অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৪
ফাহিমা ইসলাম
সকালটা অস্বাভাবিক রকমের প্রশান্ত।
বহির্জগতের কোলাহল, প্রতিযোগিতা, স্বার্থপরতার নিরন্তর রণক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রৌদ্রিকের ছোট্ট সংসারটা যেন নিজস্ব এক নক্ষত্রমণ্ডল গড়ে তুলেছে। যেখানে সময়ের গতি কিছুটা ধীর, শব্দের তীব্রতা কিছুটা মৃদু, আর ভালোবাসার পরিমাপ কোনো প্রচলিত এককে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ কিছু জিনিসের যেমন পরিমাপ নিধারণ করা যায় না। কক্ষের নরম কার্পেটজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রোদেলার খেলনা। গোলাপি রঙের ছোট্ট রান্নাঘর, ভাঙা পুতুলে, রঙ পেন্সিলের বাক্স, আর অর্ধসমাপ্ত এক রাজপ্রাসাদ। যেটাকে রোদেলা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে “আমার ক্যাসেল” বলে ঘোষণা করে। সেই ক্যাসেলের ঠিক পাশে বসে আছে রৌদ্রিক।
যেকিনা নিজের সবকাজ উপেক্ষা করে সে এই মুহূর্তে নিবিষ্টচিত্তে এক ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার অভিনয় করছে। কারণ তার সামনে বসে আছে রোদেলা। আর রোদেলার আদেশ অমান্য করার সাহস পৃথিবীর কোনো মানুষের নেই।
“ পাপা, চা খাউ।”
গম্ভীর মুখে নির্দেশ দিলো মেয়েটা। রৌদ্রিকও সমান গাম্ভীর্য বজায় রেখে কাপটা হাতে নিলো।
“বাহ! রোদপাখির বানানো চা তো পৃথিবীর সেরা।”
রোদেলা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। সেই হাসির শব্দটুকু যেন সমগ্র গৃহের দেয়ালজুড়ে অদৃশ্য আলোকরেখা এঁকে দিচ্ছে। শিশুর হাসি সম্ভবত একমাত্র জিনিস, যার মধ্যে স্বর্গের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। সোফার একপাশে আধশোয়া হয়ে বসে আছে চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা তূর্ণা। গর্ভাবস্থার কারণে শরীর কিছুটা ভারী হয়ে উঠেছে, হাঁটাচলায় আগের মতো স্বচ্ছন্দতা নেই, মাঝেমধ্যে হঠাৎ করেই মাথা ঘুরে ওঠে, আবার কখনো অকারণ ক্লান্তি এসে ভর করে। কিন্তু আজকাল এসব কষ্টও তূর্ণার কাছে তেমন বড় কিছু বলে মনে হয় না।
কারণ তার চারপাশে যে মানুষ দুটো আছে, তারা প্রতিদিন তাকে বুঝিয়ে দেয়,সে একা নয়। একদমই নয়।
রৌদ্রিকের দৃষ্টি হঠাৎ করেই তূর্ণার দিকে গিয়ে থামলো।
এক মুহূর্তের মধ্যেই ভ্রু কুঁচকে গেলো তার।
“তুমি আবার পানি খাওনি, তাই না?”
তূর্ণা চোখ সরিয়ে নিলো। অপরাধী শিশুর মতো মুখভঙ্গি করলো। রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
এই মেয়েটা পৃথিবীর সবকিছু মনে রাখলেও
কিন্তু নিজের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্যরকম অমনোযোগী। সেন্টার টেবিল থেকে বোতলটা তুলে এনে সরাসরি তূর্ণার হাতে ধরিয়ে দিলো সে।
“ পুরোটা শেষ করো।
“ বলছি কি একটু…”
”না।”
“আমি পরে”
”না।”
“ আপনি কি আমাকে বাচ্চা ভাবেন?”
“ হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ আছে?”
একদম নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিলো রৌদ্রিক। তূর্ণা প্রতিবাদ করার আগেই পাশে বসে থাকা রোদেলা হাততালি দিয়ে উঠলো।
“মা বেবি! মা বেবি!”
রৌদ্রিক ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখলো। আর তূর্ণা অপমানে চোখ বড় বড় করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু এই তথাকথিত অপমানও বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কারণ পরক্ষণেই রোদেলা ছোট্ট পায়ে দৌড়ে এসে তূর্ণার কোল ঘেঁষে বসল। তারপর অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে তার ছোট ছোট আদুরে হাতগুলো রাখলো মায়ের স্ফীত উদরের উপর।যেন সেখানে কোনো দুর্লভ ধনরত্ন সংরক্ষিত আছে।
“বেবি দেখু আনি, তুনি কি ঘুমাউ?”
ফিসফিস করে প্রশ্ন করলো সে। তূর্ণার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেমন নরম হয়ে এলো। আঙুলগুলো আলতো করে মেয়ের চুলে বুলিয়ে দিলো।
“হ্যাঁ, পুতুল। ঘুমাচ্ছে।”
রোদেলা আরও কাছে ঝুঁকে গেলো। তার কানটা পেটের কাছে রেখে, সেখানটায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে ওঠে-
“ওকে তিত্তাল তুনি ঘুমাও। আপি পরে তুমার সঙে খেলবু কেমন?”
“ খেলবে?
“ হুম। আমি না আপি!”
শব্দগুলো বলার সময় তার চোখেমুখে যে গর্ব, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। রৌদ্রিক স্থির দৃষ্টিতে দৃশ্যটা দেখছিল। তার জীবনে সাফল্য এসেছে, অর্থ এসেছে, প্রতিপত্তি এসেছে; কিন্তু এই মুহূর্তটার সমতুল্য কোনো অর্জন নেই। তার প্রথম সন্তান নিজের ছোট্ট হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে অনাগত ভাইবোনের জন্য অপেক্ষা করছে। এর চেয়ে বড় আশীর্বাদ সম্ভবত মানুষের ভাগ্যে খুব কমই লেখা থাকে। বসা থেকে উঠে এসে তূর্ণার পাশে বসলো রৌদ্রিক। এক হাত দিয়ে স্ত্রীকে কাছে টেনে নিলো। অন্য হাতটা রাখলো তূর্ণার উদরের উপর।
দুই হৃদস্পন্দনের মাঝখানে তখন তৃতীয় এক ক্ষুদ্র প্রাণের অস্তিত্ব। জিনিসটা অদৃশ্য অথচ গভীরভাবে অনুভবযোগ্য। তূর্ণা মাথাটা আলতো করে রৌদ্রিকের কাঁধে হেলিয়ে দিলো। তূর্ণার সবকিছু স্বপ্নের মত লাগছে, তার জীবনটা এত রঙিনে ভরা ছিল সেটা হয়তো এই মানুষগুলো না আসলে বুঝতেই পারতো না। রোদেলা তার ছোট্ট মাথাটা তূর্ণার উদরের উপরে রেখে আঁকি-পুকি করছে। বেবি আসা নিয়ে তার পুতুলই রোজ রোজ উৎসব মানায়, বেবির জন্য তার নতুন কত খেলনা তুলে রেখেছে এই বলে যে বেবি আসলে তাকে দিবে বলে।
সময় যত যাচ্ছে তার শরীর ততো ভাড়ি হচ্ছে, নিজের মধ্যে বেড়ে ওঠা আর একটা অস্তিত্বকে খুব ভালো করে অনুভব করতে পারে। মনে হয় তার পেটের ভিতর প্রজাপতিরা উড়ছে, জিনিসটা শুধু সে’ই অনুভব করতে পারে। রৌদ্রিক শুরু থেকেই তার প্রতি যত্নশীল,তবে এখন যত্নের পরিমাণটা বেড়েছে। মানুষটা সর্বদা চিন্তায় থাকে তার সমস্যা নিয়ে। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে ঘুৃমাতে যাওয়ার আগ অব্দি মানুষটা প্রতিনিয়তই খেয়াল রাখে। হসপিটালের প্রয়োজনীয় সার্জারী ছাড়া যায় না, বাড়িতেই থাকে।
পাশাপাশি পারিবারিক ব্যবসাটায় হাত লাগিয়েছে, শ্রাবণের একা কষ্ট হয়ে যায় তাই সেও হাত লাগিয়েছে সবার সঙ্গে। শ্রাবণের ফুটফুটে একটা মেয়ে সন্তান হয়েছে, তাকে নিয়েও সবার আহ্লাদের শেষ নেই। রোদেলা তো সকালে ঘুম থেকে উঠে শ্রাবণের রুমে চলে যাবে বেবিকে কোলে নেওয়ার জন্য। শ্রাবণ আর ইরার নামের সঙ্গে মিল রেখে তার নাম সায়রা রাখা হয়েছে, একমাস হলো তার বয়স। বাড়িটা ধীরে ধীরে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে সময়ের সঙ্গে।
নিরবতার বিচ্ছিন্ন করে রৌদ্রিক শান্ত স্বরে বলে-
“ আমি হসপিটাল যাবো কিছুখন পর। দুইজন সময় মত দুপুরের খাবার খেয়ে নিবে, তারপর একঘন্টার জন্য ঘুম তারপর হাঁটা-হাঁটি।”
তূর্ণা রৌদ্রিকের ঘাড় থেকে মাথা উঠিয়ে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আজকে না গেলে হয় না?”
“ হুম, যেতে হবে। জরুরি না হলে যেতাম না, তাড়াতাড়ি এসে পরবো চিন্তা করো না।”
“ আচ্ছা যান, কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরবেন। আমি, পুতুল আর এই কুচুপু অপেক্ষায় থাকবো কিন্তু!”
পেটের উপর হাত রেখে বলে ওঠে তূর্ণা। রৌদ্রিক হালকা ঝুঁকে তূর্ণার উদরের উপর চুম্বন করে, নরম স্বরে বলে-
“ পাপা তাড়াতাড়ি ফিরবো হুম সোনা? তোমার মা যদি না খায়, তাহলে এসে বিচার করবো পাপা। তাড়াতাড়ি এসে পরো পাপার কাছে। আরও একটা রোদপাখি চাই তো পাপার!”
রোদেলা এবার মাথা উঠিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলে-
“ না তোদ তো শুতু আনি, বেবি তো তোদপাখি না।”
রৌদ্রিকের মেয়েকে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে বলে-
“ হুম রোদপাখি তো তুমি, তাই তো তোমার মত আরও একটা রোদপাখিকে জলদি আসতে বলছি। তারপর পাপার দু’টো রোদপাখি হয়ে যাবে।”
“ তালাতালি এসে পাপা, আমলা অপেত্তা করবো।”
দিগন্তজোড়া আকাশ আজ ধূসর বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন নয়, আবার সম্পূর্ণ উজ্জ্বলও নয়। আলো আর অন্ধকারের মাঝামাঝি এক অনির্ধারিত ক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে চারপাশে। জানালার কাঁচ ভেদ করে আসা নিস্তেজ সোনালি আভাটা নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়েছে সারা রুমে। রূপা বিছানার একপাশে আধশোয়া হয়ে বসে আছে।
আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা শরীরটা দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে। হাঁটতে গেলে কোমরের নিচে টান ধরে, বেশিক্ষণ বসে থাকলে পিঠে যন্ত্রণা শুরু হয়। অথচ এই সমস্ত অস্বস্তির মাঝেও মেয়েটার মুখে এক ধরনের অব্যক্ত প্রশান্তি লেগে আছে। হয়তো কারণ, ঠিক তার বিপরীত দিকেই বসে আছে তূর্য।
গাঢ় নীল শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। কোলে ভার্সিটির কয়েকটা রিসার্চ পেপার। চশমার কাঁচের আড়ালে কঠোর, গম্ভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে কাগজের পাতায়। তূর্যকে দেখলে প্রথমেই যে শব্দটা মাথায় আসে, সেটা হলো দুর্ভেদ্য। লোকটা যেন নিজের চারপাশে অদৃশ্য কোনো প্রাচীর নির্মাণ করে রেখেছে। সেখানে প্রবেশাধিকার খুব কম মানুষেরই আছে। আর ভালোবাসা? সেই শব্দটা তো তূর্যের অভিধানেই নেই বলে মনে হয়। বিয়ের পর এতগুলো মাস পেরিয়ে গেলেও একবারের জন্যও সে রূপাকে বলেনি “আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিংবা পছন্দ করি”। কোনোদিন হাত ধরে বসে থাকেনি অকারণে। কোনোদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে প্রেমের গল্প শোনায়নি। কোনোদিন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলেনি, “তুমি সুন্দর।”
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, লোকটার প্রতিটা আচরণের মধ্যে এমন এক নীরব অধিপত্য লুকিয়ে থাকে, যেটা ভাষার চেয়েও ভয়ংকরভাবে স্পষ্ট। হঠাৎ রূপা টেবিলের উপর রাখা জগের দিকে হাত বাড়াতেই কাগজ থেকে মুখ তুললো তূর্য। একবার তাকালো, তারপর ভ্রু কুঁচকে উঠে দাঁড়ালো।
“কী করছেন?”
রূপা থমকে গেলো কিছুখনের জন্য। তারপর হালকা স্বরে বল-
” পানি নিবো।”
”আমাকে ডাকতে সমস্যা কোথায় ছিল?”
শুষ্ক স্বর, প্রায় ধমকের মতো। রূপার ঠোঁট ফুলে উঠলো। এখন একটুতেই বেশি কষ্ট লাগে, বিশেষ করে তূর্য যখন কঠোর স্বরে কিংবা ধমকিয়ে কিছু বলে।
“আমি কি পঙ্গু?”
তূর্য কোনো উত্তর দিলো না। জগটা তুলে গ্লাসে পানি ঢেলে রূপার হাতে ধরিয়ে দিলো। তারপর নির্বিকার কণ্ঠে বললো-
“আপনার বর্তমান অবস্থায় নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।
রূপা বিরক্ত চোখে তাকালো।
”আপনি আমাকে সবসময় এমনভাবে ট্রিট করেন যেন আমি কাঁচের তৈরি।”
“ তুমি কাঁচের তৈরি নও।”
তূর্য কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর অদ্ভুত গম্ভীরতায় বললো-
“কাঁচ ভাঙলে জোড়া দেওয়া যায়। তোমার ক্ষেত্রে সেই সুযোগও নেই।”
বুকের ভেতরটা কেমন থমকে গেলো রূপার। লোকটা বুঝতে পারে না, নাকি ইচ্ছে করেই এমন কথা বলে?এই মানুষটা কখনো ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দেয় না, সেই মানুষটার দুই একটা বাক্য কখনো কখনো পুরো পৃথিবীর সমস্ত প্রেমপত্রকে হার মানিয়ে দেয়। রূপা চোখ সরিয়ে নিলো।অকারণেই গাল দুটো উষ্ণ হয়ে উঠছে।
তূর্য আবার নিজের জায়গায় ফিরে বসলো।
কিছুসময় পার হতেই আচমকাই রূপার পেটের ভেতর থেকে হালকা একটা নড়াচড়া অনুভূত হলো। রূপা চমকে উঠে হাত রাখলো উদরের উপর। মুহূর্তের মধ্যে তূর্যের চোখও কাগজ থেকে সরে এলো।
”নড়েছে?”
রূপা মৃদু মাথা নাড়লো।
পরবর্তী ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটলো যে রূপা প্রস্তুতই ছিল না। তূর্য চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। মাঝে মাঝে তার প্রশস্ত হাতটা রূপার উদরে বিচরণ করে, তবুও মানুষটা স্পর্শে রূপা কেমন নুইয়ে পরে। তূর্য তার প্রশস্ত হাতটা ধীরে ধীরে এসে থামলো রূপার পেটের উপর। নিঃশব্দ প্রতীক্ষা। আরেকবার নড়লো ছোট্ট প্রাণটা। তূর্যের আঙুলগুলো কেঁপে উঠলো। মাত্র এক মুহূর্ত জন্য, কিন্তু এই এক মুহূর্তেই লোকটার বরফশীতল ব্যক্তিত্বে সূক্ষ্ম এক ফাটল দেখা দিলো। রূপা স্পষ্ট দেখলো। দেখলো, কঠোর চোয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক দুর্বল এক তূর্যকে। রূপা হালকা হাসলো, এইসব মুহুর্তগুলো তাদের জীবনে অনেক সুন্দর একটা সময়। প্রথম পিতা-মাতা হওয়ার অনুভূতি হয়তো এমনই হয়।
শহরের ব্যস্ততম সড়ক ধরে ধীরগতিতে গাড়ি চালিয়ে বাড়ির ফিরছে রৌদ্রিক। উইন্ডশিল্ডে জমে থাকা ক্ষুদ্র জলকণাগুলোকে মুছে দিচ্ছিল ওয়াইপারের ছন্দময় গতিতে। গাড়ির ভেতর নরম স্বরে বাজছিল কোনো পুরোনো পিয়ানোর সুর, অথচ তার চেয়েও অধিক সুরেলা হয়ে উঠেছিল ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা দুই পরিচিত কণ্ঠ। কানের মধ্যে থাকা ব্লুটুথে ভেসে এলো তূর্ণার মৃদু হাসি।
“ আপনি কখন আসবেন। আজ কিন্তু তাড়াতাড়ি আসতে চেয়েছেন আপনি।”
চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে তূর্ণার কণ্ঠে এক ধরনের কোমলতা এসে বাসা বেঁধেছে। মাতৃত্বের অদৃশ্য ছোঁয়ায় মেয়েটার ভেতরের থাকা সমস্ত কঠোরতা যেন ধীরে ধীরে গলে গিয়ে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় পরিণত হয়েছে। রৌদ্রিক ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে বলল-
“ এইতো এসে পরবো। বের হয়েছি হসপিটাল থেকে।”
ফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে অস্পষ্ট এক আদুরে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“ তালাতালি আতো পাপা, বেবি আর আনি ওয়েত করতি তুমাল জন্য।”
রোদেলার কণ্ঠ বরাবরের মতোই খানিক ঝাপসা, খানিক অসংলগ্ন। যেন প্রতিটি শব্দ কোনো দূরবর্তী উপত্যকা পেরিয়ে আসছে। রৌদ্রিক হেসে উঠল।
“ এইতো পাপা রাস্তায়,তাড়াতাড়ি রোদ আর বেবির কাছে চলে আসবো।”
পাশ থেকে তূর্ণা বলে ওঠে এবার
”আচ্ছা, আজ রাতে আমরা ঠিক কী করবো সেটা একবার বলে দিন তো।”
”প্রথমত, রাতের খাবার একসঙ্গে খাবো। দ্বিতীয়ত, ছাদের ওপরে বসে আজকের পূর্ণচন্দ্র দেখবো। আর তৃতীয়ত…
রৌদ্রিক ইচ্ছাকৃতভাবে বাকিটা গিলে ফেলল।
”আর তৃতীয়ত কী?”
তূর্ণার কণ্ঠে শিশুসুুলভ কৌতূহল।
“সেটা বললে সারপ্রাইজ থাকবে কোথায়?”
রোদেলা এবার ফিসফিসিয়ে বলল,
“গিফ্ট,গিফ্ট..!!”
রৌদ্রিক এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে গাড়ির পাশের সিটে রাখা মোড়ানো বাক্সটার দিকে তাকাল। গাঢ় নীল কাগজে মোড়ানো ছোট্ট উপহারটি। তূর্ণার জন্য ছিল রুপালি চাঁদের খচিত একটি পেনডেন্ট, আর রোদেলার জন্য বহুদিন ধরে খুঁজে বেড়ানো সীমিত সংস্করণের স্কেচবুক। রোদেলা আঁকতে খুব ভালোবাসে তাই এটা তার জন্য, রঙ সহ আরও অনেক কিছু রয়েছে। আজকের লালাভ চন্দ্রোদয়ের নিচে তারা তিনজন বসে অনেক গল্প করবে। গাড়ির জানালার বাইরে আকাশ ক্রমশ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। দিগন্তের কিনারা থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুলছিল অস্বাভাবিক লালচে এক পূর্ণচন্দ্র। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন আকাশের বুকে কেউ একফোঁটা রক্ত ছড়িয়ে দিয়েছে। তূর্ণা হঠাৎ বলে ওঠে
“জানেন বর, আজকে কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে আমার। আপনি তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসুন প্লিজ!”
রৌদ্রিক নরম স্বরে উত্তর দিলজ
“ ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তো ফিরছি।”
” তবুও…”
তূর্ণার বাক্য অসমাপ্ত রয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে,দূর থেকে প্রচণ্ড বেগে ছুটে আসা একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীত লেনে ঢুকে পড়ল। সবকিছু যেন এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ঘটে গেল। প্রথমে কর্কশ ব্রেকের শব্দ। তারপর ধাতব সংঘর্ষের বীভৎস আর্তনাদ। এরপর,সমস্ত পৃথিবী যেন উল্টে গেল। রৌদ্রিকের হাত থেকে স্টিয়ারিং ছিটকে বেরিয়ে গেল। গাড়ির কাচ ভেঙে হাজারো স্বচ্ছ ছুরির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বুকের ভেতর হিংস্র আঘাতের বিস্ফোরণ অনুভব করল সে। ফোনটা তখনও সংযুক্ত। ওপাশ থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠে তূর্ণা চিৎকার করে উঠেছে-
“ বর! এই বর! কী হয়েছে? কথা বলুন!
কিন্তু অপর পাশ থেকে কোনো শব্দ ভেসে আসলো না। সবকিছু কেমন নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরেছে, চারিদিক থেক ভেসে আসা কোলাহল কর্ণকুহরে বাজছে। তূর্ণা কতবার করে ডাকছে, তবুও রৌদ্রিক উত্তর দিচ্ছে না। রৌদ্রিক তো এমন নয়, তাহলে আজকে কেনো এমনটা করছে? তূর্ণা ফুঁপিয়ে উঠলো রৌদ্রিকে ডাকতে ডাকতে।
“ ও বর কথা বলুন না! আপনার কি হয়েছে? কথা বলছেন না কেনো? এই বর কথা বলুন! এই যে কথা বলুন ননননা!”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৩
তবুও কোনো উত্তর এলো না, ফোনের লাইনটাও কেটে গেলো মুহুর্তেই। তূর্ণা স্তব্ধ হয়ে রইলো সেখানেই, ছোট্ট রোদেলাও বুঝতে পারছে না কি হয়েছে। তূর্ণাকে কাঁদতে দেখে তারও কান্না পেলো খুব, ঠোঁট উল্টিয়ে কেঁদে ফেললো প্রায়।
“ পাকা কুতায়? কাতো কেনু মা? আনিও কেতে দিবো!”
তূর্ণা রোদেলাকে বু্কে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো শব্দ করে। সবকিছু কেমন অন্ধকার! অন্ধকার লাগছে এই মুহুর্তে। সে যা চিন্তা করছে সেটা হতে পারে না, এখনো শ্বাস আটকে আছে তার। একটু আগেও মানুষটা তাদের সঙ্গে কথা বলছিল, আর এখন! কোনো উত্তর দিচ্ছে না।
