Home অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২০

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২০

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২০
নুসাইবা ইভানা

জিয়ান আর নয়না সবে তালুকদার ম্যানশনে প্রবেশ করেছে। ঠিক সে সময় কল আসলো নাজিম চৌধুরীর ফোন থেকে।
জিয়ান কল রিসিভ করে ফোনটা কানের সামনে ধরতেই বলে, “এসব কখন হলো! আমি এক্ষুনি আসছি। কোন হাসপাতালে নিয়ে গেছো?”
নয়না বোকার মতো তাকিয়ে রইলো জিয়ানের মুখের দিকে। জিয়ান কল কেটে নয়নাকে বলল, “তুমি বাসায় যাও, আমাকে এক্ষুনি হাসপাতালে যেতে হবে। আম্মুর অবস্থা ভালো নয়।”

“আমিও যাবো তোমার সাথে।”
“তুমি কিছু সময় রেস্ট নিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে তারপর আসো।”
জিয়ান আর অপেক্ষা না করে দ্রুত চলে গেলো।
নয়না বাসায় এসে গালে হাত দিয়ে সোফার উপর বসে আছে। সূচনা দরজা খুলে দিয়েছিলো। সূচনা নয়নার দিকে তাকিয়ে বলে, “কিরে টয়না, তুই বৌ সেজে কেনো বসে আছিস?”
“সূচনা, এখন আমার মন ভালো নেই, একদম কথা বাড়াবি না।”
সূচনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নরম কণ্ঠে বলল, “আপু, তোমার মন এখন কেনো ভালো থাকে না?”
নয়না অবাক নেত্রে তাকিয়ে রইলো সূচনার দিকে। মনে হচ্ছে সূচনা এই আট বছরে ভিষণ বড় হয়ে গেছে।
নয়না সূচনার গাল টেনে বলে, “কে বলল তোকে আমার মন ভালো থাকে না? আমার মন ভালোই ছিলো। কিন্তু আমার শাশুড়ি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“থাক, মন খারাপ করিও না। সুস্থ হয়ে যাবেন দেখিও।”
“পাঁকা বুড়ি! যাহ, দেখ টেবিলের উপর তোর জন্য চকলেটের প্যাকেট আছে। আম্মু কোথায় রে?”
“বাসায় নেই, ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন।”
নয়না নিজের রুমে এসে ড্রেস চেঞ্জ করে শুয়ে পড়লো। মনটা ভিষণ খারাপ তার। এতগুলো দিন চলে গেলো, একটার পর একটা বিপদ যেনো লেগেই আছে। আবার কবে সেই সোনালী দিন ফিরে আসবে? নয়না বালিশে মাথা রেখে এসব ভাবনায় বিভোর।
শিল্পী বেগম এসে নয়নার দিকে এক গ্লাস ফ্রেশ অরেঞ্জ জুস এগিয়ে দিয়ে বলেন, “জুসটা খেয়ে নে। আমি তোর জন্য হালকা নাস্তা নিয়ে আসি, খেয়ে ঘুমা।”
নয়না বেশ অবাক হলো! শিল্পী বেগম কখনো সংসারের কোনো কাজ করেন না। এমনকি চাও কাউকে বানিয়ে দেন না। ছোট থেকেই দেখে আসছে এসব নয়না।

“ছোট আম্মু, জুসটা তুমি বানিয়েছো?”
“হ্যাঁ, নিজের হাতে বানিয়ে আনলাম। খেয়ে দেখ কেমন হয়েছে। বিয়ের পর থেকে এই সংসারের কোনো কাজ আমি করিনি। কোনো দায়িত্ব পালন করিনি। ভাবী একাই সবটা সামলে নিতেন। আমি নিজের উপর বিরক্ত ছিলাম। নিজেকে নিজের অসহ্য মনে হতো।”
“কেনো?”
“তুই জুসটা শেষ কর, আমি নাস্তা নিয়ে আসি।”
নয়না শিল্পী বেগমের হাত ধরে বলে, “তুমি এখানে বসো তো। তোমার সাথে গল্প করি। ভালো লাগছে না কিছু।”
শিল্পী বেগম বসলেন।
নয়না জুস শেষ করে বলল, “তা আমার ছোট আম্মু, এতো দায়িত্ববান কবে থেকে হলেন?”
“তোর হারিয়ে যাওয়া সব কিছু বদলে দিয়েছে। ভাবী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। মাঝে মাঝেই উল্টো-পাল্টা কথা বলেন। নীলাঞ্জনার বেবি হয়। এই পরিবারটা কেমন ভেঙে যায়। এতো বছর ধরে এই সংসারে আছি, ভাবী কত যত্নে সংসারটা আগলে রেখেছেন। সেই সংসার কি করে ভেঙে যেতে দেই? তাই হাল ধরেছি।”

“একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“হ্যাঁ, কর।”
“তুমি কি চাচ্চুকে পছন্দ করতে না?”
“আমি করতাম, তবে সে আমাকে পছন্দ করতো না। বাদ দে সেসব পুরোনো কথা।”
“কেনো পছন্দ করতো না! তুমি তো এই বয়সেও হেব্বি সুন্দরী, তখন তো আরো বেশি সুন্দর ছিলে।”
“সুন্দর হলেই কি কারো মন পাওয়া যায়? একসাথে সারাজীবন কাটিয়েও কারো মনের ধারে কাছেও পৌঁছানো যায় না। আবার হাজার মাইল দূরত্বে থেকেও কেউ কেউ হৃদয়ে থাকে।”
“কিছুই বুঝলাম না আম্মু। বুঝিয়ে বলো না।”

“এসব কথা কখনো পাঁচ কান করিস না। তোর চাচ্চুর আরেকটা বৌ আছে। আমি তার দ্বিতীয় বৌ। তোর দাদা মাহমুদ তালুকদার ছিলেন সমাজের গণ্যমান্য মানুষ। তার প্রভাব-আধিপত্য ছিলো বিশাল। তোর চাচা গোপনে বিয়ে করেছিলেন। সেই বিয়ে বাবা মেনে নেননি। যেদিন এই কথা জানতে পারেন, তার এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে তোর চাচার বৌ করে নিয়ে আসেন। এদিকে তোর বাবার ঘরে কোনো সন্তান হচ্ছিলো না। অন্যদিকে তোর চাচা আমার সাথে ঠিকভাবে কথাও বলতেন না। ছোঁয়া তো বহু দূরের কথা। এমন জীবন কি কোনো মেয়ে চায়? যে জীবনে তার স্বামী তার পাশে শুয়ে আরেক নারীর সাথে রাতভর কথা বলতো। তাও সে কথা জুড়ে থাকতো প্রেম-ভালোবাসা। ওই মহিলা জানতেন না তোর চাচা বিয়ে করেছেন আরেকটা। সে তখন কানাডায়, তার বেবি হয়েছে সেখানেই। কারণ দেশে তো কেউ জানে না সে বিবাহিত। তাই কানাডায় এক আত্মীয়ের বাসায় ডেলিভারি করিয়েছেন। একদিন, দুদিন, তিনদিন। কিন্তু সত্যি কি আর চাঁপা থাকে? মহিলা সম্ভবত অনেক ভালো ছিলেন। দ্বিতীয় বিয়ের কথা জানার পর তোর চাচার সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এই বছর খানেক পরে তোর চাচা আমার কাছে আসেন। তবে এই সংসারে শুধু আমি তার চাহিদা পূরণ করার এক হালাল মাধ্যম ছিলাম। কোনো ভালোবাসা কখনো দেখিনি তার হৃদয়ে আমার জন্য। দেখ, আমার মেয়ের কপালটাও আমার মতো খারাপ। মায়ের কপাল কেন পেলো আমার মেয়েটা?”

শিল্পী বেগম ওড়নার আঁচলে চোখের জল মুছেছেন।
নয়নারও চোখ ভিজে উঠেছে। এতদিন কত বাজে ভাবতো এই মানুষটাকে। অথচ মানুষটার মনের মধ্যে এক সমুদ্র দুঃখ পোষা। উপর থেকে দেখলে কারো ভেতর জানা যায় না। এতো সুন্দর সুখী ফ্যামিলি, সবাই দেখলেই বলবে কত ভাগ্যবতী সে। অথচ মনের মধ্যে কত হাহাকার আর বেদনা লোকানো।

ডাক্তার দ্রুত মিতা বেগমকে ওটিতে নিয়ে গেলেন। হার্ট অ্যাটাক করেছেন মিতা বেগম। ইমার্জেন্সি অপারেশন করাতে হবে।
জাহিন মাথা নিচু করে বসে আছে। তার চোখে অশ্রু। পৃথিবীতে একমাত্র এই মানুষটা তাকে ভালোবাসতেন। এই মানুষটা আজ তার জন্য মৃত্যুর মুখোমুখি। এসবের জন্য কি সে একা দায়ী? ছোটবেলা থেকে তার বাবা তাকে লুজার, অপদার্থ, না জানি আরো কত কী বলে এসেছেন। সেই রাগ, জেদ তাকে আজ এই রাস্তায় নিয়ে এসেছে। তার বাবার চেয়ে বড়লোক হওয়ার নেশা তাকে সহ আরো কত জীবন ধ্বংস করেছে। তার মাধ্যমে সে অনুভূতি কি জাগ্রত হবে জাহিনের মনে?
মেহনুর জাহিনের সামনে এসে দাঁড়ালো। জাহিনকে কটু কথা শোনাতেই এসেছিলো।

জাহিনের উপর মেহনুরের ছায়া পড়তেই, জাহিন এক পলক মেহনুরের দিকে তাকালো। জাহিন হঠাৎ মেহনুর কোমর জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। কান্না করতে করতে বলতে লাগলো, “আমি কি এতোই খারাপ যে কেউ আমাকে ভালোবাসে না? আমি ধ্বংস, তাই কেউ আমাকে ভালোবাসে না। মা, আমার মা, তাকেও আমি শেষ করে দিয়েছি। আমার মায়ের কিছু হলে শেষ করে দেবো আমি নিজেকে। এই জীবন আমার দরকার নেই। জঘন্য, নিকৃষ্ট একটা জীবন আমার। তোমার জীবনটাও আমি নষ্ট করছি। মেরে ফেলো আমাকে। আমি ক্ষমার অযোগ্য।”
মেহনুর জাহিনের মাথায় হাত রাখলো। চুপচাপ হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।

ওই মুহূর্তে ওইটুকু স্পর্শ হৃদয় ছুঁয়ে গেলো জাহিনের। যে মানুষটাকে বিয়ের পর থেকে একটা দিনও শান্তি দেয়নি, সেই মানুষটার থেকে ওইটুকু সহানুভূতি যেনো জাহিনের পাপিষ্ঠ হৃদয়কে বরফের মতো গলিয়ে দিলো। জাহিন চুপ হয়ে সেইভাবেই আঁকড়ে ধরে রাখলো মেহনুরকে।
হঠাৎ নাজিম সাহেব জাহিনকে মেহনুরের কাছ থেকে টেনে এনে পরপর জাহিনের গালে থাপ্পড় দিতে লাগলেন।
মেহনুরের চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগলো। শতহোক, স্বামীকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখে তার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।

জিয়ান হাসপাতালে এসে এই অবস্থা দেখে দ্রুত নিজের বাবাকে সামলে নিলো।
নাজিম চৌধুরী চিৎকার করে বললেন, “চলে যেতে বল এই জানোয়ারটাকে। এতো মানুষ প্রতিদিন মরে, এই কুলাঙ্গার মরতে পারে না। আমার চোখের সামনে থেকে সরে যেতে বল এক্ষুনি, নয়তো আমি নিজের হাতে খুন করবো। এমন ছেলেকে মেরে ফেলতে আমার হাত এক বিন্দু ও কাঁপবে না।”
জিয়ান জাহিনকে বলল, “তুই আপাতত এখান থেকে চলে যা। পরে আসিস।”
জাহিন জিয়ানের পা আঁকড়ে ধরে বলে, “শুধু আম্মুর জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত এখানে থাকতে দে ভাই। তারপর আমি চলে যাবো।”

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ১৯

“বাবা রেগে আছেন। অতিরিক্ত রাগ বাবার স্বাস্থ্যের জন্য রিস্ক।”
জাহিন জিয়ানের পা ধরে বলে, “আমি ওই করিডোরের এক কোণায় পড়ে থাকবো। এইটুকু ভিক্ষা দে আমাকে। আমি কথা দিচ্ছি, আম্মুর জ্ঞান ফেরার পর চলে যাবো।”
জিয়ান জাহিনকে ইশারা করলো।

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২১