অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩০
রিদিতা চৌধুরী
সৌহার্দ্য ছাদ থেকে নেমে বাথরুমে ঢুকে দীর্ঘ সময় ধরে নিজেকে ঘষতে লাগল। গা থেকে যেন এখনো সেই উটকো গন্ধটা লেগে আছে, যা তার স্নায়ুকে অস্থির করে তুলছে। রাগে, বিরক্তিতে চোখ বুজে একটা গভীর শ্বাস নিল সে। আরও কয়েক দফা শাওয়ার নিয়ে যখন বের হলো, তখন শরীরটা অনেকটাই শীতল, কিন্তু মনের অস্বস্তি কাটেনি। নিজেকে পরিপাটি করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পারফিউম স্প্রে করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, “স্টুপিড! মেয়েটার জন্য আর কত কী সহ্য করতে হবে আমাকে?” নিজের ওপর এই ক্ষোভটুকু ঝেড়ে একটা হালকা খাবার মুখে দিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা লক করে বেরিয়ে পড়ল সে।
সকাল আটটা। রিদি ফ্রেশ হয়ে একদম তৈরি হয়েই ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। তার পাশেই মনমরা হয়ে খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে বসে আছে রিভা। রিদিকে দেখে রিভা সামান্য নড়েচড়ে বসল। রিদি আলতো করে রিভার মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহের স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে বল তো? ওই বাড়ি থেকে আসার পর থেকেই দেখছি তুমি এমন চুপচাপ, মন খারাপ করে বসে আছো কেন?”
রিভা কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। নিজের ভেতরের তোলপাড় চেপে রেখে রিদির দিকে তাকিয়ে ম্লান একটা হাসল সে। বলল, “তেমন কিছু না ভাবি, এমনিই… শরীরটা ঠিক ভালো লাগছে না।
রিদি ভালো করেই জানে রিভা মিথ্যে বলছে, তার চোখের কোণে জমে থাকা বিষণ্ণতা অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু রিভা যখন মুখ খুলতে চাইছে না, তখন তাকে বেশি ঘাঁটানো ঠিক হবে না বুঝে রিদি আর জোরাজুরি করল না। তাড়াহুড়ো করে খেয়ে সে বেরিয়ে পড়ল, দেরি করলে ক্লাসের লেকচার মিস হয়ে যাবে।
বাসার গেটের বাইরে পা রাখতেই রিদির থমকে দাঁড়াতে হলো। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য; ঠিক যেন কোনো বখাটে ছেলের মতো অবলীলায় তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে সে। রিদি না তাকিয়েই পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সৌহার্দ্য বাঁকা হাসি হেসে শিষ বাজাতে বাজাতে বারবার তার সামনে এসে দাঁড়াল। রিদি একটা শব্দও উচ্চারণ করল না, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের চোখের দিকে। সে ভালো করেই জানে, এই মুহূর্তে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালে বা প্রতিবাদ করলে সৌহার্দ্য তাকে আরও বেশি উত্ত্যক্ত করার সুযোগ পাবে।
রিদি যখন পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইল, তখন সৌহার্দ্য আচমকা ঝুঁকে এসে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে অদ্ভুত কিছু একটা বলে উঠল। সেই কথাগুলো রিদির কানে যেতেই সে যেন পাথর হয়ে গেল। অপমানে আর লজ্জায় তার সারা শরীর কাঁপছে, কান দিয়ে যেন গরম ভাপ বের হচ্ছে। সৌহার্দ্য যখন আরও কিছু বলার জন্য আরেকটু এগিয়ে এলো, রিদি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চোখের পলকে নিজের হাঁটু দিয়ে সে সৌহার্দ্যের শরীরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায় সজোরে আঘাত করল।
হঠাৎ এমন পাল্টা আক্রমণে সৌহার্দ্য একদম প্রস্তুত ছিল না। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে সে আর্তনাদ করে উঠল, ব্যথায় চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ হয়ে গেল তার। সেই সুযোগটুকু হাতছাড়া করল না রিদি, এক মুহূর্ত দেরি না করে ঝড়ের বেগে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
যন্ত্রণায় নীল হওয়া সৌহার্দ্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। রিদির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তার মুখটা রাগে রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করে উঠল, “স্টুপিড মহিলা! নিজের ভবিষ্যৎটা যে নিজে শেষ করে দিচ্ছে,?”
বলেই রাগে গজগজ করতে করতেই সে দ্রুত তার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
বেলকনির গ্রিলের সাথে মাথা হেলিয়ে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রিভা। অদ্ভুত ব্যাপার, সেদিনের ঘটনার পর থেকে শাহাবীরের কথা মনে করার চেষ্টা করলেও তার চেহারাটা যেন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। অথচ রিভার অবাধ্য মনটা বারবার ফারিসের মুখচ্ছবি চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলছে। হয়তো এটাই সেই অমোঘ পবিত্র বন্ধনের টান!
এই বাড়িতে আসার পর থেকে ফারিস যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফোন, মেসেজ—অবিরাম যোগাযোগ করার চেষ্টা তার। ফোনের স্ক্রিনে ফারিসের নাম ভেসে উঠলে রিভা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। রিংটোন বাজতে বাজতে একসময় থেমে যায়, ঘরটা আবার নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়। তবুও ফারিস হাল ছাড়ে না, যেন নিয়মের বেড়াজালে বন্দি সে; বারবার কল দিয়ে যায়।
রিভার মনের ভেতর এখন এক অদ্ভুত দোলাচল। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে ফোনটা রিসিভ করে ফারিসের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে, তার কণ্ঠটা শোনে। কিন্তু সেদিনের সেই গভীর অভিমান, সেই স্মৃতি এখনো তার মনের গভীরে কাঁটার মতো বিঁধে আছে, যা তাকে হাত বাড়িয়েও পিছিয়ে আসতে বাধ্য করে।
কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ফারহা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল। গত কয়েকদিনে এই মেয়েটার সাথে রিদির বেশ একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছে। ফারহা রিদির হাত জড়িয়ে ধরে ক্যাম্পাসের ভেতরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে উত্তেজিত স্বরে বলল, “জানিস রিদি, আমাদের এখানে নতুন একজন প্রফেসর আসছেন! তিনি অনেক বড় ডাক্তার, আর কী যে হ্যান্ডসাম! শোনা যাচ্ছে তিনিই নাকি আমাদের ক্লাস নেবেন।”
ফারহার কথাগুলো কানে যেতেই রিদির পায়ের গতি থমকে গেল। বুকটা ধক করে উঠল তার। তবে কি সৌহার্দ্য? কিন্তু রিদি কোনো উত্তর না দিয়ে, দ্রুত একটা অস্বস্তি চেপে রিদি ফারহাকে টেনে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
ক্লাসে বসে থাকার কিছুক্ষণ পরই নতুন প্রফেসর ভেতরে এলেন। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, পরনে ফরমাল প্যান্ট। শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা—বুকের কিছুটা অংশ অনাবৃত, যেটা তার ব্যক্তিত্বে এক ধরনের উগ্র আবেদন তৈরি করেছে। ধূসর রঙের সেই তীক্ষ্ণ চাহনি যেন যে কোনো মেয়েকে নিমেষেই কাবু করে ফেলার ক্ষমতা রাখে। ক্লাসের মেয়েদের মধ্যে এক অদ্ভুত চাঞ্চল্য, তারা যেন হা করে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
রিদি আড়চোখে একবার তাকাল। তার অনুমানই সঠিক—সামনে প্রজেক্টরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আর কেউ নয়, সৌহার্দ্য। রিদি বিরক্তিতে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
এদিকে পাশে বসা ফারহা গালে হাত দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রিদিকে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে ফিসফিস করে বলল, “উফ রিদি! সত্যি কত হ্যান্ডসাম, তাই না? এমন ডাক্তার থাকলে আমি সারাজীবনের জন্য তার রোগী হয়ে থাকতে রাজি!”
ফারহার এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্যে রিদি ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে গেল। বিরক্তিতে তার নাক-মুখ কুঁচকে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করে বলল, “লুচ্চা ডাক্তার! ক্লাস নিতে এসেছে নাকি মেয়ে পটাতে, যে বুক খোলা শার্ট পরে আসতে হবে? আর মেয়েগুলোকে বলি হারি অন্যের জমায়ের দিকে কেন তোদের নজর দিতে হয় বাপু?
সৌহার্দ্য প্রজেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে লেকচার দিল।হঠাৎই তার নজর গিয়ে থামল রিদির ওপর। মুহূর্তের মধ্যে ক্লাসের পরিবেশ বদলে গেল। সৌহার্দ্য তীক্ষ্ণ ও গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল, “ইউ, রেড ড্রেস! স্ট্যান্ড আপ!”
রিদি প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। সে এদিক-ওদিক তাকাতেই সৌহার্দ্য আবার গমগমে গলায় বলে উঠল, “চোরের মতো উঁকিঝুঁকি না দিয়ে উঠে দাঁড়াও, তোমাকে বলছি!”
রিদি যেন হতবাক! সে কখন চোরের মতো করল? সে তো কেবল বোঝার চেষ্টা করছিল ক্লাসে আর কেউ লাল রঙের জামা পরেছে কি না। এই লোকের কথা বলার ভঙ্গি সব সময় এমন হয় কেন?, তা রিদি এখনো বুঝে উঠতে পারেনা। ভেতরে প্রচণ্ড বিরক্তি কাজ করলেও, সবার সামনে মাথা নত না করে রিদি ধীরস্থিরভাবে উঠে দাঁড়াল।
সৌহার্দ্য ধীর পায়ে রিদির একেবারে কাছে এগিয়ে এল। রিদির চোখের দিকে একবার তীব্র দৃষ্টি ফেলে, গমগমে স্বরে প্রশ্ন করল, “বলো, ডিএনএ সাধারণত সিঙ্গেল নাকি ডাবল স্ট্র্যান্ডেড?”
প্রশ্নের উত্তরটি তার নখদর্পণে ছিল। তাই সে কোনো ভনিতা না করে, শান্ত কিন্তু স্থির কণ্ঠে সে উত্তরটি দিয়ে দিল। সৌহার্দ্য আর কোনো উচ্চবাচ্য করল না। তার আসলে লেকচার দেওয়ার চেয়েও বড় উদ্দেশ্য ছিল—নিজের বউয়ের কণ্ঠস্বরটা শোনার তৃপ্তি। সেই তৃপ্তিটুকু পাওয়ার পর সে আর রিদিকে ঘাঁটাল না। ঘণ্টাখানেক ক্লাস করানোর পর সৌহার্দ্য দ্রুত ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল!
রাত তখন প্রায় একটা। বেলকনির নির্জনতায় একটা কাঠের চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে সৌহার্দ্য। আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে একের পর এক সিগারেট পুড়িয়ে চলেছে সে, আর ধোঁয়ার কুন্ডলীগুলো যেন তার মনের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসকেই রূপ দিচ্ছে। কলেজ থেকে ফেরার পর প্রাইভেট হাসপাতালে নামমাত্র রোগী দেখে দ্রুত বাসায় ফিরেছে সে, কিন্তু মনের অস্থিরতা যেন পিছু ছাড়ছে না।
বিকাল থেকে মনে হয় এই নিয়ে দশবার ছাদে গিয়েছে। রিদিকে একবার, মাত্র এক ঝলক দেখার তৃষ্ণা। অথচ নিয়তি যেন বড় নিষ্ঠুর—রিদির দেখা নেই। ঠিক যে বেলকনিটায় প্রথম দিন রিদিকে দেখেছিল, সেই জায়গাটাতে আজ এক ঘণ্টা একা দাঁড়িয়ে থেকেও মেয়েটার ছায়া পর্যন্ত দেখতে পায়নি সে। মনের ভেতরটা তীব্র অস্থিরতায় ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে।
রিদির কথা ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে চোখটা বুজতেই সৌহার্দ্যের মস্তিষ্কের ওপর যেন একরাশ অন্ধকার নেমে এল। চোখের সামনে মুহূর্তের ব্যবধানে ভেসে উঠল তার অতীতের সেই তিক্ত অধ্যায়গুলো—
_অতীত_
রিদিকে হাসপাতাল থেকে আকরাম খান বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই শাহেদা চৌধুরীর মাঝে মাঝে রিদিকে দেখতে যেত। সাথে থাকতো সৌহার্দ্য। মায়ের হাত ধরে খান বাড়িতে ঢুকে রিদিকে দেখলেই ওর চোখেমুখে খুশির ঝিলিক খেলে যেতো। হাসপাতালের সেই ছোট্ট রিদির মায়াবী হাসিটা যেন সৌহার্দ্যের অবুঝ মনে এক গভীর ছাপ ফেলেছিল।
রিদির বয়স তখন দুই মাস। একদিন শাহেদা চৌধুরীর সৌহার্দ্যকে সাথে করে নিয়ে গেল খান বাড়িতে। মালিহা খান সৌহার্দ্যকে রিদির পাশে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে শাহেদা চৌধুরীর সাথে অন্য রুমে গল্পে মগ্ন। বিছানায় ছোট্ট রিদি হাত-পা ছুড়ে আপনমনে খেলছিল, আর সৌহার্দ্য একমনে রিদির গাল আর নাকে আঙুলের আলতো ছোঁয়া দিয়ে দুষ্টুমি করছিল।
হঠাৎ রিদির ফোলা ফোলা তুলতুলে গালগুলো দেখে সৌহার্দ্যের শিশুসুলভ মন ভীষণ লোভাতুর হয়ে উঠল। আর নিজেকে সামলাতে না পেরে, ঝুঁকে পড়ে টপাটপ চার-পাঁচটা চুমু খেয়ে নিল রিদির গালে।
কিন্তু বিপত্তি বাঁধল তখনই! সৌহার্দ্য যখন আবার চুমু দিতে ঝুঁকেছে, আর অমনি রিদি উচ্চস্বরে কেঁদে উঠল। অত বড় কান্নার শব্দে সৌহার্দ্য ভীষণ ভয় পেয়ে দ্রুত রিদিকে কোলে তুলে নিল। আর ঠিক তখনই ঘটল সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা—রিদি তার কোলে পটি করে দিল!
সবকিছু মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। পটির দুর্গন্ধে আর অস্বস্তিতে বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেল সৌহার্দ্য। মেজাজ সামলাতে না পেরে রিদিকে বিছানায় ছুড়ে মারল। সাথে সাথে রিদির তীব্র আর্তচিৎকার আর কান্নার শব্দে পাশের রুম থেকে মালিহা খান আর শাহেদা চৌধুরী দৌড়ে এলেন। মালিহা খান দ্রুত নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। শাহেদা চৌধুরী যখন রাগে ছেলেকে বকুনি দিতে যাবেন, ঠিক তখনই তার চোখ গেল সৌহার্দ্যের সাদা শার্টের ওপর। শার্টজুড়ে হলুদ ছোপ দাগ দেখে মুহূর্তেই পরিস্থিতি বুঝে ফেললেন তিনি। সৌহার্দ্যের যে প্রচণ্ড রাগ, তা ওনার অজানা ছিল না। দ্রুত তাকে বাথরুমে নিয়ে পরিষ্কার করে দিলেন। কিন্তু সে ঘটনার পর সৌহার্দ্য আর এক সেকেন্ডও খান বাড়িতে দাঁড়ায়নি। আর না পা বাড়িয়েছে খান বাড়িতে!
এভাবে কেটে গেছে প্রায় দুই বছর। দুই বছরের দীর্ঘ সময়ে সৌহার্দ্য যেন অবুঝ রিদিকে পুরোপুরি ভুলেই গেছে!
রিদির দুই বছর বয়সের জন্মদিন উপলক্ষে খান বাড়িতে বসেছে বিশাল আয়োজন। আকরাম খানের আমন্ত্রণে সেই বাড়িতে দীর্ঘ দুই বছর পর আবার বাবা মার সাথে পা রাখল সৌহার্দ্য। সেদিনই ১৩ বছরের সৌহার্দ্যর সাথে দেখা হয় শাহাবীরের!বাড়ি কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে ড্রয়িংরুমের এক কোণে সোফায় বসে ছিল সে। ঠিক তার পাশেই বসা শাহবীর। দুজনেই স্বভাবজাতভাবে গম্ভীর আর কম কথা বলা মানুষ; তাই দীর্ঘক্ষণ পাশাপাশি বসে থাকলেও দুজনের মাঝে ছিল এক গভীর নিস্তব্ধতা।
সৌহার্দ্য ছোটবেলা থেকেই অন্তর্মুখী, সহজে কারো সাথে মিশতে পারে না। অন্যদিকে শাহবীরও ঠিক একই রকম। কিন্তু নীরবতার সেই দেয়াল একসময় ভেঙে ফেলল সৌহার্দ্যই। নিজেই এগিয়ে এসে পরিচয় জানতে চাইলে শাহবীরও হাসিমুখে সাড়া দিল। কথাবার্তার একপর্যায়ে দুজনেই অবাক হয়ে আবিষ্কার করল—তারা একই স্কুলে পড়ে! সেকশন আলাদা হওয়ার কারণেই হয়তো এতদিন তাদের দেখা হয়নি, অথবা দেখা হলেও হয়তো কারো চোখে পড়েনি। ওইদিন খান বাড়ির পুরোটা সময় যেন তারা একে অপরের ছায়া হয়ে রইল।
এরপর সৌহার্দ্যই শাহবীরকে পরিচয় করিয়ে দিল ফারিস, সুজন আর আকাশের সাথে। প্রাইমারি লেভেল থেকে তারা একে অপরের বন্ধু। সৌহার্দ্যের সেই ছোট ছোট দুষ্টুমি আর আড্ডার দলে যোগ দিল শাহবীর। সময়ের সাথে সাথে জমে উঠল তাদের বন্ধুত্বের গভীরতা। তবে মজার বিষয় হলো, এই বন্ধুত্বের মাঝেও যেন শাহবীর আর ফারিসের এক অলিখিত ‘স্নিগ্ধ যুদ্ধ’ চলত। তাদের ভালো কথা কম হতো, আর খুনসুটি বা ঝগড়া হতো বেশি!
এভাবেই এইচএসসি পর্যন্ত প্রতিটি দিন তারা একে অপরের সাথে কাটিয়ে দিয়েছে। এরপর সময়ের স্রোতে একেকজন একেক গন্তব্যে পাড়ি জমাল। সুজন আর সৌহার্দ্য ভর্তি হলো মেডিকেল কলেজে, শাহবীর উড়াল দিল দেশের বাইরে, ফারিস-আকাশ বেছে নিল প্রাইভেট ভার্সিটি। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব তাদের বন্ধুত্বের মাঝে বিন্দুমাত্র ভাটা ফেলতে পারল না।
সবাই ব্যস্ততায় ডুবে থাকলেও অবসর পেলেই তাদের ভার্চুয়াল আড্ডা জমতো। তবে শাহবীরের সাথে সৌহার্দ্যের বন্ধনটা ছিল কিছুটা আলাদা। নিয়মিত ফোনে কথা হতো তাদের; কোনো কোনো দিন সেই কথা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলত। দিনশেষে হাজার ব্যস্ততার মাঝেও তাদের কথা বলার একটা সময় ঠিকই থাকত। বছরে দু-একবার শাহবীর যখন দেশে ফিরত, তখন যেন পুরো বন্ধুদের পৃথিবীটা আবার পূর্ণতা পেত।
হঠাৎ একদিন গভীর রাতে সৌহার্দ্যের ফোনের রিংটোন নিস্তব্ধতা ভেঙে আর্তনাদ করে উঠল। স্ক্রিনে শাহবীরের নাম দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল সৌহার্দ্যের। এত রাতে? ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল শাহবীরের এক ভগ্ন কণ্ঠস্বর—পুরো পৃথিবীটা যেন সেই কণ্ঠের বিষাদ আর কান্নায় স্তব্ধ হয়ে গেল।
সেদিন শাহবীর তার জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্যটা জেনে ফেলেছিল। তার এতদিনের চেনা পৃথিবীর ভিত্তিটা এক নিমিষেই নড়বড়ে হয়ে গেল। সে জানতে পেরেছে তার পিতৃপরিচয়— আর রিদি আসলে তার আপন বোন একই বাবার সন্তান তারা!শাহবীর যখন সৌহার্দ্যের কাছে সবটা খুলে বলল, সৌহার্দ্য যেন পাথরের মতো জমে গেল। রিদির কথা সে জানত, কিন্তু শাহবীরকে সে আজীবন আরিফা খানের ছেলে হিসেবেই চিনে এসেছে। রিদির বয়স তখন তেরো। অথচ সৌহার্দ্যের সাথে তার শেষ দেখা হয়েছিল সেই পাঁচ বছর বয়সে; এরপর পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারের ব্যস্ততায় খান বাড়িতে তার আর পা-ই রাখা হয়নি।
সৌহার্দ্য সেদিন শাহবীরকে অনেক সান্ত্বনা দিয়েছিল, কিন্তু তার নিজের মনের ভেতরে তখন দাবানল জ্বলছিল। আকরাম খানের প্রতি তার তীব্র ঘৃণা জন্মে গেল। কী নিষ্ঠুর মানুষ তিনি! নিজের পরিচয়ে একজনকে পরম যত্নে বড় করলেন, আর অন্যজনকে অবহেলায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন! এই চরম অবিচার সৌহার্দ্যকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল!শাহবীরও সেই তীব্র ঘৃণা আর ক্ষোভ নিয়ে আর দেশে আসেনি!
আকরাম খানের মৃত্যুর পর যখন সারহান চৌধুরী সৌহার্দ্যর সাথে জোর করে রিদির বিয়ে দেয়, সেদিন সৌহার্দ্য রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সুজনের বাসায় ওঠে। আর সেই মুহূর্ত থেকেই তার জীবনে সবথেকে খারাপ অধ্যায়ের সাথে পরিচিত হয়! সুজনের বাসায় এক সপ্তাহ থাকার পর একদিন আকাশ আবদার করে তার সাথে তার খালার বাড়ি ঘুরতে যেতে। যদিও সৌহার্দ্যর ইচ্ছে ছিল না এত টেনশনের মধ্য কোথাও যাওয়ার, তবুও ফারিস ও সুজন তাকে বলল, “মাইন্ড ফ্রেশ করার জন্য যাওয়া দরকার।” বন্ধুদের জোরাজুরিতে শেষমেশ সৌহার্দ্য রাজি হয়। সে ভাবে, এমনি সে কিছুদিন পর লন্ডন চলে যাবে, তাই ঘুরে আসলে মন্দ হয় না!
শেষ পর্যন্ত চার বন্ধু একসাথে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, আকাশের খালার বাড়িতে। আকাশ তাদের বন্ধুদের মধ্যে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ছিল। বাবার চাকরির সুত্রে ঢাকায় ভাড়া বাসায় থাকতে হতো তাদের। একমাত্র ছেলে হওয়ার সুবাদে বাবা নিজের অল্প বেতনের চাকরি দিয়েও ছেলেকে ভালো স্কুল-কলেজে পড়িয়েছেন।
খুলনায় আকাশের খালার সাথে দেখা করার পর সারাদিন তারা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছিল। কিন্তু দিনশেষে যখন বিশ্রামের সময় এল, সৌহার্দ্যর মনটা কিছুটা দমে গেল। আকাশের খালার বাড়িটি ছিল খুবই ছোট, মাত্র চারটি রুমের এক সাধারণ টিনের ঘর। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, ঘরের ভেতর কোনো ওয়াশরুম নেই—যে পরিবেশের সাথে ফারিস বা সৌহার্দ্য—কেউই মোটেও অভ্যস্ত নয়।
আসলে সৌহার্দ্যের কাছে ধনী-গরিবের এই তফাত বা সামাজিক অবস্থান কখনো ম্যাটার করে না, মানুষের প্রতি তার সম্মান অটুট। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভ্যাসের জায়গা থেকে হুট করে এমন একটি পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। বিশেষ করে সৌহার্দ্য সবসময় একা থাকতেই পছন্দ করে, অন্য কেউ সাথে থাকলে তার অস্বস্তি হয়। যদিও দুষ্টু ফারিস মাঝেমধ্যে তাকে জ্বালানোর জন্য ওর সাথে ঘুমাতে আসত আর শেষমেশ সৌহার্দ্যর লাথি খেয়ে তবেই থামত, তবুও আজ পরিস্থিতির চাপে সৌহার্দ্য অনেকটা অসহায় বোধ করছিল।
আকাশের জোরাজুরিতেই তারা শেষ পর্যন্ত এখানে এসেছে, বন্ধুর মনের দিকে তাকিয়ে সে না করতে পারেনি। কিন্তু সৌহার্দ্যের মনের অবস্থা আকাশ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিল। বন্ধুর কমফোর্টের কথা ভেবে আকাশ নিজেই উদ্যোগী হয়ে সৌহার্দ্যকে আলাদা একটি রুমের ব্যবস্থা করে দিল। আর ফারিস, সুজন ও আকাশ মিলে এক রুমেই থাকার সিদ্ধান্ত নিল।
রাত তখন প্রায় দুটো। নিঝুম অন্ধকারে চারপাশটা যখন নিস্তব্ধ, ঠিক তখনই অস্ফুট কান্নার শব্দে সৌহার্দ্যের ঘুম ভেঙে গেল। আধো ঘুম, আধো জাগরণ—চোখ কচলাতে কচলাতে সে পাশ ফিরতেই তার হৃৎপিণ্ড যেন এক নিমেষে থমকে গেল।
বিছানার এক কোণে এলোমেলো চুলে বস্ত্রহীন বসে ফুপিয়ে কাঁদছে একটি মেয়ে। বয়স বড়জোর উনিশ-বিশ হবে। সৌহার্দ্যের শরীর হিম হয়ে এল যখন সে দেখল, নিজের উন্মুক্ত বুকের আশে পাশে লিপস্টিকের গাঢ় দাগ লেগে আছে। মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! সৌহার্দ্যের স্পষ্ট মনে আছে, প্রচণ্ড গরমে সে শার্ট খুলে ঘুমিয়েছিল, তার ঘুমও হয়েছে বড়জোর ঘণ্টাখানেক। সে নিজের সত্তা সম্পর্কে সচেতন; নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ তার এতই প্রখর যে, জ্ঞান থাকুক বা না থাকুক, এমন পৈশাচিক কাজ সে কখনোই করতে পারে না।
সৌহার্দ্যর ভেতরটা তখন রাগে ও অপমানে তিরতির করে কাঁপছে। কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই মেয়েটি ডুকরে কেঁদে উঠল, “ভাইয়া, আপনি আমার এত বড় সর্বনাশ কেন করলেন?”
মেয়েটির কণ্ঠস্বরের আর্তনাদ যেন সৌহার্দ্যের গায়ে বিঁধল। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সে গর্জে উঠল, “চুপ করো! কী আজেবাজে কথা বলছ তুমি? কে তুমি? আমি কেন এসব করতে যাব?”
তার চিৎকার শেষ হওয়ার আগেই ঘরের দরজা হুরমুড় করে খুলে আকাশ ভেতরে ঢুকল। দৃশ্যটা দেখেই আকাশ স্তব্ধ, তার চোখেমুখে অবিশ্বাস আর আতঙ্ক। কাঁপা গলায় আকাশ বলে উঠল, “তুই… তুই এটা কী করলি সৌহার্দ্য?”
আকাশের এই প্রশ্নটা সৌহার্দ্যের বুকে ছুরির মতো বিঁধল। বন্ধুকে সে যেন আজ নতুন করে দেখছে—একজন অচেনা মানুষ! সৌহার্দ্য কিছু বলার আগেই আকাশ তাড়া দিল, “তুই পালিয়ে যা! এই মুহূর্তে এখান থেকে পালা!”
সৌহার্দ্য হতভম্ব হয়ে বলল, “আশ্চর্য! আমি পালাব কেন? মেয়েটা মিথ্যে বলছে! তুই কি সত্যিই বিশ্বাস করিস আমি এমনটা করতে পারি?”
আকাশের চোখ দুটো তখন অপলক মেয়েটির দিকে। যন্ত্রণাকাতর স্বরে সে বলল, “আমি বিশ্বাস করি বলেই তোকে পালাতে বলছি! কিন্তু গ্রাম্য সমাজ, ওরা কি সেটা বুঝবে? সবাই যখন আঙুল তুলবে, তখন তুই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবি কীভাবে?”
সৌহার্দ্যর জেদ ছিল অটুট। সে পালাতে রাজি নয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ বাধ্য হয়ে সুজন ও ফারিসকে ডেকে তুলল। ঘরের দৃশ্য দেখে তারাও হতভম্ব, কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে তাদের দেরি হলো না। আকাশের পরামর্শে তারা দুজনে মিলে জোর করে সৌহার্দ্যকে টেনে ঘর থেকে বের করে আনল।
ওরা ধরে সৌহার্দ্যকে অর্ধেক রাস্তায় আনার পরও সে বারবার ফিরে যেতে চাইছিল। কারণ তার দৃঢ় বিশ্বাস, সে এমনটা করেনি। সৌহার্দ্য একজন মেডিকেল ইন্টার্ন, সে খুব ভালো করেই জানে যে সাথে সাথে আন্দাজে কোনো কথা বললে তা প্রমাণিত হয় না। সে জেদ ধরে বলল, ” মেয়েটাকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে চল, সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেই সত্য বেরিয়ে আসবে!”
কিন্তু সুজন আর ফারিস তার কথা শুনল না। ওরা খুব ভালো করেই জানে, সৌহার্দ্যর এই যুক্তি শোনার মতো ধৈর্য এই গ্রামের মানুষের নেই। তাই সৌহার্দ্যকে অনেক বুঝিয়ে, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত ওরা তাকে সেখান থেকে নিয়ে আসে।
সেই রাতের রেশ কাটতে না কাটতেই ফারিস ও সুজন সৌহার্দ্যকে নিয়ে ঢাকার পথে রওনা হলো। ঢাকায় ফেরার পর কেটে গেল তিনটি দুঃসহ দিন। তারা বারবার আকাশের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে, কিন্তু আকাশের ফোন প্রতিবারই বন্ধ পাওয়া গেছে। উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে ফারিস তো সরাসরি আকাশের বাড়িতে গিয়েও হানা দিয়েছিল, কিন্তু সেখানেও আকাশকে না পেয়ে তাকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।
এই তিন দিন সৌহার্দ্যের মনের ভেতর ছিল এক অস্থির দহন। সে বারবার খুলনা ফিরে যাওয়ার জেদ ধরেছে, কিন্তু ফারিস আর সুজন তাকে আটকিয়েছে—পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিতে। কিন্তু কোনো ভালো বা মন্দ—কোনো খবরই যখন পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন আর স্থির থাকা সম্ভব হলো না। ওরা তিনজনই আবার ছুটল খুলনার পথে।
খুলনায় পৌঁছানোর পর যা শুনল, তাতে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল তাদের মাথায়। মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মেয়েটির মানসিক সমস্যা ছিল এবং এর আগেও সে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল; কেউ না কেউ তাকে বারবার বাঁচিয়ে তুলেছে। মেয়েটি ছিল এতিম, আকাশের খালার বাড়িতেই সে থাকত—সম্পর্কে সে ছিল খালার জায়ের মেয়ে।
এই খবর শুনে সৌহার্দ্যের মাথা যেন আরও হ্যাং হয়ে গেল। মেয়েটিকে সে সেদিন যতটুকু দেখেছিল, তাতে তো তাকে এতটুকুও অস্বাভাবিক মনে হয়নি! সবচেয়ে রহস্যময় বিষয় হলো, এই মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো থানা-পুলিশের ঝামেলাও হয়নি। যেন সবকিছু খুব গোপনে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। আর আকাশ? আকাশের কোনো হদিসই নেই।
সৌহার্দ্যের কেন জানি মনে হচ্ছে, খুব নিখুঁত কোনো ছকে তাকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু কেন? কীভাবে? কোনো সূত্রই তার মাথায় আসছে না। চারপাশের ঘটনাগুলো যেন গোলকধাঁধার মতো—কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে—সবকিছুই তাদের উপলব্ধির সীমানার বাইরে।
খুলনা থেকে কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে যখন তারা হতাশ মনে ঢাকায় ফিরে এল, ঠিক তখনই সৌহার্দ্যের মোবাইলে একটি অজানা আতঙ্ক এসে আছড়ে পড়ল। শাহাবীরের নাম্বার থেকে আসা একটি ভিডিও ফাইল। ভিডিওটি ওপেন করতেই সৌহার্দ্যের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল।
ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—সে অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় বিছানায় বসে আছে, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লিপস্টিকের গাঢ় ও এলোমেলো দাগ। পাশে সেই মেয়েটি বস্ত্রহীন অবস্থায় অগোছালো চুলে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ভিডিওতে তার কান্নার শব্দ বা অস্পষ্ট কিছু কথা শুনেই সৌহার্দ্যের বুকটা কেঁপে উঠল। তার বুঝতে বাকি রইল না যে, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং তাকে পরিকল্পিতভাবে এক নিখুঁত ফাঁদে ফেলা হয়েছে।
হাত কাঁপাকাঁপা অবস্থায় সৌহার্দ্য দ্রুত শাহাবীরের নাম্বারে কল করল। রিং হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল শাহাবীরের তিক্ত, ঘৃণাভরা কণ্ঠ। শাহাবীর চিৎকার করে বলে উঠল, “কেন এমন করলি সৌহার্দ্য? এত নিচে নামতে পারলি তুই? ছিঃ! তোকে বন্ধু ভাবতে এখন আমার নিজেরই ঘৃণা হচ্ছে!”
সৌহার্দ্য নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সে শান্ত স্বরে বোঝাতে চাইল যে, এটি একটি সাজানো নাটক, সে নির্দোষ। কিন্তু শাহাবীর যেন অন্ধ—সে কিছুই শুনতে রাজি নয়, বারবার সৌহার্দ্যকে জঘন্যতম দোষারোপ করে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে শাহাবীর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হুমকি দিয়ে বসল, “তুই এক সপ্তাহের মধ্যে আমার বোনকে ডিভোর্স দিবি! তোর মতো একজন রেপিস্টের কাছে আমার বোনকে আমি আর এক মুহূর্তও রাখব না! ওকে আমি আমেরিকায় নিয়ে আসব।”
সৌহার্দ্যের মেজাজ এমনিতেই খিটখিটে, তার ওপর এই চরম অপবাদ আর শাহাবীরের উদ্ধত আচরণ তার সহ্যশক্তির বাঁধ ভেঙে দিল। রাগে শরীর কাঁপতে কাঁপতে সৌহার্দ্যও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সেও রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বলল, রিদিকে সে কখনোই স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেনি, আর ভবিষ্যতেও করবে না। রিদি থাকুক বা না থাকুক, তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না!
সৌহার্দ্যের এই কঠোর কথা শুনে শাহাবীরের ক্রোধের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেল। এরপর শুরু হলো পুরো এক ঘণ্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর, উত্তপ্ত ঝগড়া—শব্দ আর ঘৃণার লড়াই। ঝগড়া শেষে সৌহার্দ্য যখন ফোনটা কেটে দিল, তখন তার চোখেমুখে আগুনের হলকা। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে শাহাবীরকে সব প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্লক করে দিল। যোগাযোগ করার সব পথ সে নিজে থেকেই চিরতরে বন্ধ করে দিল,
দশ দিন কেটে গেছে। হাতে সময় খুব কম, তবুও সৌহার্দ্যের দৃঢ় বিশ্বাস—পুরো ঘটনার পেছনে নিখুঁত কোনো ছক কষা হয়েছে। কেউ একজন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রিদির জীবন থেকে তাকে সরিয়ে দিতে চাইছে, আর রিদি নিজেও হয়তো অজান্তে সেই ষড়যন্ত্রের দাবার ঘুঁটি হয়ে আছে। নিজের সন্দেহকে উপেক্ষা না করে সৌহার্দ্য আবার ফারিস ও সুজনকে নিয়ে খুলনায় পৌঁছাল।
এবারের মিশন আরও সাহসী। সৌহার্দ্য জানত, যতক্ষণ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ তার হাতে না আসছে, ততক্ষণ সে সমাজের চোখে একজন ‘রেপিস্ট’ই রয়ে যাবে। সে গোপনে যোগাযোগ করল একজন অভিজ্ঞ ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সাথে। হাসপাতালের নথিপত্র আর ব্যক্তিগত পরিচিতির জোরে দীর্ঘ আইনি জটিলতার তোয়াক্কা না করে, অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে মেয়েটির দেহাবশেষ উত্তোলন করে নতুন করে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হলো।
রিপোর্ট আসার পর সৌহার্দ্যের সব সংশয় দূর হয়ে গেল—মেয়েটির শরীরে যৌন নির্যাতনের কোনো আলামত নেই। বরং ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মেয়েটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার পর ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। অর্থাৎ, পুরো ঘটনাটিই সাজানো হত্যাকাণ্ড। সৌহার্দ্য নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য ঘটনার সেই রাতের প্রতিটি মুহূর্তের টাইমলাইন, ভিডিওর ফ্রেম এবং লজিস্টিক তথ্যগুলো সংগ্রহ করল।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই ঘটনার পর মেয়েটির পরিবার কোনো মামলা করল না, না তাকে কোন আইনি জামেলাই পড়তে হলো। যেন কিছু হয় নি,সব স্বাভাবিক! ভিডিওটি শুধুমাত্র শাহাবীরের কাছেই পৌঁছেছে, অন্য কেউ এর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেই না। সৌহার্দ্যের বুঝতে বাকি রইল না, এর পেছনে আকাশের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ আছে। কিন্তু সেই রাতের পর থেকেই আকাশ যেন পৃথিবী থেকে উবে গেছে।
সৌহার্দ্যের লন্ডনের সিডিউল চূড়ান্ত হওয়ার পর সে। অনেকটা বাধ্য হয়েই পাড়ি জমালো লন্ডনে, আর মাঝখান থেকে শাহাবীরের সাথে তার সম্পর্কের সবটুকু বিশ্বাস ধূলিসাৎ হয়ে গেল। দীর্ঘ চারটি বছর সৌহার্দ্য অনেক চেষ্টা করেছে আকাশকে খুঁজে বের করতে, কিন্তু প্রতিবারই ফিরেছে শূন্য হাতে। চার বছর পর যখন সে দেশে ফিরল, রিদিকে দেখে সে চিনতে পারেনি—চেনার কথাও ছিল না।
কিন্তু যখন সে বুঝতে পারল রিদিই তার স্ত্রী, তখন থেকে অদ্ভুত এক টান অনুভব করতে লাগল সে। রিদির কাছাকাছি থাকতে থাকতে তার মনে ধীরে ধীরে অনুভূতির জন্ম নিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে, একদিন এক আননোন নাম্বার থেকে তার ফোনে সেই ভিডিও এল। ভিডিওর নিচে ছোট করে লেখা: “ডাঃ সৌহার্দ্য চৌধুরী, নিজেকে যতই নির্দোষ প্রমান করুন না কেন, এই ভিডিও একবার পাবলিক হলে আপনার সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে।”
মেসেজটা দেখার দুই মিনিটের মধ্যেই নাম্বারটা অস্তিত্বহীন হয়ে গেল। সৌহার্দ্য নিশ্চিত হলো, যারা এসব করছে তাদের উদ্দেশ্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে ধ্বংস করা নয়, বরং রিদির থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা। সে নিজে থেকেই কারণগুলো খুঁজতে নেমে পড়ল। ধীরে ধীরে অনেক সত্য বেরিয়ে আসতে লাগল। সৌহার্দ্য বুঝতে পারল, এর পেছনে বাইরের শত্রুর পাশাপাশি তার নিজের আপন কেউ একজন কলকাঠি নাড়ছে। বাইরের মানুষটাকে সে কিছুটা আঁচ করতে পারলেও, সেই আপন মানুষটাকে কিছুতেই শনাক্ত করতে পারছে না। তবে এটুকু পরিষ্কার যে, সে সৌহার্দ্যের বড় কোনো ক্ষতি না করে কেবল রিদির জীবন থেকে তাকে সরিয়ে দিতে চায়।
কিন্তু শাহাবীরকে দিয়ে যখন কাজ হলো না, তখন সেই একই ভিডিও রিদির ফোনে পাঠানো হলো। নিচে লেখা:
“একজন রেপিস্টের সাথে সংসার করছেন রিদিতা খান!”
এমনিতেই রিদির সাথে সৌহার্দ্যের সম্পর্কের সমীকরণটা খুব একটা ভালো ছিল না। সৌহার্দ্য প্রতিনিয়ত তাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকার না করে যেভাবে অপমান করে এসেছে, তাতে রিদির মনে এই ভিডিও দেখার পর সন্দেহ দানা বাঁধার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল।
রাতের নিঝুম প্রহর, ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো। সৌহার্দ্যের মাথার ভেতর অগোছালো ভাবনারা ভিড় করছিল। অস্থিরতা যখন চরমে, তখন সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মনে হলো, এই মুহূর্তে রিদিকে না দেখলে তার দম বন্ধ হয়ে আসবে। কোনো রকম যুক্তি বা চিন্তার তোয়াক্কা না করে সে রায়েদা শেখের বাসার দিকে ছুটল।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, দারোয়ানকে নানাভাবে রাজি করিয়ে অবশেষে সে রায়েদা শেখের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কপালে ঘাম, হৃদপিণ্ডে তীব্র উত্তেজনা। বেল বাজাতেই ঘুমজড়ানো চোখে দরজা খুললেন রায়েদা শেখ। এত রাতে নিজের দরজার সামনে সৌহার্দ্যকে দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। ফারিসের কাছে তিনি আগেই জেনেছিলেন সৌহার্দ্যের চট্টগ্রাম আসার কথা। তাই তাকে দেখে স্বস্তির বদলে বরং একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে। ঝাঁঝালো গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কি চাই এত রাতে?”
খালার মুখে এমন শীতল অভ্যর্থনা পাওয়ার জন্য সৌহার্দ্য প্রস্তুত ছিল না। সে ভেবেছিল, রিদির দেখা পেতে সাহায্য করবেন খালা, উল্টো তাকে দেখে খালার গলার সুর এমন কর্কশ কেন? হতভম্ব সৌহার্দ্য আমতা আমতা করে কোনোমতে বলল, “প… পানি খেতে এসেছি।”
রায়েদা শেখের বিরক্তি যেন এবার চরমসীমায় পৌঁছাল। যেন এমন হাস্যকর অজুহাত তিনি জীবনে শোনেননি। বিরক্তমুখে বললেন, “তোমার বাসায় পানি নেই?”
সৌহার্দ্য বিপাকে পড়ে গেল। মিথ্যা বলার অভ্যাস নেই, তাই তোতলাতেই হলো, “ছিল… এখন শেষ।”
বলেই সে বাসার ভেতরে ঢোকার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু রায়েদা শেখ তাকে বাধা দিয়ে বললেন, “আমার বাসায় যুবতী মেয়ে আছে। এত রাতে তোমাকে ঢোকানো যাবে না। তুমি দাঁড়াও, আমি পানি দিচ্ছি।”
সৌহার্দ্য যেন পাথরের মতো জমে গেল। আশ্চর্য হয়ে সে ভাবল—একজন তার বউ, অন্যজন তার বোন; আর সেখানে সে কি পর? ভেতরে ঢুকতে পারবে না কেন? তার ভাবনার রেশ কাটার আগেই রায়েদা শেখ এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “যাও, গ্লাস ফেরত দিতে হবে না!”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৯
পরক্ষণেই ‘ধড়াস’ করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল সৌহার্দ্যের মুখের ওপর। হাতে পানির গ্লাস নিয়ে সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে। নিজের এই করুণ দশা দেখে তার নিজেরই হাসি পাচ্ছে, নাকি রাগ হচ্ছে—সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।
