Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩
রুপা

রান্নাঘরে কাজের লোকেদের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করছে পুষ্প। জেনিফার সরকার রাতের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শেহনাজ সরকার এখনো ফেরেননি; তিনি একজন লয়ার হওয়ায় একটি জটিল কেসের কাজে আজ কোর্টে বেশি সময় দিতে হচ্ছে, টিমের সাথে আলোচনা করছেন। জেনিফার সরকার রান্নার তদারকি করছেন আর পুষ্প তাকে সাহায্য করছে।
কাজের ফাঁকে জেনিফার হঠাৎ খেয়াল করলেন, পুষ্প বারবার কোমরে হাত দিচ্ছে আর মালিশ করছে। তিনি চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করলেন—
– “পুষ্প মা, কোমরে কী হয়েছে? বারবার হাত দিচ্ছিস কেন? ব্যথা করছে?”
চাচি শাশুড়ির কথায় পুষ্প চট করে উত্তর দিতে পারল না। সে আড়ষ্ট হয়ে গেল। কারো সাথে হুট করে কথা বলতে গেলেই বুক কাঁপে তার, মনে ভয় কাজ করে— যদি ভুল কিছু বলে ফেলে আবার মার খেতে হয়! পুষ্পকে এভাবে কুঁকড়ে যেতে দেখে জেনিফার সরকার তার কাছে এসে মাথায় হাত রাখলেন। নরম সুরে বললেন—

– “পুষ্প মা, আমি আর তোর ফুফুমণি তো একই রকম। তাঁর সাথে যেভাবে কথা বলিস, আমার সাথেও সেভাবে বলতে পারিস। আমাকে ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি কি তোকে কোনোদিন বকেছি?”
পুষ্প মাথা নেড়ে জানাল, তিনি কখনো বকেননি। জেনিফার আবারও বললেন—
– “তাহলে ভয় পাচ্ছিস কেন? আমাকে বল, কোথায় ব্যথা করছে?”
পুষ্প আমতা আমতা করে বলল—
– “একটু ব্যথা করছে। দরজার সাথে ধাক্কা লেগেছে তো, মনে হয় ওখানেই ব্যথা পেয়েছি। ধাক্কা খাওয়ার সময় অতটা বুঝিনি, এখন একটু বেশি লাগছে।”
জেনিফার সরকার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
– “আঘাত পাওয়ার সাথে সাথে সবসময় বোঝা যায় না রে মা, সময় পার হলে বোঝা যায় ব্যথাটা কত গভীর!”
তিনি ঘরের কাজের মেয়েটিকে ডেকে বললেন রান্নাটা দেখে নিতে, আর পুষ্পকে নিজের সাথে আসার জন্য ইশারা করলেন। বললেন—

– “পুষ্প মা, তুই আমার সাথে আয়। আমি বাম (Balm) লাগিয়ে দিচ্ছি, দেখবি কমে যাবে।”
পুষ্প লজ্জা পেয়ে বলল—
– “না না চাচি আম্মু, লাগবে না। এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। এরকম কত ব্যথা পেয়েছি আগে, কখনো তো ওষুধ লাগাতে হয়নি।”
পুষ্পর কথা শুনে জেনিফার সরকারের বুকটা হু হু করে উঠল। বড় জা’য়ের কাছে তিনি শুনেছেন, এই মেয়েটা ছোটবেলা থেকে কতটা অত্যাচারিত হয়েছে। তবুও মেয়েটা কত বুঝদার! ফর্সা গোলগাল মুখটাতে এখনো একটা বাচ্চা বাচ্চা ভাব লেগে আছে, কিন্তু কথা বলে বড়দের মতো। অল্প বয়সেই জীবন তাকে পরিণত করে দিয়েছে।
জেনিফার জেদ করে বললেন—
– “তোকে আর বেশি কথা বলতে হবে না, আয় আমার সাথে। বাম না লাগালে দেখবি কাল সকালে বিছানা থেকে উঠতেই পারবি না।”
জেনিফার পুষ্পকে নিজের রুমে নিয়ে এসে যত্ন করে কোমরে বাম লাগিয়ে দিতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন, পুষ্পর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। তিনি আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন—

– “কী মা? বেশি ব্যথা করছে?”
পুষ্প চোখের জল মুছে হেসে মাথা নেড়ে জবাব দিল—
– “একদম না চাচি আম্মু, ব্যথা করছে না। আসলে আগে কেউ কখনো এভাবে আদর করে ওষুধ লাগিয়ে দেয়নি তো, তাই একটু কান্না পাচ্ছে।”
কথাটা শুনে জেনিফার সরকার পুষ্পকে জড়িয়ে ধরলেন। মমতাভরা কণ্ঠে বললেন—
– “আগে কেউ আদর করেনি তো কী হয়েছে? এখন থেকে আমি করব, বড় ভাবি করবে। আমরা সবাই আছি তো তোর জন্য। আগে তোর কেউ ছিল না ঠিকই, কিন্তু এখন আমরাই তোর সব।”

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আর্য। হাতে তার একটি পুরনো ডায়েরি। ডায়েরির পাতাগুলো সে আনমনে উল্টে যাচ্ছে আর আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেট থেকে ঘনঘন টান দিচ্ছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে সে; বারান্দাটা ধোঁয়ায় যেন অন্ধকার হয়ে আছে।
ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠা খুলতেই চোখে পড়ল দুজন উজ্জ্বল হাসি মাখা যুবকের ছবি। একে অপরের কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে—একজন আর্য, অন্যজন ইয়াসার রেজোয়ান। ছবির পাশে লেখা—
– “কেন চলে গেলি তুই? তুই এত স্বার্থপর কীভাবে হলি ইয়াসার?”
আর্য বিড়বিড় করে বলতে লাগল—
– “আসলেই নারী জাতি মানেই বেইমান! এরা মায়া বাড়াতে জানে, আর সেই মায়ার জালে ফাঁসিয়ে নিমিষেই মায়া কাটিয়ে চলে যায়। অন্য প্রান্তের মানুষটা যে সেই মায়ায় তিলে তিলে শেষ হয়ে যায়, সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না।”
পরক্ষণেই দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
– “কিন্তু তুই ভুল করেছিস ইয়াসার, তোকে আমি কোনোদিন ক্ষমা করব না!”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়েরিটা বন্ধ করল সে। একের পর এক সিগারেট টানতে টানতে প্যাকেটটা শেষ করে ফেলল। এমন সময় নিচ থেকে রাতের খাবারের জন্য ডাক পড়ল। আর্য ডায়েরিটা নিয়ে রুমে এসে তার পার্সোনাল লকারে ঢুকিয়ে তালা মেরে দিল, যেন এই অতীত কেউ কোনোদিন জানতে না পারে। এরপর ধীরপায়ে সে নিচে নেমে গেল।

খাবার টেবিলে বাড়ির সবাই উপস্থিত। আমজাদ সরকার, আহমেদ সরকার, আহনাফ, আর্য আর সিমরান। জেনিফার সরকার সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। তিনি বারবার পুষ্পকে খেতে ডাকছেন, কিন্তু পুষ্প আসছে না। বিকেলের সেই ঘটনার পর আর্যর সামনে যাওয়ার সাহস তার নেই। সে জানে, সামনে গেলেই আবার সেই কর্কশ কথা আর অপমান সহ্য করতে হবে।
বাড়ির সবাই জানে, আর্য এই বিয়েটা মেনে নেয়নি; কেবল শেহনাজ সরকারের জোরাজুরিতেই সে পুষ্পকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। শেহনাজ সরকার সবসময় চান পুষ্প যেন আর্যর চোখের সামনে থাকে। তিনি বিশ্বাস করেন— “চোখের সামনে থাকলে মায়া বাড়ে, আর আড়াল হলে মন থেকেও আড়াল হয়ে যায়।” তাই তিনি জোর করে পুষ্পকে আর্যর সব কাজে এগিয়ে দেন, এই আশায় যে কোনো একদিন হয়তো আর্যর মন গলবে।
জেনিফার সরকারের ডাকে পুষ্প না আসায় শেহনাজ সরকার নিজেই উঠে গিয়ে পুষ্পকে নিয়ে এলেন। পুষ্পর হাত ধরে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—

– “তোকে কতবার বলেছি, কারো ভয়ে তুই লুকিয়ে থাকবি না? আমি আছি তো তোর সাথে। দেখি কে তোর সাথে কেমন ব্যবহার করে! এখানে বস আর চুপচাপ খেয়ে নে।”
পুষ্প অতি কষ্টে গুটিগুটি পায়ে এসে টেবিলের এক কোণে বসল। শেহনাজ আর জেনিফার দুজনেই পুষ্পর প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন। পুষ্প একবারও মাথা তুলে তাকাল না। তার ঠিক সামনের চেয়ারেই বসা আর্য। সে এক মুহূর্তের জন্য পুষ্পর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, যেন চাবুক মারছে চোখে দিয়ে। পরক্ষণেই নজর সরিয়ে নিয়ে সে নিজের খাবারে মন দিল। পুরো টেবিলজুড়ে এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে।
খেতে খেতে শেহনাজ সরকার সবার উদ্দেশ্যে বললেন—

– “আমি পুষ্পকে কলেজে ভর্তি করাতে চাই। কারো কোনো আপত্তি আছে?”
কথাটা তিনি মূলত আর্যকে উদ্দেশ্য করেই বলেছেন। কিন্তু আর্য শুনেও না শোনার ভান করে রইল। পরিবারের বাকিদের কারো কোনো আপত্তি নেই। আমজাদ সরকার স্ত্রীর সিদ্ধান্তে সবসময় সায় দেন; তিনি শেহনাজকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন আর বিশ্বাস করেন। পুষ্পকে ওনারও বেশ পছন্দ হয়েছে। শুরুতে বয়সে ছোট বলে খানিকটা দ্বিধা থাকলেও, পুষ্পর সরলতা দেখে তিনি আর বিয়েতে বাধা দেননি।
শেহনাজ সরকারের কথা শুনে সিমরান উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল—
– “একদম ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ বড় মা! পুষ্পরানি এমনিতেই বাসায় একা থাকে। এখন কলেজে গেলে আমরা দুজন একসাথে যাব, একসাথে আসব। কী মজা হবে, তাই না পুষ্পরানি?”
এত কিছুর মধ্যেও পুষ্প জড়সড় হয়ে বসে আছে। একবার সাহস করে আড়চোখে আর্যর দিকে তাকাল সে। কিন্তু আর্য নির্বিকারভাবে খেয়ে যাচ্ছে। শেহনাজ এবার সরাসরি প্রশ্ন করলেন—
– “আর্য, তোমার কোনো সমস্যা আছে?”
আর্য গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল—
– “আমার কেন সমস্যা থাকতে যাবে? তোমার ভাইজি, তুমি তাকে কলেজে পড়াও আর যাই করাও, আমার তাতে কী?”
শেহনাজ সরকার এবার দাঁতে দাঁত চেপে বললেন—

– “তুমি না মানলেও আইনত তো ও তোমার স্ত্রী। পরে যেন আবার ঝামেলা না করো যে আমার অনুমতি না নিয়ে কেন কলেজে ভর্তি করালে! তাই আগেই জিজ্ঞেস করে নিচ্ছি।”
আর্য খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে ধুতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল—
– “আমি এই মেয়েকে বউ বলেই মানি না, তাই ঝামেলা করার প্রশ্নই ওঠে না।”
কথাটা বলেই সে গটগট করে উপরে চলে গেল। আর্যর এমন অপমানজনক কথা শুনে পুষ্প নীরবে চোখের জল ফেলছে। শেহনাজ সরকার পেছন থেকে পুষ্পকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২

– “একদম চিন্তা করিস না পুষ্প, তোর শাশুড়ি তোর পাশে আছে! এই ঘাড়ত্যাড়া ছেলেকে যদি একদিন তোর পেছন পেছন না ঘুরিয়েছি, তবে আমিও শেহনাজ সরকার না!”
আহনাফ পরিবেশটা হালকা করতে একটু জোরেই বলে উঠল—
– “কেয়া বাত হ্যায় বড় আম্মু! ইউ আর দ্য বেস্ট মাদার-ইন-ল ইন দ্য ওয়ার্ল্ড!”
সিমরানও তার কথায় সায় দিয়ে হেসে উঠল। সবার হালকা হাসি-ঠাট্টার মাঝেই রাতের খাওয়া শেষ হলো।

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here