Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৮

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৮

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৮
ফাহিমা ইসলাম

রাত্রিকাল বিদায় নিয়ে ধরণী আবারও নতুন আলো সেজে উঠেছে রোজকার নিয়মে। নতুন করে বেঁচে উঠেছে সে, পক্ষীরাজরা নীড় ছেড়ে দূর আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেরাচ্ছে। সকাল থেকেই তূর্ণা জবা সিকদারের সঙ্গে বের হয়েছে। তূর্ণা ভয়ে আঁটোসাঁটো হয়ে জবা সিকদারের পাশে বসে আছে চুপচাপ। তার কোলে ছোট্ট রোদেলা ঘুম এসে পরেছে, কোথায় যাচ্ছে কিছুই জানে না তূর্ণা। এগারোটার দিকে তাকে তৈরি করে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে তারা; তূর্ণা প্রথমে যেতে চাইছিলো না, কিন্তু জবা সিকদারের শান্ত স্বরে বলা আদেশ মান্য না করে উপায় ছিল না। কিছু দূর যেতেই অতি চেনা এক বাড়ির সামনে এসে গাড়িটা থামলো, গাড়ির ভিতর থেকে চেনা জায়গাটা দেখতে পেয়ে তূর্ণার সারা মুখশ্রীতে কালবৈশাখী ঝড় নেমে এলো৷ ভয়ার্ত চোখে পাশে বসা জবা সিকদারের দিকে চাইলো, জবা সিকদারের মুখশ্রীতে কোনো অভিভক্তি প্রকাশ পেলো না। গাড়ি থেকে বের হয়ে তিনি তূর্ণাকে নামার জন্য বলে। তূর্ণা জবা সিকদারের দিকে তাকিয়ে ভেজা,আকুতির স্বরে বলে-

“ আমি যাবো না পঁচা শ্বাশুড়ি! ওইখানে গেলে মা অনেক মা*রবে। তুমি দয়া করে আমাকে বরের বাড়ি নিয়ে চল! আমি আর তোমার কথার অবাধ্য হবো না। তাও আমাকে এখানে নিয়ে যেওনা।”
জবা সিকদার শক্ত চোখে তাকালেন এবার তূর্ণার দিকে। কণ্ঠে হালকা গাম্ভীর্য টেনে তিনি বলেন-
“ তাড়াতাড়ি নেমে এসো বলছি, নাহলে এখানে রেখে চলে যাবো তোমাকে। বের হও, আমি আছি এখানে!”
তূর্ণা বার বার না করছিল কিন্তু জবা সিকদার আর একবার শক্ত গলায় বলতেই; তূর্ণা ভয়ে ভয়ে নেমে আসে গাড়ি থেকে। জবা সিকদারের কোলে ঘুমন্ত রোদেলা আর তার পিছনে তূর্ণা। দরজায় বেল বাজাতেই কিছু সময় পর দরজাটা খুলে দেয় রূপা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জবা সিকদার আর তূর্ণাকে দেখে বিস্মিত নয়নে চেয়ে থাকে সেদিকে। এইখানে, এইসময় তাদেরকে একদমই আশা করেনি সে। তূর্ণাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতেই আরও অবাক হয়ে রূপা, আগের তূর্ণা আর এই তূর্ণার মাঝে আকাশ-পাতাল তফাৎ! আগের তূর্ণার মায়াবী মুখশ্রীটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে থাকতো। কিন্তু এখনকার তূর্ণাকে দেখে সেটা মনে হচ্ছে না, শরীরের জড়ানো দামি পোশাক। সঙ্গে কানে ছোট্ট ডায়মন্ডের ইয়ারিং!
এই একটা মাসের ব্যবধানে এতটা পরিবর্তন হয়ে গেছে তূর্ণা জীবন! জবা সিকদার রূপাকে দেখতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, সে রূপার দিকে না তাকিয়েই শান্ত,গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে-

“ ভিতরে আসতে দিবে নাকি দাঁড় করিয়ে রাখবে?”
জবা সিকদাররে কথায় রূপা তার হুসে আসে, তাই সে তড়িঘড়ি করে দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ায়। এইদিকে রূপাকে দেখে তূর্ণা আরও ছিটিয়ে যায়; দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। জবা সিকদার তূর্ণাকে নিয়েই বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলেন। সেলিমা খাতুন বসে ছিলেন সোফায়। হঠাৎ এখানে জবা সিকদারের আগমন দেখে তিনিও একই ভাবে বিস্মিত হয়ে পরেন; বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। জবা সিকদারের দিকে এগিয়ে এসে বলেন-
“ আরে আপা আপনি! বসুন বসুন। আজকে হঠাৎ আমাদের বাড়িতে যে?”
জবা সিকদার কোনে ভনিতা ছাড়াই শান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে-

“ কিছু পাওয়া জিনিস রয়ে গেছে এখানে। সেটাই নিতে এসেছি।”
সেলিমা খাতুন ব্যস্ত হয়ে জবা সিকদারকে বসতে বললেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার পাশে থাকা তূর্ণাকে দেখে নিলেন, তূর্ণা চোরা দৃষ্টিতে সেলিমা খাতুন আর রূপাকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। জবা সিকদার তূর্ণাকে নিয়ে বসে পরলেন। এইদিকে রূপা এখনো অবাক হয়ে তূর্ণার এমন বিপুল পরিবর্তনের দিকে চেয়ে রইছে, ভাগ্য কাকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সেটা সে দেখছে, এই জায়গাটাই তো তার হওয়ার কথা ছিল! এত আদর-যত্ন, সবকিছুই তো তার হত। যদি সে সেদিন না পালাতো৷ নিজের কর্মের প্রতি বড্ড আফসোস হচ্ছে তার। সেলিমা খাতুন ইশারায় রূপাকে এদিকে এসে বসতে বললেন। যদি কোনো ভাবে আবার এদের মনটা গলানো যায়! রূপা সেলিমা খাতুনের কথা মত এদিকটাতে এগিয়ে এলো। সেলিমা খাতুন মুখে হাসি টেনে বলে ওঠে-

“ একবার ফোন করতেন আজকে যে আসবেন। তাহলে আগ থেকেই আপ্যায়ন করার জন্য সবকিছু করে রাখতাম।”
সেলিমা খাতুনের কথা শুনে জবা সিকদার সেই বিষয় নিয়ে কোনো কথা বললো না। তিনি একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা রূপাকে দেখে নিলেন। তারপর সেলিমা খাতুনের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে ওঠে-
“ তার কোনো দরকার হবে, একটা কাজে এসেছি। সেটা হলেই এখনোই বেরিয়ে পরবে।”
জবা সিকদারের কথায় কিছুটা খুশি হলেন সেলিমা খাতুন। তূর্ণাকে সঙ্গে এনেছে, এরমানে তূর্ণাকে এখানে রেখে যাওয়ার জন্য এসেছে? তারমানে এটাই সুযোগ রূপার সঙ্গে আবারও রৌদ্রিকের বিয়ের বিষয়টা নিয়ে কথা বলার। সেলিমা খাতুন হাসি মুখে বলে ওঠেন-

“ আরে আপা কাজ তো হবেই। এত তাড়াতাড়ি আর ছাড়ছি না, একবারে খেয়-দেয়ে তবেই আপনাকে আজকে ছাড়বো।”
“ তার দরকার হবে না, এত কষ্ট করতে হবে না আপনাদের।”
সেলিমা খাতুন বোধহয় একটু সাহস পেলেন। মাথা নিচু করে হাত কচলাতে থাকা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে; তাচ্ছিল্য ভাবে বলে ওঠে-
“ আমি জানতাম আপা এই মেয়েকে আপনারা ফিরেই দিবেন। একটা পাগলের সঙ্গে তো আর সারাজীবন কেউ কাটাতে পারে না। আমিও মানা করেছিলাম রূপার বাবাকে এটা না করতে, কিন্তু তখন দুই পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে যা এসেছে তাই করে বসেছিলেন তিনি।”
“ আপনাকে কে বললো আমি আমার ছেলের বউকে ফিরিয়ে দিতে এসেছি? ”তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে মারলেন তিনি। আবারও বলেন-

“ আর ওর চিকিৎসা চলছে আল্লাহ চাইলে সুস্থও হবে একদিন।”
তার কথায় কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে গেলেন সেলিমা খাতুন। নিজের করা বোকামিতে নিজেই ফেঁসে গেলো কেমন! কে বলেছিল আগ বাড়িয়ে বেশি কথা বলতে। সেলিমা খাতুন কোনো রকমে হেসে বলে ওঠে-
“ না মানে আপনি তূর্ণাকে নিয়ে হঠাৎ এলেন তাই আরকি!”
“ কেনো তূর্ণা কি ওর বাবার বাড়িতে আসতে পারবে না? সে যাইহোক যেটা বলার জন্য আসেছিলাম। সেটা বলি।”
রপা আর সেলিমা খাতুন দু’জনই বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠলেন জবা সিকদারের কথা শোনার জন্য। জবা সিকদার তূর্ণার দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে বলে ওঠে-

“ বিয়ের সময় আমাদের তরফ থেকে বউয়ের জন্য প্রায় পাঁচ ভরির বেশি স্বর্ণ দেওয়া হয়েছিল। রূপার সঙ্গে তখন বিয়েটা ঠিক হয়েছিল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেটা হয়নি। আর তূর্ণা বিয়ে করে যাওয়ার পর ওর কাছে সেই গায়নাগুলো পাইনি। তাই সেইগুলোই নিতে এসেছি, হিসেব করে দেখলে ওইগুলো তূর্ণার অধিকার। ও না বুঝুক কিন্তু তাই বলে আমার ছেলের বউয়ের জিনিস এইভাবে ফেলে দিতে পারি না। তাই সেইগুলোই নিতে এসেছি।”
জবা সিকদারের কথা গুলে যেনো বজ্রপাতের মত শুনালো তাদের নিকট। বিয়ের সময় বেশ অনেকগুলে স্বর্ণের গয়না দিয়েছিল সিকদার বাড়ি থেকে। আরও দিতো, তূর্ণাকে যখন রূপার জায়গায় বসানো হয়। তখন সেলিমা খাতুন ইচ্ছে করেই সেই গয়না গুলো আর ফেরত দেননি। এতোদিন পর আবারও গয়না গুলো এইভাবে চাইবে; সেটা ভাবতে পারেননি তিনি। কোনো রকমের হাসার চেষ্টা করে তিনি বলেন-
“ আসলে আপা হয়েছে কি আমার ঠিক মনে ছিলনা। এতকিছু হয়ে গেলো তাই আরকি!”
“ এতদিনেও মনে পরেনি আপনাদের? যাক গে তূর্ণার প্রাপ্য জিনিস নিতে এসেছি, যেহেতু ওইগুলোর ওর তাই ওর জিনিস ওর কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই উত্তম।”

তূর্ণা তাদের কথার কিছু বুঝলো না, শুধু নীরব দর্শক হয়ে বসে আছে জবা সিকদারের পাশে। জবা সিকদারের কথা শুনে মা-মেয়ে দু’জনই হতবিহ্বল! জবা সিকদার এইভাবে সরাসরি চাইবে ভাবতে পারেননি। সেলিমা খাতুন কি বলবে বুঝতে পারছেন না, তারপরও শেষ বারের মত জবা সিকদারের দিকে তাকিয়ে সাহস করে বলে-
“ আপা একটা কথা বলি, রূপা যা করেছে সেটা কি ভুলে সবকিছু নতুন করে শুরু করা যায় না? আসলে ও ছেলের দ্বিতীয় বউ হবে এটা মেনে নিতে পারেনি তাই ভুলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এখন বুঝতে পারছে ওর ভুলটা, যদি ওকে আর একটা সুযোগ দিতেন।”

সেলিমা খাতুনের কথা শুনে জবা সিকদারের মুখশ্রী কিছুটা শক্ত হয়ে এলো। বড় একটা নিশ্বাস টেনে, শান্ত স্বরে বলে-
“ কি শুরু করার কথা বলছেন আপনি? আমরা কি বিয়ে ঠিক করার সময় জানাইনি আমার ছেলের দ্বিতীয় বিয়ে এটা? আপনাদের মতামত নিয়েই বিয়েটা ঠিক করা হয়েছিল। আপনাদের মেয়েকেও এই জন্য বার বার জিজ্ঞেস করা হয়েছে সে এই বিয়েতে রাজি কি-না! আপনারা বলেছেন সমস্যা নেই। তারপর বিয়ের দিন এমন কান্ড করলো আপনার মেয়ে। এতকিছুর পরও কি ঠিক করবো আমরা? বিয়েটা তূর্ণা সঙ্গে না হলেও পরবর্তীতে রূপাকে আর আমার ছেলের পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতাম না। আমার ছেলের একটা খুঁত আছে সেটা অস্বীকার করছিনা, তাই বলে আত্মসম্মানহীন নয় আমার ছেলে। আর সবচেয়ে বড় কথা তূর্ণাকে মেনে নিয়েছে আমার ছেলে, হোক সেটা আমার বিরুদ্ধে তাই বলে এই নয় যে আপনার মেয়েকে সুযোগ দিবো।”

সেলিমা খাতুন আর কথা বলার কিছু সুযোগ পেলেন না। তার মুখ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে, তিনি আর কথা না বলে উঠে গেলেন নিজের ঘরের দিকে। রূপা জবা সিকদারের কথা শোনার পর পরই চলে গেছে। এত অপমান সহ্য হচ্ছিল না তার, নিজেকে এই প্রথম তূর্ণার থেকে দূর্ভাগা মনে হলো। এতকাল ভেবে আসচ্ছে তূর্ণাই সবচেয়ে হতভাগা তবে সময় দেখিয়ে দিয়েছে, যার নিয়তিতে সুখ লিখা আছে সেটা একদিন না একদিন আসবেই। তূর্ণা এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, জবা সিকদারের কথাগুলো তার মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে। তবু তার ভয় কাটেনি, এইদিকে সবার কথার মাঝে রোদেলার ঘুমটা ছুটে গেছে। সদ্য ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার ফলে তার নেত্রদ্বয় ফুলে রয়েছে কিছুটা। কিছু সময় জবা সিকদারের বুকের সঙ্গে মিশে থেকে তূর্ণার কাছে যাওয়ার জন্য হাত বাড়ায়। তূর্ণা ভয়ে ভয়ে রোদেলাকে নিজের কাছে টেনে নিলে। রোদেলা অপরিচিত জায়গায় হওয়ায় চোখ ঘুরিয়ে সবটা দেখে নিয়ে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-

“ হামলা কুতায় মা?”
তূর্ণার বুঝতে সক্ষম হলো না। জবা সিকদার গম্ভীর ভাবেই রোদেলার কথার জবাব দিলেন-
“ বাহিরে এসেছি দাদুভাই।”
রোদেলা মুখ ঘুরিয়ে জবা সিকদারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ তাইলে এতছি? ”
“ হুম।”
“ পাতলে তাবু দিদু!”
“ না আজকে না, অন্যদিন যাবো পার্কে। এখন ভদ্র বাচ্চা হয়ে থাকো তো দিদুভাই।”
রোদেলা আর কথা বাড়ালো না। সে তূর্ণার বেনি করা চুল নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। রোদেলা তূর্ণার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে-
“ মা মুতু পেয়েতে! মুতু!”

তূর্ণার বেশকিছু সময় পর বুঝতে সক্ষম হলো রোদেলার কথা। এদিক-ওদিক তাকিয়ে রোদেলাকে কোলে নিয়ে উঠে পারলো। জবা সিকদার রোদেলার কথাটা শুনেছে তাই আর বারণ করলো না, তূর্ণা রোদেলাকে নিয়ে বাধরুমে চলে যায়। রোদেলাকে বাথরুম করিয়ে তূর্ণা চুপিচুপি রোদেলাকে নিয়ে নিজের ছোট্ট সেই আগের থাকার জায়গায় নিয়ে যায়। ভিতরে প্রবেশ করতেই ময়লায় আবৃত ছোট রুমখানি দেখতে পায়, মানুষ না আসায় জায়গাটা আরও ময়লা হয়ে গেছে। তূর্ণা তার ছোট শক্ত বিছানার উপর রোদেলাকে বসিয়ে দিলো। তারপর রোদেলাকে বলে ওঠে-
“ তোমাদের কাছে যাওয়ার আগে আমি এখানেই থাকতাম। জানো এখানে ঘুমাতে আমার খুব কষ্ট হত পুতুল। কি গরম লাগতো! দাঁড়াও তোমাকে আমি আমার পুতুল দেখাই। ”

বলোি তূর্ণা খাটের নিচে রাখা জিনিস থেকে একটা ছেঁড়া পুতুল বের করলো। কতদিন পর সে এই পুতুলটাকে পেলো, এটা তার পুতুল নয়। রূপার এটা যখন ছিঁড়ে ময়লাতে ফেলে দিয়েছিল। সেটা তখন তূর্ণা কুড়িয়ে নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছিল। যেগুলো আছে সবাই সাজিদ আর রূপার ব্যবহার করার জিনিস। যেগুলো লুকমান হোসেন তাদের এনে দিতো, আর দূর থেকেই তূর্ণা সেগুলো দেখতো। যখন যেগুলো খেলার অযোগ্য হয়ে পরতো তখন তারা ফেলে দিতো; আর সেইগুলোই তূর্ণা যত্নসহকারে তুলে নিজের কাছে আগলে রাখতো। পুতুলটা রোদেলাকে দেখিয়ে হাসি মুখে বলে-
“ তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দেখা পুতুল। আর ওর নাম ময়না, ও খুব ভালো। ওই শুধু আমার সঙ্গে থাকতো। এখন তো তুমি আছে আমার পুতুল।”
রোদেলা পুতুলটা হাতে নিলো, পুতুলের একটা হাত নেই। আবার মাথাও কাটা, বলতে গেলে নড়বড়ে একটা অবস্থা। রোদেলা সেটার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ পুতুর খাত নাই,খাত নাই! ( হাত)”
“ কি খাত নাই?”
তূর্ণা একে একে তার সব খেলনা দেখাতে থাকে। রোদেলা আর সে মিলে সবকিছু দেখছে, তূর্ণাও তাকে বলছে সে কখন কোন খেলার সঙ্গে খেলতো। সবচেয়ে ভালো বন্ধু কে ছিল এদের মধ্যে।

সেলিমা খাতুনের নিকট থেকে সকল গয়না নিয়ে জবা সিকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তূর্ণা ভদ্র মেয়ের মত চুপচাপ বসে আছে, সে তে ভেবেছিল জবা সিকদার তাকে সেখানে রেখে আসার জন্য এনেছে। জবা সিকদার পাশে বসা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ আজ থেকে এইগুলো তোমার, এইগুলো তোমার অধিকার। আমি খারাপ হই কিংবা ভালো কিন্তু আমার ছেলে আর নাতনিকে কোনোদিন কষ্ট দিও না। দোয়া করি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠ, আমার ছেলের হাত ধরে সারাজীবন কাটানোর উপযুক্ত হয়ে ওঠ। আজকে আমার কথা অর্থ না বুঝতে পারলেন, যেদিন বুঝ আসবে আমার কথাগুলো মনে করবে।”
বলেই তিনি আবারও শান্ত হয়ে যায়, তূর্ণা আসলেই কিছু বুঝেনি জবা সিকদারের কথা। তবে এতটুকুই বুঝলো যে সে যাতে তার বরকে কষ্ট না দেয়। কিন্তু সে কেনো বরকে কষ্ট দিতে যাবে? তার বর খুব ভালো! না চাইতেও তার জীবনটা কেমন পাল্টে দিচ্ছে। যা জীবনে চোখেও দেখেনি সেটাও তার নিকট এনে দিচ্ছে৷

দিনের আলো ফুরিয়ে নিশীথের আগমন ঘটেছে বহু আগেই। পক্ষীরাজরা গোধূলির লগ্নেই তাদের নীড়ের ফিরে গিয়েছে, কৃষ্ণবর্ণ নীলিমার বুক জুড়ে জ্বলজ্বল করছে মস্ত বড় একখান চন্দ্র। যার আলোতে মুখরিত হয়ে আছে চারিদিকটা! রাত্রির মানেই নীড়ে ফিরে আসার সময়, সেই নিয়ম ধরে রৌদ্রিকও নিজের চিরচেনা নীড়ে ফিরেছে কেবলই। কান্ত শরীর নিয়ে ঘরে প্রবেশ মাত্রই সামনের দৃশ্য দেখে তার পাদচারণ থমকে যায়! নির্লিপ্ত ভাবে চেয়ে রয় সেইদিকেই। তার ঘরে দুই রমণী লাল রঙের শাড়িতে আবৃত করে রেখেছে নিজেদের! একজন তার নিজের রক্ত, সোনার পুতুল আরেক জন তার জীবনে নতুন অতিথি! খোলা কেশরাশি গুলো দোল খাচ্ছে, মসৃণ ত্বকে নেই কোনো কৃত্রিম সাজসজ্জার ছোয়া। রৌদ্রিক ধীর পায়ে তাদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়ালো। রৌদ্রিকের উপস্থিতি দেখা মাত্রই ছোট্ট রোদেলা হাসিতে ভরিয়ে দেয় সারা রুম। রৌদ্রিকের দিকে নিষ্পাপ ভাবে হাসি দিয়ে বলে ওঠে-
“ পা..পাপা দেকু।”

রৌদ্রিক নিজের মেয়ের পানে চাইলো৷ ছোট্ট শরীরের শাড়ির জড়িয়ে আছে, সেদিন রোদেলার আবদারে অনেকগুলোই একদম ছোট্ট বাচ্চার শাড়ি বানিয়ে এনেছিল রাশেদুল সিকদার। সেগুলোর থেকে লাল রঙের থাকা শাড়িটা পরা রোদেলার গায়ে; রোদেলা হাত বাড়িয়ে রৌদ্রিকের কাছে যাওয়ার আবদার জানাতেই। রৌদ্রিক মেয়েকে কোলে তুলে নিলো, তার ঠিক সামনে দাড়ানো আর এক রমণী লাল রঙের শাড়িতে নিজেকে রাঙিয়ে রেখে। অথচ শাড়ির অবস্থা বেহাল! শাড়ির কুঁচি একটা হয়েছে তো অন্যটা হয়নি। এবড়োথেবড়ো হয়ে ফুলে আছে শাড়ি। তবুও এই রমণীর ওষ্ঠপুট থেকে নিষ্পাপ হাসিখানা সরে যায়নি, কি নির্মল,স্নিগ্ধ এই হাসি! রোদেলা হাত উঠিয়ে নিজের হাতে থাকা ছোট্ট চুড়িগুলো রৌদ্রিকের সামনে নাচিয়ে বলে ওঠে-
“ সাজু সাজু তলেতি পাপা! তালি পতেতি।”
রৌদ্রিক মেয়ের মায়াভরা,স্নিগ্ধ মুখশ্রীতে ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দেয় একে একে। ছোট্ট হাতে চুমু একে দেয়, রৌদ্রিকের এমন কাজে রোদেলা খিলখিল করে হেসে ওঠে। তার হাসিতে যেনো হেসে উঠলো স্বয়ং রৌদ্রিকও, তূর্ণার চকচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রৌদ্রিকের দিকে। রোদেলার মত তাকেও কিছু বলবে সে আশায়। রৌদ্রিক রোদেলার উদ্দেশ্যে বলে-

“ আমার ঘরে দু’টো চাঁদ নেমে এসেছে দেখি! মাশাল্লাহ! আমার মা’কে অনেক সুন্দর লাগছে। একদম লাল টুকটুক বউ বউ।”
রৌদ্রিকের কথা শুনে রোদেলা হাসতে হাসতে বলে-
“ মা ভউ মা ভউ!”
মেয়ের কথায় রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকায়। মেয়েটার তার দিকেই তাকিয়ে আছে, হয়তো এই আশা নিয়ে রোদেলার মত সে তাকে কিছু বলবে। রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ শাড়ি পরতে বলেছে কে? পিচ্চি থেকে বউ হতে চাও কেনো? আমার মেয়েও তোমাকে বউ বলে ডাকছে।”
রৌদ্রিকের কথায় তূর্ণা বোকা বোকা হয়ে উত্তর দেয়-
“ আমি তো বউ, আর আপনি আমার বর। তাই তো বউ সাজলাম, আমায় কেমন লাগছে বর?”
“ তুমি জানো বর-বউ কাকে বলে?”
“ হুম জানি তো, বর মানে আপনি। বর আসলে সব কষ্ট দূর হয়ে যায়, তাই তো আপনি আসার পর সব কষ্ট কেমন মিলিয়ে যাচ্ছে।”

তূর্ণা এমন উত্তরে কি জবাব দেওয়া উচিৎ সেটা সত্যি জানা নেই রৌদ্রিকের। সে রোদেলাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে হুট করেই তূর্ণা পায়ের কাছে বসে গেলো, হঠাৎ এমনটা করায় তূর্ণা কিছুই বুঝলো না। রৌদ্রিক অতি যত্নসহকারে প্রতিটা অগোছালো শাড়ির কুঁচি একে একে ঠিক করে দিচ্ছে। অগোছালো শাড়িটা বেশ কিছু সময় নিয়ে সেটা একদম গুছিয়ে ঠিক করে দিলো। তারপর আবারও ঠিক মত দাঁড়িয়ে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৭

“ বউ যখন সেজেছো একদম রৌদ্রিকের বউয়ের মত করে সাজো। অগোছালো আমার পছন্দ নয়, তাই গুছিয়ে আমার বউ করে নিলাম!”
রৌদ্রিকের এমন কথায় তূর্ণা লজ্জামাখা একটা হাসি দেয়। এই প্রথমবার রৌদ্রিক তূর্ণাকে “রৌদ্রিকের বউ” কথাটা বললো। কেমন যেনো আলাদা এক অনুভূতি হলো তূর্ণা অন্তস্তলে নাম জানা নেই এই অনুভূতির ; তবে নতুন এক অনুভূতির ছোঁয়া লেগেছে তার হৃদয়ে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৮ (২)