অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৬
নুরিয়া ইসলাম
লাইব্রেরির নীরব পরিবেশে ইনায়া এক কোণে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছিল। চারপাশে বইয়ের হালকা গন্ধ, নরম আলোয় ভাসছে পুরো ঘর। সবকিছুতেই ছড়িয়ে আছে এক অপার্থিব শান্তি। এরিক বই ফেরত দিতে এসে ইনায়াকে খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ চেয়ারে বসে। সামনে কিছু বই খুলে রাখলেও, তার মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও, চোখ ঘুরে বেড়ায় লাইব্রেরির আনাচে-কানাচে, যেন অজানা কারও অপেক্ষায়।
হঠাৎ কর্নারের দিকে চোখ পড়তেই দেখে, ইনায়া ফ্লোরে ম্যাট পেতে গভীর মনোযোগে কিছু করছে। বিস্ময়ে এরিকের চোখ স্থির হয়ে যায়।টেবিলে মাথা রেখে সে ইনায়ার প্রতিটি নড়াচড়া দেখে। ইনায়ার মনোযোগ, তার বিশ্বাস, ছোট ছোট আচরণ সবকিছু এরিকের মনে প্রশ্নের ঢেউ তোলে।
নামাজ শেষ হলে ইনায়ার চোখ পড়ে এরিকের দিকে। সে ধীর পায়ে নিজের ডেস্কের দিকে এগিয়ে যায়। তার চলাফেরায় ফুটে উঠে এক ধরনের স্নিগ্ধ আত্মবিশ্বাস। ইনায়াকে এগিয়ে আসতে দেখে,এরিক কৌতুহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“তুমি কিছুক্ষণ আগে.. বসে দাঁড়িয়ে এইগুলো কী করছিলে?”
ইনায়া শান্ত গলায় জবাব দেয়,
“আমি নামাজ পড়ছিলাম।”
এরিক অবাক হয়ে বলে,
“নামাজটা আবার কী?”
ইনায়া মৃদু হাসে,
“এটা এক ধরনের প্রার্থনা, আমরা দিনে পাঁচবার আমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে করি।”
এরিক অবাক হয়ে বলে,
“দিনে পাঁচবার! বিরক্ত হয়ে যাও না? আমাদের তো সপ্তাহে একদিন চার্চে যেতে হয়, তাতেই বিরক্ত লাগে। এখনকার যুগে এসব কেউ মানে নাকি?”
ইনায়া দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“সবাই না মানলেও আমরা মুসলিমেরা মানি। আমার ভালো লাগে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে।এতে আমি শান্তি পাই। আপনার সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস নাই থাকতে পারে , কিন্তু আমার আছে।”
কথাগুলো বলে ইনায়া পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে এরিক বলে ওঠে,
“সো ওল্ড ফ্যাশন।”
এরিকের কথা ইনায়ার কানে পৌঁছাতেই ইনায়া থেমে পিছন ফিরে বলে,
“নিজের ধর্মের কালচার মেনে চললে কেউ ওল্ড ফ্যাশন হয়ে যায় না, মিস্টার এরিক অ্যাসফোর্ড।”
এই কথা বলে ইনায়া দৃপ্ত পায়ে বেরিয়ে যায়। এরিক তাকিয়ে থাকে তার চলে যাওয়া পথের দিকে, আর মনে মনে ভাবে,
“এটা কেমন মেয়ে? আর কেমন কালচার, যার মাঝে আধুনিকতার ছিটেফোঁটাও নেই।”
টিফিন পিরিয়ডে ইনায়া ক্যানটিনে একা বসে নিজের লাঞ্চ করছিলো। হঠাৎ এরিক তার সামনে চেয়ার টেনে বসে, ঠোঁটে তার চিরোচেনা বাঁকা হাসি,
“Hi babygirl… Eating all alone? That’s a crime, you know. You should be punished.”
ইনায়া এক সেকেন্ডের জন্য চোখ তোলে, তারপর আবার চুপচাপ খাবার খেতে থাকে, কোনো রিঅ্যাকশন না দিয়ে।
এরিকের ইনায়ার এই ইগনোরেন্সে একটু রাগ হয়, কিন্তু নিজের রাগটাকে কন্ট্রোল করে, আরও কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, ইনায়া তার প্রেমের ফাঁদে পড়বেই। আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে তাকে রিজেক্ট করেনি, বরং সবাই কাছে আসার সুযোগ খুঁজেছে।
তাই সে ইনায়ার সাথে বাকি পাঁচটা মেয়ের মতোই ফ্লার্ট করতে শুরু করে,
“Don’t worry, baby. তোমাকে একা খেতে হবে না, স্পেশালি যখন আমি এখানে আছি।”
ইনায়া: “সমস্যাটা কী আপনার? সেই সকাল থেকে দেখছি, আমার পিছনে ঘুরছেন!”
এরিক মেকি হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলে,
“সমস্যা তো অনেক, বেবিগার্ল। তুমি কোনটা শুনতে চাও?”
ইনায়া (অবাক হয়ে):
“মানে?”
এরিক নেশালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে, ঠোঁটে বাঁকা হাসি এনে বলে,
“মানে এই যে—
“আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি ম্যাডাম!
Will you be my girlfriend? ”
ইনায়া বিরক্ত হয়ে বললো,
“কী যা তা বলছেন এইগুলা ? আমি জানি, এগুলো নিশ্চয়ই আপনার কোনো প্ল্যানের অংশ!”
এরিক:
“Trust me, baby! এগুলো কোনো প্ল্যান নয়।
I really love you.”
ইনায়া ঠাণ্ডা গলায় বলে,
“But I don’t love you. আপনি দয়া করে এখান থেকে যান। আমি একাই ভালো আছি, please.”
ইনায়ার এই জেদ এরিকের রাগকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তার এই মেয়েটার সামনে নিজেকে কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। তবুও বাজিতে কখনো না হারা এরিক, আজ সামান্য একটা বাজি জিততে নিখুঁত অভিনয় করে যাচ্ছে।
“ইন্টারেস্টিং… মোস্ট গার্লস অ্যাট লিস্ট প্রিটেন্ড টু বি পোলাইট হোয়েন আই টক।
বাট ইউ? ইউ আর সো ডিফারেন্ট…
ইউ নো, আই লাইক টু টেইস্ট ডিফারেন্ট থিংস।”
এরিকের কথায় ইনায়া বিরক্ত হয়ে উঠে যেতে নেয়, কিন্তু এরিক ইনায়ার হাত ধরে কোল্ড ভয়েজে বলে,
“তুমি কোথাও যেতে পারবে না, আমি বলার আগ পর্যন্ত।”
ইনায়া রেগে বলে,
“আমার হাত ছাড়ুন।”
এরিক ইনায়ার হাতের দিকে একপলক তাকিয়ে, ফিসফিস করে বলে,
“ছাড়বো না, কী করবে তুমি?”
ইনায়া আর সহ্য করতে না পেরে এরিককে সবার সামনে এক তীব্র চড় মারে।
চড়টা শুধু শব্দে না, কাঁপিয়ে দেয় চারপাশের বাতাস। মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা যেন হিম হয়ে গলায় কাঁটা দেয়।
এরিক… অপমানিত। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার, একই মেয়ে, পুরো ক্যাম্পাসের সামনে তার গালে চড় মারল।
তার চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।
না, এটা রাগ না, এটা বিস্ফোরণের আগের সেই ভয়াবহ, নিঃশব্দ শান্তি।
এই দৃশ্য দেখে, চারপাশে কেউ কেউ ভিডিও করছে, কেউ আবার হতবাক হয়ে চোখ মেলতেই ভুলে গেছে।
একজন নিচু স্বরে বলছে,
“She slapped Eric Ashford! That’s Erik Ashford.”
আরেকজন ফিসফিস করে বলে,
“She’s dead. She doesn’t even know it yet.”
ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত বিজনেস টাইক্যুনের ছেলে, দ্যা গ্রেট এরিক অ্যাসফোর্ড.. তার গালে একটা সাধারণ মেয়ে চড় মেরেছে!
সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ক্যাম্পাস নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
ইনায়া সেইখানে আর এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে যায়, এরিকের পুরো বিষয়টা বুঝে নিতে কিছু সময় লাগে।
বুঝে উঠতেই সে রাগে পাশের টেবিলগুলো হাত-পা দিয়ে আছাড় মারতে শুরু করে। আর
চিৎকার করে বলে ওঠে,
“She slapped me?” বলেই পাগলের মতো হাসতে থাকে।
“Twice? In front of everyone?”
এই বলে সে, আরও একটা টেবিল উল্টে দেয়।
“ডাজ শি ইভেন নো হু দ্য ফাক আই অ্যাম?”
“আই’ম এরিক অ্যাশফোর্ড। আই ডোন্ট গেট ডিসরেস্পেক্টেড। আই এন্ড পিপল ফর লেস।”
তার চোখ রাগে লাল হয়ে উঠছে।
“She thinks she’s untouchable? Let’s see.”
“She wants war? I’ll give her a f*cking battlefield.”
সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কারো সাহস নেই এরিককে থামানোর।
এরিক রাগে ফুঁসতে থাকে আর বলতে থাকে,
“আমি এরিক অ্যাসফোর্ড, এই ইউনিভার্সিটির মালিকের ছেলে। ওই সামান্য মেয়ে, যার কোনো যোগ্যতা নেই আমার সামনে দাঁড়ানোর, সে কিনা আমাকে চড় মারে সবার সামনে? How funny! ওই মেয়েকে যদি আমি বদনাম করে ইউনিভার্সিটি ছাড়া করতে না পারি, তো আমার নামও এরিক অ্যাসফোর্ড না।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই এরিকের ঠোঁটে বাঁকা, নির্মম হাসি ফুটে ওঠে,
“কিপ প্লেয়িং ব্রেইভ, সুইটহার্ট।
আই ওয়ান্ট টু সি হাউ মাচ অফ ইউ ইজ ফায়ার…
অ্যান্ড হাউ মাচ ইজ জাস্ট স্মোক।”
সন্ধ্যার রক্তিম ছায়া যখন শহরের বুক ছেঁয়ে নামে , তখন দ্যা ক্যালিফোর্নিয়া ক্লাবের উষ্ণ আড্ডায় ভিড় জমায় এরিক আর তার চার বন্ধু এ্যালেক্স, এ্যারেন, এলিনা, জুলি। এটা তাদের পাঁচজনের প্রিয় আড্ডার জায়গা। মুড ঠিক করতে, একে অন্যকে চিয়ার আপ করতে, তারা প্রায় প্রতিদিনই এখানে আসে। পাঁচজনের বন্ধুত্বটা হলো অটুট, গভীর আর অকৃত্রিম। এলিনা হলো এ্যারেনের গার্লফ্রেন্ড, ওদের সম্পর্কটাও বেশ মজবুত।
ক্লাবে ঢুকেই এরিক একের পর এক ড্রিংক করতে থাকে, আর মনে মনে বিড়বিড় করে,
“হাও ডেয়ার সি।”
এ্যালেক্স চিন্তিত গলায় বলে,
এরিক, আর কত ড্রিংক করবি?
নিজেকে এভাবে শেষ করিস না ভাই।
এসব বাদ দে, বরং ভাব-
ওই মেয়েটাকে কেমন করে শিক্ষা দেওয়া যায়,
কীভাবে পুরো ক্যাম্পাসের সামনে ওকে সত্যি সত্যি ছোট করা যায়!
এ্যালেক্সের কথা এরিক মন দিয়ে শুনে, কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তোলে।
এ্যারেন অবাক হয়ে বলে,
“কীরে, এমন করে পাগলের মতো হাসছিস কেন?”
এরিক এ্যারেনের দিকে তাকিয়ে মেকি হেসে বলে,
“ওই মেয়েটাকে শায়েস্তা করার একটা পারফেক্ট উপায় মাথায় এসেছে। এবার ও বুঝবে, কার সাথে খেলতে এসেছে।”
এ্যালেক্স অধীর হয়ে বলে ,
“কি উপায়? তারাতাড়ি বল!”
এরিক একটু বাঁকা হেসে বলে,
“এই যে, মেয়েটা মুসলিম।তাই ধর্মীয় কালচার খুব মেনে চলে। আই অ্যাম প্রিটি সিওর, তার ফ্যামিলির মেন্টালিটিও তেমনই হবে।”
এ্যারেন:
“তাতে কী?”
এরিকের মুখে শয়তানি হাসি ফুটে উঠে,
“তাতেই তো সব, এ্যারেন!”
এলিনা চিন্তিত মুখে বলে,
“তুই ঠিক কী বলতে চাস, পরিষ্কার করে বল।”
এরিক সবার দিকে তাকিয়ে, ড্রিংকের গ্লাসটা হাতে নিয়ে, হাস্কি স্বরে বলে,
“আই ডোন্ট ওয়ান্ট রিভেঞ্জ, আই ওয়ান্ট হার ডিগনিটি শ্যাটার্ড রাইট ইন ফ্রান্ট অফ দ্য পিপল শি কলস ফ্যামিলি।”
এলিনা কাঁপা গলায় বলে,
“না এরিক, তুই এমন কিছু করবি না! ও একটা মেয়ে। তাছাড়া, মেয়েটা অনেক ভালো। তুই-ই তো সবকিছু আগে শুরু করেছিস!”
এ্যারেন এলিনার দিকে তাকিয়ে বলে,
“বেবি, তুমি ওকে চেনো?”
এলিনা:
“হ্যাঁ, ওর সাথে আমার ওয়াশরুমে দেখা হয়েছিলো। মেয়েটা খারাপ না, এরিক। ওকে ওর মতো থাকতে দে!”
এরিক ঠাণ্ডা গলায়, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি নিয়ে বলে,
“সরি, সুইটি। মার্সি ইজ়ন’ট রিয়ালি মাই থিং।
শি ক্রস্ড দ্য রং লাইন উইথ মি।
নাউ, শি’ল রিমেম্বার মাই নেম এভরি টাইম শি ট্রাইজ় টু ফরগেট দিস নাইট।”
বলেই এরিক লাস্ট ড্রিংকে চমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, পকেট থেকে বাইকের চাবি বের করে ঘুরাতে ঘুরাতে সামনে এগিয়ে যায়।
এরিককে উঠে যেতে দেখে এ্যালেক্স বলে,
“কোথায় যাচ্ছিস এখন?”
এরিক ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলে উঠে,
“চাঁদকে কলঙ্কিত করতে!”
বলেই এরিক শিস বাজাতে বাজাতে ক্লাব থেকে বেরিয়ে যায়, পেছনে তার বন্ধুরা স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
ক্লাবের বাইরে পার্ক করা আছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী, কিংবদন্তি বাইক “নেইম্যান মার্কাস লিমিটেড এডিশন ফাইটার। ”
বিশ্বে মাত্র এর ৪৫টি ইউনিট রয়েছে , আর এরিকের কাছে আছে একটিই যেটা তার অহংকার, তার স্বপ্ন। সব বাইকের ভিড়ে এইটাই তার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের, ভালোবেসে নাম দিয়েছে “শেডো রাইডার”
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৫
রাতের ছায়ার মতো নিঃশব্দ, অথচ দুর্দান্ত।
এরিক তার শেডো রাইডারের সিটে বসে,
ইঞ্জিনের গর্জনে চারপাশ কাঁপিয়ে তোলে,
আলো-ছায়া ছুঁয়ে, বাতাসকে চিরে
সে ছুটে চলে সান ফ্যান্সিসকোর পথে,
দেখে মনে হচ্ছে, অন্ধকারে ছুটে চলা এক রহস্যময় ছায়া, নাম তার “শেডো রাইডার”।
