Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৬

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৬

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৬
Maha Aarat

আগামী শুক্রবার নিকাহ’র অনুষ্ঠান।গতকাল আরহামের পক্ষ থেকে গার্ডিয়ানরা গিয়ে অনুষ্ঠানের ডেট ফাইনাল করে এসছেন।আরহামের যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি যাননি।বিকেলের দিকে মাহের উনাকে ফোনে বলেছিলেন, ‘জামাই সাহেব,আসলেন না?’
‘রাখলাম।’
‘আরে ওয়েট।শোনো আগে জামাই ছাড়া বিয়ের ডেইট পড়লো।আমার কাছে বিষয়টা ভালো লাগেনি।’
‘আমার সাথে কোন অন্যায়ের রিভেঞ্জ নিচ্ছো?’

‘এখানে রিভেঞ্জ নেওয়ার কি?’
‘বুঝতে পারছো আমি সাই ফিল করি।তাও ডাকো এটা রিভেঞ্জ নয়?’
‘জামাই কে জামাই বলবো না?’
‘মাহের! বেশী হয়ে যাচ্ছে।’
মাহের হালকা হাসলেন।জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা আপনার কোন কালার পছন্দ?’
‘কেনো?’
‘আপনার বিয়ের শপিং করবো।’
‘এমন দূ:সাহস করো না।রেগুলার যেভাবে থাকি,ওভাবেই থাকবো।’
‘সাদা জুব্বা?বিয়েতেও সাদা জুব্বা?’
‘তো লাল পড়তে হয় নাকি?মাহের আ’ম সিরিয়াস।এমন কিছু করবে না যাতে আমি রাগ করবো।জেনেশুনে চুল পরিমানও শরীয়াহ’র বাইরের কিছু না হোক।’
‘আরে আমি কি তোমাকে যৌতুক দিচ্ছি?যাস্ট কিছু গিফট করতে চাচ্ছি।’
‘এমন গিফটের প্রয়োজন নেই।আই রিপিট,এমন কিছু চিন্তাও করো না।গিফট দিতেই হলে,শুধু দোয়া করে দিও।’
মাহেরকে চুপচাপ দেখে আরহাম শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দিয়ে ফোন রাখলেন।

আজ রাতের আকাশে মস্তো বড় চাঁদ উঠেছে।সাথে জোৎস্নার আলো টুই টুই করে চুইয়ে পড়ছে গাছের পাতা,টিনের ওপর, ফুলের মাঝে। হাত বাড়িয়ে কোনো অদৃশ্য শক্তির বিনিময়ে সেই আলো নিজ গায়ে মেখে নিতে ইচ্ছে করে।সবুজ ঘাসের ডগায় চাঁদের চকচকে রুপালি আলো। সেই আলোর সমুদ্রে উড়োউড়ি করছে জোনাকির দল।হাফসার গভীর দৃষ্টি সেদিকে।ফিনফিনে বাতাস এসে গা ছুঁয়ে দিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।তাঁর মন খারাপের গল্প শুনতে আসছে,জোনাকপোকা,রুপোলী আলো আর হিমবাতাস।
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়েছে কেবল কয়েক মিনিটে।কিন্তু সে হতাশ নয়।কারন সিদ্ধান্ত তো আল্লাহর পক্ষ থেকেই।

তবুও তাঁর নিজেকে অপরাধী লাগে।সেদিন পুরো সময়টুকু ওই আপুটা তাকে গভীর দৃষ্টিতে পরখ করছিলেন।বারবার তাঁর গাল ছুঁয়ে যাওয়া অশ্রুর স্রোত মুছে দিয়েছেন।এটা কি করুণা?না অন্যকিছু?
হাফসা ভাবতে পারছে না।তবে এতটুক জানা আছে যে আপুর অনুমতি দেওয়াতে শুধুই হাফসার কথা ভাবা হয়নি,জড়িত ছিলো উনার অসুস্থতা বা দূর্বলতা।সেদিন ভুল করে মাইমুনার আরহামকে বলা কথাগুলো কানে এসেছিলো তাঁর।লোকটাও যে অপারগ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এটাও তাঁর অজানা নয়।
আর মাএ দুটো দিন।তৃতীয় দিনে তাকে থাকতে হবে একদম অপরিচিত একটা পরিবেশে।তাঁর ভয় করছে খুব।ভয় করছে নতুন পরিবেশ নিয়ে।আর কষ্ট হচ্ছে আপন পরিবেশ ছেড়ে যাওয়ার।ভাইয়াকে বলতে শুনেছে সে,হাফসার বিয়ে হয়ে গেলে তিনি এখানে থাকবেন না।উনার এখানে কোনো পিছুটান নেই।ইটপাথরের শহরে আপন হয়ে যাওয়া পুরনো নিজেকে তাঁরা হারিয়ে ফেলবে না তো?

আজকে নিকাহ’এর আগের দিন।হাফসার ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলো বেশ।ইদানীং রাতগুলো তাঁর ভীষণ যন্ত্রনায় পার হচ্ছে।মা-বাবার টুকরো টুকরো স্মৃতি বা হারিয়ে যাওয়া আপনজনের একাকীত্ব তাকে জেঁকে বসেছে একদম।একদম একাই তাকে নতুন একটা জীবনে পা দিতে হবে।আপন বলতে শুধু ভাইয়া।আর?
নাহ আর কারোর প্রয়োজনও নেই।হাফসা নিজের রুম গোছাচ্ছে এমন সময় শাপলাখালা এসে চুপিচুপি বলে গেলেন, ‘তোমার শ্বাশুড়ি আসছে।কাপড় পাল্টে গায়ে একখান শাড়ি জড়াই নেও।’
সেটার সুযোগ পাওয়া গেলো না।হাফসার অনুমতি নিয়েই ভদ্রমহিলা ঘরে এসে বললেন, ‘কেমন আছো হাফসা?’

হাফসা নতমুখে মাথা নাড়ায়।হাফসাকে নিয়ে আম্মু যখন ড্রয়িং রুমে গেলেন আরহাম এই প্রথম ওর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালেন।পরক্ষণেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন মাহের আর তিনি।
আম্মু তাকে সব উপহার আর বিয়ের অর্নামেন্টস বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সকালবেলা আইরা আসবে।তোমাকে রেডি করবে।’
হাফসার মলিন মুখের সাথে টলমলে চোখ দৃষ্টি এড়ায় না আম্মুর।তিনি সস্নেহে ওর মাথায় চুমু খেয়ে বললেন, ‘মন খারাপ করছো কেন?তুমি একটা পরিবার পেতে যাচ্ছো।তোমার আরেকটা বোন থাকবে,আইরা থাকবে,আমি থাকবো।তুমাকে কখনো একা ফিল করার সুযোগই দেবো না আমরা।তোমার ভাই তো শহরে থাকবে।সেও আসবে।আপত্তি কীসের।আমরা সবাই তোমার সাথেই থাকবো।’

হাফসা ঠোঁট কামড়ে অশ্রু দমানোর চেষ্টা করেও পারলো না।আম্মু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আমি জানি তুমি কেন ভয় পাচ্ছো?আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি মাইমুনার বা আরহামের পক্ষ থেকে জেনেশুনে তুমি কষ্ট পাবে না।মাইমুনা অনেক ভালো মেয়ে।নয়তো এমন সিদ্ধান্ত সে নিতো না।আর আরহাম?সে একজন আদর্শ স্বামী।সে তোমাদের দূজনকে পৃথক করে দেখবে না আশা রাখি।’
হাফসা আম্মুর বুকে থেকেই দূহাতে মুখ চেপে ধরলো।তাঁর এত কষ্ট কেন হচ্ছে সে জানে না।এত কান্না আসছে কেন?
তাঁরা আধঘন্টা থেকেই ফিরে গেলেন।যাওয়ার আগে আরহাম দেখা করেছিলেন।যাস্ট স্বল্প সময়ের জন্য।শুধু জিজ্ঞেস করেছেন, ‘আপনার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে?না বদলেছে?’
হাফসার স্বীয় নীরবতায়’ই তিনি উত্তর নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন।আবার আসবেন সম্পর্কের নতুন সুতো জুড়’তে।

অনেকদিন পর কাজিনমহল এক হয়েছে।সেই উদ্দেশ্যেই আড্ডা দিয়ে কিছু কেনাকাটা করতেই শপিং মলে ঢুকছিলো এশা।তাঁর সাথে তাঁর বোনেরা।দ্বিতীয় ফ্লোরে উঠে ম্যান’স কালেকশন পেরিয়ে যেতেই আচমকা তাঁর চোখ পড়ে কর্ণারের লং মিররে।তড়িৎ ঘাড় ঘুরিয়ে ওপাশে থাকা মানুষটাকে দেখতেই ভেতরটা ধ্বক করে উঠলো তাঁর।এত কাছে থেকেও প্রিয় মানুষের সাথে কথা বলার তেষ্টা সে সামলাতে পারলো না।মিথ্যে অজুহাত দিয়ে বোনদের অন্যদিকে পাঠিয়ে এগিয়ে এলো সে।পাশে এসেই মাহেরকে শেরওয়ানি চোজ করতে দেখে চমকে বলে উঠে,
‘আপনার বিয়ে?’
পরিচিত স্বর শুনে কৌতূহলবশত মাহের পেছন ফিরতেই দেখলেন এশাকে।তাকে রীতিমতো ইগনোর করে নিরুত্তর থেকে যেতেই আবার প্রশ্ন আসে, ‘বাবাকে বলেছেন আপনি বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয় আর এখন দেখি সত্যি সত্যি বিয় করতে চলেছেন।’

‘আমার জন্য নয়।’
এশা যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো।তাঁর বুকের ওপর থেকে ভারী পাথর সরে যেতেই মাহেরের পিছুপিছু সেও হাঁটতে থাকলো।জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলো, হাফসার বরের জন্যই এসব কেনাকাটা।
পাএ আরহাম নাম শুনতেই তাঁর ভ্রু কুঁচকে এলো।জিজ্ঞেস করলো, ‘উনি তো বিবাহিত।’
‘জানি?’
‘তাও?মানে?হাফসা দ্বিতীয় বউ হবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘অবশেষে মাসনা করাচ্ছেন আপনার বোনকে।অথচ ভাই কিন্তু হাইলি এস্টাবলিসড ছিলো।’
‘আমার বোনকে নিয়ে আমাকে ভাবতে দিন।’
‘তাহলে এখন আপনি বিয়ে করবেন?’
‘করবো।”
‘পাএী দেখেছেন?’
‘হু।’
এশার উৎসাহে ভাটা পড়লো।কোথায় সে এই লোকটার জন্য দিনেরাতে কেঁদে ভাসায়।আর লোকটা এতো স্বার্থপর?
‘শুনুন।’
‘হু?’
‘আপনি আমাকে বিয়ে করলে কি ক্ষতি হবে?’
‘আমার উডবির সাথে কমিটমেন্ট ব্রেইক হবে।’
উত্তর দিয়ে মাহের তাকে এড়িয়ে গেলেন।ততক্ষণে এশার বোনরাও তাকে খুঁজতে খুঁজতে চলে আসলো।সবার অগোচরে ভেজা চোখজোড়া মুছে সে ব্যস্ত হলেও তাঁর দৃষ্টি দূরে আটকে থাকলো যেখানে মাহেরের উপস্থিতি।

ভোরের আকাশে আলোর তেজী কিরনে সূর্যটা যেন টকটকে লাল রং ধারণ করেছে। মেঘহীন আকাশ, ফুরফুরে বাতাস এবং ফিনফিনে অনুভূতি নিয়ে হাফসা মোনাজাত শেষ করলো।ঘড়িতে সাতটা বাজে।অথচ মনে হচ্ছে, বেলা এখন মধ্যখানে।
মাহের চা নিয়ে ঘরে আসতেই সে কান্নাগুলো গিলে নিলো
মাহের ট্রে তাঁর পাশে রেখেই স্বাভাবিকের মতো চা’য়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, “দারুণ হয়েছে।”
চা উনার নিজ হাতেই বানানো।হাফসা চাইছে স্বাভাবিক থাকতে, কিন্তু বুকফেটে তাঁর কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে।নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে চায়ের কাপে হালকা চুমুক দিয়েই চোখমুখ কুঁচকালো সে।কড়া লিকার,অথচ মিষ্টি নেই একদম।মাহের ওর চোখমুখের নাজুক অবস্থা দেখে বললেন, ‘মিষ্টি অল্প কম হয়েছে?খেয়ে নাও।বেশী খেলে সুগার বেড়ে যায়।’

মিষ্টি তো হয়নি।তাও হাফসা গিলতে চেষ্টা করলো।কিন্তু গলার কান্নাগুলো ঠেলে সে গিলতে পারলো না।খানিক পর ভেজা চোখতুলে ভাইয়ের দিকে তাকাতে দেখলো মাহের ব্যথিত চোখে তাকিয়ে আছেন।মাহেরের এই একটা দৃষ্টিই যথেষ্ট ছিলো হাফসাকে দূর্বল করার।ভাইয়ের বুকে পড়ে অঝোরে কাঁদলো সে।মাহেরও তাকে দূহাতে আগলে নিলেন, যেমনটা নিতেন মা-বাবা বেঁচে থাকলে।হাফসার মন ভালো করার সব চেষ্টা তিনি করলেন।তাকে ধীরসুরে বুঝিয়ে বললেন, ‘এতো কেঁদো না।আমি তো দূরে চলে যাচ্ছি না।যখন তখন তোমাকে দেখতে যাবো।সেখানে তোমার সবাই থাকবে।একা লাগবে না।শান্ত জায়গা দেখে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে নিবো।তোমার যখন ইচ্ছা চলে আসবে,তখন না হয় আমি তোমাকে রান্না করে খাওয়াবো।আই হোপ,খারাপ হবে না।’
হাফসা হাসলো।ছলছল চোখে বোনের হাসিটা বুকে বিঁধলো মাহেরের।আজকে উনার ছোট্ট পুতুলের বিদায়।ভাইয়ের বুকে যে কবে থেকেই ঝড়ের তান্ডব বইছে,সেটা তো কাউকে বুঝতে দিচ্ছেন না।দিব্যি স্বাভাবিক থাকছেন, কেউ বুঝতেই পারছে না ভেতরটা যে দাউদাউ করে পুড়ছে।কান্নাগুলো পেটের ভেতর প্যাকেট করে জমিয়ে রেখেছেন তিনি।হাফসাকে কে বিদায় দিয়ে উনি একা কোথাও গিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদে নিবেন।কারন বোনকে বিদায় দিয়ে উনার চোখের পানি মুছে দেওয়ার মতো আরো কেউ থাকবে না।

ঘড়ির কাটা দশটায় পড়তেই বাইরে গাড়ির আওয়াজ শুনে এলো।আইরা গাড়ি থেকে নেমে একপ্রকার দৌড়ে আসলো।মাহের আতঙ্কে ছিলেন,এই না পড়ে যায় মেয়েটা।আরহাম আবার গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগেই মাহের হাতের ব্যাগগুলো উনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হাফসা তোমাকে গিফট দিয়েছে।’
‘মানে?’
‘উপহার গ্রহন করতে হয়।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৫

আরহামের ভীষণ রাগ হলো।ইচ্ছে করলো তাকে কিছু কথা শোনাতে।কিন্তু মাহেরের চোখেমুখে যেনো তাঁর ভেতরের চেপে রাখা যন্ত্রণা গুলো ফুটে উঠেছে।আরহামের দৃষ্টি নরম হয়ে এলো।চুপচাপ বিনাবাক্যে ব্যাগগুলো হাতে নিলে মাহের দ্রুত ভেতরে চলে যায়।আরহাম কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে।আইরাকে বিদায় দিতেও কি তিনি এভাবে আড়ালে আবডালে কাঁদবেন?

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৭