অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩০
রুপা
পুষ্পর ঘুম ভাঙে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে। শরীর খারাপ থাকায় নামাজ পড়তে পারেনি, ঘুমও ভেঙেছে দেরিতে। ঘুম থেকে উঠে নিজেকে আর্যর রুমে আর্যর বিছানায় দেখে সে ভীষণ চমকে গেল, অবাক হলো। সে এই বিছানায় এল কীভাবে? মনে তীব্র প্রশ্নের সঞ্চয় হলো, কিন্তু উত্তর এল না। উত্তর পেলেও পুষ্প তা মানতে নারাজ। সেদিন রাতে আর্য তাকে কোলে করে রুমে নিয়ে এসেছিল, নরম কণ্ঠে অনেক আদুরে কথা বলেছিল—সে সব কথাতেই তো পুষ্প সব ভুলে গিয়েছিল! পুষ্পর মন বলছে, আর্যই তাকে এই রুমে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তবুও পুষ্প মানতে পারছে না। মানবে কী করে? সামান্য আলমারিতে হাত দেওয়ায় যে পুরুষ চড় মারে, সেই পুরুষ কেন তাকে রুমে আনবে? তাও আবার নিজের কোলে করে! পুষ্প অস্বীকার করলেও সে জানে, আর্যই তাকে এই রুমে এনেছে। সেটা বুঝতে পেরেই সে আরও দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছে। তাকে একবার অপমান করেছে, গায়ে হাত তুলেছে, আবার নিজেই কোলে করে রুমে নিয়ে এসেছে—কেন? কী চান সরকার সাহেব!
পুষ্প আর ভাবতে পারল না। রাতের সেই আর্যর থাপ্পড়ের কথা মনে পড়তেই বুকে তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। লোকটা তার ছোঁয়া এতটাই অপছন্দ করে যে, সে সামান্য আলমারিতে হাত দেওয়ায় তাকে মেরেছে। দূরে যখন ঠেলে দেবেই, তাহলে নিজে থেকে কাছে এসেছিল কেন? সে তো সরকার সাহেবের কথা মতো দূরত্ব বজায় রেখেই চলছিল। নিজে থেকে কাছে এসে কেন তাকে এভাবে ভেঙে দিল সে? সে তো নিজের ভাগ্য মেনে নিয়েছিল; আর্যর সব অপমান, অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য—সব মেনে নিয়েছিল। তাহলে উনি কেন এত কাছে এলেন? তার সুবিধা-অসুবিধা, ভালো-মন্দের খেয়াল রাখলেন কেন? তাকে নিজের প্রতি আরও দুর্বল করলেন কেন? এখন তার আরও কষ্ট হচ্ছে। আগের চেয়েও কষ্ট হয়, অনেক বেশি দমবন্ধকর কষ্ট—কাউকে বলতেও পারে না, সহ্যও করতে পারছে না। কী করবে সে?
পুষ্প কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফুফুমণি বলেছে, আজকে ডিভোর্স পেপারে সই করবে। সত্যি সত্যি ডিভোর্স হয়ে যাবে? গতকালই তো সে ঠিক করেছিল, সে সরকার সাহেবকে ডিভোর্স দিয়ে মুক্ত করে দেবে। সে আর রাখবে না এই নামমাত্র সম্পর্কটা। কিন্তু এখন তার কেন এত কষ্ট হচ্ছে? যদি সত্যি সত্যি ডিভোর্স হয়ে যায়?
– “থাকতে থাকতে নাকি ইট-পাথরের তৈরি বাড়ির ওপরও মায়া জন্মায়। আমি কি সেই ইট-পাথরের চেয়েও মূল্যহীন? এত দিন এক রুমে, এক ছাদের নিচে থেকেও আমার প্রতি আপনার একটুও মায়া জন্মাল না, সরকার সাহেব?”
কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করল পুষ্প। নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল রমনী। না, সে আর কাঁদবে না। সে আর এই নামমাত্র সম্পর্কে আটকে রাখবে না সরকার সাহেবকে। মুক্তি দেবে সে, তার মতো করেই—হোক না তাতে কষ্ট! কষ্ট তো তার আজীবনের লিখিত ভাগ্য; এই জীবনে তা আর পিছু ছাড়বে না তার। ছোটবেলা থেকে সয়ে এসেছে, ভবিষ্যতে সয়ে নেবে। দুই হাতে চোখের পানি মুছে নিয়ে, পুষ্প নিজেকে সামলে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওঠার সময় হাতে লেগে আর্যর রেখে যাওয়া ফোনটা ফ্লোরে পড়ে যায়। সে উঠিয়ে দেখল ফোন, তবে সেটা বিছানায় আবারো রেখে দিল। এটা আর্যর ফোন—বুঝতে অসুবিধা হলো না, তাই তড়িঘড়ি করে রেখে দিল, যদি আবার ফোন ধরার অপরাধে গালে চড় পড়ে!
অথচ ভীতু রমনী জানেও না, কত যত্নে আর আশা নিয়ে ফোনটা রেখে গেছে একজন, তার সাথে কথা বলার জন্য! পুষ্প ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে জামা পাল্টে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
পুষ্পকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে শেহনাজ সরকার ল’ ফার্মে গেলেন। আজকে সামনে একটা কেসের হিয়ারিং আছে, সেই কেসের ফাইল স্টাডি করতে হবে। সাথে ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট জুনিয়র লয়ারের সাথে কেসটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে। এদিকে পুষ্প কলেজে এসে সারার সাথে ক্লাসরুমে ঢুকে গেল।
সকালে উঠে আর্যকে অনেক খুঁজেছিলেন শেহনাজ সরকার, কিন্তু আর্যর দেখা পাননি। শেষে আমজাদ সরকারের কাছে জানতে পেরেছেন আর্য প্যারিস চলে গেছে, এখন সে ফ্লাইটে। তিনি আর কিছু বলেননি। ছেলে যে ডিভোর্স পেপারে সই না করার জন্য পালিয়ে গেছে, তা বুঝতে তার অসুবিধা হলো না। ছেলের এই কাণ্ডে তিনি মনে মনে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন, যেটা আর্য ফিরে এলেই কার্যকর করবেন। পুষ্প চাইলে ডিভোর্স হবে—যেকোনো মূল্যে হবে, তাতে তার ছেলে যতই অমত পোষণ করুক না কেন।
ক্লাস শেষে ছুটি হওয়ার পরে আজকেও সারার সাথে কলেজের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে পুষ্প। কারণ শেহনাজ সরকার নিতে আসবেন বলেছেন। যদিও আর্যর ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে, তবুও পুষ্প ফুফুমণির জন্য চুপচাপ অপেক্ষা করছে। সারা আজকে কলেজে আসার পর থেকেই খেয়াল করছে পুষ্প বেশ চুপচাপ, মনমরা; মুখে যেন আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ জমেছে। যদিও পুষ্প বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকে, কিন্তু সারা বুঝতে পারে—এইটা স্বাভাবিক চুপ থাকা নয়, তার বান্ধবীর মন কোনো কারণে বেশ খারাপ। সারা এবার পুষ্পর দুই কাঁধ ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—
– “কী হয়েছে পুষ্প? এরকম মন খারাপ করে আছিস কেন? সেই কলেজ আসার পর থেকে দেখছি একদম চুপচাপ বসে আছিস, আমার সাথে আজকে মন খুলে কথাও বলিসনি। কেন? কী হয়েছে?”
সারার কথায় পুষ্পর মাঝে কোনো পরিবর্তন এল না। সে আগের মতোই বলল—
– “আরে কিছু হয়নি সারা, এমনিই ভালো লাগছে না!”
সারা এবার পুষ্পর কপালে হাত ছুঁয়ে দেখল জ্বর আছে কি না। নাহ, জ্বর নেই। শরীরের তাপমাত্রা ঠিক আছে, তাহলে?
– “জ্বর তো নেই, কেন ভালো লাগছে না?”
সারার এই নরম ব্যাকুলতা দেখে পুষ্পর মুখের কালো মেঘ আরও ঘন হলো। সকাল থেকে আর্যর দেখা মেলেনি। গতকাল রাতে সে পুষ্পকে মেরেছে, সব কিছুতেই সে ঠিক করেছিল আর্যর থেকে দূরে থাকবে। সকালেও ঠিক করেছিল ফুফুমণির কথা মতো ডিভোর্স দিয়ে দেবে আর্যকে; তার নিজের কষ্ট হলেও দেবে। কিন্তু সকাল থেকে আর্যর দেখা নেই, ফুফুমণিও আর এ বিষয়ে কোনো কথা তোলেনি। পুষ্পর ভাবনার মাঝেই সারা এবার পুষ্পর মুখে হাত দিয়ে আদুরে গলায় বলল—
– “ওলে লে সোনা পাখি! কী হয়েছে মুখের যা অবস্থা, আর একটু হলেই তো কান্না করে দিবি! কাঁদে না সোনা পাখি, ময়না পাখি, টিয়া পাখি, জান পাখি, দোয়েল পাখি!”
সারার মুখে এত এত পাখির নাম শুনে আর কথা বলার ধরণ দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল পুষ্প। সেটা দেখে সারা পুষ্পর দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাল, পরমুহূর্তেই নিজেও হেসে উঠল। দুজনের প্রাণখোলা মুক্ত হাসিতে চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে মুখরিত হলো। সারা হাসতে হাসতে বলল—
– “মেরি জান, ফুল হামেশা খিলতে হুয়েই আচ্ছা লাগতা হ্যায়, মুরঝায়া হুয়া নেহি!”
সারার হিন্দি কথার কিছুই বুঝল না পুষ্প, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে বুঝতে পারেনি। তাই এবার সারা সেই দৃষ্টিতেই তাকিয়ে বলল—
– “চল, তোর মন ভালো করি! ফুচকা খাবি নাকি ঝালমুড়ি, নাকি ভেলপুরি?”
– “কিছু খাব না, এখনই ফুফুমণি চলে আসবে!”
– “আরে আসলে সমস্যা নেই, আন্টিকেও খাওয়াব! চিন্তা করিস না, টাকা আছে আমার কাছে!”
পুষ্প যেতে না চাইলেও সারা তাকে টেনে নিয়ে গেল; সে তার জানের বান্ধবীর মন ভালো করেই ছাড়বে। পাশের একটা ঝালমুড়ি-ফুচকার স্টলে গিয়ে ফুচকাওয়ালা মামাকে দুই প্লেট ফুচকা দিতে বলল। ফুচকা আসতেই দুজনে খাওয়া শুরু করল। সাধারণত ফুচকায় মেয়েরা ঝাল বেশি খায়, কিন্তু পুষ্প সম্পূর্ণ তার উল্টো। পুষ্প ঝাল খাবার মোটেও সহ্য করতে পারে না; ঝাল একটু বেশি হলেই তার মুখ লাল হয়ে র্যাশ বেরিয়ে আসে। আসলে ঝালে তার অ্যালার্জি আছে।
সেটা সারা জানে না, তাই ফুচকায় স্বাভাবিক ঝাল দিয়েছে। অতিরিক্ত না হলেও পুষ্পর ঝাল লাগছে, তবু তার খেতে ভালো লাগছে তাই সে খেয়ে যাচ্ছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, মুখ ইতিমধ্যে লাল হয়ে গেছে। এদিকে শেহনাজ সরকার কলেজে এসে পুষ্পকে না দেখে গাড়ি থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকালেন। কোথাও না দেখে ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে দুজনে খুঁজতে শুরু করলেন। শেহনাজ সরকার কলেজের সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞেস করলেন, প্রতিদিন এখানে দুটি মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তারা আজকে কোথায়? সিকিউরিটি গার্ড বললেন, দুজনে এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল, একটু আগে ওদিকে গেছে, মনে হয় ফুচকা খেতে গেছে। কথাটা শুনে সেদিকে তাকিয়ে পুষ্পকে দেখে শেহনাজ সরকার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
শেহনাজ সরকার সেদিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। কিছুটা গিয়ে দেখলেন দুই বান্ধবী ফুচকা খাচ্ছে, কথা বলতে বলতে হাসছে। যাক, কেউ একজন আছে যে তার মেয়েটার মন খারাপের সময় তাকে মন খুলে হাসাতে পারে! হঠাৎ পুষ্পর মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি ড্রাইভারকে গাড়ি থেকে পানি আনতে বললেন। পানির বোতল নিয়ে পুষ্পর কাছে গিয়ে তিনি আঁতকে উঠলেন। তড়িঘড়ি করে পুষ্পর হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে টেবিলে রেখে অস্থির হয়ে বললেন—
– “পুষ্প, তোর মুখ লাল হয়ে গেছে! খেয়াল আছে তোর? ঝাল কেন খেয়েছিস?”
শেহনাজ সরকারের কথায় সারা এবার পুষ্পর দিকে তাকিয়ে দেখল, সত্যি সত্যি মুখ লাল হয়ে গেছে। সে-ও এবার তড়িঘড়ি করে প্লেট রেখে বলল—
– “পুষ্প, ফুচকা তো বেশি ঝাল ছিল না! তোর এই অবস্থা কেন?”
– “ও ঝাল একদমই সহ্য করতে পারে না, ঝালে ওর অ্যালার্জি আছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই ওর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।”
সারার কথার বিপরীতে শেহনাজ সরকার কথাটা বলে পুষ্পর কাঁধ থেকে ব্যাগটা নিয়ে ড্রাইভারের হাতে দিলেন এবং পুষ্পকে পানি খেতে দিলেন। পুষ্প পানি খেয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে বলল—
– “আমি ঠিক আছি, ফুফুমণি!”
শেহনাজ সরকার কিছু না বলে পুষ্পর মুখ মুছে দিলেন। সারা এবার অপরাধী সুরে বলল—
– “আই এম সরি পুষ্প, আমার জন্যই সব হয়েছে।”
– “আরে, কিছু হয়নি! তুই কি জানতি নাকি? আর আমারও ভালো লাগছিল খেতে, তাই খেয়েছি।”
– “তবুও, আমি তো তোকে জোর করে ফুচকা খেতে আনলাম।”
দুজনের কথার মাঝে শেহনাজ সরকার বললেন—
– “চিন্তা করো না, ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বান্ধবী, চলো আমাদের সাথে—তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিই।”
– “নাহ আন্টি, আমি চলে যেতে পারব। আপনি পুষ্পকে নিয়ে চলে যান।”
সারা দুজনের থেকে বিদায় নিয়ে ফুচকার টাকা দিতে চাইলে শেহনাজ সরকার দিতে না দিয়ে নিজেই ফুচকার দাম মিটিয়ে দিলেন। তারপর পুষ্পকে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলেন। এদিকে তারা যেতেই তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোক কাউকে কল করে কিছু একটা বলল, তারপর আবারো শেহনাজ সরকারের গাড়ি অনুসরণ করতে শুরু করল!
বাড়ি ফিরে শেহনাজ সরকার ও পুষ্প গোসল সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে নিল। শেহনাজ সরকার পুষ্পকে অ্যালার্জির ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন, এতে মুখের র্যাশ কমে যাবে এবং অ্যালার্জির রিঅ্যাকশন বেশি হবে না। পুষ্প প্রতিদিনের মতো দুপুরে ভাত খেয়ে ঘুমানোর জন্য রুমে চলে এল। কিন্তু আজকে পুষ্প খাটে শুয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এমন সময় রুমে শেহনাজ সরকার এলেন। তিনি পুষ্পকে কিছু না বলে তার পাশে খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসলেন এবং পুষ্পর মাথাটা নিজের কোলের ওপর নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ডাকলেন—
– “পুষ্প!”
– “হুম!”
– “আমি তোকে কিছু কথা বলব, মন দিয়ে শুনবি।”
পুষ্প কিছু বলল না। একবার মুখ তুলে ফুফুমণির দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে চুপচাপ শেহনাজ সরকারের কোলে শুয়ে রইল। শেহনাজ সরকার এবার পুষ্পর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন—
– “আমি যদি আর্যর সাথে তোর ডিভোর্স করিয়ে দিই, এতে কি তোর আপত্তি আছে?”
কথাটা শুনে পুষ্প চুপ করে রইল। সেটা দেখে শেহনাজ সরকার আবারো বললেন—
– “পুষ্প, চুপ করে থাকিস না। বল, তোর কোনো সমস্যা আছে? আমি তোকে বারবার শিখিয়েছি, নিজের অধিকার নিজে আদায় করে নিবি—এতে আমি সবসময় তোর পাশে আছি। হ্যাঁ, এখন আমি তোর কথা ভেবেই ডিভোর্সটা করাতে চাই, কারণ আর্য রেগে তোকে মেরেছে। হয়তো এর আগেও তোর গায়ে হাত তুলেছে, তুই আমাকে জানাসনি। কিন্তু তবুও আমি জানতে চাই, তুই কি ডিভোর্স চাস? আর্যর থেকে আলাদা হতে চাস? তোকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি—ডিভোর্সের পরও তোকে আমার কাছেই রাখব, আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে তোকে আগলে রাখব। কিন্তু তোকে শক্ত হতে হবে!”
শেহনাজ সরকার একটু থেমে আবারো বলতে লাগলেন—
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৯
– “আমি ঘরে-বাইরে মানুষের অনেক রূপ দেখেছি, তাই তোকে অবগত করছি—ডিভোর্স হলে তোর গায়ে একটা ট্যাগ লাগবে, তুই ‘ডিভোর্সি’। মানুষ তোকে কথা শোনাবে, বাঁকা চোখে তাকাবে। তোর বয়স কম, তুই এতে কষ্ট পাবি; তোকে শক্ত হতে হবে। মানুষ কথা শোনালে হজম না করে সেই কথার মোক্ষম জবাব দিতে জানতে হবে। মানুষের মুখ তোকেই বন্ধ করতে হবে—তুই এসব করতে পারবি তো? এতে আমি সবসময় তোর পাশে আছি। ডিভোর্স হলেও আমাকে তোর পাশে পাবি, না হলেও সবসময় পাবি। তুই আমার ছেলের বউ হওয়ার আগে আমার মেয়ে, আর আমি আমার মেয়ের সাথে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আছি। তোকে অনেক শক্ত হতে হবে; ডিভোর্স না হলেও তোকে শক্ত হতে হবে। আর্য যদি তোকে কষ্ট দেয়, পাল্টা কষ্ট তোকেও দিতে হবে। একা কষ্ট তুই কেন পাবি? তাকেও কিছুটা কষ্ট অনুভব করাতে হবে, যাতে সে-ও বুঝতে পারে কাউকে কষ্ট দিলে তার কেমন লাগে।”
