যে আরেকবার বাজেভাবে ভেঙে পড়বে! এই দৃঢ় বিশ্বাসটুকু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। সেই ধ্বংসাবস্থা থেকে মা কি আরেকবার দৃঢ়তার সাথে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? সে কী করে এই নির্মম সত্য লুকিয়ে রাখবে?
নীলিমা মেয়ের কম্পমান দেহটিকে পরম মমতায় বুকে চেপে ধরে। অশ্রুসিক্ত চোখেমুখে অজস্র চুমু দিয়ে বলল,
–“কাঁদিস না, মা। আমি জানি আমার স্বামী চরিত্রহীন না, আর এটাও জানি আমার কথাও এমন কোনো কাজ করেনি।”
রূপকথা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
–“আমি কোনো খারাপ কাজ করিনি, আম্মা। তোমার জামাই ব্যতীত কোনো পর-পুরুষের প্রতি আমার কোনো অনুভূতি নেই।”
নীলিমা টলটলে নেত্রে গাল ভরে হাসল। মেয়ের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বলল,
–“আমি জানি তো আমার কথা কখনো কোনো খারাপ কাজ করতে পারে না। দেখবি জামাই ঠিক বুঝবে, আর সম্মানের সহিত তোকে আবার নিয়ে যাবে। কিন্তু এরপর থেকে কোনো ছোট বিষয় ও জামাইয়ের থেকে লুকাবি না। সংসার জীবনে ছোট্ট একটা চির বড় ফাটল ধরানোর জন্য যথেষ্ট হয়।”
রূপকথা ঘন ঘন মাথা নাড়ল,
–“কখনো কিছু লুকাবো না। তোমার জামাই আমায় কখনো অবিশ্বাস করবে না। আমি জানি, সে আমায় নিতে আসবে।”
–“তবে এত কাঁদছিস কেন? ওঠ, কিছু খাবি। এসেছিস থেকে কেঁদেই যাচ্ছিস। মা সুন্দর করে ইলিশ মাছ ভুনা করেছি আর সবজি রান্না করেছি, তা দিয়ে ভাত মেখে খাইয়ে দেই।”
রূপকথা ঠোঁট চেপে কান্না আটকায়। মাকে কি করে বোঝাবে, মস্তিষ্ক সহ অন্তঃস্থলে কত দূর্বিষহ বাস্তবতা মেনে নেয়ার দুর্ধর্ষ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কি করে বোঝাবে, দীর্ঘ দশটি বছর যার জন্য তারা চাতক পাখির মতো প্রতীক্ষা করেছে, সেই মানুষটি এই পবিত্র ভালোবাসার যোগ্যই ছিল না?
ঐ দুশ্চরিত্র লোকটা তাদের কোনো ভালোবাসা, দুশ্চিন্তা কিংবা দোয়া’র হকদার নয়।
–“ওঠ, কথা।”
নীলিমা বুকে পাথর চেপে হাসিমুখে উঠে দাঁড়ায়। বুকটা যে তার ভীষণ ব্যথা করছে। যেই বয়সে তার ছোট মেয়েটার পড়াশুনা, হাসিঠাট্টা, নতুন স্বপ্ন নিয়ে উজ্জ্বল জীবনের পেছনে ছোটার কথা ছিল, সেই বয়সে তাকে শ্বশুর বাড়ি থেকে চরিত্রহীনের তকমা দিয়ে লাঞ্ছিত করে ঘর ছাড়া করা হয়েছে। না জানি প্রতিনিয়ত কতটা কঠিন বাস্তবতার স্বীকার হতে হয়!
নীলিমা শুকনো ঢোক গিলে অন্তরের কথা অন্তরেই রাখে। নিজেই তো এই কঠিন জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে মেয়েটাকে। কোন মুখে সহানুভূতি দেখাবে?
ছোট্ট হাতটি আরেকটু দৃঢ়ভাবে রূপকথাকে জড়িয়ে ধরতেই রূপকথার ধ্যান ভাঙে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকাতেই চোখে বাঁধে কান্না আঁটকে রাখা ছোট্ট বোনটির থমথমে মুখ।
রূপকথা কৃত্রিম হেসে কাত ফিরে বোনকে বুকে জড়িয়ে নিলো। সহসা শুকতারা হেঁচকি তুলে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বিলাপের সুরে বলল,
–“বুবু, তোকে মেরেছে তারা? তারা অনেক খারাপ, তাই না?”
রূপকথা বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
–“সংসার জীবন কঠিন হয়, বুঝলি! এগুলো কিছুই না। বুবু ভালো আছি। তুই কাঁদছিস কেন? কাঁদবি না। বুবু তোকে অনেক বড় করব, পড়াশুনা করিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করাব। এতটা বড় করব—যেন কেউ তোকে দু’টো মন্দ কথা শোনানোর আগে দশবার ভাবে, বুঝেছিস? বুবুর কথা শুনবি তো? মন দিয়ে পড়াশুনা করবি তো?”
শুকতারা অশ্রুভেজা চোখে মাথা নাড়ল,
–“পড়ব, বুবু। আমি অনেক বড় হব।”
–“কখনো কোনো ভুল পথে পা দিবি না কিন্তু!”
–“কখনো না।”
দুই বোন একে অপরকে আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরল। রূপকথা বোনের চোখেমুখে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়ে আক্ষেপের সুরে বলল,
–“বুবু তো তোর জন্য কিছুই আনতে পারিনি, তারা। কষ্ট পাস না, পরের বার অনেক কিছু নিয়ে আসব।”
–“আমার কিচ্ছু লাগবে না বুবু, তুই এলেই হবে। কতদিন তোকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাই না! তুই আর ওই বাড়িতে যাস না, তখন বুঝবে ওরা।”
রূপকথা ম্লান হাসল। কঠিন বাস্তবতা মেনে নিয়ে বলল,
–“তা কি হয়? বিয়ের পর মেয়েদের জন্য তার শ্বশুর বাড়ি হয় তার সম্মান। আমায় তো যেতেই হবে।”
–“তারা যে তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করে? তারপর ও কেন যাবি?”
রূপকথা টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,
–“তোর দুলাভাই আর তানশান থাকলে কেউ আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে না। আজ তো তারা ছিল না, তাই পেরেছে। দেখবি, তোর দুলাভাই সবাইকে বকে দেবে।”
–“সে খুব ভালো মানুষ, তাই না?”
–“হুঁ।”
নীলিমা খাবার গরম করে ত্রস্ত কদমে বড় ঘরে ঢুকল। জোরপূর্বক মুখে হাসি নিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“দুই বোন তাড়াতাড়ি ওঠ, আয় একসাথে খাইয়ে দেই। কতদিন হলো তিনজন এক প্লেটে খাই না।”
রূপকথা বোনের চোখ মুছিয়ে দিয়ে দূর্বল দেহ টেনে উঠে বসে। তিন মা-মেয়ে পেট ভরে ভাত খেল একসাথে। সারাদিন ধরে ক্ষুধার্ত রূপকথা কতদিন পর একটু পেট আর মন ভরে খেল কে জানে!
সকল ক্লেশগুলো ক্ষণিকের জন্য ফিকে পড়ল মাতৃস্নেহের কাছে। রূপকথা চোখভরে দেখে অত্যন্ত শক্তিশালী মানুষটিকে। যার সান্নিধ্যে পৃথিবীর সকল দুঃখ ফিকে পড়ে, তাকে সৃষ্টিকর্তা এত কষ্ট কি করে দিল?
শীতের রাতে অশনী যেন নিদারুণ আস্কারা পায়। আটটা বাজলেই গ্রাম শুনশান নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আর সেই জনমানবহীন ধরণী হয়ে ওঠে হিংস্র শ্বাপদদের অবাধ বিচরণভূমি।
মেয়েদের খাইয়ে নীলিমা হাত ধুয়ে আসতেই হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেদ করে দরজায় দু’টো টোকা পড়ল। পরপর চার পাঁচটা পড়ল! ভীষণ উদগ্রীবতা!
রূপকথার বিধ্বস্ত মস্তিষ্ক বিচলিত হয়ে পড়ল, চোখমুখ চকচক করে উঠল। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,
–“তানশানের পাপা এসেছে মনে হয়, আম্মা।”
নীলিমার চোখেমুখেও ঠিক একই হারে উজ্জ্বলতা ছেয়ে গেল। মেয়েকে আশ্বস্ত করে বলল,
–“আমি দেখছি, বস।”
সিকদার বাড়ির দুর্ভেদ্য প্রাচীর টপকানোর সাহস কেউ কোনোদিন দেখায়নি— এই অন্ধবিশ্বাসেই নীলিমা নির্দ্বিধায় বড় ঘর পেরিয়ে সদর দরজা খুলে দিল। কিন্তু সেটিই ছিল তার জীবনের চরম ভুল।
অন্ধকার ভেদ করে একটা দানবীয় থাবা অতর্কিতে তার কণ্ঠনালি চেপে ধরতেই দু’চোখে আতঙ্কের হিম স্রোত বয়ে গেল। চিৎকার কিংবা নড়াচড়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে ঘাতক চোখের পলকে টেপ দিয়ে তার মুখ আঁটকে দিল। নীলিমা শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালাল, কিন্তু সেই পৈশাচিক শক্তির কাছে সে ছিল নিছক এক পলাকা।
গলা টিপে ধরা অবস্থাতেই অজ্ঞাত ঘাতক একপা দু’পা করে তাকে ঘরের ভেতর ঠেলে নিয়ে এলো। আবছা আলোয় মিন্টুর তেল চিটচিটে বীভৎস মুখটি ফুটে উঠতেই নীলিমা গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করে উঠল। সন্তানসহ সর্বহারা হওয়ার সেই পুরনো বিভীষিকা জেগে উঠতেই সে উন্মাদের মতো হাত-পা ছুড়তে লাগল।
কিন্তু ব্যর্থতার গ্লানি সইতে সইতে মিন্টু যেন আজ এক ক্ষুধার্ত নেকড়ে! লালসা মেটাতে আজ সব প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে সে। একে একে গজা সহ আরো একজন ঘরে ঢুকে দরজার খিল লাগিয়ে দিল। নিঃশব্দে হাত পা ছুড়তে থাকা নীলিমার হাত পা বেঁধে ফেলল। নীলিমার চোখ বেয়ে অবাধে গড়িয়ে পড়া অশ্রু গুলোও ততক্ষণে অনুনয় করতে শুরু করে দিয়েছে।
অধৈর্য রূপকথা প্রিয় মানুষটির অপেক্ষা সইতে না পেরে সামনের ঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে শুধায়,
–“আম্মা, তানশানের পাপা এসেছে?”
উদগ্রীব রূপকথা চৌকাঠ পেরোতেই দেহ হীম হয়ে আসল অতি ভয়ঙ্কর তিনটা চেহারা দেখতেই। পা দুটো জমতে চাইলেও পারল না, সে চেঁচিয়ে উঠল,
–“আম্মা।”
রূপকথা ছুটে যায় মেঝেতে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা মায়ের কাছে। গজা দ্রুত কদমে এক ঝটকায় ছুটন্ত দেহটিকে জাপ্টে ধরে আর অন্য একটা ছেলে দ্রুত তার কণ্ঠ ও রোধ করে দিল টেপ দ্বারা। গজার লোহার মতো শক্ত বাহুডোর থেকে নিজেকে মুক্ত করতে রূপকথা প্রাণপণ লড়াই চালাল, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ছিল নিষ্ফল। এমনকি ছোট্ট শুকতারাকেও আর্তনাদ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া হলো না।
পরপর দুই বোনকে হাত-পা বেঁধে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে মিন্টু বিজয়ী বীরের মতো বিছানায় জাঁকিয়ে বসল।
একটু হাঁফ ছেড়ে বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল,
–“একটু দম নেই, তারপর উৎসব শুরু করি, কী কও নীলিমা? কতদিন লুকাইয়া ছিলা জামাইর ডেরায়! আমার কলিজাটা পুইড়া কয়লা হইয়া গেছে। কিন্তু জানো তো—সবুরে মেওয়া ফলে। তোমরা কি সুন্দর হইয়া গেছো, দেখতেই জিভে পানি আইসা যাইতেছে।”
বলেই মিন্টু সোজা দৃষ্টি তাক করে গহনা, দামী শাড়িতে পরিস্ফুটিত রূপকথার পানে। যে কি-না একাধারে ছটফট করছে আর গুঙিয়ে যাচ্ছে। মিন্টুর দৃষ্টি ভীষণ লোলুপ। তার থেকেও দ্বিগুণ লোলুপ দৃষ্টি গজার! যে আকুল চোখে রূপকথার আপাদমস্তক অস্থির হয়ে তাকাচ্ছে। অধৈর্যতা তার চোখেমুখে স্পষ্ট!
গজা লোভ সামলাতে পারে না, হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে রূপকথার পাশে। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় রূপকথার গাল। লোভাতুর চোখে চেয়ে বলে,
–“মিন্টু ভাই, এই কি সেই মাইয়্যা? এ তো চান্দের মতোন সুন্দর হইয়া গেছে।”
পরপরই উন্মাদের ন্যায় বলে,
–“স্বামী অনেক সোহাগ করে, তাই না? আজ জনমের সোহাগ করব তোমায়, আমার বুকে জ্বালা ধরাইয়া অন্য পুরুষের হাত ধইরা চইলা গেলা ক্যামনে? একটুও ভয় করে নাই যে— আমার হাতে যেদিন পড়বা, সেদিন তোমার কলিজা ছিইড়া খামু!”
বলতে বলেই গজার হাত রূপকথার দেহ ছুঁয়ে ছুঁয়ে নেমে আসে কোমরে। সেই ঘৃণ্য নোংরা স্পর্শে রূপকথার ছটফটে দেহ সর্বশান্ত হয়ে আসে।
চোখ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়া অশ্রু গুলো সৃষ্টিকর্তার কাছে একাধারে অনুনয় করে যাচ্ছে,
–“আজ যদি তানাশানের পাপা না আসে, তবে আর কোনোদিন তাদের দেখা হওয়ার উপায় থাকবে না।”
একটা মা বোধহয় তার সন্তানকে এমন পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে নিজের প্রাণ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না। সেখানে নীলিমা নিজের চোখের সামনে মেয়ের দেহে হিংস্র ছোঁয়া দিতে দেখছে। আর সে কিছুই করতে পারছে না। ছটফট করতে থাকা মা নামক মানুষটির চোখ থেকে এবার অশ্রুর বদলে র”ক্ত গড়িয়ে পড়ার উপক্রম! চোখের ইশারায় অনুনয় করছে তার সন্তানটিকে ছেড়ে দিতে, আর মেঝে ঘেঁষে মেয়ের কাছে ছুটছে সে।
উন্মাদ গজা লালসার আগুনে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অস্থির কণ্ঠে বলল,
–“ভাই, যা করার জলদি করো। এরপর এইখান থিকা বাইর হইতে হইব।”
মিন্টু শয়তানি হাসি হেসে বিছানা ছাড়ল। নবযৌবনের কর্ণধার রূপকথার বিধ্বস্ত শরীরের ওপর ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো দৃষ্টি বুলিয়ে আফসোসের সুরে বলল,
–“ওরে আগে আমারে দে। আমি না দেখলে তুই কি আজ এই খনির সন্ধান পাইতি?”
সহসা গজার রক্তচক্ষু মিন্টুর দিকে স্থির হলো। দাঁত কিড়মিড় করে হিসহিসিয়ে বলল,
–“খবরদার! আগে আমি। নয়তো এইখানেই ওরে শেষ কইরা দিমু। না খাইতে পারবা তুমি, না খামু আমি!”
গজার জেদি কণ্ঠের কাছে মিন্টু হার মানল। ফিচলে হেসে বলল,
–“আচ্ছা যা, ও তোর! মা তো আছেই। এহনো বেশ সুন্দর আছে। ছোটডাও কিন্তু বেশ বড়সড় হইয়া উঠছে।”
বলেই তারা একসাথে হেসে উঠল। রূপকথা আর নীলিমার চোখের সামনে দানবীয় দুটি লোভাতুর হিংস্র মুখ ভেসে উঠতেই হঠাৎ করে তাদের চোখে ধোঁয়াশা হয়ে আসে সব।
নিলীমা মিরাকেল এ বিশ্বাস করে না, কিন্তু এটা বিশ্বাস করে ঐ উপর ওয়ালা চাইলে সব করতে পারে। সে শেষবারের মতো আকুতি জানায়, তার মেয়েটাকে নোংরা স্পর্শ থেকে রক্ষা করার জন্য।
ইমরোজের ভুলের খেসারত দিতে সিকদার কোম্পানিকে দশ লক্ষ টাকার জরিমানার মুখে পড়তে হলো। ফোনের পর ফোন বেজে গেলেও তপোবন তখন সালিশি সভায় মগ্ন। এক ক্লায়েন্টের কাজে খামতি হয়েছে বড়সড়। যখন সে বাড়ির পথ ধরল, তখন প্রায় সন্ধ্যা।
বাগেরহাট পৌঁছাতে তপোবনের ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল। গাড়ি গেট পেরিয়ে ঢুকতেই তপোবন ত্রস্ত পায়ে ছুটল মেয়েটির কাছে। সারাদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কি কম ছিল যে—ছোট্ট মেয়েটিকে লাঞ্ছিত করে তার স্বামীর ঘর থেকেই বিতাড়িত করা হয়? আদৌও কি এতকিছু সহ্য করার সামর্থ্য আছে ঐ ছোট্ট মনটিতে?
বাবার পিছু পিছু তানশানও নিঃশব্দে এগিয়ে চলল। বদ্ধ দরজার সামনে এসে তপোবন একবার গভীর শ্বাস টেনে দরজায় করাঘাত করল। কোনো সাড়াশব্দ নেই, অথচ ভেতরে আলো জ্বলছে! পুনরায় টোকা দিতে গিয়েও সে থমকে গেল। অন্দরের নিস্তব্ধতা চিরে কারোর অবরুদ্ধ গোঙানি তার কানে এলো।
গজা আর মিন্টু সহ ছেলেটা সর্বোচ্চ শক্তিতে নীলিমা, রূপকথা আর শুকতারার মুখ চেপে ধরলেও, প্রাণের অন্তিম চিৎকার যেন দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মিন্টু সচকিত হয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
–“কে হতে পারে?”
গজা দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল,
–“যেই হোক, একদম চুপ! সাড়াশব্দ না পাইলে চলে যাবে।”
বাবার হঠাৎ পাথরের মতো স্থির হয়ে যাওয়া দেখে তানশান অধৈর্য হয়ে ডাকল,
–“পাপা…!”
তপোবন তড়িৎ গতিতে ছেলের ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল। তার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে আসল। সে দরজায় কান পাতল। কোনো শব্দ নেই— এমনকি নিশ্বাসের শব্দটুকুও শোনা যাচ্ছে না। তপোবনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কপালে ফুটে ওঠে ক্রুরতার রেখা। আর এক মুহূর্তও নষ্ট করে না, নিজের বাহু দিয়ে সর্বশক্তিতে দরজা বরাবর এক ধাক্কা দিল।
জরাজীর্ণ পুরনো দরজাটি সেই প্রচণ্ড আঘাত সইতে পারল না। পরপর চারটে ক্ষিপ্র ধাক্কায় কবজা উপড়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল।
গজা আর মিন্টু ভেবেছিল অজ্ঞাত ব্যক্তি চলে যাবে, কিন্তু তারা ভয়ে শিউরে উঠল দরজার ভীত দূর্বল হয়ে পড়তেই। তারা নীলিমা, রূপকথা আর তার বোনকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। বের হওয়ার জন্য চারিদিকে অস্থির দৃষ্টি ফেললে দরজা ভেঙে তপোবন ছুটে ভেতরে ঢুকে যায়।
তপোবন ভেতরে ঢুকতেই তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। মেঝেতে হাত-পা বাঁধা তিনটি নিথর দেহ। পুরুষালী দেহ সর্বশান্ত হয়ে আসে নিজের ছোট্ট স্ত্রীর অর্ধ বিবস্ত্র দেহ দেখে।
রূপকথা নিথর দেহে তাকিয়ে রইল ঐ রক্তাভ দুটি নেত্রপানে। এতক্ষণ যাবৎ নিজের শেষ শক্তি দিয়ে লড়ে যাওয়ার তাগিদ আর অনুভব হলো না।
সম্মুখের মানুষটির প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে মেয়েটির চোখ ধীরস্থির বন্ধ হয়ে গেল।
গজা, মিন্টু নিরুপায় হয়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটেছে পালানোর জন্য। কিন্তু তাদের ক্ষিপ্র গতি রোধ হয়ে আসে পেছন থেকে সজোরে এক লাথিতে। মিন্টুর ও গতিরোধ হয়ে গেল মাথায় ধাতব কিছুর আঘাত লাগতেই। মেঝেতে লুটিয়ে পড়া গজার মাথা পায়ে পিষে ধরল তপোবন। অন্য বাহু শক্ত হাতে মিন্টুর গলা চেপে ধরে আছে। তপোবন তাদের ততক্ষণ নিজের আয়ত্তে রাখল, যতক্ষণ না গজা-মিন্টুর প্রতিঘাত করার সবটুকু শক্তি নিঃশেষ হয়।
তানশান বড্ড সংবেদনশীল পরিবেশে বড় হয়েছে। সম্মুখের এই দৃশ্যটা তার জন্য মেনে নেয়ার মতো ছিল না। পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা তানশানের দৃষ্টি নড়েচড়ে উঠল একটা পুরুষ তার পাশ কাটিয়ে ছুটে যেতেই।
সে চমকে ফিরে তাকায় ছুটন্ত পুরুষটির দিকে। মস্তিষ্ক কাজ না করলেও, এতটুকু সে বুঝেছে—এই মানুষগুলোই তার মিমির সাথে অন্যায় করেছে। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ভাঙা দরজার একটা ধারালো কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে লোকটির পেছনে ছুটল।
লোকটি যখন পাঁচিল টপকে পালাচ্ছিল, তানশান নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ছুটে গিয়ে লোকটির মাথা বরাবর আঘাত করল। প্রচণ্ড আঘাতে লোকটি ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল। পরিবারের দুঃসময়ে নরম সরম ছেলেটিও আজ রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। যে কোনোদিন কাউকে কটু কথা বলেনি, ফুলের টোকাও দেয়নি, সে আজ উন্মাদের মতো কাঠটি দিয়ে লোকটিকে প্রহার করে যাচ্ছে… যতক্ষণ না লোকটির দেহ সর্বশান্ত হয়।
তপোবন তপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসছে। সে নিস্তেজ গজা আর মিন্টুকে পশুর মতো টেনেহিঁচড়ে ঘরের মাঝখানে এনে ছুড়ে ফেলল। তার ক্রুব্ধ টলটলে চোখদুটো গিয়ে স্থির হলো কোণায় পড়ে থাকা ছোট্ট শুকতারার ওপর। অঝোর কান্নায় বাচ্চা মেয়েটির চোখ-মুখ ফুলে উঠেছে, ফোঁপানোর শব্দটুকুও যেন গলায় আঁটকে গেছে। সে দ্রুত হাতে তার বাঁধন খুলে আলগোছে বুকে টেনে নিল। মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত করে বলল,
–“ভয় নেই, দুলাভাই আছি তো। আর কেউ কিছু করতে পারবে না।”
সে শুকতারাকে বসিয়ে নত শির নিস্তেজপ্রায় নীলিমার বাঁধন খুলে দেয়। এলোমেলো শাড়ি সামলে নীলিমা ছলছল নেত্রে তাকায় তপোবনের নত শির পানে। নারীটির চোখেমুখে ভীষণ ক্ষোভ আর ক্লেশ। জীবন এতটা ভারী না হলেও পারত। সে রূপকথার নিথর, অচেতন দেহপানে চেয়ে আক্ষেপ ভরা কণ্ঠে বলল,
–“সৃষ্টিকর্তা আমার এই ছোট্ট মেয়েটার কপালে এত দুঃখ কেন লিখেছেন, বলতে পারেন?”
তপোবন অপরাধীর ন্যায় নত শির তুলল না। অনুশোচনা ভরা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
–“আমায় ক্ষমা করবেন, আম্মা। আমি তার যথাযথ খেয়াল রাখতে পারিনি।”
নীলিমা নির্বাক। আজ কোনো অভিযোগ করতেও ইচ্ছে হলো না। তপোবন ধীরস্থির এগিয়ে যায় নিথর পড়ে থাকা মেয়েটির কাছে। ফর্সা পেটে লালচে খামচির দাগটি দেখে রক্তাভ চোখ ঝাঁপসা হয়ে উঠল নোনাজলে। শুকনো ঢোকের সাথে অনুশোচনা, রাগ, দুঃখ গুলোও গিলে নিলো। নিজের গায়ের শাল খুলে মেয়েটির অর্ধ বিবস্ত্র দেহে জড়িয়ে দিল। যেন দুনিয়ার সমস্ত কলুষতা থেকে তাকে আড়াল করতে চায়। তারপর অতি সন্তর্পণে রূপকথাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল নিজের প্রশস্ত বুকে।
তপোবন যখন রূপকথাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ভারাক্রান্ত কিন্তু সংকল্পে অটল। এই অশুভ অন্ধকার ঘর থেকে সে তার ভালোবাসাকে আলোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পেছনে ফেলে যাচ্ছে একরাশ দীর্ঘশ্বাস আর বীভৎস এক কালবেলা। চোখেমুখে অদম্য কাঠিন্যতা আর দৃঢ়তা, এই মেয়েটির চোখে আর এক বিন্দু অশ্রুকনা আসতে দেবে না।
সম্পর্কটাতে আর কোনো দ্বিধার জায়গা দেবে না, আর না দেবে কাউকে এই সম্পর্কটা নিয়ে ছেলেখেলা করতে!
সিকদার বাড়ির অন্দরমহলে সরব অস্থিরতা, আতঙ্ক আর পাঁচ কথা ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঘটনা শুনে। তপোবন শাশুড়ির কোলে স্ত্রীকে শুইয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়। নীলিমার পাশে গুটিয়ে শুয়ে আছে শুকতারা।
তপোবন ঘর থেকে বের হতেই উঁকি ঝুঁকি দিতে থাকা তার মেজো চাচি হড়বড়িয়ে শুধায়,
–“ও তপোবন, ক্ষতি টতি হইয়া গেছে কি? কিছু করতে পারছে? সংসার করতে পারবে তো?”
তপোবন শান্ত বদনে কঠিন চোখে তাকায় উৎসুক নারীটির পানে। থমথমে মুখে বলল,
–“ডাক্তার আসবে একটু পর। ততক্ষণ উনাদের একটু খেয়াল রাখুন, আমি পনেরো মিনিটের মধ্যে আসছি। আর হ্যাঁ, দয়া করে কাঁটা গাঁয়ে নুনের ছিটা দেয়ার মতো কোনো কথা বলবেন না।”
তপোবনের কথায় মেজো চাচির মুখ থমথমে হয়ে গেল। বলল,
–“তুমি আমার সাথে এমন কইরা কথা বলতে পারলা? চাচি হই তোমার।”
–“কিন্তু বড়দের মতো কখনো বুঝেশুনে কথা বলেন না, চাচি। উনারা কি পরিস্থিতি দিয়ে গিয়েছে, সহানুভূতি না দেখিয়ে আপনি জিজ্ঞেস করছেন সংসার করতে পারবে কি-না! রিডিকিউলাস!”
তপোবনের গ্রামের বাড়ির গেটে দু’জন দারোয়ান থাকে। এটা ব্যতীত চারপাশে কোনো দেহরক্ষী নেই। এটাই বোধহয় গজা আর মিন্টুর সবচেয়ে বড় সুযোগ হয় সিকদার বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকতে পারার।
তপোবনের এতক্ষণ বাদ মনে পড়ল ছেলের কথা। সে বিচলিত দৃষ্টি ফেলে দ্রুত কদমে নিচে নেমে আসে। দারোয়ান দু’জন পাণ্ডর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন নিচে। তপোবন তাদের দিকে ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে শুধায়,
–“এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? সারাদিন এগুলো করেন বলেই আজ এই দিন দেখতে হলো। অনেক হয়েছে, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য আমরা কাউকে বেতন দেই না। আপনারা যেতে পারেন।”
বলেই সে হাঁক ছেড়ে তানশানকে ডাকলো।
–“তানশান…তানশান…আব্বু, কোথায় তুমি?”
তানশানের কোনো সাড়াশব্দ আসল না। দারোয়ানদের মধ্যে একজন বিমর্ষ মুখে বলল,
–“স্যার, তানশান বাবা ঐ পেছনের জঙ্গলে একটা গুন্ডাকে পেটাচ্ছে তো পেটাচ্ছেই। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি থামানোর, কিন্তু পারিনি।”
তপোবন হতভম্ব হয়ে গেল তার কথায়। অবাক কণ্ঠে শুধায়,
–“তানশান? গুন্ডা পেটাচ্ছে মানে? ও এমন কিছু করতেই পারে না।”
সে ছুটে বের হয় বাড়ি থেকে। রূপকথাদের বাড়ির পেছনের দিকটায় গেলে অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো রক্তাক্ত একটা দেহ দেখে। তানশান হিংস্র মুখে একাধারে পিটিয়ে যাচ্ছে। যেই ছেলে সামান্য কারোর চোখের পানি সহ্য করতে পারে না, সেই ছেলে কাউকে পিটিয়ে আধমরা বানিয়ে দিয়েছে। রক্তে জবুথবু হয়ে আছে আধমরা দেহটি।
সে চেঁচিয়ে উঠল,
–“তানশান, হাউ ডেয়ার ইউ? তুমি কি করছো ভাবতে পারছো?”
বাবার হুঙ্কারে তানশানের গতিরোধ হয়ে আসে তবুও চোখমুখ থেকে রাগ, হিংস্রতা সরে না। সে আরো দুই ঘা লাগিয়ে দিলে তপোবন তাকে টেনে বক্ষমাঝে আঁকড়ে ধরে। তানশান রাগে ফুঁসে উঠে বলে,
–“এটাকে মেরে ফেলব আমি। ওর সাহস কি করে হয় আমার মিমির গায়ে হাত দেয়ার? বাস্টার্ড!”
হতবাক তপোবন ধমকে উঠল,
–“তানশান, হাউ ডেয়ার ইউ ইউজ স্ল্যাং? তোমার সাহস কি করে হয় এসবে নিজে জড়ানোর?”
তানশান অবাক কণ্ঠে বলল,
–“সে মিমির আর তার পরিবারের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে, তাকে আমি মারব না? তুমিই তো বলো, আমায় মিমিকে সবসময় সব বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য।”
তপোবন রাগ দেখাতে গিয়েও দম ফেলল। বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“সেটা আমি যখন তোমার আশেপাশে থাকব না। এখন তো পাপা আছি। তার থেকেও বড় কথা, তোমার দ্বারা কেউ রক্তাক্ত হলো কি করে?”
তানশান আজ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সে রেগে কাঠটা ছুঁড়ে মেরে বলল,
–“যা করেছি বেশ করেছি। আবার এমন সিচুয়েশন আসলে আবারও করব, আর সেইবার একদম জানে মেরে ফেলব।”
বলেই সে গটগট করে ঘরে চলে যায়। তপোবন অবাক চোখে তাকায় ছোট্ট ছেলেটির দিকে। না না ছোট্ট ছেলেটি নয়, সে এখন তার মিমির যোগ্য ছেলে।
তানশান সোজা তার অচেতন মিমির পাশে গিয়ে পা গুটিয়ে বসে রইল। নীলিমা পিটপিট করে দেখে রূপকথার হাত ধরে টলটলে নেত্রে ছেলেটি কেমন মায়াভরা নেত্রে চেয়ে আছে। সে ম্লান হেসে শুধাল,
–“নানুভাই, ভালো আছো?”
তানশান মুখ তুলল। তাকায় স্নেহভরা মুখপানে। মৃদু হেসে বলল,
–“ভালো আছি। আপনাদের আর ভয় নেই, আর কেউ আপনাদের ক্ষতি করতে পারবে না। পাপা সব সুরক্ষা নিশ্চিত করে দিয়ে যাবে।”
নীলিমা মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রাখল। তাদের একটা ছোট অভিভাবক হয়েছে। ডাক্তার আসল, রূপকথাকে চেকাপ করে জানালো ভয় আর মানসিক চাপের কারণে জ্ঞান হারিয়েছে। একটা খামচি ব্যতীত বাহ্যিক কিংবা অভ্যন্তরীণ কোনো ক্ষতি হয়নি।
নীলিমা আর শুকতারাকেও ডাক্তার পর্যবেক্ষণ করে বেরিয়ে আসে। তারা সবাই ঠিক আছে, তবে আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।
তপোবন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বেরিয়ে আসে। পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে নিচ তলার স্টোর রুমের দিকে পা বাড়ায়। বহুদিনের বদ্ধ কামড়ায় ঢুকতেই লাল লাইটের আলোয় দৃশ্যমান হয় দু’টো ঝুলন্ত দেহ।
তপোবন ক্রুর চোখে তাকায় পাশের টেবিলে রাখা মোটা মোটা লাঠিগুলোর দিকে। তপোবনের মেজো চাচা পিছু পিছু গম্ভীর মুখে ঢুকলেন। গম্ভীর গলায় বললেন,
–“অক্ষত অবস্থায় পুলিশের হাতে দিলে ভালো হতো না?”
তপোবন একটা মোটা লাঠি হাতে তুলে নিয়ে বলল,
–“উঁহু, তাদের বুঝতে হবে তারা কোথায় হাত দিয়েছে। এভাবে ছেড়ে দিলে তারা ভুলে যাবে তারা কোনো একদিন তপোবন সিকদারের কলিজার দিকে হাত বাড়িয়েছিল। তুমি বের হও চাচু, আমি দশ মিনিট পর বের হচ্ছি। পুলিশে ফোন দাও।”
মেজো চাচা বেরিয়ে আসে। গজা আর মিন্টু নিভু নিভু চোখ মেলে তাকায়। নিজেদের উল্টো অবস্থান দেখে অনুনয় করে বলল,
–“আর কখনো করব না এই ভুল। এবারের মতো ছেড়ে দিন।”
তপোবন চোয়াল শক্ত করে বলল,
–“যা ভুল করার করে ফেলেছিস। আজকের পর থেকে আমার স্ত্রী-পরিবার কেন, তোরা কোনো মেয়ের দিকে তাকানোর ই সাহস পাবি না।”
বলেই তপোবন দরজা বন্ধ করে দিল। এরপর রাতের নিস্তব্ধতা কেমন ভারী হয়ে উঠল লাঠিচার্জের লাগাতার শব্দ আর আর্তনাদে। দরজা খুলে উঁকি দিয়ে থাকা তানশান দাঁতে দাঁত চাপলো গজা আর মিন্টুকে তরপাতে দেখে। অন্তঃস্থল ভীষণ প্রসন্ন হয় বাবার কাজে। সে আনন্দ ধরে রাখতে না পেরে বাবাকে আরো উৎসাহ দিয়ে বলল,
–“পাপা গুড, ভেরি গুড! আরো জোরে দাও। হাত দু’টো ভেঙে দাও একদম।”
ক্ষিপ্ত তপোবন অবাক হলো ছেলের কণ্ঠে। সে তড়িৎ গতিতে থেমে যায়। পিছু ফিরে তাকাতেই তানশানের উঁকি দেয়া মুখটি দেখে সে রেগে গেল,
–“হোয়াট রাবিশ তানশান, গেট আউট ফ্রম হিয়ার। তুমি এখানে কি করছ? দিন দিন অবাধ্য হয়ে যাচ্ছ তুমি।”
তানশানের মুখ ছোট হয়ে গেল। সে আবার দরজা চাপিয়ে রেখে চলে গেল। তপোবন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে তাকায় গজার পানে। গনগনে কণ্ঠে শুধায়,
–“রূপকথাকে ছুঁয়েছে কে? তুই, নাকি তুই?”
ব্যথায় কাতর গজা আর মিন্টু নির্বাক। তপোবন গর্জে উঠল,
–“আমি আর একবার জিজ্ঞেস করব। যদি না বলিস, তোদের দু’জনের হাত গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেব।”
মিন্টু হড়বড়িয়ে দূর্বল কণ্ঠে বলল,
–“ও গজা ছুঁইছে।”
তপোবন তাকায় গজার হাত দুটোর দিকে। গজা ভয়ার্ত চোখে আর্তনাদ করে বলল,
–“এই ভাই, ছাইড়া দেন। আমি মদ খাওয়া ছিলাম। মাথা কাজ করতেছিল না।”
তপোবন হিংস্র দৃষ্টি ফেলে স্মিত হাসল। বলল,
–“ছেড়ে দেব, কিন্তু ঐ দুঃসাহসী হাত দুটো ভাঙার পর।”
পরমুহূর্তটি গগনবিদারী আর্তনাদে ফের ভারী হয়ে উঠল। তপোবন দশ মিনিট বাদ বেরিয়ে আসে। উঠোনে তখন সদ্যই পুলিশের গাড়ি এসে থামে। দারোগারা গজা মিন্টুকে গাড়িতে উঠাল। ও.সি মিনমিনে স্বরে বলল,
–“সুস্থ সবল দিলে ভালো হতো।”
তপোবন পাঞ্জাবি পড়তে পড়তে বলল,
–“আপনাদের পকেট গরম হয়ে গেলেই তো ছেড়ে দেবেন। তাই শাস্তিটুকু আমিই দিয়ে দিলাম।”
ও.সি বিগলিত হেসে বলল,
–“ওদের অত টাকা পয়সা আছে নাকি!”
তপোবন নিরুত্তর এক পলক ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে ঘরে চলে গেল।
তখন রাত প্রায় দশটা। তপোবন বিনম্র চিত্তে নীলিমার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসল। বিনম্র কণ্ঠে বলল,
–“আমাদের আজ যেতে হবে, আম্মা। আমি এই পরিস্থিতিতে ওকে কখনো নিতাম না। কিন্তু ও-কে সসম্মানে বাড়িতে ফিরিয়ে নেয়াটা জরুরি। দয়া করে আমার কথায় কষ্ট পাবেন না।”
নীলিমা ম্লান হেসে বলল,
–“আমি জানি, ওই বাড়িই এখন কথার আসল পরিচয়। আমি ওকে আটকাব না। কিন্তু আশা করি আর ওকে বিনা দোষে লাঞ্ছিত হতে হবে না।”
–“আমি যতদিন তার পাশে আছি আর কোনোদিন এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না, আম্মা।”
নীলিমা মাথা নাড়ল। তপোবন অনুরোধ করল, এখন থেকে তাদের মূল দালানের নিচ তলাতেই থাকতে। অনুরোধ করল, অন্তত ছোট মেয়েটার কথা চিন্তা করে হলেও তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে। নীলিমা আজ কেন জানি আর নাকচ করল না। মেনে নিল। তপোবন লোক ঠিক করে দিয়েছে, রাতের মধ্যে তাদের সব জিনিসপত্র এই দালানে শিফট করার জন্য।
তপোবন বাড়ির নিরাপত্তা ও বাড়িয়ে দিল যথাসম্ভব। অতঃপর সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে বাবা-ছেলে নিজেদের সুখকে নিয়ে ছুটল।
তপোবন রূপকথার অচেতন দেহ নিয়ে গাড়ির কাছে আসতেই, তানশান দ্রুত ব্যাকসিটে বসে পড়ল। নিজের দুই পা দেখিয়ে বাবাকে বলল,
–“পাপা, মিমিকে এখানে আমার কোলের উপর শুইয়ে দাও।”
তপোবন ছেলের স্নিগ্ধ মুখপানে চেয়ে স্মিত হেসে তার কোলেই শুইয়ে দিল। ভীষণ মনোমুগ্ধকর এক বিরল দৃশ্য! তপোবন কিয়ৎকাল দরজা ধরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তানশান তার মিমির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে পরম যত্নে।
তপোবন জানত, তানশান একদিন না একদিন রূপকথাকে মেনে নেবে। কিন্তু কখনোই ভাবেনি দিনটা এত দ্রুত আর এত সহজে আসবে। আর অবশ্যই কখনো ভাবেনি এই দিনটা এত অপার্থিব সৌন্দর্যের সাথে আসবে।
সে মৃদু হেসে মাথা নুইয়ে ছেলের ঘর্মাক্ত ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। বিমুগ্ধ চিত্তে বলল,
–“পাপাকে জীবনের সব পর্যায়ে সবভাবে জিতিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, আব্বু।”
তানশান লাজুক হাসল। এসব আবেগী কথায় তার ভীষণ লজ্জা করে।
খুলনা ফিরতে ফিরতে রূপকথার জ্ঞান ফিরল। কিন্তু চেতনা ফিরলেও তার মাঝে স্বাভাবিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না, বরং সে নিথর দেহে পড়ে রইল তানশানের কোলে।
তানশান প্রফুল্ল হতে গিয়েও হতে পারল না। কেননা সে জানে, অন্য কোনোদিন হলে মিমি খুব খুশি হতো তার কোলে নিজেকে দেখে। কিন্তু আজ তার মাঝে একটু আনন্দ তো দূর নড়াচড়াও দেখা যাচ্ছে না।
সরোবরে ঢুকতেই তপোবন গাড়ি থেকে নেমে আসে। নিথর পড়ে থাকা মেয়েটির ম্লান দৃষ্টি কোনো এক অজানা গন্তব্যের পানে। তপোবনের বুকটা মুচড়ে উঠল অচেনা এক রূপকথাকে দেখে। সে জানে, রূপকথার পাওয়া ক্ষতগুলো সহজে প্রতিকার হবে না, স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। কিন্তু সে এটাও জানে, এই কঠিন পথটা সহজ করা শুধুমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব।
সে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল মেয়েটিকে। নির্জনা বেগম তখনো সোফায় ঠাঁই বসেছিলেন। তখনি সদর দরজা থেকে ঢোকা তপোবন, রূপকথা আর তানশানকে দেখে সে থমথমে মুখে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
তপোবন নির্বিকার রূপকথাকে নিজের ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিল। তানশান ঘুরঘুর করছে বাবার আশেপাশে। তপোবন হাত মুখ ধুয়ে এসে কোমরে হাত দিয়ে তাকায় অস্থির ছেলের পানে।
কিছুটা অবাকের সুরে বলল,
–“আমি এখনো ভাবতে পারছি না তুমি কাউকে মেরে আধমরা বানিয়ে ফেলেছো, তানশান। তুমি না কারোর কান্না দেখেও বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে আর বলতে, বাবা তাকে কাঁদতে বারণ করো, আমার কষ্ট হয়? তবে?”
তানশান বেজায় লজ্জা পেল, আর রাগ ও হলো বাবার কথায়। সে থমথমে মুখে বলল,
–“তা তো ভালো মানুষের কান্না দেখলে কষ্ট হয়। কিন্তু খারাপ মানুষের কান্না দেখলে কষ্ট হয় না বরং তাদের রক্ত দেখলে আনন্দ লাগে।”
তপোবন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল পনেরো বছরের ছেলেটির দিকে। শাসিয়ে বলল,
–“তুমি কি এরোজের আচার আচরণ আয়ত্ত করছো? লিসেন তানশান, এমন কিছু হলে আমি পিটিয়ে তোমার হাড়গোড় ভেঙে ফেলব। পড়াশুনায় মনোযোগী হও। কে খারাপ, কে ভালো তা দেখার জন্য এখনো পাপা আছি। আমি যেন আর কোনোদিন তোমার মাঝে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ না দেখি।”
তানশান পাণ্ডুর মুখে মাথা নেড়ে সায় জানালো,
–“ওকে পাপা।”
–“হাত মুখ ধুয়ে পোশাক বদলে শুয়ে পড়ো। সকাল সকাল উঠে পড়তে বসবে।”
তানশান শান্ত দৃষ্টি ফেলল বিছানায় নীরবে শুয়ে থাকা রূপকথার দিকে। দেয়ালের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
পরপরই বাবার দিকে তাকালে তপোবন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে মিহি স্বরে বলল,
–“ভয় পেয়েছে তাই এমন করে শুয়ে আছে। সকালে কথা বলো, এখন ঘুমাক। একটু সময় কাটলে ভয় কেটে যাবে।”
তানশান বাবার কথা বুঝল। মাথা নেড়ে নীরবে চলে গেল নিজের ঘরে। এরপর একে একে দুয়ারে ঘরের সকলে এসে দাঁড়াল। তপোবন সকলকে আশ্বস্ত করে পাঠিয়ে দিল। আগামীকাল কথা হবে।
লাগাতার ভাইব্রেট করা ফোনটির দিকে আরেকদফা বিরক্তি মিশ্রিত দৃষ্টি ফেলল তপোবন। অতঃপর ‘ছোট খালুজান’ লেখা নাম্বারটি ব্লক করে দিল।
ঘরে ফিরতেই বিছানা একদম খালি পেল। ওয়াশরুম থেকে শব্দ আসছে। সে শ্রান্ত দেহ বিছানায় এলিয়ে দিল।
আলমারিতে থাকা সবচেয়ে সাদামাটা শাড়িটি আজ অনাদরে লেপ্টে আছে দূর্বল কায়ায়। দূর্বল কদম, বিধ্বস্ত মুখশ্রীতে কেউ এগিয়ে আসতেই তপোবন চোখ খুলে তাকায়। সম্মুখে নত শির দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির অশ্রুভেজা চোখে চোখ পড়তেই সে মৃদু হাসল। আলগোছে দুই হাত বাড়িয়ে দিল নারীটির দিকে।
রূপকথা তাকায় বাড়িয়ে দেয়া ভরসাটুকুর দিকে। অতঃপর গুটি গুটি কদমে গিয়ে লেপ্টে গেল বক্ষমাঝে। তপোবন শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ছোট্ট দেহটিকে।
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৭
প্রশস্ত বক্ষে তপ্ত মুখটি ঠেকতেই রূপকথার বদ্ধ চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অন্তঃস্থল আর্তনাদে ভারী হয়ে আছে তবুও কণ্ঠনালী ঠিকরে কিছু বের হচ্ছে না।
বুকে জড়িয়ে নেয়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়া দূর্বল দেহটি দেখে তপোবন ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেলল। আলগোছে মাথা নুইয়ে নিল এবং প্রথম বারের মতো নির্দ্বিধায় আলতো ছুঁয়ে দিল মেয়েটির নরম পেলব অধর।
বদ্ধ নেত্রে ঝিমুতে থাকা রূপকথা কেঁপে উঠল অভাবনীয় অনাকাঙ্ক্ষিত পবিত্র স্পর্শে। মনে হলো ঐ সামান্য স্পর্শটুকু তার শরীরের সকল অপবিত্র স্পর্শ ভীষণ যত্ন সহকারে মুছে দিয়েছে।
