Home অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় শেষ পর্ব

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় শেষ পর্ব

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় শেষ পর্ব
সুমি চৌধুরী

জীবনের কিছু অদ্ভুত জিনিস আর অমীমাংসিত বিশ্বাস থাকলেও দিন শেষে এই নিষ্ঠুর বাস্তবটাকে মেনে নিতেই হয়, কারণ বেঁচে থাকতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। যেদিন একটা শিশুর জন্ম হয়, ঠিক সেদিনই তার নামের পাশে অবধারিতভাবে ‘মৃত্যু’ শব্দটাও লিখে দেওয়া হয়। কার কখন, কোন মুহূর্তে ডাক আসবে তা কেউ জানে না। আজ হোক কিংবা কাল, এই মায়ার সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে একদিন আমাদের সবাইকে চিরতরে চলে যেতে হবে, এটাই চরম চিরন্তন সত্য। শুভ্রা মারা গেছে আজ দীর্ঘ ৫ বছর। সেদিনের সেই কালবৈশাখী ঝড়ের রাতে, রক্তাক্ত ব্রিজের ওপর শুভ্রার নিথর হয়ে যাওয়ার পর থেকে গুনে গুনে পাঁচ-পাঁচটি বছর কেটে গেছে। তবে এই পাঁচটি বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। বদলে গেছে চেনা মানুষগুলো, বদলে গেছে এই ব্যস্ত শহর। শুধু ধুলোবালি মাখিয়ে পেছনে রেখে গেছে কারো সুন্দর অতীত, আর কারো বুক চিরে যাওয়া তীব্র যন্ত্রণার এক অতীত।

চৌধুরী বাড়িটার অবস্থা এখন আর আগের মতো ভালো নেই, পুরো বাড়িটা জুড়ে কেমন যেন একটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। সোহান চৌধুরী এখন আর নিজের পায়ে হাঁটতে পারেন না, তিনি চিরতরে হুইলচেয়ারে বন্দি হয়ে পড়েছেন। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে, সেই কালরাত্রিতে শুভ্রার মৃত্যুর খবরটা শোনার সাথে সাথেই তিনি তীব্র হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন, আর সেই থেকে আজ অব্দি তিনি ওই হুইলচেয়ারেই দিন কাটাচ্ছেন। ওদিকে সাহেরা চৌধুরী নিজের একমাত্র আদরের মেয়েকে হারিয়ে শোকে পুরো পাগলের মতো হয়ে গেছেন। শরীরে জীবন থাকলেও তিনি যেন এক জ্যান্ত লাশ সারাদিন চুপচাপ ঘরের কোণে বসে থাকেন, কারো সাথে কোনো কথা বলেন না, মুখে এক চিলতে হাসিও ফোটে না তার।
তবে এই ঘন অন্ধকারের মাঝেও শুভ্র আর রিদির জীবনটা নতুন এক আলোয় আলোকিত হয়েছে। তাদের দুজনের কোল আলো করে এই পৃথিবীতে এসেছে ফুটফুটে একটি কন্যাসন্তান, যার বয়স এখন তিন বছর চলছে। মেয়েটার নাম রাখা হয়েছে ইয়ানা আফরোজ শ্রেয়া। দেখতে ও একদম আস্ত একটা কিউটের ডিব্বা, দুধে-আলতা গায়ের রঙ, আর টানা টানা মায়াবী চোখ সব মিলিয়ে ও যেন এক ডানা কাটা পরী। এই নিস্তব্ধ ও শোকাতুর চৌধুরী বাড়িতে শ্রেয়াই একমাত্র আনন্দের উৎস।

সব থেকে বড় কথা হলো, ঈশানের কোনো খবর নেই। সে আজ কোথায় আছে, কেমন আছে তা এই পৃথিবীর কেউ জানা না। শুভ্রাকে যখন কবর দেওয়া হয়েছিল তখন সে যে কি পরিমাণ পাগলামি করেছিল, তা দেখে উপস্থিত সবার কলিজা কেঁপে উঠেছিল। এক রাতে সে শুভ্রার কবর পর্যন্ত খুঁড়ে লাশ তুলে ফেলেছিল। সে এতটাই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল যে, একটা রাতও সে ঘরের ভেতর থাকেনি সারাটা রাত শুভ্রার ওই ভেজা মাটির কবরের পাশে শুয়ে-বসে ঘুমিয়েছে। কেউ, কোনোভাবেই তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারেনি। ঠিক এভাবে দীর্ঘ তিনটে বছর কাটানোর পর, আজ থেকে দুই বছর আগে হুট করেই ঈশানকে আর শুভ্রার কবরের পাশে দেখা যায়নি। শুভ্র নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে তাকে অনেক খুঁজেছে, পুরো শহর ওলট-পালট করেছে, কিন্তু ঈশানের কোনো হদিস মেলেনি। সে যেন কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে।

তবে অপরাধীদের শেষ রক্ষা হয়নি। শুভ্রার খুনি নির্ভানের আদালতের রায়ে ফাঁসি হয়েছে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর তার বাবা, পৈশাচিক নাহিদ খানকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এক কথায়, পাঁচটা বছরের ব্যবধানে পুরো দুনিয়াটাই বদলে গেছে।
সকালটা আজ অন্য রকম। রোজকার সেই গুমোট ভাবটা কাটিয়ে আজকের আলোটায় কেমন যেন একটা স্নিগ্ধতা আছে। শুভ্র আর রিদি তাদের কলিজার টুকরো আদরের মেয়ে শ্রেয়াকে নিয়ে আজ সকালে ঘুরতে বের হয়েছে। আসলে শ্রেয়াই সকাল থেকে প্রচণ্ড জেদ ধরেছে যে সে আজ বাইরে ঘুরতে যাবে। আর শুভ্র তো তার মেয়ের নামে একপায়ে খাড়া, শ্রেয়া বলতেই সে পুরো পাগল, মেয়ের কোনো আবদার সে জীবনেও ফেলতে পারে না।

তিনজনে মিলে বেশ কিছুক্ষণ শহরের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াল। শ্রেয়ার খিলখিল হাসিতে শুভ্র আর রিদির বিষণ্ণ মনেও আজ এক চিলতে আনন্দের ছোঁয়া লাগল। ঘোরাঘুরি শেষে তারা দুপুরের দিকে একটা সুন্দর রেস্টুরেন্টে ঢুকল। তিনজনে একটা টেবিল ঘিরে একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া শুরু করল। শ্রেয়া নিজ হাতে চামচ দিয়ে পোলাও মুখে তুলছে আর সারা মুখে মাখছে, তাই দেখে শুভ্র পরম মায়ায় হেসে উঠছে।
হুট করেই খাওয়ার মাঝে রেস্টুরেন্টের বাইরের রাস্তা থেকে প্রচণ্ড চিৎকার-চেঁচামেচি আর হট্টগোলের শব্দ শোনা গেল। মানুষের চিল-চিৎকার আর গালিগালাজের সেই তীব্র গণ্ডগোল শোনা মাত্রই শুভ্র খাওয়া ছেড়ে এক ঝটকায় টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।
শ্রেয়া তার বাবাকে ওভাবে হুট করে উঠে দাঁড়াতে দেখে নিজের ছোট ছোট চোখ দুটো বড় বড় করে, তার আধো-আধো মিষ্টি মুখে বলে উঠল,

“কী হতে পাপ্পা, অতে দাড়ালে কেন”
শুভ্র পরম যত্নে শ্রেয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো হেসে বলল,
“তুমি একটু থাকো মামুনি, পাপ্পা জাস্ট একটু বাইরে থেকে আসছে, কেমন”
রিদি বেশ চিন্তিত মুখে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাইরে তো বড্ড ঝামেলা হচ্ছে মনে হচ্ছে, কোথায় যাবেন আপনি”
শুভ্র সংক্ষেপে বলল,
“আসছি।”

এই বলেই শুভ্র রেস্টুরেন্ট থেকে দ্রুত পায়ে বাইরে চলে আসল। বাইরে পা রাখতেই শুভ্রের চোখের সামনে ভেসে উঠল এক অত্যন্ত নির্মম আর অমানবিক দৃশ্য। রেস্টুরেন্টের ঠিক সামনের রাস্তাটায় বিশ-পঁচিশজন মানুষ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাদের মাঝখানে মাটিতে পড়ে থাকা এক জরাজীর্ণ, নোংরা পাগলকে কিছু মানুষ একদম জানোয়ারের মতো লাথি, কিল-ঘুষি আর লাঠি দিয়ে পিটিয়ে যাচ্ছে। একদল মানুষ যেন সমস্ত বিবেক বিসর্জন দিয়ে ওই অসহায় পাগলটার ওপর নিজেদের গায়ের জোর দেখাচ্ছে। মাটিতে পড়ে থাকা পাগলটা তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, ধুলোবালির মধ্যে গড়াগড়ি খেয়ে ছটফট করছে আর বাঁচানোর জন্য আকুতি করছে। কিন্তু ওই হিংস্র মানুষগুলোর মনে বিন্দুমাত্র দয়া হচ্ছে না।
এই অন্যায় দেখে শুভ্রের মাথা গরম হয়ে গেল। সে নিজের গায়ের সমস্ত শক্তি এক করে সিংহের মতো গর্জন করে এক প্রচণ্ড ধমক দিয়ে চিৎকার করে উঠল,

“এইইই, কী হচ্ছেটা কী এখানে, থামুন বলছি, একটা মানুষকে এভাবে মারছেন কেন”
শুভ্রের সেই বজ্রকণ্ঠের ধমক আর বলিষ্ঠ উপস্থিতি দেখে লাঠি হাতে থাকা মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যে দমে গেল। শুভ্রের চোখ-মুখের রাগ দেখে তারা ভয়ে এক এক করে পিছাতে শুরু করল এবং পাগলটাকে মারা ছেড়ে দিল। চারপাশের ভিড়টা একটু হালকা হতেই শুভ্র ধীর পায়ে মাটিতে পড়ে থাকা সেই ছটফট করতে থাকা পাগলটার দিকে এগিয়ে গেল। পাগলটা তখনো মাটিতে শুয়ে ব্যথায় গোঙাচ্ছে। তার সারা শরীরে কালচে ধুলোবালি আর কাদা মাখা। পরনে একটা অত্যন্ত ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত শার্ট, যা টেনে-হিঁচড়ে জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। মাথার চুলগুলো জট পেকে জঙ্গল হয়ে আছে, মুখে এক মুখ বড় বড় উস্কোখুস্কো দাঁড়ি । লোকটা নিজের হাত দুটো দিয়ে মুখটা ঢেকে এক কোণে গুটিসুটি মেরে পড়ে কাঁপছে।
শুভ্র তার ঠিক সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। লোকটার ছেঁড়া শার্ট আর তার হাতের অবয়ব দেখে শুভ্রের বুকের ভেতর কেমন যেন চেনা এক অস্বস্তি মোচড় দিয়ে উঠল। সে অত্যন্ত সাবধানে নিজের হাত বাড়িয়ে পাগলটার মুখের ওপর থেকে তার নোংরা, জট পাকানো চুলগুলো সরিয়ে দিল।

আর চুলগুলো সরানো মাত্রই যেন এক তীব্র ধাক্কা লাগল শুভ্রের বুকে। তার পায়ের নিচের মাটি যেন এক নিমেষে সরে গেল। ভালো করে লক্ষ্য করতেই শুভ্র দেখল এই উস্কোখুস্কো, দাড়িওয়ালা, নোংরা আর জরাজীর্ণ পাগলটা আর অন্য কেউ নয় এ যে তাদের হারিয়ে যাওয়া সেই ঈশান।
পাঁচ বছর আগের সেই সুদর্শন, চওড়া বুকের, ধবধবে সাদা ঈশান আজ চরম নিষ্ঠুর বাস্তবতার আঘাতে, ভালোবাসার মানুষ হারানোর তীব্র যন্ত্রণায় পুরোপুরি এক আস্ত পাগল হয়ে এই মাঝরাস্তায় ধুলোবালি মেখে পড়ে আছে। ঈশানের এই মর্মান্তিক দশা দেখে শুভ্রের চোখ দুটো মুহূর্তে জলে ভিজে উঠল, তার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরল না। চোখ থেকে টপ টপ করে নোনা জল গড়িয়ে ঈশানের সেই ধুলোমাখা নোংরা গায়ের ওপর পড়তে লাগল। তার বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল। সে ঝাপসা চোখে ঈশানের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত করুণ গলায় ডেকে উঠল,

“ঈশান…”
শুভ্রের গলার আওয়াজ পেয়ে ঈশান হঠাৎ চমকে উঠে আরও দূরে সরে গেল। সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ছেঁড়া শার্টের হাতাটা আঁকড়ে ধরে অবুঝের মতো বলল,
“মারবি না মারবি না আমাকে, আমাকে যদি মারিস, তাহলে শুভ্রার ভূত দিয়ে তোকে এক্কেবারে মেরে দেব। তুই জানিস, প্রতি রাতে আমার শুভ্রা আমার সাথে দেখা করতে আসে। ধবধবে একটা সাদা শাড়ি পড়ে আসে, আর ওর সারা শরীর থেকে একদম আলো বের হয়, কী সুন্দর যে লাগে দেখতে”
ঈশানের মুখ থেকে এমন অসংলগ্ন কথা শুনে শুভ্রের আর বুঝতে বাকি রইল না যে, ভালোবাসার তীব্র আঘাতে ঈশান আক্ষরিক অর্থেই তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে। শুভ্র নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারল না, সে মুহূর্তের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে ঈশানের সেই ধুলোবালি মাখা নোংরা শরীরটাকে নিজের শক্ত বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু ঈশান এক ঝটকায় শুভ্রকে নিজের গা থেকে সরিয়ে দিয়ে নাক কুঁচকে বলল,

“ছিঃ, কী ময়লা তোর শরীরে, যা এখান থেকে, দূরে যা”
বলেই ঈশান আবার নিজেই পাগলের মতো খিলখিল করে হাসতে হাসতে পেটে হাত দিয়ে বলল,
“আমার বড্ড খিদে পেয়েছে রে আজ অনেক দিন হলো আমি ভাত খাই না। আমাকে একটু খেতে দে না, দিবি খেতে”
কথাটা বলেই ঈশান চোখের পলক ফেলে শুভ্রের মুখের দিকে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ভালো করে তাকাল। তার ধোঁয়াটে স্মৃতির পাতা থেকে যেন একটা চেনা অবয়ব ভেসে উঠল। সে হঠাৎ শুভ্রের হাতটা চেপে ধরে আহ্লাদিত গলায় বলল,
“এই, তুই… তুই শুভ্র না, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার মনে পড়েছে, তোর বাড়িতেই তো আমার শুভ্রা থাকত। জানিস শুভ্র… শুভ্রা না মরেনি, আমার শুভ্রা এখনো বেঁচে আছে, ও প্রতি রাতে আমার কাছে আসে, আমাকে ওর কোলে মাথা রেখে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, পরম আদরে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কিন্তু এই দুনিয়ার পচা মানুষগুলো কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে না রে, সবাই বলে আমি নাকি পাগল হয়ে গেছি, হি হি… কিন্তু আমি তো জানি আমি একটুও মিথ্যা বলছি না”
বলেই ঈশান তার অবশ হয়ে আসা দুর্বল শরীরটা নিয়ে কোনো রকমে টেনেটুনে উঠে দাঁড়াল। নিজের মাথার জট পাকানো নোংরা চুলগুলো দুই হাতে পাগলের মতো টানতে টানতে সে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

“কিন্তু শুভ্রার সাথে আমি আর কথা বলি না ও একটা বেইমান। আমাকে বলেছিল কোনোদিন ছেড়ে যাবে না, অথচ মাঝরাস্তায় আমাকে ফাঁকি দিয়ে নিজে একা একা চলে গেল। নিজে মরে গিয়ে দিব্যি শান্তিতে আছে, আর আমাকে দিয়ে গেছে এক বুক নরক যন্ত্রণা। বড্ড খারাপ মেয়ে একটা”
পেছন থেকে শুভ্র একছুটে এসে ঈশানের নোংরা হাতটা শক্ত করে ধরে ব্যাকুল হয়ে বলল,
“ঈশান, কোথায় যাচ্ছ তুমি, চলো, আমাদের সাথে বাড়ি চলো।”
ঈশান খিলখিল করে হাসতে হাসতে মাথা নেড়ে বলল,
“উঁহু, বাড়ি যাব না, আমার শুভ্রা তো বাড়ি যায় না। আমি রাতের বেলা মস্ত বড় গাছতলায় ঘুমাই, আর ওইখানেই আকাশ থেকে আমার শুভ্রা নেমে আসে। আমি যদি ঠিক সময়ে গাছতলায় না থাকি, তবে ও বড্ড রাগ করে। অনেক অভিমান ওর, আমার সাথে কথাই বলতে চায় না”
বলেই সে আবার সামনের দিকে দু-পা বাড়াল, কিন্তু পরক্ষণেই হুট করে থমকে দাঁড়িয়ে পেটে হাত দিয়ে বলল,

“আমাকে কিছু খেতে দে না রে শুভ্র… খুব ক্ষুধা লেগেছে। আজ অনেক দিন পর পেটটা খালি লাগছে, আমাকে একটু মাংস দিয়ে ভাত খেতে দে না”
শুভ্র নিজের চোখের জল হাতা দিয়ে মুছে কাঁপা গলায় বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো আমার সাথে। তোমাকে পেট ভরে মাংস-ভাত, যা খেতে চাও সবকিছু দেব।”
ঈশান বাচ্চার মতো চোখ বড় বড় করে বিশ্বাস না করার মতো গলায় বলল,
“সত্যি বলছিস, ফাঁকি দিবি না তো”

শুভ্র হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। তারপর পরম মমতায় ঈশানের হাত ধরে তাকে রেস্টুরেন্টের ভেতরে নিয়ে আসল। হুট করে এই জরাজীর্ণ, দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পাগলটাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে আর তার মুখটা ভালো করে লক্ষ্য করে রিদি চমকে উঠে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঈশানের শরীরের এই বীভৎস ও করুণ অবস্থা দেখে রিদির মুখ থেকে কথা বলার মতো সব ভাষা যেন এক মুহূর্তে হারিয়ে গেল। একসময়ের এত পরিপাটি, চওড়া বুকের, স্মার্ট সেই ছেলেটার আজ একি দশা। রিদি যেন নিজের চোখ দুটোকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। সে বুকে হাত দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় শুধু উচ্চারণ করতে পারল,
“ঈ-ঈশান…”

ঈশান তখন রিদির কথার দিকে বিন্দুমাত্র কান না দিয়ে ড্যাবড্যাব করে ছোট শ্রেয়ার প্লেটের দিকে তাকাল। প্লেটে থাকা লালচে মাংসের টুকরোটা দেখে ক্ষুধার্ত ঈশানের চোখ জোড়া এক অদ্ভুত তৃষ্ণায় ছলছল করে উঠল। সে আর এক সেকেন্ডও তর সইল না, এক টানে ছোঁ মেরে তিন বছরের বাচ্চাটার প্লেট থেকে মাংসের টুকরোটা কেড়ে নিয়ে মুখে পুরে দিল। সে গোগ্রাসে সারা মুখে ঝোল আর মশলা মাখিয়ে এমন বন্যভাবে খেতে লাগল, যেন কত শত দিন ধরে সে মুখে এক দানা অন্নও তোলেনি। তিন বছরের ছোট্ট শ্রেয়া তার প্লেট থেকে খাবার কেড়ে নেওয়া এই অদ্ভুত, দাড়িওয়ালা মানুষটার দিকে অবুঝ আর অবাক চোখে তাকিয়ে দাঁড়ি ঈশান হঠাৎ তার খাওয়া থামিয়ে, মুখে ঝোল মেখে অবুঝের মতো গোল গোল চোখে ছোট্ট শ্রেয়ার দিকে তাকাল। তারপর শুভ্রের দিকে আঙুল তুলে বলল,
“এই ছোট্ট মেয়েটা কে রে?”
শুভ্র তার নিজের চোখের কোণের জলটা লুকিয়ে আলতো হেসে বলল,

“ও আমার মেয়ে, শ্রেয়া।”
ঈশান সাথে সাথে চোখ কপালে তুলে হাত নেড়ে বলল,
“দূর কিসের মেয়ে তোর? তুই তো পুরুষ মানুষ, তোর মেয়ে কেমনে হয়? পুরুষ মানুষ কখনো সন্তান জন্ম দিতে পারে না, হি হি তুই আমাকে বোকা বানাচ্ছিস।”
শুভ্র ঈশানের এই বাচ্চার মতো কথায় কষ্ট পেয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে নরম গলায় বলল,
“আমি জন্ম দিইনি, রিদি দিয়েছে।”
ঈশান ভ্রু কুঁচকে চারপাশ তাকিয়ে বলল,
“অ্যাঁ? রিদি কে?”

শুভ্র চোখের ইশারায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিদিকে দেখিয়ে দিল। ঈশান সাথে সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে রিদির দিকে তাকাল। রিদি তখনো নিজের আঁচল মুখে চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ঈশান রিদির মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে ভালো করে তাকিয়ে রইল। তার ঝাপসা স্মৃতির পাতা থেকে যেন পুরনো কিছু চেনা দৃশ্য ভেসে উঠল। সে হঠাৎ একগাল হেসে হাততালি দিয়ে বলল,
“আরে মনে পড়েছে। ওকে তো আমার শুভ্রার সাথে কত দেখেছি। দুজনে আগে কত খেলত। ছোটবেলা থেকে ওকে আর শুভ্রাকে একসাথে পুতুল খেলতে দেখেছি আমি।”
বলেই ঈশান আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে ধপ করে একটা খালি চেয়ারে বসে পড়ে এবার শুভ্রের প্লেটের দিকে হাত বাড়াল। শুভ্রের প্লেট থেকে পোলাও নিয়ে সে গোগ্রাসে মুখ ভর্তি করে খাওয়া শুরু করল। তার খাওয়ার ধরন দেখে মনে হচ্ছে সে কত যুগের এক অনাহারী মানুষ, পেটে যেন দিনের পর দিন কোনো দানাপানি পড়েনি। দেখতে দেখতে পুরো প্লেটের খাবার সাবাড় করে দিয়ে ঈশান একটা তৃপ্তির দীর্ঘ ঢেকুর তুলল। তারপর শুভ্রের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
“আমি না এখান থেকে কিছু খাবার সাথে করে নিয়ে যাই? আমার শুভ্রা রাতে আসে। ও আসলে ওকে এই পোলাও খেতে দেব। ও বড্ড ভালোবাসে। আমি তো আর ওকে ছাড়া একা একা সব খেতে পারি না।”
শুভ্র নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে কামড়ে ধরে ভেতরের বুকফাটা কান্নাটা কোনো রকমে আটকে রেখে ভাঙা গলায় বলল,

“হ্যাঁ ঈশান, সব… সব নিয়ে নাও তুমি।”
কথাটা শুনেই ঈশান একগাল হাসল। তারপর টেবিল থেকে অল্প কিছু পোলাও আর মাংস তুলে নিয়ে নিজের সেই ময়লা শার্টের ছেঁড়া কোণাটা মেলে তার মধ্যে পোটলা করে বেঁধে নিল। খাবারটা সযত্নে পেটের সাথে চেপে ধরে সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি যাই রে শুভ্র… আমার শুভ্রা মনে হয় এতক্ষণে আমার জন্য একা একা বসে আছে।”
শুভ্র আর থাকতে পারল না, সে চট করে এগিয়ে গিয়ে ঈশানের দুটো কাঁধ শক্ত করে ধরে আকুল হয়ে বলল,
“কোথায় যাবে তুমি এই অবস্থায়? চলো, আমাদের সাথে বাড়ি চলো ঈশান।”
শুভ্রর ছোঁয়া পেয়ে ঈশান আবার ছিটকে দূরে সরে গেল। সে ভয় পেয়ে মাথা দুলাতে দুলাতে বলল,
“না। ওই বাড়িতে তো শুভ্রা নেই। শুভ্রা যেখানে নেই, সেখানে আমিও নেই। যেদিন শুভ্রা আবার ওই বাড়িতে ফিরে আসবে, আমার সাথে আগের মতো দুষ্টুমি করবে, ঠিক সেদিন আমি তোর বাড়ি যাব। তুই যদি আমাকে সত্যিই বাড়ি নিয়ে যেতে চাস শুভ্র, তাহলে আমার শুভ্রাকে ওই অন্ধকার কবরটা থেকে তুলে এনে দে না। দিবি এনে?”

ঈশানের এই বুক চিরে যাওয়া আকুতি শুনে রিদি আর নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারল না। সে শব্দ করে ডুকরে কেঁদে উঠে ধপ করে পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল।মায়ের এই কান্না দেখে তিন বছরের ছোট্ট শ্রেয়া খাওয়া ছেড়ে ছুটে আসল। সে রিদির পাশে দাঁড়িয়ে তার ছোট্ট দুটি হাত মায়ের কাঁধে রেখে অবুঝের মতো বলল,
“মাম্মা? তুমি কাঁদছো কেন? এই ময়লা লোকটা কে মাম্মা? ও কেন ওভাবে কথা বলছে?”
রিদি নিজের চোখের জল মুছে শ্রেয়াকে কাছে টেনে নিল। তারপর তার তুলতুলে দুধে-আলতা গালে নিজের দুহাত রেখে কেঁদে কেঁদে বলল,
“ও কোনো ময়লা লোক না সোনা, ও হচ্ছে তোমার মামু। ওনাকে তুমি মামু বলে ডাকবে, মনে থাকবে?”
শ্রেয়া তার টানা টানা চোখ দুটো গোল গোল করে বলল,
“ওহ, আচ্ছা… মামু। কিন্তু মামু এমন নোংরা কেন মাম্মা? মামু কি গোসল করে না? আর মামুর মুখে বারবার আমি আমার ফুপির নাম শুনছি কেন? ও কেন বলছে আমার ফুপির নাম?”
রিদি শ্রেয়াকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে, ঈশানের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে অশ্রুভেজা কণ্ঠে বলল,

“কারণ তোমার ফুপি তোমার এই মামুকে বড্ড বেশি ভালোবাসতো সোনা, আর তোমার এই মামুও এখনো তোমার ফুপিকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।”
শুভ্র নিজের মনকে শক্ত পাথর বানিয়ে নিল। ঈশানের সারা শরীরে মানুষের দেওয়া নির্মম মারের কালচে দাগ, শার্ট ছেঁড়া, জরাজীর্ণ অবস্থা। এই অবস্থায় ছেলেটাকে এভাবে একা ছেড়ে দিলে ও সত্যিই না খেতে পেয়ে, রাস্তায় রাস্তায় ধুঁকে ধুঁকে মরে যাবে। বোন তো চলে গেছে, কিন্তু বোনের ভালোবাসার এই মানুষটাকে সে আর এভাবে হারিয়ে যেতে দিতে পারে না। শুভ্র ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঈশানের কাঁধ দুটো আলতো করে ধরল, তারপর চোখে এক বুক মিথ্যা আশ্বাস নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ ঈশান, চলো। তোমাকে আমি তোমার শুভ্রার কাছেই নিয়ে যাব।”
শুভ্রার নাম শুনতেই ঈশানের চোখের মণি দুটো চকচক করে উঠল। সে ছোট বাচ্চাদের মতো খুশিতে রাস্তায় লাফিয়ে উঠে বলল,

“সত্যি বলছিস? তুই তুই আমাকে আমার শুভ্রার কাছে নিয়ে যাবি? ফাঁকি দিচ্ছিস না তো?”
শুভ্র নিজের চোখের জল লুকিয়ে জোর করে মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“একদম সত্যি। তাহলে চলো আমার সাথে?”
ঈশান তার শার্টের কোণায় বাঁধা পোলাওয়ের পোটলাটা বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে আনন্দের আতিশয্যে বলতে লাগল,
“আচ্ছা, আচ্ছা চল। আমি আমার শুভ্রার কাছে যাব, ও আমাকে এত দিন পর দেখে আবার আগের মতো অনেক দুষ্টুমি করবে, তাই না রে শুভ্র?”
শুভ্র আর কথা বাড়াল না। সে ঈশান, রিদি আর শ্রেয়াকে সাথে নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বাইরে রাস্তার ধারে বের হয়ে আসল। ঈশান খুশিতে আত্মহারা হয়ে অনবরত নিজের মনে কী সব হাবিজাবি বকেই চলেছে। ঠিক তখনই রাস্তার ওপাশে একটা রঙিন আইসক্রিমের ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল ছোট্ট শ্রেয়া। আইসক্রিম দেখেই তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে শুভ্রের শার্ট টেনে ধরে আধো-অধো গলায় বায়না ধরল,
“পাপ্পা। আমি আইচক্রিম খাবো।”

রিদি চারপাশের পরিস্থিতি আর ঈশানের অবস্থা দেখে শ্রেয়াকে শান্ত করার জন্য বলল,
“না সোনা, এখন না। পরে পাপ্পা তোমাকে অনেক আইসক্রিম এনে দেবে, এখন চলো বাড়ি যাই।”
কিন্তু তিন বছরের অবুঝ শ্রেয়া মায়ের কোলেই দুই হাত দিয়ে চোখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে উঠল,
“না, না, না। আমি এখনি খাবো। আমি কিচ্ছু জানি না, আমাকে এখনি আইচক্রিম এনে দাও।”
মেয়ের এই কান্না দেখে শুভ্র একটু ভাবল। তারপর সে ঈশানের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বুদ্ধি খাটিয়ে একটা কথা বলল,
“ঈশান… ওই দেখো, শুভ্রা না আইসক্রিম খেতে চাইছে। এখন যদি Oke আইসক্রিম না নিয়ে দিই, তবে তোমার শুভ্রা বড্ড রাগ করবে কিন্তু। তুমি এক কাজ করো, এখানে একদম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি রাস্তার ওপারে গিয়ে চট করে আইসক্রিম কিনে আসছি, কেমন?”
শুভ্রার রাগ করার কথা শুনতেই ঈশান একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল,

“আচ্ছা, আচ্ছা যা তুই। জলদি গিয়ে নিয়ে আয়। বেশি করে নিয়ে আসবি কিন্তু, যাতে আমার শুভ্রা খেয়ে অনেক খুশি হয়। আমি এখানে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকব, একটুও নড়ব না এখান থেকে।”
ঈশান সত্যি লক্ষ্মী ছেলের মতো হাত দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। শুভ্র আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি বড় রাস্তাটা পার হয়ে ওপাশের আইসক্রিম ভ্যানের কাছে গেল। দোকানদারকে আইসক্রিমের কথা বলতেই হুট করে শুভ্রের পকেটে থাকা ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে তাকাতেই শুভ্র দেখল বিদেশ থেকে একটা অত্যন্ত জরুরি অফিশিয়াল কল এসেছে। সে আর দেরি না করে কলটা রিসিভ করে কথা বলতে শুরু করল। ওপাশের কথাগুলো এতটাই জটিল আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, শুভ্র পুরো দুনিয়া ভুলে ফোনের ভেতরেই মগ্ন হয়ে গেল। দোকানদার তার হাতে আইসক্রিমটা তুলে দিতেই শুভ্র নিজের মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করল, কিন্তু ফোনের দিকে মনোযোগ থাকায় সে একশো টাকার জায়গায় একটা এক হাজার টাকার নোট দোকানদারের হাতে গুঁজে দিল। তারপর ফোনে অনবরত কথা বলতে বলতেই সে অবচেতন মনে রাস্তার দিকে পা বাড়াল। পিছন থেকে আইসক্রিমওয়ালা লোকটা চেঁচিয়ে বলতে লাগল, “আরে স্যার। ভাঙতি টাকাটা নিয়ে যান। স্যার… শুনুন।” কিন্তু শুভ্র তখন ফোনের ওপাশের কথায় এতটাই ডুবে আছে যে তার কানে সেই ডাক পৌঁছালই না।

ওদিকে রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে থাকা রিদি হুট করে সামনের দিকে তাকিয়ে তীব্র আতঙ্কে জমে গেল। সে খেয়াল করল, শুভ্র ফোনের ওপাশে পুরোপুরি মগ্ন হয়ে কথা বলতে বলতে অন্যমনস্কভাবে রাস্তার দিকে এগিয়ে আসছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, ওপাশের মোড় ঘুরে একটা মস্ত বড় প্রাইভেট কার প্রচণ্ড তীব্র গতিতে সেই রাস্তা দিয়েই ধেয়ে আসছে। রিদি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না, শুভ্র কি অন্ধ হয়ে গেছে? ও কি দেখতে পাচ্ছে না যে সামনে থেকে একটা যমদূত গাড়ি ধেয়ে আসছে? তাহলে ও ওভাবে অবহেলার সাথে কেন এগোচ্ছে?
রিদির এই ভাবনার মাঝেই, শুভ্র ফোনের ওপাশের মানুষের সাথে তর্ক করতে করতে মেইন রাস্তায় নিজের পা দিয়ে দিল। ওদিকে গাড়িটার স্পিড এতটাই বেশি ছিল যে চালক ব্রেক কষারও সুযোগ পায়নি, সেটা শুভ্রের একদম কাছাকাছি চলে এসেছে।

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাগল ঈশান হুট করে এই দৃশ্যটা দেখল। আর দেখা মাত্রই, এক অদ্ভুত অলৌকিক উপায়ে তার বুকের ভেতরটা এক তীব্র যন্ত্রণায় ধক করে উঠল। তার ঘোলাটে মস্তিস্কে যেন এক পলকে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল, এই লোকটা শুভ্র, ছোট থেকে যে তাকে আশ্রয় দিয়েছে, ভাইয়ের মতো মানুষ করেছে, বিপদে পাশে থেকেছে। সে চিনে ফেলল পুরোপুরি ভাবে শুভ্রকে।
শুভ্র যখন রাস্তার ঠিক মাঝখানে, গাড়িটা তখন তার শরীর থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে। আর এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ, তারপরই গাড়িটা শুভ্রকে চাকার নিচে পিষে ছিন্নভিন্ন করে চলে যাবে। এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে রিদি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করতে যাবে, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হওয়ার আগেই এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটে গেল। ওই জরাজীর্ণ, অবশ হয়ে থাকা পাগল ঈশান এক মুহূর্তের জন্য যেন ঝড়ের গতি পেয়ে গেল। সে এক মরণকামড় দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে দৌড়ে গিয়ে নিজের পুরো শরীরের শক্তি দিয়ে জোরে একটা ধাক্কা মারল শুভ্রকে। সেই তীব্র ধাক্কায় শুভ্র ছিটকে গিয়ে রাস্তার ওপাশের কিনারে আছাড় খেয়ে পড়ল। কিন্তু শুভ্র বেঁচে গেলেও ঈশান নিজেকে আর বাঁচাতে পারল না। শুভ্রকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার ঠিক সেই মুহূর্তেই, এক ঝটকায় সেই কালচে প্রাইভেট কারের সামনের অংশটা এসে সজোরে আঘাত করল ঈশানের পেটে আর বুকে।

“ধড়াসসস”
এক বিকট, হাড়গোড় ভাঙার শব্দ হলো চারদিকে। গাড়ির সেই তীব্র ধাক্কায় ঈশানের জরাজীর্ণ নোংরা শরীরটা শূন্যে কয়েক ফুট ওপরে উঠে গেল, তারপর চট করে বেশ খানিকটা দূরে পিচঢালা শক্ত রাস্তার ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই তার মুখ আর নাক দিয়ে গলগল করে তাজা লাল রক্ত ছিটকে বের হতে লাগল। শক্ত রাস্তায় মাথাটা সজোরে লাগার কারণে এক নিমেষে তার মস্তিষ্ক ফেটে গেল, আর দেখতে দেখতে সেই কালচে পিচ রাস্তার ওপর লাল রক্তের একটা ছোটখাটো বন্যা বয়ে গেল। তার শার্টের কোণায় এত যত্ন করে বেঁধে রাখা পোলাওয়ের পোটলাটা ছিঁড়ে গিয়ে চারপাশের রক্তের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল।

শুভ্র রাস্তার ওপাশে মাটিতে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই নির্মম, বীভৎস দৃশ্যটা দেখল। তার হাতের আইসক্রিম আর ফোন কখন মাটি ছুঁয়েছে সে নিজেও জানে না। তার কলিজা কাঁপানো এক চিল-চিৎকার পুরো পুরান ঢাকার আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল।
“ঈশাআআআআআআআআন…”
এক মুহূর্তে চারপাশের সমস্ত মানুষ এক জায়গায় জড়ো হয়ে মস্ত বড় ভিড় জমিয়ে ফেলল। গাড়িটা ততক্ষণে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু শুভ্রের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে পাগলের মতো ছুটে এসে ঈশানের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। পিচঢালা রাস্তা থেকে ঈশানের রক্তাক্ত মাথাটা পরম মমতায় তুলে নিজের কোলের ওপর নিয়ে ভাঙা গলায় চিৎকার করে বলল,
“ঈশান। এটা তুমি কী করলে ঈশান? কেন বাঁচাতে গেলে আমাকে? মরতে দিতে আমাকে… কেন এমন করলে?”

মস্তিষ্কে প্রচণ্ড আঘাত লাগার কারণেই হোক কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঈশানের ভেতরের সেই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিটা হয়তো পুরোপুরিভাবে ফিরে এসেছে। তার চোখের সেই ধোঁয়াটে পাগল ভাবটা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেছে। সে নিজের শেষ নিঃশ্বাসটুকু নেওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে, হাঁপাতে হাঁপাতে অতি কষ্টে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,
“যার আশ্রয়ে, যার আশ্রয়ে আমি এত বড় হয়েছি বস, যার আশ্রয়ে শুভ্রা নামক একটা পবিত্র মেয়েকে আমি নিজের জীবনে পেয়েছি, সেই মানুষটাকে আমি চোখের সামনে এভাবে মরতে দিই কী করে, বলুন তো বস?”
ঈশানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে শুভ্র আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে চারপাশের গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসুক মানুষের দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচিয়ে বলল,
“কী তামাশা দেখছেন আপনারা? জলদি একটা অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন কেউ। প্লিজ, কেউ একটা গাড়ি ডাকুন।”
ঈশান শুভ্রের শার্টের হাতাটা তার রক্তমাখা হাত দিয়ে আলতো করে চেপে ধরে বলল,

“না বস… আ-আমি আর বাঁচতে চাই না। আমি আমার শুভ্রার কাছে যেতে চাই… যেতে দিন আমাকে আমার শুভ্রার কাছে। ও ওপারে হয়তো বড্ড অভিমান করে এতগুলো বছর ধরে শুধু আমার জন্যই অপেক্ষা করে আছে। আমি ওর কাছে চলে যাব বস। এই নিষ্ঠুরতম মায়ার পৃথিবীতে আমি আর একটা মুহূর্তও থাকতে চাই না। জানেন বস? আমি চাইলে… আমি চাইলে অনেক আগেই নিজের হাত কেটে বা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে পারতাম। কিন্তু আমি করিনি… কারণ আমি আমার শুভ্রাকে কথা দিয়েছিলাম যে আমি নিজের কোনো ক্ষতি করব না। মনে মনে ভাবতাম, যদি নিজের ক্ষতি করি, তবে ওপারে গিয়ে শুভ্রা আমার ওপর বড্ড রাগ করবে, আর রাগ করে যদি ও আমার সাথে আর কোনোদিন কথাই না বলে? তাই আমি এই ভয়ে আত্মহত্যা করিনি। শুধু ছটফট করে অপেক্ষা করছিলাম কখন আমার স্বাভাবিক মৃত্যু হবে আর আমি আমার শুভ্রার কাছে চলে যাব। আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছে বস, এই সুযোগ আমি কোনোভাবেই হারাতে চাই না। বস, আমি শুভ্রার কাছে যেতে চাই, আমাকে যেতে দিন।”

শুভ্র একদম ছোট বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। ওদিকে রিদিও শ্রেয়াকে কোলে নিয়ে একছুটে এসে ঈশানের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। ঈশানের মাথা থেকে গলগল করে রক্ত বের হতে দেখে সে আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে লাগল এবং শুভ্রকে বলল,
“তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে চলুন ওনাকে। এভাবে ফেলে রাখলে হবে না, এখনি নিয়ে যেতে হবে।”
শুভ্র এক অদ্ভুত শান্ত কিন্তু কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় বলল,
“না রিদি।”
রিদি চরম অবাক আর ক্ষুব্ধ হয়ে বলল,
“মা-মানে? আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? এভাবে রাস্তায় ফেলে রাখলে ও তো এখনই মরে যাবে।”
শুভ্র আকাশপানে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“মরতে দে ওকে, চলে যাক ও ওর শুভ্রার কাছে। এই স্বার্থপর পৃথিবীতে এভাবে প্রতিদিন তিলে তিলে নরক যন্ত্রণায় ভোগার চেয়ে ওর মরে যাওয়াটাই অনেক ভালো। মরতে দে ওকে।”
বলেই শুভ্র ঈশানের রক্তাক্ত দেহটাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাস্তার মাঝখানেই চিৎকার করে কাঁদতে থাকল। ঈশান তখন নিজের শরীরের শেষ অবশিষ্ট শক্তিটুকু এক জায়গায় জড়ো করে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে খুব ধীর লয়ে বলল,

“বস একটা সত্যি কথা বলি, আমি না মন থেকে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেছি অনেক আগে। শুধু তাই না… এই জরাজীর্ণ পোশাকেই আমি মসজিদের বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একা একা নামাজও পড়েছি। আমার শরীরটা নোংরা ছিল বলে মসজিদের ভেতরের মানুষগুলো আমাকে ঢুকতে দেয়নি, তাই আমি ওই ধুলোবালির ওপর বাহিরেই সিজদা দিয়েছি। আমি প্রাণভরে আল্লাহকে ডেকেছি, ওনাকে বলেছি, উনি যেন পরপারে আমার শুভ্রার সাথে আমাকে দেখা করিয়ে দেন। আমি শুনেছি ইসলামে বলা আছে যে ব্যক্তি মন থেকে খাঁটিভাবে ইসলাম গ্রহণ করে, আল্লাহ তাআলা তার জীবনের আগের সব গুনাহ মাফ করে দেন। তাহলে আল্লাহ তো আমার সব পাপও মাফ করে দিয়েছেন, তাই না বস? তাই এখন আমি মন থেকে দোয়া করি… আল্লাহ যেন আপনাকে অনেক ভালো রাখে। আজকে যেভাবে রাস্তা পার হওয়ার সময় ফোনে অন্যমনস্ক হয়ে আসছিলেন, এমন বেখেয়াল কখনো হবেন না। সব দিকে খেয়াল রাখবেন… কারণ আপনার একটা সুন্দর পরিবার আছে। প্রত্যেকটা পরিবারের মাথার ওপর একটা ছায়ার মতো মস্ত বড় গাছ থাকে, আর সেই গাছের ছায়া দিয়েই পুরো পরিবারটা বেঁচে থাকে। আর আপনার এই ছোট্ট পরিবারের সেই গাছটাই হচ্ছেন আপনি। আপনার কিছু হয়ে গেলে… আপনার কিছু হয়ে গেলে এই রিদি নামের মেয়েটাও আমার মতো পাগল হয়ে যাবে। ভালোবাসার মানুষকে হারানোর তীব্র যন্ত্রণা ও সইতে পারবে না… একদম পারবে না। তাই নিজের খেয়াল রাখবেন… আর রিদিকেও অনেক ভালো রাখবেন।”
বলেই ঈশান এক বুক গভীর শ্বাস নিল, তার চোখের কোণ দিয়ে দু-ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,

“আমার একটা শেষ ইচ্ছে রাখবেন… ভাই?”
ঈশানের মুখ থেকে জীবনের প্রথমবার এই ‘ভাই’ ডাকটা শুনে শুভ্রের চারপাশের পুরো পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার কান্না হুট করে থেমে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে ঈশানের মুখের দিকে তাকিয়ে আকুল হয়ে বলল,
“কী বললে ঈশান? আবার বলো… আরেকটা বার বলো, কী বললে তুমি আমাকে?”
ঈশান চোখ দুটো বুজে আসার উপক্রম হতেই ঠোঁটটা একটু কাঁপিয়ে বলল,
“ভাইয়া… আমার একটা ইচ্ছে রাখবেন?”
শুভ্র এবার আরও দ্বিগুণ বেগে কেঁদে দিল। সারাটা জীবন সে ঈশানকে কতবার বলেছে তাকে একটা বার ‘ভাই’ বলে ডাকতে, কিন্তু ঈশান কখনো ডাকেনি। আর আজ সেই ছেলেটাই কিনা নিজের মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাকে পরম মায়ায় ‘ভাইয়া’ বলে ডাকছে। শুভ্র ঈশানের রক্তমাখা গালে নিজের হাতটা রেখে বলল,
“বলো… বলো কী ইচ্ছে তোমার? আমি নিজের জীবন দিয়ে হলেও তোমার সেই ইচ্ছে পূরণ করব।”
ঈশান এক বুক তৃপ্তি নিয়ে বলল,

“আমাকে… আমাকে যেন মুসলমানদের মতো কবর দেওয়া হয় ভাইয়া। আমার লাশটা যেন চিতায় পুড়িয়ে ফেলা না হয়। আর… আর আমার কবরটা যেন একদম শুভ্রার কবরের ঠিক পাশে হয়। এই মায়ার পৃথিবীতে আমরা একসাথে বাঁচতে পারলাম না তো কী হয়েছে… অন্তত ওপারে গিয়ে মাটির নিচে পাশাপাশি শান্তিতে ঘুমাতে তো পারব। আমি সারাজীবনের জন্য ওর পাশে শুয়ে থাকতে চাই। আমার এই শেষ ইচ্ছেটা আপনি পূরণ করবেন তো ভাইয়া?”
শুভ্র এক নিমিষেই নিজের মাথা নেড়ে চিৎকার করে বলল, “হ্যাঁ করব। করব ঈশান। আমি কথা দিচ্ছি তোমার কবর শুভ্রার পাশেই হবে।”
ঈশান এক গাল মায়াবী হাসি হেসে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে তার জীবনের শেষ কথাটি উচ্চারণ করল,
“আই লাভ ইউ ভাইয়া… আই লাভ ইউ সো মাচ…”
বলেই ঈশান নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট স্বরে কালেমা পড়ে ফেলল,
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।”

কালেমা পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ঈশানের জ্বলজ্বলে চোখ দুটো চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। তার মাথাটা এক পাশে আলতো করে ঢলে পড়ল শুভ্রের কোলের ওপর। বুকের ধকধকানিটা এক নিমেষে থমে গেল, বন্ধ হয়ে গেল তার তপ্ত নিশ্বাস। এক বুক তীব্র নরক যন্ত্রণা, আর পরপারে নিজের কলিজার টুকরো শুভ্রাকে ফিরে পাওয়ার এক আকাশ আশা বুকে নিয়ে চিরতরে বিদায় নিল ঈশান নামক প্রেমিক পুরুষটা। অন্ধকার ব্রিজের সেই ট্র্যাজেডির পাঁচ বছর পর, অবশেষে আজ এই রক্তাক্ত পিচ রাস্তায় মিলন হলো এক অমর ও অসমাপ্ত ভালোবাসার মহাকাব্যের। মায়ার এই পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিল ঈশান।

পৃথিবীর বুকে হাজারো স্মৃতি, হাজারো কান্না আর এক আকাশ নিখাদ ভালোবাসা ফেলে রেখে ঈশান চলে গেল না-ফেরার দেশে। যেখান থেকে শত ডাকলেও আর কোনোদিন কেউ ফিরে আসে না। সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঈশান অবশেষে চলে গেল তার প্রিয়তমা শুভ্রার কাছে। ঈশান শুভ্রার পরপারে কি লেখা আছে তা একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। তবুও মন থেকে একটাই দোয়া, আল্লাহ যেন এই সত্যিকারের পবিত্র ভালোবাসার মানুষদের পরপারে চিরদিনের জন্য এক করে দেন, তাদের পরম শান্তিতে দেখা করিয়ে দেন। রাস্তার মাঝখানে বসে শুভ্র ঈশানের সেই রক্তাক্ত নিথর দেহটা বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকল। তার সেই বুকফাটা কান্নায় ঢাকার আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। পাশে বসা রিদিও নিজের মুখে হাত দিয়ে অঝোরে কেঁদে চলল। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত উৎসুক মানুষ, যারা এতক্ষণ ভিড় জমিয়ে তামাশা দেখছিল, তারাও এই দৃশ্য দেখে আর নিজেদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। পাষাণ হৃদয়ের মানুষের চোখ থেকেও আজ অন্তত এক ফোঁটা হলেও অশ্রু ঝরে পড়ল। এক নিঃস্বার্থ প্রেমিকের আত্মত্যাগ আর করুণ বিদায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো জনসমুদ্রকে স্তব্ধ করে দিল।

অবশেষে ঈশানের শেষকৃত্য নিয়ে চারদিকে নানা আলোচনা আর সমালোচনা শুরু হলো। তার ধর্মের পরিচয় নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠল, তখন স্বয়ং সেই মসজিদের ইমাম সাহেব নিজে এসে সবার সামনে সাক্ষ্য দিলেন। যে মসজিদের বাইরে বসে ঈশান ধুলোবালির মধ্যে সেজদা দিত, সেই ইমাম সাহেব অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বললেন,
“আমি নিজে সাক্ষী। এই পাগলটাকে প্রতিদিন নামাজের সময় আমি মসজিদের বাইরে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে নামাজ পড়তে দেখেছি। আমি নিজ চোখে দেখেছি, সে সিজদায় গিয়ে আল্লাহর দরবারে কতটা ব্যাকুল হয়ে কাঁদত। আর যাই হোক, আল্লাহর দরবারে ঝরে পড়া মানুষের চোখের পানি কখনো মিথ্যা হয় না। সে দুনিয়ার মানুষের চোখে পাগল হলেও, সে মন থেকে পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তাই তাকে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক দাফন করতে কোনো বাধা নেই, এতে কোনো পাপ হবে না।”

ইমাম সাহেবের এই অকাট্য সাক্ষ্যের পর সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটল। শুভ্র নিজের দেওয়া কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। সব নিয়ম মেনে ঈশানের জানাজা আর দাফন সম্পন্ন করা হলো। আর ঠিক শুভ্রার সেই চিরচেনা কবরের পাশেই খুঁড়ে দেওয়া হলো ঈশানের কবরটি। কবর দেওয়া শেষে উপস্থিত সবাই দু-হাত তুলে অশ্রুসজল চোখে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করল। তারপর একে একে সবাই যার যার মতো চলে গেল নিজেদের চেনা ব্যস্ত জীবনে। পাঁচটা বছরের দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর অপেক্ষা শেষে, শুভ্রার রেখে যাওয়া সেই অবুঝ পাগলটা আজ চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়ল তারই পাশে। এই নশ্বর পৃথিবীর সব গ্লানি, সব আঘাত আর সব একাকীত্ব ঝেড়ে ফেলে ঈশান এখন পরম শান্তিতে মগ্ন। মাটির নিচের সেই অন্ধকার আর নিস্তব্ধ ঘরে কে জানে হয়তো ওপারে আজ সত্যিই শুভ্রা মায়াবী এক চিলতে হাসছে। এতগুলো বছর পর নিজের সেই হারিয়ে যাওয়া পাগলটাকে আবার নিজের বুকে ফিরে পেয়ে শুভ্রার আত্মাটা হয়তো আজ পরম তৃপ্তিতে শান্ত হয়েছে। নিয়তি যাদের এই চেনা পৃথিবীতে এক হতে দেয়নি, আজ মৃত্যুর ওপারে গিয়ে তারা ঠিকই খুঁজে নিল তাদের সেই চিরন্তন ভালোবাসার আশ্রয়।
আবারও চিরচেনা নিয়মে ব্যস্ত হয়ে গেল এই যান্ত্রিক শহর। ট্রাফিকের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর বদলে যাওয়া পরিবেশের ভিড়ে সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকল। শুধু এই পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে গেল শুভ্রা আর ঈশানের দুটি জীবন্ত প্রাণ। তবে এই শহরের কিছু মানুষ চিরদিনের জন্য সাক্ষী হয়ে রইল তাদের এই অমর, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার।

আজও যদি কেউ সেই কবরস্থানের দিকে তাকায়, তবে দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যায় ধুলোমাখা মাটির তৈরি সেই দুটি কবর। পাশাপাশি পরম শান্তিতে মিশে আছে তারা। দেখে মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল, সমস্ত বাধা আর সব সামাজিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে দুজন আজ পাশাপাশি পরম শান্তিতে ঘুমে মগ্ন হয়ে আছে। মৃত্যুর ওপারে গিয়ে যেন তারা তাদের নিজেদের এক স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছে।

হায় রে, কী অদ্ভুত আর ভয়ঙ্কর সুন্দর এই ভালোবাসা। শুভ্রা সেদিন চাইলে নির্ভানের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে যেতে পারত, নিজের জীবনটা বাঁচাতে পারত। কিন্তু সে পালায়নি নিজের ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে, ঈশানের প্রতি নিজের পবিত্র অনুভূতির সম্মান রক্ষা করতে সে নিজের তাজা প্রাণটা হাসিমুখে বিলিয়ে দিয়ে গেছে। ওদিকে ঈশানও তো চাইলে পারতো শুভ্রার মৃত্যুর পর সবকিছু ভুলে গিয়ে নতুন করে সংসার শুরু করতে, অন্য কোনো মেয়েকে নিজের জীবনসঙ্গী করে সুখে দিন কাটাতে। কিন্তু সে তা করেনি। সে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি, ক্যারিয়ার, স্মার্টনেস সবকিছু এক নিমেষে পায়ে ঠেলে দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ধুলোবালি মেখে পাগল হয়ে ঘুরে বেরিয়েছে শুধু একটা চাতক পাখির মতো মৃত্যুর আশায়। কারণ শুভ্রাহীন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুটাই ছিল তার কাছে পরম পাওয়া, চরম শান্তি। আর সেই মৃত্যুর জন্য দীর্ঘ পাঁচটি বছর ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করতে করতে, আজ এক চরম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ঈশান এই নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিল। রেখে গেল শুধু এক বেদনাবিধুর রূপকথা, যা এই শহরের বুকে চিরকাল বেঁচে থাকবে এক অমর প্রেমের গল্প হয়ে।

মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে এসেও তারা দুজনে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর বুকে এক অকাট্য প্রমাণ দিয়ে গেল, সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো পরাজয় মানে না। ভালোবাসা ভাঙতে পারে, দুমড়ে-মুচড়ে যেতে পারে, কিন্তু কোনো শক্তিই তাকে চিরতরে হারিয়ে দিতে পারে না। সত্যিকারের ভালোবাসা তো আসলে এক অদ্ভুত শক্তি, যা আদিহীন আর অনন্ত। এ ভালোবাসা চরম ধৈর্য ধরতে জানে, যুগের পর যুগ একলা নীরবতায় অপেক্ষা করতে পারে। আজকের এই স্বার্থপর আর যান্ত্রিক দুনিয়ায় যখন ভালোবাসার সংজ্ঞাটা প্রতিনিয়ত বদলে যায়, মানুষ যখন খুব সহজেই এক হাত ছেড়ে অন্য হাত ধরে নেয়, ঠিক তখন শুভ্রা আর ঈশানের এই গল্পটা আমাদের এক পাক্ষিক বা স্বার্থের ভালোবাসার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। সত্যিকারের ভালোবাসা আসলে কোনো শরীরী চাওয়া-পাওয়ার নাম নয়, এটা হলো দুটি আত্মার এমন এক অদৃশ্য বন্ধন, যা পৃথিবীর কোনো দেওয়াল, কোনো সামাজিক দূরত্ব, এমনকি মৃত্যুর মতো অমোঘ সত্যও আলাদা করতে পারে না। শুভ্রা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, সত্যিকারের প্রেমিকারা কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। নিজের পবিত্রতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে, কিন্তু ভালোবাসার অমর্যাদা হতে দেয়নি। আর ঈশান তার রাজকীয় জীবনকে পায়ে ঠেলে, রাস্তায় রাস্তায় ধুলোবালি মেখে, পাগল বেশে দীর্ঘ পাঁচটি বছর কাটিয়ে প্রমাণ করেছে, যেখানে নিজের হৃদয়ের মানুষটাই নেই, সেখানে এই পৃথিবীর সমস্ত জাঁকজমক আসলে অর্থহীন, এক মস্ত বড় শূন্যতা।

সত্যিকারের ভালোবাসা এমনই হয়। এটা মানুষকে যেমন তিলে তিলে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে, ঠিক তেমনি সেই ছাই থেকেই জন্ম দেয় এক অমর রূপকথার। পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ী হয়তো আজ শুভ্রা আর ঈশান পরাজিত, তারা আজ বেঁচে নেই। কিন্তু ভালোবাসার নিয়ম অনুযায়ী তারা আজ এক পরম বিজয়ী জুটি। তারা আমাদের শিখিয়ে গেল ভালোবাসা যদি সত্যি খাঁটি হয়, তবে মাটির নিচের অন্ধকার কবরটাও শেষ পর্যন্ত এক পবিত্র বাসর ঘরে পরিণত হতে পারে। তারা প্রমাণ করে গেল, পৃথিবীর বুকে দেহ দুটো আলাদা হয়ে মাটিতে মিশে গেলেও, আত্মার মিলন ঠিক ওপারেই হয়। সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো মরে না, তা বেঁচে থাকে মানুষের বিশ্বাসে, বাতাসে ভেসে বেড়ানো দীর্ঘশ্বাসে আর আকাশের ওই দূর সীমানায় পাশাপাশি দুটো নক্ষত্রের আলোয়।

সময় কখনো থেমে থাকে না। সে তার মতো আপন খেয়ালে বয়ে চলে; কখনো কারো তীব্র ব্যাকুলতা দেখে না, কারো বুকচিরে যাওয়া কষ্ট কিংবা দুঃখের দিকে ফিরেও তাকায় না। তার অমোঘ নিজ গতিতে সে কেবলই সামনের দিকে এগিয়ে চলে। তাই তো দেখতে দেখতে জীবনের ক্যানভাস থেকে কেটে গেল আরও দুটি বছর। এই দীর্ঘ চব্বিশটা মাসে শুভ্র আর রিদির জীবনটা সমস্ত ঝড়-ঝাপটা কাটিয়ে এখন মোটামুটি বেশ ভালোই চলছে। অতীতের সেই ঘন কালচে মেঘ কেটে গিয়ে তাদের সংসারে এখন এক স্নিগ্ধ, শান্ত আলো বিরাজ করছে।
আজ এক অলস বিকেল বেলা। শুভ্র অফিস থেকে ক্লান্ত পায়ে ঘরে ফিরে সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। তবে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে রিদির দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে গেল,
“রেডি হয়ে নে, একটা জায়গায় যাবো।”

বলেই সে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। রিদি কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে রইল, শুভ্রের চোখে আজ এক অন্যরকম চপলতা ছিল। সে আর দেরি না করে চটপট শ্রেয়াকে রেডি করে দিল। সময়ের নিয়মে কোলেপিঠে করে বড় হওয়া শ্রেয়ার বয়স এখন দেখতে দেখতে পাঁচ বছর ছুঁয়েছে। তার চঞ্চলতা আর আধো-আধো মিষ্টি বুলিতে এখন পুরো বাড়ি সারাদিন মুখরিত থাকে। শ্রেয়াকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়ার পর রিদি নিজেও একটা চমৎকার হালকা গোলাপি রঙের থ্রি-পিস পরে নিল, আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরম পরিপাটি করে মাথায় একটা সুন্দর হিজাব বেঁধে নিল। তাকে যেন আজ এক টুকরো শরতের আকাশের মতো শান্ত আর সুন্দর দেখাচ্ছে।
শুভ্র ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াল। চিরুনি দিয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে রিদির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হেসে বলল,
“রেডি?”

শুভ্রের কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই ড্রয়িংরুম থেকে ছোট্ট শ্রেয়া একছুটে এসে এক লাফে তার বাবার কোমর জড়িয়ে ধরল। শুভ্রও পরম মায়ায় এক ঝটকায় মেয়েকে কোলে তুলে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। শ্রেয়া তার বড় বড় মায়াবী চোখ দুটো গোল গোল করে বাবার গাল ছুঁয়ে বলল,
“পাপ্পা, আমরা কি ঘুরতে যাচ্ছি?”
শুভ্র শ্রেয়ার নরম তুলতুলে গালে একটা গভীর চুমু খেয়ে আদুরে গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আমার সোনা পাখি।”
বাবার মুখে হ্যাঁ শুনে শ্রেয়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে হাততালি দিয়ে বলে উঠল,
“ইয়েই। কী মজা, আমরা ঘুরতে যাবো। কী মজা, কী মজা।”
মেয়ের এই অফুরন্ত আনন্দ দেখে শুভ্র রিদির দিকে তাকিয়ে আলতো হাসল। তারপর শ্রেয়াকে কোলে নিয়েই বাইরের দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“আমি গাড়ির কাছে গিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছি, তুই চট করে চলে আয়।”
রিদিও নিজের পার্সটা হাতে নিয়ে এক গাল মিষ্টি হাসি ঠোঁটে মেখে তাদের পেছন পেছন ঘর থেকে বের হয়ে আসল।

কিছুক্ষণ ড্রাইভ করার পর শুভ্র তাদের দুজনকে নিয়ে শহরের কোলাহল মুক্ত এক শান্ত নদীর পাড়ে এসে পৌঁছাল। সেখানে তখন এক গ্রামীণ মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণের রঙিন আলো, বেলুন আর নাগরদোলার শব্দ দেখে শ্রেয়া তো রীতিমতো খুশিতে পাগল হয়ে গেল। তিনজনে মিলে সেই লোকজ মেলার এমাথা-ওমাথা ঘুরে বেড়াল, মাটির খেলনা কিনল আর অনেক রকমের গরম গরম মুখরোচক ভাজা পোড়াও খেলো।
সব শেষে, সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে আসছে, শুভ্র শ্রেয়াকে একহাতে কোলে নিয়ে নদীর একদম কিনারায় এসে দাঁড়াল। গোধূলির আলো তখন নদীর শান্ত জলে প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী আবহের সৃষ্টি করেছে। চারপাশ থেকে একটা হিমেল মৃদু বাতাস এসে তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর নদীর ছোট ছোট ঢেউগুলো এক অদ্ভুত ছন্দ তুলে পাড়ে এসে আছড়ে পড়ছে। ঠিক সেই নিস্তব্ধ মায়াবী মুহূর্তে, রিদি হঠাৎ পরম ভরসায় শুভ্রের চওড়া কাঁধের ওপর নিজের মাথাটা সঁপে দিল। নদীর দিগন্ত বিস্তৃত জলের দিকে তাকিয়ে সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত আবেগঘন গলায় বলল,

“জীবনটা বড় অদ্ভুত, তাই না শুভ্র ভাই। কখন, কী থেকে যে কী হয়ে যায়, আমরা সাধারণ মানুষগুলো তার বিন্দুবিসর্গও টের পাই না।”
শুভ্র নদীর শান্ত স্রোতের দিকে তাকিয়ে শুধু সংক্ষেপে বলল,
“হুম।”
রিদি শুভ্রের হাতটা নিজের আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে নিয়ে আরও একটু নিবিড় হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বড্ড ভালোবাসি আপনাকে। সারাজীবনে এই অবুঝ হাতটা এভাবে শক্ত করে ধরে পাশে থাইকেন, কখনো কোনো অভিমানে আমায় ছেড়ে যাইয়েন না।”

শুভ্র এবার নদীর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রিদির মায়াবী মুখের দিকে তাকাল। তার চোখ জুড়ে তখন এক মহাসমুদ্রের মতো গভীরতা। সে অত্যন্ত গম্ভীর কিন্তু এক বুক প্রেম উজাড় করে দিয়ে বলে উঠল,
“ছেড়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি যদি আমার থাকতো রিদি, তবে ঝড়ের সেই প্রথম আঘাতেই আমি অনেক দূরে চলে যেতাম। আমি কোনো কাপুরুষ নই যে, দুদিনের বসন্তের মায়া দেখিয়ে মাঝরাস্তায় হাত ছেড়ে দেব। আবার আমি কোনো মহাপুরুষও নই যে, তোর এই নশ্বর ভালোবাসার জন্য কোনো নতুন তাজমহল গড়ে দেব। আমি তো নিতান্তই এক সাধারণ প্রেমিক পুরুষ যে জীবনের এই শত ব্যস্ততা আর কঠোর নিয়মের মাঝেও, কোনো এক নিস্তব্ধ শেষ বিকেলে তোকে নিয়ে এভাবে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াবে, তোর হাত ধরে পুরো চেনা শহরটা ঘুরে বেড়াবে, আর আমাদের এই মৌন ভালোবাসার গল্প পৃথিবীর বুকে নিরবে বিলিয়ে দেবে। আমার এই অনুভূতির আয়ু কোনো একটা নির্দিষ্ট দিনের গণ্ডিতে বাঁধা নেই, আমার এই আত্মিক টান চিরকালের, অনন্তকালের। আমি শুধু তোকে ভালোবাসিটুকুই বলবো না, আমি শুধু বলবো #অসম্ভব_রকম_ভালোবাসি_তোমায়।”

হুট করে শুভ্রের মুখে জীবনের প্রথমবার এমন গভীর ভালোবাসামাখা ‘তুমি’ সম্বোধন শুনে রিদি তীব্র বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে হা হয়ে গেল। সে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। তার পুরো শরীর জুড়ে এক অলৌকিক শিহরণ খেলে গেল। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“কী কী বললেন আমাকে আপনি?”
শুভ্র ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে চোখের ইশারায় বলল,
“কী বলেছি, তা কি তোমার ওই অবুঝ হৃদয়ে পৌঁছায়নি?”
দ্বিতীয়বারের মতো এক তীব্র মধুর ধাক্কা খেলো রিদি। সে নিজের বুকের ধকধকানি সামলে নিয়ে আকুল হয়ে বলল,

“আপনি… আপনি আমাকে ‘তুমি’ বলে ডাকছেন?”
শুভ্র রিদির সেই হিজাব জড়ানো মুখখানা নিজের এক হাত দিয়ে আগলে ধরে বলল,
“শোনো, ‘তুই’ শব্দটা হয়তো সবথেকে কাছের, সবথেকে নিবিড় অধিকারের রূপ দেখায়। কিন্তু ‘তুমি’ শব্দটা হলো এক পরম শ্রদ্ধামিশ্রিত নিখাদ ভালোবাসার অলঙ্কার। যাকে আমি আমার জীবনের ধ্রুবতারা বানিয়েছি, তাকে ‘তুমি’ করে সম্বোধন না করলে যে আমার এই প্রেমের কাব্যটাই অপূর্ণ থেকে যাবে। আমি কখনো হয়তো অভিমানে তোমাকে ‘তুই’ বলে শাসন করবো, কখনো শ্রদ্ধায় ‘আপনি’ বলে দূরে রাখবো, আবার কখনো অনুরাগে ‘তুমি’ বলে বুকের মাঝে লুকিয়ে নেবো। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের পরতে পরতে, আমার সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে তুমিই তো একমাত্র ধ্রুব সত্য।”

শুভ্রের এই জাদুকরী কথার বাঁধনে রিদির চোখ জোড়া মুহূর্তের মধ্যে নোনা জলে ছলছল করে উঠল। এ এক পরম পাওয়ার আনন্দ অশ্রু। সে আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না; শুভ্রের সেই চওড়া কাঁধে নিজের মুখটা আরও গভীরভাবে লুকিয়ে, নদীর ওপারের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“আমি যে আজ কতটা সুখী, কতটা তৃপ্ত তা এই পৃথিবীর কোনো ভাষা দিয়ে আজ আপনাকে বোঝাতে পারবো না শুভ্র। আই লাভ ইউ সো মাচ। এভাবেই সারাজীবন আমার ছায়া হয়ে পাশে থাইকেন। আমি কোনো শর্ত ছাড়া, একদম নিঃস্বার্থে আমার এই পুরোটা জীবন আপনার সাথে কাটিয়ে দিতে পারবো।”
শুভ্র আর মুখে কিছু বলল না। সে নিজের শক্ত হাত দিয়ে রিদির নরম হাতটা আরও একটু নিবিড় ও শক্ত করে চেপে ধরল।

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭৩

কোল থেকে ছোট্ট শ্রেয়া তখন কলকাকলি করে নদীর বুকে চরে বেড়ানো নৌকার আলো দেখাচ্ছে। ওদিকে নদীর শান্ত স্রোত আর বইতে থাকা হিমেল হাওয়া যেন নীরব সাক্ষী হয়ে রইল তাদের এই পবিত্র ভালোবাসার কথোপকথনের।নদীর জল যেমন কলকল শব্দে সাগরের পানে ছুটে চলে, তাদের জীবনটাও সমস্ত অতীত শোক আর যন্ত্রণার ইতিহাস পেছনে ফেলে, এক নতুন আশার আলো বুকে নিয়ে সামনের দিকে বয়ে চলল। যে ভালোবাসার সূত্রপাত হয়েছিল একরাশ অন্ধকার আর ঝড়ের রাতে, আজ এক শান্ত নদীর মোহনায় এসে তা এক পূর্ণাঙ্গ রূপকথায় রূপ নিল। এভাবেই দুটি হৃদয়ের একাত্মতা আর এক বুক পরম শান্তির চাদরে জড়িয়ে, শুভ্র আর রিদির এই দীর্ঘ কাহিনীর ওপর এক চিরন্তন ও সুন্দর সমাপ্তির পর্দা নেমে এলো।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here