অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮ (৩)
তোনিমা খান
দুঃস্বপ্ন না কি ভবিতব্য? দৃশ্যগুলো এতটা সুস্পষ্ট আর নিখুঁত কেন?
বাইরের তাপমাত্রা তখন মাইনাস ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঘামে ভিজে একাকার পুরুষালী দেহটি বদ্ধ নেত্রে অসহনীয় যন্ত্রণায় ছটফট করছে। চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অসহায়ত্বের অশ্রু। অবরুদ্ধ কণ্ঠে কেবল অস্ফুট কিছু গোঙানি বেরিয়ে আসছে তার ঠোঁট চিরে।
লিরা উদ্বিগ্ন চিত্তে এরোজের গায়ে হাত রাখল। ব্যাকুল স্বরে নিজ ভাষায় শুধাল,
-“এরোজ? কী হয়েছে তোমার? এমন করছ কেন? শরীর খারাপ লাগছে? এরোজ!”
কারও ক্রমাগত ধাক্কায় হাসপাতালের বেঞ্চে শুয়ে থাকা এরোজ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। তার অস্থির দুটি নয়নে তখনো নিঃশেষিত শোকের গাঢ় ছায়া। অবশ মস্তিষ্ক থেকে ঘোর কাটছে না সেই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের। হারিয়ে ফেলার ভয় আর তীব্র অসহায়ত্বে চারদিকে দিশেহারা দৃষ্টি মেলে সে আর্তনাদ করে উঠল,
-“মৌন? মৌন, আপনি কোথায়? আপনি এভাবে আমায় ছেড়ে যেতে পারেন না! এই মৌন?”
এরোজকে এমন উন্মাদের মতো আচরণ করতে দেখে লিরা হন্তদন্ত হয়ে বলল,
-“কী হয়েছে তোমার? এমন করছ কেন? দুঃস্বপ্ন দেখেছ বুঝি? মৌনতাকে খুঁজছ? ও তো কেবিনে ঘুমাচ্ছে।”
এরোজ অশ্রুসিক্ত নয়নে এদিক-ওদিক তাকাল। ধরা গলায় অস্থিরচিত্তে বলল,
-“তুমি মিথ্যা বলছ, তাই না? আমার মৌন আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে! আমি স্পষ্ট দেখেছি… সেই কবরস্থান… ওই ল্যাভেন্ডার ফুল… আমার ডায়েরি! সব শেষ হয়ে গিয়েছে লিরা। শুরু হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে না!”
বলতে বলতেই এরোজ লিরাকে সরিয়ে দিয়ে উন্মাদের মতো কেবিনের দিকে ছুটল। পা দুটো কাঁপছে, শরীরে পর্যাপ্ত বল নেই, তবুও সে থামল না। যখন সেই কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল, স্বপ্নের মতোই তার পদযুগল স্থবির হয়ে গেল। তবে এবার হারানোর ভয়ে নয়, বরং নিজের অসহায়ত্বে।
সে কারোর মাঝে এতটাই বিভোর যে ভাগ্যের মতো এখন ভ্রমও তাকে ভয় দেখায়। কার্ডিয়াক মনিটরে সচল হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনে এরোজ ধপ করে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। শান্ত কামরার নিস্তব্ধতা ভেঙে পুরুষালী কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। কড়া ওষুধের প্রভাবে আচ্ছন্ন থাকায় সেই আর্তনাদটুকু নিস্পন্দ নারীর কানে পৌঁছাল না।
এরোজ কাঁদতে কাঁদতে কম্পিত হাতে মৌনতার নিস্তেজ হাতটি আলতো স্পর্শ করল। হাতের উষ্ণতা অনুভব করতেই ছেলেটি কান্নাভেজা চোখে হাসল। না, স্বপ্নের মতো হাতটি বরফশীতল নয়! সে মৌনতার হাতটি আঁকড়ে ধরল, যতটা শক্ত করে ধরা সম্ভব। মনের গহিনে জমে থাকা ভয়ের মেঘ কাটাতে সেই হাতটি নিজের গালের সঙ্গে চেপে ধরল সে। বদ্ধ নেত্রে পরম আবেশে অনুভব করল সেই ছোঁয়াটুকু। ফিসফিসিয়ে বলল,
-“ভাগ্যের সাথে লড়তে লড়তে আমি ভীষণ ক্লান্ত, মৌন। আমায় একটু ভালোবাসুন না!”
কিন্তু এই আকুল আবদারটুকু শোনার মতো কেউ ছিল না। লিরা ধীর কদমে এগিয়ে এসে তার ঘাড়ে হাত রাখল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
-“এতই যখন ভালোবাসো, তবে তাকে কখনো বলো না কেন?”
এরোজ নীরব। সে বলতে চায়, খুব করে বলতে চায়। কিন্তু তার মনে কেবল একটাই সংশয় যদি এই সামান্য নৈকট্যটুকুও হারিয়ে যায়? মৌনতা যদি তাকে ঘৃণা করে দূরে সরে যায়? যদি তার কাছে চিকিৎসা নিতেই অস্বীকার করে?
এরোজের দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে লিরা ওর মাথায় হাত রেখে বলল,
-“এত দ্বিধা করো না। যা হওয়ার হবে, বলে দাও। সময় যদি একবার হাতছাড়া হয়ে যায়, তবে আগেরবারের মতো সারাজীবন শুধুই আফসোস করবে।”
লিরার কথাগুলো এরোজের কানে তীরের মতো বিঁধল। চোখের সামনে ভেসে উঠল বিগত ছয় বছরের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তগুলো। মানসপটে বারবার উঁকি দিতে লাগল ভেজা চুলে সেই প্রিয় রমণীর স্নিগ্ধ প্রতিচ্ছবি—যা সে আজও ভুলতে পারেনি। তার বক্ষস্থল আবারও কেঁপে উঠল।
ভয়ঙ্কর রাতটি সেভাবেই পার হয়ে গেল। ভোরের দিকে মৌনতা যখন দুর্বল চোখ মেলল, তার দৃষ্টি আটকে গেল হাসপাতালের সাদাটে বিবর্ণ দেয়ালে। বুকটা হু হু করে উঠল তার। আজ তিন দিন হতে চলল সে নায়েলকে দেখতে পায়নি। ঠিক এই ভয়েই সে কাউকে বুঝতে দেয়নি তার শরীর কতটা খারাপ ছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না; আবারও সেই চার দেয়ালের বন্দিত্ব।
শুয়ে থাকতে থাকতে শরীরটা যখন সামান্য নাড়ানোর চেষ্টা করল, তখনই সে চমকে উঠল। বিস্ময় নিয়ে দেখল, তার বেডের পাশে মাথা রেখে মেঝেতে বসে আছে এরোজ। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো তার হাতের মুঠোয় নিজের হাতটি দেখে।
মৌনতার শরীর অস্বস্তিতে আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে ঝট করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতেই তন্দ্রাচ্ছন্ন এরোজ হকচকিয়ে জেগে উঠল। সুপ্ত মস্তিষ্কে ভয়ের রেশ কাটেনি বলে সে আবারও মৌনতার হাত টেনে এনে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে শুধাল,
-“কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে বলুন? ডাক্তার ডাকব?”
এরোজের এমন অদ্ভুত আচরণে মৌনতা যারপরনাই বিস্মিত। সে সন্দিগ্ধ নয়নে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করল,
-“আপনি এমন করছেন কেন?”
মৌনতার শীতল কণ্ঠস্বর শুনে এরোজের চৈতন্য ফিরল। নিজের অগোছালো আচরণের দিকে তাকিয়ে সে দ্রুত হাত ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গেল। গায়ের ওভারসাইজড টি-শার্ট আর ট্রাউজার ঝেড়ে অস্বস্তি লুকানোর চেষ্টা করল। মৌনতার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে কৃত্রিম গাম্ভীর্যে বলল,
-“শরীর এখন কেমন? খারাপ লাগছে?”
-“না। কিন্তু আপনি এখানে কী করছিলেন?”
-“কিছু না… আমি একটু আসছি।”
এরোজকে এক প্রকার মুখ লুকিয়ে প্রস্থান করতে দেখে মৌনতার সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো। সে নিশ্চিত, এই মানুষটি কিছু একটা লুকাচ্ছে। নিশান্তও সেদিন তাকে সত্যিটা বলেনি। কিন্তু সে সত্যিটা জানবে কী করে? এক অজানা আশঙ্কায় তার অন্তঃস্থল ক্রমশ বিচলিত হয়ে উঠতে লাগল।
কর্মক্ষেত্রে এরোজের শুভাকাঙ্ক্ষী হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন, বাকি সবার কাছেই সে চক্ষুশূল। এর যথাযথ কারণও আছে, কাজের প্রতি এরোজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, প্রখর মেধা আর একনিষ্ঠ পরিশ্রম। যে কাজ যতটুকু করে খুব মনোযোগ আর দায়িত্বের সাথে করে। এই গুণগুলোর কারণেই সে বসের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছে। কর্মক্ষেত্রে তার এই প্রখরতাই বহুজনের চাকরি খেয়ে নিয়েছিল। মূলত এর জন্যই তাকে সবাই সহ্য করতে পারে না আর কিছুটা এড়িয়েও চলে।
মধ্যরাতে প্লেন টেক অফ করবে। ফ্লাই করার আগে প্লেনের যাবতীয় যন্ত্রাংশগুলো সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তার জন্য রাত বারোটা নাগাদ এরোজসহ অফিসের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত হন। প্রথম চারজন পুরো চেক করে কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্ত করলেন, কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু এরোজ তখনো নিশ্চুপ, নিগুঢ় চোখে পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত। তাই দেখে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আত্মসম্মানে আঘাত লাগল। সে দাম্ভিকতার সাথে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“মিঃ এরোজ, আপনি শত চেষ্টা করেও কোনো ত্রুটি পাবেন না। কারণ এবার আমি নিজ দায়িত্বে সবটা চেক করেছি। আপনার থেকে আমার এই পেশায় অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। এবার চলে আসুন।”
লোকটির দাম্ভিক কণ্ঠে এরোজ স্মিত হাসল। ঠান্ডায় জমে যাওয়া দুই হাত ঝেড়ে পকেটে ঢুকিয়ে শান্তভাবে প্লেনের বাইরের অংশে থাকা পিটট টিউবের দিকে নির্দেশ করে বলল,
-“স্যার, আপনার অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু লেফট-সাইড পিটট টিউবের ভেতরকার বায়ু চলাচলের পথটিতে পোকা নয়তো কোনো একটা ময়লা আটকে আংশিক রুদ্ধ হয়ে আছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি নগণ্য মনে হলেও, আকাশে এই সামান্য প্রতিবন্ধকতাই কয়েকশ যাত্রীর জীবনের জন্য ডেথ ওয়ারেন্ট হতে পারে। আমি ল্যাব রিপোর্ট ছাড়াই বলছি, এই ব্লকেজ নিয়ে টেক-অফ করা আত্মহত্যার শামিল।”
উপস্থিত সকলে চমকাল। কারোর চোখে না পড়া সামান্য ব্লকেজটুকু এবার সবার নজরে এল। সকলের মুখ সেই পর্যায়ে বিবর্ণ হয়ে গেল লজ্জায় ও অপমানবোধে। কেননা প্লেন আকাশে উড্ডয়নের পর এই সামান্য ব্লকেজটুকু প্লেনের গতিবিধির ভুল তথ্য দিত পাইলটকে। ফলে যেকোনো দুর্ঘটনা হতে সময় লাগত না।
সেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মুখ ছোট হয়ে গেল বসের চোখে চোখ পড়তেই। ভদ্রলোক রেগেমেগে একদফা ঝাড়লেন তাদের।
ত্রুটিটুকু ঠিক করা হলো। এরোজ হাসপাতালে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলে বস বললেন,
-“এরোজ আরেকবার প্লিজ সবটা চেক করে যাও।”
এরোজ ফিরে তাকায়। মৃদু হেসে বলল,
-“প্রিয়জন হারানোর কষ্ট কতটা যন্ত্রণা দেয় আমি জানি, স্যার। সবটা আগেই আমি চেক করেছি, প্লেন টেক অফ করার জন্য একদম প্রস্তুত।”
বস মৃদু হাসলেন। ঠিক এই কারণেই ছেলেটিকে সে খুব পছন্দ করে। কাজ হোক বা সম্পর্ক সবটা বড্ড যত্ন, একাগ্রতা আর বিশ্বস্ততার সাথে পালন করে। যেটা সবাই করে না।
নিজের গাফিলতির কারণে মৌনতাকে আরও দুই সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। মৌনতা তখন আনমনে কাঁচের দেয়াল ভেদ করে তমসাবৃত আকাশ দেখছিল। তন্মধ্যেই কেউ কামরায় ঢুকল। মৌনতা জানে এই অসময়ে কে আসতে পারে, তাই কোনো উদ্বেগ দেখা গেল না তার মাঝে। বরং চোখ ভরে ওঠে অসহায়ত্ব আর যন্ত্রণায়।
এরোজ শায়িত নারীটির পানে এক পলক চেয়ে পাশের টেবিলে রাখা প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র গোছাতে লাগল। ব্যস্ত কণ্ঠে শুধাল,
-“জেগে আছেন কেন?”
-“ঘুম আসছে না।”
-“কেন? শরীর খারাপ লাগছে?”
মৌনতার চোখের কার্নিশ ভিজে উঠল। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
-“বাসায় যাব। আমায় এখানে কেন এনেছেন? বারণ করেছিলাম না? এখানে আসলেই ডাক্তাররা আটকে রাখে।”
এরোজ ম্লান হাসল। বেরির বক্সগুলো গুছিয়ে নিয়ে বলল,
-“বাইরে যাবেন?”
মৌনতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল এবার। বলল,
-“মজা করছেন?”
-“উঁহু।”
-“সত্যি নেবেন?”
-“হুঁ।”
-“আচ্ছা চলুন। নায়েলের কাছে নেবেন?”
-“নেব।”
কার্টুন পেলেই বাচ্চারা যেমন খুশি হয়ে যায়, মৌনতাও ঠিক তেমনি খুশি হয়ে গেল। পুতুলের মতো উঠে বসে হাত এগিয়ে দিয়ে বাচ্চাদের মতো বলল,
-“ক্যানুলা খুলে দিন।”
-“নার্স আসছে। খুলে দেবে আর কিছু ওষুধ গুছিয়ে দেবে। সেগুলো নিয়ে যাব।”
-“ডক্টর কি আমায় যেতে দেবে?”
এরোজের জবাব দিতে হলো না। নার্স কক্ষে ঢুকেই হাসিমুখে বলল,
-“বাসায় যাওয়ার সময় এসে গিয়েছে।”
-“আমায় কী ডিসচার্জ দিয়েছে?”, মৌনতা চঞ্চল কণ্ঠে শুধাল। নার্স বলল,
-“হ্যাঁ, কিন্তু অনেক হাসিখুশি থাকতে হবে। চঞ্চল হতে হবে, ঘোরাফেরা করতে হবে। দুশ্চিন্তা করা যাবে না, নিজেকে কষ্ট দেয়া যাবে না। নয়তো কিন্তু আবার দীর্ঘদিনের জন্য তোমায় হাসপাতালে আটকে রাখা হবে।”
-“না না আমি অনিয়ম করব না।”, মৌনতা ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল। পনেরো মিনিটের মাথায় তারা বের হয়ে এল হাসপাতাল থেকে।
আজ বাইক দেখে আপাদমস্তক শীতের কাপড়ে আবৃত মৌনতা খানিক প্রসন্ন হলো। বলল,
-“সবসময় বাইক ব্যবহার করতে পারেন না? কেন ওই চার চাকার কবরস্থান নিয়ে ঘোরেন?”
-“চার চাকার কবরস্থান মানে?”, এরোজ ভ্রু কুঁচকে শুধাল।
মৌনতা বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
-“সব আটকানো, দম বন্ধ হয়ে আসে গাড়িতে চলতে।”
-“আর কখনো গাড়িতে চড়তে হবে না। আসুন।”
এরোজের বাধ্যগত কণ্ঠে মৌনতা ভড়কে গেল। তার পছন্দ নয় বলে আর কখনো গাড়ি চালাবে না না-কি? কী অদ্ভুত!
মৌনতা বাইকে চড়ে বসল।
বহুদিন বাদে খোলা আকাশের নিচে শীতল সমীরণের তীব্রতায় অসুস্থতার আধিপত্য ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে। মনটা খানিক ফুরফুরে হয়ে গেল। তবে বাইকটিকে দীর্ঘসময় একইভাবে অজানা অচেনা জায়গায় চলতে দেখে শুধাল,
-“কোথায় যাচ্ছেন?”
-“কোথাও না। এমনিই ঘুরছি। ডক্টর বলেছে আপনাকে বদ্ধ পরিবেশে রাখতে না। খোলামেলা পরিবেশে, প্রকৃতির কাছাকাছি রাখতে।”
-“ওহ্। কিন্তু আমি মাথা জাগিয়ে রাখতে পারছি না বেশিক্ষণ।”
এরোজ বাইক চালাতে চালাতে নির্বিকার চিত্তে বলল,
-“শুয়ে পড়ুন।”
-“কোথায়?”
-“আমার এত বড় পিঠ চোখে পড়ছে না? ওখানে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকুন, ভালো লাগবে।”
মৌনতা কপাল কুঁচকে নিল এহেন কথায়। থমথমে মুখে বলল,
-“বাসায় গেলেই পারেন।”
-“আধা ঘণ্টার আগে বাসায় যাচ্ছি না। আপনার সিদ্ধান্ত আপনি কী করে বসবেন এতক্ষণ।”
মৌনতা বেজায় বিরক্ত হলো। বহুক্ষণ মাথা জাগিয়ে রাখতে না পারায় শেষপর্যন্ত আলতো করে মাথা রাখল পুরুষালী পৃষ্ঠদেশে। দুহাতে আলতো করে এরোজের পেটের দুই পাশের সোয়েটার চেপে ধরে চোখ বুজতেই মনে হলো এর থেকে আরামদায়ক সফর বুঝি আর কিছুই হতে পারে না।
এরোজ এক মুহূর্তের জন্য নেত্রদ্বয় আবদ্ধ করে নেয়। বুকভরা এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সৃষ্টিকর্তা কারোর মাঝে এত প্রশান্তি লুকিয়ে রেখে, গোটা মানুষটাকেই তার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
আধা ঘণ্টার সফর এক ঘণ্টা হলো। বাইকের ইঞ্জিন থামতেই মৌনতার তন্দ্রাচ্ছেদ ঘটল। মাথা তুললে চোখের সামনে ভেসে উঠল এরোজের বাড়ি। সে দ্রুত নেমে গেল। তবে যাওয়ার আগে ধন্যবাদ দিতে ভুলল না এরোজকে।
সে ছুটে গিয়ে মায়ের ঘরে ঢুকতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল। নানুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে নায়েল। সে গিয়ে মেয়ের পাশে শুয়ে পড়ল। মাসুমা বেগম মেয়েকে দেখে অবাক হলেন।
-“মৌন, তুই এখানে?”
মৌনতা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে অজস্র চুমু খেতে খেতে বলল,
-“ডক্টর ছেড়ে দিয়েছে, আম্মা।”
-“কার সাথে এসেছিস?”
-“নায়েলের চাচু নিয়ে এসেছে।”
-“কই এরোজ তো আমায় বলল না।”
মৌনতা ঠোঁট উল্টে বলল,
-“আমিও জানতাম না। হঠাৎ গিয়ে নিয়ে এল।”
-“ওহ্।”, মাসুমা বেগম বিমর্ষ মুখে বললেন। এরোজের এত দুশ্চিন্তা, যত্ন সে মানতে পারে না, কিন্তু তবুও মনুষ্যত্ববোধের কারণে কিছু বলতে পারে না। মৌনতার এই পুরো ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ যে ওই ছেলেটা একা চালাচ্ছে।
এরোজ উপরে আসতেই মাসুমা বেগমের সাথে দেখা হলো।মাসুমা বেগম থমথমে মুখে শুধালেন,
-“মৌনকে যে আজ আনবে তা তো আগে থেকে কিছু বললে না?”
-“ডক্টরের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সে বলল, এখন অনেকটা সুস্থ। বাসায় নিয়ে যাওয়া যাবে। মৌনতাও ওখানে থাকতে চাইছিল না, তাই সাথে সাথেই নিয়ে এসেছি।”
মাসুমা বেগম কিছু বললেন না। এরোজ ফের বলল,
-“ঘুমানোর আগে তাকে কিছু ফল খাইয়ে দিয়েন।”
বলেই নতশিরে নিজের ঘরে যেতে নিলে মাসুমা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
-“এসব কেন করছ?”
এরোজ ফিরে তাকায় বয়স্ক মহিলার মুখপানে। বয়স্ক মহিলা ঠিক কোন জবাব চান তা জেনেও বলল না।
বলল,
-“নায়েলের জন্য।”
-“অন্য কোনো কারণ নেই?”
-“কী কারণ?”
মাসুমা বেগম কিছু বললেন না। শুধু চেয়ে রইলেন এরোজের নির্বিকার মুখের দিকে।
সকাল আটটা নাগাদ এরোজ ফোলা ফোলা মুখে ব্রেকফাস্ট বানাতে নিচে এল। নামতেই দেখল সোফায় নায়েল আর মৌনতা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। টিভি আপনমনে চলছে, মৌনতার হাতে একটা বই। নিকোলাস স্পার্কসের ‘আ ওয়াক টু রিমেম্বার’ বইটা দেখতেই এরোজের মাথা গরম হয়ে গেল। সে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বইটা ছিনিয়ে নিল। গমগমে স্বরে বলল,
-“এসব পড়বেন না, মৌন। এই বই আপনি কোথায় পেয়েছেন? এটা তো আমি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলাম।”
মৌনতা ভ্রু কুঁচকে বলল,
-“এটা সুন্দর! আপনি এটা ডাস্টবিনে ফেলেছেন কেন?”
-“এটা সুন্দর না। এটা বাজে, ফালতু। এসব পড়বেন না একদম।”
মৌনতা বুঝতে পারল না এত রাগের কারণ কী? বলল,
-“জেমি একদম আমার মতো। হয়তো আমার সমাপ্তিটাও জেমির মতোই হবে। আমি পড়ব, দিন। আমি শেষ অবধি এখনো যেতে পারিনি।”
এরোজ ক্ষোভে ফেটে পড়ল। ক্ষোভে ভরা কণ্ঠে বলল,
-“জেমিকে নিজের মাঝে খুঁজে নিয়েছেন কিন্তু ল্যান্ডন কার্টারকে খুঁজে পাননি, তাই না?”
মৌনতা সচকিত হয়। জেমি একজন লিউকেমিয়া পেশেন্ট। তার মতোই শান্ত, নম্র, আনস্মার্ট। কিন্তু জেমিকে আগলে রাখার জন্য ল্যান্ডন কার্টার ছিল, যে জেমির জীবনের শেষ অপূর্ণতাটুকু নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। তাকে পাগলের মতো ভালোবাসত।
সে বলল,
-“যা আমার জন্য অসম্ভব তা আমি কেন খুঁজব? ল্যান্ডন কার্টারের মতো মানুষ বইয়ের পাতায় থাকে, বাস্তব জীবনে থাকে না। বাস্তব জীবনে ভালোবাসার বিনিময়ে যন্ত্রণা, অবহেলা আর মৃত্যু দেয়া হয়।”
এরোজ ম্লান কণ্ঠে বলল,
-“কখনো খুঁজে দেখবেন, জীবন গল্পের থেকে বেশি সুন্দর। কেননা গল্প মানুষের সৃষ্টি আর জীবন আল্লাহর সৃষ্টি! আল্লাহর সৃষ্টি স্বপ্নের থেকেও অধিক সুন্দর হয়।”
বলেই এরোজ গটগট করে সদর দরজার দিকে এগিয়ে যায়। অবুঝ পানে তাকিয়ে থাকা মৌনতা উঁচু স্বরে বলল,
-“বইটা দিন। আমি শেষটা জানতে চাই। শেষ পর্যন্ত জেমির কী হয়েছিল?”
এরোজ ফিরে তাকিয়ে বলল,
-“জেমি সুস্থ হয়েছিল আর তার একটা সুন্দর সংসার হয়েছিল।”
বলেই সে সদর দরজা খুলে চলে গেল। বাসা থেকে অনেকটা দূরে গিয়ে একটা ডাস্টবিনের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বইয়ের শেষের পাতা খুলল।
খুলে ল্যান্ডনের বলা শেষ কথাটা কয়েকবার আওড়াল।
“I now believe, by the way, that miracles can happen.”
ওষ্ঠকোণে ম্লান হাসি নিয়ে এরোজ বইটা ডাস্টবিনে ফেলে দিল। গল্পে জেমি আর ল্যান্ডন হেরে গেলেও সে আর মৌনতা হারবে না। কারণ তারা দুজন আগে থেকেই হেরে যাওয়া দুটো মানুষ। সৃষ্টিকর্তা কখনোই কারোর সাথে অন্যায় হতে দেন না। তাদের সাথেও অন্যায় করবেন না।
জীবনকে হতে হয় সমুদ্রের মতো। দীর্ঘ প্রবাহে প্রবাহিত হতে গিয়ে পথিমধ্যে যত বাধা-বিপত্তি আসুক না কেন, তাদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কখনো কোথাও বাধা পেয়ে থমকে যাওয়া যাবে না।
তপোবন নিজের জীবনকে ঠিক এইভাবে প্রবাহিত করে চলেছে। জীবন তাকে বহুবার ভাঙার চেষ্টা করেছে কিন্তু সে কিছু না কিছু আঁকড়ে ধরে এগিয়ে গিয়েছে।
বাসার সামনের উদ্যানে চেয়ার পেতে বসে আছে তপোবন ও তকদির সিকদার। তপোবনের হাতে একটা আইনি নোটিশ আর তকদির সিকদারের হাতে একটা দলিলের কাগজ।
আইনি নোটিশটা এখনো বাবাকে দেখায়নি। তকদির সিকদার নিজের হাতের কাগজটি মনোযোগ সহকারে দেখে বললেন,
-“আলাদা বাড়ি করার কি খুব প্রয়োজন ছিল?”
তপোবন নিজের হাতের কাগজটি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাবার পানে তাকায়। বলল,
-“তুমি যেমন তোমার স্ত্রী সন্তানদের জন্য বাড়ি-গাড়ি সব করে রেখেছ, তেমন আমার ও আমার স্ত্রী সন্তানদের জন্য সব করে রেখে যাওয়া উচিত, আব্বু।”
-“এগুলো কি তোমাদের নয়?”
-“উঁহু, এগুলো তোমার এবং তোমার সন্তানদের, আব্বু। কিন্তু আমার সন্তান ও স্ত্রীর জন্য আমায় কিছু করতে হবে। যেন যেকোনো বিপদে তাদের মাথার উপর ছাদ থাকে।”
তকদির সিকদার মলিন মুখে বললেন,
-“তোমার ইচ্ছা। আমি আর কী বলব।”
তপোবন হাত বাড়িয়ে বাবার হাতের উপর হাত রাখে। নম্র স্বরে বলে,
-“আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন তোমার ছায়াতলে বাঁচব, আব্বু। তুমি কেন মন খারাপ করছ। এই বাড়ি শুধু আমি তানশান আর রূপকথার ভবিষ্যতের জন্য করে রাখছি।”
তকদির সিকদার মাথা নাড়লেন। তপোবন দীর্ঘক্ষণ বাদে নিজের হাতের কাগজটা বাবার হাতে দিল। বলল,
-“ইমরোজ অফিসে থাকা ওর অংশটুকু বিক্রি করে দিচ্ছে, আব্বু।”
তকদির সিকদার স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এই কোম্পানি তার আর তপোবনের কষ্টে গড়া। এখানে বাইরের মানুষকে ঢোকানো মানে তার গড়া সবকিছু তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়া। সে অবাক হয়ে বলল,
-“ইমরোজ এটা কী করে করতে পারে তপোবন? ও কি জানে না, আমাদের কোম্পানিকে ডোবানোর জন্য কত মানুষ ওঁত পেতে বসে আছে? ও কোন সাহসে বাইরের লোক ঢুকাতে চাচ্ছে? ওর কি একটুও করুণা হলো না আমাদের উপর?”
-“ইমরোজ ওর সামান্যতম বিবেকটুকু সেদিন খুইয়ে ফেলেছিল যেদিন ও ওর সন্তানের মাকে মারার চিন্তা করেছিল। আমি ওর এমন আচরণে খুব অবাক হইনি আব্বু।”
-“তুমি এই খবর কীভাবে পেলে?”
-“ও যে দালালকে দায়িত্ব দিয়েছে, সেই বলল। তার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। একবার বিপদে সাহায্য করেছিলাম। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নিজে থেকেই বলল এই কথা।”
-“এখন কী করবে? কোম্পানিতে বাইরের লোক ঢুকতে দেয়াই যাবে না।”
বাবার চিন্তিত কণ্ঠে তপোবন মৃদু হেসে বলল,
-“চিন্তা করো না। এতদিন যখন আগলে রেখেছি এখনো আগলে রাখব। ইমরোজের ভাগটা আমি কিনে রাখছি। ও জানে না এগুলো। আমি দালালকে জানাতে বারণ করেছি। ক্রেতা বিদেশে থাকে বলতে বলেছি।”
-“কিন্তু সাইন করার সময় তো তোমাদের দুজনের উপস্থিত থাকতে হবে। তখন তো ও জানবে। তখন কোনোভাবেই তোমার কাছে ও বিক্রি করতে চাইবে না।”
-“তখন কোনো উপায় থাকবে না। কারণ ও অলরেডি আশিভাগ টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে নিয়েছে।”
-“তুমি আগে জানাওনি কেন এগুলো?”
-“তুমি কষ্ট পাবে বলে। কিন্তু এখন চিন্তার কিছু নেই। আমাদের কোম্পানি সবটা আমাদের মাঝেই থাকবে।”
তকদির সিকদার নিশ্চিন্ত হলেন। বললেন,
-“তুমি ঠিক করেছ। নয়তো আমিই কিনে রাখতাম কোনোভাবে। ও বিক্রি করবে এটা তো আমাদের জানাতে পারত? আমরাই নাহয় টাকার বিনিময়ে কিনে রাখতাম।”
-“আমাদের কাছে বিক্রি করবে না বলেই জানায়নি।”
-“ঠিক বলেছ। ওটা তো একটা জানোয়ার। পরিবারের ক্ষতি করতেও ও দুবার ভাবে না।”
তপোবন কিছু বলল না। ছোট থেকে কোলেপিঠে মানুষ করায় সে আজও এই ভাইদের সাথে কোনো দুর্ব্যবহার করতে পারে না। তাই নীরবে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। সে কিয়ৎকাল বাদে বলল,
-“আমি এই ভাগটা রূপকথার নামে লিখে দিতে চাইছি, আব্বু। আশা করি তুমি কিছু মনে করবে না।”
তকদির সিকদার চোখ তুলে তাকালেন। মৃদু হেসে বললেন,
-“দেবে, তা আবার আমায় বলছ কেন? তুমি কিনছ, তুমি যা ইচ্ছা করতে পারো। আমি কী মনে করব?”
তপোবন ম্লান হেসে বলল,
-“কোম্পানিতে আম্মা, রোজ, মৌনতা থেকে শুরু করে সবার ভাগ আছে কিন্তু রূপকথার কোনো ভাগ নেই। যেহেতু একটা বড় অংশ আমার নামে, তাই এটা ওর নামে করে দিতে চাইছি, আব্বু।”
-“এত কৈফিয়ত দিতে হবে না তপোবন।”
-“জি আব্বু।”
বাবার সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা করে তপোবন বাড়িতে ঢোকে। জীবনের জটিল টানাপোড়েনে এসে অনুভব করল, রূপকথা ও তানশানের নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানা করা দরকার। যেটা সম্পূর্ণই তাদের শক্তি হবে। গতকাল ইমরোজ বলেছে, সে বাবার টাকায়, বাবার বাড়িতে বউ-বাচ্চা পালছে। হয়তো আগামী দিনে অন্য কেউও একই কথা বলবে। এই রোডেই বহু আগে তার কেনা একটা খালি জায়গা পড়ে আছে। সেখানেই বাড়ি করার সব প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এরপর থেকে বাবার সাথে থাকলেও অন্তত কেউ স্ত্রী-সন্তানদের কখনো কটু কথা শোনাতে পারবে না।
ঘরে ঢুকতেই তপোবনের ভ্রু কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। সে পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে সটান হয়ে দাঁড়াল। মূলত সে দেখছে তার বউ কী করছে।
রূপকথাকে ঘষে ঘষে লিপস্টিক দিতে দেখে সে কপাল কুঁচকে নিল। চোখেমুখে ঘোর বিরোধ! গম্ভীর কণ্ঠে শুধাল
-“এগুলো কী দিচ্ছ?”
কলেজ ড্রেস পরিহিত রূপকথা না ফিরেই ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
-“লিপস্টিক দিচ্ছি। আজ কলেজে অনুষ্ঠান আছে তাই সবাই সেজেগুজে যেতে বলেছে।”
তপোবনের ভ্রু টানটান হয়ে গেল। স্বামী থাকবে অফিসে, বউ কি-না সেজেগুজে পুরো কলেজকে দেখাবে? এ কি মানা যায়? যায় না। তাই সে থমথমে মুখে বলল,
-“ওগুলো দিও না। ওগুলোতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল থাকে।”
রূপকথা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
-“সত্যি? তবে কী দেব? একটু না সেজে গেলে হবে না।”
-“একদমই হবে না?”
-“নাহ্, হবে না।”
তপোবন গলা খাঁকারি দিল। বলল,
-“ওহ্, আমার কাছে ন্যাচারাল লিপস্টিক আছে। সাথে ওই যে গালে কী যেন দেয় না লাল লাল? তাও আছে।”
রূপকথা পিটপিট করে চেয়ে বলল,
-“ব্লাশ বলে ওটাকে।”
-“হবে হয়তো।”
-“আপনার কাছে কী সত্যিই ন্যাচারাল লিপস্টিক আর ব্লাশ আছে?”
তপোবন অত্যন্ত গুরুগম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,
-“একদম ন্যাচারাল, কোনো ক্ষতি নেই বরং ভরপুর উপকার আছে।”
রূপকথা হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এসে বলল,
-“সত্যি? দিয়ে দিন তবে তাড়াতাড়ি। সুন্দর করে আর বেশি করে দিয়ে দেবেন। আজ সবাই একটু বেশি সেজেগুজে যেতে বলেছে বুঝেছেন?”
তপোবন মাথা নেড়ে বলল,
-“আচ্ছা বেশি বেশি করে দিয়ে দেব, এসো।”
বলতেই রূপকথা গাল ভরে হেসে নিজের মুখ এগিয়ে দিল। বদ্ধ নেত্রে অপেক্ষা করল ন্যাচারাল লিপস্টিকের। কিন্তু লিপস্টিকের বদলে অধরে এক জোড়া উত্তপ্ত অধর লেপ্টে যেতেই সে হকচকিয়ে চোখ খুলে তাকায়। সম্মুখের অতি নিকটে থাকা চোখজোড়ায় চাপা হাসির উজ্জ্বলতা। ততক্ষণে পাতলা অধরযুগল পরাস্ত সৈনিকের ন্যায় সম্মুখের ক্ষমতাধর পুরুষের আয়ত্তে পিষ্ট হচ্ছে।
চুম্বনটা দীর্ঘ ছিল। বাহুডোরে নেতিয়ে পড়া দেহটি তখনো রুদ্ধশ্বাস ফেলে দুলছে। তপোবন নীরবে দোদুল্যমান দেহটিকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর মিটিমিটি হাসছে। বলল,
-“চোখ খোলো, দেখো তোমার ঠোঁট আর গাল দুটো একদম টমেটোর মতো লাল হয়ে গিয়েছে।”
রূপকথা চোখ তো খুললই না বরং তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে এক ছুটে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। তপোবন হো হো করে হেসে উঠল তার দৌড় দেখে। দশ মিনিট বাদেও বের হলো না মেয়েটি। কলেজের সময় হয়ে গিয়েছে।
তপোবন এবার দরজায় নক করে বলল,
-“কলেজে যাবেন না মুরুব্বি? তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমায় অফিসে যেতে হবে আপনাদের ড্রপ করে।”
অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল মিনমিন কণ্ঠ
-“আপনি আগে নিচে যান, আমি আসছি।”
-“আচ্ছা।”, বলেই তপোবন বুট জুতোর শব্দ তুলে বেরিয়ে গেল। রূপকথা হাঁফ ছেড়ে লাজে রাঙা মুখটি নিয়ে দরজা খুলল। ওমনি ভয়ে গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল চোখের সামনে তপোবনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তপোবন পুনরায় উচ্চস্বরে হেসে উঠে ভয়ার্ত মেয়েটিকে বুকে আগলে নিল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
-“আরে মেয়ে শান্ত হও। আমি কি বাঘ না-কি ভাল্লুক?”
রূপকথা জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলায়। অতঃপর তেতে উঠে বলল,
-“আপনি একটা বাজে চতুর লোক। সবসময় বুদ্ধিমানি করেন আমার সাথে।”
তপোবন হেসে দুই আঙুলে তার নাক চেপে ধরে বলল,
-“এমন আদুরে পিচ্চি একটা মেয়ে তুমি, দেখলেই ইচ্ছে করে একটু ক্ষেপাতে।”
রূপকথা ফোঁস ফোঁস করে ব্যাগ কাঁধে তুলে নেয়। তপোবন মানিব্যাগ আর ফোন পকেটে ঢুকিয়ে নিতে নিতে বলল,
-“আয়নায় নিজেকে একটু দেখে নেবে না? দেখো তোমার লিপস্টিক আর ব্লাশ পরিমাণমতো হয়েছে কি-না! নয়তো আমি ফ্রি আছি। আরো দিয়ে দেব।”
রূপকথা এবার তেতে উঠে সোফা থেকে কুশন ছুঁড়ে মারল তপোবনের গায়ে। তপোবন সেটি ক্যাচ ধরে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। রূপকথা ফুঁসতে ফুঁসতে বেরিয়ে যায় কামরা থেকে।
প্রতি রাতেই মৌনতা ঘুমাতে পারে না দৈহিক অস্থিরতার কারণে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। নামাজ শেষে দীর্ঘক্ষণ জায়নামাজে বসে জিকির করতে করতে কোমর-পা ব্যথায় চিরবিরিয়ে উঠল। সে জায়নামাজ ছেড়ে একটু হাঁটতে বের হয়। ঘুমন্ত মেয়েকে এক পলক দেখে নিজের ঘর থেকে বের হয়। আজও এরোজ ঘুম পাড়িয়ে তার ঘরে দিয়ে গিয়েছে।
পোর্চে আর করিডোরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতেই সে কারোর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল। কোত্থেকে আসছে সেই কৌতূহল নিয়ে নিচে যেতে নিলেই তার পা থেমে যায়। সে সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ডান দিকে থাকা এরোজের ঘরটির দিকে। ওখান থেকেই শব্দ আসছে। সে নিঃশব্দে এগিয়ে যায়। চাপিয়ে রাখা দরজাটি অতি সাবধানে খুলতেই দৃষ্টি ম্লান হয়। আঁধারে জায়নামাজে বসা এরোজ মোনাজাতে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর কিছু বিড়বিড় করছে।
এসেছে থেকে সে দেখেছে মানুষটা প্রতি রাতে নামাজে বসে আকুতি করে। এই এরোজ অকল্পনীয় তার জন্য। কৌতূহল আরও প্রগাঢ় হয়। কার জন্য এত পরিবর্তন? কার জন্য এত আকুতি?
প্রশ্নগুলো জবাব পেল না বরাবরের মতোই। সকাল হতেই দশটা নাগাদ এরোজ বেরিয়ে গেল। নায়েলকে চাইল্ড কেয়ারে দিয়ে অফিসে যাবে। মৌনতা তখন একাকী ঘরময় হাঁটছিল। হাতে একটা ফলের বাটি। হাঁটতে হাঁটতেই দেখল এরোজের ঘর লক করা না।
সে সচকিত হয়। এরোজ তাদের কাউকে ঘরে ঢুকতে দেয় না, এর কিছু তো কারণ আছে। তাকে জানতে হবে তার অন্তঃস্থলে চলা অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর জবাব।
সে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে যেতে নিলে মাসুমা বেগম পিছু ডাকলেন।
-“মৌন?”
-“জি আম্মা?”, মৌনতা চমকে ফিরে তাকাল মায়ের দিকে। মাসুমা বেগম কাপড়চোপড় হাতে ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন,
-“ওই ঘরে যেও না আবার। এরোজ বারণ করেছে ওর ঘরে কাউকে ঢুকতে।”
-“আচ্ছা।”
মৌনতা সতর্ক কণ্ঠে বলল। মাসুমা বেগম নিচে চলে গেলেন, দুপুরের রান্না করবেন। মা যেতেই মৌনতা সকল বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে এরোজের ঘরে ঢুকল।
ঢুকেই চারিদিকে চোখ বুলাল। আভিজাত্য আর শৌখিনতার ছোঁয়ায় সেজে থাকা একটা বিশাল কক্ষ। সে চঞ্চল দৃষ্টি ফেলে সব জায়গা খুঁজতে লাগল। জবা যেই ডায়েরিটা পেয়েছিল সেটা পেলেও কিছু জানতে পারবে।
সে হন্যে হয়ে সব জায়গা খুঁজল কিন্তু কোথাও কিছু পেল না। ব্যর্থতার নিঃশ্বাস ফেলতে নিলেই তার চোখ গেল ঘরের দেয়ালে। বাম পাশের দেয়ালে এঁটে আছে অনেকগুলো ওয়ালম্যাট। কিন্তু একটা ওয়ালম্যাট কিছুটা অদ্ভুত দেখতে। সে কাছে গেল। কাঁচের উপর হাত দিতেই তার ললাটের ভাঁজ দৃঢ় হলো। কেননা বিশাল অদ্ভুত ওয়ালম্যাটটিতে একগুচ্ছ চুলের মতো দীর্ঘ কিছু খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। যেন কেউ খুব যত্ন করে একটা একটা চুল ওয়ালম্যাটটিতে লাগিয়ে রেখেছে।
তার থেকেও অদ্ভুত বিষয় হলো এই চুলগুলো তার চেনা। মৌনতা হতবাক হয়ে নিজের মাথার টুপিটা খুলে ফেলল। সে অবাক চোখে সামনের আরশিতে নিজের সাফেদ মসৃণ মাথার তালু দেখে আর একবার দেখে ওয়ালম্যাটটি। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
-“এগুলো তো আমার চুল।”
দৃষ্টি অচিরেই বিবর্ণ হতে লাগল। মৌনতা অস্থিরচিত্তে এবার পুরো ঘরে চোখ বুলাতে লাগল। তবে আর কিছুই পেল না। হতাশ হয়ে এবার সে তাকায় পুরো একটা দেয়ালজুড়ে থাকা বিশালাকৃতির বুকশেলফটির দিকে। অসহায়ত্ব অনুভব হলো। এত বড় বুকশেলফে হাজার হাজার বই, ডায়েরি আছে; সে কি ওই একটা ডায়েরি খুঁজে পাবে?
তবুও হার মানল না মৌনতা। পাশে থাকা সিঁড়িটি বেয়ে বেয়ে উঠে খুঁজতে লাগল ডায়েরি। খুঁজতে খুঁজতে ঠিক উনিশতম শেলফে এসে থামল। শেল্ফের এই উচ্চতা একদম এরোজের বরাবর। এবং সেটাই তার সকল প্রশ্নের জবাব দিল। জবার পাওয়া সেই ডায়েরিটা দেখতেই মৌনতা চকিতে সেটি নামাল। হন্তদন্ত হয়ে তার পাতা উল্টাতে লাগল। উল্টাতে উল্টাতে ঠিক সেই জায়গায় এসে থামল যে জায়গায় রোজ পড়া থামিয়েছিল।
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮ (২)
“আমি শূন্য বক্ষে আর আপনি কারোর বক্ষতলে। অনুমতিবিহীন ভালোবাসার শাস্তি এত কঠিন কেন, রূপাঞ্জেল?”
রূপাঞ্জেল! ঠিক এই নামে নিজের জীবদ্দশায় অজস্র চিঠি পাওয়া মৌনতা ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। লালচে নেত্র অচিরেই চোখের পানি ছেড়ে দিল যখন পরের পাতা উল্টাল। সেখানে এঁটে আছে ছয় বছর আগের একটা প্রাণবন্ত মেয়ের ছবি।
মৌনতা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। অস্থিরচিত্তে পুরো ডায়েরির এক একটা পাতা উল্টাতে লাগল। যেখানে প্রতিটা পাতায় ছয় বছর আগের সেই প্রাণবন্ত মৌনতার এক একটা ছবি এঁটে আছে আর তার নিচে লিপিবদ্ধ কিছু ছোট্ট ছোট্ট গল্প। এবং প্রতিটা গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু শুধুমাত্র সে।
