Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৭ (২)

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৭ (২)

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৭ (২)
রুপা

মিনারা বেগমের গগনবিদারী চিৎকারে রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন শেহনাজ সরকার ও জেনিফার সরকার; তাদের সাথে পুষ্পও ছুটে এল। এদিকে মাথায় ফুটন্ত কফি পড়ায় মিনারা বেগম নিজের মাথা চেপে ধরে ব্যথায় চিৎকার করছেন। শেহনাজ সরকার দ্রুত এগিয়ে এসে কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই মিনারা বেগম আর্তনাদ করে বললেন যে ওনার মাথায় গরম পানি পড়েছে! ওটা যে আসলে ব্ল্যাক কফি ছিল, তীব্র যন্ত্রণার কারণে মিনারা বেগম প্রথমে তা বুঝতে না পেরে গরম পানি ভেবে বসে আছেন। মিনারা বেগমের কথা শুনে শেহনাজ সরকারের ভ্রু আপনাআপনিই কুঁচকে গেল। এই সুরক্ষিত ড্রয়িং রুমের সোফা এরিয়ায় ওনার মাথার ওপর হঠাৎ গরম পানি কোত্থেকে পড়বে? তিনি এবার সন্দিহান গলায় বলেই ফেললেন—

– “কী বলছেন খালা! এখানে আপনার মাথায় গরম পানি কোত্থেকে পড়বে?”
– “শেহনাজ, আমি কি তোমাকে মিথ্যে বলছি? তুমি দেখতে পাচ্ছ না আমার মাথা পুরো ভিজে গেছে? মনে হচ্ছে মাথার চামড়া একদম পুড়ে গেছে, সাথে মুখেও পড়েছে!” মিনারা বেগম বিলাপ করতে লাগলেন।
নিশি দাদির দিকে তাকিয়ে একটু কাছে যেতেই কড়া কফির তীব্র ঘ্রাণ তার নাকে এল। সে এবার সোফার পাশে মেঝেতে পড়ে থাকা খালি কফির মগটার দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল—
– “এটা গরম পানি না দাদি, এটা কফি ছিল!”
– “কিন্তু এখানে কফি কোত্থেকে আসল?” জেনিফার সরকার অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।
এবার সবার সন্দেহী দৃষ্টি সোজা ওপরের দিকে গেল। সেখানে করিডোরের রেলিং ধরে আর্য অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে; যেন নিচে কোনো হাই-ভোল্টেজ ড্রামা চলছে আর সে তার দর্শক! শেহনাজ সরকার প্রথমে মেঝেতে পড়া মগটার দিকে তাকালেন, তারপর আবার আর্যর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন—

– “আর্য, তুমি কফি ফেলেছ?”
আর্য মুখে কিছু বলল না। সে শুধু নিজের শীতল চোখ দুটো ঘুরিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পুষ্পর দিকে তাকাল এবং অত্যন্ত ধীরপায়ে নিচে নামতে লাগল। আর্য নিচে পা রাখতেই নিশি রাগে চেঁচিয়ে উঠল—
– “আর্য! তুমি দাদির মাথায় এভাবে গরম কফি কেন ফেলেছ?”
নিশির এমন চড়া গলা শুনেও আর্যর মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না; উল্টো তার কপালে এক জোড়া বিরক্তিকর ভাঁজ পড়ল। সে এবার চরম বিরক্তি নিয়ে নিজের গম্ভীর ও ভারী গলায় বলল—
– “আমি কেন ওনার মাথায় কফি ফেলতে যাব? জাস্ট হাত স্লিপ করে পড়ে গেছে!”
আর্যর এমন বরফশীতল ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে নিশি আর কিছু বলার সাহস পেল না। শেহনাজ সরকার এবার জেনিফার সরকারকে উদ্দেশ্য করে বললেন মিনারা বেগমকে ওনার ঘরে নিয়ে গিয়ে বরফ দিতে এবং বার্নিং ক্রিম লাগিয়ে দিতে। জেনিফার সরকারও বড় ভাবির কথামতো ওনাকে ধরে ধরে ওনার রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। আর আর্য? সে তো তখন থেকে একটু দূরে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুষ্পর দিকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শেহনাজ সরকার পরিস্থিতি সামলে আবারও রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। নিশি এবার আর্যকে কিছু একটা বলতে গেলে আর্য তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সোজা পুষ্পর দিকে এগিয়ে গেল। পুষ্পর একদম নিকটে গিয়ে অত্যন্ত নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—

– “কী হয়েছে? এভাবে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন? কোনো কারণে ভয় পাচ্ছো?”
পুষ্পর সাথে আর্যকে এতটা নরম ও মোলায়েম গলায় কথা বলতে দেখে নিশি রাগে আর হিংসায় ভেতরে ভেতরে একদম ফুঁসতে লাগল। আর্য হয়তো নিশিকে আরও কিছুটা জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্যই ইচ্ছে করে পুষ্পর কপালে ও গালে আঁচড়ে পড়া দুই-তিনটি অবাধ্য চুল আলতো করে কানের পিঠে গুঁজে দিল। হঠাৎ আর্যর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পুরুষালি স্পর্শে নিমিষেই কেঁপে উঠল রমণীর ভীত কায়া, যা আর্যর তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না। ওদিকে নিশি রাগে নিজের হাত দুটো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে নিল।
– “কী হয়েছে, বলছ না কেন? ভয় পেয়েছ?” আর্য আবারও জিজ্ঞেস করল।
আর্যর কথার বিপরীতে পুষ্প তার কাঁপা কাঁপা ও ভীত দৃষ্টি তুলে তাকাল আর্যর দিকে। আর্য একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল, ফলে মুহূর্তেই দুজনের চোখাচোখি হলো। পুষ্প এবার মিনমিন করে বলল—
– “আপনার হাত থেকে দাদির মাথায় গরম কফি পড়েছে, আপনি ওনার কাছে ক্ষমা চাননি কেন?”
পুষ্পর মুখের এমন সরল কথা শুনে আর্যর কুঁচকে থাকা ভ্রু দুটো যেন আরও কিছুটা সংকুচিত হলো। সে সেভাবেই জিজ্ঞেস করল—

– “আমার ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল?”
পুষ্প ওপর-নিচ মাথা নেড়ে পরম সম্মতির সাথে বলল—
– “ফুফুমণি বলেছেন, ভুল করে যদি নিজের দ্বারা কারও কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তবে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত!”
পুষ্পর কথা শুনে আর্যর কুঞ্চিত ভ্রু জোড়া এবার ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এল। মনে মনে ভাবল—কী দিয়ে তৈরি এই মেয়েটা? যে মহিলা গতকাল রাতে ওকে এত এত কটু কথা শোনাল, যার কারণে মেয়েটা আড়ালে গিয়ে নিজে নিজে এতটা কাঁদল, এখন সেই মহিলার কষ্টেই সে নিজে কষ্ট অনুভব করছে! অথচ, এই মেয়ের চোখের পানির বদলা নেওয়ার জন্যই আর্য এত বড় একটা কাণ্ড ঘটাল, আর এই মেয়েই এখন এসে বলছে তার ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল! ভাবতেই আর্যর চোয়াল আবারও শক্ত হয়ে গেল। সে এবার পুষ্পর দিকে সামান্য ঝুঁকে, ওর কানের একদম কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল—

– “কিন্তু আমি ভুল করে কিছু করিনি! ইচ্ছে করেই ওই গরম কফি ওই মহিলার মাথায় ঢেলেছি। নেক্সট টাইম যদি সে একই ভুল আবারও করে, তবে এর চেয়েও ভয়ংকর কিছু ঘটবে ওনার সাথে। মাইন্ড ইট!”
আর্যর রাগান্বিত কণ্ঠে বলা কথাগুলো কান দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই পুষ্প পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল! শরীরটা যেন মুহূর্তের জন্য হিম হয়ে এল তার। কী বলছেন সরকার সাহেব? ইচ্ছে করে করেছেন? কিন্তু কেন? তবে মনের এই তীব্র প্রশ্নটা ঠোঁট অব্দি টেনে আনার মতো সাহস পেল না ভীত রমণী। আর্য এবার নিজেকে পুষ্পর থেকে কিছুটা সরিয়ে নিল। তারপর তীক্ষ্ণ ও গভীর দৃষ্টিতে উপর-নিচ অবলোকন করল পুষ্পকে। পুষ্পর পরনে আজ খয়েরি রঙের কাজ করা থ্রি-পিস, মাথায় ওড়নাটা খুব সুন্দর করে জড়ানো—ঠিক যেভাবে একদিন আর্য নিজে ওকে পরিয়ে দিয়েছিল; শুধু ফর্সা মায়াবী মুখশ্রীটুকু দৃশ্যমান সাথে কিছু অবাধ্য চুল।
আর্য এবার ব্রেকফাস্ট টেবিলের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে গম্ভীর গলায় বলল—

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৭

– “যাও, আম্মুর কাছে যাও। বাড়িতে আসা মেহমানদের ধারেকাছেও একদম যাবে না। মনে রেখো, সবসময় তোমার শাশুড়ি তোমার সাথে থাকবে না; তাই নিজেকে প্রটেক্ট করতে শেখো।”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here