Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪২

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪২

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪২
রিদিতা চৌধুরী

বিকেলের সূর্যটা তখন দিগন্তের কোলে নুয়ে পড়েছে। মেঘের গায়ে লেগেছে একরাশ সিঁদুরে আভার খেলা।
শিকদার বাড়ির বারান্দায় বসে রিদি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে ছিল সেই মায়াবী দৃশ্যের দিকে। বাতাসে ভাসছে শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ, আর দূর থেকে ভেসে আসা কোনো এক অজানা পাখির শেষ বিকেলের ডাক চারপাশের নিস্তব্ধতাকে যেন আরও গভীর করে তুলছে।
কিন্তু প্রকৃতির এই শান্ত রূপের বিপরীতে রিদির মনের ভেতরে তখন এক অশান্ত ঢেউ আছড়ে পড়ছে। এখানে দুই দিন থাকবে বললেও এখন, সৌহার্দ্যের অভাবটা যেন প্রতিটি মুহূর্তে ওকে বিঁধছে। সকাল থেকে লোকটার কোনো খবর নেই। একটা মেসেজ দেওয়ার পর থেকেই যেন সে এক রহস্যময় নীরবতায় হারিয়ে গেছে।
রিদির এমন ভাবনার মাঝেই শাহাবীর এসে তার পাশে বসল। বোনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“কী হলো পাখি? মন খারাপ কেন?”
রিদি ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে ম্লান হাসি হাসল।
“তেমন কিছু না ভাইয়া।”
শাহাবীর পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে বোনের হাতে গুঁজে দিল। বোনের বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর মমতায় বলল,
“আমার ওপর অনেক অভিমান তোর, তাই না?”
রিদি চেয়ার টেনে ভাইয়ের আরেকটু কাছে এগিয়ে এলো। তারপর ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,

“অভিমান তো নয় ভাইয়া, শূন্যতা। তুমি যখন জানতে আমি তোমার বোন, তখন কেন আমাকে এভাবে একা ফেলে রাখলে? কেন তখন আমাকে তোমার কাছে নিয়ে গেলে না?”
আবেগ সামলাতে না পেরে রিদির কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। চোখের কোণ গড়িয়ে জল নেমে এল তার।
“জানো ভাইয়া, মা-বাবা চলে যাওয়ার পর এই পৃথিবীতে নিজেকে বড্ড একা লাগত। প্রতিটা দিন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, এই দুনিয়ায় যদি আমার একজন মানুষও আপন থাকত! যখনই মনে হতো আমার কেউ নেই, বুকের ভেতরটা যেন চিরে যেত। অসহ্য যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে উঠতাম। অথচ তুমি ছিলে… আমার একটা ভাই ছিল, যা আমি জানতামই না!”

বলেই রিদি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ভাইয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠল। তার কান্না যেন দীর্ঘদিনের জমানো সব অবহেলা আর একাকিত্বের অভিমান হয়ে ঝরে পড়তে লাগল।
শাহাবীরের চোখজোড়া টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। পুরুষ মানুষ সহজে কাঁদে না। আর শাহাবীরও হয়তো নিজের বুকের ভেতর গুমরে ওঠা সেই হাহাকারটুকু পাথরচাপা দিয়ে গিলে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। বোনের অভিযোগের প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃৎপিণ্ডে ধারালো ছুরির মতো বিঁধছিল।
সত্যিই তো, সে চাইলে তো অনেক আগেই রিদিকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তার আগে যে পরিস্থিতির বেড়াজাল আর অন্য কারো অধিকারের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তার সামনে! যে বন্ধন চাইলেই ছিন্ন করার সাধ্য তার ছিল না, সেই অসহায়ত্বই তাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল।
শাহাবীর দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল। সেই নিঃশ্বাসের সাথে যেন বেরিয়ে এল কয়েক বছরের জমানো দীর্ঘশ্বাস। রিদিকে নিজের বুকের সাথে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে কম্পিত কণ্ঠে বলল,
“সরি কলিজা… ভাইয়াকে ক্ষমা করে দে। আমার এই পাখিটাকে আর কোনোদিন কষ্ট পেতে দেব না, প্রমিস! সৌহার্দ্য যদি তোকে এক বিন্দুও কষ্ট দেয়, তবে তার খবর আমি করে ছাড়ব।”
নিজের কথার দৃঢ়তায় যেন একটু আশ্বস্ত হলো সে। রিদির মাথায় আলতো করে ভালোবাসার এক চুমু খেল শাহাবীর।
ভাইয়ের সেই আদরমাখা কথা আর অকৃত্রিম মমতায় রিদির সমস্ত অভিমান যেন ধুয়ে মুছে গেল। সে বিড়ালের ছানার মতো আরও একটু গুটিসুটি মেরে ভাইয়ের বুকে লেপ্টে রইল, যেন বহু বছর পর নিজের হারানো আশ্রয়টুকু খুঁজে পেয়েছে।

রিদি শিকদার বাড়ি থেকে আসার প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে!
আজ খান বাড়িতে উৎসবের আমেজ। আরহানের যমজ মেয়েদের দ্বিতীয় জন্মদিন উপলক্ষে ছোটখাটো এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ির অন্দরমহল যেন এক টুকরো ব্যস্ততার স্বর্গ।
রিদি আর পৃথা দুইজন যেন পাক্কা গৃহিণীর মতো শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে ব্যস্ত হয়ে আছে মেহমানদের আপ্যায়নের আয়োজনে। তাদের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করছে রায়েদা শেখও। সাথীকে অবশ্য রান্নাঘরের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয়নি তারা। রিদি তার ওপর দায়িত্ব দিয়েছে ছোট দুই রাজকন্যার সাজগোজের।
রিদি যখন নিপুণ হাতে ফল কাটতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে সৌহার্দ্যের হাঁকডাক ভেসে এল। রিদিকে চিৎকার করে ডাকছে সে। এখন এটা সৌহার্দ্যের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাড়িতে যতক্ষণ থাকে, রিদিকে তার চোখের সামনে চাই-ই চাই। তার এই ডাকার ধরণটা বড় অদ্ভুত! যে কেউ শুনলে ভাববে, বউয়ের জন্য যেন ব্যাকুল হয়ে সে হাহাকার করছে। অথচ ঘরের ভেতরে নিয়ে গেলে হয় তাকে পড়তে বসাবে, নয়তো কোনো অহেতুক টপিক টেনে এনে ধমকাবে!
রিদি চটজলদি ফল কাটার ছুরিটা একপাশে নামিয়ে রেখে রুমের দিকে দৌড় দিল।
রিদি ঘরে ঢুকতেই সৌহার্দ্য ওর দিকে না তাকিয়েই বিরক্তি ঝরানো কণ্ঠে বলল,

“তোমাকে কাল যে ফাইলটা রাখতে দিয়েছিলাম, সেটা কো—”
কথা শেষ করতে পারল না। দৃষ্টি সামনে পড়তেই বাক্যটা গলায় আটকে গেল ওর।
পরনে খয়েরি রঙের শাড়ি, আঁচলটা কোমরে যত্ন করে গোঁজা। কপালে জমে থাকা বিন্দুবিন্দু ঘাম আর পরিপাটি সাজে রিদিকে আজ এক অনন্য গৃহিণী মনে হচ্ছে। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা সৌহার্দ্যের চোখ মুহূর্তেই রিদির অনাবৃত কোমরের ভাঁজে আটকে গেল।
নিমেষের মধ্যে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কণ্ঠস্বরে তখন আগ্নেয়গিরির উত্তাপ,
“স্টুপিড মহিলা! তোমাকে শাড়ি পরে বাইরে যেতে বারণ করিনি আমি? তার ওপর আবার এভাবে পেট দেখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ? সাহস তো কম বাড়েনি তোমার! আমার কথার অ—”
সৌহার্দ্যের রাগী কণ্ঠস্বর থামিয়ে দিয়ে রিদি দ্রুত এগিয়ে এল। আলতো করে নিজের মাথাটা সৌহার্দ্যের বুকের ওপর এলিয়ে দিয়ে শার্টের বোতামে আঙুল বোলাতে বোলাতে মিনমিনে গলায় বলল,
“এমন রেগে যাচ্ছেন কেন? আজ বাড়িতে অনুষ্ঠান, তাই আম্মু পড়তে বললেন…”
রিদির উষ্ণ ছোঁয়া আর অবাধ্য চাউনি মুহূর্তেই সৌহার্দ্যের ক্রোধের ধার কমিয়ে দিল। সে শাড়ির ভাঁজ ভেদ করে রিদির উন্মুক্ত কোমরে হাত রাখল। আলতো করে আঙুল চালাতে চালাতে তার গলার স্বর ভারী হয়ে এল,

“আমাকে কন্ট্রোল করা শিখে গেছেন, মিসেস চৌধুরী?”
বলেই আরেকটু ঘনিষ্ঠ হতে চাইল সৌহার্দ্য। তবে মুহূর্তটা পূর্ণতা পাওয়ার আগেই ঘরের ভেতর সূক্ষ্ম এক ‘মিউ মিউ’ শব্দ ভেসে এল।
সৌহার্দ্যের বিরক্তির শেষ রইল না। নাক-মুখ কুঁচকে উৎস খুঁজতেই দেখল, রিদির পায়ের কাছে শাড়িটা মুখ দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করছে একরত্তি এক বিড়ালছানা।
সৌহার্দ্য ধমক দেওয়ার আগেই রিদি ঝুঁকে পড়ল। পরম মমতায় ছানাটিকে কোলে তুলে নিল সে। ছানাটির পশমযুক্ত শরীরে গাল ঘষে চুমু দিতে দিতে আদুরে গলায় বলল,
“কী হয়েছে সোনা? খুব খিদে পেয়েছে? চলো, তোমাকে খেতে দিই!”
সৌহার্দ্যের চোখে তখন মিশ্র এক অনুভূতি, অবিশ্বাস আর কিছুটা অসহায়ত্ব। একবার সে তার এই ‘স্টুপিড’ বউয়ের মায়াবী মুখের দিকে তাকাচ্ছে, যে বিড়ালছানাকে নিজের বুকের কাছে আগলে রেখেছে। আর একবার ওই ছোট্ট প্রাণিটার দিকে।
অদ্ভুত বিষয় হলো, ছানাটি রিদির কোলে যতটা নিশ্চিন্ত, সৌহার্দ্যের দিকে তাকাতেই তার চোখেমুখে ফুটে উঠছে চরম বিরক্তি। যেন সে পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে, এই গম্ভীর মানুষটিকে তার একদমই পছন্দ হয়নি।
বিড়ালছানাটির এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ চাহনি দেখে সৌহার্দ্যের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। রাগে গজগজ করে সে এগিয়ে এসে বলল,

“সরাও ওটাকে! অ্যালার্জি হবে তোমার। এটা কোত্থেকে জুটিয়েছ? আর… ওকে চুমু খেলে কেন? স্টুপিড মহিলা!”
রিদি বিরক্তির চোটে নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠল,
“এমন করছেন কেন আপনি? কত ভদ্র একটা বাচ্চা! গতকাল কলেজ থেকে ফেরার পথে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে কাঁপছিল, তাই নিয়ে এলাম। দেখুন তো, কত শান্ত, একদম বিরক্ত করে না!”
বলে রিদি আবার যেই ছানাটিকে আদর করে চুমু খেতে গেল, সৌহার্দ্যের ধৈর্যের বাঁধটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। সে রাগে চিৎকার করে উঠল,
“স্টুপিড মহিলা! আর একবার ওটাকে চুমু দিয়েছ তো, দুজনকে একসাথে বারান্দা থেকে ছুড়ে ফেলব!”
সৌহার্দ্যের প্রচণ্ড হুঙ্কারে রিদি থমকে গেল। আর বিড়ালছানাটি ভয়ে রিদির শাড়ির ভাঁজে গুটিসুটি মেরে ঢুকে পড়ল।
রিদি অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

“এমন করেন কেন সবসময়? একদম ভালো লাগে না আপনার এই স্বভাব!”
বিড়বিড় করতে করতে সে ছানাটিকে আগলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রিদির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্য। রাগে তার সারা শরীর জ্বলছে। দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজের মনেই গজরাচ্ছে,
“স্টুপিড মহিলা! নিজের স্বামীকে এক ফোঁটা ভালোবাসা দিয়ে একটা চুমু খেতে পারলো না এখনো, সেই কি না একটা স্টুপিড বিড়ালকে বুকে ডুকিয়ে চুমু খাচ্ছে! বেয়াদব মহিলা একটা! স্বামীর মনের অবস্থা বোঝার কোনো ক্ষমতাই নেই, আবার চলে আসে ভালোবাসার দাবি নিয়ে!”
রাগে বিরক্তিতে চেয়াল শক্ত করে সৌহার্দ্য হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

রাত প্রায় এগারোটা। অন্দরমহল মুখরিত ছোটদের হাসিতে, কেক কাটার প্রস্তুতি চলছে। রিদি বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। ফোনের স্ক্রিনে সৌহার্দ্যের নাম দেখে কয়েকবার কলও দিয়েছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কেবল আশ্বাস মিলেছে, “একটু পর আসছি।” অথচ মানুষটার আসার নামগন্ধ নেই।
রিদির মনে তখন অস্থিরতা। চাচী হিসেবে বাচ্চাগুলোর হাতে কিছু উপহার তো তুলে দিতে হবে। রিভা সাথে যেতে চেয়েছিল কিছু আনার উদ্দেশ্যে, কিন্তু সৌহার্দ্যই বারণ করে বলেছিল ওসব নিয়ে রিদির ভাবতে হবে না, সময়মতো পেয়ে যাবে। এখন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পথে, অথচ সৌহার্দ্যের দেখা নেই! বাচ্চা দুটোকে খালি হাতে কেক খাওয়াতে হবে ভেবে রিদির ভীষণ রাগ আর অস্বস্তি হচ্ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ঢুকল সৌহার্দ্য। কালো শার্টের উপরের বোতামগুলো খোলা, চুলগুলো অবিন্যস্ত। রিদি দ্রুত পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চারদিকে একবার আড়চোখে চেয়ে দেখল কেউ দেখছে কি না। তারপর ইশারায় মাথা নিচু করতে বলল। সৌহার্দ্য কোনো প্রতিউত্তর করল না, বরং বাধ্য ছেলের মতো মাথাটা নিচু করে দিল। রিদি নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে আলতো করে সৌহার্দ্যের কপাল থেকে ঘাম মুছে দিয়ে নরম স্বরে বলল, “এত দেরি করলেন যে?”

সৌহার্দ্য হঠাৎ হাত বাড়িয়ে রিদির কোমরে টান দিয়ে রিদিকে একদম নিজের কাছে টেনে নিল। তারপর রিদির গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল, “রাস্তায় জ্যাম ছিল, সুইটহার্ট।”
রিদি লজ্জা আর অস্বস্তিতে ওকে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত ফিসফিস করে বলল, “কি করছেন? ছাড়ুন, সবাই এখানে!”
সৌহার্দ্য বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে নিয়ে ওকে ছেড়ে দিল। নিজের পকেট থেকে গিফটের দুটি জুয়েলারি বক্স রিদির হাতে ধরিয়ে দিয়ে গম্ভীর ও গমগমে স্বরে বলল, “দ্রুত শেষ করে রুমে এসো।”
বলেই কোনো দিকে আর না তাকিয়েই সে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। রিদি জানে, এমন ভিড়ের মধ্যে সৌহার্দ্য থাকবে না। তাই সে আর কোনো প্রশ্ন করল না।

রাত তখন প্রায় বারোটা। চৌধুরী বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ফারিস আর রিভা। ফারিস সেই কখন থেকে মেয়েটাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছে, কিন্তু রিভার একটাই জেদ, সে খন্দকার বাড়িতে যাবে না। সেখানে সে একা একা হাঁপিয়ে ওঠে, আর ফাহানের বউ তাকে ছোট বাচ্চা ভেবে পাত্তাই দেয় না।
ফারিস নিজের বউয়ের এই ‘নেকামি’ দেখে ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হলেও বাইরে ধৈর্য ধরে বলল, “এমন করিস না তো। শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে! তোকে ছাড়া আমার ঘুমই হবে না, প্লিজ চল না?”
রিভা উল্টো ঝাঁঝালো কণ্ঠে উত্তর দিল, “আমি আপনার সাথে মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমানোর জন্য ওই বাড়ি যেতে পারব না! সারাদিন বাইরে থাকেন, রাতের অর্ধেক পার করে ঘরে ফেরেন শুধু ঘুমানোর জন্য। একদম নির্লজ্জ এমপি!”
নিজের বউয়ের এমন বিস্ফোরক অভিযোগে ফারিস যেন থতমত খেয়ে গেল। সে কি এখন সব কাজকর্ম ফেলে বউয়ের সাথে সারাদিন ঘুমিয়ে থাকবে নাকি? আশ্চর্য! তবুও বউকে মানানোর জন্য একটু আদুরে গলায় বলল, “ঠিক আছে সোনা-ময়না পাখি, তিন ঘণ্টার জায়গায় দশ মিনিট বাড়াবো, তবুও চল! শশুরের বেয়াদব মেয়ে!”

কথাটা বলেই ফারিস যেই রিভাকে কোলে তুলে নিতে গেল, অমনি ছাদের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সৌহার্দ্য। ফারিস সাথে সাথে থমকে গিয়ে রিভাকে ছেড়ে দিল। নিজের ভাইকে দেখে রিভা লজ্জায় লাল হয়ে দ্রুত ছাদ থেকে চলে গেল।
রিভা চলে যেতেই ফারিস বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে মুখ কুঁচকে বলল, “নিজের সমস্যার জন্য বউয়ের কাছে যেতে পারিস না বলে আমাকেও কি আমার বউয়ের কাছে থাকতে দিবি না? তুই কি চাস আমার সংসারটাও তোর মতো পানসে হয়ে যাক?”
সৌহার্দ্যের মেজাজ তখন তুঙ্গে। ভ্রু কুঁচকে, রাগী কণ্ঠে সে ধমকে উঠল, “বাজে কথা রাখ! চল, একটা জায়গায় যেতে হবে।”
ফারিস ভাবল, নিশ্চয়ই খুব জরুরি কিছু হয়েছে। তাই আর কোনো কথা বাড়াল না। গুমোট ভাব নিয়ে সৌহার্দ্যের পিছু পিছু পা বাড়াল।

প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে গাড়ি চলছে নির্জন পিচঢালা রাস্তা দিয়ে। সৌহার্দ্যের দৃষ্টি স্টিয়ারিংয়ে নিবদ্ধ, চোয়াল শক্ত। ফারিস পাশে বসে বিরক্তিতে ছটফট করছে। এতক্ষণ ধরে সে জানতে চাচ্ছে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কিন্তু সৌহার্দ্যের মুখে রা নেই।
একঘেয়ে নিস্তব্ধতা ভেঙে শেষমেশ ফারিস চেঁচিয়ে উঠল, “অদ্ভুত প্রোডা.. না মানে সৌহার্দ্য, বলবি তো ভাই আমরা কোথায় যাচ্ছি? এত রাতে না ঘুমিয়ে কার সাধনা করতে বের হলাম? বললে একটু ফুরফুরে মেজাজে যেতে পারতাম আর কি!”
সৌহার্দ্য এতক্ষণে মুখ খুলল। তবে তার কণ্ঠস্বর হিমাঙ্কের নিচে। শীতল কণ্ঠে বলল, “তোর পাশের কার্টনটা ফেলতে যাচ্ছি।”
ফারিস অবাক! এই সামান্য একটা কার্টন ফেলার জন্য এত পথ পাড়ি দেওয়ার মানে কী? এমনে এমনে ফারিস এটাকে ‘ভেজাল প্রোডাক্ট’ বলে না। সে কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলল, “আরে ভাই, এটা ফেলার জন্য এত দূরে আসতে হলো কেন? আমাকে বললে তো আমি বাড়ির পেছনের ডাস্টবিনে ফেলে আস…”

কথা শেষ করতে গিয়েও সে থেমে গেল। ফারিসের মনে খটকা লাগল, এই কার্টনের ভেতরে এমন কী আছে যে সৌহার্দ্য এতটা মরিয়া? পরক্ষণেই আঁতকে উঠল সে, এই ছেলে কি কাউকে খুন-টুন করে কার্টনে ভরে নিয়ে এল নাকি? একে বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, এত ছোট কার্টনে মানুষ থাকা অসম্ভব।
ফারিস ধীরে ধীরে কার্টনের ঢাকনাটা খুলল। ভেতরে তাকাতেই তার বিস্ময়ের সীমা রইল না, একটা ছোট্ট বিড়ালছানা! কী নিষ্পাপ ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে প্রাণীটা। ফারিস অবাক হয়ে ভাবল, এই অবলা প্রাণীর সাথে সৌহার্দ্যের সমস্যাটা কী?
সে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, “এই অবলাটার সাথে তোর সমস্যা কী ভাই? কেন এটাকে এত দূরে ফেলতে হচ্ছে? এটার বাবা কি তোর বউ মানে আমার ভাবিজান—”
ফারিসের কথা শেষ হলো না। সৌহার্দ্য স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত শক্ত করে গর্জে উঠল, “তোর মুখ দিয়ে আমার বউয়ের নাম একবারও উচ্চারণ করবি না! আর একটা বাজে শব্দ বের হলে তোকে আর এই স্টুপিড বিড়ালটাকে একসাথেই ব্রিজের ওপর থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে দেব, ইডিয়েট!”
হঠাৎ জঙ্গলের নির্জন এক পাশে গাড়ি থামিয়ে সৌহার্দ্য নির্দেশ দিল, “যা, এটাকে ফেলে দিয়ে আয়।”
ফারিস দরজা খুলতে গিয়েও থমকে গেল। পেছন ফিরে বাঁকা হেসে বলল, “আগে বল, এই বাচ্চা আসামির অপরাধটা কী?”

সৌহার্দ্য বিরক্তি চেপে রেখে গম্ভীর গলায় বলল, “এটা ছেলে বিড়াল। কথা কম বলে এটাকে ফেলে দিয়ে আয়!”
ফারিস যা বোঝার বুঝে ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে দুষ্টু হাসি। সে কার্টনটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। বিড়ালছানাটাকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে সে যখন ফিরে এল, সৌহার্দ্য আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি ছোটাল সে। হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছাতেই সে ফারিসকে গাড়ির চাবিটা দিয়ে হাসপাতালের দিকে পা বাড়াল।

সকাল প্রায় দশটা। রিদি আর পৃথা বাড়ির বাকিদের নাস্তা খাইয়ে আমেনা খালাকে নিয়ে টুকিটাকি সব কাজ গোছগাছে ব্যস্ত। আজ শুক্রবার, কলেজের কোনো চাপ নেই, তাই অনেকটা সময় হাতে।
নাস্তার পর্ব শেষ হতেই রিদির মনে পড়ল মিকির কথা। শখ করে দারোয়ানকে দিয়ে ক্যাটফুড আনিয়েছে, বাচ্চাটাকে খাওয়াবে বলে। কিন্তু সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বাচ্চাটার টিকি পাওয়া গেল না। মুহূর্তেই রিদির মনটা ভার হয়ে গেল। কোথায় গেল তার ছোট্ট ছানাটা? একদিনে কেমন মায় পড়ে গেছে!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিদি এক কাপ কফি বানিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। সৌহার্দ্য হাসপাতাল থেকে ফিরেছে ভোর পাঁচটার দিকে, নিশ্চয়ই এখনো ঘুমে। ঘরের দরজাটা আলতো করে ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই রিদির দৃষ্টি আটকে গেল বিছানার দিকে।
সৌহার্দ্য উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। শরীরের অর্ধেকটা কাঁথা দিয়ে ঢাকা। ফর্সা পিঠে স্পষ্ট হয়ে আছে রিদির নখের গভীর দাগ। সকালে হাসপাতাল থেকে ফিরে বউকে কাছে টেনে চেপে ধরে একটা চুমু খেয়েছিল সৌহার্দ্য। আর সেই আদরের ফলাফলই এখন তার পিঠে জ্বলজ্বল করছে!

সৌহার্দ্যের মাঝে মাঝে রিদির প্রতি দারুণ বিরক্তি লাগে। একটা সাধারণ চুমু দিতে গেলেই এই মেয়ে তার এমন অবস্থা করে দেয়! যদি সৌহার্দ্য পূর্ণমাত্রায় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে যেত, তবে রিদি যে তার কী হাল করত, ভাবতেই সৌহার্দ্যের বিরক্তি যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। অনেকবার ভেবেছে রিদির নখগুলো কেটে দেবে, কিন্তু বউয়ের মন খারাপ হবে ভেবে এই জ্বালাটা সে নীরবে সহ্যই করে নেয়। যদিও রিদির নখ খুব একটা বড় নয়, কারণ নামাজ পড়ার কারণে সে নখ ছোটই রাখে, তবুও সুমি আর পৃথার থেকে দেখে শখ করে সে-ও ইদানিং নখগুলো হালকা একটু বাড়িয়ে রেখেছে। আর তাতেই কেল্লাফতে!
রিদি হাতের কফিটা সেন্টার টেবিলে রেখে সৌহার্দ্যের পাশে এসে বসল। সৌহার্দ্য ঘুমের মধ্যেই রিদির উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ না খুলেই তাকে টেনে নিজের বলিষ্ঠ শরীরের নিচে চাপা দিয়ে মুখ গুজে দিল রিদির গলার ভাঁজে। পরক্ষণেই চোখ তুলে তাকাল রিদির বিষণ্ণ মুখশ্রীর দিকে, যা দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। হাতের আঙুল দিয়ে রিদির মুখের ওপর পড়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে আলতো করে জিজ্ঞেস করল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড, হার্ট? মুড অফ কেন আমার বুচিটার?”

রিদি একরাশ হতাশা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মিকিকে খুঁজে পাচ্ছি না, ডাক্তার সাহেব। পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম, কোথাও নেই!”
সৌহার্দ্যের কপালে ভাঁজ আরও গভীর হলো। ‘মিকি’ নামের কেউ এ বাড়িতে থাকে বলে তার জানা নেই। সে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে ওটা?”
রিদি বিরক্তি ঝরিয়ে বলল, “কে আবার? আমাদের বাচ্চা!”
কথাটা শুনেই সৌহার্দ্য এক ঝটকায় রিদিকে সরিয়ে দিয়ে উঠে বসল। তার চোখের সামনে যেন বিস্ময়ের পাহাড়! তাদের একটা সন্তান আছে অথচ সে কিছুই জানে না? তাও আবার কোনো ‘প্রসেস’ ছাড়াই? সৌহার্দ্যের বিরক্তি তখন চরম পর্যায়ে। সে তেতে উঠে বলল, “স্টুপিড মহিলা! বাচ্চা আসার মতো কোনো কাজ আমি করেছি বলে তো আমার মনে পড়ে না? আমাকে ছাড়া একা একা ওটা ডাউনলোড করলে কীভাবে?”

রিদি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তেতে উঠল, “অসভ্য ডাক্তার! একদম বাজে বকবেন না তো! আমি মিকি মানে ওই বিড়ালছানার কথা বলছি!!”
সৌহার্দ্যের রাগের পারদ তখন আগ্নেয়গির মতো ফুটছে। সে গর্জে উঠে বলল, “স্টুপিড! তোমার কি মনে হয় আমার ডিএনএ-তে কোনো ভেজাল আছে যে আমি বিড়ালের বাচ্চা জন্ম দেবো?”
সৌহার্দ্যের প্রতিটি কথায় রিদির মেজাজ বিগড়ে গেল। এই লোক সামান্য একটা বিষয়কে কতটা ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে জটিল করে তোলে! সে নাক-মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলল, “পেঁচামুখো লোক! আমি কি সেটা বলেছি নাকি? একটা সাধারণ কথাকে এভাবে পেঁচাতে আপনার ভালো লাগে?”
বলেই সে দুপ-দাপ পা ফেলে রাগে গজগজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য রিদির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে লাগল। “বেয়াদব মহিলা! ওই স্টুপিড বিড়ালটার জন্য সকাল সকাল পুরো মেজাজটাই মাটি করে দিল!” বিড়বিড় করতে সে তীব্র বিরক্তি নিয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল।

দুপুর প্রায় দুটো। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে সৌহার্দ্যের প্রবেশ। রিদি মাথা তুলে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। শুভ্র ধবধবে পাঞ্জাবিতে সৌহার্দ্যকে যেন আজ অন্য জগতের মানুষ লাগছে! কনুই পর্যন্ত গোটানো হাত, আর সেই ফর্সা হাতের লোমগুলো রোদের আলোয় চিকচিক করছে। কানে ফোন চেপে কারো সাথে কথা বলতে বলতে সে যখন হেঁটে আসছিল, পুরো ঘরটা যেন তার ব্যক্তিত্বের ঔজ্জ্বল্যে ভরে গেল।
সৌহার্দ্যের অভ্যাস নেই পাঞ্জাবি পরার। এমনকি আজ যখন রিদি বায়না ধরেছিল, সে স্পষ্টতই বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “ওসব আমার দ্বারা সম্ভব না!” অভিমানে রিদি তখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, কে জানত তার না বলা কথাগুলোই সৌহার্দ্যের জেদ ভাঙবে? সে ঠিকই পাঞ্জাবিটা গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪১

হঠাৎ রিদির ভাবনার মাঝেই দুজনের চোখের পলক এক বিন্দুতে মিলল। মুহূর্তেই সৌহার্দ্যের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তার দৃষ্টিতে কোনো কোমলতা নেই, আছে জ্বলন্ত ক্ষোভ! সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিদির দিকে তাকিয়ে। রিদির বুকের মাঝে পরম মমতায় লেপ্টে আছে সেই ‘স্টুপিড’ বিড়ালটা, যাকে সে রাতে বাড়ি থেকে বিদায় করেছিল! আর রিদির এক পাশেই বসে ফারিস আড়চোখে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে, যেন এই পরিস্থিতির মজাটা সে পুরোপুরি উপভোগ করছে।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here