Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫
রুপা

ইভান আর্যকে সরকার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে থাকায় সে আহনাফকে কল করে আর্যকে ভেতরে নিয়ে যেতে বলে। আর্য নিজের পায়ে হেঁটে যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। আহনাফ এসে আর্যকে ওর রুমের দরজার সামনে দিয়ে নিজের রুমে চলে যায়; ভেতরে পুষ্প কী অবস্থায় আছে, তাই সে আর ঘরের ভেতরে ঢোকেনি।
আর্য টলতে টলতে রুমে ঢুকে খাটের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ পায়ে কিছু একটা বাধা পাওয়ায় সে পড়ে যেতে যেতেও নিজেকে সামলে নিল। আধো-বোজা চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখল—পুষ্প মেঝেতে শুয়ে আছে। সেটা দেখে আর্য আরও বিরক্ত হলো। সে পা দিয়ে যেন কোনো আবর্জনা সরিয়ে দিচ্ছে, ঠিক সেভাবে পুষ্পকে একপাশে ঠেলে দিয়ে খাটে গিয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়ল।

ঘুমন্ত পুষ্প আর্যর পায়ের ধাক্কায় জেগে গেল। সে উঠে দেখল আর্য খাটে এলোমেলোভাবে শুয়ে আছে। পুষ্প উঠে আর্যর জুতো জোড়া খুলে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখল। তারপর অনেক কষ্টে তাকে টেনেটুনে বিছানায় সোজা করে শুইয়ে দিল। নিজে আবার মেঝেতে শুয়ে পড়তেই হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল পুষ্প। মুখ চেপে ধরে নিজের কান্নার আওয়াজ আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করল সে। কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে প্রয়াত বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠল—
– “তোমরা যাওয়ার সময় আমাকে কেন সাথে নিয়ে গেলে না আব্বু-আম্মু? আল্লাহকে বলো না, তোমাদের কাছে আমাকেও যেন নিয়ে যান! আমার আর ভালো লাগছে না। আমি তোমার কোলে মাথা রেখে শুতে চাই আম্মু… আমার জন্য ফুফুমণির সাথে সরকার সাহেবের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে।”
কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে পুষ্প।

প্রতিদিনের মতো আজানের সুমধুর ধ্বনি কানে আসতেই পুষ্প উঠে অজু করে নামাজ আদায় করে নিল। তারপর আর্যর প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে রাখল। রান্নাঘরে গিয়ে কফি বানিয়ে রুমে এনে সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল সে। আর্য তার জিনিসে হাত দিতে কড়াভাবে বারণ করেছে ঠিকই, কিন্তু শেহনাজ সরকার পুষ্পকে বারবার বলেছেন আর্যর সব জিনিস যেন পুষ্পই গুছিয়ে রাখে। তাই পুষ্প আর্যর কটু কথা আর ধমক শুনেও বারবার তার সবকিছু পরিপাটি করে রাখে।
সকালে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাড়ির সব পুরুষেরা যে যার কাজে বেরিয়ে গেছে। শুধু আর্য এখনো রুম থেকে বের হয়নি। রাতে অতিরিক্ত ড্রিঙ্ক করার ফলে মাথা ব্যথায় কাতরাচ্ছে সে। তবুও উঠে ফ্রেশ হয়ে যখন দেখল তার কাপড়গুলো সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা, তখন রাগে তার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে বিড়বিড় করে উঠল— “এই মেয়েকে বারণ করলেও শোনে না, ধমক দিলেও লাভ হয় না, এমনকি মারলেও সোজা হয় না! একটা মেয়ে এমন কীভাবে হতে পারে? কোনো কথাই কি গায়ে লাগে না?” সে বিরক্ত হয়ে পুষ্পর রাখা শার্ট-প্যান্ট ছুড়ে ফেলে আলমারি থেকে অন্য একটা পোশাক বের করে পরে নিচে নেমে গেল।
আর্যকে দেখে জেনিফার সরকার নাস্তা এগিয়ে দিলেন। আর্য চুপচাপ খাওয়া শুরু করল। এর মধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে শেহনাজ সরকার আর পুষ্প নেমে এল। শেহনাজ সরকার পুষ্পকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে নিজে তার কলেজের ব্যাগে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না, তা দেখে গুছিয়ে দিলেন।
পুষ্পর মাথায় মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন—

– “পুষ্প মা, কলেজে তুই তো কাউকে চিনিস না, তাই একদম সাবধানে থাকবি। কোথাও একা একা যাবি না। কলেজ ছুটি হওয়ার পর গেটে দাঁড়িয়ে থাকবি; আমি, নয়তো আর্যর বাবা, কিংবা বাড়ির কেউ গিয়ে তোকে নিয়ে আসবে। কারো সাথে নিজে থেকে ঝামেলা করবি না, তবে কেউ ঝামেলা করতে চাইলে ছেড়েও দিবি না। নিজের অধিকার সবসময় আদায় করে নিবি। কেউ তোকে ইট মারলে তুই পাটকেল মারবি, পরে কোনো ঝামেলা হলে আমি আছি!”
শেহনাজ সরকারের কথা শুনে জেনিফার সরকার আর আর্য দুজনেই খুকখুক করে কেশে উঠল। জেনিফার সরকার মনে মনে ভাবছেন— ‘এ কেমন শাশুড়ি! যে নিজের ছেলের বউকে মারামারি করার জন্য উসকে দিচ্ছে আর বলছে ঝামেলা হলে সে আছে!’

ওদিকে আর্য ভাবছে অন্য কিছু। তার মনে হলো, মা কি কোনোভাবে তাকে উদ্দেশ্য করেই কথাটা বললেন? কারণ এই বাড়িতে সে ছাড়া পুষ্পর সাথে আর কেউ খারাপ ব্যবহার করে না, গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা! প্রবাদ আছে না— “ঠাকুরঘরে কে, রে? আমি তো কলা খাইনি!” নিজে অন্যায় করেছে বলেই তার মনে এই খটকা লাগল। মায়ের এমন আদিখ্যেতা আর কথা শুনে আর্য মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হলো— ‘অসহ্য! এই সামান্য মেয়েটাকে নিয়ে এত মাতামাতি কিসের?’ তবুও সে নাস্তার টেবিল থেকে নড়ল না।
শেহনাজ সরকার পেছনে আর্য আর জেনিফার সরকারকে খুকখুক করে কাশতে দেখে বিরক্ত হয়ে বললেন—
– “এভাবে যক্ষ্মা রোগীর মতো না কেশে, কফ সিরাপ এনে খা, না হলে পানি খেয়ে নে!”
শেহনাজ সরকারের ধমক শুনে দুজনেই চুপ হয়ে গেল। শেহনাজ সরকার আবার পুষ্পর দিকে তাকিয়ে বললেন—
– “খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করবি। তোকে অনেক বড় হতে হবে—যাতে কেউ চাইলেই তোকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে না পারে। হাজার চেষ্টা করেও যেন কেউ তোর নাগাল না পায়। আমি যতদিন বেঁচে আছি তোকে আগলে রাখব; আর আমি না থাকলেও তুই যেন নিজেই নিজেকে আগলে রাখতে পারিস, তোকে আমি সেভাবেই তৈরি করব। কারণ, যার ভরসায় তোকে আমি এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম, সে নিজেই তো চলতে পারে না—অন্যের কাঁধে ভর দেওয়া ছাড়া! তাই তোকে শক্ত হতে হবে, স্বাবলম্বী হতে হবে। নিজের পায়ে এমনভাবে দাঁড়াবি, যেন আমি না থাকলেও কেউ তোর দিকে আঙুল তুলে কথা বলার সাহস না পায়।”

শেহনাজ সরকারের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না পুষ্প। সে শুধু বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে সায় জানাল। শেহনাজ সরকার নিজের কেসের কিছু জরুরি ফাইল আর পুষ্পর ব্যাগ এক হাতে নিলেন, আর অন্য হাতে পুষ্পর হাত ধরে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
পুষ্পর পরনে আজ সাদা জর্জেটের লং গাউন, সাথে ম্যাচিং করা সাদা হিজাব। এখনো কলেজের ইউনিফর্ম রেডি না হওয়ায় সে এই সাধারণ পোশাকেই যাচ্ছে। আর শেহনাজ সরকারের পরনে কালো পাড়ের সাদা শাড়ি, যা পেশাদার আইনজীবীরা পরে থাকেন। দুজনকে পাশাপাশি দেখে ঠিক যেন মা-মেয়ে মনে হচ্ছে!
এতক্ষণ ধরে মায়ের বলা প্রতিটি কথাই শুনেছে আর্য। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, তাকে উদ্দেশ্য করেই তাঁর মা এই তির্যক কথাগুলো বলেছেন। তবে এতে আর্যর মনে খুব একটা ফারাক পড়ল না। সে নির্বিকার মুখে হাত ধুয়ে টেবিল থেকে উঠে নিজের রুমে চলে গেল।

পুষ্প এসএসসিতে খুব ভালো রেজাল্ট করেছিল। মাত্র অল্প কিছু পয়েন্টের জন্য গোল্ডেন এ-প্লাস পায়নি। কিন্তু এত ভালো রেজাল্ট করার পরেও পুষ্পর চাচি তার পড়াশোনা বন্ধ করে দেন; সাফ জানিয়ে দেন, মেয়ে মানুষের আর পড়াশোনা করার দরকার নেই। ঠিক সেই কঠিন সময়েই শেহনাজ সরকার পুষ্পর সাথে আর্যর বিয়ে দিয়ে তাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসেন। আর এখন তিনি পুষ্পকে কলেজের একাদশ শ্রেণীতে মানবিক বিভাগে (আর্টস) ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন।
পুষ্প নিজের ক্লাসরুমে বসে আছে। এখানে সে কাউকে চেনে না, তাই এক কোণে চুপচাপ জড়সড় হয়ে বসে রইল। পুষ্পকে এভাবে একা ও নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখে একটা মেয়ে এগিয়ে এসে বলল—
– “কী ব্যাপার, এভাবে চুপচাপ বসে আছো কেন? সবাই দেখো কারো না কারো সাথে কথা বলছে, গল্প করছে, পরিচিত হচ্ছে; আর তুমি একা একা গুটিসুটি মেরে বসে আছো যে!”
হঠাৎ একটা অচেনা মেয়ের কণ্ঠ শুনে পুষ্প মাথা তুলে তাকাল। মেয়েটার গায়ের রঙ শ্যামলা, উচ্চতা প্রায় পুষ্পর মতোই। সে মিষ্টি একটা হাসি ঠোঁটে নিয়ে পুষ্পর উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। অন্য সময় হলে এমন পরিস্থিতিতে পুষ্পর ভীষণ ভয় করত, কিন্তু এই মেয়েটার নিষ্পাপ মুখটা দেখে কেন যেন তার মনে কোনো ভয়ের উদ্রেক হলো না।

ঠিক এই মুহূর্তে পুষ্পর মনে পড়ে গেল কলেজের গেটে ঢোকার আগে ফুফুমণির বলা সেই মূল্যবান কথাগুলো—
– “পুষ্প, তুই কলেজে একদম নতুন। এখানে মানুষ চিনতে তোর ভুল হতেই পারে। কিন্তু একটা কথা সবসময় মনে রাখবি—কেউ তোকে কষ্ট দিতে তোর কাছে আসবে, আবার কেউ তোকে হাসাতে তোর কাছে আসবে। সবাইকে হুট করে সহজে বিশ্বাস করবি না। তবে কেউ যদি নিজে থেকে তোর সাথে কথা বলতে আসে, আর তোর মন যদি কোনো খারাপ সংকেত না দেয়, তোর মন যদি বলে ওর সাথে কথা বলা যায়—তবে তুই নির্দ্বিধায় তার সাথে কথা বলবি। পৃথিবীতে সবাই তো আর খারাপ না রে মা! কেউ ভালো, কেউ খারাপ; তোকেই চিনে নিতে হবে কে কেমন। কে স্বার্থের জন্য মিশছে আর কে তোকে প্রকৃত বন্ধু ভেবে হাসানোর জন্য মিশছে, সেটা তোকে বুঝতে হবে। সবসময় নিজের খেয়াল রাখবি, অন্যের চেয়ে নিজেকে বেশি প্রাধান্য দিবি। তোর যদি মনে হয় তুই নিজের জায়গায় ঠিক আছিস, তবে গোটা পৃথিবী তোর বিরুদ্ধে গেলেও কিচ্ছু যায়-আসে না। মনে রাখবি, তোর পাশে সবসময় তোর এই ফুফুমণি আছে। এবার যা মা, দেখে-শুনে ভালো মানুষ বুঝে বন্ধু বানাবি। কারণ একা একা কলেজ লাইফ সুন্দর হয় না, একটা ভালো বন্ধুর বড্ড প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু সব বন্ধু তো আর সত্যিকারের বন্ধু হয় না, কেউ কেউ বন্ধুর বেশে শত্রুও হয়!”

পুষ্প যখন ফুফুমণির ভাবনায় ডুবে ছিল, তখন মেয়েটা আবারও বলে উঠল—
– “কী হলো? আমার সাথে কথা বলবে না? তুমি এত ফর্সা আর আমি শ্যামলা, এজন্যই কি আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না?”
মেয়েটার এমন কথায় পুষ্প একদম হকচকিয়ে গেল! সে তাড়াহুড়ো করে দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল—
– “না, না! ওমা, এমন কেন হবে?”
– “তাহলে কথা বলছ না কেন?”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪

পুষ্প এবার মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল—
– “আসলে আমি পুষ্প। এখানে একদম নতুন তো, তাই কারো সাথে হুট করে মিশতে পারি না। তোমার নাম কী?”
মেয়েটা এবার একগাল হেসে পুষ্পর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
– “আমি সারা। সারা ইসলাম।”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here