অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪১
রিদিতা চৌধুরী
গভীর রাতের নিস্তব্ধতা আজ যেন এক অদ্ভুত সুর হয়ে বাজছে। শিকদার বাড়ির অন্দরমহল তখন গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন, কেবল রিদির ঘরের জানালা চুঁইয়ে আসা চাঁদের ম্লান আলোটুকু মেঝেতে বিছিয়ে আছে রূপোলি কার্পেটের মতো। সৌহার্দ্যের শরীরের উষ্ণতা আর তার পৌরুষদীপ্ত ঘ্রাণে রিদির অস্তিত্ব যেন এক মুহূর্তেই বন্দি হয়ে পড়েছে।
সৌহার্দ্য রিদির ওপর ঝুঁকে আছে; তার চোখের তারায় এক গভীর ব্যাকুলতা—যেন বহু যুগের তৃষ্ণার্ত কোনো পথিক। রিদির দুই হাত নিজের মুঠোয় আলতো করে আটকে সে যখন খুব কাছ থেকে তার চোখের দিকে তাকাল, রিদির মনে হলো পৃথিবীর সব কোলাহল যেন থেমে গেছে। সৌহার্দ্যের তপ্ত নিঃশ্বাস রিদির কপালে এসে আছড়ে পড়ছে, আর সেই উষ্ণ ছোঁয়ায় রিদির সারা শরীরে এক অদৃশ্য শিহরণ বয়ে যাচ্ছে।
রিদি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে, অস্ফুট স্বরে বলল,
“দ-দরজা খোলা… উঠুন প্লিজ?”
সৌহার্দ্য সেসব কথার কোনো তোয়াক্কা করল না। বরং সে রিদির দিকে আরেকটু ঝুঁকে এল, তারপর অত্যন্ত আলতো করে রিদির চোখের পাতায় তার উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ রাখল। কয়েক মুহূর্ত সেই অবস্থায় থেকে, পলকহীন দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল সে। এরপর নেশাভরা, গম্ভীর কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা স্বরে বলল—
“এই চোখ দুটোর মধ্যে এত মায়া কেন, হার্ট? এই মায়াবী দৃষ্টির কাছেই সৌহার্দ্য চৌধুরী বারবার অসহায় হয়ে পড়ে। যার চোখের এক ফোঁটা পানি দেখার ক্ষমতাও এই সৌহার্দ্যে চৌধুরীর হয়না… বলতে পারেন, কেন এমন হয়?”
রিদি সৌহার্দ্যের আবেগঘন কথাগুলো শুনে যেন মোমের মতো গলে গেল। সে আলতো করে নিজের হাত দুটো সৌহার্দ্যের হাতের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিল, তারপর নিবিড় মমতায় তার গলা জড়িয়ে ধরল। তার কণ্ঠে তখন একরাশ ব্যাকুলতা,
“আমার খুব ভয় করছে, ডাক্তার সাহেব! কেউ কেন চাইছে আমাদের আলাদা করতে? সত্যি যদি আমরা আলা…”
রিদি কথাটা শেষ করতে পারল না। সৌহার্দ্য তার তর্জনী আলতো করে রিদির ঠোঁটের ওপর রাখল, ওকে থামিয়ে দিল। কিছুক্ষণ রিদির চোখের গভীরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে, নিচু অথচ গম্ভীর স্বরে সে ফিসফিস করে বলল,
“সৌহার্দ্য চৌধুরীর দেহে যতক্ষণ এক ফোঁটা প্রাণ আছে, ততক্ষণ তার কাছ থেকে তার স্টুপিড মহিলাকে আলাদা করার শক্তি এই পৃথিবীর কারও নেই।”
একটু থেমে সে আরও কাছে টেনে নিল রিদিকে, তারপর রিদির আবেগে টলমল করা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমার ভালোবাসা নও, তুমি আমার অস্তিত্ব। তুমি আমার নিশ্বাস, আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ। তুমি আমার এমন এক আসক্তি, যেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছেও আমার নেই। এই আসক্তিতেই সারাজীবন ডুবে থাকতে চাই আমি। আমার প্রতিটি নিশ্বাসে, প্রতিটি হৃদস্পন্দনে, প্রতিটি অনুভূতিতে শুধু তোমারই নাম খোদায় করা। তোমাতেই আমার শুরু, তোমাতেই আমার শেষ। আমার প্রতিটি সকাল তোমাকে দিয়ে শুরু হয়, আর প্রতিটি রাত তোমাকেই ভেবে শেষ হয়। এই সৌহার্দ্য চৌধুরীর রাজ্যে একমাত্র রানি আপনি—মিসেস চৌধুরী।”
কথাগুলো বলেই সৌহার্দ্য রিদির ঠোঁটের কোণে আলতো করে একটি চুমু খেল। তারপর চোখের দিকে তাকিয়ে আবার ও শীতল অথচ দৃঢ় স্বরে বলে উঠল,
“যতই ঝড় তুফান আসুক মান অভিমন হোক না কেন “আমাকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা ও কখনো করবেন না, মিসেস চৌধুরী, তাহলে সেদিনের দুজনের জীবনের শেষ দিন হবে!” আমি কিন্তু আপনার চিন্তা ভাবনার থেকেও অনেক বেশি খারাপ মানুষ,!”
রিদির স্তব্ধতা ভেঙে সৌহার্দ্যের প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয়ের গভীরে গিয়ে আঘাত করছিল। অতিরিক্ত আবেগে তার দুচোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আজ মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী বোধ হয় সে নিজেই। যে মানুষটিকে সে সব সময় রাগী আর জেদি ভেবে এসেছে, সেই মানুষটার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে শুধু তারই বাস—এই সত্যটা মেনে নিতেও রিদির কষ্ট হচ্ছে। নাক টেনে, ভেজা চোখে সে মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল,
“এত ভালোবাসেন আমার ডাক্তার সাহেব?”
সৌহার্দ্য উত্তর না দিয়ে রিদির ফুলকো গাল দুটিতে আলতো করে কামড় বসিয়ে দিল। এরপর গম্ভীর, গমগমে স্বরে বলল,
“স্টুপিড মহিলা, আই ডোন্ট লাভ ইউ!”
কথাটা শেষ হতে না হতেই তার গাঢ় বাদামী ওষ্ঠজোড়া রিদির নরম, তুলতুলে ওষ্ঠের ভাঁজে ডুবিয়ে দিলো। রিদির হাতগুলো অনৈচ্ছিকভাবে সৌহার্দ্যের শার্ট আঁকড়ে ধরল, নখের আঁচড়ে ফুটে উঠল সেই আকুলতা। কিন্তু পরক্ষণেই সৌহার্দ্য নিজেকে সরিয়ে নিল। চোখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে সে নিচু স্বরে বলল,
“স্টুপিড মহিলা, রেসপন্স করো! ফিল পাচ্ছি না।”
রিদির মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। বুকের ভেতর যেন হাজারটা রঙিন প্রজাপতি ডানা ঝাপটাচ্ছে, অদ্ভুত এক শিহরণে তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন কেঁপে উঠছে। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই সৌহার্দ্য আবার তাকে গভীর চুম্বনে ডুবিয়ে দিল। রিদি তাল মেলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু এই উন্মত্ত পুরুষের আবেগের তোড়ে সে খেই হারিয়ে ফেলল।
অনেকক্ষণ পর যখন সৌহার্দ্য তাকে ছেড়ে দিল, তখন তার ঠোঁট কাঁপছে। সৌহার্দ্য ঝুকে এসে রিদির কানের লতিতে আলতো করে দাঁত বসিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“প্রস্তুত হন মিসেস চৌধুরী, আপনার এই ছোট্ট শরীরটাতে আমার উত্তাপ সয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিন। আমার এসব নরম আদরে পোষাবে না সুইটহার্ট; একবার আমার বাহুবন্দী হলে, কাঁদতে কাঁদতে মুক্তি চাইলেও আমি আপনাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়ব না!”
রিদির গালের রং যেন শরতের শেষ বিকেলের রাঙা আভার চেয়েও গাঢ়। লজ্জায় তার সর্বাঙ্গ যেন আগুনের তাপে পুড়ে যাচ্ছে, কান দিয়ে যেন সূক্ষ্ম গরম ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে—আর ফোলা গাল দুটো ঠিক যেন রসে টইটুম্বুর দু’টি চেরী ফল! কাঁপা কাঁপা হাতে সে সৌহার্দ্যর বুকের ওপর আলতো করে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“অসভ্য পুরুষ! চুপ করুন তো!”
সৌহার্দ্যর মুখে বাঁকা হাসির ঝিলিক। নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়িভর্তি গালটা রিদির মসৃণ ত্বকে ঘষতে ঘষতে নিচু স্বরে বলল,
“তুমি এত সফট কেন জান? খেয়ে…”
কথাটা শেষ হলো না। রিদি দ্রুত নিজের হাত দিয়ে সৌহার্দ্যর মুখটা চেপে ধরল। অভিমানে আর লজ্জায় কাবু হয়ে বলল,
“ছিঃ! একদম নষ্ট পুরুষ! এভাবে লজ্জা দিয়ে মেরে ফেলতে চান আমাকে?”
রিদির কথা বলা মাত্র সৌহার্দ্য ওর আঙুলে আলতো একটা কামড় বসিয়ে সৌহার্দ্য বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রিদির দিকে ফিরতেই দেখল, লজ্জায় মেয়েটার মুখটা রাঙা হয়ে আছে, যেন ভোরের রক্তিম আভা। সৌহার্দ্য তার গম্ভীর মুখোশটা টেনে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে শীতল গলায় বলল,
“দেরি হয়ে যাচ্ছে, রেডি হয়ে নাও। হারি আপ!”
খানিক সময়ের ব্যবধানে সৌহার্দ্যের এই রুক্ষতা রিদির মনে চিনচিনে ব্যথা জাগিয়ে দিল। সে মলিন মুখে বিছানায় বসে রইল, তারপর আলতো করে সৌহার্দ্যের শার্টের কোণাটা টেনে ধরে করুণ স্বরে বলল,
“ভাইয়ার কাছে কয়টা দিন থাকি না? প্লিজ, না করবেন না!”
সৌহার্দ্যের চোখেমুখে বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু কঠোর স্বরেই বলল,
“সরি হার্ট, তোমাকে ছাড়া আমার ঘুম হয় না। এমন অহেতুক জেদ করো না লক্ষ্মীটি!”
রিদি করুন চোখে তাকিয়ে রইল। তার বড় বড় চোখের কোণে জমে ওঠা অভিমান আর বিষণ্ণতা দেখে সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুলে উঠল। সৌহার্দ্য নিজের বিরক্তিটুকু সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ওকে, থাকো। বাট অনলি টু ডেইজ! এরপর কিন্তু কোনো অজুহাত চলবে না।”
বলেই রিদির কপালে একটা দীর্ঘ ও স্নিগ্ধ চুমু এঁকে সে যখন বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো, রিদি ব্যাকুল গলায় বলে উঠল,
“আজ রাতটা থেকে গেলে হতো না? অনেক রাত, …”
সৌহার্দ্য থমকে দাঁড়িয়ে রিদির দিকে ঝুঁকে এল। রিদির ঠোঁটের কোনে আলতো একটা আদুরে চুমু এঁকে সে অসহায় গলায় ফিসফিস করে বলল,
“পসিবল না পাখি। ঘন্টা খানেক পরেই একটা জরুরি ওটি (OT) আছে। আমাকে যেতে হবে। সাবধানে থেকো, কোনো প্রয়োজনে ফোন দিও, সুইটহার্ট।”
বলেই হাত ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে গেল!
সকাল আটটার স্নিগ্ধ আলোয় রিদির ঘুম ভাঙল। আজ যেন চারপাশটা অন্যরকম উজ্জ্বল, মনে হচ্ছে কোনো এক অজানা খুশির দোলায় মনটা দোল খাচ্ছে। অকারণে ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা কিছুতেই যেন থামছে না। রাতের কথাগুলো মনে পড়তেই তার গাল দুটো রক্তিম আভা ধারণ করল—লজ্জায় সে মুখ লুকাতে চাইছে। সৌহার্দ্যের সেই প্রতিটি কথা যেন এখনো তার কানে সুরের মতো বাজছে। মুখে না ভালোবাসি না বলেও কত সহজে বুঝিয়ে দিলো—সৌহার্দ্যের অস্তিত্বের গভীরে সে কতটা জড়িয়ে আছে।
রিদি আলতো হাতে মোবাইলটা তুলে নিল। হৃদস্পন্দন কিছুটা বাড়িয়ে টাইপ করল,
“গুড মর্নিং ডাক্তার সাহেব!”
নিমিষেই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল টুং শব্দ। মেসেজটা খুলে রিদির চোখেমুখে একরাশ প্রশান্তি।
“ভেরি গুড মর্নিং সুইটহার্ট! আই অ্যাম বিজি নাউ, পরে কল দিচ্ছি তোমায়। ওকে হার্ট?”
মুচকি হেসে রিদি ফিরতি মেসেজ পাঠাল,
“ওকে!”
তারপর ফোনটা পাশে রেখে সে একরাশ উচ্ছ্বাস নিয়ে বিছানা ছাড়ল।
ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে যেতেই দেখল সবাই নাশতার টেবিলে বসে পড়েছে। রিদিকে দেখেই শাহাবীর স্নেহের স্বরে তার পাশের চেয়ারটা টেনে দিল। রিদি গিয়ে ভাইয়ার পাশে বসতেই শাহাবীর পরম মমতায় নিজে হাতে খাবার বেড়ে তার মুখে তুলে দিতে লাগল। আরিফা খান একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন, তাঁর চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি; ভাই-বোনের এই গভীর ভালোবাসা দেখে যেন তাঁর প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই টেবিলের আবহটা বিষাক্ত করে তুললেন আকিব শিকদার। শাহাবীরের দিকে তীক্ষ্ণ, বিরক্তির চোখে তাকিয়ে তিনি রুক্ষ গলায় বলে উঠলেন,
“আর কতদিন এভাবে অন্যের দায়িত্ব ঘাড়ের ওপর বয়ে বেড়াবে? রিদি মামুনি এখন বড় হয়েছে, তার সব দায়-দায়িত্ব এবার ওকে বুঝিয়ে দাও।”
টেবিলের পরিবেশটা মুহূর্তেই থমথমে ভারী হয়ে উঠল। শাহাবীর এক পলক বাবার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তাচ্ছিল্যের হাসি। স্থির কণ্ঠে সে বলল,
“কেন পাপা? শত্রুদের সুবিধা করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে?”
আকিব শিকদার চমকে উঠলেন। শাহাবীর কখনো তার সঙ্গে এভাবে কথা বলেনি। তিনি কিছুটা হকচকিয়ে গেলেন, পরক্ষণেই সামলে নিয়ে হালকা কাশলেন। নিজেকে স্বাভাবিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করে বললেন,
“ওর আবার কিসের শত্রু? কীসব বাজে কথা বলছ? ও তো এখনো বাচ্চা মেয়ে! আর তাছাড়া, এখন ওর ভালো-মন্দ বোঝার বয়স হয়েছে, নিজেরটা ওর বুঝে নেওয়াই ভালো।”
এরপর কণ্ঠে সামান্য বিষ মিশিয়ে যোগ করলেন,
“তাছাড়া, তোমার নিজেরও তো একটা ভবিষ্যৎ আছে, নাকি? সব তো তোমার বোনের নামে করে দেওয়া হয়েছে…”
আকিব শিকদারের বাক্য শেষ হওয়ার আগেই শাহাবীরের রাগী কণ্ঠস্বরে বাতাস যেন কেঁপে উঠল। সে বলে উঠল,
“প্রয়োজনে আমার যা কিছু আছে, তাও আমার বোনেরই হবে! এই পৃথিবীতে ও আমার সবথেকে বড় সম্পদ। তাই ওই বিষয়ে কারো কাছ থেকে আমি কোনো ধরনের মন্তব্য শুনতে চাই না। আজকের পর থেকে যেন এই আলোচনার পুনরাবৃত্তি না হয়!”
বলেই সে পরম যত্নে রিদির মুখটা মুছিয়ে দিল। এরপর আদুরে কণ্ঠে বলল,
“তুই রুমে যা। কলেজ যেহেতু নেই, একটু পড়াশোনা কর। আমি ফিরলেই তোকে ঘুরতে নিয়ে যাব।”
রিদি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল।
আকিব শিকদারের কথায় রিদি বিশেষ মাথা ঘামাল না। কারণ, সে আগে থেকেই জানে যে তার বাবা আকরাম খানের মৃত্যুর পর তাদের সমস্ত সম্পত্তি দেখাশুনার দায়িত্ব আরিফা খানের বড় ছেলে শাহাবীর নিয়েছে। তবে রিদি তখনো জানত না যে শাহাবীর তার আপন ভাই। সে কেবল এটুকুই জানত যে, খান বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে তার দাদা আর বাবা আকরাম খান মিলে সমস্ত সম্পত্তি তার নামে করে দিয়ে গেছেন। আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার পর সে সবকিছুর মালিকানা বুঝে নিতে পারবে—এমনটাই সে শুনেছে সরহান চৌধুরীর কাছে!
আকরাম খানের আরেকটি সন্তান ছিল—রিদা। কিন্তু সে তার নিজের রক্ত নয়, জেলখানার এক আসামির সন্তান। মেয়েটি জন্ম নেওয়ার পরই তার মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। আকরাম খান দয়া পরবশ হয়ে মেয়েটিকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। কিন্তু তার একান্ত ইচ্ছে ছিল তিন জন মানে, শাহবীরসহ সবাইকে, সমান চোখে দেখবেন এবং সবকিছুর সমান ভাগীদার করবেন। কিন্তু আকরাম খানের বাবার জন্য সেটা আর হয়ে ওঠেনি।
আকরাম খানের বাবা মানুষটা অনেকটা আরমান খানের মতোই ছিলেন, খুব একটা সহজ-সরল বা ভালো মানুষ তিনি ছিলেন না। কেন জানি না, তিনি কোনোভাবেই শাহবীরকে নিজের বংশধর হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। অথচ কী অদ্ভুত ব্যাপার, সেই দাদাই আবার রিদিকে নিজের কলিজার টুকরো মনে করতেন। আকরাম খান কখনো তার বাবার কথার অবাধ্য হওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না, তাই শেষ পর্যন্ত বাবার জেদের কাছে তিনি নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার যেহেতু নিজের কোনো সন্তান ছিল না, তাই এসব নিয়ে তিনি খুব একটা মাথা ঘামাতে চাননি। তবে সত্যি বলতে, রিদাকে তিনি কখনো ভাইয়ের সন্তান মনে করেননি, নিজের সন্তানের মতোই পরম যত্নে বড় করেছেন। মেয়েটাকে কোনোদিন তিনি বুঝতেই দেননি যে, যারা তাকে বড় করছে—তার আসল বাবা-মা তারা নন!
দুপুর প্রায় বারোটা। শহরের একটি অভিজাত রেস্টুরেন্ট। টেবিলের একপাশে বসে আছে সৌহার্দ্য, ফারিস আর সুজন; ঠিক তাদের মুখোমুখি তাজওয়ান। গত আধা ঘণ্টা ধরে সৌহার্দ্য তাজওয়ানের দিকে এমন এক শিকারি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যে, কারো সাধ্য নেই বোঝার—তার মাথায় ঠিক কী চলছে।
দীর্ঘক্ষণ এই অদ্ভুত নীরবতার পর তাজওয়ান বিরক্তি ঝেড়ে বলল,
“হঠাৎ আমাকে ডাকার কারণটা বলবি? নাকি বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে বলে এখন শত্রুকে দেখে নিজের খায়েশ মেটাতে চাচ্ছিস?”
বলেই এক গাল বাঁকা হাসি দিল তাজওয়ান।
সৌহার্দ্যর কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। তবে পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে সে শান্ত গলায় বলল,
“আমার এত সুন্দরী বউ থাকতে তোকে দেখে খায়েশ মেটাতে হবে কেন, বল? উল্টো তোর জন্যই তো উপকার হলো! শশুরবাড়ি বউয়ের রাগ ভাঙাতে গিয়ে দুই দফা হট রোমান্স সেরে এলাম। তোর কারণেই আমার অসম্পূর্ণ কাজটা সম্পূর্ণ হলো, তাই ভাবলাম তোকে ট্রিট দিই। আমার আবার স্বভাবই এমন—কেউ উপকার করলে তাকে কিছু না দিতে পারলে মনটা ছটফট করে।”
কথাটা বলেই সৌহার্দ্য নিজের শার্টের কলারটা একটু নিচে নামাল। ঘাড়ের কাছে একটা স্পষ্ট লাল দাগ দেখিয়ে একটা বিজয়ীর হাসি দিয়ে বলল,
“দেখ, বউ কত ভালোবেসে লাভ বাইট দিয়েছে!”
তাজওয়ান কে সুন্দর করে মিথ্যা বললেও সৌহার্দ্য মনে রাগে ফেটে পড়ল। তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে—’কুত্তার বাচ্চা, তোর জন্য বউয়ের লাভ বাইট তো দূরের কথা, অধেকরাত রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেয়েছি! তোকে কেটে কুচি কুচি না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। হারামীর বাচ্চা, জেনে শুনে তুই বাঘের খাঁচায় পা বাড়িয়েছিস!’
সৌহার্দ্যর কথাটা তাজওয়ান এর বিষের মত মনে হলো সে চোয়াল শক্ত করে বসে আছে, তার হাত দুটো রাগে মুষ্টিবদ্ধ। এদিকে সুজন আর ফারিস খুক খুক করে কেশে উঠল; তারা এতক্ষণ ধৈর্য নিয়ে এই দুই শত্রুর সংলাপ উপভোগ করছিল। সৌহার্দ্য অবশ্য সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। সে শান্ত ভঙ্গিতে এক ওয়েটারকে ডেকে খাবারের অর্ডার দিল।
তাজওয়ান বিরক্তিভরা কণ্ঠে বলল,
“আমি খাব না। কী বলবি বল, আমার তাড়া আছে!”
তাজওয়ানের কথা শুনে ফারিস মুখ বাঁকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল,
“অবৈধ মাল, তোর আবার কিসের তাড়া? নতুন করে কার বউ ভাগিয়ে আনার প্ল্যান করছিস শুনি?”
তাজওয়ান রাগে গর্জে উঠে বলল,
“তোর সাথে কথা বলছি না আমি!”
তারপর সৌহার্দ্যের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“আমার একজনকে চাই, সে হচ্ছে—ডা. সৌহার্দ্যর…”
কথাটা শেষ করতে পারল না তাজওয়ান। তার আগেই সৌহার্দ্য গর্জে উঠে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল। তার চোখে আগুনের ঝিলিক। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল,
“হারামির বাচ্চা, একবার তোর ওই দুর্গন্ধযুক্ত মুখে আমার বউয়ের নাম নিয়ে দেখ, তোর কলিজা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে কুকুরকে খাইয়ে দেব! শান্ত আছি, শান্ত থাকতে দে। শুকরের বাচ্চা, আমার ধৈর্য যে কতটা কম, সেটা তোদের বাপ-বেটা ভালোভাবেই জানিস!”
সৌহার্দ্যের এই রনমূর্তি দেখে তাজওয়ান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে সৌহার্দ্য কেমন মানুষ; এই ছেলে ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করতেও দুবার ভাবে না। তাজওয়ান তাই নিজেকে কিছুটা শান্ত করে বলল,
“কী বলতে চাস, বল?”
ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়েটার খাবার নিয়ে হাজির হলো। সৌহার্দ্য ইশারায় খাবার সার্ভ করতে বলল। ওয়েটার খাবার রেখে চলে যেতেই সৌহার্দ্য নিজের জুসের গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“খাওয়া শুরু কর, খেতে খেতে বলছি।”
তাজওয়ানের খাওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না, কিন্তু সৌহার্দ্যের আসল উদ্দেশ্য জানার কৌতূহলে সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাত বাড়িয়ে প্লেটে খাবার তুলে নিল। লোভনীয় খাবার দেখে সুজনও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে-ও ধুমিয়ে খেতে শুরু করল। সৌহার্দ্য সুজনের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে নিল। আসার আগেই ওই গাধাটাকে বলে দিয়েছিল জিভ সামলাতে, কিন্তু এখানে এসে খাবারের স্বাদ পেয়েই সে সব নিয়মকানুন ভুলে গেছে!সৌহার্দ্য সুজনের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কিছু বুঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সুজন খাওয়ায় এতটা মগ্ন যে সেদিকে পাত্তাই দিলো না!
ফারিস চুপচাপ তাজওয়ান আর সুজনের খাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ওদের খাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল, যেন এটাই তাদের জীবনের শেষ খাওয়া! ফারিসের এই চিন্তার মাঝেই সুজন প্লেটে আরেক টুকরো মাংস তুলে নিয়ে ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ফারিস, মাংসটা কিন্তু হেব্বি মজা হয়েছে! খেয়ে দেখ, এটা কিসের মাংসরে সৌহার্দ্য ? দারুন টেস্ট তো! এই রেস্টুরেন্টের খাবারের স্বাদ যদি আগেই জানতাম, তবে অনেক আগে থেকেই এখানে আসতাম !”
সুজনের একটানা বকবকানি ফারিসের কানের পাশ দিয়ে স্রেফ বেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে ওর বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ধড়ফড় করছে ওর; মস্তিষ্ক বারবার সংকেত দিচ্ছে—নিশ্চয়ই কোনো বড়সড় গন্ডগোল আছে! সৌহার্দ্য মোটেও এমন কোনো দয়াবান মহামানব নয় যে, নিজের স্ত্রীর সাথে ঝামেলা পাকানো ঘোর শত্রুকে ডেকে এনে এমন রাজকীয় আপ্যায়ন করবে। অসম্ভব! এর পেছনে নিশ্চিত বড় কোন গন্ডগোল তো আছে। এই ‘ভেজাল প্রোডাক্ট’টাকে ফারিস হাড়ে হাড়ে চেনে, ওর শিরায় শিরায় কী বইছে তা ফারিসের অজানা নয়।
ওর মাথার ভেতর যখন সন্দেহের পোকাগুলো কিলবিল করছে, ঠিক তখনই ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল তাজওয়ানের কথায়। সে চরম আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“খাওয়ার টা ভালো ছিল , এবার বল কি বলবি?”
তাজওয়ান এর কথা কানে যেতে সৌহার্দ্যর কাঁচের গ্লাসটা মৃদু শব্দে টেবিলে নামিয়ে রাখল। তারপর তাজওয়ানের দিকে এক বাঁকা চাহনি নিক্ষেপ করে ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় নিষ্ঠুর হাসি ফুটিয়ে ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াল সে। চেয়ার ছেড়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে, গলার স্বর নামিয়ে এনে এক হিমশীতল গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তৃপ্তি করে খাওয়ার জন্য ধন্যবাদ তোকে। খাবারটা সুস্বাদু লাগারই কথা, কারণ তোর চরিত্রের সাথে ওটার বেশ মিল আছে। ওটা মরা কুকুরের মাংস ছিল। তবে সাবধান, এরপর যদি আমার স্ত্রীর দিকে হাত বাড়ানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করিস, তবে তোকে টুকরো টুকরো করে তোর বাবার পাতে তুলে দেব, শুয়োরের বাচ্চা!”
সৌহার্দ্যর প্রতিটি শব্দ যেন বজ্রপাতের মতো নিস্তব্ধতায় আছড়ে পড়ল। তাজওয়ানের হাতের চামচটা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে থেমে গেল, একই অবস্থা সুজনেরও। দুজনেই পাথরের মূর্তির মতো স্থবির হয়ে সৌহার্দ্যর দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই যেন তাজওয়ানের পেটের ভেতরটা তোলপাড় শুরু হলো। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল বমির স্রোত, যা নিমেষেই টেবিলকে ভাসিয়ে দিল।
সুজন তখনও ঘোর কাটেনি, যেন সৌহার্দ্যর প্রতিটি ভয়াবহ শব্দ তার মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করেছে। কিন্তু তাজওয়ানের বীভৎস অবস্থা দেখে তার নিজেরও গা গুলিয়ে উঠল। তাজওয়ান যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে, দম বন্ধ হয়ে চোখ উল্টে ফেলতে শুরু করেছে; তার শরীরের ভেতর থেকে যা বেরিয়ে আসছে, তা যেন খাওয়ার পরিমাণের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ এবং বমির গন্ধে সুজন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
একটু পরেই সুজনের ও হুঁশ ফিরল, সৌহার্দ্যর সেই বিষাক্ত কথাগুলো যেন তার কানের ভেতরে আগুনের মতো জ্বলছে। সে-ও আর সামলাতে পারল না, বমির তোড়ে টেবিল ভাসিয়ে দিয়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল। রাগে, দুঃখে আর চরম বিতৃষ্ণায় সুজন বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“হে আল্লাহ, আমি কোন পাপ করেছিলাম? শাস্তি হিসেবে আমাকে এমন দুটো শয়তান বন্ধু জুটিয়ে দিলে? এমন শাস্তি দেওয়ার চেয়ে বরং আমাকে তোমার কাছে তুলে নিতে পারতে। এমন অভিশপ্ত বন্ধু তুমি শত্রুকেও দিও না, মাবুদ!”
কথাটা শেষ করেই সে পুনরায় অসহ্য যন্ত্রণায় আবার বমি করতে শুরু করল।
এদিকে তাজওয়ানের অবস্থা তখন শোচনীয়, যন্ত্রণায় তার চোখ-মুখ উল্টে যাচ্ছে। সৌহার্দ্য সেদিকে তাকিয়ে বিরক্তির চোটে ভ্রু কুঁচকে নিল। পাশেই থাকা একজন ওয়েটারকে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“এটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাও!”
ওয়েটারটি দ্রুত সায় দিয়ে তাজওয়ানকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতেই সুজন ক্লান্ত ও ভাঙা চোখে সৌহার্দ্যর দিকে তাকাল। আর্তস্বরে সে প্রশ্ন করল,
“তুই আমার সাথে এত বড় শত্রুতা কীভাবে করতে পারলি? ভাই, সত্যি করে বল তো, কিসের মাংস ছিল?”
সৌহার্দ্যর চোখে-মুখে একরাশ বিরক্তি খেলা করছে। সে ঝাঝিয়ে উঠে বলল,
“তোকে এখানে আসার সময় বলছিলাম না তোর জিভ সামলাতে? শুনছিস আমার কথা? এখন আমার দোষ দিচ্ছিস, ইডিয়েট? আর শোন, ওটা কুকুরের মাংস ছিল না!”
সৌহার্দ্যর কথা শুনে সুজন যেন মরা মানুষের মতো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তার মনে কিছুটা স্বস্তি এল যে, তার বন্ধু অন্তত অতটা খারাপ না। কিন্তু তার সেই স্বস্তি দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হলো না। তার আগেই ভেসে এল সৌহার্দ্যর সেই গমগমে কণ্ঠস্বর,
“ওটা মরা শিয়ালের মাংস ছিল!”
কথাটা বলেই সে পকেট থেকে সানগ্লাসটা বের করে চোখে লাগিয়ে নিল, এরপর কোনো দিকে না তাকিয়েই গটগট করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল।
সুজন এই মর্মান্তিক সত্য শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে তার পাকস্থলী দুমড়ে-মুচড়ে উঠল, অসহ্য গ্লানিতে সে আবারো বমি করে দিল। সৌহার্দ্যর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে সে বলল,
“আমার অভিশাপে জীবনে তুই বাসর করতে পারবি না! বউয়ের কাছে গেলেই তোর জীবনে গজব আসবে। শালার, তোর মতো বন্ধু থাকার চেয়ে খোলা শত্রু অনেক ভালো!”
কথাটা শেষ না হতেই সুজন আবার বমি করতে শুরু করল। ফারিস একটু এগিয়ে গিয়ে সুজনের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে চাইল, কিন্তু সুজন তীব্র ঝাড়ে তাকে সরিয়ে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠল,
“দূরে থাক আমার থেকে! তোরা দুটো আমাকে কবরে না পাঠানো পর্যন্ত ক্ষান্ত হবি না, তাই না? তোদের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই—ডিভোর্স দিলাম তোদের দুইজনকে আমার জীবন থেকে!”
ফারিস ওর পাগলামি গায়ে মাখল না। এই মুহূর্তে সুজনের বীভৎস অবস্থা দেখে তার যেমন হাসি পাচ্ছে, তেমনি ভীষণ মায়াও লাগছে। সৌহার্দ্যর ওপর সে কোনো দোষও চাপাতে পারছে না; কারণ আসার আগেই সৌহার্দ্য তাদের বিশেষ করে সুজনকে বারবার সতর্ক করে দিয়েছিল, সে জানত সুজন খেতে খুব ভালোবাসে। ফারিস সুজনকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলল,
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪০ (৩)
“এমন করিস না ভাই, ও তো শুধু ওই অবৈধ মালটাকে ভয় দেখানোর জন্য এসব বলছে। তুই শান্ত হ, ভাই!”
ফারিস মুখে সান্ত্বনা দিলেও মনে মনে সে জানে, এটি স্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্তু আসল রহস্যটা কী, তা সৌহার্দ্য ছাড়া আর কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সৌহার্দ্যকে সে খুব ভালো করেই চেনে। সুজনকে সান্তনা দিতে দিতে ফারিস বিরবির করে বলতে লাগল,
“সারহান চৌধুরীর ফ্যাক্টরিতে নিশ্চিত কোনো গন্ডগোল ছিল , তা না হলে এমন ভেজাল প্রোডাক্ট বের হলো কীভাবে?”
