অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৮
রুপা
রাত ফুরোতেই পূর্বাকাশের কোণে রঙের মেলা বসেছে—সোনার আলোয় ধীরে ধীরে ঘুম ভেঙেছে চারপাশের সবুজ প্রকৃতিতে। শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় মুক্তোর মতো ঝলমলে রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাসের আলতো ছোঁয়া যেন পুরো পৃথিবীকে এক নতুন প্রাণের ছন্দে জাগিয়ে তুলেছে। কোলাহলমুখর দিনের শুরুতে এই শান্ত, পবিত্র সকালটি মনকে এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে দেয়।
এই সকালে সরকার বাড়ির সবাই একটু বেশি ব্যস্ত। রান্নাঘর থেকে টুংটাং খুন্তি নাড়ার শব্দ ভেসে আসছে—আজকে রেশমারা সবাই নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাবে, তাই তাদের জন্য নানা রকম খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করা হচ্ছে। সকাল থেকে সরকার বাড়ির দুই কর্ত্রী শেহনাজ সরকার আর জেনিফার সরকার সেই কাজেই ব্যস্ত, সাথে আছে কাজের মেয়ে। শেহনাজ সরকার রান্না করতে ব্যস্ত হলেও মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। প্রতিদিন তিনি নামাজ আদায় করে নিচে নামার কিছুক্ষণ পরে পুষ্প নিজেও নিচে নেমে আসে, তারপর কলেজ যাওয়া পর্যন্ত শেহনাজ সরকারের শাড়ির আঁচল ধরে ঘুরঘুর করে; কিন্তু আজকে, এখন সকাল নয়টা বাজতে চলল, এখনো পুষ্প নিচে নামেনি, একবারও দেখা যায়নি তাকে!
ওনার এবার চিন্তা হতে লাগল—মেয়েটার শরীর খারাপ করেনি তো? তিনি জেনিফার সরকারকে রান্নাটা দেখতে বলে তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে ওপরে চলে গেলেন। প্রথমে গেলেন সিমরানের রুমে, কিন্তু কেউ নেই। ওয়াশরুমে, বারান্দায়—সব জায়গায় খুঁজে দেখলেন, কিন্তু না, নেই মেয়েটা! শেহনাজ সরকার গেস্টরুমে গিয়ে খোঁজ করলেন—হয়তো সিমরান আর শিফার সাথে গল্প করছে; না, সেখানেও নেই। সিমরানকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে সে পুষ্পকে দেখেনি।
শেহনাজ সরকার এবার একে একে সব জায়গায় খুঁজে দেখলেন। শেষে কোথাও না পেয়ে আর্যর রুমে গিয়ে দেখলেন, সেখানেও নেই! বিছানায় কম্বল এলোমেলো হয়ে আছে, তিনি সেটা ভাঁজ করে বিছানার একপাশে রাখলেন। হঠাৎ ওনার চোখ যায় পাশের ছোট টেবিলে—একটা নোটবুক আর কলম, হয়তো কিছু লিখছে। উনি সেটা হাতে নিতেই চোখে পড়ল কিছু লেখা, যা দেখে শেহনাজ সরকারের মুখটা থমথমে হয়ে গেল! উনি নোটবুকটা যেখান থেকে নিয়েছিলেন, সেখানেই রেখে দিলেন; তবে নিজেই গোটা অক্ষরে দুটো শব্দ যোগ করে দিলেন।
তারপর রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। নোটবুকে আর্য শেহনাজ সরকারের জন্য সতর্কবার্তা লিখে গেছিল—
– “আমি আমার বউকে নিয়ে আলাদা সংসার করতে গেলাম। ভুলেও খোঁজ করার চেষ্টা করো না, আম্মু। বউ যতদিন স্বামীভক্ত না হচ্ছে, ততদিন আর আসব না।”
সেটার নিচে শেহনাজ সরকার লিখেছেন—
– “সংসারের মানে জানো?”
উত্তরা থেকে বেশ দূরত্বে আশুলিয়ার ভেতরে অবস্থিত একটা দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়ি বেশ আধুনিকভাবেই তৈরি করা হয়েছে। বাড়িটা দেখে বোঝাই যায়, বেশ শৌখিন মানুষের পছন্দের বাড়ি। বাড়ির চারপাশে রকমারি বিদেশি ফুল—টিউলিপ, অর্কিড—বিভিন্ন ভ্যারাইটি ও রঙের। বাড়ির কাজ করা হয়েছে কালো মার্বেল দিয়ে, সাথে সাদা থাই গ্লাস; বাইরে থেকে কিছু দেখার উপায় না থাকলেও ভেতর থেকে বাইরের পুরো ভিউ দেখা যায়।
সেই দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়ির একটা বিশাল বিলাসবহুল রুম—সব দামি শোপিস দিয়ে সাজানো রুমটায় রয়েছে একটা বড় কিং সাইজ বেড। সেখানেই বেঘোরে ঘুমিয়ে আছে আর্যর ফ্লাওয়ার, আর আর্য একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘুমন্ত পুষ্পর দিকে। তার নিজের ঘুম কোথায় উধাও হয়েছে, সে তা বুঝতেই পারছে না।
আজকে ভোরের ঘটনা:
আর্যর উন্মুক্ত চওড়া বক্ষস্তলে বিড়ালছানার মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে পুষ্প। আর্য খুব আদরে আগলে রেখেছে তার ফ্লাওয়ারকে, দুই হাতে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে। আর্যর পুরো রাত কেটেছে নির্ঘুম, তার ফ্লাওয়ারকে দেখতে দেখতে! আর্যর হয়েছে আরেক জ্বালা—মেয়েটা কাছে থাকলেও ঘুম হয় না, দূরে থাকলেও ঘুম হয় না। এই যে গত তিন দিন সে মেয়েটার থেকে দূরে ছিল, ছটফট করেছে প্রতিমুহূর্তে শুধু মেয়েটাকে এক পলক দেখার জন্য, বুকে জড়িয়ে নেওয়ার জন্য; আর এখন এই ভাবনায় ঘুমাতে পারছে না যে, সে ঘুমালেই যদি তার ফ্লাওয়ার আবার দূরে চলে যায়! তাই তো আর্য দুই চোখের পাতা এক করছে না।
আর্য বালিশ হাতড়ে ফোন দেখল—ভোর পাঁচটা বাজে, একটু পরে আজান শুরু হবে। তার মা আবার তার বউকে নিয়ে টানাটানি শুরু করবেন, কিন্তু সে এবার এরকম কিছুই হতে দেবে না। এমনিতেই বউ তাকে ভয় পায়, দূরে থাকলে ভয় কাটবে কী করে? ভয় না কাটলে বউ তার কাছে আসবে না, সবসময় দূরে দূরে থাকবে, যেটা তার সহ্য হয় না। আর্য কিছু একটা ভেবে পুষ্পকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে উঠে পাশ থেকে টি-শার্ট পরে নিল। মাঝরাতে এসি’র ঠান্ডায় মেয়েটা কাঁপে, তাই এসি’র টেম্পারেচার বাড়িয়ে দেয়; এতে আর্য গরমে ঘেমে যায়, তাই তো টি-শার্ট খুলে উদাম গায়ে শুয়ে ছিল। আর্য টি-শার্ট পরে ক্যাবিনেট থেকে গাড়ির চাবি, ক্রেডিট কার্ড—সব গুছিয়ে প্যান্টের পকেটে পুরল। তারপর এগিয়ে এসে ড্রয়ার থেকে একটা নোটবুক বের করে কিছু লিখে, পুষ্পকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
ফোনে মেসেজের নোটিফিকেশনের আওয়াজে আর্য নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। ফোন হাতে নিয়ে যেই না মেসেজটা ওপেন করল, অমনি আর্যর মুখের আদল পরিবর্তন হতে শুরু করল! চোয়াল শক্ত, চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ—যাতে হিংস্রতা উপচে পড়ছে। সে নিজের চোখ শক্ত করে বন্ধ করে, সাথে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এল, সাথে সাথে হাতের শক্ত পেশি ফুলে উঠে। গায়ে শার্ট থাকলে হয়তো ছিঁড়ে বেরিয়ে আসত, কিন্তু শর্ট হাতা টি-শার্ট হওয়ায় উন্মুক্ত পেশিগুলো ফুলে উঠেছে, দেখতে আকর্ষণীয়ও লাগছে। আর্য বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। চোখ খুলে ঘুমন্ত পুষ্পর দিকে তাকাতেই চোখের হিংস্রতা যেন শিথিল হতে লাগল। আর্য নিচু হয়ে পুষ্পর কপালে নিজের অধরজোড়া চেপে ধরে দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। নিজের ভেতরের পরিবর্তন আর্য লক্ষ্য করতে পারে—এই যে তার রাগ উঠছিল, কিন্তু মেয়েটার ঘুমন্ত চেহারায় নজর পড়তেই রাগ যেন পানির মতো গলতে শুরু করেছে!
আর্য রমণীর ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজের মুখ রমণীর কানের কাছে নিয়ে গিয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল—
– “আই লাইক দিস ফিলিংস! তোমায় ঘিরে আমার সমস্ত অনুভূতি অন্যরকম। আমার পছন্দ এই অনুভূতি, যা তুমি কাছে থাকলে হয়। তোমার দূরত্বে যেই অনুভূতি কাজ করে, সেটা ভীষণ বাজে! দ্বিতীয়বার সেই অনুভূতির সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই না। আমি সারাজীবন তোমার কাছে থাকার অনুভূতির সাথেই পরিচিত হতে চাই, নো আদার এলস।”
একটু থেমে আর্য পুষ্পর কপালে চুমু দিয়ে আবার বিড়বিড় করে বলল—
– “আই উইল বি ব্যাক সুন।”
কথাটা বলে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। পুষ্পকে ভালোভাবে কম্বল জড়িয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। চেহারার কোমলতা ইতিমধ্যে গায়েব হয়ে গেছে, সেখানে এসে ভর করেছে অদ্ভুত ঠান্ডা স্থিরতা, চোয়ালে এসেছে কঠোরতা। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে অদ্ভুত বাঁকা হাসি—কে জানে এই হাসি কার ওপর গিয়ে পড়ে!
একটা নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে নিশি। বারবার এদিক-ওদিক চারপাশে তাকাচ্ছে, হয়তো কারো অপেক্ষায় প্রহর গুনছে; মুখে বিন্দু বিন্দু ঘামের উপস্থিতি, কোনো কারণে সে বেশ ভয়ে আছে! ভয় পাওয়ারই কথা—সরকার বাড়ি থেকে আজকে সবার চলে যাওয়ার কথা, তাই সবাই খেতে বসেছিল। সেখানে সবার সাথে নিশিকেও খেতে বলেছিল, কিন্তু খাওয়ার মাঝপথে নিশির ফোনে আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ আসে। সেটা দেখে রীতিমতো ভয়ে ঘামতে শুরু করে সে! মেসেজটা ছিল কিছুটা এরকম—
– “তুমি কী কী করেছ, আমি সব জানি; আমার কাছে সব প্রমাণ আছে। যদি না চাও প্রমাণগুলো পুলিশের হাতে না পড়ুক, তাহলে এই জায়গায় চলে আসবে আধা ঘণ্টার মধ্যে।”
মেসেজটা পড়ে খাওয়ার মাঝপথে উঠে পড়ে সে, জরুরি কাজ আছে বলে সরকার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। তারপর থেকেই এখানে দাঁড়িয়ে আছে টেনশনে, এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছে কে আসছে। কিন্তু উল্টো দিক দিয়ে তীব্র গতিতে একটা কালো মার্সিডিজ গাড়ি যে তার দিকে এগিয়ে আসছে, সেটা নিশি খেয়াল করল না। নিশি যতক্ষণে খেয়াল করে, তার আগেই গাড়ির তীব্র ধাক্কায় গিয়ে পড়ে পাকা ইটের রাস্তায়! মুহূর্তেই মাথা ফেটে রক্তে লাল হয়ে গেল পুরো রাস্তা। নিশি বুঝতে পারল না তার সাথে কী হয়েছে, চোখ দুটো নিভু নিভু হয়ে আসছে। চোখের পাতা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগে, সেই গাড়িটা আবার ঘুরে ফিরে এল। গাড়ির ভেতর থেকে নেমে এল আর্য! আর্যকে হয়তো এই মুহূর্তে এখানে আশা করেনি নিশি, তবে তার মনে আশার আলো জ্বলে উঠল—আর্য তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে! সে ভাঙা গলায় ডাকল—
– “আ…আর্য!”
তবে আর্যর চেহারায় কোনো সহানুভূতি প্রকাশ পেল না। সে এগিয়ে এসে নিশির ছিলে যাওয়া হাতের ওপর নিজের বুটজুতো পরা পা দিয়ে চেপে বসল! সাথে সাথে নিশি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল; চিৎকার করলেও বেশি জোরে আওয়াজ হলো না, তবে ব্যথায় গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগল, চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ে রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে। এতেও যেন আর্যর মনে কোনো দয়া কাজ করল না। সে পায়ের চাপ আরও বাড়াতে লাগল, দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
– “এই হাত দিয়েই তো আমার ফ্লাওয়ারের সাথে ইভানের ছবি তুলেছিলি, তাই না? যার সামনে পর্যন্ত আমি ওকে যেতে দিই না, তুই আর তোর ওই বুড়ি দাদি মিলে আমার ফ্লাওয়ারকে ধাক্কা দিয়ে ওর বুকেই ফেললি কেন? এই, তোর একটুও ভয় করেনি আমি জানতে পারলে কী করব? বারবার সতর্ক করেছি, আমার ফ্লাওয়ারের থেকে দূরে থাকবি, দূরে থাকবি; কিন্তু তুই শুনলি না! তোর তো মরার শখ জেগেছিল, এবার মর!”
আর্যর কথা শুনে নিশি কী বলবে বুঝতে পারছে না। এই একটা কারণে আর্য তাকে মারতে দুবারও ভাবছে না! এত ভালোবাসে ওই মেয়েকে এই আর্য? অথচ নিশি তার জন্য কী না করল! ভার্সিটিতে কোনো মেয়েকে আর্যর আশেপাশে আসতে দিত না সে। আর্যর কোনো কিছু প্রয়োজন পড়লে নিশি নিজের ক্লাস মিস দিয়ে হলেও আগে আর্যর প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিত। আবার ভাবল, মনে রাখবে কেন? আর্য তো কোনোদিন তাকে বলেনি তার জন্য কিছু করতে; উল্টো সে নিজে থেকে কিছু করলে আর্য বিরক্ত হতো। নিশির ভাবনার সুতো ছিঁড়ল আর্যর কথায়—
– “একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো—তোর ওই সস্তা ট্রিকস প্লে করে আমার ফ্লাওয়ারকে কোনোদিন আমার থেকে আলাদা করতে পারবি না, এই জীবনে তো নয়!”
– “আর্য, প্লিজ আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো।”
নিশির কথা শুনে আর্যর ঠোঁটে ফুটে উঠল ক্রুর হাসি। বড় নিষ্ঠুরভাবে সে বলল—
– “যদি নিজের হাতে বাঁচানোরই হতো, তাহলে মারলাম কেন?”
– “আ…আর্য, পি…প্লিজ!”
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৭
নিশির কোনো কথাই কানে নিল না আর্য। নিশির হাতের ওপর থেকে নিজের পা সরিয়ে সে নিজের গাড়ির দিকে অগ্রসর হতে হতে বলল—
– “গো টু হেল! যদি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাস, তাহলে ইনফিউচার আমার ফ্লাওয়ারের ত্রিসীমানায় যেন তোকে না দেখি! যদি দেখেছি, তাহলে সেদিন পৃথিবীতে তোর শেষ দিন হবে, মাইন্ড ইট..!”
