অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৫
ফাহিমা ইসলাম
“ রিলাক্স তূর্ণা! রোদ ঘুমাচ্ছে ঘুম ভাঙলে আসবে।”
“ ও..ও কোথায় তাহলে?”
রৌদ্রিক তূর্ণার চিন্তাগ্রস্ত মুখশ্রী পানে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো৷ ইচ্ছে করলো না নিজের মেয়ের এমন কথা তূর্ণাকে বলার। তূর্ণা এমনিই এখন বেশ দূর্বল, তারউপর এমন খবর জানতে পারলে আরও সমস্যা হবে।
“ ও আছে, ভালো আছে৷ ঘুমাচ্ছে ও, ওর ঘুমের প্রয়োজন৷ ঘুম শেষ হলে ওকে নিতে পারবে।”
তূর্ণার মাতৃ মনটা মানতে চাইলো না কেনো জানি৷ হয়তো মানের মতন বলেই সন্তানের ভালো-খারাপ সবকিছু বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ পাক দিয়েছে। রৌদ্রিকেও অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে জাগলো না।
“ এক..একটুও দেখা যাবে না?”
“ আপাতত না, আর একটু অপেক্ষা করো তোমার কাছেই আসবে আমার সব চড়ুইরা!”
তূর্ণা আর কিছু বললো না, তার এতোকিছু জানা নেই। নিজের কোলে থাকা ছেলের দিকে আবারও অশ্রুসিক্ত চোখে তাকালো, তূর্ণার ভয় লাগলো কেনো জানি৷ এতো নাজুক! এতো কোমল প্রাণকে প্রথমবারের মতো নিজের কোলে নিয়েছে৷ এই ছোট্ট ছানাটা তার মধ্যে ছিলো? ভাবতেই তূর্ণার চোখটা আরও ভরে উঠলো৷ সিজার হওয়া পেটে আবারও টান পরায় ব্যথায় ফুঁপিয়ে উঠলো সে। রৌদ্রিক আর দেরি না করে আবারও ছেলেকে সাবধানে বুকে তুলে নিলো। তূর্ণা অসহায়,কাতর দৃষ্টিতে থাকিয়ে রইলো সেদিকে৷ এতো কষ্টেও পরও সন্তানকে মন ভরে কোলে নিতা না পারায় আফসোস লাগছে। নিজের শরীরও দূর্বলতাকে আস্ত একটা আপদ মনে হচ্ছে৷ রিনি এতো কান্না কান্না পরিবেশ দেখে সইতে পারলো না৷ সে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
” এতো কাঁদছো কেনো? আমার ছেলে-মেয়েকে তোমার পেটে রাখতে দিয়েছিলাম খালি। এখন তাড়াতাড়ি ঠিক হও তো, আমার বিয়ে সামনে৷ আমার চারটা বাচ্চাকে তো নাচ-গান শিখাতে হবে তো নাচার জন্য।”
তূর্ণা হালকা হাসলো ব্যথার মাঝেও। রৌদ্রিকের ছেলে তার কোলেই ঘুমে ঢলে পেরেছে ইতিমধ্যে। সেটা দেখে রিনি চট করে বলে-
“ ভাবির কাছে আমার ছেলেকে শুইয়ে দাও৷ নাহলে তো একজন চোখের পানি বন্যা বানিয়ে দিচ্ছে।”
তূর্ণার চোখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো রিনির কথা শুনে৷ স্ট্রেচারটা বেশ বড়সড়, অনেকটা জায়গা পরে আছে৷ রৌদ্রিক রিনির কথা মতো তার ছেলে আস্তে করে শুইয়ে দেয়৷ তূর্ণা তাকিয়ে থাকলো নিজের অংশের দিকে। কি ছোট ছোট চোখ, নাক, ঠোঁট,কান! তূর্ণা অবুঝের মতো প্রশ্ন করে বসে।
“ ও এ..এতো ছোট কেনো? ও ক..কি ব্যথা পেয়েছে?”
“ নবজাতক শিশুরা এতো ছোটই হয়৷”
সেখান একজন নার্স উপস্থিত হলো৷ পিছনেই ডাক্তারও এলেন, তিনি সবাইকে বাহিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন৷ তূর্ণার সি সেকশনে ডেলিভারি হয়েছে৷ রৌদ্রিক বাহিরেই দাঁড়িয়ে ছিলো ডাক্তারের বের হওয়ার আশায়৷ এরমধ্যে শ্রাবণের কোলে আঁধভাঙা ঘুমন্ত রোদেলা ফোঁপাতে ফোপাঁতে এলো। রৌদ্রিকে দেখা মাত্রই তার কান্নার বেগ বাড়লো৷ রৌদ্রিক এগিয়ে মেয়েকে বুকে আগলে নিলো৷ রোদেলা ঘুম জড়ানো ভেজা স্বরে বলে-
“ কুতায় ছিলে তুনি? মা কুতায়? বেবি কুতায়?”
” এই তো মা এখানেই আছি৷ কি হয়েছে আমার রোদের? কাঁদে কেনো?”
“ বেবি নাই, বেবি কই?”
রোদেলা ঘুমানোর সময় তার ভাইকে পাশে রেখে খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পরেছিলো। ঘুম থেকে ওঠার পর কাউকে দেখতে না পেয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছে, শ্রাবণ শান্ত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এতে কোনো লাভ হয়নি, তাই বাধ্য হয়ে এখানে নিয়ে এসেছে।
“ বেবি আছে তো। এতোটুকুর জন্য কেউ কাঁদে?”
রোদেলা কিছু বললো না ঠোঁট উল্টিয়ে রৌদ্রিকের কাঁধে মাথা রাখলো৷ রৌদ্রিকে মেয়েকে কোলে নিয়ে হালকা হাঁটা-হাঁটি করলো কলিডোরেই৷ এরমধ্যেই ডাক্তারও বেরিয়ে আসতে দেখে সেদিকে চলে যায়।
“ আমার ওয়াইফের কি অবস্থা? সব ঠিক আছে তো?”
“ দেখুন, সিজারের ঘাঁ’টা শুকাতে বেশ সময় লাগবে। আপাতত বাচ্চাদের ব্রেস্টফিডের করাতে পারবে না। Hypogalactia কারণে৷ ঘাঁ’টাতে যাতে কোনো প্রকার আঘাত বা অন্যকিছু না লাগে, নাহলে জায়গাটাতে ইনফেকশন ছড়াবে আর পচন ধরবে। একমাসের মতো বেড রেস্টে থাকতে হবে। কয়েকিন পর রিজিল করে নিতে পারবেন।”
বলেই তিনি চলে যায়, রৌদ্রিক রোদেলাকে নিয়েই ভিতরে প্রবেশ করল। রোদেলা কাঁধ থেকে মাথা তুলে তাকালো। তূর্ণা চোখ বন্ধ করে শুইয়ে ছিল, কারো পদধ্বনির শব্দ শুনতেই চোখ মেলে তাকায়। রোদেলা তূর্ণাকে দেখা মাত্রই তার কাছে ছুটতে চায়, রৌদ্রিক মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ ডাক্তার কি বললো রোদ? এখন না মায়ের এখন কষ্ট হবে, কোলে যাওয়া যাবে না।”
“ কি হয়েছে মায়ের?”
“ মা একটু অসুস্থ, তুমি শুধু মায়ের পাশে থাকো হুম? কোলে গেলে মা আরও কষ্ট পাবে। রোদ কি চায় তার মা কষ্ট পাক?”
রোদেলা মাথা দোলালো অর্থাৎ সে চায় না। রোদেলাকে দেখা মাত্রই তূর্ণা রোদেলাকে নিজের কাছে ডাকলো। রোদেলা তূর্ণার সামনে গিয়ে বসলো, তূর্ণা রোদেলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ পুতুল কি হয়েছে? কেঁদেছো কেনো?”
রোদেলা চোখ ঢলতে ঢলতে বলে-
“ তুনি তো আমাল কাছে ছিলে না। বেবিও ছিলো না, পাপাও ছিল না!”
“ মায়ের কাছে আসো পুতুল।”
বলেই তূর্ণা হাত বড়ালল তূর্ণা মুখ ঘুরালো, অর্থাৎ সে যাবে না। রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ না, তুনি ব্যতা পাবে৷ তোদ যাবে না!”
“ আচ্ছা কোলে আসতে হবে না, মায়ের পাশে এসো ”
রোদেলা উঠে স্ট্রেচারে বেবির একপাশে বসলো। তূর্ণা বহু কষ্টে একহাত উঁচু করে রোদেলার মাথাটা ছুঁইয়ে দিলো। রোদেলা শান্ত দৃষ্টিতে ঘুমন্ত বেবির দিকে তাকিয়ে আছে। রোদেলা রৌদ্রিকের পানে চেয়ে জিজ্ঞেস করে-
” বেবি এত্তো ঘুমায় কেনু?”
“ এতোদিন ও তো পেটের মধ্যে ছিলো, তাই এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ঘুমায়।”
রোদেলা শুনলো সবটা, সে তার ছোট্ট হাত দ্বারা একদম ক্ষুদ্র হাতটা ধরলো। এতো ছোট ছোট আঙ্গুল দেখে তার সত্যি ভয় লাগছে। তার পুতুলগুলোর মতো একদম ছোটো,ছোটো। হঠাৎ করেই নবজাতক শিশুটা ‘ওয়্যা’ ‘ওয়্যা’ করে কেঁদে উঠলো কেবিন কাঁপিয়ে। ক্ষুন্ন স্বরে কেঁপে উঠছে ছোট্ট স্বরটা, কাঁদার ফলে লালিত ক্ষুদ্র মুখশ্রীটা আরও লালিত হয়ে উঠলো মুহুর্তেই।
“ ও কাঁতে কেনু?”
রৌদ্রিক দ্রুত নার্সকে ডাকলো, যত দূর বুঝতে পারলো খিদে পেয়েছে। কিছুখন পর একজন নার্স এলো, সে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ফর্মুলা দুধ পান করালো। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাচ্চাটা শান্ত হয়ে গেলো, রোদেলা আর তূর্ণা দু’জনই সেটা দেখছে অবাক হয়ে। দুইজনের কাছেই এটা নতুন, খাওয়ানো শেষে বাচ্চাকে শুইয়ে দিতেই সে আনন্দ পা নাড়াতে শুরু করেছে। চোখ দু’টো হালকা খোলা, তার পা দুটো নাড়িয়ে অদ্ভুত এক আনন্দময় শব্দ তৈরি করছে। তার তার ফোলকা হাসিমাখা মুখশ্রী উপহার দিচ্ছে। রোদেলা তার ভাইকে এতো আনন্দের সঙ্গে পা দোলাতে দেখে তার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নাজুর স্বরে বলে-
“এত্তো হাসো কেনু? তোমাল হাসিটা তো অন্নেক তুন্দল! একদম পুতুলের মতো! তুনি জানো আমি কে? আমি তুমাল বিগ তিত্তাল জানো?”
তূর্ণা আর রৌদ্রিক কেউই কথা বললো না তাদের মাঝখানে। রোদেলা তার ভাইয়ের সঙ্গে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলছো, নবজাতক শিশুটাও কি বুঝছে কে জানে, সেও আনন্দের সঙ্গে রোদেলার কথার উত্তর হিসেবে অদ্ভুত আনন্দময় শব উপহার দিচ্ছে৷ এতে যেনো রোদেলার আনন্দ বেড়ে চলছে। কিন্তু কিছুখনের মাঝেই শিশুটা আবারও ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো। সেটা দেখে রোদেলা ঠোঁট উল্টিয়ে বলে-
“ বেবি খালি ঘুমায় হু!”
দীর্ঘ রজনীর গাঢ় তমসা ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে এলো। পূর্বাকাশের নিভৃত প্রান্তর জুড়ে প্রথমে ফুটে উঠল কাঁচা অরুণিমার ক্ষীণ রেখা, অতঃপর সেই আলো ক্রমশ রক্তিম।
পাঁচটি দীর্ঘ, উৎকণ্ঠাময় দিন শেষে অবশেষে হাসপাতালের সাদা দেয়াল, জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ আর অসংখ্য চিকিৎসা-যন্ত্রের কোলাহল পেছনে ফেলে নিজের ঠিকানায় ফিরছে তূর্ণা। গাড়ির জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে নিশ্চুপ বসে আছে সে। অপারেশনের পাঁচদিন পেরোলেও সিজারের গভীর ক্ষত এখনো প্রতিটি নড়াচড়ায় অসহনীয় টান ধরাচ্ছে সারা অঙ্গে। তলপেটের ব্যান্ডেজের নিচে যেন আগুনের সরু রেখা বেয়ে প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ছে যন্ত্রণা। সামান্য উঠে বসা, শ্বাস একটু গভীর করে নেওয়া কিংবা কোমর সোজা করার ক্ষুদ্রতম প্রচেষ্টাতেও মুখ বিকৃত হয়ে উঠছে ব্যথার দহনেই।
প্রসবোত্তর দুর্বলতায় মুখশ্রী ফ্যাকাশে, চোখের নিচে ঘুমহীনতার নীলচে ছাপ। শরীর থেকে যেন সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত হয়ে গেছে। দুই হাত অবশ, পিঠে অবিরাম যন্ত্রণা, বুকের দুধ জমে হালকা অস্বস্তি,এইসব মিলিয়ে মাতৃত্বের প্রথম অধ্যায় তাকে এক অনির্বচনীয় সহিষ্ণুতার পরীক্ষায় দাঁড় করিয়েছে। অথচ সেই সমস্ত কষ্ট মুহূর্তেই তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে, যখন পাশের বেবি-কারসিটে পাশাপাশি ঘুমিয়ে থাকা দুই ক্ষুদ্র প্রাণের দিকে তাকাচ্ছে সে। বিশ্বাসই হচ্ছে না তার ভিতরেই এই দুটো ক্ষুদ্র প্রাণ ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। বাড়ির ফেরার আলাদা আনন্দ কাজ করছে, হসপিটালে থাকতে থাকতে মনটা বিষাদে ভরে উঠেছিলো। চারদিন পর সে তার মেয়েকে নিজের কাছে পেয়েছে, না চাইতেও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল।
রৌদ্রিক পাশেই বসে আছে, অন্য হাত বারবার বাড়িয়ে তূর্ণার আঙুলগুলো নিজের মুঠোয় আবদ্ধ করছে। রোদেলা ঘুমিয়ে পরেছে, আপাতত সে রৌদ্রিকের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।
“ব্যথা বাড়ছে?”
তূর্ণা মৃদু হাসল। কোনো রকমে ব্যথাটাকে আড়াল করার চেষ্টা করে বলে-
“ একটু একটু! তবে সহ্য করে নিবো।”
রৌদ্রিকের কপাল আরও গাঢ় ভাঁজে ঢেকে গেল।
“সহ্য করার জন্য তো বলিনি। একটু কষ্ট লাগলেই বলবে। বাড়িতে পৌঁছেই ওষুধ খাবে। বেশি কষ্ট হলে বল।”
” আরে না আপনি বেশি চিন্তা করছেন খালি!”
সিকদার বাড়ির প্রধান ফটক আজ যেন এক উৎসবের দ্বার।
রঙিন ফুলের মালা, বেলুন, আলোকসজ্জা সব মিলিয়ে পুরো প্রাসাদোপম বাড়িটা নবজন্মের আনন্দে সেজে উঠেছে। বাড়ির সবার মুখে আজ একই রকম নির্মল উচ্ছ্বাস। রিনি আর শ্রাবণ মিলে পুরো বাড়ি সাজিয়েছে, বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই চারপাশে আনন্দধ্বনি বেজে উঠল।
” আলহামদুলিল্লাহ!”
সবাই ভির করেছে গাড়ির দরজার সামনে। রোদেলা ঘুম থেকে উঠে পরেছে, এতো আয়োজন দেখে তার ছোট মনটা আবারও নেচে উঠলো । রৌদ্রিক দরজা খুলে দিতেই রোদেলা ঝটপট নেমে পরে, তারপর রৌদ্রিক নামলো, তারপর তূর্ণাকে নামার জন্য হাত বাড়ালল। তারপর অত্যন্ত সর্তকতা অবলম্বন করে বলে-
“তাড়াহুড়ো করবে না।”
সে নিজেই দুই হাত বাড়িয়ে তূর্ণাকে উঠতে সাহায্য করল। তূর্ণা দাঁড়াতেই অপারেশনের জায়গায় টান খেল। মুখ বিকৃত হয়ে এলো।রৌদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে কোমর জড়িয়ে নিল।
” ধীরে… খুব ধীরে।”
তার কণ্ঠে এমন এক কোমলতা ছিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভঙ্গুর কাঁচের পুতুলটিকে সামলাচ্ছে। ইরা এসে তূর্ণাকে আগলে নিলো, তূর্ণা ইরার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।
তারপর রৌদ্রিক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বেবি ক্যারিয়ারটা তুলে নিলো। তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে রোদেলা, সে তার পেছন পেছন হাঁটছে। ছোট্ট আঙুল দিয়ে বাবার শার্ট আঁকড়ে ধরে আছে। রুমা সিকদার এগিয়ে এসে ক্যারিয়ার থেকে একজনকে তুলে নিলেন, রোমানা সিকদারও অপরজনকে তুলে নিলো। সেটা দেখে রোদেলা মুখ ফুলিয়ে বলে-
“ হে সবাই নাও, আমাকে দিও না খালি হু!”
রোদেলার কথা শুনে হেসে ফেললো, রুমা সিকদার রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ দিদুভাই একটু নেই, তারপর আবার তোমাকেও তো নিতে হবে নাকি।”
জবা সিকদার তূর্ণাকে হালকা মিষ্টি মুখ করে সবাই বাড়ির ভিতরে গেলো। পুরো মহল্লায় সেদিনই মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। মহল্লায় এতোদিন যারা তূর্ণাকে নিয়ে নানা কথা বলছিল তাদের মুখটাও বন্ধ হয়ে গেছে। তূর্ণা প্রেগ্ন্যাসির সময়টাতে তাদের থেকে বাহিরের মানুষের টেনশন বেশি ছিলো বাচ্চা মায়ের মতো পাগল হবে, মাথার সিট খারাপ হবে আরও কথা কি। তারা চাইলেও সবার মুখ বন্ধ করতে পারবে না, সমাজ সর্বদাই মানুষের পিছনে কথা বলতে ওস্তাদ৷ তাছাড়াও প্রতিটা মানুষের মুখ বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তূর্ণার হাঁটায় কষ্ট হওয়ায় সবার সামনেই কোলে করে তাদের কক্ষে নিয়ে এসেছে। তাদের কক্ষটি যেন রূপকথার এক স্বপ্নপুরী। রুমে সাদা-নীল রঙের নরম পর্দা লাগানো হয়েছে নতুন। কাঠের দোলনা, দুইটি ক্ষুদ্র বেবি-কট, দেয়ালে মেঘ আর নক্ষত্রের কারুকাজ। এইসব কিছু এই কয়েকদিনে রিনি সাজিয়েছে।তূর্ণাকে ধীরে ধীরে বিছানায় বসিয়ে পিঠের পেছনে কয়েকটি নরম বালিশ গুঁজে দিল সে।
“এভাবে বসো। প্রেসার কম পড়বে না।”
তারপর নিচু হয়ে তূর্ণার পায়ের ওপর পাতলা কম্বল টেনে দিল।
” ঠান্ডা লাগবে।”
তূর্ণা বিস্মিত দৃষ্টিতে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক রাতের নির্ঘুম ক্লান্তিতে রৌদ্রিকের চোখ লালচে হয়ে আছে। দাড়ি এলোমেলো। চোখের নিচে স্পষ্ট কালি। অথচ নিজের ক্লান্তির লেশমাত্র প্রকাশ নেই। মানুষটা এই কয়েকদিন ঠিক মতো পানি খেয়েছে কিনা সন্দেহ৷ তাদের পিছনেই লোকটা পরে ছিলো সর্বদা। অনেকটা পথ জার্নি করে আসার কারণে কেউ এখন বিরক্ত করছে না, বাচ্চারা বিছানার মাঝখানে শুইয়ে আছে। রোদেলাও তাদের সঙ্গে খেলায় ব্যস্ত। হঠাৎ ই একটি বাচ্চা কান্না জুড়ে দিল। রৌদ্রিক দ্রুত তাকে কোলে তুলে নিল। ঠিক তখনই অন্যজনও কেঁদে উঠল একই সঙ্গে, রোদেলা ছোটাছুটি শুরু করে দিল। সে অস্থির হয়ে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে
“পাপা… ও কাঁতে কেনু?”
রৌদ্রিক এক হাতে একটি শিশু, অন্য হাতে আরেকটিকে দোলাতে দোলাতে মেয়েকে বলল-
” হয়তো ওদের খিদে পেয়েছে।”
“আনি চতলেট আনবো?”
“না, তুমি শুধু পাপার পাশে বসো। ওরা তো ছোট চকলেট খেতে পারবে না।”
রোদেলা বাধ্য মেয়ের মতো বাবার হাঁটুর পাশে বসে ছোট্ট হাত দিয়ে ভাইয়ের পা ছুঁয়ে দিল। তূর্ণাও ইচ্ছে করলো রৌদ্রিকের একটু সাহায্য করার, মানুষটা একা হাতে কতজনকে সামলাবে?
“ রিনি বা মা’কে ডাকুন,একা কিভাবে সামলাবেন? আমাকে দিন।”
“ না দরকার নেই, কিছুখন রেস্ট নাও এখন ওরা কাঁদছে। হুট করে পা লাগলেই সমস্যা হবে। আমি রিনিলে ডাকছি।”
কিছুখন পর সেখানে রিনি এলো, ছেলে বাচ্চাটার তুলনায় মেয়ে বাচ্চাটা অত্যন্ত শান্ত। অল্পতেই সে চুপ হয়ে গেলো। সে ঘুমিয়ে পরেছে খেয়ে, রোদেলা রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ পাপা খিদে পেয়েছে!”
রৌদ্রিক মেয়েকে কোলে তুলে নিলো রিনির দিকে তাকিয়ে বলে-
” ওদের দিকে নজর রাখিস, রোদকে খাইয়ে আনি। ওরও ঘুম পেয়েছে।”
রিনি নিজের ভাইকে এতো খাটতে দেখে কষ্ট হলো। সে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ তুমি না একটু বেশি, মা বললো একা সামলাতে পারবে না। তাও এতো প্রেশার নেওয়ার মানে কি ভাই? আমরা কি বাড়িতে নেই?”
“ আচ্ছা বাবা এতো রাগতে হবে না।”
” ফ্রেশ হয়ে আসো মা খাবার আনছে, রোদকে খাইয়ে দিবে। তুমি ফ্রেশ হও যাও। রোদপাখি পিপির কাছে আসো তো।”
রোদেলাও জেদ করলো না, সে রিনির কাছে চলে গেলো। তূর্ণার খারাপ লাগলো তাদের কারণে মানুষটার কত কষ্ট পোয়াতে হচ্ছে।
চারিদিকে এক ধরনের নিভৃত প্রশান্তি, যার বুকে আলস্য মেখে ঘুমিয়ে আছে পৃথিবী। আর সেই নৈঃশব্দ্যের গভীরে ডুবে রয়েছে রৌদ্রিকের সুদীর্ঘ কক্ষটি। গাঢ় নিদ্রার অতল থেকে সদ্য জেগে উঠলো সে। দশটার দিকে ঘুমিয়ে পরেছিলো, কান্তিময় দেহটা বহুদিন পর আরাম পেয়ে নিদ্রায় ডুবে গিয়েছিলো। ভারী চোখের পাতা মেলে প্রথমেই দৃষ্টি গেল বিছানার মাঝ বরাবর। সঙ্গে সঙ্গে তার শীতল মুখাবয়বে নেমে এলো এক অচেনা কোমলতা। তার ছোট্ট নবজাতক পুত্রটি নরম কম্বলের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আপনমনে খেলছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঙুলগুলো কখনো মুষ্টিবদ্ধ করছে, কখনো আবার বাতাসে ছুঁড়ে দিচ্ছে। গোলাপি ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে দুধে ভেজা হাসি। মাঝেমধ্যে অস্পষ্ট স্বরে কী যেন বলার চেষ্টা করছে সে, যেন নিজস্ব কোনো অদৃশ্য জগতের সঙ্গে কথা বলছে। তার পাশেই গা এলিয়ে গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন তূর্ণা। দীর্ঘ কৃষ্ণ কেশ ছড়িয়ে আছে বালিশ জুড়ে। ক্লান্ত অথচ প্রশান্ত মুখাবয়বে মাতৃত্বের অপার্থিব ঔজ্জ্বল্য। আর তার বক্ষের সঙ্গে লেপ্টে ঘুমিয়ে রয়েছে ছোট্ট কন্যা সন্তানটি। ক্ষুদ্র হাতটা মায়ের পোশাক আঁকড়ে ধরে আছে, যেন সমগ্র পৃথিবীর নিরাপত্তা খুঁজে পেয়েছে সেই উষ্ণ আশ্রয়ে। তূর্ণার হাতটার নিচে রোদেলার মাথাও রয়েছে, একহাতেই দুই মেয়েকে সামলে রেখেছে। তার অস্তিত্ব বন্দি হয়ে আছে চারটি ক্ষুদ্র প্রাণের মধ্যে। দেখতেই কেমন মনটা ভরে উঠছে তার সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে বিছানা থেকে নামলো। অতঃপর অত্যন্ত সাবধানে পুত্রটিকে কোলে তুলে নিতেই ছোট্ট মানুষটা খিলখিল করে হেসে উঠলো।রৌদ্রিকের কঠিন মুখশ্রীতে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
“আমার রাজপুত্রের ঘুম ভেঙে গেছে?”
কোনো উত্তর নেই। বরং শিশুটি তার ক্ষুদ্র হাত বাড়িয়ে বাবার দাড়িভর্তি চোয়াল চেপে ধরলো।
“আহ্!”
মৃদু ব্যথার অভিনয় করতেই বাচ্চাটা আবারও হাসলো। সেই হাসি যেন তুষার গলানো রৌদ্রের মতো উষ্ণ।
রৌদ্রিক বিস্মিত নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর কপালে আলতো চুম্বন এঁকে ফিসফিস করে বললো-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৪
” কি করে আমার বাবাটা? পাপাকে ছাড়াই খেলছো?এতো আনন্দ কেনো বাবাটার হুম? পাপা একটু আদর করে দেই কেমন?”
বলেই তাকে নিয়ে রৌদ্রিক আপনমনে হেঁটে বেড়াতে লাগলো বিশাল কক্ষজুড়ে। বাচ্চাটা খুশি মনে পা দুলিয়ে চলেছে,বিরাট কাঁচঘেরা জানালার সামনে গিয়ে থামলো দু’জন। দূরে শুভ্র প্রান্তরে অলস সূর্যালোক খেলা করছে।
