অস্তরাগের রঙ পর্ব ১১
তেজরিন উম্মীদ
জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যার কালো সেই অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাম্পের হলদেটে আলোয় তিথি মগ্ন ছিল তার বইয়ের পাতায়। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের ডাক সেই নীরবতাকে ভাঙছিল।
“টু্ং!”
ফোনের নোটিফিকেশনের শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে তিথির।টুং! শব্দটা তিথির কানে গিয়ে বিধে। লহমায় তার একাগ্রতা টুটে গেল।সে পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিতেই দেখল,হোয়াটসঅ্যাপে একটি অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে।
তিথির সরু ললাটে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ ফুটে উঠল। কৌতূহল আর বিরক্তি মেশানো মনে মেসেজটি ওপেন করে,স্কিনের ভেসে ওঠা মেসেজটি পড়ল। লেখা,
“হ্যালো ডার্লিং!”
মুহূর্তেই তিথির বুঝল বার্তা দাতা কে! আঙুলের ডগায় দ্রুতলয়ে সে টাইপ করল,
“ব্লক খেতে না চাইলে ভদ্রমতো কথা বলুন, মিস্টার শানান খান।”
ওপাশ থেকে উত্তর আসতে দেরি হলো না। শানান যেন ওত পেতেই ছিল। কয়েকটা অবাক হওয়ার ইমোজি পাঠিয়ে সে লিখল, “কীভাবে বুঝলে আমি? বুঝছি, একেই বলে দিলের টান!”
তিথির বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছাল। মেকি আহ্লাদ আর সস্তা রোমান্টিসিজম তার দু চোখের বিষ। সে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে কড়া ভাষায় উত্তর দিল,
“কচু! নিজের চেহারার অত বড় একটা প্রোফাইল পিক দিয়ে রাখলে কে না চিনতে পারবে? তাছাড়া আপনার আইডি নামও সুন্দর করে লেখা আছে,শানান খান। এখন কাজের কথা বলুন।”
শান যেন তিথির এই রূঢ়তাকেও উপভোগ করছে।আর পাঁচটা ছেঁচড়া প্রেমিকের মত,সস্তা ফ্লার্টিং শুরু করে, পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,
“কথা তো অনেক আছে, তুমি কোনটা শুনতে চাও?”
তিথি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে চুপ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। শানানের এই পিছু লেগে থাকা, গায়ে পড়া স্বভাব তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। সে জানে শানান তাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছে, কিন্তু এই অতিষ্ঠ করা আচরণ তিথির কাছে স্রেফ ছেলেমানুষি আর অভদ্রতা মনে হয়। তবে সম্পর্কে সে রুশদীর দেবর, সেই খাতিরেই তিথি এর সাথে এখনো রুড বিহেভি করেনি। নয়ত সে-ও তিথি! ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে নিরুত্তাপভাবে লিখল,
“আপনি যা বলার জন্য মেসেজ দিয়েছেন সেটাই বলুন। আর কোনো কথা না থাকলে মেসেজ দেওয়া বন্ধ করুন।”
এবার শানান আসল কথায় এল,
“কাল কলেজ শেষে ওয়েট করো।”
“কেন?” তিথির সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন।
“আমি আসব তাই।”
“তো আমি কী করব আপনি আসবেন তাতে?”
তিথির এই সরাসরি প্রত্যাখ্যানেও শানান অবিচল। সে সেই অচেনা, অজনা, স্লো পয়জনের মায়াজাল বুনছে। সে মেসেজ সেন্ড করলো,
“তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে তাই।”
“কেন করব?”
“কেন করবে না?”
তিথি এবার সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলল,
“কারণ আমার দরকার নেই।”
“আছে, আছে, দরকার আছে বেপস! আমি ঠিক সময়ে থাকব, তুমি ভুলেও আগে চলে যাবে না। টা টা! কাল দেখা হচ্ছে।”
মেসেজটি পাঠিয়েই শানান অফলাইনে চলে গেল, সে তিথিকে আর পাল্টা তর্কের সুযোগ দিতে চায় না সে। তিথি নীল হয়ে থাকা সিন অপশনটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। কোনো রিপ্লাই দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না সে। ফোনটা সজোরে টেবিলের ওপর উল্টে রেখে সে আবার বইয়ের পাতায় চোখ ফেরাল।
এস. কে. ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ—ঢাকা শহরের ব্যস্ততম বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠন।ঢাকার শহরের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড়, ও মেধাবী স্টুডেন্টদের দিক থেকে প্রথম পজিশনে আছে এই স্কুল এন্ড কলেজটি।চোরের হাজার হাজার স্টুডেন্টের স্বপ্ন এস.কে. ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ।হাজার হাজার স্টুডেন্ট লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এই প্রতিষ্ঠানে এডমিশন পাওয়ার জন্য। এই প্রতিষ্ঠানে,শহরের শ্রেষ্ঠ মগজগুলোর মিলনমেলা বললেও ভুল হবে না একে।
কলেজের সুবিশাল অডিটরিয়ামে বসে নখ কামড়াচ্ছে রুশদী। আজ একজন প্রবীণ শিক্ষকের বিদায় সংবর্ধনা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি তার আবেগঘন দীর্ঘ জীবনের স্মৃতিচারণ করছেন। অডিটোরিয়ামের হাজারো চোখ মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্টেজের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, এক কোণায় বসে থাকা রুশদীর মন জুড়ে বইছে কালবৈশাখী ঝড়। তার মনোযোগ নেই সেদিকে।
রুশদীর অস্থিরতার কারণ একটাই,ফারাজ। আজ ফারাজের কলেজে আসার কথা। মানুষটা কি এসেছে? নাকি এই ভিড়ের মাঝে কোথাও ওত পেতে আছে? রুশদী বরাবরই একটু অন্তর্মুখী স্বভাবের। নিজেকে কারো সামনে প্রমাণ করা বা নিজের হয়ে সাফাই গাওয়া তার কাছে পাহাড় ডিঙানোর চেয়েও কঠিন মনে হয়। এই তুচ্ছ বিষয়টি নিয়ে তার ভেতরে যে পরিমাণ প্যানিক বা আতঙ্ক কাজ করছে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই। রুশদী একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিল,যাক বাবা, এত বেলা হয়ে গেছে, ফারাজ বোধহয় আর আসবে না। বুকের ওপর চেপে বসা এক মস্ত পাথর যেন মুহূর্তেই নেমে গেল। তার শরীরে যেন প্রাণ ফিরে এল। কিন্তু এই স্বস্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী।
কিছুক্ষণ পরেই কলেজের পিয়ন এসে তাকে ডাক দিল। মুহূর্তেই রুশদীর হৃদস্পন্দন থমকে গেল, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল ভয়ে। কলিজায় ফুঁ দিয়ে কয়েকবার দোয়া-দরুদ পড়ে সে অত্যন্ত ভারী পায়ে প্রিন্সিপাল অফিসের দিকে পা বাড়াল।
প্রিন্সিপাল অফিসের দরজায় পৌঁছে রুশদী নিজেকে একটু সামলে নিল। কম্পিত কণ্ঠে অনুমতি চাইল
“স্যার, মে আই কাম ইন?”
ভেতর থেকে গম্ভীর ও গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর এল, “ইয়েস, কাম ইন।”
রুশদী ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল এক থমথমে পরিবেশ। সেই প্রায় ত্রিশ বছর বয়সী একজন যুবক, পরনে দামী স্যুট-কোট, পায়ে পা তুলে অত্যন্ত দাম্ভিক আর গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছে। তার পাশের চেয়ারেই প্রিন্সিপাল স্যার বসে আছেন। আর তাদের একটু দূরে ফাহাদ মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। রুশদী গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল।
প্রিন্সিপাল স্যার সরাসরি রুশদীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “কাল ঠিক কী হয়েছিল রুশদী? তোমার তো কালকেই পুরো ব্যাপারটা আমাকে জানানো উচিত ছিল। কেন বলনি? এখন যা হয়েছে ঘটনার শুরু থেকে খুলে বলো।”
রুশদীর ভেতরটা তখন থরথর করে কাঁপছে। কথাগুলো গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। কীভাবে শুরু করবে, কী বলবে,সব যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। সে আমতা আমতা করতে লাগল, ঠোঁট জোড়া কাঁপলেও কোনো স্পষ্ট শব্দ বেরোচ্ছিল না।
রুশদীর এই জড়তা দেখে ফারাজ অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে চেয়ার ছাড়ল।
“স্যার, আমি এখানে ওকে জেরা করার জন্য ডাকিনি। আমি আপনাকে যা বলেছি সেটাই যথেষ্ট। আমার কথা কি আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না যে আপনি ওকে আবার জেরা করছেন?”
প্রিন্সিপাল আলম সাহেবের মুখমন্ডলে এক চিলতে বিনয়ী হাসি ফুটে উঠল, তবে সেই ছিল পরিস্থিতির চাপ। তিনি কিছুটা কুঁকড়ে গিয়ে বললেন,
“নো স্যার! আপনার কথা বিশ্বাস হবে না কেন? আমি তো কেবল…”
প্রিন্সিপালকে কথা শেষ করতে দিল না ফারাজ। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে অত্যন্ত দৃঢ় সুরে বলল,
“বিশ্বাস যদি হয়ে থাকে, তবে ওর মুখ থেকে আবার শোনার কোনো প্রয়োজন আমি মনে করছি না। আমি এখানে সাধারণ কোনো অভিভাবকের মতো বিচার নিয়ে আসিনি যে আপনি বিচার করবেন। এটা আমার স্কুল, আমার কলেজ মিস্টার আলম। ভুলে যাবেন না।”
ফারাজের এই অভাবনীয় রুক্ষতা এবং মালিকসুলভ দাপটের সামনে প্রিন্সিপাল যেন এক মুহূর্তে ক্ষুদ্র হয়ে গেলেন। মালিক পক্ষের মুখের ওপর কথা বলার দুঃসাহস বা সামর্থ্য কোনোটিই এই মুহূর্তে তার নেই। তিনি নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব কোমল এবং বিনীত রেখে নিচু স্বরে বললেন,
“জ্বি স্যার, আমি বুঝতে পেরেছি।”
ফারাজ এবার তার শিকারের দিকে মুখ ফেরাল। সে স্থির দৃষ্টিতে ফাহাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“হে ইউ! তোমার নাম কী যেন?”
ফাহাদ ঘামছে। সে অস্ফুট স্বরে উত্তর দিল, “ফাহাদ আলম।”
ফারাজ কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে ফাহাদকে পর্যবেক্ষণ করল। তার জহুরি চোখ জোড়া ফাহাদের পা থেকে মাথা অবধি মেপে নিল।২০-২১ বছরের এক যুবক, যে এখন লোকদেখানো মাথা নিচু করে বিনীত হওয়ার ভান করছে।কিন্তু ফারাজের বুঝতে বাকি নেই যে এই বিনয়ের আবরনের নিচে ফাহাদের ভেতরে এক রাগে, জেদে ফসছে।ফারাজের ক্ষমতার জন্য চুপ রয়েছে সে। ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে প্রচণ্ড কড়া গলায় বলল,
“তো ফাহাদ, তুমি কি জানতে না যে রুশদী আমার ওয়াইফ আর শের আমার ছেলে?”
ফাহাদ মাথা নিচু রেখেই কাঁপা কাঁপা গলায় প্রতিউত্তর করল,
“রুশদী আপনার…”
“রুশদী ম্যাম! নট রুশদী।” ফারাজের কণ্ঠের হুঙ্কারে ফাহাদ কেপে উঠলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে রাগে।ফাহাদ ভেতরে ভেতরে চরম অপমানিত বোধ করল।রুশদীর সামনে এভাবে ছোট হওয়াটা তার পৌরুষে আঘাত হানলেও সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “জ্বি… জানতাম ম্যাম আপনার ওয়াইফ।”
“জানতে? তারপরও তুমি ওকে বিরক্ত করতে? তুমি জানো তো আমি কে?”
ফারাজের প্রশ্নগুলো তীরের মতো ফাহাদের দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল।
“জ্বি স্যার, জানি।”
“তারপরও? তোমার সাহস অনেক ফাহাদ! তোমার কলিজা কয়টা বল তো? একটা নাকি দুইটা?”
ফাহাদ কোনোমতে উত্তর দিল, “একটা।”
ফারাজ এবার এক কুৎসিত হাসি হাসল, যে হাসিতে মিশে ছিল খুনে মেজাজ। সে ধীর পায়ে ফাহাদের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“তুমি ভুল ফাহাদ। তোমার কলিজা দুইটা। তা না হলে তুমি শারফারাজ খানের বউকে বিরক্ত করার সাহস পেতে না। ওহ না, আমিও তো ভুল বলছি! তোমার কলিজা আসলে তিনটা। নাহলে তুমি শারফারাজ খানের ছেলেকে ধাক্কা দেওয়ার দুঃসাহস পেতে না। তোমার হাতে কি অনেক জোর ফাহাদ? হাতি ঘোড়া মারো বুঝি?”
ফাহাদ কিছুটা ঘাবড়ালো।ফাহাদ এবার আতঙ্কিত হয়ে মিথ্যা বলার চেষ্টা করল।
“স্যার আমি… আমি আসলে ধাক্কা দিতে চাইনি!”
ফারাজ তার মুখের খুব কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সিসিটিভি ফুটেজ দেখাব তোমায়? আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলো না ফাহাদ।”
“সরি স্যার!” ফাহাদ আর পেরে উঠছিল না।
ফারাজ এবার তার আসল রূপ দেখাল। সে চিৎকার করে উঠল না, বরং খুব শান্ত কিন্তু ভয়ানক গলায় বলল, “তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি ফাহাদ! তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলার সাহস করো? এই জিবটা যদি এখন আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলি, তবে এই শহরের কারও বাপের ক্ষমতা নেই আমাকে আটকানোর।”
পুরো রুমে তখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। রুশদী এক কোণায় দাঁড়িয়ে,তার ভেতর টা থরথর করে কাঁপছে, আর ফারাজের ব্যক্তিত্ব তার ধরনার বাহিরে।
ফারাজের কণ্ঠস্বর তখন অস্বাভাবিক নিচু হয়ে এসেছে, যা ঝড়ের আগের স্তব্ধতার চেয়েও ভয়ানক। সে তার ধীরস্থির চাহনি ফাহাদের ওপর নিবদ্ধ রেখে বলতে শুরু করল, “এলাকার পাতি নেতা তুমি, না? এই জন্যই কি এত সাহস, এত তেজ? শোনো ফাহাদ, তোমার মতো হাজারো পাতি নেতা আমার বাড়ির সদর দরজায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তুমি প্রিন্সিপাল স্যারের ছেলে বলেই এখনো অক্ষত অবস্থায় এখানে দাঁড়িয়ে আছ, নাহলে ফারাজ খান অতটা ভদ্র মানুষ নয় যে তোমার সাথে এত ভদ্র ভাষায় কথা বলবে।”
ফাহাদ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরে অপমানের জ্বালা দাউদাউ করে জ্বলছে, হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ। সে নিজেও খুব একটা সুবিধার ছেলে নয়, ক্যাম্পাসে তার দাপট কম নেই।কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি স্বয়ং মন্ত্রীর ছেলে,এই এক পরিচয় ফাহাদের সব দম্ভকে বালির বাঁধের মতো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
ফারাজ ফের চেয়ারে এসে পায়ের উপর পা রেখে আয়েশ করে বসলো।ঠোটের উপর আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলতে শুরু করল,
, “তুমি তো বেশ রোমান্টিক পুরুষ ফাহাদ! দারুণ সব টেক্সট পাঠাও রুশদীকে। গত রাতেও পাঠিয়েছিলে, তাই না? তুমি কি জানতে গত রাতে ওর ফোনটা আমার কাছে ছিল? কী লিখেছিলে তা কি এখন তোমার বাবার সামনে জোরে জোরে পড়ে শোনাব? জানুক তার ছেলে কত বড় প্রেমিক!”
ফাহাদ এবার সত্যিই কুঁকড়ে গেল। মাথাটা আরও নিচু হয়ে এল তার। ফারাজ এবার গর্জনের সুরে বলে উঠল, “কথা বলছ না কেন? যখন রুশদীকে মাঝরাস্তায় বাইক নিয়ে আটকাতে, তখন তো মুখে কথার খই ফুটত। এখন কি জিভটা বাড়িতে ফেলে এসেছ? নাকি ভয়ে আত্মা কাঁপছে?”
ফাহাদ মুখ তুলে কিছু একটা বলতে চাইল, “আ… আমি…”
ফারাজ বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়াল। তার দু চোখে তখন খুনে নেশা। সে এক ঝটকায় ফাহাদের কলার চেপে ধরল।
“রুশদী আমার সম্মান, আর তুমি সেই সম্মানে ধুলো ছেটানোর চেষ্টা করেছ! তোমার মতো রাস্তার ছেলেদের জন্য আমার হাতে রক্ত মাখাতে আমার সেকেন্ড খানেক সময়ও লাগবে না। মেরে পুঁতে ফেললেও এই শহরে কেউ আমাকে ছোঁয়ার ক্ষমতা রাখে না। আমার বাপের রাজত্ব চলে এই শহরে,…!”
ফারাজ ফাহাদের থুতনি চেপে ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরল। ফাহাদের চোখে তখনো রাগের লাভা জ্বলছিল, তা স্পষ্ট দেখতে পেল ফারাজ। ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল,
“শোনো ফাহাদ, আজ থেকে যদি রুশদীর ছায়ার আশেপাশেও তোমাকে দেখি, তবে তোমার ওই একটা কলিজা আর শরীরে থাকবে না। আমি কি পরিষ্কার বোঝাতে পেরেছি?”
ফাহাদ কোনোমতে যন্ত্রণায় আর ভয়ে মাথা নাড়ল। ফারাজ এক ঝটকায় ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল, যেন কোনো নোংরা আবর্জনা ঝেড়ে ফেলল।
“এখন মুখ ফুটে বলো—’জ্বি স্যার, বুঝতে পেরেছি’।”
ফাহাদের মুখ অপমানে নীল হয়ে গেছে, গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না। তবুও প্রাণভয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় সে বলল, “জ্বি স্যার… বুঝতে পেরেছি।”
ফারাজ অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে পকেট থেকে ধবধবে সাদা রুমালটা বের করল। যেন ফাহাদকে স্পর্শ করে তার হাত অপবিত্র হয়ে গেছে, এমন ভঙ্গিতে হাত মুছতে মুছতে সে দরজার দিকে ইঙ্গিত করল।
“গুড। এবার আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও। মনে রেখো, দ্বিতীয়বার আমি আর কথা বলব না, সরাসরি অ্যাকশনে যাব। গেট আউট!”
ফাহাদ এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়াল না। অপমানে তার কানঝাঁঝাঁ করছিল। হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার ঋজু ভঙ্গি আর পায়ের দাপট স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল,এই অপমান সে হজম করেনি। তার ভেতরে এখন প্রতিশোধের বিষাক্ত নীল দহন চলছে। এদিকে প্রিন্সিপাল আলম সাহেবও কাঠের পুতুলের মতো নিজের চেয়ারে স্থির হয়ে আছেন। চাকরির ভয় আর মালিকপক্ষের দাপট তার মুখ বন্ধ করে দিলেও, তার নিজের ছেলেকে এভাবে অপমান করা আর তাকে পরোক্ষভাবে অপমান করাটা তিনি সহজভাবে নিতে পারেননি। ফারাজের প্রতিটি বাক্য তীরের মতো তার সম্মানেও বিঁধেছে।
পুরোটা সময় রুশদী রুমের এক কোণায় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটতেই চাইছে না। তার বড় বড় দু’টি চোখে -মুখে একরাশ হওয়া বিস্ময়। সে মনে মনে ভাবছে, ‘এই লোক এত সিনেমাটিক ডায়লগ কোত্থেকে শিখল?’
ফাহাদ চলে যাওয়ার পর ছোট্ট শের গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে রুশদীর আঙুল ধরে টানল। রুশদীর ধ্যান তখনো কাটেনি। সে যেন অন্য কোনো জগতে চলে গেছে। শের যখন দ্বিতীয়বার জোরে টান দিয়ে ডাকল, তখন তার তন্দ্রা টুটল। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল— “উহ্!”
রুশদী নিচু হয়ে শেরের দিকে তাকালে, শের দুষ্টুমি মাখা মুখে তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “বলেছিলাম না পাপা অনেক রাগী? এখন প্রমাণ পেলে তো?”
রুশদী কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি তখনো ফারাজের ওপর নিবদ্ধ। ফারাজ তখন স্থির পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। রুশদী কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারাজ তার কবজি শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। হাতের সেই স্পর্শে বিদ্যুৎ খেলে গেল রুশদীর শরীরে। কোনো বাক্যব্যয় না করেই ফারাজ তাকে টেনে নিয়ে চলল অডিটোরিয়ামের দিকে। শের-ও রুশদীর অন্য হাত ধরে তাদের সাথে দৌড়াতে লাগল
অডিটোরিয়ামে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী কানায় কানায় পূর্ণ। স্টেজে দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষক তখনো অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। ফারাজ ঝড়ের বেগে স্টেজে উঠে গেল এবং সেই শিক্ষককে এক পাশে সরিয়ে দিয়ে মাইক্রোফোনটা দখল করে নিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো অডিটোরিয়ামের, হাজার হাজার জোড়া চোখ এখন স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই তিন মানব-মানবীর ওপর স্থির।
ফারাজ তার গম্ভীর আর ভরাট কণ্ঠেবলতে শুরু করল,”আই থিঙ্ক অল অফ ইউ নো মি ভেরি ওয়েল!”
সারা হলরুম থেকে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর ভেসে এল,”ইয়েস স্যার!”
ফারাজ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জড়সড় রুশদীকে সবার সামনে আনল। রুশদী তখন লজ্জায় আর সংকোচে মাটির সাথে মিশে যেতে চাইছে। ফারাজ বজ্রকণ্ঠে বলতে শুরু করল,”আমার পাশে কলেজ ইউনিফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটি, শি ইজ মাই ওয়াইফ—রুমাইসা হক রুশদী। আমি তোমাদের একটা ওয়ার্নিং দিতে চাই। এটা আমার ফার্স্ট ওয়ার্নিং এবং দিস ইজ দা লাস্ট ওয়ান। ওকে নিয়ে কোনো আজেবাজে মন্তব্য বা কুৎসা যদি আমার কানে আসে, তবে টিসি পেপার হাতে নিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থেকো।”
ফারাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে আরও তেজি গলায় বলল,”মনে রেখো, তোমাদের এখান থেকে একশ-দুইশ স্টুডেন্টকে টিসি দিলে আমাদের কলেজের কিছুই হবে না।হাজার হাজার স্টুডেন্ট এই কলেজের গেটে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু একটা চান্স পাওয়ার জন্য। সো, যদি সম্মান নিয়ে থাকতে চাও, তবে বিহেভ ইয়োরসেলফ! মাইন্ড ইট, আমি শারফরাজ খান শুধু বলার জন্য বলি না,সেটা করতে পারব বলে বলি
অডিটোরিয়ামের বিশালাকার স্পিকারগুলো থেকে ফারাজের কথাগুলো উচ্চশব্দে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রুশদী লজ্জায়, সংকোচে আর এক অদ্ভুত আড়ষ্টতায় তার মাথাটা যেন ক্রমশ নুয়ে পড়ছিল।
হাজার হাজার শিক্ষার্থীর উৎসুক আর কৌতুহলী দৃষ্টি এখন তার ওপর স্থির। রুশদী আড়চোখে একবার নিচের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল, দেখল স্টুডেন্টদের ভিড়ে কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছে, কারো ঠোঁটের কোণে মিটমিটে দুষ্টুমি মাখা হাসি। কেউ হয়তো পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলছে, “পুরো বউ-পাগল হাজব্যান্ড রে ভাই!” আবার কেউ হয়তো বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে এই অপ্রত্যাশিত নাটকীয়তার দিকে।
রুশদীর সারা শরীর যেন রি রি করে উঠল। তার তীব্র ইচ্ছে হচ্ছিল এই মুহূর্তেই স্টেজ থেকে এক দৌড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে, কোনো অন্ধকার কোণে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে। কিন্তু তার পা দুটো যেন মেঝেতে গেঁথে গেছে। লজ্জার এক অদৃশ্য শেকল তাকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে যে, সে এক চুল পরিমাণ নড়াচড়া করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে।
গাড়িতে উঠে রুশদী ফারাজের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “এই যে, আপনার কি মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে? আপনি অতগুলো স্টুডেন্টের সামনে ওভাবে হুটহাট ওসব কথা বলতে গেলেন কেন?”
ফারাজ ড্রাইভ করছিল। রুশদীর এই রাগি চেহারা দেখেও তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর হলো না। সে যেন খুব স্বাভাবিক কোনো কাজ করেছে, এমন এক নির্লিপ্ত ভঙ্গি নিয়ে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে প্রতিউত্তরে বলল,
“কেন? এতে সমস্যাটা কী হয়েছে?”
রুশদী এবার প্রায় চিৎকার করে উঠল, “সমস্যা কী হয়েছে মানে? আপনি ফাহাদকে অফিস রুমে গিয়ে তামিল হিরোদের মতো ডায়লগ মেরেছেন, সেটা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু অডিটোরিয়ামে আমার সিনিয়র-জুনিয়রদের সামনে ওভাবে নাটক করার কী দরকার ছিল? আপনি কি বুঝতে পারছেন না আমাকে এখন কী পরিমাণ লজ্জায় পড়তে হবে?”
ফারাজ গাড়িটা হঠাৎ রাস্তার একপাশে সাইড করে ব্রেক কষল। সে শরীরটা একটু ঘুরিয়ে,পিছনে ফিরে তিব্র দৃষ্টিতে রুশদীর দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বরে একধরণের তাচ্ছিল্য খেলে গেল,
“লাইক সিরিয়াসলি? এটা তোমার কাছে অপমানের মনে হচ্ছে?”
“হ্যাঁ, অবশ্যই!” রুশদী উত্তর দিল।
ফারাজ মুখ খিচে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রুশদীর। এই নারীকে খোদা কি দিয়ে বানিয়েছেন?এ-এমন কেন?মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে মাথায় তুলে একটা আছাড় মারতে।রুশদীর ভালো করতে গিয়ে এখন খারাপ বনে গেল ফারাজ।ওই যে গ্রামে একটা কথা আছে না,’ যার জন্য কোরবাই চুরি সেই বলবে চোর’।ব্যাপারটা ঠিক তেমনি হয়েছে। ফারাজ মুখ খিচে বলল,
“পৃথিবীতে আসলে দুই প্রকারের নারী আছে। এক—যারা বুদ্ধিমতী, আর দ্বিতীয়টা হলো তোমার মতো…”
ফারাজের অসমাপ্ত কথায় রুশদী দপ করে জ্বলে উঠল। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল, “আমার মত মান?আমার মতো বলতে আপনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন?”
ফারাজ উত্তর না দিয়ে রুশদীর মুখের একটু কাছে ঝুঁকে এল। তারপর আঙুল দিয়ে রুশদীর ওপরের পাটির দাঁতের এক কোণায় ইশারা করে বলল,
“এটা কী?”
রুশদী থতমত খেয়ে গেল। নিজের অস্বস্তি লুকিয়ে বলল, “কোনটা কী? এটা?..এটা আক্কেল দাঁত।”
ফারাজ যেন এই উত্তরের জন্যই ওত পেতে ছিল। সে এক বাঁকা হাসি হেসে ধপাস করে সিটে হেলান দিল।
“একটা দাঁতের আক্কেল আছে অথচ তোমার নেই, আস্ত একটা বেআক্কেল বেডি! তোমার কি গসিপের পাত্রী হওয়ার খুব শখ? যদি তাই হয়, তবে আমি কয়েকটা লোক ভাড়া করে দিচ্ছি, যারা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা তোমার পিছে লেগে থেকে গসিপ করবে। নাকি তোমার আসল কষ্টটা অন্য জায়গায়? কলেজের সবাই জেনে গেল যে তুমি ম্যারিড, এখন আর কেউ তোমার পেছনে লাইন মারবে না—এই জন্য কি খুব খারাপ লাগছে?”
রুশদী এবার রাগে অপমানে তোতলামি শুরু করে দিল, “এই! একদম ফাউল কথা বলবেন না কিন্তু! আমার বয়েই গেছে কেউ আমার পেছনে ছেঁছড়ার মতো পড়ে থাকুক সেই স্বপ্ন দেখতে।”
“তাহলে তোমার প্রবলেমটা কোথায়? আমার তো কোনো সমস্যা দেখছি না। প্রবলেম তো হওয়ার কথা আমার। কারণ আমার বউকে অন্য একটা ছেলে টিজ করে বেড়ায়, বিরক্ত করে। এটা আমার ইগোতে লাগে রুশদী, তোমার না। আমার স্ত্রীকে অন্য কেউ স্পর্শ করবে বা বিরক্ত করবে—এটা আমি মেনে নেব? হাহ্! আমি যে ওর হাড়গোড় আস্ত রেখে এসেছি, এটাই তোমার আর ওর কপাল!এখন কলেজে তোমার ধারের কাছেও কেউ থাকবে না দেখে নিও, কারন তুনি শারফারাজ খান এর বউ।
রুশদী এবার জেদ ধরে বলল, “তাহলে এক কাজ করি? আগামীকাল থেকে আমার কপালে বড় বড় করে লিখে রাখি,’আমি শারফারাজ খানের বউ’। তাহলে সবার চিনতে আরও সুবিধা হবে, কী বলেন?”
ফারাজ যেন রুশদীর এই ত্যাঁদড়ামিতে মুগ্ধ হলো। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “বাহ! তোমার এই ছোট মাথায় এত ভালো একটা বুদ্ধি এল কোত্থেকে? তবে কলম দিয়ে না লিখে ট্যাটু করে ফেললে মনে হয় আরও বেশি পারমানেন্ট হতো!”
রুশদী মুখটা বিকৃত করে বলে উঠল, “আপনি না আসলেই একটা…”
ফারাজ রুশদীর কথা শেষ করতে দিল না। সে আবার ড্রাইভিং সিটে সোজা হয়ে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে শেষ কথাটি বলে দিল যা রুশদীর হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল,”লিসেন, নাউ ইউ আর মাই প্রাইভেট প্রপার্টি। অনলি মাইন! আমি সেখানে দ্বিতীয় কাউকেই সহ্য করব না। বুঝতে পেরেছেন, মিস ছোট মগজের অধিকারী?”
গাড়িটা ঝড়ের বেগে সামনের দিকে এগিয়ে চলল।
রুশদী জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলল, তারপর চোখ উল্টে অত্যন্ত অবজ্ঞার সাথে একটা ভেংচি কাটল। ফারাজের কথায় সায় দিয়ে গাল ফুলিয়ে একটা ছোট্ট উত্তর দিল, “হুম।”
গাড়ির পেছনের সিটে বসে থাকা ছোট্ট প্রাণটি তখন চরম বিরক্ত। এতক্ষণ ধরে তার মম আর পাপার এই বাকযুদ্ধ দেখতে দেখতে সে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার ছোট্ট মগজে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই দুজন মানুষ সারাক্ষণ কেন এত ঝগড়া করে? ঝগড়া না করলে কি ওদের পেটের ভাত হজম হয় না?
শের আর চুপ থাকতে পারল না। সে তার দুই হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে, রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বলল,
“উফ! তোমরা এত ঝগড়া করো কেন বল তো? একদম যেন টম অ্যান্ড জেরি! তোমরা কি বোঝো না যে তোমাদের এভাবে ঝগড়া করতে দেখলে আমিও ঝগড়া করা শিখে যাব? হুহ্! তোমাদের দুজনের একজনেরও একটুও ম্যানার নেই। আমার মতো একটা কিউট বেবির সামনে কেউ এভাবে ঝগড়া করে?আমি তোমাদের থেকে কি শিখবো? ”
শেরের কথা শুনে রুশদী আর ফারাজ,দুজনেরই মুখ হা হয়ে গেল। বিস্ময়ের ঘোর এমন যে, যেন মুখে মশা ঢুকে যাওয়ার উপক্রম! এইটুকু একটা পুঁচকে ছেলে, অথচ কথা বলে যেন আস্ত এক বুড়ো মানুষ। খোদা হয়তো একে দুনিয়ায় পাঠানোর সময় বুদ্ধির সাথে খানিকটা এক্সট্রা অর্ডিনারি মশলা মিশিয়ে দিয়েছিলেন।
ফারাজ নিজেকে সামলে নিয়ে একটু কড়া গলায় বলল, “আমরা কোনো টিচার নই যে তুমি আমাদের কাছ থেকে কিছু শিখবে। এখন ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করে বসে থাকো।”
শেরও ঠিক বাবার মতোই সমান তালে এটিটিউড দেখিয়ে পালটা জবাব দিল, “বড়দেরও তো ছোটদের সামনে ঝগড়া করতে হয় না!”
বাপের বেটা বটে! সামনের নৌকা যেদিকে যায়, পেছনের নৌকাও তো সেদিকেই যাবে। পিতা যদি শারফরাজ খান হয়, তবে পুত্র শিহরান খান শের-ও কোনো অংশে কম নয়। শের এবার হাত-পা ছুড়ে অভিমানে গাল ফুলিয়ে জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে বসল। তার আর এসব ভালো লাগে না। অন্য সব ফ্যামিলিতে কি বাবা-মায়েরা এত ঝগড়া করে? নিশ্চয়ই না! শুধু তার কপালটাই এমন মন্দ।
ফারাজ আয়নায় ছেলের প্রতিচ্ছবি দেখে বলল, “শের, তুমি কি আমার সাথে তর্ক করছ?”
শের সংক্ষিপ্ত আর কাঠখোট্টা উত্তর দিল, “নো!”
ফারাজ আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বুঝে গাড়ি স্টার্ট দিল। এদিকে রুশদীর এবার ছেলের ওপর মায়া হলো। সে একটু আদুরে ভঙ্গিতে শেরের ফুলিয়ে রাখা গালটা টেনে দিয়ে বলল, “কী হলো আমার অ্যাংরি বার্ডের? মুখ এভাবে ফুলিয়ে আছে কেন?”
শের বাচ্চাদের মতো মুখ আরও একটু ফুলিয়ে ভারি গলায় বলল, “অ্যাংরি বার্ড এখন অ্যাংরি মুডে আছে, মম!”
ছেলের এই পাকা পাকা বুলি আর কথা বলার ধরন দেখে এই পরিস্থিতির মাঝেও রুশদীর হাসি পেয়ে গেল। সে হাসি চেপে রেখে বলল, “অ্যাংরি বার্ড অ্যাংরি মুডে থাকবে, এটাই তো নরমাল!”
শের এবার চট করে মম এর দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে অভিমান স্পষ্ট। সে বড়দের মত গম্ভীর হয়ে বলল, “মম, তুমি কি এখন আমার সাথে মজা নিচ্ছ?”
রুশদী এবার আর হাসি সামলাতে পরল না।রুশদী দ্রুত নিজের ভঙ্গি সামলে নিয়ে ঠোঁটে হাসি চেপে ধরল। বড় বড় চোখ করে শেরের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিরীহভাবে বলল, “নো নো নেভার! আমি তোমার সাথে মজা নেব কেন? আমি কি ওমন কাজ করতে পারি বলো তো? আমি তো একদম ইনোসেন্ট পাবলিক!”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ১০
রুশদীর এই ‘ইনোসেন্ট’ দাবি করা মাত্রই স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখা ফারাজ এক মুহূর্ত দেরি না করে টিপ্পনী কাটল। সামনের রাস্তায় নজর রেখেই সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল, “তোমার থেকে আজরাইল বেশি ইনোসেন্ট!”
